(২৮:৮৩) সে আখেরাতের ১০৩ গৃহ তো আমি তাদের জন্য নির্দিষ্ট করে দেবো যারা পৃথিবীতে নিজেদের বড়াই চায় না ১০৪ এবং চায় না বিপর্যয় সৃষ্টি করতে৷১০৫ আর শুভ পরিণাম রয়েছে মুত্তাকীদের জন্যই৷১০৬
(২৮:৮৪) যে কেউ ভাল কাজ নিয়ে আসবে তার জন্য রয়েছে তার চেয়ে ভাল ফল এবং যে কেউ খারাপ কাজ নিয়ে আসে তার জানা উচিৎ যে, অসৎ কর্মশীলরা যেমন কাজ করতো তেমনটিই প্রতিদান পাবে৷
(২৮:৮৫) হে নবী! নিশ্চিত জেনো, যিনি এ কুরআন তোমার ওপর ন্যস্ত করেছেন ১০৭ তিনি তোমাকে একটি উত্তম পরিণতিতে পৌঁছিয়ে দেবেন৷১০৮ তাদেরকে বলে দাও, "আমার রব ভালো করেই জানেন কে হিদায়াত নিয়ে এসেছে এবং কে প্রকাশ্য গোমরাহীতে লিপ্ত রয়েছে৷"
(২৮:৮৬) তুমি মোটেই আশা করোনি যে, তোমার প্রতি কিতাব নাযিল করা হবে৷ এতো নিছক তোমার রবের মেহেবানী (তোমার প্রতি অবতীর্ন হয়েছে)১০৯ কাজেই তুমি কাফেরদের সাহায্যকারী হয়ো না৷১১০
(২৮:৮৭) আর এমনটি যেন কখনো না হয় যে, আল্লাহর আয়াত যখন তোমার প্রতি অবতীর্ণ হয় তখন কাফেররা তোমাকে তা থেকে বিরত রাখে৷১১১ নিজের রবের দিকে দাওয়াত দাও এবং কখনো মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত হয়ো না
(২৮:৮৮) এবং আল্লাহর সাথে অন্য মাবুদদেরকে ডেকো না৷ তিনি ছাড়া আর কোন মাবুদ নেই৷ সব জিনিসই ধ্বংস হবে কেবলমাত্র তাঁর সত্ত্বা ছাড়া৷ শাসন কর্তৃত্ব একমাত্র তাঁরই ১১২ এবং তাঁরই দিকে তোমাদের সবাইকে ফিরে যেতে হবে৷
১০৩. এখানে জান্নাতের কথা বলা হয়েছে, যা প্রকৃত সাফল্যের স্থান হিসেবে চিহ্নিত৷
১০৪. অর্থাৎ, যারা আল্লাহর যমীনে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠার প্রত্যাশী নয়৷ যারা বিদ্রোহী, স্বৈরাচারী ও দাম্ভিক হয়ে নয় বরং বান্দা হয়ে থাকে এবং আল্লাহর বান্দাদেরকে নিজেদের বান্দা করে রাখার চেষ্টা করে না৷
১০৫. 'ফাসাদ' বা বিপর্যয় হচ্ছে মানব জীবন ব্যবস্থার এমন একটি বিকৃতি যা সত্য বিচ্যুত হবার ফলে অনিবার্যভাবে দেখা দেয়৷ আল্লাহর বন্দেগী এবং তাঁর আইন কানুনের আনুগত্যের সীমানা অতিক্রম করে মানুষ যা কিছুই করে সবই হয় প্রথম থেকে শেষ পর্যন্তই বিপর্যয়৷ এর একটি অংশ হচ্ছে এমন ধরনের বিপর্যয়, যা হারাম পথে ধন আহরণ এবং হারাম পথে তা ব্যয় করার ফলে সৃষ্টি হয়৷
১০৬. অর্থাৎ, তাদের জন্য যারা আল্লাহকে ভয় করে এবং তাঁর নাফরমানী করা থেকে দূরে থাকে৷
১০৭. অর্থাৎ, এই কুরআনকে আল্লাহর বান্দাদের কাছে পৌঁছাবার, তাদেরকে এর শিক্ষা দান করার এবং এর পথ নির্দেশনা অনুযায়ী বিশ্ব সংস্কার করার দায়িত্ব তোমার প্রতি অর্পণ করেছেন৷
১০৮. আসল শব্দ --------------------- অর্থাৎ তোমাকে একটি মা'আদের দিকে পৌঁছিয়ে দেবেন৷ মা'আদ এর আভিধানিক অর্থ হচ্ছে এমন স্থান যেদিকে মানুষকে ফিরে যেতে হবে৷ এ শব্দটিকে অনির্দিষ্টবাচক হিসেবে ব্যবহার করার কারনে এর দ্বারা আপনা আপনি এ অর্থ বুঝানো হয় যে, এ স্থানটি বড়ই মহিমন্বিত ও মর্যাদা সম্পন্ন৷ কোন কোন মুফাসসির এর অর্থ করেছেন জান্নাত৷ কিন্তু একে শুধুমাত্র জান্নাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে দেয়ার কোন যুক্তিসংগত কারন নেই৷ আল্লাহ শব্দটিকে যেমন ব্যপক অর্থে বর্ণনা করেছেন তেমনি ব্যাপক অর্থে একে ব্যবহার করাই বাঞ্ছনীয়৷ এর ফলে এ প্রতিশ্রুতি দুনিয়া ও আখেরাত উভয়ের মধ্যে সংশ্লিষ্ট হয়ে যাবে৷ আয়াতের পূর্ববর্তী আলোচনাও এ কথাই দাবী করে যে, একে কেবলমাত্র আখেরাতেই নয় বরং দুনিয়াতেও নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহিওয়া সাল্লামকে বিরাট শান শওকত এবং মাহাত্ন্য ও শ্রেষ্ঠত্ব দান করার প্রতিশ্রুতি মনে করা হোক৷ মক্কার কাফেরদের যে উক্তি নিয়ে ৫৭ আয়াত থেকে এ পর্যন্ত লাগাতার আলোচনা চলছে তাতে তারা বলেছিল, হে মুহাম্মদ! (সাল্লাল্লাহু আলাইহিওয়া সাল্লাম) তুমি নিজের সাথে আমাদেরকেও নিয়ে ডুবাতে চাও৷ যদি আমরা তোমার সাথে সহযোগিতা করি এবং এ ধর্ম গ্রহন করে নিই, তাহলে আরবের সরযমীনে আমাদের বেঁচে থাকা কঠিন হয়ে যাবে৷ এর জবাবে আল্লাহ তাঁর নবীকে বললেন, হে নবী! যে আল্লাহ এ কুরআনের পতাকা বহন করার দায়িত্ব তোমার ওপর অর্পণ করেছেন তিনি তোমাকে ধ্বংস করে দেবেন না৷ বরং তিনি তোমাকে এমন উচ্চ মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করতে চান যার কল্পনাও আজ এরা করতে পারে না৷ আর প্রকৃতপক্ষে আল্লাহ মাত্র কয়েক বছর পর নবী করীম (সা) কে এ দুনিয়ার এদেরই চোখের সামনে সমগ্র আরব দেশে এমন নিরংকুশ কর্তৃত্ব দান করলেন যে, তাঁকে বাধাদানকারী কোন শক্তিই সেখানে টিকতে পারল না এবং তাঁর দীন ছাড়া অন্য কোন দীনের জন্য সেখানে কোন অবকাশই থাকল না৷ আরবের ইতিহাসে এর আগে সমগ্র আরব উপদ্বীপে কোন এক ব্যক্তির একচ্ছত্র আধিপত্যের এ ধরনের কোন নজীর সৃষ্টি হয়নি, যার ফলে সারা দেশে তার কোন প্রতিদ্বন্দী থাকেনি, তার হুকুমের বিরুদ্ধে টু শব্দটি করার ক্ষমতা কেউ রাখেনি এবং লোকেরা কেবল রাজনৈতিকভাবেই তার দলভূক্ত হয়নি বরং সমস্ত দীনকে বিলুপ্ত করে দিয়ে সেই এক ব্যক্তি সবাইকে তার দীনের অনুসারীও করে নিয়েছে৷ কোন কোন মুফাসসির এ অভিমত প্রকাশ করেছেন যে, সূরা কাসাসের এ আয়াতটি মক্কা থেকে মদীনায় হিজরত করার সময় পথে নাযিল হয়েছিল৷ তাঁদের মতে এতে আল্লাহ তাঁর নবীকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে, তিনি আবার তাঁকে মক্কায় ফিরিয়ে আনবেন৷ কিন্তু প্রথমত এর শব্দাবলীর মধ্যে "মা'আদ" কে "মক্কা" অর্থে গ্রহন করার কোন সুযোগ নেই৷ দ্বিতীয়ত বিষয়বস্তু ও আভ্যন্তরীন সাক্ষ্য-প্রমানের দিক দিয়ে বিচার করলে এ সূরাটি হচ্ছে হাব্‌শায় হিজরাতের নিকটবর্তী সময়ের এবং এ কথা বুঝা যাচ্ছে না যে, কয়েক বছর পর মদীনায় হিজরাতের সময় পথে যদি এ আয়াতটি নাযিল হয়ে থাকে তাহলে কোন্‌ সম্পর্কের ভিত্তিতে এখানে এ ধারাবাহিক আলোচনার মধ্যে একে এনে বসিয়ে দেয়া হয়েছে৷ তৃতীয়ত এ প্রেক্ষাপটে মক্কার দিকে নবী করীমের (সা) ফিরে যাবার আলোচনা একেবারেই বেমানান ঠেকে৷ আয়াতের এ অর্থ গ্রহন করা হলে এটা মক্কার কাফেরদের কথার জবাব হবে না বরং তাদের ওজরকে শক্তিশালী করা হবে৷ এর অর্থ হবে, অবশ্যই হে মক্কাবাসীরা! তোমরা ঠিকই বলছো, মুহাম্মদ (সা) কে এ শহর থেকে বের করে দেয়া হবে কিন্তু তিনি স্থায়ীভাবে নির্বাসিত হবেন না বরং শেষ পর্যন্ত আমি তাকে আবার এখানে ফিরিয়ে আনবো৷ এ হাদীসটি যদিও বুখারী, নাসাঈ, ইবনে জারীর ও অন্যান্য মুহাদ্দিসগন ইবনে আব্বাস (রা) থেকে উদ্ধৃত করেছেন কিন্তু আসলে এটি ইবনে আব্বাসের নিজস্ব অভিমত৷ এটি সরাসরি রাসূল (সা) এর বক্তব্য সম্বলিত কোন মারফূ হাদীস নয় যে, একে মেনে নিতেই হবে৷
১০৯. এ কথাটি মুহাম্মদ সল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নবুওয়াতের প্রমান স্বরূপ পেশ করা হচ্ছে ৷মূসা আলাইহিস সালাম এ কথা মোটেই জানতেন না যে, তাঁকে নবী করা হচ্ছে এবং বিরাট দায়িত্ব সম্পাদনে নিযুক্ত করা হচ্ছে৷ তিনি কখনো কল্পনায়ও এ ইচ্ছা বা আশা পোষণ করা তো দূরের কথা কখনো এ বিষয়টি কামনাও করেননি৷ হঠাৎ পথ চলার সময় তাকে ডেকে নেয়া হয় এবং নবীর দায়িত্ব চাপিয়ে দিয়ে তার থেকে বিস্ময়কর কাজ নেয়া হয়, যার সাথে তার পূর্ববর্তী জীবনের কাজের কোন সাদৃশ্যই ছিল না৷ ঠিক একই ঘটনা ঘটে মুহাম্মদ সল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথেও৷ মক্কার লোকেরা নিজেরাই জানতো,হেরা গিরিগৃহা থেকে যেদিন তিনি নবুওয়াতের পয়গাম নিয়ে নেমে আসেন তার মাত্র একদিন আগে পর্যন্ত তার জীবন কি ছিল,তিনি কি কাজ করতেন, কেমন কথাবার্তা বলতেন, তাঁর কথাবার্তার বিষয়বস্তু কি হতো, কোন বিষয়ে তাঁর আগ্রহ ছিল এবং তাঁর তৎপরতা ছিলো কোন ধরনের৷ তাঁর এ সমগ্র জীবন অবশ্যই সত্যতা, বিশ্বস্ততা, আমানতদারী ও পবিত্রতা পরিচ্ছন্নতায় পরিপূর্ণ ছিল৷ সেখানে পরিপূর্ণ ভদ্রতা, শালীনতা, শান্তিপ্রিয়তা, প্রতিশ্রুতি পালন, অধিকার প্রদান ও জনসেবার ভাবধারা অসাধারণ উজ্জ্বল্যে দেদীপ্যমান ছিল৷ কিন্তু সেখানে এমন কোন জিনিস ছিল না যার ভিত্তিতে কেউ এ কথা কল্পনাও করতে পারে যে, এ সদাচারী লোকটি আগামীকাল নবুওয়াতের দাবী নিয়ে এগিয়ে আসবেন৷ তাঁর সাথে যারা নিকটতম সম্পর্ক রাখতো এবং তাঁর আত্নীয়-স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশি ও বন্ধু-বান্ধবদের মধ্যে একজনও এ কথা বলতে পারেনি যে, তিনি পূর্ব থেকেই নবী হবার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন৷ হেরা গিরিগূহার সেই বৈপ্লবিক মূহুর্তের পরে অকস্মাত যেসব বিষয়বস্তু, সমস্যাবলী ও প্রসঙ্গ সম্পর্কে তার বক্তব্য বিবৃতি ও ভাষণ দান শুরু হয়ে যায় ইতিপূর্বে কেউ তার কন্ঠ থেকে কখনো তার একটি বর্ণও শোনেনি৷ কুরআনের আকারে অকস্মাত তাঁর মুখ থেকে যে বিশেষ ভাষা, শব্দ ও পরিভাষা লোকেরা শুনতে থাকে ইতিপূর্বে কখনো তারা তা শোনেনি৷ ইতিপূর্বে কখনো তিনি কোথাও বক্তৃতা ও ওয়াজ-নসিহত করতে দাঁড়াননি৷ কখনো দাওয়াত দিতে ও আন্দোলনের বাণী নিয়ে এগিয়ে আসেননি৷ বরং কখনো তাঁর কোন কর্মতৎপরতা থেকে এ ধারণাই জন্মাতে পারেনি যে, তিনি সামাজিক সমস্যা সমাধান অথবা ধর্মীয় সংশোধন কিংবা নৈতিক ও চারিত্রিক সংস্কার সাধনের জন্য কোন কাজ শুরু করার চিন্তা-ভাবনা করছেন৷ এ বৈপ্লবিক মুহুর্তে সমাগত হবার একদিন আগেও তাঁর জীবন ছিল একজন ব্যবসায়ীর জীবন৷ সাদামাটা ও বৈধপথে রুজি-রোজগার করা, নিজের সন্তান পরিজনদের সাথে হাসিখুশির জীবন-যাপন করা, অতিথি আপ্যায়ন করা, দুঃখী-দরিদ্র জনদের সাহায্য সেবা করা এবং আত্নীয়-স্বজনদের সাথে সদ্ব্যবহার আর কখনো কখনো ইবাদত করার জন্য একান্তে বসে যাওয়া -এই ছিল তার স্বাভাবিক জীবন৷ এ ধরনের একজন লোকের হঠাৎ একদিন বিশ্ব কাঁপানো বাগ্মীতা নিয়ে ময়দানে নেমে আসা, একটি বিপ্লবাত্মক দাওয়াতের কাজ শুরু করে দেয়া, একটি অভিনব সাহিত্য সৃষ্টি করা এবং একটি স্বতন্ত্র জীবন দর্শন চিন্তোধারা ও নৈতিক ও সাংস্কৃতিক বিধান নিয়ে সামনে এগিয়ে আসা, এতবড় একটি পরিবর্তন, যা মানবিক মনস্তত্বের দৃষ্টিতে কোন প্রকার কৃত্রিমতা, প্রস্তুতি ও ইচ্ছাকৃত প্রচেষ্টার মাধ্যমে কখনোই আত্নপ্রকাশ করতে পারে না৷ কারণ এ ধরনের প্রত্যেকটি প্রচেষ্টা ও প্রস্তুতি অবশ্যই পর্যায়ক্রমিক ক্রমোন্নতির স্তর অতিক্রম করে এবং যাদের মধ্যে মানুষ রাত্রি- দিন জীবন-যাপন করে এ পর্যায় ও স্তর কখনো তাদের চোখের আড়ালে থাকতে পারে না৷ নবী সল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর জীবন যদি এ পর্যায়গুলো অতিক্রম করে থাকতো তাহলে মক্কার হাজার হাজার লোক বলতো, আমরা না আগেই বলেছিলাম এ ব্যক্তি একদিন কোন বড় আকারের দাবী করে বসবে৷ কিন্তু ইতিহাস সাক্ষী, মক্কার কাফেররা তাঁর বিরুদ্ধে সব ধরনের অভিযোগ আনলেও এ অভিযোগটি তাদের একজনও উত্থাপন করেননি৷

তারপর তিনি নিজেও নবুওয়াতের প্রত্যাশী ছিলেন না৷ অথবা তা কামনা করতেন না এবং সেজন্য অপেক্ষাও করছিলেন না৷ বরং সম্পূর্ণ অজ্ঞাতসারে অবস্মাত তিনি এ বিষয়টির মুখোমুখি হলেন৷ বিভিন্ন হাদীসে অহীর সূত্রপাতের অবস্থা বর্ণনা প্রসঙ্গে যে ঘটনা উদ্ধৃত হয়েছে তা থেকে এর প্রমান পাওয়া যায়৷ জিব্রীলের সাথে প্রথম সাক্ষাত এবং সূরা আলাকের প্রাথমিক আয়াতগুলো নাযিল হওয়ার পর তিনি হেরা গূহা থেকে ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে গৃহে পৌঁছেছিলেন৷ গৃহের লোকদের বলেছিলেন, "আমাকে ঢেকে দাও, আমাকে ঢেকে দাও৷" কিছুক্ষণ পরে ভীতির অবস্থা কিছুটা দূর হয়ে গেলে নিজের জীবন সঙ্গীনিকে সব অবস্থা খুলে বললেন৷ এ প্রসঙ্গে তাঁকে বললেন, "আমি নিজের প্রাণের ভয় করছি৷" স্ত্রী সংগে সংগেই জবাব দিলেন, "মোটেই না, আল্লাহ আপনাকে কখনো কষ্ট দেবেন না৷ আপনি আত্নীয়দের হক আদায় করেন৷ অসহায়কে সাহায্য করেন৷ অভাবী দরিদ্রকে সহায়তা দেন৷ অতিথি আপ্যায়ন করেন৷ প্রত্যেক ভাল কাজে সাহায্য করতে প্রস্তুত থাকেন৷" তারপর তিনি তাঁকে নিয়ে নিজের চাচাতো ভাই ও আহলে কিতাবদের একজন অভিজ্ঞ আলেম ও সদাচারী ব্যক্তি ওয়ারাকাহ ইবনে নওফালের কাছে গেলন৷ তাঁর কাছ থেকে পুরো ঘটনা শোনার পর ওয়ারাকাহ বললেন, "আপনার কাছে যিনি এসেছিলেন তিনি ছিলেন সেই একই আসমানী দূত বা নামূস (বিশেষ কাজে নিযুক্ত নির্দিষ্ট ফেরেশতা) যিনি মূসার (আ) কাছে এসেছিলেন৷ হায়! যদি আমি যুবক হতাম এবং সে সময় পর্যন্ত জীবিত থাকতাম যখন আপনার সম্প্রদায় আপনাকে বহিস্কার করবে৷" তিনি জিজ্ঞেস করলেন, "এরা কি আমাকে বের করে দেবে?" জবাব দিলেন, "হ্যাঁ আজ পর্যন্ত এক ব্যক্তিও এমন অতিক্রান্ত হননি, যিনি এ ধরনের বাণী বহন করে এনেছেন, এবং লোকেরা তাঁর দুশমনে পরিণত হয়নি৷

এ সমগ্র ঘটনাটি এমন একটি অবস্থার ছবি তুলে ধরে, যা একজন সরল মানুষ একটি অপ্রত্যাশিত ও চরম স্বাভাবিক অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হলে তার জীবনে দেখা দিতে পারে৷ যদি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রথম থেকেই নবী হবার চিন্তা করতেন, নিজের সম্পর্কে চিন্তা করতেন যে, তাঁর মতো মানুষের নবী হওয়া উচিত এবং কবে কোন ফেরেশতা তাঁর কাছে পয়গাম নিয়ে আসবে তারই প্রতীক্ষায় ধ্যান সাধনা করে নিজের মনের ওপর চাপ প্রয়োগ করতেন, তাহলে হেরা গূহার ঘটনাটি সংঘটিত হবার সাথে সাথেই তিনি আনন্দে উৎফুল্ল হয়ে উঠতেন এবং বলিষ্ঠ মনোবল নিয়ে বিরাট দাবী সহকারে পাহাড় থেকে নামতেন, তারপর সোজা নিজের সম্প্রদায়ের লোকদের কাছে পৌঁছে নিজের নবুওয়াতের ঘোষনা দিতেন৷ কিন্তু এখানে এর সম্পূর্ণ বিপরীত অবস্থা পরিদৃষ্ট হয়৷ তিনি যা কিছু দেখেন তাতে বিস্মিত ও কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়েন৷ ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে ঘরে পৌঁছেন৷ লেপ মুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়েন৷ মনটা একটু শান্ত হলে চুপি চুপি স্ত্রীকে বলেন, আজ গুহার নিসংগতায় এ ধরনের একটি ঘটনা ঘটে গেছে৷ জানি না কি হবে৷ আমার প্রান নিরাপদ নয় মনে হচ্ছে৷ নবুওয়াত প্রার্থীর অবস্থা থেকে এ অবস্থা কত ভিন্নতর৷

তারপর স্বামীর জীবন, তার অবস্থা ও চিন্তাধারা সম্পর্কে স্ত্রীর চেয়ে বেশি আর কে জানতে পারে? যদি তিনি পূর্বাহ্নেই এ অভিজ্ঞতা লাভ করে থাকতেন যে, তাঁর স্বামী হচ্ছেন নবুওয়াতের প্রার্থী, তিনি সার্বক্ষণ ফেরেশতাদের আগমনের প্রতীক্ষা করছেন,তাহলে তার জবাব কখনো হযরত খাদিজার (রা) জবাবের অনুরূপ হতো না৷ বরং তিনি বলতেনঃ হে স্বামী! ভয় পাও কেন? দীর্ঘদিন থেকে যে জিনিসের প্রত্যাশী ছিলে তা পেয়ে গেছো৷ চলো, এবার পীর গীরির দোকান পাঠ সাজাও৷ আমি মানত, নাজরানা ইত্যাদি সামলানোর প্রস্তুতি নিচ্ছি৷ কিন্তু পনের বছরের দাম্পত্য জীবনে তিনি স্বামীর জীবনের যে চেহারা দেখেছিলেন তার ভিত্তিতে একথা বুঝতে তার এক মুহুর্তও দেরী হয়নি যে,এমন সৎ, ত্যাগী ও নির্লোভ ব্যক্তির কাছে শয়তান আসতে পারে না, আল্লাহ তাঁকে কোন বড় পরীক্ষার সম্মুখীনও করতে পারেন না বরং তিনি যা কিছু দেখেছেন তা নির্জালা সত্য ছাড়া আর কিছুই নয়৷

ওয়ারকাহ ইবনে নওফালের ব্যাপারে একই কথা৷ তিনি কোন বাইরের লোক ছিলেন না৷ বরং তিনি ছিলেন নবী করীম (সা) এর ভ্রাতৃসমাজের অন্তরভূক্ত এবং নিকটতম আত্মীয়তার প্রেক্ষিতে তাঁর শ্যালক৷ তারপর একজন ঈসায়ী আলেম হবার ফলে নবুওয়াত, কিতাব ও অহীকে কৃত্রিমতা বানোয়াট থেকে বাছাই করার ক্ষমতা রাখতেন৷ বয়সে অনেক বড় হবার কারণে নবীর (সা) শৈশব থেকে সে সময় পর্যন্ত সমগ্র জীবন তার সামনে ছিল৷ তিনিও তাঁর মুখ থেকে হেরা গূহার সমস্ত ঘটনা আনুপূর্বিক শোনার পর সংগে সংগেই বলে ওঠেন, এ আগমনকারী নিশ্চিতভাবেই সেই একই ফেরেশতা হবেন যিনি হযরত মূসার (আ) কাছে অহী নিয়ে আসতেন৷ কারণ হযরত মুসা (আ) সাথে যা ঘটেছিল এখানেও সেই একই ঘটনা ঘটেছে৷ অর্থাৎ একজন অত্যন্ত পবিত্র পরিচ্ছন্ন চরিত্রের অধিকারী সহজ সরল মানুষ, মাথায় কোন প্রকার পূর্ব চিন্তা বা পরিকল্পনা নেই, নবুওয়াতের চিন্তায় ডুবে থাকা তো দূরের কথা তা অর্জন করার কল্পনাও কোনদিন তাঁর মনে জাগেনি এবং অকস্মাত তিনি পূর্ণ সচেতন অবস্থায় প্রকাশ্যে এ অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হন৷ এ জিনিসটি তাঁকে দুই আর দু'ইয়ের চারের মতো নির্দ্ধিধায় নিশ্চতভাবেই এ সিদ্ধান্তে পৌঁছিয়ে দেয় যে, এখানে কোন প্রবৃত্তির প্ররোচনা বা শয়তানী ছল চাতুরী নেই৷ বরং এ সত্যাশ্রয়ী মানুষটি নিজের কোন প্রকার ইচ্ছা-আকাংখা ছাড়াই যা কিছু দেখেছেন তা আসলে প্রকৃত সত্যদর্শন ছাড়া আর কিছু নয়৷

এটি মুহাম্মদ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নবুওয়াতের এমন একটি সুস্পষ্ট ও জ্বাজ্জ্বল্যমান প্রমান যে, একজন সত্যপ্রিয় মানুষের পক্ষে তা প্রমান করা কঠিন৷ তাই কুরআনে বিভিন্ন জায়গায় এ জিনিসটিকে নবুওয়াতের প্রমাণ হিসেবে পেশ করা হয়েছে৷ যেমন সূরা ইউনুসে বলা হয়েছেঃ -------------------------------------------------------------------------------------------- "হে নবী! তাদেরকে বলে দাও, যদি আল্লাহ এটা না চাইতেন, তাহলে আমি কখনো এ কুরআন তোমাদের শুনাতাম না বরং এর খবরও তোমাদের দিতাম না৷ ইতিপূর্বে আমি তোমাদের মধ্যে আমার জীবনের দীর্ঘকাল অতিবাহিত করেছি, তোমরা কি এতটুকু কথাও বোঝো না?" (ইউনুসঃ ১৬ আয়াত)

আর সূরা আশ্‌-শূরায় বলা হয়েছে,

"হে নবী! তুমি তো জানতেও না কিতাব কি এবং ঈমান কি৷ কিন্তু আমি এ অহীকে একটি আলোয় পরিণত করে দিয়েছি৷ যার সাহায্যে আমি নিজের বান্দাদের মধ্য থেকে যাকে চাই তাকে পথ দেখাই৷" (আশ্‌-শূরাঃ ৫২ আয়াত)

[আরো বেশি ব্যাখ্যার জন্য দেখুন তাফহীমুল কুআন, সূরা ইউনুস ২১, আনকাবুত ৮৮-৯২ এবং শূরা ৮৪ টীকা৷]
১১০. অর্থাৎ আল্লাহ যখন না চাইতেই তোমাদের এ নিয়ামত দান করেছেন তখন তোমাদের কর্তব্য হচ্ছে, তোমাদের সমস্ত শক্তি ও শ্রম এর পতাকা বহন করার এবং এর প্রচার ও প্রসারের কাজে ব্যয় করবে এ কাজে ত্রুটি ও গাফলতি করার মানে হবে তোমরা সত্যের পরিবর্তে সত্য অস্বীকারকারীদেরকে সাহায্য করেছো৷ এর অর্থ এ নয় , নাউযুবিল্লাহ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের এ ধরনের কোন ভুলের আশংকা ছিল৷ বরং এভাবে আল্লাহ কাফেরদেরকে শুনিয়ে শুনিয়ে নিজের নবীকে এ হিদায়াত দান করছেন যে, এদের শোরগোল ও বিরোধিতা সত্ত্বেও তুমি নিজের কাজ করে যাও এবং তোমার এ দাওয়াতের ফলে সত্যের দুশমনরা তাদের জাতীয় স্বার্থ বিঘ্নিত হবার যেসব আশংকা প্রকাশ করে তার পরোয়া করার কোন প্রয়োজন নেই৷
১১১. অর্থাৎ, সেগুলোর প্রচার ও প্রসার থেকে এবং সে অনুযায়ী কাজ করা থেকে৷
১১২. এ অর্থও হতে পারে, শাসন কর্তৃত্ব তাঁরই জন্য অর্থাৎ, একমাত্র তিনিই তার অধিকার রাখেন৷