(৩:৫৫) (এটি আল্লাহরই একটি গোপন কৌশল ছিল) যখন তিনি বললেনঃ ‘‘হে ঈসা ! এখন আমি তোমাকে ফিরিয়ে নেবো ৫১ এবং তোমাকে আমার নিজের দিকে উঠিয়ে নেবো৷ আর যারা তোমাকে অস্বীকার করেছে তাদের থেকে ( অর্থাৎ তাদের সংগ এবং তাদের পূতিগন্ধময় পরিবেশে তাদের সংগে থাকা থেকে ) তোমাকে পবিত্র করে দেবো এবং তোমাকে যারা অস্বীকার করেছে ৫২ তাদের ওপর তোমার অনুসারীদের কিয়ামত পর্যন্ত প্রাধান্য দান করবো৷ তারপর তোমাদের মধ্যে যেসব বিষয়ে মতবিরোধ সৃষ্টি হয়েছে সেগুলোর মীমাংসা করে দেবো৷
(৩:৫৬) যারা কুফরী ও অস্বীকার করার নীতি অবলম্বন করেছে তাদেরকে দুনিয়ায় ও আখেরাতে উভয় স্থানে কঠোর শাস্তি দেবো এবং তারা কোন সাহায্যকারী পাবে না ৷
(৩:৫৭) আর যারা ঈমান ও সৎকাজ করার নীতি অবলম্বন করেছে, তাদেরকে তাদের পূর্ণ প্রতিদান দেয়া হবে৷ ভালো করেই জেনে রাখো আল্লাহ জালেমদের কখনোই ভালোবাসেন না৷’’
(৩:৫৮) এই আয়াত ও জ্ঞানগর্ভ আলোচনা আমি তোমাকে শুনাচ্ছি৷
(৩:৫৯) আল্লাহর কাছে ঈসার দৃষ্টান্ত আদমের মতো৷ কেননা আল্লাহ তাকে মাটি থেকে সৃষ্টি করেন এবং হুকুম দেন , হয়ে যাও, আর তা হয়ে যায়৷৫৩
(৩:৬০) এ প্রকৃত সত্য তোমার রবের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে ৷ কাজেই তুমি সন্দেহকারীদের অন্তরভুক্ত হয়ো না৷৫৪
(৩:৬১) এই জ্ঞান এসে যাওয়ার পর এখন যে কেউ এ ব্যাপারে তোমার সাথে ঝগড়া করে, হে মুহাম্মাদ ! তাকে বলে দাওঃ ‘‘ এসো আমরা ডেকে নেই আমাদের পুত্রগণকে এবং তোমাদের পুত্রগণকে ৷ আর আমাদের নারীদেরকে এবং তোমাদের নারীদেরকে আর আমাদের নিজেদেরকে এবং তোমাদের নিজেদেরকে, তারপর আল্লাহর কাছে এই মর্মে দোয়া করি যে, যে মিথ্যাবাদী হবে তার ওপর আল্লাহর লানত বর্ষিত হোক৷’’৫৫
(৩:৬২) নিসন্দেহ এটা নির্ভুল সত্য বৃত্তান্ত ৷ প্রকৃতপক্ষে আল্লাহ ছাড়া আর কোন ইলাহ নেই৷ আর আল্লাহর সত্তা প্রবল পরাক্রান্ত এবং তার জ্ঞান ও কর্মকৌশল সমগ্র বিশ্ব ব্যবস্থায় সক্রিয় ৷
(৩:৬৩) কাজেই এরা যদি ( এই শর্তে মোকাবিলায় আসার ব্যাপারে) মুখ ফিরিয়ে নেয়, তাহলে (তারা যে ফাসাদকারী একথা পরিষ্কার হয়ে যাবে এবং) আল্লাহ অবশ্যি ফাসাদকারীদের অবস্থা ভালো করেই জানেন৷
৫১. এখানে কুরআনের মূল শব্দ হচ্ছে, মুতাওয়াফ্ফীকা (-------) মূল তাওয়াফ্ফা (-----) শব্দের আসল মানে হচ্ছেঃ নেয়া ও আদায় করা৷ "প্রাণবায়ু বরে করে নেয়া" হচ্ছে এর গৌণ ও পরোক্ষ অর্থ, মূল আভিধানিক অর্থ নয়৷ এখানে এ শব্দটি ইংরেজী To Recall এর অর্থ ব্যবহৃত হয়েছে৷ এর অর্থ হয়, কোন পদাধিকারীকে তার পদ থেকে ফিরিয়ে ডেকে নেয়া৷ যেহেতু বনী ইসরাঈল শত শত বছর ধরে অনবরত নাফরমানী করে আসছিল, বার বার উপদশে দান ও সতর্ক করে দেয়ার পরও তাদের জাতীয় মনোভাব ও আচরণ বিকৃত হয়ে চলছিল, একের পর এক কয়েকজন নবীকে তারা হত্যা করেছিল এবং যেকোন সদাচারী ব্যক্তি তাদেরকে নেকী, সততা ও সৎবৃত্তির দাওয়াত দিতো তাকেই তারা হত্যা করতো৷ তাই আল্লাহ তাদের মুখ বন্ধ করার ও তাদেরকে শেষবারের মতো সুযোগ দেবার জন্যে হযরত ঈসা ও হযরত ইয়াহ্ইয়া আলাইহসি সালামের মতো দু'জন মহান মর্যাদা সম্পন্ন পয়গম্বর পাঠালেন৷ আল্লাহর পক্ষ থেকে তাদের নিযুক্তির প্রমাণ স্বরূপ তাদের সাথে এমন সব সুস্পষ্ট নিশানী ছিল যেগুলো একমাত্র তারাই অস্বীকার করতে পারতো, যারা ন্যায়, সত্য ও সততার সাথে চরম শত্রুতা পোষন করতো এবং যাদের সত্যের বিরুদ্ধাচরণ করার দু:সাহস ও নির্লজ্জতা চরতম পর্যায়ে পৌছে গিয়েছিল৷ কিন্তু বনী ঈসরাইলরা এই শেষ সুযোগও হাত ছাড়া করেছিল৷ তারা কেবল এই দুজন পয়গম্বরের দাওয়াত প্রত্যাখ্যান করেই ক্ষান্ত হয়নি বরং এই সংগে তাদের একজন প্রধান ব্যক্তি নিজের নর্তকীর ফরমায়েশ অনুযায়ী প্রকাশ্যে হযরত ইয়াহ্ইয়া আল্লাইহসি সালামের শিরচ্ছেদ করেছিল এবং তাদের আলমে ও ফকীহগণ ষড়যন্ত্র জাল বিস্তার করে রোমান শাসকের সাহায্যে হযরত ঈসা আলাইহসি সালামকে মৃত্যুদন্ড দেবার চেষ্টা চালিয়েছিল৷ এরপর আর বনী ইসলাঈলদের উপদশে দেবার জন্য বেশী সময় ও শক্তি ব্যয় করা ছিল অর্থহীন৷ তাই মহান আল্লাহ তার নবীকে ফিরিয়ে নিজের কাছে ডেকে নিলেন এবং কিয়ামত পর্যন্ত বনী ইসলাঈলদের জন্য লিখে দিলেন লাঞ্ছনার জীবন৷ এখানে অবশি একথা অনুধাবন করতে হবে যে, কুরআনের এ সমগ্র ভাষণ আসলে খৃষ্টানদের ঈসার খোদা হওয়ার আকীদার প্রতিবাদ ও সংশোধনের উদ্দেশ্যেই ব্যক্ত হয়েছে৷ খৃষ্টানদের মধ্যে এই আকীদার জন্মের মূলে ছিল তিনটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ:

এক: হযরত ঈসার অলৌকিক জন্ম৷

দুই: তাঁর সুস্পষ্ট অনুভূত মুজিযাসমূহ৷

তিন: তাঁর আকাশের দিকে উঠিয়ে নেয়া৷ তাদের বই পত্রে পরিস্কার ভাষায় এই ঘটনার উল্লেখ পাওয়া যায়৷

কুরআন প্রথম কথাটিকে সত্য বলে ঘোষণা করেছে৷ কুরআনের বক্তব্য হচ্ছে, হযরত ঈসার (আ) পিতা ছাড়াই জন্মগ্রহণ নিছক আল্লাহর কুদরাতের প্রমাণ ছাড়া আর কিছুই নয়৷ আল্লাহ যাকে যেভাবে ইচ্ছা সৃষ্টি করে থাকেন৷ এই অস্বাভাবিক জন্মের কারণে একথা প্রমাণ হয় না যে, হযরত ঈসা (আ) খোদা ছিলেন বা খোদায়ী কর্তৃত্বে তাঁর কোন অংশীদারীত্ব ছিল৷

দ্বিতীয় কথাটিকেও কুরআন সত্য বলে ঘোষণা করেছে৷ কুরআন হযরত ঈসার মুজিযাগুলো একটি একটি করে গণনা করে বর্ণনা করেছে৷ কিন্তু এখানে সুস্পষ্ট করে বলে দেয়া হয়েছে যে, এই সমস্ত কাজই তিনি আল্লাহর হুকুমে সম্পদান করেছিলেন৷ তিনি নিজে অর্থবা নিজের শক্তিতে কিছুই করেননি৷ কাজেই এগুলোর মধ্য থেকে কোন একটি ভিত্তিতেই এই ফল লাভ করা যেতে পারে না যে, খোদায়ী কর্তৃত্ব ও কার্যকলাপে হযরত ঈসার কোন অংশ ছিল৷

এখন তৃতীয় কথাটি সম্পর্কে খৃষ্টানদের বর্ণনাগুলো যদি একবারেই ভুল বা মিথ্যা হতো, তাহলে তাদের ঈসার খোদা হবার আকীদাটির প্রতিবাদ করার জন্য পরিষ্কারভাবে একথা বলে দেয়া অপিরহার্য ছিল যে, যাকে তোমরা খোদার পুত্র বা খোদা বলছো সে তো কবে মরে মাটির সাথে মিশে গেছে৷ আর যদি এজন্য অধিকতর নিশ্চিন্ত হতে চাও, তাহলে উমুক স্থানে গিয়ে তার কবরটি দেখো৷ কিন্তু একথা না বলে কুরআন কেবল তাঁর মৃত্যুর ব্যাপারটি অস্পষ্ট রেখেই থেমে যায়নি এবং তার অদৃশ্য হয়ে যাওয়া সম্পর্কে কেবল এমন শব্দ ব্যবহার করেনি যার ফলে কমপক্ষে তাঁকে জীবিত উঠিয়ে নেয়ার অর্থের সম্ভাবনা থেকে যায় বরং খৃস্টানদের সুস্পষ্টভাবে একথা বলে দেয় যে, ঈসাকে আদতে শূলে চড়ানোই হয়নি৷ অর্থাৎ যে ব্যক্তি শেষ সময়ে '' এইলী এইলী লিমা শাবাকতানী'' (অর্থাৎ ঈশ্বর আমার! কেন আমাকে পরিত্যাগ করেছো?) বলেছিল এবং যার শুলে চড়াবার দৃশ্যের ছবি নিয়ে তোমরা ঘুরে বেড়াও, সে ঈসা ছিল না৷ ঈসাকে আল্লাহ তার আগেই উঠিয়ে নিয়েছিলেন৷

এ ধরনের বক্তব্য পেশ করার পর যে ব্যক্তি কুরআনের আয়াত থেকে হযরত ঈসার (আ) মৃত্যুর অর্থ বের করার চেষ্টা করে সে আসলে একথা প্রমাণ করার চেষ্টা করে যে আল্লাহ পরিস্কার ভাষায় নিজের বক্তব্য প্রকাশ করার ক্ষমতা রাখেন না, নাউযুবিল্লাহ মিন যালিক৷
৫২. অস্বীকারকারী বলতে এখানে ইহুদীদেরকে বুঝানো হয়েছে৷ হযরত ঈসা আলাইহিস সালাম তাদেরকে ঈমান আনার দাওয়াত দিয়েছিলেন এবং তারা তা প্রত্যাখ্যান করেছিল৷ বিপরীত পক্ষে তাঁর অনুসারী বলতে যদি সঠিক, যথাথ নির্ভুল অনুসারী ধরা হয় তাহলে কেবল মুসলমানরাই তার অন্তরভূক্ত হতে পারে৷ আর যদি এর অর্থ হয় মোটামুটি যারা তাঁকে মেনে নিয়েছিল, তাহলে এর মধ্যে খৃষ্টান ও মুসলমান উভয়ই শামিল হবে৷
৫৩. অর্থাৎ যদি নিছক অলৌকিক জন্মলাভ কারো খোদা বা খোদার পুত্র হবার যথেষ্ট প্রমাণ বলে বিবেচিত হয়ে থাকে, তাহলে সর্বপ্রথম তোমাদের আদম সম্পর্কেই এহেন আকীদা পোষণ করা উচিত ছিল৷ কারণ ঈসা কেবল বিনা পিতায় জন্মলাভ করেছিলেন কিন্তু আদম জন্মলাভ করেছিলেন পিতা ও মাতা উভয়ের সাহায্য ছাড়াই৷
৫৪. এ পর্যন্তকার ভাষনে যেসব মৌলিক বিষয় খৃষ্টানদের সামনে পেশ করা হয়েছে সেগুলোর সংক্ষিপ্তসার ক্রমানুসারে নীচে দেয়া হলোঃ

প্রথম যে বিষয়টি তাদের বুঝাবার চেষ্টা করা হয়েছে সেটি হচ্ছে, যেসব কারণ ঈসাকে আল্লাহ বলে তোমাদের মনে বিশ্বাস জন্মেছে, সেগুলোর মধ্যে একটি কারণও এই ধরনের বিশ্বাসের ভিত্তি হতে পারে না৷ ঈসা একজন মানুষ ছিলেন৷ বিশেষ কারণে ও উদ্দেশ্যে আল্লাহ তাঁকে অস্বাভাবিক পদ্ধতিতে সৃষ্টি করা সংগত মনে করেন৷ তাঁকে এমন সব মু'জিয়া তথা অলৌকিক ক্ষমতা ও নিদর্শন দান করেন, যা ছিল তাঁর নবুওয়াতের দ্ব্যর্থহীন আলামত৷ সত্য অস্বীকারকারী ও সত্যদ্রোহীদের দ্বারা শূলবিদ্ধ হওয়া থেকে তাকে রক্ষা করেন৷ বরং আল্লাহ তাঁকে নিজের কাছে উঠিয়ে নেন৷ প্রভু তার দাসকে যেভাবে ইচ্ছা ব্যবহার করার ক্ষমতা ও ইখতিয়ার রাখেন৷ নিছক তাঁর সাথে এই অস্বাভাবিক ব্যবহার দেখে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছে যাওয়া যে, তিনি নিজেই প্রভু ছিলেন অথবা প্রভুপুত্র ছিলেন অথবা প্রভুত্বে ও মালিকানা স্বত্বে অংশীদার ছিলেন, এটা কেমন করে সঠিক হতে পারে?

দ্বিতীয় যে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি তাদের বুঝানো হয়েছে সেটি হচ্ছে এই যে, ঈসা যে দাওয়াত নিয়ে এসিছিলেন সেই একই দাওয়াত নিয়ে এসেছেন মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম৷ উভয়ের মিশনের মধ্যে সামান্য চুল পরিমাণ পার্থক্যও নেই৷

এই ভাষনের তৃতীয় মৌলিক বিষয়টি হচ্ছে, কুরআন যে ইসলামের দাওয়াত পেশ করছে এই ইসলামই ছিল হযরত ঈসার পর তাঁর হাওয়ারীদের ধর্মী৷ পরবর্তীকালের ইসায়ী ধর্ম হযরত ঈসা আলাইহিস সালামের শিক্ষার ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকেনি এবং তাঁর অনুসারীবৃন্দ হওয়ারীদের অনুসৃত ধর্মের ওপরও প্রতিষ্ঠিত থাকতে পারেনি৷
৫৫. মীমাংসার এই পদ্ধিত উপস্থাপন করার উদ্দেশ্য ছিল আসলে একথা প্রমাণ করা যে, নাজরানের প্রতিনিধিদল জেনে বুঝে হঠধর্মিতার পথ অবলম্বন করছে৷ ওপরের ভাষণে যেসব কথা বলা হয়েছে তার একটিরও জবাব তাদের কাছে ছিল না৷ খৃষ্টানদের আকীদাগুলোর মধ্য থেকে কোন একটির পক্ষেও তারা নিজেদের পবিত্র গ্রন্থ ইনজীল থেকে এমন কোন সনদ আনতে পারছিল না যার ভিত্তিতে পূর্ণ বিশ্বাসের সাথে তারা এ দাবী করতে পারতো যে, তাদের বিশ্বাস প্রকৃত সত্যের সাথে পূর্ণ সামঞ্জস্যশীল এবং সত্য কোনক্রমেই তার বিরোধী নয়৷ তা ছাড়া নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের চরিত্র মাধুর্য এবং তাঁর শিক্ষা ও কার্যাবলী দেখে প্রতিনিধি দলের অধিকাংশ সদস্যের মনে তাঁর নবুওয়াতের প্রতি বিশ্বাসও জন্মে গিয়েছিল৷ অথবা কমপক্ষে তাঁর নবুওয়াত অস্বীকার করার ভিত্ নড়ে উঠেছিল৷ তাই যখন তাদের বলা হলো আচ্ছা, যদি তোমাদের বিশ্বাসের সত্যতার ওপর পূর্ণ ঈমান থাকে, তাহলে এসো আমাদের মোকাবিলায় এই দোয়া করো যে, যে মিথ্যেবাদী হবে তার ওপর আল্লাহর লানত বর্ষিত হোক, তখন তাদের একজনও মোকাবিলায় এগিয়ে এলো না৷ এভাবে সমগ্র আরববাসীর সামনে একথা পরিস্কার হয়ে গেলো যে, নাজরানের খৃষ্টবাদের যেসব পুণ্যাত্মা পাদরী ও যাজকের পবিত্রতার প্রভাব বহুদূর বিস্তৃত, তারা আসলে এমনসব আকীদা-বিশ্বাস পালন করে আসছে যেগুলোর সত্যতার প্রতি তাদের নিজেদেরও পূর্ণ আস্থা নেই৷