(৩:১৫৬) হে ঈমানদারগণ ! কাফেরদের মতো কথা বলো না৷ তাদের আত্মীয়স্বজনরা কখনো সফরে গেলে অথবা যুদ্ধে অংশগ্রহণ করলে ( এবং সেখানে কোন দুর্ঘটনায় পতিত হলে) তারা বলে, যদি তারা আমাদের কাছে থাকতো তাহলে মারা যেতো না এবং নিহত হতো না ৷ এ ধরনের কথাকে আল্লাহ তাদের মানসিক খেদ ও আক্ষেপের কারণে পরিণত করেন ৷১১৩ নয়তো জীবন –মৃত্যু তো একমাত্র আল্লাহই দান করে থাকেন এবং তোমাদের সমস্ত কার্যকলাপের ওপর তিনি দৃষ্টি রাখেন ৷
(৩:১৫৭) যদি তোমরা আল্লাহর পথে নিহত হও বা মারা যাও তা হলে তোমরা আল্লাহর যে রহমত ও ক্ষমা লাভ করবে, তা এরা যা কিছু জমা করে তার চাইতে ভালো৷
(৩:১৫৮) আর তোমরা মারা যাও বা নিহত হও, সব অবস্থায় তোমাদের অবশ্যি আল্লাহর দিকেই যেতে হবে৷
(৩:১৫৮) ( হে নবী!) এটা আল্লাহর বড়ই অনুগ্রহ যে, তোমার ব্যবহার তাদের প্রতি বড়ই কোমল৷ নয়তো যদি তুমি রুক্ষ স্বভাবের বা কঠোর চিত্ত হতে, তাহলে তারা সবাই তোমার চার পাশ থেকে সরে যেতো ৷ তাদের ক্রটি ক্ষমা করে দাও৷ তাদের জন্য মাগফিরাতে দোয়া করো এবং দীনের ব্যাপারে বিভিন্ন পরামর্শে তাদেরকে অন্তরভুক্ত করো৷ তারপর যখন কোন মতের ভিত্তিতে তোমরা স্থির সংকল্প হবে তখন আল্লাহর ওপর ভরসা করো৷ আল্লাহ তাদেরকে পছন্দ করেন যারা তাঁর ওপর ভরসা করে কাজ করে৷
(৩:১৬০) আল্লাহ যদি তোমাদের সাহায্য করেন তাহলে কোন শক্তি তোমাদের ওপর প্রাধান্য বিস্তার করতে পারবে না৷ আর যদি তিনি তোমাদের পরিত্যাগ করেন, তাহলে এরপর কে আছেন তোমাদের সাহায্য করার মতো ? কাজেই সাচ্চা মুমিনদের আল্লাহর ওপরই ভরসা করা উচিত ৷
(৩:১৬১) খেয়ানত করা কোন নবীর কাজ হতে পারে না৷১১৪ যে ব্যক্তি খেয়ানত করবে কিয়ামতের দিন সে নিজের খেয়ানত করা জিনিস সহকারে হাজির হয়ে যাবে৷ তারপর প্রত্যেকেই তার উপার্জনের পুরোপুরি প্রতিদান পেয়ে যাবে এবং কারো প্রতি কোন জুলুম করা হবে না৷
(৩:১৬২) যে ব্যক্তি সবসময় আল্লাহর সন্তুষ্টি অনুযায়ী চলে সে কেমন করে এমন ব্যক্তির মতো কাজ করতে পারে , যাকে আল্লাহর গযব ঘিরে ফেলেছে এবং যার শেষ আবাস জাহান্নাম, যা সবচেয়ে খারাপ আবাস ?
(৩:১৬৩) আল্লাহর কাছে এ উভয় ধরনের লোকদে মধ্যে বহু পর্যায়ের পার্থক্য রয়েছে ৷ আল্লাহ সবার কার্যকলাপের ওপর নজর রাখেন ৷
(৩:১৬৪) আসলে ঈমানদারদের মধ্যে তাদেরই মধ্য থেকে একজন নবী পাঠিয়ে আল্লাহ মুমিনদের প্রতি অনুগ্রহ করেছেন৷ সে তাঁর আয়াত তাদেরকে শোনায়, তাদের জীবনকে পরিশুদ্ধ ও সুবিন্যস্ত করে এবং তাদেরকে কিতাব ও জ্ঞান শিক্ষা দেয়৷ অথচ এর আগে এই লোকেরাই সুস্পষ্ট গোমরাহীতে লিপ্ত ছিল৷
(৩:১৬৫) তোমাদের ওপর যখন বিপদ এসে পড়লো তোমরা বলতে লাগলে, এ আবার কোথায় থেকে এলো ? ১১৫ তোমাদের এ অবস্থা কেন ? অথচ (বদরের যুদ্ধে) এর দ্বিগুণ বিপদ তোমাদের মাধ্যমে তোমাদের বিরোধী পক্ষের ওপর পড়েছিল৷১১৬ হে নবী! ওদের বলে দাও, তোমরা নিজেরাই এ বিপদ এনেছো৷১১৭ আল্লাহ প্রতিটি জিনিসের ওপর শক্তিমান৷১১৮
(৩:১৬৬) যুদ্ধের দিন তোমাদের যে ক্ষতি হয় তা ছিল আল্লাহর হুকুমে এবং তা এ জন্য ছিল যাতে আল্লাহ দেখে নেন তোমাদের মধ্যে কে মুমিন
(৩:১৬৭) এবং কে মুনাফিক৷ এ মুনাফিকদের যখন বলা হলো, এসো আল্লাহর পথে যুদ্ধ করো অথবা (কমপক্ষে) নিজের শহরের প্রতিক্ষা করো, তারা বলতে লাগলোঃ যদি আমরা জানতাম আজ যুদ্ধ হবে, তাহলে আমরা অবশ্যি তোমাদের সাথে চলতাম ৷১১৯ যখন তারা একথা বলছির তখন তারা ঈমানের তুলনায় কুফরীর অনেক বেশী কাছে অবস্থান করছিল৷ তারা নিজেদের মুখে এমন সব কথা বলে, যা তাদের মনের মধ্যে নেই এবং যা কিছু তারা মনের মধ্যে গোপন করে আল্লাহ তা খুব ভালো করেই জানেন ৷
(৩:১৬৮) এরা নিজেরা বসে থাকলো এবং এদের ভাই –বন্ধু যারা লড়াই করতে গিয়ে মারা গিয়েছিল, তাদের সম্পর্কে বলেছিলঃ যদি তারা আমাদের কথা মেনে নিতো, তাহলে মারা যেতো না ৷ ওদের বলে দাও, তোমরা নিজেদের একথায় যদি সত্যবাদী হয়ে থাকো, তাহলে তোমাদের নিজেদের মৃত্যু যখন আসবে তখন তা থেকে নিজেদেরকে রক্ষা করে দেখাও৷
(৩:১৬৯) যারা আল্লাহর পথে নিহত হয়েছে তাদেরকে মৃত মনে করো না৷ তারা আসলে জীবিত ৷১২০ নিজেদের রবের কাছ থেকে তারা জীবিকা লাভ করছে৷
(৩:১৭০) আল্লাহ নিজের অনুগ্রহ থেকে তাদেরকে যা কিছু দিয়েছেন তাতেই তারা আনন্দিত ও পরিতৃপ্ত ১২১ এবং যেসব ঈমানদার লোক তাদের পরে এ দুনিয়ায় রয়ে গেছে এবং এখনো সেখানে পৌঁছেনি, তাদের জন্যও কোন ভয় ও দুঃখের কারণ নেই, একথা জেনে তারা নিশ্চিন্ত হতে পেরেছে৷
(৩:১৭১) তারা আল্লাহর পুরস্কার ও অনুগ্রহ লাভে আনন্দিত ও উল্লসিত এবং তারা জানতে পেরেছে যে, আল্লাহ মুমিনদের প্রতিদান নষ্ট করেন না৷
(৩:১৭২) আহত হবার পরও যারা আল্লাহ ও রসূলের আহবানে সাড়া দিয়েছে, তাদের মধ্যে ১২২ যারা সৎ-নেককার ও মুত্তাকী তাদের জন্য রয়েছে বিরাট প্রতিদান৷ আর যাদেরকে ১২৩
১১৩. অর্থাৎ একথাগুলো সত্য নয়৷ এর পেছনে কোন ভিত্তি নেই৷ আল্লাহর ফায়সালাকে কেউ নড়াতে পারে না৷ এটিই সত্য৷ কিন্তু যারা আল্লাহার প্রতি ঈমান রাখে না এবং সবকিছুকে নিজেদের বুদ্ধিমত্তা ও কৌশলের ওপর নির্ভরশীল বলে মনে করে,তাদের জন্য এ ধরনের আন্দাজ অনুমান কেবল তাদের আক্ষেপ ও হতাশাই বাড়িয়ে দেয়৷ তারা কেবল এই বলে আফসোস করতে থাকে, হায়! যদি এমনটি করতাম তাহলে এমনটি হতো৷
১১৪. পেছনের অংশের প্রতিক্ষার জন্য নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যে তীরন্দাজ বাহিনী মোতায়েন করেছিলেন তারা যখন দেখলো শত্রুসৈন্যদের মালমাত্তা লুটে নেয়া হচ্ছে তখন তারা আশংকা করলো, হয়তো সমগ্র ধন-সম্পদ তারাই পাবে যারা সেগুলো হস্তগত করছে এবং গনীমাত বন্টনের সময় আমরা বঞ্চিত হবো৷ তাই তারা নিজেদের জায়গা ছেড়ে দিয়ে শত্রু সেনাদের সম্পদ ছিনিয়ে নেবার কাজে লেগে গিয়েছিল৷ যুদ্ধ শেষে মদীনায় ফিরে এসে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ঐ তীরন্দাজ বাহিনীর লোকেদের ডেকে তাদের এ নাফরমানীর কারণ জিজ্ঞেস করলেন৷ জবাবে তারা এমন কিছু ওজর পেশ করলো যা ছিল আসলে অত্যন্ত দুর্বল৷ তাদের জবাবে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেনঃ ------- "আসল কথা হচ্ছে, আমাদের ওপর তোমাদের আস্তা ছিল না৷ তোমরা মনে করছিলে আমরা তোমাদের সাথে খেয়ানত করবো এবং তোমাদের অংশ দেবো না"৷ এ আয়াতটিতে আসলে এ বিষয়টির প্রতি ইংগিত করা হয়েছে৷ আল্লাহর বক্তব্যের অর্থ হচ্ছে, আল্লাহর নবী নিজেই যখন ছিলেন তোমাদের সেনাপতি এবং সমস্ত বিষয়ই ছিল তাঁর হাতে তখন তোমাদের মনে এ আশংকা কেমন করে দেখা দিল যে, নবীর হাতে তোমাদের স্বার্থ সংরক্ষিত হবে না? আল্লাহর নবীর ব্যাপারে তোমরা কি এ আশংকা করতে পারো যে, তাঁর তত্বাবধানের যে সম্পদ থাকবে তা বিশ্বাস্ততা, আমানতদারী ও ইনসাফের সাথে বন্টন না করে অন্য কোনভাবে বন্টন করা হবে?
১১৫. নেতৃস্থানীয় সাহাবীগণ অবশ্যি যথার্থ সত্য অবগত ছিলেন এবং তাঁদের কোন প্রকার বিভ্রান্তির শিকার হবার সম্ভাবনা ছিল না৷ তবে সাধারণ মুসলমানরা মনে করছিলেন, আল্লাহর রসূর যখন আমাদের সংগে আছেন এবং আল্লাহ আমাদের সাহায্য ও সহযোগিতা দান করছেন তখন কোন অবস্থাতেই কাফেররা আমাদের ওপর বিজয় লাভ করতে পারে না৷ তাই ওহোদ পরাজিত হবার পর তারা ভীষণভাবে আশাহত হয়েছেন৷ তারা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করছেন, এ কি হলো? আমরা আল্লাহর দীনের জন্য লড়তে গিয়েছিলাম৷ তাঁর প্রতিশ্রুতি ও সাহায্য আমাদের সংগে ছিল৷ তাঁর রসূল সশরীরে যুদ্ধের ময়দানে উপস্থিত ছিলেন৷ এরপরও আমরা হেরে গেলাম? এমন লোকদের হাতে হেরে গেলাম, যারা আল্লাহর দীনকে দুনিয়ার বুক থেকে নিশ্চিহ্ন করে দেবার জন্য এসেছিল? মুসলমানদের এই বিস্ময় পেরেশানী ও হতাশা দূর করার জন্য এ আয়াত নাযিল হয়৷
১১৬. ওহোদের যুদ্ধে মুসলমানদের সত্তর জন লোক শহীদ হয়৷ অন্যদিকে ইতপূর্বে বদরের যুদ্ধে মুসলমানদের হাতে সত্তর জন্য কাফের নিহত এবং সত্তর জন বন্দী হয়েছিল৷
১১৭. অর্থাৎ এটা তোমাদের নিজেদের দুর্বলতা ও ভুলের ফসল৷ তোমরা সবর করোনি৷ তোমাদের কোন কোন কাজ হয়েছে তাকওয়া বিরোধী৷ তোমরা নির্দেশ অমান্য করেছো৷ অর্থ-সম্পদের লোভো আত্মহারা হয়েছো৷ পরস্পরের মধ্যে বিবাধ ও মতিবরোধ করেছো৷ এতোসব করার পর আবার জিজ্ঞেস করছো, বিপদ এলো কোথা থেকে?
১১৮. অর্থাৎ আল্লাহ যদি তোমাদের বিজয় দান করার শক্তি রাখেন তাহলে পরাজয় দানকরার শক্তিও রাখেন৷
১১৯. আবদুল্লাহ ইবনে উবাই যখন তিনশো মুনাফিক নিয়ে মাঝপথ থেকে ফিরে যেতে লাগলো তখন কোন কোন মুসলমান গিয়ে তাকে বুজাবার চেষ্টা করলো এবং মুসলিম সেনাদলে ফিরে আসার জন্য রাজী করতে চাইলো৷ কিন্তু সে জবাব দিল, "আমার নিশ্চিত বিশ্বাস আজ যুদ্ধ হবে না, তাই আমরা চলে যাচ্ছি৷ নয়তো আজো যুদ্ধ হবার আশা থাকলো আমরা অবশ্যি তোমাদের সাথে চলে যেতাম"৷
১২০. এর ব্যাখ্যার জন্য সূরা বাকারার ১৫৫ টীকা দেখুন৷
১২১. মুসনাদে আহমাদে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের একটি হাদীস বর্ণিত হয়েছে৷ তার বিষয়বস্তু হচ্ছে, যে ব্যক্তি ভালো কাজ করে এ দুনিয়া থেকে বিদায় নেয়, সে আল্লাহর কাছে এমন আরাম আয়েসের জীবন লাভ করে যে,তারপর এ দুনিয়ায় ফিরে আসার কোন আকাংখাই সে করে না৷ কিন্তু শহীদরা এর ব্যতিক্রম৷ তারা আকাংখা করে, আবার যেন তাদেরকে দুনিয়ায় পাঠানো হয় এবং আল্লাহর পথে জীবন দিতে গিয়ে যে ধরনের আনন্দ, উৎফুল্লতা ও উন্মাদনায় তারা পাগল হয়ে গিয়েছিল আবার যেন সেই অভিনব আস্বাদনের সাগরে তারা ডুব দিতে পারে৷
১২২. ওহোদের যুদ্ধক্ষেত্র থেকে ফেরার পথে বেশ কয়েক মনযিল দূরে চলে যাবার পর মুশরিকদের টনক নড়লো৷ তারা পরস্পর বলাবলি করতে লাগলো, এ আমরা কি করলাম! মুহাম্মাদের (সা) শক্তি ধ্বংস করার যে সুবর্ণ সুযোগ আমরা পেয়েছিলাম, তা হেলায় হারিয়ে ফেললাম? কাজেই তারা এক জায়গায় থেমে গিয়ে পরামর্শ করতে বসলো৷ সিদ্ধান্ত হলো, এখনি মদীনার ওপর দ্বিতীয় আক্রমণ চালাতে হবে৷ সিদ্ধান্ত তো তারা করে ফেললো তড়িঘড়ি৷ কিন্তু আক্রমণ করার আর সাহস হলো না৷ কাজেই মক্কায় ফিরে এলো৷ ওদিকে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামেরও আশংকা ছিল, কাফেররা আবার ফিরে এসে মদীনার ওপর আক্রমণ না করে বসে৷ তাই ওহোদ যুদ্ধের পরদিনই তিনি মুসলমানদের একত্র করে বললেন, কাফেরদের পেছনে ধাওয়া করা উচিত৷ যদিও সময়টা ছিল অত্যন্ত নাজুক তবুও যারা সাচ্চা মু'মিন ছিলেন তাঁরা প্রাণ উৎসর্গ করতে প্রস্তুত হয়ে গেলেন এবং নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে হামরাউল আসাদ পর্যন্ত ধাওয়া করলেন৷ এ জায়গাটি মদীনা থেকে আট মাইল দূরে অবস্থিত৷ এ আয়াতে এ প্রাণ উৎসর্গকারী মু'মিন দলের প্রতি ইংগিত করা হয়েছে৷
১২৩. এ আয়াত ক'টি ওহোদ যুদ্ধের এক বছর পর নাযিল হয়েছিল৷ কিন্তু ওহোদের ঘটনাবলীর সাথে সম্পর্কিত হবার কারণে এগুলোকে এ ভাষনের সাথে জুড়ে দেয়া হয়েছে৷