(৩:১১০) এখন তোমরাই দুনিয়ায় সর্বোত্তম দল৷ তোমাদের কর্মক্ষেত্রে আনা হয়েছে মানুষের হিদায়াত ও সংস্কার সাধনের জন্য ৷৮৮ তোমরা নেকীর হুকুম দিয়ে থাকো, দুষ্কৃতি থেকে বিরত রাখো এবং আল্লাহর প্রতি ঈমান আনো৷ এই আহলি কিতাবরা ৮৯ ঈমান আনলে তাদের জন্যই ভালো হতো৷ যদিও তাদের মধ্যে কিছু সংখ্যক ঈমানদার পাওয়া যায়, কিন্তু তাদের অধিকাংশই নাফরমান৷
(৩:১১১) এরা তোমাদের কোন ক্ষতি করতে পারে না৷ বড় জোড় কিছু কষ্ট দিতে পারে৷ এরা তোমাদের সাথে যুদ্ধ করলে পৃষ্ঠ প্রদর্শন করবে তারপর এমনি অসহায় হয়ে পড়বে যে কোথাও থেকে কোন সাহায্য পাবে না৷
(৩:১১২) এদের যেখানেই পাওয়া গেছে সেখানেই এদের ওপর লাঞ্জনার মার পড়েছে৷ তবে কোথাও আল্লাহর দায়িত্বে বা মানুষের দায়িত্বে কিছু আশ্রয় মিলে গেলে তা অবশ্যি ভিন্ন কথা,৯০ আল্লাহর গযব এদেরকে ঘিরে ফেলেছে৷ এদের ওপর মুখাপেক্ষীতা ও পরাজয় চাপিয়ে দেয়া হয়েছে ৷ আর এসব কিছুর কারণ হচ্ছে এই যে, এরা আল্লাহর আয়াত অস্বীকার করতে থেকেছে এবং নবীদেরকে অন্যায়ভাবে হত্যা করেছে৷ এসব হচ্ছে এদের নাফরমানি ও বাড়াবাড়ির পরিণাম ৷
(৩:১১৩) কিন্তু সমস্ত আহলি কিতাব এক ধরনের নয়৷ এদের মধ্যে কিছু লোক রয়েছে সত্য পথের ওপর প্রতিষ্ঠিত ৷ তারা রাতে আল্লাহর আয়াত পাঠ করে এবং তাঁর সামনে সিজদানত হয়৷
(৩:১১৪) আল্লাহ ও আখেরাতের দিনের প্রতি ঈমান রাখে৷ সৎকাজের নির্দেশ দেয়, অসৎকাজ থেকে বিরত রাখে এবং কল্যাণ ও নেকীর কাজে তৎপর থাকে৷ এরা সৎলোক ৷
(৩:১১৫) এরা যে সৎকাজই করবে তার অমর্যাদা করা হবে না ৷ আল্লাহ মুত্তাকীদেরকে খুব ভালোভাবেই জানেন ৷
(৩:১১৬) আর যারা কুফরীনীতি অবলম্বন করেছে, আল্লাহর মোকাবিলায় তাদের ধন-সম্পদ কোন কাজে লাগবে না এবং তাদের সন্তান –সন্ততিও ৷ তারা তো আগুনের মধ্যে প্রবেশ করবে এবং সেখানেই তারা থাকবে চিরকাল ৷
(৩:১১৭) তারা তাদের এই দুনিয়ার জীবনে যা কিছু ব্যয় করছে তার উপমা হচ্ছে এমন বাতাস যার মধ্যে আছে তূষার কণা৷ যারা নিজেদের ওপর জুলুম করেছে তাদের শস্যক্ষেতের ওপর দিয়ে এই বাতাস প্রবাহিত হয় এবং তাকে ধ্বংস করে দেয়৷৯১ আল্লাহ তাদের ওপর জুলুম করেননি৷ বরং প্রকৃতপক্ষে এরা নিজেরাই নিজেদের ওপর জুলুম করেছে৷
(৩:১১৮) হে ঈমানদারগণ ! তোমাদের নিজেদের জামায়াতের লোকদের ছাড়া অন্য কাউকে তোমাদের গোপন কথার সাক্ষী করো না৷ তারা তোমাদের দুঃসময়ের সুযোগ গ্রহণ করতে কুণ্ঠিত হয় না৷৯২ যা তোমাদের ক্ষতি করে তাই তাদের কাছে প্রিয় ৷ তাদের মনের হিংসা ও বিদ্বেষ তাদের মুখ থেকে ঝরে পড়ে এবং যা কিছু তারা নিজেদের বুকের মধ্যে লুকিয়ে রেখেছে তা এর চাইতেও মারাত্মক৷ আমি তোমাদের পরিষ্কার হিদায়াত দান করেছি৷ তবে যদি তোমরা বুদ্ধিমান ও ( তাহলে তাদের সাথে সম্পর্ক রাখার সতর্কতা অবলম্বন করবে)৷
(৩:১১৯) তোমরা তাদেরকে ভালোবাসো কিন্তু তারা তোমাদেরকে ভালোবাসে না অথচ তোমরা সমস্ত আসমানী কিতাবকে মানো ৷৯৩ তারা তোমাদের সাথে মিলিত হলে বলে, আমরাও (তোমাদের রসূল ও কিতাবকে) মেনে নিয়েছে৷ কিন্তু তোমাদের থেকে আলাদা হয়ে যাবার পর তোমাদের বিরুদ্ধে তাদের ক্রোধ ও আক্রোশ এতবেশী বেড়ে যায় যে, তারা নিজেদের আঙুল কামড়াতে থাকে৷ তাদেরকে বলে দাও, নিজেদের ক্রোধ ও আক্রোশে তোমরা নিজেরাই জ্বলে পুড়ে মরো৷ আল্লাহ মনের গোপন কথাও জানেন ৷
(৩:১২০) তোমাদের ভালো হলে তাদের খারাপ লাগে এবং তোমাদের ওপর কোন বিপদ এলে তারা খুশী হয়৷ তোমরা যদি সবর করো এবং আল্লাহকে ভয় করে কাজ করতে থাকো, তাহলে তোমাদের বিরুদ্ধে তাদের কোন কৌশল কার্যকর হতে পারে না ৷ তারা যা কিছু করছে আল্লাহ তা চতুর্দিক থেকে বেষ্টন করে আছেন ৷
৮৮. ইতিপূর্বে সূরা বাকারার ১৭ রুকূ'তে যে কথা বলা হয়েছিল এখানেও সেই একই বিষয়বস্তুর অবতারণা করা হয়েছে৷ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অনুসারীদের বলা হচ্ছে, নিজেদের অযোগ্যতার কারণে বনী ইসরাঈলদেরকে দুনিয়ার নেতৃত্ব ও পথপ্রদর্শনের যে আসন থেকে বিচ্যুত করা হয়েছে সেখানে এখন তোমাদেরকে বসিয়ে দেয়া হয়েছে৷ কারণ নৈতিক চরিত্র ও কার্যকলাপের দিক দিয়ে এখন তোমরাই দুনিয়ায় সর্বোত্তম মানব গোষ্ঠী৷ সৎ ও ন্যায়নিষ্ঠ নেতৃত্বের জন্য যেসব গুণাবলীর প্রয়োজন সেগুলো তোমাদের মধ্যে সৃষ্টি হয়ে গেছে৷ অর্থাৎ তোমাদের মধ্যে ন্যায় ও সৎবৃত্তির প্রতিষ্ঠা এবং অন্যায় ও অসৎবৃত্তির মূলোৎপাটন করার মনোভাব ও কর্মস্পৃহা সৃষ্টি হয়ে গেছে৷ আর এই সংগে তোমরা এক ও লা-শরীক আল্লাহকেও বিশ্বাসগত দিক দিয়ে এবং কার্যতও নিজেদের ইলাইহ, রব ও সর্বময় প্রভু বলে স্বীকার করে নিয়েছো৷ কাজেই এ কাজের দায়িত্ব এখন তোমাদের মাথায় চাপিয়ে দেয়া হয়েছে৷ তোমরা নিজেদের দায়িত্ব অনুধাবন করো এবং তোমাদের পূর্ববর্তীরা যেসব ভুল করে গেছে তা থেকে নিজেদেরকে দূরে রাখো ৷ (সূরা বাকারার ১২৩ ও ১৪৪ টীকা ও দেখুন)
৮৯. এখানে আহলি কিতাব বলতে বনী ইসরাঈলকে বুঝানো হয়েছে৷
৯০. অর্থাৎ দুনিয়ার কোথাও যদি তারা কিছুটা শান্তি ও নিরাপত্তা লাভ করে থাকে৷ তাহলে তা তাদের নিজেদের ক্ষমতা বলে অর্জিত হয়নি বরং অন্যের সহায়তা ও অনুগ্রহের ফল৷ কোথাও কোন মুসলিম সরকার আল্লাহর নামে তাদেরকে নিরাপত্তা দান করেছে এবং কোথাও কোন অমুসলিম সরকার নিজস্বভাবে তাদেরকে সহায়তা দান করেছে৷ এভাবে কোন কোন সময় দুনিয়ার কোথাও তারা শক্তিশালী হবার সুযোগও লাভ করেছে৷ কিন্তু তাও নিজের বাহু বলে নয়, বরং নিছক অপরের অনুগ্রহে তথা পরের ধনে পোদ্দারী করার মতো৷
৯১. এই উপমাটিতে শস্যক্ষেত মানে হচ্ছে জীবন ক্ষেত্র৷ আখেরাতে মানুষকে তার এই জীবনক্ষেতের ফসল কাটতে হবে৷ বাতাস বলতে মানুষের বাহ্যিক কল্যাণাকাংখাকে বুঝানো হয়েছে৷ যার ভিত্তিতে কাফেরেরা জনকল্যাণমূলক কাজ এবং দান খয়রাত ইত্যাদিতে অর্থ ব্যয়্ করে থাকে৷ আর তূষারকণা হচ্ছে, সঠিক ঈমান ও আল্লাহর বিধান অনুসৃতির অভাব, যার ফলে তাদের সমগ্র জীবন মিথ্যায় পর্যবসিত হয়৷ এ উপমাটির সাহায্যে আল্লাহ একথা বলতে চাচ্ছেন যে, শস্যক্ষেতের পরিচর্যার ক্ষেত্রে বাতাস যেমন উপকারী তেমনি আবার এই বাতাসের মধ্যে যদি তূষারকণা থাকে তাহলে তা শস্যক্ষেতকে সবুজ শ্যামল করার পরিবর্তে ধ্বংস করে দেয়৷ ঠিক তেমনি দান-খয়রাত যদিও মানুষের আখেরাতের ক্ষেতের পরিচর্যা করে কিন্তু তার মধ্যে কুফরীর বিষ মিশ্রিত থাকলে তা লাভজনক হবার পরিবর্তে মানুষের জন্য ক্ষতিকর হয়ে দাঁড়ায়৷ একথা সুস্পষ্ট যে,মানুষের মালিক হচ্ছেন আল্লাহ এবং মানুষ যে ধন-সম্পদ ব্যয় করছে তার মালিকও আল্লাহ৷ এখন যদি আল্লাহর এই দাস তার মালিকের সার্বভৌম কর্তৃত্ব স্বীকার না করে অথবা তাঁর বন্দেগীর সাথে আর কারো অবৈধ বন্দেগী শরীক করে এবং আল্লাহ প্রদত্ত সম্পদ ব্যয় করে ও তাঁর রাজ্যের মধ্যে চলাফেরা ও বিভিন্ন কাজ কারবার করে তাঁর আইন ও বিধানের আনুগত্য না করে, তাহলে প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত তার এ সমস্ত কাজ অপরাধে পরিণত হয়৷ প্রতিদান-পাওয়া তো দূরের কথা বরং এই সমস্ত অপরাধ তার বিরুদ্ধে ফৌজদারী মামলা দায়ের করার ভিত্তি সরবরাহ করে৷ তার দান খয়রাতের দৃষ্টান্ত হচ্ছেঃ কোন চাকর যেন তার মনিবের অনুমতি ছাড়াই তার অর্থ ভাণ্ডারের দরজা খুলে নিজের ইচ্ছামত যেখানে সংগত মনে করলো সেখানে ব্যয় করে ফেললো৷
৯২. মদীনার আশেপাশে যেসব ইহুদী বাস করতো আওস ও খাযরাজ গোত্রের লোকদের সাথে প্রাচীন কাল থেকে তাদের বন্ধুত্ব চলে আসছিল৷ এ দুই গোত্রের লোকেরা ব্যক্তিগতভাবেও বিভিন্ন ইহুদীরা সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রাখতো এবং গোত্রীয়ভাবেও তারা ছিল পরস্পরের প্রতিবেশী ও সহযোগী৷ আওস ও খাযরাজ গোত্রের লোকেরা মুসলমান হয়ে যাবার পরও ইহুদীদের সাথে তাদের সেই পুরাতন সম্পর্ক বজায় রেখেছিল৷ ব্যক্তিগতভাবেও তারা তাদের পুরাতন ইহুদী বন্ধুদের সাথে আগের মতই প্রীতি ও আন্তরিকতার সাথে মেলামেশা করতো৷ কিন্তু নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও তাঁর মিশনের বিরুদ্ধে ইহুদীদের মধ্যে যে শত্রুতাপূর্ণ মনোভাব সৃষ্টি হয়ে গিয়েছিল তার ফলে তারা এই নতুন আন্দোলনে যোগদানকারী কোন ব্যক্তির সাথে আন্তরিকতাপূর্ণ সম্পর্ক রাখতে প্রস্তুত ছিল না৷ আনসারদের সাথে তারা বাহ্যত আগের সম্পর্ক বজায় রেখেছিল৷ কিন্তু মনে মনে তারা হয়ে গিয়েছিল তাদের চরম শত্রু ৷ ইহুদীরা তাদের এই বাহ্যিক বন্ধুত্বকে অবৈধভাবে ব্যবহার করে মুসলমানদের জামায়াতে অভ্যন্তরীণ ফিত্‌না ও ফাসাদ সৃষ্টি করার এবং তাদের জামায়াতের গোপন বিষয়গুলোর খবর সংগ্রহ করে শত্রুদের হাতে পৌছিয়ে দেবার জন্য সর্বক্ষন প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিল৷ মহান আল্লাহ এখানে তাদের এই মুনাফেকী কর্মনীতি থেকে মুসলমানদের সাবধান থাকার নির্দেশ দিয়েছেন৷
৯৩. অর্থাৎ এটা একটা অদ্ভুত ব্যাপারই বলতে হবে, কোথায় তোমরা তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করবে,তা নয় বরং তারা তোমাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করছে৷ তোমরা তো কুরআনের সাথে তাওরাতকেও মানো, তাই তোমাদের বিরুদ্ধে তাদের অভিযোগ করার কোন যুক্তিসংগত কারণ থাকেত পারে না৷ বরং তাদের বিরুদ্ধে তোমাদের অভিযোগ থাকতে পারতো৷কারণ তারা কুরআনকে মানে না৷