(৩৩:২৮) (হে নবী)! ৪১ তোমার স্ত্রীদেরকে বলো, যদি তোমরা দুনিয়া এবং তার ভূষণ চাও, তাহলে এসো আমি তোমাদের কিছু দিয়ে ভালোভাবে বিদায় করে দিই৷
(৩৩:২৯) আর যদি তোমরা আল্লাহ, তাঁর রসূল ও আখেরাতের প্রত্যাশী হও, তাহলে জেনে রাখো তোমাদের মধ্যে যারা সৎকর্মশীল তাদের জন্য আল্লাহ মহা প্রতিদানের ব্যবস্থা করে রেখেছেন৷৪২
(৩৩:৩০) হে নবীর স্ত্রীগণ! তোমাদের মধ্য থেকে যে কেউ কোনো সুস্পষ্ট অশ্লীল কাজ করবে তাকে দ্বিগুন শাস্তিদেয়া হবে৷ ৪৩ আল্লাহর জন্য এটা খুবই সহজ কাজ৷ ৪৪
(৩৩:৩১) আর তোমাদের মধ্য থেকে যে কেউ আল্লাহ ও তাঁর রসূলের আনুগত্য করবে এবং সৎকাজ করবে তাকে আমি দুবার প্রতিদান দেবো ৪৫ এবং আমি তার জন্য সম্মানজনক রিযিকের ব্যবস্থা করে রেখেছি৷
(৩৩:৩২) হে নবীর স্ত্রীগণ! তোমরা সাধারণ নারীদের মতো নও৷ ৪৬ যদি তোমরা আল্লাহকে ভয় করে থাকো, তাহলে মিহি স্বরে কথা বলো না, যাতে মানুষ গলদে আক্রান্ত কোনো ব্যক্তি প্রলুব্ধ হয়ে পড়ে, বরং পরিষ্কার সোজা ও স্বাভাবিকভাবে কথা বলো৷৪৭
(৩৩:৩৩) নিজেদের গৃহ মধ্যে অবস্থান করো ৷৪৮ এবং পূর্বের জাহেলী যুগের মতো সাজসজ্জা দেখিয়ে বেড়িও না৷ ৪৯ নামায কায়েম করো, যাকাত দাও এবং আল্লাহ ও তাঁর রসূলের আনুগত্য করো৷ আল্লাহ তো চান, তোমাদের নবী পরিবার থেকে ময়লা দূর করতে এবং তোমাদের পুরোপুরি পাক-পবিত্র করে দিতে৷৫০
(৩৩:৩৪) আল্লাহর আয়াত ও জ্ঞানের যেসব কথা তোমাদের গৃহে শুনানো হয় ৷ ৫১ তা মনে রেখো৷ অবশ্যই আল্লাহ সূক্ষ্মদর্শী ৫২ ও সর্ব অবহিত৷
৪১. এখানে থেকে ৩৫ আয়াত পর্যন্ত আহযাব ও বনী কুরাইযার যুদ্ধের সন্নিহিত সময়ে নাযিল হয়েছিল৷ ভূমিকায় আমি এগুলোর পটভূমি সংক্ষেপে বর্ণনা করেছি৷ সহীহ মুসলিমে হযরত জাবের ইবনে আবদুল্লাহ (রা) সেযুগের একটি ঘটনা বর্ণনা করেছেন৷ তিনি বলেছেন, একদিন হযরত আবু বকর (রা) ও হযরত উমর (রা) নবী করীমের (সা) খেদমতে হাজির হয়ে দেখনে তাঁর স্ত্রীগণ তাঁর চারদিকে বসে আছেন এবং তিনি কোন কথা বলছেন না৷ নবী করীম (সা) হযরত উমরকে সম্বোধন করে বললেন, (আরবী)"তুমি দেখতে পাচ্ছো, এরা আমার চারদিকে বসে আছে এবং আমার কাছে খরচপত্রের জন্য টাকা চাচ্ছে৷" একথা শুনে তাঁরা উভয়ে নিজ নিজ মেয়েকে ধমক দিলেন এবং তাদেরকে বললেন, তোমরা রসূললুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে কষ্ট দিচ্ছো এবং এমন জিনিস চাচ্ছো যা তাঁর কাছে নেই৷ এ ঘটনা থেকে বুঝা যায়, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আর্থিক সংকট সে সময় কেমন ঘনীভূত ছিল এবং কুফর ও ইসলামের চরম দ্বন্দ্বের দিনগুলোতে খরচপাতির জন্য পবিত্র স্ত্রীগণের তাগাদা তাঁর পবিত্র ব্যক্তিত্বকে কিভাবে বিচলিত করে তুলছিল৷
৪২. এ আয়াতটি নাযিল হবার সময় নবী সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লামের স্ত্রী ছিল চারজন৷ তাঁরা ছিলেন হযরত সওদা (রা), হযরত আয়েশা (রা), হযরত হাফসা (রা) এবং হযরত উম্মে সালামাহ (রা) তখনো হযরত যয়নবের (রা) সাথে নবী করীমের (সা) বিয়ে হয়নি৷ (আহকামুল কুরআন, ইবনুল আরাবী, ১৯৫৮ সালে মিসর থেকে মুদ্রিত, ৩ খণ্ড, পৃষ্ঠা ৫১২-৫১৩) এ আয়াত নাযিল হবার পর নবী করীম (সা) সর্বপ্রথম হযরত আয়েশার সাথে আলোচনা করেন এবং বলেন, "আমি তোমাকে একটি কথা বলছি, জবাব দেবার ব্যাপারে তাড়াহুড়া করো না৷ তোমার বাপ-মায়ের মতামত নাও এবং তারপর ফায়সালা করো৷" তারপর তিনি তাঁকে বলেন, আল্লাহর পক্ষ থেকে এ হুকুম এসেছে এবং তাঁকে এ আয়াত শুনিয়ে দেন৷ হযরত আয়েশা বলেন, "এ ব্যাপারটি কি আমি আমার বাপ-মাকে জিজ্ঞেস করবো? আমি তো আল্লাহ, তাঁর রসূল ও আখেরাতকে চাই৷" এরপর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এক এক করে তাঁর অন্যান্য পবিত্র স্ত্রীদের প্রত্যেকের কাছে যান এবং তাঁদেরকে একই কথা বলেন৷ তারা প্রত্যেকে হযরত আয়েশার (রা) মতো একই জবাব দেন৷ (মুসনাদে আহমাদ, মুসলিম ও নাসাঈ)

ইসলামী পরিভাষায় একে বলা হয় "তাখঈর"৷ অর্থাৎ স্ত্রীকে তার স্বামীর থাকার বা আলাদা হয়ে যাবার মধ্য থেকে যে কোন একটিকে বাছাই করে নেবার ফায়সালা করার ইখতিয়ার দান করা৷ এই তাখঈর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওপর ওয়াজিব ছিল৷ কারণ আল্লাহ তাঁকে এর হুকুম দিয়েছিলেন৷ যদি তাঁর পবিত্র স্ত্রীগণের কেউ আলাদা হয়ে যাবার পথ অবলম্বন করতেন তাহলে তিনি আপনা আপনিই আলাদা হয়ে যেতেন না বরং নবী করীমের (সা) আলাদা করে দেবার কারণে আলাদা হয়ে যেতেন যেমন আয়াতের শব্দাবলী থেকে সুষ্পষ্ট হচ্ছেঃ "এসো আমি কিছু দিয়ে তোমাদের ভালোভাবে বিদায় করে দেই৷" কিন্তু এ অবস্থায় তাঁকে আলাদা করে দেয়া নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওপর ওয়াজিব ছিল৷ কারণ নিজের প্রতিশ্রুতি পালন না করা নবী হিসেবে তাঁর জন্য সমীচীন ছিল না৷ আলাদা হয়ে যাবার পর বহ্যত এটাই মনে হয়, মু'মিনের মাতার তালিকা থেকে তাঁর নাম কাটা যেতো এবং অন্য মুসলমানের সাথে তাঁর বিবাহ আর হারাম থাকতো না৷ কারণ তিনি দুনিয়া এবং তার সাজসজ্জার জন্যই তো রসূলে করীমের (সা) থেকে আলাদা হতেন এবং এর অধিকার তাঁকে দেয়া হয়েছিল৷ আর একথা সুষ্পষ্ট যে, অন্য কারো সাথে বিবাহ নিষিদ্ধ থাকলে তাঁর এ উদ্দেশ্য পূর্ণ হতো না৷ অন্যদিকে আয়াতে এটিও একটি উদ্দেশ্য মনে হয়, নবী করীমের (সা) যে সকল স্ত্রী আল্লাহ, তাঁর রসূল ও আখেরাতকে পছন্দ করে নিয়েছেন তাঁদেরকে তালাক দেবার ইখতিয়ার নবীর আর থাকেনি৷ কারণ তাখঈরের দু'টি দিক ছিল৷ এক, দুনিয়াকে গ্রহণ করলে তোমাদেরকে আলাদা করে দেয়া হবে৷ দুই, আল্লাহ, তাঁর রসূল ও আখেরাতকে গ্রহণ করলে তোমাদের আলাদা করে দেয়া হবে না৷ এখন একথা সুষ্পষ্ট, এ দু'টি দিকের মধ্য থেকে যে কোন একটি দিকই কোন মাহিমান্বিতা মহিলা গ্রহণ করলে দ্বিতীয় দিকটি স্বাভাবিকভাবেই তাঁর জন্য নিষিদ্ধ হয়ে যেতো৷

ইসলামী ফিকহে "তাখঈর" আসলে তালাকের ক্ষমতা অর্পণ করার পর্যায়ভুক্ত৷ অর্থাৎ স্বামী এর মাধ্যমে স্ত্রীকে এ ক্ষমতা দেয় যে, সে চাইলে তার স্ত্রী হিসেবে থাকতে পারে এবং চাইলে আলাদা হয়ে যেতে পারে৷ এ বিষয়টির ব্যাপারে কুরআন ও সুন্নাহ থেকে ইজহিহাদের মাধ্যমে ফকীহগণ যে বিধান বর্ণনা করেছেন তার সংক্ষিপ্ত সার নিম্নরূপঃ

একঃ এ ক্ষমতা একবার স্ত্রীকে দিয়ে দেবার পর স্বামী আর তা ফেরত নিতে পাবে না এবং স্ত্রীকে তা ব্যবহার করা থেকে বিরত রাখতেও পারে না৷ তবে স্ত্রীর জন্য তা ব্যবহার করা অপরিহার্য হয়ে যায় না৷ সে চাইলে স্বামীর সাথে থাকতে সম্মত হতে পারে, চাইলে আলাদা হয়ে যাবার কথা ঘোষণা করতে পারে এবং চাইলে কোন কিছুর ঘোষণা না দিয়ে এ ক্ষমতাকে এমনিই নষ্ট হয়ে যাবার সুযোগ দিতে পারে৷

দুইঃ এ ক্ষমতাটি স্ত্রীর দিকে স্থানান্তরিত হবার জন্য দু'টি শর্ত রয়েছে৷ প্রথমত স্বামী কর্তৃক তাকে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় তালাকের ইখতিয়ার দান করা চাই, অথবা তালাকের কথা সুষ্পষ্ট ভাষায় না বললেও এ ইখতিয়র দেবার নিয়ত তার থাকা চাই৷ যেমন, সে যদি বলে, "তোমার ইখতিয়ার আছে" বা "তোমার ব্যাপার তোমার হাতে আছে," তাহলে এ ধরনের ইংগিতধর্মী কথার ক্ষেত্রে স্বামীর নিয়ত ছাড়া তালাকের ইখতিয়ার স্ত্রীর কাছে স্থানান্তরিত হবে না৷ যদি স্ত্রী এর দাবী করে এবং স্বামী হলফ সহকারে বিকৃতি দেয় যে, এর মাধ্যমে তালাকের ইখতিয়ার সোপর্দ করার উদ্দেশ্য তার ছিল না তাহলে স্বামীর কথা গ্রহণ করা হবে৷ তবে স্ত্রী যদি এ মর্মে সাক্ষ্য হাজির করে যে, "অবনিবনা ঝগড়া বিবাদের পরিবেশে বা তালাকের কথাবার্তা চলার সময় একথা বলা হয়েছিল, তাহলে তখন তার দাবী বিবেচিত হবে৷ কারণ এ প্রেক্ষাপটে ইখতিয়ার দেবার অর্থ এটাই বুঝা যাবে যে, স্বামীর তালাকের ইখতিয়ার দেবার নিয়ত ছিল৷ দ্বিতীয়ত স্ত্রীর জানতে হবে যে, তাকে এ ইখতিয়ার দেয়া হয়েছে৷ যদি সে অনুস্থিত থাকে, তাহলে তার কাছে এ খবর পৌঁছুতে হবে এবং যদি সে উপস্থিত থাকে, তাহলে এ শব্দগুলো তার শুনতে হবে৷ যতক্ষণ সে নিজ কানে শুনবে না অথবা তার কাছে খবর পৌঁছুবে না ততক্ষণ ইখতিয়ার তার কাছে স্থানান্তরিত হবে না৷

তিনঃ যদি স্বামী কোন সময় নির্ধারণ করা ছাড়াই শর্তহীনভাবে স্ত্রীকে ইখতিয়ার দান করে, তাহলে স্ত্রী কতক্ষণ পর্যন্ত এ ইখতিয়ার প্রয়োগ করতে পারে? এ ব্যাপারে ফকীহদের মধ্যে মতবিরোধ পাওয়া যায় একটি দল বলেন, যে বৈঠকে স্বামী একথা বললেই বৈঠকেই স্ত্রী তার ইখতিয়ার প্রয়োগ করতে পারে৷ যদি সে কোন জবাব না দিয়ে সেখান থেকে উঠে যায় অথবা এমন কাজে লিপ্ত হয় যা একথাই প্রমাণ করে যে, সে জবাব দিতে চায় না, তাহলে তার ইখতিয়ার বাতিল হয়ে যাবে৷ এ মত পোষণ করেন হযরত উমর (রা), হযরত উসমান (রা), হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা), হযরত জাবের ইবনে আবদুল্লাহ (রা), হযরত জাবের ইবনে যায়েদ, আতা (র), মুজাহিদ (র), শা'বী (র) ইবরাহীম নাখঈ (র), ইমাম মালেক (র) ইমাম আবু হানীফা (র), ইমাম শাফেঈ (র), ইমাম আওযায়ী (র), সুফিয়ান সওরী (র) ও আবু সওর (র)৷ দ্বিতীয় দলগনের মতে, তার ইখতিয়ার ঐ বৈঠক পর্যন্ত সীমাবদ্ধ থাকবে না বরং তারপরও সে এ ইখতিয়ার প্রয়োগ করতে পারবে৷ এ মত পোষণ করেন হযরত হাসান বসরী (র), কাতাদাহ ও যুহরী৷

চারঃ স্বামী যদি সময় নির্ধারণ করে দেয়৷ যেমন, সে যদি বলে, এক মাস বা এক বছর পর্যন্ত তোমাকে ইখতিয়ার দিলাম অথবা এ সময় পর্যন্ত তোমার বিষয় তোমার হাতে রইলো, তাহলে ঐ সময় পর্যন্ত সে এ ইখতিয়ার ভোগ করবে৷ তেব যদি সে বলে, তুমি যখন চাও এ ইখতিয়ার ব্যবহার করতে পারো, তাহলে এ অবস্থায় তার ইখতিয়ার হবে সীমাহীন৷

পাঁচঃ স্ত্রী যদি আলাদা হতে চায়, তাহেল তাকে সুষ্পষ্ট ও চূড়ান্ত অর্থবোধক শব্দাবলীর মাধ্যমে তা প্রয়োগ করতে হবে৷ অস্পষ্ট শব্দাবলী, যার মাধ্যমে বক্তব্য সুস্পষ্ট হয় না, তা দ্বারা ইখতিয়ার প্রয়োগ কার্যকর হতে পারে না৷

ছয়ঃ আইনত স্বামীল পক্ষ থেকে স্ত্রীকে ইখতিয়ার দেবার জন্য তিনটি বাক্য ব্যবহার করা যেতে পারে৷ এক, সে বলবৈ, "তোমার ব্যাপারটি তোমার হাতে রয়েছে৷" দুই, সে বলবে, "তোমাকে ইখতিয়ার দেয়া হচ্ছে৷" তিন, সে বলবে,"যদি তুমি চাও তাহলে তোমাকে তালাক দিলাম৷" এর মধ্যে প্রত্যেকটির আইনগত ফলাফল হবে ভিন্ন রকমেরঃ

(ক) "তোমার বিষয়টি তোমার হাতে রয়েছে" এ শব্দগুলো যদি স্বামী বলে থাকে এবং স্ত্রী এর জবাবে এমন কোন স্পষ্ট কথা বলে যা থেকে বুঝা যায় যে, সে আলাদা হয়ে গেছে, তাহলে হানাফী মতে এক তালাক বায়েন হয়ে যাবে৷ অর্থাৎ এরপর স্বামী আর স্ত্রীকে ফিরিয়ে নিতে পারবে না৷ কিন্তু ইদ্দত অতিবাহিত হবার পর উভয়ে আবার চাইলে পরস্পরকে বিয়ে কতে পারে৷ আর যদি স্বামী বলে থাকে, " এক তালাক পর্যন্ত তোমার বিষয়টি তোমার হাতে রয়েছে," তাহলে এ অবস্থায় একটি 'রজঈ' তালাক অনুষ্ঠিত হবে৷ (অর্থাৎ ইদ্দতের মধ্যে স্বামী চাইলে স্ত্রীকে ফিরিয়ে নিতে পারে৷) কিন্তু স্বামী যদি বিষয়টি স্ত্রীর হাতে সোপর্দ করতে গিয়ে তিন তালাকের নিয়ত করে থাকে অথবা একথা সুস্পষ্ট করে বলে থাকে, তাহলে সে সুস্পষ্ট ভাষায় নিজের ওপর তিন তালাক আরোপ করুক অথবা কবেলমাত্র একবার বলুক আমি আলাদা হয়ে গেলাম বা নিজেকে তালাক দিলাম, এ অবস্থার স্ত্রীর ইখতিয়ার তালাকের সমার্থক হবে৷

(খ) "তোমাকে ইখতিয়ার দিলাম" শব্দগুলোর সাথে যদি স্বামী স্ত্রীকে আলাদা হয়ে যাওয়ার ইখতিয়ার দিয়ে থাকে এবং স্ত্রী আলাদা হয়ে যাওয়ার কথা স্পষ্ট ভাষায় ব্যক্ত করে থাকে, তাহলে হানাফীর মতে স্বামীর তিন তালাকের ইখতিয়ার দেবার নিয়ত থাকলেও একটি বায়েন তালাকই অনুষ্ঠিত হবে৷ তবে যদি স্বামীর পক্ষ থেকে তিন তালাকের ইখতিয়ার দেবার কথা সুস্পষ্টভাবে বলা হয়ে থাকে, তাহলে স্ত্রীর তালাকের ইখতিয়ারের মাধ্যমে তিন তালাক অনুষ্ঠিত হয়ে যাবে৷ ইমাম শাফেঈর (র) মতে, যদি স্বামী ইখতিয়র দেবার সময় তালাকের নিয়ত করে থাকে এবং স্ত্রী আলাদা হয়ে যায়, তাহলে একটি রজঈ তালাক অনুষ্ঠিত হবে৷ ইমাম মালেকের (র) মতে, স্বামী যদি স্ত্রীর সাথে সহবাস করে থাকে তাহলে তিন তালাক অনুষ্ঠিত হবে আর যদি সহবাস না করে থাকে, তাহলে এ অবস্থায় স্বামী এক তালাকের নিয়তের দাবী করলে তা মেনে নেয়া হবে৷

(গ) "যদি তুমি চাও, তাহলে তোমাকে তালাক দিলাম" একথা বলার পর যদি স্ত্রী তালাকের ইখতিয়ার ব্যবহার করে, তাহলে বায়েন নয় বরং একটি রজঈ তালাক অনুষ্ঠিত হবে৷

সাতঃ যদি স্বামীর পক্ষ থেকে আলাদা হবার ইখতিয়ার দেবার পর স্ত্রী তার স্ত্রী হয়ে থাকার জন্য নিজের সম্মতি প্রকাশ করে, তাহলে কোন তালাক সংঘটিত হবে না৷ এ মত পোষণ করেন হযরত উমর (রা), হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা), হযরত আয়েশা (রা), হযরত আবুদ দারদা (রা), হযর ইবনে আব্বাস (রা) ও হযরত ইবনে উমর (রা) সংখ্যাগরিষ্ঠ ফকীহগণ এ মতই অবলম্বন করেছেন৷ মাসরূক হযরত আয়েশাকে এ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেন৷ তিনি জবাব দেনঃ

(আরবী)

"রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর স্ত্রীদেরকে ইখতিয়ার দিয়েছিলেন এবং তাঁরা রসূলূল্লাহরই সাথে থাকা পছন্দ করেছিলেন৷ একে কি তালাক বলে গণ্য করা হয়?"

এ ব্যাপারে একমাত্র হযরত আলীল (রা) ও হযরত যায়েদ ইবনে সাবেতের (রা) এ অভিমত উদ্ধৃত হয়েছে যে, এ ক্ষেত্রে একটি রজঈ তালাক অনুষ্ঠিত হবে৷ কিন্তু এ উভয় মনীষীর অন্য একটি বর্ণনা থেকে জানা যায় যে, তাঁরাও এ ক্ষেত্রে কোন তালাক সংঘটিত হবে না বলে মত প্রকাশ করেছেন৷
৪৩. এর অর্থ এ নয় যে, নাউযুবিল্লাহ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পবিত্র স্ত্রীদের থেকে কোন অশ্লীল কাজের আশংকা ছিল৷ বরং এর মাধ্যমে নবীর স্ত্রীগণকে এ অনুভূতি দান করাই উদ্দেশ্য ছিল যে, ইসলামী সমাজে তাঁরা মেন উচ্চ মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত আছেন সেই অনুযায়ী তাঁদের দায়িত্বও অনেক কঠিন৷ তাই তাঁদের নৈতিক চালচলন হতে হবে অত্যন্ত পবিত্র ও পরিচ্ছন্ন৷ এটা ঠিক তেমনি যেমন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে সম্বোধন করে মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী)" যদি তুমি শিরক করো তাহলে তোমার সমস্ত কৃতকর্ম বরবাদ হয়ে যাবে৷" (আয যুমারঃ ৬৫) এর অর্থ এ নয় যে, নাউযুবিল্লাহ নবী করীম (সা) থেকে কোন শিরকের আশংকা ছিল বরং নবী করীমকে এবং তাঁর মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে শিরক কত ভয়াবহ অপরপাধ এবং তাকে কঠোরভাবে এড়িয়ে চলা অপরিহার্য, সে কথা বুঝানোই ছিল উদ্দেশ্য৷
৪৪. অর্থাৎ তোমরা এ ভুলের মধ্যে অবস্থান করো না যে, নবীর স্ত্রী হওয়ার কারণে তোমরা আল্লাহর পাকড়াও থেকে বেঁচে যাবে অথবা তোমাদের মর্যাদা এত বেশী উন্নত যে, সে কারণে তোমাদেরকে পাকড়াও করা আল্লাহর জন্য কঠিন হয়ে যেতে পারবে৷
৪৫. গোনাহর জন্য দু'বার শাস্তিও নেকীর জন্য দু'বার পুরস্কার দেবার কারণ হচ্ছে এই যে, আল্লাহ যাদেরকে মানুষের সমাজে কোন উন্নত মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করেন তারা সাধারণত জনগণের নেতা হয়ে যায় এবং জনগণের বিরাট অংশ ভালো ও মন্দ কাজে তাঁদেরকেই অনুসরণ করে চলে৷ তাঁদের খারাপ কাজ শুধুমাত্র তাঁদের একার খারাপ কাজ হয় না বরং একটি জাতির চরিত্র বিকৃতরি কারণও হয় এবং তাঁদের ভালো কাজ শুধুমাত্র তাদের নিজেদের ব্যক্তিগত ভালো কাজ হয় না বরং বহু লোকের কল্যাণ সাধনেরও কারণ হয়৷ তাই তারা যখন খারাপ কাজ করে তখন নিজেদের খারাপের সাথে সাথে অন্যদের খারাপেরও শাস্তি পায় এবং যখনি তারা সৎকাজ করে তখন নিজেদের সৎকাজের সাথে সাথে অন্যদেরকে তারা যে সৎপথ দেখিয়েছে তারও প্রতিদান লাভ করে৷ আলোচ্য আয়াত থেকে এ মূলনীতিও স্থিরীকৃত হয়ে যে, যেখানে মর্যাদা যত বেশী হবে এবং যত বেশী বিশ্বস্ততার আশা করা হবে যেখানে মর্যাদাহানি ও অবিশ্বস্ততার অপরাধ ততবেশী কঠোর হবে এবং এ সংগে তার শাস্তি ও হবে তত বেশী কঠিন৷ যেমন মসজিদে শরাব পান করা নিজ গৃহে শরাব পান করার চেয়ে বেশী ভয়াবহ অপরাধ এবং এর শাস্তি ও বেশী কঠোর৷ মাহরাম নারীদের সাথে যিনা করা অন্য নারীদের সাথে যিনা করার তুলনায় বেশী গোনাহের কাজ এবং এ জন্য শাস্তি ও হবে বেশী কঠিন৷
৪৬. এখান থেকে শেষ প্যারা পর্যন্ত আয়াতগুলোর মাধ্যমে ইসলামে পরদা সংক্রান্ত বিধানের সূচনা করা হয়েছে৷ এ আয়াতগুলোতে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের স্ত্রীদেরকে সম্বোধন করা হয়েছে৷ কিন্তু এখানে উদ্দেশ্য হচ্ছে সমস্ত মুসলিম পরিবারে এ সংশোধনীগুলো প্রবর্তন করা৷ নবীর পবিত্র স্ত্রীগণকে সম্বোধন করার একমাত্র উদ্দেশ্য হচ্ছে এই যে, যখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের গৃহ থেকে এ পবিত্র জীবন ধারার সূচনা হবে তখন অন্যান্য সকল মুসলিম গৃহের মহিলারা আপনা আপনিই এর অনুসরণ করতে থাকবে৷ কারণ এ গৃহটিই তাদের জন্য আদর্শ ছিল৷ এ আয়াতগুলোতে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের স্ত্রীদেরকে সম্বোধন করা হয়েছে কেবলমাত্র এরি ভিত্তিতে কেউ কেউ দাবী করে বসেছেন যে, এ বিধানগুলো কেবলমাত্র তাঁদের সাথেই সংশ্লিষ্ট৷ কিন্তু সামনের দিকে এ আয়াতগুলোতে যা কিছু বলা হয়েছে তা পাঠ করে দেখুন৷ এর মধ্যে কোনটি এমন যা শুধুমাত্র নবীর (সা) পবিত্র স্ত্রীদের সাথে সংশ্লিষ্ট এবং বাকি মুসলমান নারীদের জন্য কাংখিত নয়? কেবলমাত্র নবীর স্ত্রীগণই আবর্জনামুক্ত নিষ্কলুষ জীবন যাপন করবেন, তাঁরাই আল্লাহ ও রসূলের আনুগত্য করবেন, নামায তাঁরাই পড়বেন এবং যাকাত তাঁরাই দেবেন, আল্লাহর উদ্দেশ্য কি এটাই হতে পারতো? যদি এ উদ্দেশ্য হওয়া সম্ভব না হতো, তাহলে গৃহকোণে নিশ্চিন্তে বসে থাকা, জাহেলী সাজসজ্জা থেকে দূরে থাকা এবং ভিন্ন পুরুষদের সাথে মৃদুস্বরে কথা বলার হুকুম একমাত্র তাদের সাথে সংশ্লিষ্ট এবং অন্যান্য সমস্ত মুসলিম নারীরা তা থেকে আলাদা হতে পারে কেমন করে? একই কথার ধারাবাহিকতায় বিধৃত সামগ্রিক বিধানের মধ্য থেকে কিছু বিধিকে বিশেষ শ্রেণীর মানুষের জন্য নির্দিষ্ট ও কিছু বিধিকে সর্বসাধারণের পালনীয় গণ্য করার পেছনে কোন ন্যায়সংগত যুক্তি আছে কি? আর "তোমরা সাধারণ নারীদের মতো নও" এ বাক্যটি থেকেও এ অর্থ বুঝায় না যে, সাধারণ নারীদের সাজসজ্জা করে বাইরে বের হওয়া এবং ভিন্ন পুরুষদের সথে খুব ঢলাঢলি করে কথাবার্তা বলা উচিত৷ বরং এ কথাটা কিছুটা এমনি ধরনের যেমন এক ভদ্রলোক নিজের সন্তানদেরকে বলে, "তোমরা বাজারের ছেলেমেয়েদের মত নও৷ তোমাদের গালাগালি না করা উচিত৷" এ থেকে কোন বুদ্ধিমান ব্যক্তি ও বক্তা এ উদ্দেশ্য আবিষ্কার করবে না যে, সে কেবলমাত্র নিজের ছেলেমেয়েদের জন্য গালি দেয়াকে খারাপ মনে করে, অন্য ছেলেমেয়েদের মধ্যে এ দোষ থাকলে তাতে তার কোন আপত্তি নেই৷
৪৭. অর্থাৎ প্রয়োজন হলে কোন পুরুষের সাথে কথা বলতে বাধা নেই কিন্তু এ সময় নারীর কথা বলার ভংগী এধরন এমন হতে হবে যাতে আলাপকারী পুরুষের মনে কখনো এ ধরনের কোন চিন্তার উদয় না হয় যে, এ নারীটির ব্যাপারে অন্য কিচু আশা করা যেতে পারে৷ তার বলার ভংগীতে কোন নমনীয়তা থাকবে না৷ তার কথায় কোন মনমাতানো ভাব থাকবে না৷ সে সজ্ঞানে তার স্বরে মাধুর্য সৃষ্টি করবে না, যা শ্রবণকারী পুরুষের আবেগকে উদ্বেলিত করে তাকে সামনে পা বাড়াবার প্ররোচনা দেবে ও সাহস যোগাবে৷ এ ধরনের কথাবার্তা সম্পর্কে আল্লাহ পরিষ্কার বলেন, এমন কোন নারীর পক্ষে এটা শোভনীয় নয়, যার মনে আল্লাহ ভীতি ও অসৎকাজ থেকে দূরে থাকার প্রবণতা রয়েছে৷ অন্যকথায় বলা যায়, এটা দুশ্চরিত্রা ও বেহায়া নারীদের কথা বলার ধরন মু'মিন ও মুত্তাকী নারীদের নয়৷ এই সাথে সূরা নূরের নিম্নোক্ত আয়াতটিও সামেন রাখা দরকার (আরবী) (আর তারা যেন যমীনের ওপর এমনভাবে পদাঘাত করে না চলে যার ফলে যে সৌন্দর্য তারা লুকিয়ে রেখেছে তা লোকদের গোচরীভূত হয়৷) এ থেকে মনে হয় বিশ্ব-জাহানের রবের পরিষ্কার উদ্দেশ্য হচ্ছে এই যে, নারীরা যেন অযথা নিজেদের স্বর ও অলংকারের ধ্বনি অন্য পুরুষদেরকে না শোনায় এবং যদি প্রয়োজনে অপরিচিতদের সাথে কথা বলতে হয়, তাহলে পূর্ণ সতর্কতা সহকারে বলতে হবে৷ এ জন্য নারীদের আযান দেয়া নিষেধ৷ তাছাড়া জামায়াতের নামাযে যদি কোন নারী হাজির থাকে এবং ইমাম কোন ভুল করেন তাহলে পুরুষের মতো তার সুবহানাল্লাহ বলার অনুমতি নেই, তার কেবলমাত্র হাতের ওপর হাত মেরে আওয়াজ সৃষ্টি করতে হবে যাতে ইমাম সতর্ক হয়ে যান৷এখন চিন্তার বিষয় হচ্ছে যে দীন নারীকে ভিন্ন পুরুষের সাথে কোমল স্বরে কথা বলার অনুমতি দেয় না এবং পুরুষদের সাথে অপ্রয়োজনে কথা বলতেও তাদেরকে নিষেধ করে, সে কি কখনো নারীর মঞ্চে এসে নাচগান করা, বাজনা বাজানো ও রঙ্গরস করা পছন্দ করতে পারে? সে কি রেডিও-টেলিভিশনে নারীদের প্রেমের গান গেয়ে এবং সুমিষ্ট স্বরে অশ্লিল রচনা শুনিয়ে লোকদের আবেগকে উত্তেজিত করার অনুমতি দিতে পারে? নারীরা নাটকে কখনো কারো স্ত্রীর এবং কখনো কারো প্রেমিকার অভিনয় করবে, এটাকে কি সে বৈধ করতে পারে? অথবা তাদেরক বিমানবালা (Air-hostess) করা হবে এবং বিশষভাবে যাত্রীদের মন ভোলাবার প্রশিক্ষণ দেয়া হবে, কিংবা ক্লাবে, সামাজিক উৎসবে ও নারী-পুরুষের মিশ্র অনুষ্ঠানে তারা চমকপ্রদ সাজ-সজ্জা করে আসবে এবং পুরুষদের সাথে অবাধে মিলেমিশে কথাবার্তা ও ঠাট্টা-তামাসা করবে, এসবকে কি সে বৈধ বলবে? এ সংস্কৃতি উদ্ভাবন করা হয়েছে কোন কুরআন থেকে? আল্লাহর নাযিল করা কুরআন তো সবার সামনে আছে৷ সেখানে কোথাও যদি এ সংস্কৃতির অবকাশ দেখা যায় তাহলে সেখানটা চিহ্নিত করা হোক৷
৪৮. মূলে বলা হয়েছে (আরবী) কোন কোন অভিধানবিদ একে (আরবী) শব্দ থেকে গৃহীত বলে মত প্রকাশ করেন আবার কেউ কেউ বলেন (আরবী) থেকে গৃহীত৷ যদি এটি (আরবী) থেকে উদ্ভুত হয়, তাহলে এর অর্থ হবে "স্থিতিবান হও" "টিকে থাকো"৷ আর যদি (আরবী) থেকে উদ্ভুত হয়, তাহলে অর্থ হবে "শান্তিতে থাকো৷", "নিশ্চিন্তে ও স্থির হয়ে বসে উভয় অবস্তায় আয়াতের অর্থ দাঁড়ায়, নারীর আসল কর্মক্ষেত্র তার গৃহ৷ এ বৃত্তের মধ্যে অবস্থান করে তাকে নিশ্চিন্তে নিজের দায়িত্ব সম্পাদন করে যেতে হবে৷ কেবলমাত্র প্রয়োজনের ক্ষেত্রে সে গৃহের বাইরে বের হতে পারে৷ আয়াতের শব্দাবলী থেকেও এ অর্থ প্রকাশ হচ্ছে এবং নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাদীস একে আরো বেশী সুস্পষ্ট করে দেয়৷ হাফেয আবু বকর বায্‌যার হযরত আনাস (রা) থেকে বর্ণনা করেছেনঃ নারীরা নবী করীমের (সা) কাছে নিবেদন করলো যে, পুরুষরা তো সকল শ্রেষ্ঠ মর্যাদা লুটে নিয়ে গেলো৷ তারা জিহাদ করে এবং জিহাদ করে এবং আল্লাহর পথে বড় বড় কাজ করে৷ মুজাহিদদের সমান প্রতিদান পাবার জন্য আমরা কি কাজ করবো? জবাবে বললেনঃ

(আরবী)

"তোমাদের মধ্য থেকে যে গৃহমধ্যে বসে যাবে সে মুজাহিদদের মর্যদা লাভ করবে৷" অর্থাৎ মুজাহিদ তো তখনই স্থিরচিত্তে আল্লাহ পথে লড়াই করতে পারবে যখন নিজের ঘরের দিক থেকে সে পূর্ণ নিশ্চিন্ত থাকতে পারবে, তার স্ত্রী তার গৃহস্থালী ও সন্তানদেরকে আগলে রাখবে এবং তার অবর্তমানে তার স্ত্রী কোন অঘটন ঘটাবে না, এ ব্যাপারে সে পুরোপুরি আশংকামুক্ত থাকবে৷ যে স্ত্রী তার স্বামীকে এ নিশ্চিন্ততা দান করবে সে ঘরে বসেও তার জিহাদে পুরোপুরি অংশীদার হবে৷ অন্য একটি হাদীস বায্‌যার ও তিরমিযী হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা) থেকে উদ্ধৃত করেছেন৷ তাতে তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের এ উক্তি বর্ণনা করেছেনঃ

(আরবী)

"নারী পর্দাবৃত থাকার জিনিস৷ যখন সে বের হয় শয়তান তার প্রতি দৃষ্টি নিবদ্ধ রাখে এবং তখনই সে আল্লাহর রহমতের নিকটতর হয় যখন সে নিজের গৃহে অবস্থান করে৷" (আরো বেশী ব্যাখ্যার জন্য দেখুন তাফসীর সূরা নূর ৪৯ টীকা)

কুরআন মজীদের এ পরিষ্কার ও সুস্পষ্ট হুকুমের উপস্থিতিতে মুসলমান নারীদের জন্য অবকাশ কোথায় কাউন্সিল ও পার্লামেন্টে সদস্য হবার, ঘরের বাইরে সামাজিক কাজকর্মে দৌড়াদৌড়ি করার, সরকারী অফিসে পুরুষদের সাথে কাজ করা, কলেজে চেলেদের সাথে শিক্ষালাভ করার, পুরুষদের হাসপাতলে নাসিংয়ের দায়িত্ব সম্পাদন করার, বিমানে ও রেলগাড়িতে যাত্রীদের সেবা করার দায়িত্ব নিয়োজিত হবার এবং শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ লাভের জন্য তাদেরকে আমেরিকায় ও ইংল্যাণ্ড পাঠাবার? নারীদের ঘরের বাইরে গিয়ে কাজ করার বৈধতার সপক্ষে সবচেয়ে যে যুক্তি পেশ করা হয় সেটি হচ্ছে এই যে, হযরত আয়েশা (রা) উষ্ট্র যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করেছিলেন৷ কিন্তু এ যুক্তি যারা পেশ করেন তারা সম্ভবত এ ব্যাপারে স্বয়ং হযরত আয়েশার কি চিন্তা ছিল তা জানেন না৷ আবদুল্লাহ ইবনে আহমাদ ইবনে হাম্বল যাওয়ায়েদুয যাহদ এবং ইবনুল মুনযির, ইবনে আবী শাইবাহ ও ইবনে সা'দ তাঁদের কিতাবে মাসরূক থেকে হাদীস উদ্ধৃত করেছেন৷ তাতে বলা হয়েছে, হযরত আয়েশা (রা) যখন কুরআন তেলাওয়াত করতে করতে এ আয়াতে পৌঁছতেন (আরবী) তখন স্বতষ্ফূর্তভাবে কেঁদে ফেলতেন, এমনকি তাঁর উড়না ভিজে যেতো৷ করণ এ প্রসংগে উষ্ট্র যুদ্ধে গিয়ে তিনি যে ভুল করেছিলেন সে কথা তাঁর মনে পড়ে যেতো৷
৪৯. এ আয়াতে দু'টি গুরুত্বপূর্ণ শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে৷ আয়াতের অর্থ অনুধাবন করার জন্য এ দু'টি বুঝে নেয়া জরুরী৷ এর একটি হচ্ছে "তাবাররুজ" এবং দ্বিতীয়টি "জাহেলিয়াত৷"

আরবী ভাষায় 'তাবাররুজ" মানে হচ্ছে উন্মুক্ত হওয়া, প্রকাশ হওয়া এবং সুস্পষ্ট হয়ে সামনে এসে যাওয়া৷ দূর থেকে দেখা যায় এমন প্রত্যেক উঁচু ভবনকে আরবরা "বুরুজ" বলে থাকে৷ দুর্গ বা প্রসাদের বাইরের অংশের উচ্চ থেকে দেখা যায় বলে তাকে "বারজা" বলা হয়, নারীর জন্য তাবাররুজ শব্দ ব্যবহার করা হলে তার তিনটি অর্থ হবে৷ এক, সে তার চেহারা ও দেহের সৌন্দর্য লোকদের দেখায়৷ দুই, সে তার পোশাক ও অলংকারের বহর লোকদের সামনে উন্মুক্ত করে৷ তিন, সে তার চাল-চলন ও চমক-ঠমকের মাধ্যমে নিজেকে অন্যদের সামনে তুলে ধরে৷ অভিধান ও তাফসীর বিসারদগণ এ শব্দটির এ ব্যাখ্যাই করেছেন৷ মুজাহিদ, কাতাদাহ ও ইবনে আবি নুজাইহ বলেন, (আরবী) "তাবাররুজের অর্থ হচ্ছে, গর্ব ও মনোরম অংগভংগী সহকারে হেলেদুলে ও সাড়ম্বরে চলা৷" মুকাতিল বলেন, (আরবী) "নিজের হার, ঘাড় ও গলা সুস্পষ্ট করা৷" আল মুবাররাদের উক্তি হচ্ছেঃ (আরবী) "নারীর এমন গুণাবলী প্রকাশ করা যেগুলো তার গোপন রাখা উচিত৷" আর উবাইদাহর ব্যাখ্যা হচ্ছেঃ

(আরবী)

"নারীর শরীর ও পোশাকের সৌন্দর্য এমনভাবে উন্মুক্ত করা যার ফলে পুরুষেরা তার প্রতি আকৃষ্ট হয়৷"

জাহেলিয়াত শব্দটি কুরআন মজিদের এ জায়গা ছাড়াও আরো তিন জায়গায় ব্যবহার করা হয়েছে৷ এক, আলে ইমরানের ১৫৪ আয়াত৷ সেখানে আল্লাহর পথে যুদ্ধ করার ক্ষেত্রে যারা গা বাঁচিয়ে চলে তদের সম্পর্কে বলা হয়েছে, তারা "আল্লাহ সম্পর্কে সত্যের বিরুদ্ধে জাহেলিয়াতের মতো ধারণা পোষণ করে৷" দুই, সূরা মা-য়েদাহর ৫০ আয়াতে৷ সেখানে আল্লাহর আইনের পরিবর্তে অন্য কারোর আইন অনুযায়ী ফায়সালাকারীদের সম্পর্কে বলা হয়েছে, "তারা কি জাহেলিয়াতের ফায়সালা চায়?" তিন, সূরা ফাতহের ২৬ আয়াতে সেখানে মক্কার কাফেররা নিছক বিদ্বেষ বশত মুসলমানদের উমরাহ করতে দেয়নি বলে তাদের এ কাজকেও "জাহেলী স্বার্থান্ধতা ও জিদ" বলা হয়েছে৷ হাদীসে বলা হয়েছে, একবার হযরত আবু দারদা করো সাথে ঝগড়ায় লিপ্ত হয়ে তার মাকে গালি দেন৷ রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তা শুনে বলেন, "তোমার মধ্যে এখনো জাহেলিয়াত রয়ে গেছে৷" অন্য একটি হাদীসে রসূলুল্লাহ (সা) বলেন, "তিনটি কাজ জাহেলিয়াতের অন্তরভুক্ত৷ অন্যের বংশের খোটা দেয়া, নক্ষত্রের আবর্তন থেকে ভাগ্য নির্ণয় করা এবং মৃতদের জন্য সুর করে কান্নাকাটি করা৷" শব্দটির এ সমস্ত প্রয়োগ থেকে একথা সুস্পষ্ট হয়ে যায় যে, জাহেলিয়াত বলতে ইসলামী পরিভাষায় এমন প্রত্যেকটি কার্যধারা বুঝায় যা ইসলামী কৃষ্টি ও সংস্কৃতি, ইসলামী শিষ্টাচার ও নৈতিকতা এবং ইসলামী মানসিকতার বিরোধী৷ আর প্রথম যুগের জাহেলিয়াত বলতে এমন অসৎকর্ম বুঝায় যার মধ্যে প্রাগৈসলামিক আরবরা এবং দুনিয়ার অন্যান্য সমস্ত লোকেরা লিপ্ত ছিল৷

এ ব্যাখ্যা থেকে একথা সুস্পষ্ট হয়ে যায় যে, আল্লাহ নারীদেরকে যে কার্যধারা থেকে বিরত রাখতে চান তা হচ্ছে, তাদের নিজেদের সৌন্দর্যের প্রদর্শনী করে গৃহ থেকে বের হওয়া৷ তিনি তাদের আদেশ দেন, নিজেদের গৃহে অবস্থান করো৷ কারণ, তোমাদের আসল কাজ রয়েছে গৃহে, বাইরে নয়৷ কিন্তু যদি বাইরে বের হবার প্রয়োজন হয়, তাহলে এমনভাবে বের হয়ো না যেমন জাহেলী যুগে নারীরা বের হতো৷ প্রসাধন ও সাজ-সজ্জা করে, সুশোভন অলংকার ও আঁটসাঁট বা হালকা মিহিন পোষাকে সজ্জিত হয়ে চেহারা ও দেহের সৌন্দর্যকে উন্মুক্ত করে এবং গর্ব ও আড়ম্বরের সাথে চলা কোন মুসলিম সমাজের নারীদের কাজ নয়৷ এগুলো জাহেলিয়াতের রীতিনীতি৷ ইসলামে এসব চলতে পারে না৷ এখন প্রত্যেক ব্যক্তি নিজেই দেখতে পারেন আমাদের দেশে যে সংস্কৃতির প্রচলন করা হচ্ছে তা কুরআনের দৃষ্টিতে ইসলামের সংস্কৃতি না জাহেলিয়াতের সংস্কৃতি? তবে হাঁ, আমদের কর্মকর্তাদের কাছে যদি অন্য কোন কুরআন এসে গিয়ে থাকে, যা থেকে ইসলামের এ নতুন তত্ত্ব ও ধ্যান-ধারণা বের করে তারা মুসলমানদের মধ্যে ছড়াচ্ছেন, তাহলে অবশ্য ভিন্ন কথা৷
৫০. যে প্রেক্ষাপটে এ আয়াত নাযিল হয়েছে তা থেকে সুস্পষ্টভাবে জনা যায় যে, এখানে আহলে বায়েত বা নবী পরিবার বলতে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের স্ত্রীদেরকে বুঝানো হয়েছে৷ কারণ সম্বোধনের সূচনা করা হয়েছে "হে নবীর স্ত্রীগণ৷" বলে এবং সামনের ও পিছনের পুরো ভাষণ তাদেরকে সম্বোধন করেই ব্যক্ত হয়েছে৷ এ ছাড়াও যে অর্থে আমরা "পরিবারবর্গ" শব্দটি বলি এ অর্থে একজন লোকেরা স্ত্রী ও সন্তানরা সবাই এর অন্তরভুক্ত হয় ঠিক সেই একই অর্থে আরবী ভাষায় "আহলুল বায়েত" শব্দটি ব্যবহৃত হয়ে থাকে৷ স্ত্রীকে বাদ দিয়ে "পরিবারবর্গ" শব্দটি কেউ ব্যবহার করে না৷ খোদ কুরআন মজীদেও এ জায়গা ছাড়াও আরো দু'জায়গায় এ শব্দটি এসেছে এবং সে দু'জায়গায়ও তার অর্থের মধ্যে স্ত্রী অন্তরভুক্তই শুধু নয়, অগ্রবর্তীও রয়েছে৷ সূরা হূদে যখন ফেরেশতারা হযরত ইবরাহীমকে (আ) পুত্র সন্তান লাভের সুসংবাদ দেন তখন তাঁর স্ত্রী তা শুনে বিস্ময় প্রকাশ করেন এই বলে যে, এ বুড়ো বয়সে আমাদের আবার ছেলে হবে কেমন করে৷ একথায় ফেরেশতারা বলেনঃ

(আরবী)

"তোমরা কি আল্লাহর কাজে অবাক হচ্ছো? হে এ পরিবারের লোকেরা! তোমাদের প্রতি তো আল্লাহর রহমত ও তাঁর বরকত রয়েছে৷"

সূরা কাসাসে যখন হযরত মূসা (আ) একটি দুগ্ধপোষ্য শিশু হিসেবে ফেরাউনের গৃহে পৌঁছে যান এবং ফেরাউনের স্ত্রী এমন কোন ধাত্রীর সন্ধান করতে থাকেন যার দুধ এ শিশু পান করবে তখন হযরত মূসার বোন গিয়ে বলেনঃ

(আরবী)

"আমি কি তোমাদের এমন পরিবারের খবর দেবো যারা তোমাদের জন্য এ শিশুর লালন-পালনের দায়িত্ব নেবেন?

কাজেই ভাষার প্রচলিত কথ্যরীতি, কুরআনের বর্ণনাভংগী এবং খোদ এ আয়াতটির পূর্বাপর আলোচ্য বিষয় সবকিছুই চূড়ান্তভাবে প্রমাণ করে যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আহলি বায়েতের মধ্যে তাঁর পবিত্র স্ত্রীগণও আছেন এবং তাঁর সন্তানরাও আছেন৷ বরং বেশী নির্ভুল কথা হচ্ছে এই যে, আয়াতে মূলত সম্বোধন করা হয়েছে তাঁর স্ত্রীগণকেই এবং সন্তানরা এর অন্তরভুক্ত গণ্য হয়েছেন শব্দের অর্থের প্রেক্ষিতে৷ এ কারণে ইবনে আব্বাস (রা), উরওয়া ইবনে যুবাইরে (রা) এবং ইকরামাহ বলেন, এ আয়াতে আহলে বায়েত বলতে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের স্ত্রীদেরকেই বুঝানো হয়েছে৷

কিন্তু কেউ যদি বলেন, 'আহলুল বায়েত" শব্দ শুধুমাত্র স্ত্রীদের জন্য ব্যবহৃত হয়েছে, অন্য কেউ এর মধ্যে প্রবশ কতে পারে না, তাহলে একথাও ভুল হবে৷ "পরিবারবর্গ" শব্দের মধ্যে মানুষের সকল সন্তান-সন্ততি কেবল শামিল হয় তাই নয় বরং নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজে সুস্পষ্টভাবে তাদের শামিল হবার কথা বলেছেন৷ ইবনে আবি হাতেম বর্ণনা করেছেন, হযরত আয়েশাকে (রা) একবার হযরত আলী (রা) সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হয়৷ জবাবে তিনি বলেনঃ

(আরবী)

"তুমি আমাকে এমন ব্যক্তি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করছো যিনি ছিলেন রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রিয়তম লোকদের অন্তরভুক্ত এবং যার স্ত্রী ছিলেন রসূলের এমন মেয়ে যাকে তিনি মানুষদের মধ্যে সবচেয়ে বেশী ভালোবাসতেন৷" তারপর হযরত আয়েশা (রা) এ ঘটনা শুনানঃ নবী করীম (সা) হযরত আলী ও ফাতেমা এবং হাসান ও হোসাইন রাদিয়াল্লাহু আনহুমকে ডাকলেন এবং তাঁদের উপর একটা কাপড় ছড়িয়ে দিলেন এবং দোয়া করলেনঃ

(আরবী)

"হে আল্লাহ এরা আমার আহলে বায়েত (পরিবারবর্গ), এদের থেকে নাপাকি দূর করে দাও এবং এদেরকে পাক-পবিত্র করে দাও৷"

হযরত আয়েশা (রা) বলেন, আমি নিবেদন করলাম, আমিও তো আপনার আহলে বায়েতের অন্তরভুক্ত (অর্থাৎ আমাকেও এ কাপড়ের নীচে নিয়ে আমার জন্যও দোয়া করুন) নবী করীম (সা) বলেন, "তুমি আলাদা থাকো, তুমি তো অন্তরভুক্ত আছোই৷" প্রায় একই ধরনের বক্তব্য সম্বলিত বহু সংখ্যক হাদীস মুসলিম, তিরমিযী, আহমাদ, ইবনে জারীর, হাকেমত, বায়হাকি প্রমুখ মুহাদ্দিসগণ আবু সাঈদ খুদরী (রা), হযরত আয়েশা (রা), হযরত আনাস (রা), হযরত উম্মে সালামাহ (রা), হযরত ওয়াসিলাহ ইবন আসকা' এবং অন্যান্য কতিপয় সাহাবা থেকে বর্ণনা করেছেন৷ সেগুলো থেকে জানা যায়, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হযরত আলী (রা), ফাতেমা (রা) এবং তাদের দু'টি সন্তানকে নিজের আহলে বায়েত গণ্য করেন৷ কাজেই যাঁরা তাঁদেরকে আহলে বায়েতের বাইরে মনে করেন তাদের চিন্তা ভুল৷

অনুরূপভাবে যার উপরোক্ত হাদীসগুলোর ভিত্তিতে রসূলের পবিত্র স্ত্রীগণকে আহেল বায়েতের বাইরে গণ্য করেন তাদের মতও সঠিক নয়৷ প্রথমত যে বিষয়টি সরাসরি কুরআন থেকে প্রমাণিত, তাকে কোন হাদীসের ভিত্তিতে প্রত্যাখ্যান করা যেতে পারে না৷দ্বিতীয়ত সংশ্লিষ্ট হাদীসগুলোর অর্থও তা নয় যা সেগুলো থেকে গ্রহণ করা হচ্ছে৷ এগুলোর কোন কোনটিতে এই যে কথা এসেছে যে, হযরত আয়েশা (রা) ও হযরত উম্মে সালামাকে (রা) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সেই চাদরের নীচে নেননি যার মধ্যে হযরত আলী, ফতেমা, হাসান ও হোসাইনকে নিয়েছিলেন, এর অর্থ এ নয় যে, তিনি তাঁদেরকে নিজের "পরিবারের" বাইরে গণ্য করেছিলেন৷ বরং এর অর্থ হচ্ছে, স্ত্রীগণ তো পরিবারের অন্তরগত ছিলেনই৷ কারণ কুরআন তাঁদেরকেই সম্বোধন করেছিল৷ কিন্তু নবী করীমের (সা) আশংকা হলো, এ চারজন সম্পর্কে কুরআনের বাহ্যিক অর্থের দিক দিয়ে কারো যেন ভুল ধারণা না হয়ে যায় যে, তাঁরা আহলে বায়েতের বাইরের আছেন, তাই তিনি পবিত্র স্ত্রীগণের পক্ষে নয়, তাঁদের পক্ষে ব্যাপারটি সুস্পষ্টভাবে প্রকাশ করার প্রয়োজন অনুভব করেন৷

একটি দল এ আয়াতের ব্যাখ্যায় শুধুমাত্র এতটুকু বাড়াবাড়ি করেই ক্ষান্ত থাকেননি যে, পবিত্র স্ত্রীগণকে আহলে বায়েত থেকে বের করে দিয়ে কেবলমাত্র হযরত আলী (রা), ফাতেমা (রা) ও তাঁদের দু'টি সন্তানকে এর মধ্যে শামিল করেছেন বরং এর ওপর এবাবে আরো বাড়াবাড়ি করেছেন যে, "আল্লাহ তো চান তোমাদের থেকে ময়লা দূর করে তোমাদের কে পুরোপুরি পবিত্র করে দিতে" কুরআনের এ শব্দগুলো থেকে এ সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন যে, হযরত আলী, ফাতেমা এবং তাঁদের সন্তান-সন্ততি আম্বিয়া আলাইহিমুস সালামগণের মতোই মাসূম তথা গোনাহমুক্ত নিষ্পাপ ৷ তাদের বক্তব্য হচ্ছে, "ময়লা" অর্থ ভ্রান্তি ও গোনাহ এবং আল্লাহর উক্তি অনুযায়ী আহলে বায়েতকে এগুলো থেকে মুক্ত করে দেয়া হয়েছে৷ অথচ আয়াতে একথা বলা হয়নি যে, তোমাদের থেকে ময়লা দূর করে দেয়া হয়েছে এবং তোমাদেরকে পাক-পবিত্র করা হয়েছে৷ বরং বলা হয়েছে, আল্লাহ তোমাদের থেকে ময়লা দূর করতে এবং তোমাদের পুরোপুরি পাক পবিত্র করতে চান৷ পূর্বাপর আলোচনাও এখানে আহলে বায়েতের মর্যাদা বর্ণনা করাই উদ্দেশ্য একথা বলে না৷ বরং এখানে তো আহলে বায়েতকে এ মর্মে নসিহত করা হয়েছে, তোমরা অমুক কাজ করো এবং অমুক কাজ করো না কারণ আল্লাহ তোমাদের পাক পবিত্র করতে চান৷ অন্য কথায় এর অর্থ হচ্ছে, তোমরা অমুক নীতি অবলম্বন করলে পবিত্রতার নিয়ামতে সমৃদ্ধ হবে অন্যথায় তা লাভ করতে পারবে না৷ তবুও যদি .... এর অর্থ এ নেয়া হয় যে, আল্লাহ তাঁদেরকে নিষ্পাপ করে দিয়েছেন, তাহলে অযু, গোসল ও তায়াম্মুমকারী প্রত্যেক মুসলমানকে নিষ্পাপ বলে মেনে না নেয়ার কোন কারণ নেই ৷ কারণ তাদের সম্পর্কে আল্লাহ বলেছেনঃ

(আরবী)

"কিন্তু আল্লাহ চান তোমাদেরকে পাকপবিত্র করে দিতে এবং তাঁর নিয়ামত তোমাদের উপর পূর্ণ করে দিতে৷" (আল মা-য়েদাহ, ৬)
৫১. মূলে (আরবী) শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে৷ এর দু'টি অর্থঃ মনে রেখো এবং বর্ণনা করো৷ প্রথম অর্থের দৃষ্টিতে এর তাৎপর্য এই দাঁড়ায়ঃ হে নবীর স্ত্রীগণ৷ তোমরা কখনো ভুলে যেয়ো না যে, যেখান থেকে সারা দুনিয়াকে আল্লাহর আয়াত, জ্ঞান ও প্রজ্ঞার শিক্ষা দেয়া হয় সেটিই তোমাদের আসল গৃহ৷ তাই তোমদের দায়িত্ব বড়ই কঠিন৷ লোকেরা এ গৃহে জাহিলিয়াতের আদর্শ দেখতে থাকে, এমন যেন না হয়৷ দ্বিতীয় অর্থটির দৃষ্টিতে এর তাৎপর্য হয়ঃ হে নবীর স্ত্রীগণ ! তোমরা যা কিছু শোনো এবং দেখো তা লোকদের সামনে বর্ণনা করতে থাকো৷ কারণ রসূলের সাথে সার্বক্ষণিক অবস্থানের কারণে এমন অনেক বিধান তোমাদের গোচরীভূত হবে যা তোমাদের ছাড়া অন্য কোন মাধ্যমে লোকদের জানা সম্ভব হবে না৷ এ আয়াতে দু'টি জিনিসের কথা বলা হয়েছে৷ এক আল্লাহর আয়াত, দুই, হিকমাত বা জ্ঞান ও প্রজ্ঞা৷ আল্লাহর আয়াত অর্থ হচেছ, আল্লাহর কিতাবের আয়াত৷ কিন্তু হিকমাত শব্দটি অত্যন্ত ব্যপক অর্থবোধক৷ সকল প্রকার জ্ঞানের কথা এর অন্তরভুক্ত, যেগুলো নবী (সাঃ) লোকদেরকে শেখাতেন৷ আল্লাহর কিতাবের শিক্ষর ওপরও এ শব্দটি প্রযোজ্য হতে পারে৷ কিন্তু কেবলমাত্র তার মধ্যেই এক সীমিত করে দেবার সপক্ষে কোন প্রমাণ নেই৷ কুরআনের আয়াত শুনানো ছাড়াও নবী (সাঃ) নিজের পবিত্র জীবন ও নৈতিক চরিত্র এবং নিজের কথার মাধ্যমে যে হিকমাতের শিক্ষা দিতেন তাও অপরিহার্যভাবে এর অন্তরভুক্ত৷ কেউ কেউ কেবলমাত্র এরি ভিত্তিতে যে আয়াতে . যা তেলাওয়াত করা হয়ে ৷ শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে, এ দাবী করেন যে আল্লাহরর আয়াত ও হিকমাত মানে হচ্ছে কেবলমাত্র কুরআন৷ কারণ "তেলাওয়াত" শব্দটি একমাত্র কুরআন তেলাওয়াতের সাথেই সংশ্লিষ্ট৷ কিন্তু এ যুক্তি একবারেই ভ্রান্ত৷ তেলাওয়াতের সাথে সংশ্লিষ্ট করে দেয়া পরবর্তীকালের লোকদের কাজ৷ কুরআনে এ শব্দটিকে পারিভাষিক অর্থে ব্যবহার করা হয়নি৷ সূরা বাকারার ১০২ আয়াতে এ শব্দটিকেই যাদুমন্ত্রের জন্য ব্যবহার করা হয়েছে৷ শয়তানরা হযরত সুলাইমানের নামের সাথে জড়িত করে এ মন্ত্রগুলো লোকদেরকে তেলাওয়াত করে শুনাতোঃ

(আরবী )

"তারা অনুসরণ করে এমন এক জিনিসের যা তেলাওয়াত করতো অর্থাৎ যা শুনাতো শয়তানরা সুলাইমানের বাদশাহীর সাথে জড়িত করে" -থেকে স্পষ্টত প্রমাণিত হয়, কুরআন এ শব্দটিকে এর শাব্দিক অর্থে ব্যবহার করে৷ আল্লাহর কিতাবের আয়াত শুনাবার জন্য পারিভাষিকভাবে এক নির্দিষ্ট করে না৷
৫২. আল্লাহ সূক্ষ্ণদর্শী অর্থাৎ গোপনে এবং অতিসংগোপনে রাখা কথাও তিনি জানতে পারেন৷ কোন জিনিসই তাঁর কাছ থেকে লুকিয়ে রাখ যেতে পারে না৷