(২৮:২৯) মূসা যখন মেয়াদ পূর্ণ করে দিল, ৪০ এবং নিজের পরিবার পরিজন নিয়ে চললো তখন তূর পাহাড়ের দিক থেকে একটি আগুন দেখতে পেলো৷ ৪১ সে তার পরিবারবর্গকে বললো, "থামো! আমি একটি আগুন দেখছি, হয়তো আমি সেখান থেকে কোন খবর আনতে পারি অথবা সেই আগুন থেকে কোন অংগারই নিয়ে আসতে পারি যাতে তোমরা আগুন পোহাতে পারো৷"
(২৮:৩০) সেখানে পৌঁছার পর উপত্যকার ডান কিনারায় ৪২ পবিত্র ভূখণ্ডে ৪৩ একটি বৃক্ষ থেকে আহ্বান এলো, "হে মূসা! আমিই আল্লাহ৷ সমগ্র বিশ্বের অধিপতি৷"
(২৮:৩১) আর (হুকুম দেয়া হলো) ছুঁড়ে দাও তোমার লাঠিটি৷ যখনই মূসা দেখলো লাঠিটি সাপের মতো মোচড় খাচ্ছে তখনই সে পেছন ফিরে ছুটতে লাগলো এবং একবার ফিরেও তাকালো না৷ বলা হলো,"হে মূসা! ফিরে এসো এবং ভয় করো না, তুমি সম্পূর্ন নিরাপদ৷
(২৮:৩২) তোমার হাত বগলে রাখো উজ্জল হয়ে বের হয়ে আসবে কোন প্রকার কষ্ট ছাড়াই৷ ৪৪ এবং ভীতিমুক্ত হবার জন্য নিজের হাত দু'টি চেপে ধরো৷ ৪৫ এ দু'টি উজ্জল নিদর্শন তোমার রবের পক্ষ থেকে ফেরাউন ও তার সভাসদদের সামনে পেশ করার জন্য, তারা বড়ই নাফরমান৷" ৪৬
(২৮:৩৩) মূসা নিবেদন করলো, "হে আমার প্রভু! আমি যে তাদের একজন লোককে হত্যা করে ফেলেছি, ভয় হচ্ছে, তারা আমাকে মেরে ফেলবে৷ ৪৭
(২৮:৩৪) আর আমার ভাই হারূন আমার চেয় বেশী বাকপটু, তাকে সাহায্যকারী হিসেবে আমার সাথে পাঠাও, যাতে সে আমাকে সমর্থন দেয়, আমার ভয় হচ্ছে, তারা আমার প্রতি মিথ্যা আরোপ করবে৷"
(২৮:৩৫) বললেন, তোমার ভাইয়ের সাহায্যে আমি তোমার শক্তি বৃদ্ধি করবো এবং তোমাদের দু'জনকে এমনই প্রতিপত্তি দান করবো যে, তারা তোমাদের কোন ক্ষতি করতে পারবে না৷ আমার নিদর্শনগুলোর জোরে তোমার ও তোমাদের অনুসারীরাই বিজয় লাভ করবে৷" ৪৮
(২৮:৩৬) তারপর মূসা যখন তাদের কাছে আমার সুস্পষ্ট নিদর্শনগুলো নিয়ে পৌঁছুলো তখন তারা বললো, এসব বানোয়াট যাদু ছাড়া আর কিছুই নয়৷ ৪৯ আর এসব কথা তো আমরা আমাদের বাপ দাদার কালে কখনো শুনিনি৷ ৫০
(২৮:৩৭) মূসা জবাব দিল, "আমার রব তার অবস্থা ভালো জানেন, যে তার পক্ষ থেকে পথ নির্দেশনা নিয়ে এসেছে এবং কার শেষ পরিণতি ভালো হবে তাও তিনিই ভালো জানেন, আসলে জালেম কখনো সফলকাম হয় না৷" ৫১
(২৮:৩৮) আর ফেরাউন বললো, "হে সভাসদবর্গ! তো আমি নিজেকে ছাড়া তোমাদের আর কোন প্রভু আছে বলে জানি না৷ ৫২ ওহে হামান! আমার জন্য ইঁট পুড়িয়ে একটি উঁচু প্রাসাদ তৈরি করো, হয়তো তাতে উঠে আমি মূসার প্রভুকে দেখতে পাবো, আমিতো তাকে মিথ্যুক মনে করি৷" ৫৩
(২৮:৩৯) সে এবং তার সৈন্যরা পৃথিবীতে কোন সত্য ছাড়াই নিজেদের শ্রেষ্ঠত্বের অহংকার করলো ৫৪ এবং মনে করলো তাদের কখনো আমার কাছে ফিরে আসতে হবে না৷ ৫৫
(২৮:৪০) শেষে আমি তাকে ও তার সৈন্যদেরকে পাকড়াও করলাম এবং সাগরে নিক্ষেপ করলাম৷৫৬ এমন এ জালেমদের পরিণাম কি হয়েছে দেখে নাও৷
(২৮:৪১) তাদেরকে আমি জাহান্নামের দিকে আহবানকারী নেতা করেছিলাম ৫৭ এবং কিয়ামতের দিন তারা কোথাও থেকে কোন সাহায্য লাভ করতে পারবে না৷
(২৮:৪২) এ দুনিয়ায় আমি তাদের পেছনে লাগিয়ে দিয়েছি অভিসম্পাত এবং কিয়ামতের দিন তারা হবে বড়ই ঘৃণার্হ ও ধিকৃত৷৫৮
৪০. হাসান ইবনে আলী ইবনে আবু তালেব রাদিয়াল্লাহু আনহুমা বলেন, মূসা (আ) আট বছরের জায়গায় দশ বছরের মেয়াদ পুরা করেছিলেন৷ ইবনে আব্বাসের বর্ণনা মতে এ বক্তব্যটি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণিত হয়েছে৷ তিনি বলেছেন, "মূসা আলাইহিস সালাম দু'টি মেয়াদের মধ্য থেকে যেটি বেশী পরিপূর্ণ এবং তাঁর শ্বশুরের জন্য বেশী সন্তোষজনক সেটি পূর্ণ করেছিলেন অর্থাৎ দশ বছর৷"
৪১. এ সফরে মূসার তূর পাহাড়ের দিকে যাওয়া দেখে অনুমান করা যায় তিনি পরিবার পরিজন নিয়ে সম্ভবত মিসরের দিকে যেতে চাচ্ছিলেন৷ কারণ মাদয়ান থেকে মিসরের দিকে যে পথটি গেছে তূর পাহাড় তার উপর অবস্থিত৷ সম্ভবত মূসা মনে করে থাকবেন, দশটি বছর চলে গেছে, যে ফেরাউনের শাসনামলে তিনি মিসর থেকে বের হয়েছিলেন সে মারা গেছে, এখন যদি আমি নীরবে সেখানে চলে যাই এবং নিজের পরিবারের লোকজনদের সাথে অবস্থান করতে থাকি তাহলে হয়তো আমার কথা কেউ জানতেই পারবে না৷
৪২. অর্থাৎ মূসার ডান হাতের দিকে যে কিনারা ছিল সেই কিনারায়৷
৪৩. অর্থাৎ, আল্লাহর দ্যুতির আলোকে যে ভূখণ্ড আলোকিত হচ্ছিল৷
৪৪. এ মু'জিযা দু'টি তখন মূসাকে দেখানোর কারণ হচ্ছে, প্রথমত যাতে তার মনে পূর্ণ বিশ্বাস জন্মে যে প্রকৃতপক্ষে যে সত্তা বিশ্ব-জাহানের সমগ্র ব্যবস্থার স্রষ্টা , অধিপতি , শাসক ও পরিচালক তিনিই তাঁর সাথে কথা বলছেন৷ দ্বিতীয়ত এ মু'জিযাগুলো দেখে তিনি এ মর্মে নিশ্চিন্ত হয়ে যাবেন যে, তাঁকে ফেরাউনের কাছে যে ভয়াবহ দায়িত্ব দিয়ে পাঠানো হচ্ছে সেখানে তিনি একেবারে খালি হাতে তার মুখোমুখি হবেন না বরং প্রচণ্ড শক্তিশালী অস্ত্র নিয়ে যাবেন৷
৪৫. অর্থাৎ যখন কোন ভয়াবহ মুহূর্ত আসে, যার ফলে তোমার মনে ভীতির সঞ্চার হয় তখন নিজের বাহু চেপে ধরো৷ এর ফলে তোমার মন শক্তিশালী হবে এবং ভীতি ও আশংকার কোন রেশই তোমার মধ্যে থাকবে না৷

বাহু বা হাত বলতে সম্ভবত ডান হাত বুঝানো হয়েছে৷ কারন সাধারনভাবে হাত বললে ডান হাতই বুঝানো হয়৷ চেপে ধরা দু'রকম হতে পারে৷ এক, হাত পার্শ্বদেশের সাথে লাপিয়ে চাপ দেওয়া৷ দুই, এক হাতকে অন্য হাতের বগলের মধ্যে রেখে চাপ দেয়া৷ এখানে প্রথম অবস্থাটি প্রযোজ্য হবার সম্ভাবনা বেশি৷ কারন এ অবস্থায় অন্য কোন ব্যক্তি অনুভব করতে পারবে না যে, এ ব্যক্তি মনের ভয় দূর করার জন্য কোন বিশেষ কাজ করছে৷

হযরত মূসাকে যেহেতু একটি জালেম সরকারের মোকাবিলা করার জন্য কোন সৈন্য সামন্ত ও পার্থিব সাজ-সরঞ্জাম ছাড়াই পাঠানো হচ্ছিলো তাই তাকে এ ব্যবস্থা অবলম্বন করতে বলা হয়৷ বার বার এমন ভয়ানক ঘটনা ঘটতে যাচ্ছিলো যাতে একজন মহান দৃঢ়চেতা নবীও আতংকমুক্ত থাকতে পারতেন না৷ মহান আল্লাহ বলেন, এ ধরনের কোন অবস্থা দেখা দিলে তুমি স্রেফ এ কাজটি করো, ফেরাউন তার সমগ্র রাষ্ট্রশক্তি ব্যবহার করেও তোমার মনের জোর শিথিল করতে পারবে না৷
৪৬. এ শব্দগুলোর মধ্যে এ বক্তব্য নিহিত রয়েছে যে, এ নিদর্শনগুলো নিয়ে ফেরাউনের কাছে যাও এবং আল্লাহর রসূল হিসেবে নিজেকে পেশ করে তাকে ও তার রাষ্ট্রীয় প্রশাসকবৃন্দকে আল্লাহ রব্বুল আলামীনের আনুগত্য ও বন্দেগীর দিকে আহবান জানাও৷ তাই এখানে তাঁর ও নিযুক্তির বিষয়টি সুস্পষ্ট ও বিস্তারিত বলা হয়নি৷ তবে কুরআনের অন্যান্য স্থানে এ বিষয়টি সুস্পষ্টভাবে বর্ণনা করা হয়েছে৷ যেমন সূরা ত্ব-হা ও সূরা নাযি'আতে বলা হয়েছে -------------------- ফেরাউনের কাছে যাও, সে বিদ্রোহী হয়ে গেছে"

সূরা আশ শূরায় বলা হয়েছে :

"যখন তোমার রব মূসাকে ডেকে বললেন, যাও জালেম জাতির কাছে, ফেরাউনের জাতির কাছে৷"
৪৭. এর অর্থ এ ছিল না যে, এ ভয়ে আমি সেখানে যেতে চাই না৷ বরং অর্থ ছিল, আপনার পক্ষ থেকে এমন কোন ব্যবস্থা থাকা দরকার যার ফলে আমার সেখানে পৌঁছার সাথে সাথেই কোন প্রকার কথাবার্তা ও রিসালাতের দায়িত্বপালন করার আগেই তারা যেন আমাকে হত্যার অপরাধে গ্রেফতার করে না নেয়৷ কারণ এ অবস্থায় তো আমাকে যে উদ্দেশ্যে এ অভিযানে সেখানে পাঠানো হচ্ছে তা ব্যর্থ হয়ে যাবে ৷ পরবর্তী ইবারত থেকে একথ স্বত:স্ফূতভাবে সুস্পষ্ট হয়ে যায় যে, মূসার এ আবেদনের উদ্দেশ্য মোটেই এরূপ ছিল না যে, তিনি ভয়ে নবুওয়াতের দায়িত্ব গ্রহণ এবং ফেরাউনের কাছে যেতে অস্বীকার করতে চাচ্ছিলেন৷
৪৮. আল্লাহর সাথে হযরত মূসার এ সাক্ষাত ও কথাবার্তার অবস্থা এর চাইতেও বিস্তারিতভাবে সূরা ত্ব-হার ৯ থেকে ৪৮ আয়াতে বর্ণনা করা হয়েছে৷ কুরআন মজীদ এ ব্যাপারে যে বর্ণনা দিয়েছে তাকে যে ব্যক্তি বাইবেলের যাত্রা পুস্তকের ৩ ও ৪ অধ্যায়ের এতদ সংক্রান্ত বর্ণনার সাথে তুলনা করবে, সে যদি কিছুটা ভারসাম্যপূর্ন রুচির অধিকারী হয়ে থাকে তাহলে এ দুয়ের মধ্য থেকে কোনটি আল্লাহর কালাম এবং কোনটি মানুষের তৈরি গল্প বলা যাবে তা সে নিজেই উপলদ্ধি করতে পারবে৷ তাছাড়া কুরআনের এ বর্ণনা নাউযুবিল্লাহ বাইবেল ও ইসরাঈলী বর্ণনা থেকে নকল করা হয়েছে, না যে আল্লাহ হযরত মূসাকে তাঁর সাথে সাক্ষাত করিয়েছিলেন তিনি নিজেই আসল ঘটনা বর্ননা করেছেন, এ ব্যাপারে সে সহজে নিজের মত স্থির করতে পারবে৷ (আরো বেশি জানতে হলে দেখুন তাফহীমূল কুরআন, সূরা ত্ব-হা, ১৯ টীকা)৷
৪৯. মূলে বলা হয়েছে ......... "বানোয়াট যাদু"৷ এ বানোয়াটকে যদি মিথ্যা অর্থে ধরা হয় তাহলে এর অর্থ হবে, এ লাঠির সাপে পরিণত হওয়া এবং হাতের ঔজ্জ্বল্য বিকীরণ করা মূল জিনিসের প্রকৃত পরিবর্তন নয় বরং এটা হচ্ছে নিছক একটি লোক দেখানো প্রতারণামূলক কৌশল, একে মু'জিযা বলে এ ব্যক্তি আমাদের ধোঁকা দিচ্ছে৷ আর যদি একে বানোয়াট অর্থে গ্রহণ করা হয়, তাহলে এর অর্থ হবে, এ ব্যক্তি কোন কৌশল অবলম্বন করে এমন একটি জিনিস তৈরী করে এনেছে , যা দেখতে লাঠির মতো কিন্তু যখন সে সেটাকে ছুঁড়ে দেয় তখন সাপের মতো দেখায়৷ আর নিজের হাতেও সে এমন কিছু জিনিস মাখিয়ে নিয়েছে যার ফলে তা বগল থেকে বের হবার পর হঠাৎ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে৷ এ কৃত্রিম যাদু সে নিজেই তৈরী করেছে কিন্তু আমাদের নিশ্চয়তা দিচ্ছে এ বলে যে, এটি আল্লাহ প্রদত্ত একটি মু'জিযা৷
৫০. রিসালাতের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে মূসা যেসব কথা বলেছিলেন সে দিকে ইংগিত করা হয়েছে৷ কুরআনের অন্যান্য জায়গায় এগুলোর বিস্তারিত বিবরণ এসেছে৷ আন-নাযি'আতে বলা হয়েছে, মূসা তাকে বলেন :.................................
৫১. অর্থাৎ তুমি আমাকে যাদুকর ও মিথ্যুক গণ্য করছো কিন্তু আমার রব আমার অবস্থা ভালো জানেন৷ তিনি জানেন তাঁর পক্ষ থেকে যাকে রসূল নিযুক্ত করা হয়েছে সে কেমন লোক৷ পরিণামের ফায়সালা তাঁরই হাতে রয়েছে৷ আমি মিথ্যুক হলে আমার পরিণাম খারাপ হবে এবং তুমি মিথ্যুক হলে ভালোভাবে জেনে রাখো তোমার পরিণাম ভালো হবে না৷ মোট কথা জালেমের মুক্তি নেই, এ সত্য অপরিবর্তনীয়৷ যে ব্যক্তি আল্লাহর রসূল নয় এবং মিথ্যা রসূল সেজে নিজের কোন স্বার্থোদ্ধার করতে চায় সেও জালেম এবং সেও মুক্তি ও সাফল্য থেকে বঞ্চিত থাকবে৷ আর যে ব্যক্তি নানা ধরনের মিথ্যা অপবাদ দিয়ে সত্য রসূলকে মিথ্যা বলে এবং ধোঁকাবাজদের সাহায্যে সত্যকে দমন করতে চায় সেও জালেম এবং সেও কখনো মুক্তি ও সাফল্য লাভ করবে না৷
৫২. "এ উক্তির মাধ্যমে ফেরাউন যে বক্তব্য পেশ করেছে তার অর্থ এ ছিল না এবং এ হতেও পারত না যে, আমিই তোমাদের এবং পৃথিবী ও আকাশের স্রষ্টা৷ কারন কেবলমাত্র কোন পাগলের মুখ দিয়েই এমন কথা বের হতে পারত৷ অনুরূপভাবে এ অর্থ এও ছিল না এবং হতে পারত না যে, আমি ছাড়া তোমাদের আর কোন মাবুদ নেই৷ কারন মিশরবাসীরা বহু দেবতার পুজা করত এবং স্বয়ং ফেরাউনকেই যেভাবে উপাস্যের মর্যাদা দেয়া হয়েছিল তাও শুধূমাত্র এই ছিল যে, তাকে সূর্য দেবতার অবতার হিসেবে স্বীকার করা হতো৷ সবচেয়ে বড় সাক্ষী কুরআন মজীদ নিজেই৷ কুরআনে বলা হয়েছে ফেরাউন নিজে বহু দেবতার পূজারী ছিলঃ

"আর ফেরাউনের জাতির সরদাররা বলল, তুমি কি মুসা ও তার জাতিকে অবাধ ছাড়পত্র দিয়ে দেবে যে, তারা দেশে বিপর্যয় সৃষ্টি করুক এবং তোমাকে ও তোমার উপাস্যদেরকে ত্যাগ করুক?" (আল আ'রাফঃ ১২৭)

তাই ফেরাউন অবশ্যই এখানে "ইলাহ" শব্দটি নিজের জন্য স্রষ্টা ও উপাস্য অর্থে নয় বরং সার্বভৌম ও স্বয়ং সম্পূর্ণ শাসক এবং তাকে আনুগত্য করতে হবে, এ অর্থে ব্যবহার করেছিল৷ তার বলার উদ্দেশ্য ছিল, আমি মিশরের এ সরযমীনের মালিক৷ এখানে আমারই হুকুম চলবে৷ আমারই আইনকে এখানে আইন বলে মেনে নিতে হবে৷ আমারই স্বত্তাকে এখানে আদেশ ও নিষেধের উৎস বলে স্বীকার করতে হবে৷ এখানে অন্য কেউ তার হুকুম চালাবার অধিকার রাখে না৷ এ মুসা কে? সে রাব্বুল আলামীনের প্রতিনিধি সেজে দাঁড়িয়েছে এবং আমাকে এমনভাবে হুকুম শুনাচ্ছে যেন সে আসল শাসনকর্তা এবং আমি তার হুকুমের অধীন? এ কারনে সে তার দরবারের লোকদের সম্বোধন করে বলেছিলঃ

হে আমার জাতি! মিসরের বাদশাহী কি আমারই নয় এবং এ নদীগুলো কী আমার অধীনে প্রবাহিত নয়? (আয যুখরুফঃ৫১)

আর এ কারনেই সে বারবার হযরত মুসাকে বলেছিলঃ

"তুমি কি এসেছ আমাদের বাপ-দাদাদের আমল থেকে যে পদ্ধতি চলে আসছে তা থেকে আমাদের সরিয়ে দিতে এবং যাতে এ দেশে তোমাদের দু'ভাইয়ের আধিপত্য ও কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়?" (ইউনুসঃ ৭৮) "হে মুসা! তুমি কি নিজের যাদুবলে আমাদের ভূখন্ড থেকে আমাদের উৎখাত করতে এসেছো? (ত্বা-হাঃ ৫৭)

"আমি ভয় করছি এ ব্যক্তি তোমাদের দ্বীন পরিবর্তিত করে দেবে অথবা দেশে বিপর্যয় সৃষ্টি করবে৷"(আল মু'মিনঃ২৬)

এদিক দিয়ে চিন্তা করলে যেসব রাষ্ট্র আল্লাহর নবী প্রদত্ত শরীয়তের অধীনতা প্রত্যাখান করে নিজেদের তথাকথিত রাজনৈতিক ও আইনগত সার্বভৌমত্বের দাবীদার ফেরাউনের অবস্থা তাদের থেকে ভিন্নতর ছিল না৷ তারা আইনের উৎস এবং আদেশ নিষেধের কর্তা হিসেবে অন্য কোন বাদশাকে মানুক অথবা জাতির ইচ্ছার আনুগত্য করুক যতক্ষণ তারা এরূপ নীতি অবলম্বন করে চলবে যে দেশে আল্লাহ ও তার রাসুলের নয় বরং আমাদের হুকুম চলবে, ততক্ষণ তাদের ও ফেরাউনের নীতি ও ভূমিকার মধ্যে কোন মৌলিক পার্থক্য থাকবে না৷ এটা ভিন্ন কথা যে, অবুঝ লোকেরা একদিকে ফেরাউনকে অভিসম্পাত করতে থাকে, অন্যদিকে ফেরাউনী রীতিনীতির অনুসারী এসব শাসককে বৈধতার ছাড়পত্র দিয়ে দেয়৷ যে ব্যক্তি প্রকৃত সত্যের জ্ঞান রাখে, সে শব্দ ও পরিভাষা নয়, অর্থ ও প্রাণশক্তি দেখবে৷ ফেরাউন নিজের জন্য "ইলাহ" শব্দ ব্যবহার করছিল এবং এরা সেই একই অর্থে সার্বভৌমত্বের পরিভাষা ব্যবহার করছে, এতে এমন কী পার্থক্য সৃষ্টি হয়! (আরো বেশি ব্যাখ্যার জন্য দেখুন তাফহীমুল কুরআন, সূরা ত্বা-হা ২১ টীকা৷)"
৫৩. "বর্তমান যুগের রুশীয় কম্যুনিষ্টরা একই ধরনের মানসিকতার প্রকাশ ঘটিয়ে যাচ্ছে৷ তারা স্পুটনিক ও লুনিকে চড়ে মহাশূন্যে উঠে দুনিয়াবাসীকে খবর দিচ্ছে, আমাদের মহাশূন্য যাত্রীরা উপরে কোথাও আল্লাহর সন্ধান পায়নি৷* ওদিকে এ নির্বোধটিও মিনারে উঠে আল্লাহ কে দেখতে চাচ্ছিল৷ এ থেকে জানা যায়, বিভ্রান্ত লোকদের মানসিকতা সাড়ে তিন হাজার বছর আগে যেমনটি ছিল আজো তেমনটিই আছে৷ এদিক দিয়ে তারা এক ইঞ্চি পরিমানও উন্নতি করতে পারেনি৷ জানিনা কোন আহাম্মক তাদেরকে এ খবর দিয়েছিল যে, আল্লাহ বিশ্বাসী লোকেরা যে রব্বুল আলামীনকে মানে তিনি তাদের বিশ্বাস অনুযায়ী উপরে কোথাও বসে আছেন৷ আর এ কুলকিনারাহীন মহাবিশ্বে কয়েক হাজার ফুট বা কয়েক লাখ মাইল উপরে উঠে যদি তারা তাঁর সাক্ষাত না পায় তাহলে যেন এ কথা পুরোপুরি প্রমাণিত হয়ে যাবে যে, তিনি কোথাও নেই৷

কুরআন এখানে এ কথা বলছে না যে, ফেরাউন সত্যি সত্যিই একটি ইমারত এ উদ্দেশ্যে বানিয়েছিল এবং তাতে উঠে আল্লাহকে দেখার চেষ্টা করেছিল৷ বরং কুরআন শুধুমাত্র তার এ উক্তি উদ্ধৃত করছে৷ এ থেকে আপাতদৃষ্টে মনে হয় সে কার্যত এ বোকামি করেনি৷ এ কথাগুলোর মাধ্যমে কেবলমাত্র মানুষকে বোকা বানানোই ছিল তার উদ্দেশ্য৷

ফেরাউন সত্যিই বিশ্বজাহানের মালিক ও প্রভু আল্লাহর অস্তিত্ব অস্বীকার করত, না নিছক জিদ ও হঠকারিতার বশবর্তী হয়ে নাস্তিক্যবাদী কথাবার্তা বলত, তা সুস্পষ্টভাবে জানা যায় না৷ তার উক্তিগুলো থেকে ঠিক একই ধরনের মানসিক অস্থি'রতার সন্ধান পাওয়া যায় যেমন রুশ কম্যুনিষ্টদের কথাবার্তায় পাওয়া যায়৷ কখনো সে আকাশে উঠে দুনিয়াবাসীকে জানাতে চাইতো, আমি উপরে সব দেখে এসেছি, মুসার আল্লাহ কোথাও নেই৷ আবার কখনো বলতো- "যদি সত্যিই মূসা আল্লাহর প্রেরিত হয়ে থাকে, তাহলে কেন তার জন্য সোনার কাঁকন অবতীর্ন হয়নি অথবা ফেরেশতারা তার আরদালী হয়ে আসেনি কেন?"

এ কথাগুলো রাশিয়ার সাবেক প্রধানমন্ত্রী মিঃ ক্রুশ্চেভের কথা থেকে মোটেই ভিন্নতর নয়৷ তিনি কখনো আল্লাহ কে অস্বীকার করতেন আবার কখনো বারবার আল্লাহর নাম নিতেন এবং তাঁর নামে কসম খেতেন৷ আমাদের অনুমান, হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালাম ও তাঁর খলিফাদের যুগ শেষ হবার পর মিসরে কিব্‌তী জাতীয়তাবাদের শক্তি বৃদ্ধি হয় এবং স্বদেশ প্রীতির ভিত্তিতে দেশে রাজনৈতিক বিপ্লব সাধিত হয়৷ এ সময় নতুন নেতৃত্ব জাত্যাভিমানের আবেগে আল্লাহর বিরুদ্ধেও বিদ্রোহ ঘোষণা করে৷ হযরত ইউসুফ ও তাঁর অনুসারী ইসরাঈলী এবং মিসরীয় মুসলমানরা তাদেরকে আল্লাহকে মেনে চলার দাওয়াত দিয়ে আসছিলেন৷ তারা মনে করলো, আল্লাহকে মেনে নিয়ে আমরা ইউসুফীয় সংস্কৃতির প্রভাব মুক্ত হতে পারবো না এবং এ সংস্কৃতি জীবিত থাকলে আমাদের রাজনৈতিক প্রভাবও শক্তিশালী হতে পারবে না৷ তারা আল্লাহকে স্বীকৃতি দেবার সাথে মুসলিম কর্তৃত্ব কে অংগাংগীভাবে জড়িত মনে করেছিল৷ তাই একটির হাত থেকে নিস্কৃতি পাবার জন্য অন্যটিকে অস্বীকার করা তাদের জন্য জরুরী ছিল, যদিও তার অস্বীকৃতি তাদের অন্তরের ভেতর থেকে বের হয়েও বের হচ্ছিল না৷"
৫৪. অর্থাৎ এ বিশ্ব জাহানে একমাত্র আল্লাহ রব্বুল আলামীনই শ্রেষ্ঠত্বের অধিকারী৷ কিন্তু ফেরাউন এবং তার সৈন্যরা পৃথিবীর একটু ক্ষুদ্র অংশে সামান্য একটু কর্তৃত্বের অধিকারী হয়ে মনে করে বসলো এখনো একমাত্র তারাই শ্রেষ্ঠ এবং তাদেরই সর্বময় কর্তৃত্ব ও আধিপত্য বিরাজিত৷
৫৫. অর্থাৎ, তারা নিজেদের ব্যাপারে মনে করলো তাদেরকে কোথাও জিজ্ঞাসিত হতে হবে না৷ আর তাদেরকে কারো কাছে জবাবদিহি করতে হবে না মনে করে তারা স্বেচ্ছাচারমূলক কাজ করতে লাগলো৷
৫৬. এ শব্দগুলোর মাধ্যমে মহান আল্লাহ্ তাদের মিথ্যা অহমিকার মোকাবেলায় তাদের নিকৃষ্টতা ও হীনতার চিত্র তুলে ধরেছেন৷ তারা নিজেদেরকে অনেক বড় কিছু মনে করে বসেছিল৷ কিন্তু সঠিক পথে আসার জন্য আল্লাহ্ তাদেরকে যে অবকাশ দিয়েছিলেন তা যখন খতম হয়ে গেলো তখন তাদেরকে এমনভাবে সাগরে নিক্ষেপ করা হলো যেমন খড়কুটা ও ময়লা-আবর্জনা নিক্ষেপ করা হয়৷
৫৭. অর্থাৎ পরবর্তী প্রজন্মের জন্য তারা একটি দৃষ্টান্ত কায়েম করে গেছে৷ জুলুম কিভাবে করা হয় , সত্য অস্বীকার করে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তার উপর কিভাবে অবিচল থাকা যায় এবং সত্যের মোকাবিলায় বাতিলের জন্য লোকেরা কেমন ধরনের অস্ত্র ব্যবহার করতে পারে, এসব তারা করে দেখিয়ে দিয়ে গেছে৷ দুনিয়াবাসীকে এসব পথ দেখিয়ে দিয়ে তারা জাহান্নামের দিকে এগিয়ে গেছে৷ এখন তাদের উত্তরসূরীরা তাদেরই পদাংক অনুসরণ করে সেই মনযিলের দিকে দ্রুত অগ্রসর হচ্ছে৷
৫৮. মূলে বলা হয়েছে, কিয়ামতের দিন তারা "মাকবূহীন"দের অন্তরভুক্ত হবে৷ এর কয়েকটি অর্থ হতে পারে৷ তারা হবে প্রত্যাখ্যাত ও বহিস্কৃত ৷ আল্লাহর রহমত থেকে তাদেরকে বঞ্চিত করা হবে৷ তাদের অবস্থা বড়ই শোচনীয় করে দেয়া হবে৷ তাদের চেহারা বিকৃত করে দেয়া হবে৷