(৩৩:১) হে নবী! আল্লাহকে ভয় করো এবং কাফের ও মুনাফিকদের আনুগত্য করো না৷ প্রকৃতপক্ষে আল্লাহই সর্বজ্ঞ ও মহাজ্ঞানী৷
(৩৩:২) তোমার রবের পক্ষ থেকে তোমার প্রতি যে বিষয়ের ইংগিত করা হচ্ছে তার অনুসরণ করো৷ তোমরা যা কিছু করো আল্লাহ তা সবই জানেন৷
(৩৩:৩) আল্লাহর প্রতি নির্ভর করো৷ কর্ম সম্পাদনের জন্য আল্লাহই যথেষ্ঠ৷
(৩৩:৪) আল্লাহ কোন ব্যক্তির দেহাভ্যন্তরে দু’টি হৃদয় রাখেননি৷ তোমাদের যেসব স্ত্রীকে তোমরা “যিহার” করো তাদেরকে আল্লাহ তোমাদের জননীও করেননি এবং তোমাদের পালক পুত্রদেরকেও তোমাদের প্রকৃত পুত্র করেননি৷ এসব তো হচ্ছে এমন ধরনের কথা যা তোমরা সম্মুখে উচ্চারণ করো, কিন্তু আল্লাহ এমন কথা বলেন যা প্রকৃত সত্য এবং তিনিই সঠিক পথের দিকে পরিচালিত করেন৷
(৩৩:৫) পালক পুত্রদেরকে তাদের পিতার সাথে সম্পর্কিত করে ডাকো৷ এটি আল্লাহর কাছে বেশী ন্যায়সংগত কথা৷ আর যদি তোমরা তাদের পিতৃ পরিচয় না জানো, তাহলে তারা তোমাদের দীনী ভাই এবং বন্ধু৷ না জেনে যে কথা তোমরা বলো সেজন্য তোমাদের পাকড়াও করা হবে না, কিন্তু তোমরা অন্তরে যে সংকল্প করো সেজন্য অবশ্যই পাকড়াও হবে৷১০ আল্লাহ ক্ষমাকারী ও দয়াময়৷১১
(৩৩:৬) নিসন্দেহে নবী ঈমানদারদের কাছে তাদের নিজেদের তুলনায় অগ্রাধিকারী,১২ আর নবীদের স্ত্রীগণ তাদের মা৷১৩ কিন্তু আল্লাহর কিতাবের দৃষ্টিতে সাধারণ মু’মিন ও মুহাজিরদের তুলনায় আত্মীয়রা পরস্পরের বেশি হকদার৷ তবে নিজেদের বন্ধুবান্ধবদের সাথে কোন সদ্ব্যবহার (করতে চাইলে তা) তোমরা করতে পারো৷১৪ আল্লাহর কিতাবে এ বিধান লেখা আছে৷
(৩৩:৭) আর হে নবী ! স্বরণ করো সেই অংগীকারের কথা যা আমি নিয়েছি সকল নবীর কাছ থেকে, তোমার কাছ থেকে এবং নূহ, ইবরাহীম, মূসা ও মরিয়াম পুত্র ঈসার কাছ থেকেও৷ সবার কাছ থেকে আমি নিয়েছি পাকাপোক্ত অলংঘনীয় অঙ্গীকার ১৫
(৩৩:৮) যাতে সত্যবাদীদেরকে (তাদের রব) তাদের সত্যবাদিতা সম্বন্ধে প্রশ্ন করেন ১৬ এবং কাফেরদের জন্য তো তিনি যন্ত্রণাদায়ক আযাব প্রস্তুত করেই রেখেছেন৷১৭
(৩৩:৯) হে ঈমানদাগণ ১৮ স্বরণ করো আল্লাহর অনুগ্রহ, যা তিনি করলেন তোমাদের প্রতি, যখন সেনাদল তোমাদের ওপর চড়াও হলো আমি পাঠালাম তাদের বিরুদ্ধে প্রচন্ড ধুলিঝড় এবং এমন সেনাবাহিনী রওয়ানা করলাম যা তোমরা দেখোনি৷১৯ তোমরা তখন যা কিছু করছিলে আল্লাহ তা সব দেখছিলেন৷
১. ওপরে ভূমিকায় বর্ণনা করে এসেছি, এ আয়াত এমন এক সময় নাযিল হয় যখন হযরত যায়েদ (রা) হযরত যয়নবকে (রা) তালাক দিয়েছিলেন৷ তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজেও অনুভব করেছিলেন এবং আল্লাহর ইশারাও এটিই ছিল যে, দত্তক সম্পর্কের ব্যাপারে জাহেলীয়াতের রসম-রেওয়াজ ও কুসংস্কারের ওপর আঘাত হানার এটিই মোক্ষম সময়৷ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজেকে অগ্রসর হয়ে তাঁর দত্তক পুত্রের (যায়েদ) তালাকপ্রাপ্ত স্ত্রীকে বিয়ে করা উচিত৷ এভাবে এ রেওয়াজটি চূরান্তভাবে খতম হয়ে যাবে৷ কিন্তু যে কারণে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ ব্যাপারে পদক্ষেপ নিতে ইতস্তত করেছিলেন তা ছিল এ আশংকা যে, এর ফলে তাঁর একের পর এক সাফল্যের কারণে যে কাফের ও মুশরিকরা পূর্বেই ক্ষিপ্ত হয়েই ছিল এখন তাঁর বিরুদ্ধে প্রপাগান্ডা করার জন্য তাঁরা একটি শক্তিশালী অস্ত্র পেয়ে যাবে৷ এটা তাঁর নিজের দুর্নামের আশংকা জনিত ভয় ছিল না৷ বরং এ কারণে ছিল যে, এর ফলে ইসলামের উপর আঘাত আসবে, শত্রুদের অপপ্রচার বিভ্রান্ত হয়ে ইসলামের প্রতি ঝুঁকে পরা বহু লোকের মনে ইসলাম সম্পর্কে খারাপ ধারণা জন্মাবে, বহু নিরপেক্ষ লোক শত্রুপক্ষে যোগ দেবে এবং স্বয়ং মুসলমানদের মধ্যে যারা দুর্বল বুদ্ধি ও মনের অধিকারী তারা সন্দেহ-সংশয়ের শিকার হবে৷ তাই নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মনে করতেন, জহেলীয়াতের একটি রেওয়াজ পরিবর্তন করার জন্য এমন পদক্ষেপ উঠানো কল্যাণকর নয় যার ফলে ইসলামের বৃহত্তর উদ্দেশ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়৷
২. ভাষণ শুরু করে প্রথম ব্যাক্যেই নবী করীমের সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ আশংকার অবসান ঘটিয়েছেন৷ বক্তব্যের নিগূঢ় অর্থ হচ্ছে দীনের কল্যাণ কিসে এবং কিসে নয় এ বিষয়টি আমিই ভালো জানি৷ কোন্‌ সময় কোন্‌ কাজটি করতে হবে এবং কোন্ কাজটি অকল্যানকর তা আমি জানি৷কাজেই তুমি এমন কর্মনীতি অবলম্বন করো না যা কাফের ও মুনাফিকদের ইচ্ছার অনুসারী হয় বরং এমন কাজ করো যা হয় আমার ইচ্ছার অনুসারী৷ কাফের ও মুনাফিকদেরকে নয় বরং অমাকেই ভয় করা উচিত৷
৩. এ বাক্যে সম্বোধন করা হয়েছে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে , মুসলমানদেরকেও ইসলাম বিরোধীদেরকেও৷ এর অর্থ হচ্ছে নবী যদি-আল্লাহর হুকুম পালন করে দুর্নামের জুঁকি মাথা পেতে নেন এবং নিজের ইজ্জত আবরুর ওপর শত্রুর আক্রমণ ধৈর্যসহকারে বরদাশ্‌ত করেন তাহলে তাঁর বিশ্বস্তামূলক কর্মকান্ড আল্লাহর দৃষ্টির আড়ালে থাকবে না৷ মুসলমানদের মধ্য থেকে যে সব লোক নবীর প্রতি বিশ্বাসের ক্ষেত্রে অবিচল থাকবে এবং যারা সন্দেহ-সংশয়ে ভুগবে তাদের উভয়ের অবস্থাই অগোচরে থাকবে না৷ কাফের ও মুনাফিকরা তাঁর দুর্নাম করার জন্য যে প্রচেষ্টা চালাবে সে সম্পর্কেও আল্লাহ বেখবর থাকবেন না৷ কাজেই ভয়ের কোন কারণ নেই৷ প্রত্যেকে যার যার কার্য অনুযায়ী যে পুরস্কার বা শাস্তি লাভের যোগ্য হবে তা সে অবশ্যই পাবে৷
৪. এ বাক্যে আবার নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে সম্বোধন করা হয়েছে৷ তাঁকে এই মর্মে নির্দেশ দেয়া হচ্ছে যে, তোমার ওপর যে দায়িত্ব অর্পণ করা হয়েছে আল্লাহর প্রতি নির্ভর করে তা সম্পন্ন করো এবং সারা দুনিয়ার মানুষ যদি বিরোধিতায় এগিয়ে আসে তাহলেও তার পরোয়া করো না৷ মানুষ যখন নিশ্চিত ভাবে জানবে উমুক হুকুমটি আল্লাহ দিয়েছেন তখন সেটি পালন করার মধ্যেই সমস্ত কল্যাণ নিহিত রয়েছে বলে তার পুরোপুরি নিশ্চিন্ত হয়ে যাওয়া উচিত৷ এরপর তার মধ্যে কল্যাণ, সুবিধা ও প্রজ্ঞা খুঁজে বেড়ানো সেই ব্যক্তির নিজের কাজ নয় বরং কাজ হওয়া উচিত শুধুমাত্র আল্লাহর প্রতি নির্ভর করে তাঁর হুকুম পালন করা৷ বান্দা তার যাবতীয় বিষয় আল্লাহর হাতে সোপর্দ করে দেবে, তার জন্য আল্লাহই যথেষ্ট৷ তিনি পথ দেখাবার জন্যও যথেষ্ট এবং সাহায্য করার জন্যও৷ আর তিনিই এ বিষয়ের নিশ্চয়তাও দেন যে, তাঁর পথনির্দেশের আলোকে কার্যসম্পাদনকারী ব্যক্তি কখনো অশুভ ফলাফলের সম্মুখীন হবে না৷
৫. অর্থাৎ একজন লোক একই সংগে মু'মিন ও মুনাফিক, সত্যবাদী ও মিথ্যাবাদী এবং সৎ ও অসৎ হতে পারে না৷ তার বক্ষ দেশে দু'টি হৃদয় নেই যে, একটি হৃদয়ে থাকবে আন্তরিকতা এবং অন্যটিতে থাকবে আল্লাহর প্রতি বেপরোয়া ভাব৷ কাজেই একজন লোক এক সময় একটি মর্যাদারই অধিকারী হতে পারে৷ সে মু'মিন হবে অথবা হবে মুনাফিক৷ সে কাফের হবে অথবা হবে মুসলিম৷ এখন যদি তোমরা কোন মু'মিনকে মুনাফিক বলো অথবা মুনাফিককে মু'মিন, তাহলে তাতে প্রকৃত সত্যের কোন পরিবর্তন হবে না৷ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির আসল মর্যাদা অবশ্যই একটিই থাকবে৷
৬. "যিহার" আরবের একটি বিশেষ পরিভাষা৷ প্রাচীন কালে আরবের লোকেরা স্ত্রীর সাথে ঝগড়া করতে করতে কখনো একথা বলে বসতো, "তোমার পিঠ আমার কাছে আমার মায়ের পিঠের মতো৷" একথা কারো মুখ থেকে একবার বের হয়ে গেলেই মনে করা হতো, এ মহিলা এখন তার জন্য হারাম হয়ে গেছে৷ কারণ সে তাকে তার মায়ের সাথে তুলনা করেছে৷ এ ব্যাপারে আল্লাহ বলেছেন, স্ত্রীকে মা বললে বা মায়ের সাথে তুলনা করলে সে মা হয়ে যায় না৷ মা তো গর্ভধারিনী জন্মদাত্রী৷ নিছক মুখে মা বলে দিলে প্রকৃত সত্য বদলে যায় না৷ এর ফলে যে স্ত্রী ছিল সে তোমাদের মুখের কথায় মা হয়ে যাবে না৷ (এখানে যিহার সম্পর্কিত শরীয়াতের বিধান বর্ণনা করা উদ্দেশ্য নয়৷ যিহার সম্পর্কিত আইন বর্ণনা করা হয়েছে সূরা মুজাদিলার ২-৪ আয়াতে)
৭. এটি হচ্ছে বক্তব্যের আসল উদ্দেশ্য৷ ওপরের দুটি বাক্যাংশ এ তৃতীয় বক্তব্যটি বুঝাবার যুক্তি হিসেবে পেশ করা হয়েছে৷
৮. এ হুকুমটি পালন করার জন্য সর্বপ্রথম যে সংশোধনমূলক কাজটি করা হয় সেটি হচ্ছে এই যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পালক পুত্র হযরত যায়েদকে (রা) যায়েদ ইবনে মুহাম্মাদ বলার পরিবর্তে তাঁর প্রকৃত পিতার সাথে সম্পর্কিত করে যায়েদ ইবনে হারেসাহ বলা শুরু করা হয়৷ বুখারী, মুসলিম, তিরমিযি ও নাসাঈ হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রা) থেকে এ হাদীস উদ্ধৃত করেছেন যে, যায়েদ ইবনে হারেসাকে প্রথমে সবাই যায়েদ ইবনে মুহাম্মাদ বলতো৷ এ আয়াত নাযিল হবার পর তাঁকে যায়েদ ইবনে হারেসাহ বলা হতে থাকে৷ তাছাড়া এ আয়াতটি নাযিল হবার পর কোন ব্যক্তি নিজের আসল বাপ ছাড়া অন্য কারো সাথে পিতৃ সম্পর্ক স্থাপন করাকে হারাম গণ্য করা হয়৷ বুখারী, মুসলিম ও আবু দাউদ হযরত সা'দ ইবনে আবি ওয়াক্‌কাসের (রা) রেওয়ায়াত উদ্ধৃত করেছেন৷ তাতে বলা হয়েছে, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ

(······)

"যে ব্যক্তি নিজেকে আপন পিতা ছাড়া অন্য কারো পুত্র বলে দাবী করে, অথচ সে জানে ঐ ব্যক্তি তার পিতা নয়, তার জন্য জান্নাত হারাম৷"

হাদীসে একই বিষয়বস্তু সম্বলিত অন্যান্য রেওয়াতও পাওয়া যায়৷ সেগুলো এ কাজটিকে মারাত্মক পর্যায়ের গুনাহ গণ্য করা হয়েছে৷
৯. অর্থাৎ এ অবস্থাতেও খামাখা কোন ব্যক্তির সাথে তার পিতৃ-সম্পর্ক জুরে দেয়া ঠিক হবে না৷
১০. এর অর্থ হচ্ছে, কাউকে সস্নেহে পুত্র বলে ফেললে এতে কোন গুনাহ হবে না৷ অনুরূপভাবে মা, মেয়ে, বোন, ভাই ইত্যাদি শব্দাবলীও যদি কারো জন্য নিছক ভদ্রতার খাতিরে ব্যবহার করা হয় তাহলে তাতে কোন গুনাহ হবে না৷ কিন্তু যদি এরূপ নিয়ত সহকারে একথা বলা হয় যে, যাকে পুত্র ইত্যাদি বলা হবে তাকে যথার্থই এ সম্পর্কগুলোর যে প্রকৃত মর্যাদার অভিসিক্ত করতে হবে, এ ধরনের আত্মীয়দের যে অধিকার স্বীকৃত তা দান করতে হবে এবং তার সাথে ঠিক তেমনি সম্পর্ক স্থাপন করতে হবে যেমন সেই পর্যায়ের আত্মীয়দের সাথে করা হয়ে থাকে, তাহলে নিশ্চিত ভাবেই এটি হবে আপত্তিকর এবং এ জন্য পাকড়াও করা হবে৷
১১. এর একটি অর্থ হচ্ছে, ইতিপূর্বে এ ব্যাপারে যেসব ভুল করা হয়েছে আল্লাহ সেগুলো মাফ করে দিয়েছেন ৷এ ব্যাপারে তাদেরকে আর কোন জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে না৷ দ্বিতীয় অর্থ হচ্ছে, না জেনে কোন কাজ করার জন্য আল্লাহ পকড়াও করবেন না৷ যদি বিনা ইচ্ছায় এমন কোন কাজ করা হয় যার বাইরের চেহারা নিষিদ্ধ কাজের মতো কিন্তু প্রকৃত পক্ষে সেখানে সেই নিষিদ্ধ কাজটি করার ইচ্ছা ছিল না৷ তাহলে নিছক কাজটির বাইরের কাঠামোর ভিত্তিতে আল্লাহ শাস্তি দেবেন না৷
১২. অর্থাৎ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে মুসলমানদের এবং মুসলমানদের সাথে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের যে সম্পর্ক তা অন্যান্য সমস্ত মানবিক সম্পর্কের উর্ধ্বের এক বিশেষ ধরনের সম্পর্ক৷ নবী ও মু'মিনদের মধ্যে যে সম্পর্ক বিরাজিত, অন্য কোন আত্মীয়তা ও সম্পর্ক তার সাথে কোন দিক দিয়ে সামান্যতমও তুলনীয় নয়৷ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মুসলমানদের জন্য তাদের বাপ-মায়ের, চাইতেও বেশী স্নেহশীল ও দয়াদ্র হৃদয় এবং তাদের নিজেদের চাইতেও কল্যাণকামী৷তাদের বাপ-মা, স্ত্রী ও ছেলেমেয়েরা তাদের ক্ষতি করতে পারে, তাদের সাথে স্বার্থপরের মতো ব্যবহার করতে পারে, তাদেরকে বিপথে পরিচালিত করতে পারে, তাদেরকে দিয়ে অন্যায় কাজ করাতে পারে, তাদেরকে জাহান্নামে ঠেলে দিতে পারে, কিন্তু নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদের পক্ষে কেবলমাত্র এমন কাজই করতে পারেন যাতে তাদের সত্যিকারের সাফল্য অর্জিত হয়৷ তারা নিজেরাই নিজেদের পায়ে কুড়াল মারতে পারে, বোকামি করে নিজেরাই নিজেদের ক্ষতি করতে পারে কিন্তু নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদের জন্য তাই করবেন যা তাদের জন্য লাভজনক হয়৷ আসল ব্যাপার যখন এই তখন মুসলমানদের ওপরও নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের এ অধিকার আছে যে, তারা তাঁকে নিজেদের বাপ-মা ও সন্তানদের এবং নিজেদের প্রাণের চেয়েও বেশী প্রিয় মনে করবে৷ দুনিয়ার সকল জিনিসের চেয়ে তাঁকে বেশী ভালোবাসবে৷ নিজেদের মতামতের ওপর তার মতামতকে এবং নিজেদের ফায়সালাকে প্রাধান্য দেবে৷ তাঁর প্রত্যেকটি হুকুমের সামনে মাথা নত করে দেবে৷ বুখারি ও মুসলিম প্রমুখ মুহাদ্দিসগণ তাদের হাদীসগ্রন্থে সামান্য শাব্দিক পরিবর্তন সহকারে এ বিষয়বস্তু সম্বলিত একটি হাদীস বর্ণনা করেছেন৷ তাতে বলা হয়েছেঃ

(·······)

"তোমাদের কোন ব্যাক্তি মু'মিন হতে পারেনা যতক্ষণ না আমি তার কাছে তার পিতা, তার সন্তান-সন্ততি ও সমস্ত মানুষের চাইতে বেশী প্রিয় হই৷"
১৩. ওপরে বর্ণিত এ একই বৈশিষ্টের ভিত্তিতেই নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের এও একটি বৈশিষ্ট ছিল যে, মুসলমানদের নিজেদের পালক মতো কখনো কোন অর্থেই তাদের মা নয় কিন্তু নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের স্ত্রীগণ ঠিক তেমনিভাবে তাদের জন্য হারাম যেমন তাদের আসল মা তাদের জন্য হারাম৷ এ বিশেষ বিধানটি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ছাড়া দুনিয়ার আর কোন মানুষের জন্য প্রযোজ্য নয়৷

এ প্রসংগে এ কথাও জেনে নেয়া প্রয়োজন যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের স্ত্রীগণ শুধু মাত্র এ অর্থে মু'মিনদের মাতা যে, তাঁদেরকে সম্মান করা মুসলমানদের জন্য ওয়াজিব এবং তাঁদের সাথে কোন মুসলমানের বিয়ে হতে পারে না৷ বাদবাকি অন্যান্য বিষয়ে তাঁরা মায়ের মতো নন৷ যেমন তাদের প্রকৃত আত্মীয়গণ ছাড়া বাকি সমস্ত মুসলমান তাদের জন্য গায়ের মাহরাম ছিল এবং তাঁদের থেকে পর্দা করা ছিল ওয়াজিব৷ তাঁদের মেয়েরা মুসলমানদের জন্য বৈপিত্রেয় বোন ছিলেন না, যার ফলে তাদের সাথে মুসলমানদের বিয়ে নিষিদ্ধ হয়ে পরে৷ তাঁদের ভাই ও বোনেরা মুসলমানদের জন্য মামা ও খালার পর্যায়ভুক্ত ছিলেন না৷ কোন ব্যাক্তি নিজের মায়ের তরফ থেকে যে মীরাস লাভ করে তাঁদের তরফ থেকে কোন আত্মীয় মুসলমান সে ধরনের কোন মীরাস লাভ করে না৷

এখানে আর একটি কথাও উল্লেখযোগ্য৷ কুরআন মাজীদের দৃষ্টিতে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সকল স্ত্রীই এই মর্যাদার অধিকারী৷ হযরত আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহাও এর অন্তরভূক্ত৷ কিন্তু একটি দল যখন হযরত আলী ও ফাতেমা (রা) এর অন্তরভূক্ত৷ কিন্তু একটি দল যখন হযরত আলী ও ফাতেমা রাদিয়াল্লাহ আনহা এবং তাঁর সন্তানদেরকে দীনের কেন্দ্রে পরিণত করে সমগ্র ইসলামী জীবন ব্যবস্থাকে তাঁদের চারপাশে ঘোরাতে থাকে এবং এরি ভিত্তিতে অন্যান্য বহু সাহাবার সাথে হযরত আয়েশাকেও নিন্দাবাদ ও গালাগালির লক্ষ্য বস্তুতে পরিণত করে তখন কুরআন মজীদের এ আয়াত তাদের পথে প্রতিরোধ দাঁড় করায়৷ কারণ এ আয়াতের প্রেক্ষিতে যে ব্যক্তিই ঈমানের দাবীদার হবে সে-ই তাঁকে মা বলে স্বীকার করে নিতে বাধ্য৷ শেষমেষ এ সংকট থেকে রেহাই পাওয়ার উদ্দেশ্যে এ অদ্ভুত দাবী করা হয়েছে যে, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হযরত আলীকে এ ইখতিয়ার দিয়েছিলেন যে, তাঁর ইন্তিকালের পর তিনি তাঁর পবিত্র স্ত্রীদের মধ্য থেকে যাঁকে চান তাঁর স্ত্রীর মর্যাদায় টিকিয়ে রাখতে পারেন এবং যাঁকে চান তাঁর পক্ষ থেকে তালাক দিতে পারেন৷ আবু মনসুর আহমাদ ইবনে আবু তালেব তাবরাসী কিতাবুল ইহ্‌তিজাজে যে কথা লিখেছেন এবং সুলাইমান ইবনে আবদুল্লাহ আলজিরানী যা উদ্ধৃত করেছেন তা হচ্ছে এই যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হযরত আলীকে বলেন :

---------------------

"হে আবুল হাসান ! এ মর্যাদা ততক্ষণ অক্ষুণ্ন থাকবে যতক্ষণ আমরা আল্লাহর আনুগত্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকবো৷ কাজেই আমার স্ত্রীদের মধ্য থেকে যে কেউ আমার পরে তোমার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে আল্লাহর নাফরমানি করবে তাকে তুমি তালাক দিয়ে দেবে এবং তাদেরকে মু'মিনদের মায়ের মর্যাদা থেকে বহিস্কার করবে৷"

হাদীস বর্ণনার রীতি ও মূলনীতির দিক দিয়ে তো এ রেওয়ায়াতটি সম্পুর্ন ভিত্তিহীন৷ কিন্তু কোন ব্যক্তি যদি এ সূরার ২৮-২৯ এবং ৫১ ও ৫২ আয়াত ৪টি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেন তাহলে তিনি জানতে পারবেন যে, এ রেওয়ায়াতটি কুরআনেরও বিরোধী৷ কারণ ইখ্‌তিয়ার সম্পর্কিত আয়াতের পর রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের যে সকল স্ত্রী সর্বাবস্থায় তাঁর সাথে থাকা পছন্দ করেছিলেন তাঁদেরকে তালাক দেবার ইখ্‌তিয়ার আর রসুলের (সা) হাতে ছিল না৷ সামনের দিকে ৪২ ও ৯৩ টীকায় এ বিষয়ের বিস্তারিত আলোচনা আসছে৷

এ ছাড়াও একজন নিরপেক্ষ ব্যক্তি যদি শুধুমাত্র বুদ্ধিবৃত্তিই ব্যবহার করে এ রেওয়ায়াতটির বিষয়বস্তু সম্পর্কে চিন্তা-ভাবনা করেন তাহলেও তিনি পরিস্কার দেখতে পাবেন এটি একটি চরম ভিত্তিহীন এবং রসূলে পাকের বিরুদ্ধে অত্যন্ত অবমাননাকর মিথ্যাচার ছাড়া আর কিছুই নয়৷ রসূল তো অতি উন্নত ও শ্রেষ্ঠতম মর্যাদার অধিকার, তাঁর কথাই আলাদা, এমন কি একজন সাধারণ ভদ্রলোকের কাছেও এ আশা করা যেতে পারে না যে, তিনি মারা যাবার পর তাঁর স্ত্রীকে তালাক দেবার কথা চিন্তা করবেন এবং দুনিয়া থেকে বিদায় নেবার সময় নিজের জামাতাকে এই ইখ্‌তিয়ার দিয়ে যাবেন যে, যদি কখনো তার সাথে তোমার ঝগড়া হয় তাহলে তুমি আমার পক্ষ থেকে তাকে তালাক দিয়ে দেবে৷এ থেকে জানা যায়, যারা আহ্‌লে বায়তের প্রেমের দাবীদার তারা গৃহস্বামীর (সাহেবে বায়েত) ইজ্জত ও আবরুর কতোটা পরোয়া করেন৷ আর এরপর তারা মহান আল্লাহর বাণীর প্রতিও কতটুকু মর্যাদা প্রদর্শন করেন সেটিও দেখার বিষয়৷
১৪. এ আয়াতে বলা হয়েছে, নবী সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে তো মুসলমানদের সম্পর্কের ধরন ছিল সবকিছু থেকে আলাদা৷ কিন্তু সাধারণ মুসলমানদের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক এমন নীতির ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত হবে যার ফলে আত্বীয়দের অধিকার পরস্পরের ওপর সাধারণ লোকদের তুলনায় অগ্রগণ্য হয়৷ নিজের মা -বাপ, সন্তান - সন্ততি ও ভাইবোনদের প্রয়োজন পূর্ণ না করে বাইরে দান -খয়রাত করে বেড়ালে তা সঠিক গণ্য হবে না৷ যাকাতের মাধ্যমে প্রথমে নিজের গরীব আত্বীয় স্বজনদেরকে সাহায্য করতে হবে এবং তারপর অন্যান্য হকদারকে দিতে হবে৷ মীরাস অপরিহার্যভাবে তারাই লাভ করবে যারা হবে মৃত ব্যক্তির নিকটতম আত্মীয়৷ অন্যদেরকে সে চাইলে (জীবিতাবস্থায়) হেবা, ওয়াকফ বা অসিয়াতের মাধ্যমে নিজের সম্পদ দান করতে পারে৷ কিন্তু এও ওয়ারিসদেরকে বঞ্চিত করে সে সবকিছু অন্যদেরকে দিয়ে যেতে পারে না৷ হিজরাতের পর মুহাজির ও আনসারদের মধ্যে ভ্রাতৃ সম্পর্ক স্থাপন করার জন্য যে পদ্ধতি অবলম্বিত হয়েছিল, যার প্রেক্ষিতে নিছক দীনী ভ্রাতৃত্বের সম্পর্কের ভিত্তিতে মুহাজির ও আনসারগণ পরস্পরের ওয়ারিস হতেন, এ হুকুমের মাধ্যমে তাও রহিত হয়ে যায়৷ আল্লাহ পরিস্কার বলে দেন, মীরাস বন্টন হবে আত্মীয়তার ভিত্তিতে৷ তবে হাঁ কোন ব্যক্তি চাইলে হাদীয়া, তোহ্‌ফা,উপটোকন বা অসিয়াতের মাধ্যমে নিজের কোন দীনী ভাইকে সাহায্য করতে পারেন৷
১৫. এ আয়াতে আল্লাহ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে স্বরণ করিয়ে দিচ্ছেন, সকল নবীদের ন্যায় আপনার থেকেও আল্লাহ পাকাপোক্ত অংগীকার নিয়েছেন সে অংগীকার আপনার কঠোরভাবে পালন করা উচিত৷ এ অংগীকার বলতে কোন্‌ অংগীকার বুঝানো হয়েছে ? ওপর থেকে যে আলোচনা চলে আসছে সে সম্পর্কে চিন্তা করলে পরিস্কার বুঝা যায় যে, এখানে যে অংগীকারের কথা বলা হয়েছে তা হচেছ : নবী নিজে আল্লাহর প্রত্যেকটি হুকুম মেনে চলবেন এবং অন্যদের তা মেনে চলার ব্যবস্থা করবেন৷ আল্লাহর প্রত্যেকটি কথা হুবহু অন্যদের কাছে পৌছিয়ে দেবেন এবং তাকে কার্যত প্রয়োগ করার প্রচেষ্টা ও সংগ্রামে কোন প্রকার গাফলতি করবেন না ৷ কুরআন মজীদের বিভিন্ন স্থানে এ অংগীকারের কথা বলা হয়েছে৷ যেমন :

(আরবী-------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------)

"আল্লাহ তোমাদের জন্য এমন দীন নির্ধারিত করে দিয়েছেন, যার নির্দেশ দিয়েছিলেন তিনি নূহকে এবং যা অহির মাধ্যমে দান করা হয়েছে (হে মুহাম্মদ) তোমাকে৷ আর নির্দেশ দেয়া হয়েছে ইবরাহীম, মূসা ও ঈসাকে এ তাকীদ সহকারে যে, তোমরা প্রতিষ্ঠিত করবে এ দীনকে এবং এর মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করবে না৷"(আশ শূরা,১৩)

---------------------------------------------------------------------

"আর স্মরণ করো, আল্লাহ অংগীকার নিয়েছিলেন তাদের থেকে যাদেরকে কিতাব দেয়া হয়েছিল এ জন্য যে, তোমরা তার শিক্ষা বর্ণনা করবে এবং তা লুকাবে না৷ "(আলে ইমরান, ১৮৭)

-------------------------------------------------------------------------------------------

"আর স্মরণ করো, আমি বনী ইসরাঈলের কাছ থেকে অংগীকার নিয়েছিলাম এই মর্মে যে, তোমরা আল্লাহ ছাড়া আর কারো বন্দেগী করবে না৷" (আল বাকারাহ, ৮৩)

-------------------------------------------------------------------------------------------

"তাদের থেকে কি কিতাবের অংগীকার নেয়া হয়নি ?------ সেটিকে মজবুতভাবে ধরো যা আমি তোমাদের দিয়েছে এবং সেই নির্দেশ মনে রাখো যা তার মধ্যে রয়েছে৷ আশা করা যায়, তোমরা আল্লাহর নাফরমানি থেকে দূরে থাকবে৷" (আল আরাফ, ১৬৯-১৭১)

------------------------

" আর হে মুসলমানরা! মনে রেখো আল্লাহর অনুগ্রহকে, যা তিনি তোমাদের প্রতি করেছেন এবং সেই অংগীকারকে যা তিনি তোমাদের থেকে নিয়েছেন যখন তোমরা বলেছিলে, আমরা শুনলাম ও আনুগত্য করলাম৷"(আল মা-য়েদাহ, ৭)

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম শত্রুদের সমালোচনার আশংকায় পালক সন্তানের আত্মীয়তা সম্পর্কের ক্ষেত্রে জাহেলিয়াতের নিয়ম ভাংতে ইতস্তত করছিলেন বলেই মহান আল্লাহ এ অংগীকারের কথা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন৷ যেহেতু ব্যাপারটা একটি মহিলাকে বিয়ে করার, তাই তিনি বারবার লজ্জা অনুভব করছিলেন৷ তিনি মনে করছিলেন, আমি যতই সৎ সংকল্প নিয়ে নিছক সমাজ সংস্কারের উদ্দেশ্যেই কাজ করি না কেন শত্রু একথাই বলবে, প্রবৃত্তির তাড়নায় এ কাজ করা হয়েছে এবং এ ব্যক্তি নিছক ধোঁকা দেবার জন্য সংস্কারকের খোলস নিয়ে আছে৷ এ কারণেই আল্লাহ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলছেন, তুমি আমার নিযুক্ত পয়গম্বর, সকল পয়গম্বরদের মতো তোমার সাথেও আমার এ মর্মে অলংঘনীয় চুক্তি রয়েছে যে, আমি যা কিছু হুকুম করবো তাই তুমি পালন করবে এবং অন্যদেরকেও তা পালন করার হুকুম দেবে৷ কাজেই কারো তিরস্কার সমালোচনার পরোয়া করো না, কাউকে লজ্জা ও ভয় করো না এবং তোমাকে দিয়ে আমি যে কাজ করাতে চাই নির্দ্বিধায় তা সম্পাদন করো৷

একটি দল এ অংগীকারকে একটি বিশেষ অংগীকার অর্থে গ্রহণ করে৷ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পূর্বেও সকল নবীর কাজ থেকে এ অংগীকারটি নেয়া হয়৷ সেটি ছিল এই যে, তাঁরা পরবর্তীকালে আগমনকারী নবীর প্রতি ঈমান আনবেন এবং তাঁর সাথে সহযোগিতা করবেন৷ এ ব্যাখ্যার ভিত্তিতে এ দলের দাবী হচ্ছে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পরেও নবুওয়াতের দরজা খোলা আছে এবং মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছ থেকেও এ অংগীকার নেয়া হয়েছে যে, তাঁর পরেও যে নবী আসবে তাঁর উম্মাত তার প্রতি ঈমান আনবে৷ কিন্তু আয়াতের পূর্বাপর বক্তব্য পরিস্কার জানিয়ে দিচ্ছে এ ব্যাখ্যা সম্পূর্ন ভুল৷ যে বক্তব্য পরস্পরায় এ আয়াতটি এসেছে সেখানে তাঁর পরও নবী আসবে এবং তাঁর উম্মাতের তার প্রতি ঈমান আনা উচিত, একথা বলার কোন অবকাশই নেই৷ এর এ অর্থ গ্রহণ করলে এ আয়াতটি এখানে একেবারেই সর্ম্পকহীন ও খাপছাড়া হয়ে যায়৷ তাছাড়া এ আয়াতের শব্দগুলোয় এমন কোন সুসপষ্ট বক্তব্য নেই যা থেকে এখানে অংগীকার শব্দটির সাহায্যে কোন ধরনের অংগীকারের কথা বলা হয়েছে তা বুঝা যেতে পারে৷ অবশ্যই এর ধরন জানার জন্য আমাদের কুরআন মজীদের যেসব জায়গায় নবীদের থেকে গৃহীত অংগীকারসমূহের কথা বলা হয়েছে সেদিকে দৃষ্টি ফিরাতে হবে৷ এখন যদি সমগ্র কুরআন মজীদে শুধুমাত্র একটি অংগীকারের কথা বলা হতো এবং তা হতো পরবর্তীকালে আগমনকারী নবীদের প্রতি ঈমান আনার সাথে সম্পর্কিত তাহলে এখানেও ঐ একই অংগীকারের কথা বলা হয়েছে একথা দাবী করা যথার্থ হতো৷ কিন্তু যে ব্যক্তিই সচেতনভাবে কুরআন মজীদ অধ্যয়ন করে সে জানে এ কিতাবে নবীগণ এবং তাঁদের উম্মাতদের থেকে গৃহীত বহু অংগীকারের কথা বলা হয়েছে৷ কাজেই এসব বিভিন্ন ধরনের অংগীকারের মধ্যে থেকে যে অংগীকারটি এখানকার পূর্বাপর বক্তব্যের সাথে সামঞ্জস্য রাখে একমাত্র সেটির কথা এখানে বলা হয়েছে বলে মনে করা সঠিক হবে৷ এখানে যে অংগীকারের উল্লেখের কোন সুযোগই নেই তার কথা এখানে বলা হয়েছে বলে মনে করা কখনই সঠিক নয়৷ এ ধরনের ভুল ব্যাখ্যা থেকে একথা পরিস্কার হয়ে যায় যে, কিছু লোক কুরআন থেকে হিদায়াত গ্রহণ করার নয় বরং কুরআনকে হিদায়াত করার কাজে ব্যাপৃত হয়৷
১৬. অর্থাৎ আল্লাহ্‌ কেবলমাত্র অংগীকার নিয়েই ক্ষান্ত হননি বরং এ অংগীকার কতটুকু পালন করা হয়েছে সে সম্পর্কে তিনি প্রশ্ন করবেন৷ তারপর যারা নিষ্ঠা সহকারে আল্লাহর সাথে করা অংগীকার পালন করে থাকবে তারাই অংগীকার পালনকারী গণ্য হবে৷
১৭. এ রুকুর বিষয়বস্তুও পরোপুরি অনুধাবন করার জন্য একে এ সূরার ৩৬ ও ৪১ আয়াতের সাথে মিলিয়ে পড়া দরকার৷
১৮. এখান থেকে ৩ রুকুর শেষ পর্যন্তকার আয়াতগুলো নাযিল হয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বনী কুরাইযার যুদ্ধ শেষ করার পর৷ এ দুটি রুকুতে আহযাব ও বনী কুরাইযার ঘটনাবলী সম্পর্কে মন্তব্য করা হয়েছে৷ এগুলো পড়ার সময় আমি ভুমিকায় এ দুটি যুদ্ধের যে বিস্তারিত বিবরণ দিয়েছি তা যেন দৃষ্টি সমক্ষে থাকে৷
১৯. শত্রুসেনারা যখন মদীনার ওপর চড়াও হয়েছিল ঠিক তখনই এ ধূলিঝড় আসেনি৷ বরং অবরোধের এক মাস হয়ে যাওয়ার পর এ ধূলি ঝড় আসে৷ অদৃশ্য ‌সেনাবাহিনী বলতে এমন সব গোপন শক্তিকে বুঝানো হয়েছে যা মানুষের বিভিন্ন বিষয়াবলীতে আল্লাহর ইশারায় কাজ করতে থাকে এবং মানুষ তার খবরই রাখে না৷ ঘটনাবলী ও কার্যকলাপকে মানুষ শুধুমাত্র তাদের বাহ্যিক কার্যকারণের দৃষ্টিতে দেখে৷ কিন্তু ভেতরে ভেতরে অননুভূত পদ্ধতিতে যেসব শক্তি কাজ করে যায় সেগুলো থাকে তার হিসেবের বাইরে৷ অথচ অধিকাংশ সময় এসব গোপন শক্তির কার্যকারিতা চূড়ান্ত প্রমাণিত হয়৷ এসব শক্তি যেহেতু আল্লাহর ফেরেশতাদের অধীনে কাজ করে তাই "সেনাবাহিনী" অর্থে ফেরেশতাও ধরা যেতে পারে, যদিও এখানে ফেরেশতাদের সৈন্য পাঠাবার কথা স্পষ্টভাবে বলা হয়নি৷