(৩:১০২) হে ঈমানদারগণ ! তোমরা যথাযথভাবে আল্লাহকে ভয় করো৷ মুসলিম থাকা অবস্থায় ছাড়া যেন তোমাদের মৃত্যু না হয়৷৮২
(৩:১০৩) তোমরা সবাই মিলে আল্লাহর রুজ্জু ৮৩ মজবুতভাবে আকঁড়ে ধরো এবং দলাদলি করো না৷ আল্লাহ তোমাদের প্রতি যে অনুগ্রহ করেছেন সে কথা স্মরণ রেখো৷ তোমরা ছিলে পরস্পরের শক্র ৷ তিনি তোমাদের হৃদয়গুলো জুড়ে দিয়েছেন৷ ফলে তাঁর অনুগ্রহ ও মেহেরবানীতে তোমরা ভাই ভাই হয়ে গেছো৷ তোমরা একটি অগ্নিকুণ্ডের কিনারে দাঁড়িয়ে ছিলে৷ আল্লাহ সেখান থেকে তোমাদের বাঁচিয়ে নিয়েছেন ৷৮৪ এভাবেই আল্লাহ তাঁর নির্দশনসমূহ তোমাদের সামনে সুস্পষ্ট করে তুলেন ৷ হয়তো এই নিদর্শনগুলোর মাধ্যমে তোমরা নিজেদের কল্যাণের সোজা সরল পথ দেখতে পাবে৷৮৫
(৩:১০৪) তোমাদের মধ্যে এমন কিছু লোক অবশ্যি থাকতে হবে, যারা নেকী ও সৎকর্মশীলতার দিকে আহবান জানাবে, ভালো কাজের নির্দেশ দেবে ও খারাপ কাজ থেকে বিরত রাখবে৷ যারা এ দায়িত্ব পালন করবে তারাই সফলকাম হবে ৷
(৩:১০৫) তোমরা যেন তাদের মতো হয়ে যেয়ো না, যারা বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়ে গেছে এবং সুস্পষ্ট ও প্রকাশ্য হিদায়াত পাওয়ার পরও মতবিরোধে লিপ্ত হয়েছে৷৮৬ যারা এ নীতি অবলম্বন করেছে তারা সেদিন কঠিন শাস্তি পাবে ৷
(৩:১০৬) যেদিন কিছু লোকের মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠবে এবং কিছু লোকের মুখ কালো হয়ে যাবে৷ তাদেরকে বলা হবে, ঈমানের নিয়ামত লাভ করার পরও তোমরা কুফরী নীতি অবলম্বন করলে ? ঠিক আছে, তাহলে এখন এই নিয়ামত অস্বীকৃতির বিনিময়ে আযাবের স্বাদ গ্রহন করো৷
(৩:১০৭) আর যাদের চেহারা উজ্জ্বল হবে, তারা আল্লাহর রহমতের আশ্রয় লাভ করবে এবং তারা চিরদিন এই অবস্থায় থাকবে৷
(৩:১০৮) এগুলো আল্লাহর বাণী, তোমাকে যথাযথভাবে শুনিয়ে যাচ্ছি৷ কারণ দুনিয়াবাসীদের প্রতি জুলুম করার কোন এরাদা আল্লাহর নেই৷৮৭
(৩:১০৯) আল্লাহ পৃথিবী ও আকাশের সমস্ত জিনিসের মালিক এবং সমস্ত বিষয় আল্লাহর দরবারে পেশ হয়৷
৮২. অর্থাৎ মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত আল্লাহর প্রতি অনুগ্রহ ও বিশ্বস্ত থাকো৷
৮৩. আল্লাহর রজ্জু বলতে তাঁর দীনকে বুঝানো হয়েছে৷ আল্লাহর দীনকে রজ্জুর সাথে তুলনা করার কারণ হচ্ছে এই যে, এটিই এমন একটি সম্পর্ক, যা একদিকে আল্লাহর সাথে ঈমানদারদের সম্পর্ক জুড়ে দেয় এবং অন্যদিকে সমস্ত ঈমানদারদেরকে পরস্পরের সাথে মিলিয়ে এক জামায়াত বদ্ধ করে৷ এই রজ্জুকে মজবুতভাবে আঁকড়ে ধরার মানে হচ্ছে, মুসলমানরা ''দীন" কেই আসল গুরুত্বের অধিকারী মনে করবে,তার ব্যাপারেই আগ্রহ পোষণ করবে, তাকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য প্রচেষ্টা চালাবে এবং তারই খেদমত করার জন্য পরস্পরের সাথে সহযোগিতা করবে৷ যেখানেই মুসলমানরা দীনের মৌলিক শিক্ষা ও দীন প্রতিষ্ঠার লক্ষ থেকে বিচ্যুত হয়ে পড়বে এবং তাদের সমগ্র দৃষ্টি ও আগ্রহ ছোটখাট ও খুঁটিনাটি বিষয়ের প্রতি আকৃষ্ট হবে সেখানেই অনিবার্যভাবে তাদের মধ্যে সে এই প্রকারের দলাদলি ও মতবিরোধ দেখা দেবে, যা ইতিপূর্বে বিভিন্ন নবীর উম্মাতদেরকে তাদের আসল জীবন লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত করে দুনিয়া ও আখেরাতের লাঞ্ছনার আবর্তে নিক্ষেপ করেছিল৷
৮৪. ইসলামের আগমেনর পূর্বে আরববাসীরা যেসব ভয়াবহ অবস্থার সম্মুখীন হয়েছিল, এখানে সেদিকেই ইংগিত করা হয়েছে৷ বিভিন্ন গোত্রের মধ্যে পারস্পরিক শত্রুতা, কথায় কথায় ঝগড়া বিবাদ এবং রাতদিন মারামারি, কাটাকাটি,হানাহানি ও যুদ্ধ-বিগ্রহের কারণে সমগ্র আবর জাতিই ধ্বংসের কবলে নিক্ষিপ্ত হয়েছিল৷ এই আগুনে পুড়ে ভস্মীভুত হওয়া থেকে ইসলামই তাদেরকে রক্ষা করেছিল৷ এই আয়াত নাযিল হওয়ার তিন চার বছর আগেই মদীনার লোকেরা ইসলাম গ্রহণ করেছিল৷ ইসলামের এ জীবন্ত অবদান তারা স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করেছিল৷ তারা দেখছিলঃ আওস ও খাযরাজ দু'টি গোত্রে বছরের পর বছর থেকে শত্রুতা চলে আসছিল৷ তারা ছিল পরস্পরের রক্ত পিপাসু৷ ইসলামের বদৌলতে তারা পরস্পরের মিলে মিশে একাকার হয়ে গিয়েছিল৷ এই গোত্র দু'টি মক্কা থেকে আগত মুহাজিরদের সাথে এমন নজীর বিহীন ত্যাগ ও প্রীতিপূর্ণ ব্যবহার করছিল, যা সাধারণত একই পরিবারের লোকদের নিজেদের মধ্যে করতে দেখা যায় না৷
৮৫. অর্থাৎ যদি তোমাদের সত্যিকার চোখ থেকে থাকে, তাহলে এই আলামতগুলো দেখে তোমরা নিজেরাই আন্দাজ করতে পারবে, কিসে তোমাদের কল্যাণ-এই দীনকে মজবুতভাবে আঁকড়ে ধরার মধ্যে, না একে পরিত্যাগ করে আবার তোমাদের সেই পূর্বের অবস্থায় ফিরে যাওয়ার মধ্যে? তোমাদের আসল কল্যাণকামী কে-আল্লাহ ও তাঁর রসূল না সেই ইহুদী, মুশরিক ও মুনাফিক, যারা তোমাদের আগের অবস্থার ফিরিয়ে নিয়ে যেতে চাইছে?
৮৬. এখানে পুর্ববর্তী নবীদের এমন সব উম্মাতের প্রতি ইংগিত করা হয়েছে, যারা সত্য দীনের সরল ও সুস্পষ্ট শিক্ষা লাভ করেছিল৷ কিন্তু কিছুদিন অতিবাহিত হবার পর দীনের মূল বিষয়গুলো পরিত্যাগ করে দীনের সাথে সম্পর্কবিহীন গৌণ ও অপ্রয়োজনীয় খুঁটিনাটি বিষয়াবলীর ভিত্তিতে নিজেদেরকে একটি আলাদা ধর্মীয় সম্প্রদায় হিসেবে গড়ে তুলতে শুরু করে দিয়েছিল৷ তারপর অবান্তর ও আজেবাজে কথা নিয়ে এমনভাবে কলহে লিপ্ত হয়ে পড়েছিল যে, আল্লাহ তাদের ওপর যে দায়িত্বের বোঝা চাপিয়ে দিয়েছিলেন তার কথাই তারা ভুলে গিয়েছিল এবং বিশ্বাস ও নৈতিকতার যেসব মূলনীতির ওপর আসলে মানুষের সাফল্য ও কল্যাণের ভিত্তি স্থাপিত হয়েছে, তার প্রতি কোন আগ্রহই তাদের ছিল না৷
৮৭. অর্থাৎ যেহেতু আল্লাহ দুনিয়াবাসীদের প্রতি কোন জুলুম করতে চান না তাই তিনি তাদেরকে সোজা পথ দেখিয়ে দিচ্ছেন৷ আবার শেষ পর্যন্ত কোন্ কোন্ বিষয়ে তাদেরকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে সে কথাও পূর্বাহ্ণেই জানিয়ে দিচ্ছেন৷ এরপরও যারা বাঁকা পথ ধরবে এবং নিজেদের ভ্রান্ত কর্মপদ্ধতি পরিহার করবে না, তারা আসলে নিজেরাই নিজেদের ওপর জুলুম করবে৷