(৩:১০) যারা কুফরী নীতি অবলম্বন করেছে, তাদের না ধন –সম্পদ, না সন্তান –সন্ততি আল্লাহর মোকাবিলায় কোন কাজে লাগবে ৷ তারা দোজখের ইন্ধনে পরিণত হবেই৷
(৩:১১) তাদের পরিণম ঠিক তেমনি হবে যেমন ফেরাউনের সাথী ও তার আগের নাফরমানদের হয়ে গেছেঃ তারা আল্লাহর আয়াতের প্রতি মিথ্যা আরোপ করেছে, ফলে আল্লাহ তাদের গোনাহের জন্য তাদেরকে পাকড়াও করেছেন ৷ আর যথার্থই আল্লাহ কঠোর শাস্তিদানকারী৷
(৩:১২) কাজেই হে মুহাম্মাদ ! যারা তোমরা দাওয়াত গ্রহণ করতে অস্বীকার করলো, তাদের বলে দাও, সেই সময় নিকটবর্তী যখন হবে, তোমরা পরাজিত হবে এবং তোমাদের জাহান্নামের দিকে তাড়িয়ে নিয়ে যাওয়া হবে, আর জাহান্নাম বড়ই খারাপ আবাস ৷
(৩:১৩) তোমাদের জন্য সেই দুটি দলের মধ্যে একটি শিক্ষার নিদর্শন ছিল যারা (বদরে) পরস্পর যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছিল৷ একটি দল আল্লাহর পথে যুদ্ধ করছিল এবং অন্য দলটি ছিল কাফের ৷ চোখের দেখায় লোকেরা দেখছিল, কাফেররা মু’মিনদের দ্বিগুণ৷ কিন্তু ফলাফল (প্রমাণ করলো যে) আল্লাহ তাঁর বিজয় ও সাহায্য দিয়ে যাকে ইচ্ছা সহায়তা দান করেছেন ৷ অন্তর্দৃষ্টি সম্পন্ন লোকদের জন্য এর মধ্যে বড়ই শিক্ষণীয় বিষয় রয়েছে৷১০
(৩:১৪) মানুষের জন্য নারী, সন্তান, সোনারুপার স্তূপ, সেরা ঘোড়া, গবাদী পশু ও কৃষি ক্ষেতের প্রতি আসক্তিকে বড়ই সুসজ্জিত ও সুশোভিত করা হয়েছে৷ কিন্তু এগুলো দুনিয়ার ক্ষণস্থায়ী জীবনের সামগ্রী মাত্র৷ প্রকৃতপক্ষে উত্তম আবাস তো রয়েছে আল্লাহর কাছে৷
(৩:১৫) বলো, আমি কি তোমাদের জানিয়ে দেবো, ওগুলোর চাইতে ভালো জিনিস কি? যারা তাকওয়ার নীতি অবলম্বন করে তাদের জন্য তাদের রবের কাছে রয়েছে বাগান, তার নিম্নদেশে ঝরণাধারা প্রবাহিত হয়৷ সেখানে তারা চিরন্তন জীবন লাভ করবে৷ পবিত্র স্ত্রীরা হবে তাদের সংগিনী ১১ এবং তারা লাভ করবে আল্লাহর সন্তুষ্টি ৷ আল্লাহ তার বান্দাদের কর্মনীতির ওপর গভীর ও প্রখর দৃষ্টি রাখেন ৷১২
(৩:১৬) এ লোকেরাই বলেঃ ‘‘হে আমাদের রব! আমরা ঈমান এনেছি, আমাদের গোনাহখাতা মাফ করে দাও এবং জাহান্নামের আগুন থেকে আমাদের বাচাঁও ৷ এরা সবরকারী, ১৩
(৩:১৭) সত্যনিষ্ঠ, অনুগত ও দানশীল এবং রাতের শেষভাগে আল্লাহর কাছে গোনাহ মাফের জন্য দোয়া করে থাকে৷’’
(৩:১৮) আল্লাহ নিজেই সাক্ষ দিয়েছেন , তিনি ছাড়া আর কোন ইলাই নেই৷১৪ আর ফেরেশতা ও সকল জ্ঞানবান লোকই সততা ও ন্যায়পরায়ণতার সাথে এ সাক্ষ্য দিচ্ছে ১৫ যে, সেই প্রবল পরাক্রান্ত ও জ্ঞানবান সত্তা ছাড়া আর কোন ইলাহ নেই৷
(৩:১৯) ইসলাম আল্লাহর নিকট একমাত্র দীন –জীবনবিধান৷১৬ যাদেরকে কিতাব দেয়া হয়েছিল, তারা এ দীন থেকে সরে গিয়ে যেসব বিভিন্ন পদ্ধতি অবলম্বন করেছে, সেগুলো অবলম্বনের এ ছাড়া আর কোন কারণই ছিল না যে, প্রকৃত জ্ঞান এসে যাওয়ার পর তারা নিজেদের মধ্যে পরস্পরের ওপর বাড়াবাড়ি করার জন্য এমনটি করেছে৷১৭ আর যে কেউ আল্লাহর হেদায়াতের আনুগত্য করতে অস্বীকার করে, তার কাছ থেকে হিসেব নিতে আল্লাহর মোটেই দেরী হয় না৷
(৩:২০) এখন যদি এ লোকেরা তোমার সাথে বিতর্কে লিপ্ত হয় তাহলে তাদের বলে দাওঃ ‘‘ আমি ও আমার অনুগতরা আল্লাহর সামনে আনুগত্যের শির নত করেছি৷’’ তারপর আহলি কিতাব ও অ-আহলি কিতাব উভয়কে জিজ্ঞেস করো, ‘‘তোমরাও কি তাঁর বন্দেগী কবুল করেছো?’’১৮ যদি করে থাকে তাহলে ন্যায় ও সত্যের পথ লাভ করেছে আর যদি তা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে থাকে, তাহলে তোমার ওপর কেবলমাত্র পয়গাম পৌছিয়ে দেবার দায়িত্বই অর্পিত হয়েছিল৷ পরবর্তী পর্যায়ে আল্লাহ নিজেই তার বান্দাদের অবস্থা দেখবেন৷
৮. এর ব্যাখ্যার জন্য সূরা বাকারার ১৬১ টীকা দেখুন৷
৯. যদিও আসল পার্থক্য ছিল তিনগুণ৷ কিন্তু সরাসরি এক নজরে দেখে যে কেউ মনে করতে পারতো, কাফেরদের সৈন্য সংখ্যা মুসলমানদের দ্বিগুন হবে৷
১০. বদরের যুদ্ধ মাত্র কিছুদিন আগে হয়ে গেছে৷ তার বিভিন্ন ঘটনা তখনো মানুষের মনে তরতাজা ছিল ৷ তাই এ যুদ্ধের ঘটনাবলী ও ফলাফলের প্রতি ইংগিত করে লোকদের উপদেশ দেয়া হয়েছে৷ এ যুদ্ধের তিনটি বিষয় ছিল অত্যন্ত শিক্ষণীয়ঃ

একঃ মুসলমান ও কাফেররা যেভাবে পরস্পরের মুখোমুখি হয়েছিল তাতে উভয় দলের নৈতিক ও চারিত্রিক পার্থক্য সুস্পষ্ট হয়ে উঠেছিল৷ একিদেক কাফেরদের সেনাবাহিনীতে মদপানের হিড়িক চলছিল৷ তাদের গায়িকা ও নর্তকী বাঁদীরা সংগে এসেছিল৷ ফলে সেনা শিবিরের ভোগের পেয়ালা উপচে পড়ছিল৷ অন্যদিকে মুসলমানদের সেনাদল আল্লাহভীতি ও আল্লাহর প্রতি আনুগত্যের স্নিগ্ধ পরিবেশ বিরাজমান ছিল৷ তাদের মধ্যে ছিল চরম নৈতিক সংযম৷ সৈন্যরা নামায-রোয়ায় মশগুল ছিল৷ কথায় কথায় আল্লাহর নাম উচ্চারিত হচ্ছিল এবং আল্লাহর কাছে দোয়া ও করুণা ভিক্ষা মহড়া চলছিল৷ দু'টি সৈন্য দল দেখে যে কোন ব্যক্তি অতি সহজেই জানতে পারতো, কোন্ দলটি আল্লাহর পথে লড়াই করছে৷

দুই: মুসলমানরা তাদের সংখ্যাল্পতা ও সমরাস্ত্রের অভাব সত্ত্বেও যেভাবে কাফেরদের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ ও উন্নত অস্ত্রসজ্জায় সেনাদলের ওপর বিজয় লাভ করলো তাতে একথা সুস্পষ্ট হয়ে উঠেছিল যে, তারা আল্লাহর সাহায্যপুষ্ট ছিল৷

তিন: আল্লাহর প্রবল প্রতাপান্বিত ক্ষমতা সম্পর্কে গাফেল হয়ে যারা নিজেদের সাজ-সরঞ্জাম ও সমর্থকদের সংখ্যাধিক্যের কারণে আত্নম্ভরিকতায় মেতে উঠেছিল, তাদের জন্য এ ঘটনাই ছিল যথার্থই একটি চাবুকের আঘাত৷ আল্লাহ কিভাবে মাত্র গুটিকয় বিত্তহীন, অভাবী ও প্রবাসী মুহাজির এবং মদীনার কৃষক সমাজের মুষ্টিমেয় জনগোষ্ঠীর সহায়তায় কুরাইশদের মতো অভিজাত শক্তিশালী ও সমগ্র আরবীয় সমাজের মধ্যমণি গোত্রকে পরাজিত করতে পারেন, তা তারা স্বচক্ষেই দেখে নিল৷
১১. এর ব্যাখ্যা দেখুন সূরা আল বাকারার ২৭ টীকায়৷
১২. অর্থাৎ আল্লাহ অপাত্রে দান করেন না৷ উপরি উপরি বা ভাসাভাসাভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা তার নীতি নয়৷ তিনি তার বান্দাহদের কার্যাবলী, সংকল্প ও ইচ্ছা পুরোপুরি ও ভালোভাবেই জানেন৷ কে পুরুস্কার লাভের যোগ্য আর কে যোগ্য নয়, তাও তিনি ভালোভাবেই জানেন৷
১৩. অর্থাৎ সত্য পথে পূর্ণ অবিচলতার সাথে প্রতিষ্ঠিত থাকে৷ কোন ক্ষতি বা বিপদের মুখে কখনো সাহস ও হিম্মতহারা হয় না৷ ব্যর্থতা এদের মনে কোন চিড় ধরায় না৷ লোভ-লালসায় পা পিছলে যায় না৷ যখন আপাতদৃষ্টিতে সাফল্যের কোন সম্ভাবনাই দেখা যায় না তখনো এরা মজবুতভাবে সত্যকে আঁকড়ে ধরে থাকে৷ (সূরা আল বাকারার ৬০ টীকাটিও দেখে নিন)৷
১৪. অর্থাৎ যে আল্লাহ বিশ্ব-জাহানের সমস্ত তত্ব, সত্য ও রহস্যের প্রত্যক্ষ জ্ঞান রাখেন, যিনি সমগ্র সৃষ্টিকে আবরণহীন অবস্থায় দেখছেন এবং যার দৃষ্টি থেকে পৃথিবী ও আকাশের কোন একটি বস্তুও গোপন নেই-এটি তার সাক্ষ্য এবং তার চাইতে আর বেশী নির্ভরযোগ্য চাক্ষুষ সাক্ষ্য আর কে দিতে পারে? কারণ সমগ্র সৃষ্টিজগতে তিনি ছাড়া আর কোন সত্তা খোদায়ী গুণান্বিত নয়৷ আর কোন সত্তা খোদায়ী কর্তৃত্বের অধিকারী নয় এবং আর কারোর খোদায়ী করার যোগ্যতাও নেই৷
১৫. আল্লাহর পর সবচেয়ে বেশী নির্ভরযোগ্য সাক্ষ্য হচ্ছে ফেরেশতাদের৷ কারণ তারা হচ্ছে বিশ্বরাজ্যের ব্যবস্থাপনার কার্যনির্বাহী ও কর্মচারী৷ তারা সরাসরি নিজেদের ব্যক্তিগত জ্ঞানের ভিত্তিতে সাক্ষ্য দিচ্ছে যে, এই বিশ্বারাজ্যে আল্লাহ ছাড়া আর আরো হুকুম চলে না এবং পৃথিবী ও আকাশের পরিচালনা ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে তিনি ছাড়া আর কোন সত্তা এমন নেই যার কাছ থেকে তারা নির্দেশ গ্রহণ করতে পারে৷ ফেরেশতাদের পরে এই সৃষ্টিজগতে আর যারাই প্রকৃত সত্য সম্পর্কে কম বেশী কিছুটা জ্ঞান রাখে, সৃষ্টির আদি থেকে নিয়ে আজ পর্যন্তকার তাদের সবার সর্বসম্মত সাক্ষ হচ্ছে এই যে, আল্লাহ একাই এই সমগ্র বিশ্ব-জাহানের মালিক, পরিচাল ও প্রভু৷
১৬. অর্থাৎ আল্লাহর কাছে মানুষের জন্য একটি মাত্র জীবন ব্যবস্থা ও একটি মাত্র জীবন বিধান সঠিক ও নির্ভুল বলে গৃহীত৷ সেটি হচ্ছে, মানুষ আল্লাহকে নিজের মালিক ও মাবুদ বলে স্বীকার করে নেবে এবং তাঁর ইবাদাত, বন্দেগী ও দাসত্বের মধ্যে নিজেকে সম্পূর্ণরূপে সোপর্দ করে দেবে৷ আর তাঁর বন্দেগী করার পদ্ধতি নিজের আবিষ্কার করবে না৷ বরং তিনি নিজের নবী-রসূলগণের মাধ্যমে যে হিদায়ত ও বিধান পাঠিয়েছেন কোন প্রকার কমবেশী না করে তার অনুসরণ করবে৷ এই চিন্তা ও কর্মপদ্ধতির নাম ''ইসলাম" আর বিশ্ব-জাহানের স্রষ্টার ও প্রভর নিজের সৃষ্টিকূল ও প্রজা সাধারনের জন্য ইসলাম ছাড়া অন্য কোন কর্মপদ্ধতির বৈধতার স্বীকৃতি না দেয়াও পুরোপুরি ন্যায়সংগত৷ মানুষ তার নির্বুদ্ধিতার কারণে নাস্তিক্যবাদ থেকে নিয়ে শিরক ও মূর্তিপূজা পর্যন্ত যে কোন মতবাদ ও যে কোন পদ্ধতির অনুসরণ করা নিজের জন্য বৈধ মনে করতে পারে কিন্তু বিশ্ব-জাহানের প্রভুর দৃষ্টির এগুলো নিছক বিদ্রোহ ছাড়া আর কিছুই নয়৷
১৭. এর অর্থ হচ্ছে, আল্লাহর পক্ষ থেকে দুনিয়ার যে কোন অঞ্চলে যে কোন যুগে যে নবীই এসেছেন, তাঁর দীনই ছিল ইসলাম৷ দুনিয়ার যে কোন জাতির ওপর যে কিতাবই নাযিল হয়েছে, তা ইসলামেরই শিক্ষা দান করেছে৷ এই আসল দীনকে বিকৃত করে এবং তার মধ্যে পরিবর্তন পরিবর্ধন করে যেসব ধর্ম মানুষের মধ্যে প্রচলিত হয়েছে, তাদের জন্ম ও উদ্ভবের কারণ ও ছাড়া আর কিছুই ছিল না যে, লোকেরা নিজেদের বৈধ সীমা অতিক্রম নিজেদের খেয়াল খুশী মতো আসল দীনের আকীদা-বিশ্বাস, মূলনীতি ও বিস্তারিত বিধান পরিবর্তন করে ফেলেছে৷
১৮. অন্য কথায় এ বক্তব্যটিকে এভাবে বলা যায়, যেমন-''আমি ও আমার অনুসারীরা তো সেই নির্ভেজাল ইসলামের স্বীকৃতি দিয়েছি, যেটি আল্লাহর আসল দীন ও জীবন বিধান৷ এখন তোমরা বলো, তোমরা ও তোমাদের পুর্বপুরুষরা দীনের মধ্যে যে পরিবর্তন সাধন করেছো তা বাদ দিয়ে এই আসল ও প্রকৃত দীনের দিকে কি তোমরা ফিরে আসবে?