(৩:১২১) (হে নবী ! ৯৪ মুসলমানদের সামনে সে সময়ের কথা বর্ণনা কারো) যখন তুমি অতি প্রত্যুষে নিজের ঘর থেকে বের হয়েছিল এবং ( ওহোদের ময়দানে) মুসলমানদেরকে যুদ্ধের জন্য বিভিন্ন স্থানে নিযুক্ত করেছিলে৷ আল্লাহ সমস্ত কথা শুনেন এবং তিনি সবকিছু ভালো করে জানেন৷
(৩:১২২) স্মরণ করো, যখন তোমাদের দুটি দল কাপুরুষতার প্রদর্শনী করতে উদ্যেগী হয়েছিল,৯৫ অথচ আল্লাহ তাদের সাহায্যের জন্য বর্তমান ছিলেন এবং মুমিনদের আল্লাহরই ওপর ভরসা করা উচিত৷
(৩:১২৩) এর আগে তোমরা অনেক দুর্বল ছিলে৷ কাজেই আল্লাহর না –শোকরী করা থেকে তোমাদের দূরে থাকা উচিত, আশা করা যায় এবার তোমরা শোকর গুজার হবে ৷
(৩:১২৪) স্মরণ করো যখন তুমি মুমিনদের বলছিলেঃ আল্লাহ তাঁর তিন হাজার ফেরেশতা নামিয়ে দিয়ে তোমাদের সাহায্য করবেন, এটা কি তোমাদের জন্য যথেষ্ট নয়? ৯৬
(৩:১২৫) অবশ্যি, যদি তোমরা সবর করো এবং আল্লাহকে ভয় করে কাজ করতে থাকো, তাহলে যে মুহূর্তে দুশমন তোমাদের ওপর চড়াও হবে ঠিক তখনি তোমাদের রব (তিন হাজার নয়) পাচঁ হাজার চিহ্নযুক্ত ফেরেশতা দিয়ে তোমাদের সাহায্য করবেন ৷
(৩:১২৬) একথা আল্লাহ তোমাদের এ জন্য জানিয়ে দিলেন যে, তোমরা এতে খুশী হবে এবং তোমাদের মন আশ্বস্ত হবে ৷ বিজয় ও সাহায্য সবকিছুই আল্লাহর পক্ষ থেকে আসে ৷ তিনি প্রবল পরাক্রান্ত ও মহাজ্ঞানী ৷
(৩:১২৭) ( আর এ সাহায্য তিনি তোমাদের এ জন্য দেবেন) যাতে কুফরীর পথ অবলম্বনকারীদের একটি বাহু কেটে দেবার অথবা তাদের এমন লাঞ্জনাপূর্ণ পরাজয় দান করার ফলে তারা নিরাশ হয়ে পশ্চাদপসরণ করবে৷
(৩:১২৮) (হে নবী!) চূড়ান্ত ফায়সালা করার ক্ষমতায় তোমার কোন অংশ নেই৷ এটা আল্লাহর ক্ষমতা-ইখতিয়ারভুক্ত, তিনি চাইলে তাদের মাফ করে দেবেন৷ আবার চাইলে তাদের শাস্তি দেবেন ৷ কারণ তারা জালেম ৷
(৩:১২৯) পৃথিবী ও আকাশে যা কিছু আছে সমস্তই আল্লাহর মালিকানাধীন ৷ যাকে চান মাফ করে দেন এবং যাকে চান শাস্তি দেন ৷ তিনি ক্ষমাশীল ও করুণাময়৷৯৭
৯৪. এখান থেকে চতুর্থ ভাষণ শুরু হচ্ছে৷ ওহোদ যুদ্ধের পর এটি নাযিল হয়৷ এখানে ওহোদ যুদ্ধের ওপর মন্তব্য করা হয়েছে৷ আগের ভাষণটি শেষ করার সময় বলা হয়েছিল, ‍‍'"যদি তোমরা সবর করো এবং আল্লাহকে ভয় করে কাজ করতে থাকো, তাহলে তোমাদের বিরুদ্ধে তাদের কোন কৌশল কার্যকর হতে পারবেনা"৷ এখন যেহেতু ওহোদ যুদ্ধে মুসলমানদের পরাজয়ের কারণেই দেখা যাচ্ছে তাদের মধ্যে সবরের অভাব ছিল এবং কোন কোন মুসলমানের এমন কিছু ভূলচুক হয়ে গিয়েছিল যা ছিল আল্লাহভীতি বিরোধী, তাই তাদের এই দুর্বলতা সম্পর্কে সতর্কবাণী সম্বলিত এ ভাষণটি উপরোক্ত ভাষনের শেষ বাক্যটির পরপরই তার সাথে বসিয়ে দেয়া হয়েছে৷

এ ভাষণটির বর্ণনাভংগী বড়ই বৈশিষ্টময়৷ ওহোদ যুদ্ধের প্রত্যেকটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা চিহ্নিত করা হয়েছে এবং তার প্রত্যেকটির ওপর পৃথক পৃথকভাবে কয়েকটি মাপাজোখা শব্দ সমন্বিত ভারসাম্যপূর্ণ বাক্যের মাধ্যমে শিক্ষনীয় মন্তব্য করা হয়েছে৷ এগুলো বুঝতে হলে সংশ্লিষ্ট ঘটণাগুলোর পটভূমি জানা একান্ত অপরিহার্য৷

তৃতীয় হিজরীর শাওয়াল মাসের শুরুতে মক্কার কুরাইশরা প্রায় তিন হাজার সৈন্য নিয়ে মদীনা আক্রমণ করে৷ সংখ্যায় বেশী হবার পরও অস্ত্রশস্ত্রও তাদের কাছে ছিল মুসলমানদের চাইতে অনেক বেশী৷ এর ওপর ছিল তাদের বদর যুদ্ধের পরাজয়ের প্রতিশোধ নেবার তীব্র আকাংখা৷ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও অভিজ্ঞ সাহাবীগণ মদীনায় অবরুদ্ধ হয়ে প্রতিরক্ষার লড়াই চালিয়ে যাবার পক্ষপাতি ছিলেন৷ কিন্তু বদর যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করতে পারেননি এমন কতিপয় শাহাদাতের আকাংখায় অধীরভাবে প্রতীক্ষারত তরুণ সাহাবী শহরের বাইরে বের হয়ে যুদ্ধ করার ওপর জোর দিতে থাকেন৷ অবশেষে তাদের পীড়াপীড়িতে বাধ্য হয়ে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বাইরে বের হবার ফায়সালা করেন৷ এক হাজার লোক তাঁর সাথে বের হন৷ কিন্তু 'শওত' নামক স্থানে পৌছে আবদুল্লাহ ইবনে উবাই তার তিনশো সংগী নিয়ে আলাদা হয়ে যায়৷ যুদ্ধের অব্যবহিত পূর্বে তার এহেন আচরণে মুসলিম সেনাদল বেশ বড় আকারের অস্থিরতা ও হতাশার সঞ্চার হয়৷ এমন কি বনু সাল্‌মা ও বনু হারেসার লোকরা এত বেশী হতাশ হয়ে পড়ে যে, তারাও ফিরে যাবার সংকল্প করে ফেলেছিল৷

কিন্তু দৃঢ় প্রত্যয়ী সাহাবীগণের প্রচেষ্টায় তাদের মানসিক অস্থিরতা ও হতাশা দূর হয়ে যায়৷ এই অবশিষ্ট সাতশো সৈন্য নিয়ে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সামনের দিকে এগিয়ে যান এবং ওহোদ পর্বতের পাদদেশে (মদীনা থেকে প্রায় চার মাইল দূরে) নিজের সেনাবাহিনীকে এমনভাবে বিন্যস্ত করেন যার ফলে পাহাড় থাকে তাদের পেছন দিকে এবং সামনের দিকে থাকে কুরাইশ সেনাদল৷ একপাশে এমন একটি গিরিপথ ছিল, যেখান থেকে আকস্মিক হামলা হবার আশংকা ছিল৷ সেখানে তিনি আবদুল্লাহ ইবনে জুবাইরের নেতৃত্বে পঞ্চাশ জন তীরন্দাজের একটি বাহিনী মোতায়েন করেন৷ তাদেরকে জোর তাকীদ দিয়ে জানিয়ে দেনঃ "কাউকে আমাদের ধারে কাছে ঘেষঁতে দেবে না৷ কোন অবস্থায় এখান থেকে সরে যাবে না৷ যদি তোমরা দেখো, পাখিরা আমাদের গোশত ঠুকরে ঠুকরে খাচ্ছে, তাহলেও তোমরা নিজেদের জায়গা থেকে সরে যাবে না"৷ অতপর যুদ্ধ শুরু হয়ে যায়৷ প্রথম দিকে মুসলমানদের পাল্লা ভারী থাকে৷ এমনকি মুশরিকদের সেনাবাহিনীতে বিশৃংখলা দেখা দেয়৷ তারা বিচ্ছিন্ন –বিক্ষিপ্ত হয়ে পড়তে থাকে৷ কিন্তু এই প্রাথমিক সাফল্যকে পূর্ণ বিজয়ের দ্বারপ্রান্তে পৌছিয়ে দেবার পরিবর্তে গনীমাতের মাল আহরণ করার লোভ মুসলমানদের বশীভূত করে ফেলে৷তারা শত্রু সেনাদের ধন-সম্পদ লুট করতে শুরু করে৷

ওদিকে যে তীরন্দাজদেরকে পেছনে দিকের হেফাজতে নিযুক্ত করা হয়েছিল,তারা যখন দেখতে পেলো শত্রুরা পালিয়ে যাচ্ছে এবং গনীমাতের মাল লুট করা হচ্ছে তখন তারাও নিজেদের জায়গা ছেড়ে গনীমাতের মালের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে৷ হযরত আবদুল্লাহ ইবনে জুবাইর তাদেরকে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কড়া নির্দেশ স্মরণ করিয়ে দিয়ে বার বার বাঁধা দিতে থাকেন৷ কিন্তু মাত্র কয়েকজন ছাড়া কাউকে থামানো যায় নি৷ কাফের সেনাদলের একটি বাহিনীর কমাণ্ডার খালেদ ইবনে অলীদ যথা সময়ে এই সুযোগের সদ্ব্যবহার করেন৷ তিনি নিজের বাহিনী নিয়ে পাহাড়ের পেছন দিক থেকে এক পাক ঘুরে এসে গিরিপথে প্রবেশ করে আক্রমণকরে বসেন৷ আবদুল্লাহ ইবনে জুবাইর তাঁর মাত্র কয়েকজন সংগীকে নিয়ে এই আক্রমণ সামাল দেবার ব্যর্থ চেষ্টা করেন৷ গিরিপথের ব্যুহ ভেদ করে খালেদ তার সেনাদল দিয়ে অকস্মাৎ মুসলমানদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েন৷ খালেদের বাহিনীর এই আক্রমণ পলায়নের কাফের বাহিনীর মনে নতুন আশার সঞ্চার করে৷ তারাও পেছন ফিরে মুসলমানদের ওপর একযোগে আক্রমণ করে বসে৷ এভাবে মুহূর্তের মধ্যে যুদ্ধক্ষেত্রের চেহারা বদলে যায়৷ হঠাৎ এই অপ্রত্যাশিত অবস্থার মুখোমুখি হয়ে মুসলমানরা কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়ে৷ তাদের একটি বড় অংশ বিক্ষিপ্ত হয়ে পলায়নমুখী হয়৷ তবুও কয়েক জন সাহসী সৈন্য তখনো যুদ্ধ ক্ষেত্রে বীর বিক্রমে যুদ্ধ চালিয়ে যেতে থাকেন৷ এমন সময় গুজব ছড়িয়ে পড়ে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম শহীদ হয়ে গেছেন৷ এ গুজবটি সাহাবায়ে কেরামের অবশিষ্ট বাহ্যিক জ্ঞানটুকুও বিলুপ্ত করে দেয়৷ এতক্ষণ যারা ময়দানে লড়ে যাচ্ছিলেন এবার তারাও হিম্মতহারা হয়ে বসে পড়েন৷ এ সময় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের চারপাশে ছিলেন মাত্র দশ বারো জন উৎসর্গীত প্রাণ মুজাহিদ৷ তিনি নিজেও আহত ছিলেন৷ পরিপূর্ণ পরাজয়ে আর কিছুই বাকি ছিল না৷ কিন্তু এই মুহূর্তে সাহাবীগণ জানতে পারলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জীবিত আছেন৷ কাজেই তারা সবদিক থেকে একে একে তাঁর চারদিকে সমবেত হতে থাকে৷ তারা তাঁকে নিরাপদে পর্বতের ওপরে নিয়ে যান৷ এ সময়ের এ বিষয়টি আজো দুর্ব্যেধ্য রয়ে গেছে এবং এ প্রশ্নটির জবাব আজো খুঁজে পাওয়া যায়নি যে,কাফেররা তখন অগ্রবর্তী হয়ে ব্যাপকভাবে আক্রমণ না চালিয়ে কিসের তাড়নায় নিজেরাই মক্কায় ফিরে গিয়েছিল? মুসলমানরা এত বেশী বিক্ষিপ্ত হয়ে পড়েছিলেন যে, তাঁদের পক্ষে পূনর্বার এক জায়গায় একত্র হয়ে যথারীতি যুদ্ধ শুরু করা কঠিন ছিল কাফেররা তাদের বিজয়কে পূর্ণতার প্রান্তসীমায় পৌছাতে উদ্যোগী হলে তাদের সাফল্য লাভ অসম্ভব ব্যাপার ছিল না৷ কিন্তু তারা নিজেরাই বা কেন ময়দানে ছেড়ে চলে গিয়েছিল তা আজো অজানা রয়ে গেছে৷
৯৫. এখানে বনু সাল্‌মা ও বনু হারেসার দিকে ইংগিত করা হয়েছে৷ আবদুল্লাহ ইবনে উবাই ও তার সাথীদের ময়দান থেকে সরে পড়ার কারণে তারা সাহস হারিয়ে ফেলেছিল৷
৯৬. মুসলমানরা যখন দেখলেন, একদিকে শত্রুদের সংখ্যা তিন হাজার আর অন্যদিকে তাঁদের মাত্র এক হাজার থেকেও আবার তিনশো চলে যাচ্ছে, তখন তাদের মনোবল ভেঙে পড়ার উপক্রম হলো৷ সে সময় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁদেরকে একথা বলেছিলেন৷
৯৭. আহত হবার পর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মুখ থেকে কাফেরদের জন্য বদ্‌দোয়া নি:সৃত হয় এবং তিনি বলেনঃ "যে জাতি তার নবীকে আহত করে সে কেমন করে কল্যাণ ও সাফল্য লাভ করেত পারে?" এরি জবাবে এই আয়াত নাযিল হয়৷