(২৮:২২) (মিসর থেকে বের হয়ে) যখন মূসা মাদয়ানের দিকে রওয়ানা হলো ৩১ তখন সে বললো, "আশা করি আমার রব আমাকে সঠিক পথে চালিত করবেন৷" ৩২
(২৮:২৩) আর যখন সে মাদয়ানের কুয়ার কাছে পৌঁছুল, ৩৩ সে দেখলো, অনেক লোক তাদের পশুদের পানি পান করাচ্ছে এবং তাদের থেকে আলাদা হয়ে একদিকে দু'টি মেয়ে নিজেদের পশুগুলো আগলে রাখছে৷ মূসা মেয়ে দু'টিকে জিজ্ঞেস করলো, "তোমাদের সমস্যা কি?" তারা বললো, "আমরা আমাদের জানোয়ারগুলোকে পানি পান করাতে পারি না যতক্ষণ না এ রাখালেরা তাদের জানোয়ারগুলো সরিয়ে নিয়ে যায়, আর আমাদের পিতা একজন অতি বৃদ্ধ ব্যক্তি৷" ৩৪
(২৮:২৪) একথা শুনে মূসা তাদের জানোয়ারগুলোকে পানি পান করিয়ে দিল৷ তারপর সে একটি ছায়ায় গিয়ে বসলো এবং বললো, "হে আমার প্রতিপালক! যে কল্যাণই তুমি আমার প্রতি নাযিল করবে আমি তার মুখাপেক্ষী৷"
(২৮:২৫) (বেশিক্ষণ অতিবাহিত হয়নি এমন সময়) ঐ দু'টি মেয়ের মধ্য থেকে একজন লজ্জাজড়িত পদ বিক্ষেপে তার কাছে এলো ৩৫ এবং বলতে লাগলো, "আমার পিতা আপনাকে ডাকছেন, আপনি আমাদের জানোয়ারগুলোকে যে পানি পান করিয়েছেন আপনাকে তার পারিশ্রমিক দেয়ার জন্য৷" ৩৬ মূসা যখন তার কাছে পৌঁছুল এবং নিজের সমস্ত কাহিনী তাকে শুনালো তখন সে বললো, "ভয় করো না, এখন তুমি জালেমদের হাত থেকে বেঁচে গেছো৷"
(২৮:২৬) মেয়ে দু'জনের একজন তার পিতাকে বললো, "আব্বাজান! একে চাকরিতে নিয়োগ করো, কর্মচারী হিসেবে ব্যক্তিই উত্তম হতে পারে যে বলশালী ও আমানতদার৷" ৩৭
(২৮:২৭) তার পিতা (মূসাকে) বললো, ৩৮ )"আমি আমার এ দু'মেয়ের মধ্য থেকে একজনকে তোমার সাথে বিয়ে দিতে চাই৷শর্ত হচ্ছে, তোমাকে আট বছর আমার এখানে চাকরি করতে হবে৷ আর যদি দশ বছর পুরো করে দাও, তাহলে তা তোমার ইচ্ছা৷ আমি তোমার ওপর কড়াকড়ি করতে চাই না৷ তুমি ইনশাআল্লাহ আমাকে সৎলোক হিসেবেই পাবে৷
(২৮:২৮) মূসা জবাব দিল,"আমার ও আপনার মধ্যে একথা স্থিরীকৃত হয়ে গেলো, এ দু'টি মেয়াদের মধ্য থেকে যেটাই আমি পূরণ করে দেবো তারপর আমার ওপর যেন কোন চাপ দেয়া না হয়৷ আর যা কিছু দাবী ও অঙ্গীকার আমরা করছি আল্লাহ তার তত্বাবধায়ক৷" ৩৯
৩১. হযরত মূসার মিসর থেকে বের হয়ে মাদয়ানের দিকে যাবার ব্যাপারে বাইবেলের বর্ণনা কোরআনের সাথে মিলে যায়৷ কিন্তু তালমুদের এ প্রসংগে এক ভিত্তি হীন কাহিনীর বর্ণনা করেছেন৷ সেটা এই যে, হযরত মূসা মিসর থেকে হাবসায় পালিয়ে যান এবং সেখানে গিয়ে বাদশাহর পারিষদে পরিনত হয়৷ তারপর বাদশহর মৃত্যুর পর লোকেরা তাঁকেই নিজেদের বাদশহের সিংহাসনে বসায় এবং বাদশহর বিধবা স্ত্রীর সাথে তার বিবাহ দেন৷ ৪০ বছর তিনি সেখানে রাজত্ব করেন৷ কিন্তু এ সুদীর্ঘ সময় কালে তিনি কখনো নিজের হাবশী স্ত্রীর নিকটবর্তী হননী৷ ৪০ বছর অতিক্রান্ত হবার পর ঐ ভদ্র মহিলা হাবশার জনগনের কাছে এ মর্মে অভিযাগ করেন যে, ৪০ বছর অতিবাহিত হয়ে গেলেও আজ পর্যন্ত এ ব্যাক্তি স্বামী-স্ত্রী সম্পর্ক রক্ষা করেননি এবং হাবসার দেবতাদের পূজা করেনি৷ এ কথায় রাষ্ট্রের প্রশাসনিক কর্মকর্তারা তাকে পদচূত করে বিপুল পরিমান ধন-সম্পদ দিয়ে সসম্মানে বিদায় করে দেয়৷ তখন তিনি হাবশা ত্যাগ করে মাদয়ানে পৌছে যান এবং সেখানে সামনের যে সব ঘঠনার কথা বলা হয়েছে সেগুলো ঘটে৷ তখন তার বয়স ছিল ৬৭ বছর৷এ কাহিনীটি যে ভিত্তিহীন এর একটি সুস্পষ্ট প্রমান হচ্ছে যে, এতে এ কথাও বলা হয়েছে যে একসময় আসিরীয়ায়দের বিদ্রহ দমন করার জন্য হযরত মূসা ও তাঁর পূর্ববতি বাদশহরাও সামরিক অভিযান চালান৷ সামান্যতম ইতিহাস-ভূগোল জ্ঞান যার আছ সে এ পৃথিবীর মানচিত্রের দিকে একটু নজর দিলেই দেখতে পাবে যে, আসিরীয়ার উপর হাবশার শাসন বা হাবশি সেনা দলের আক্রমনের ব্যাপারটি কেবলমাত্র তখনই ঘটতে পারতো যখন মিসর, ফিলিস্তীন ও সিরিয়া তার দখলে থাকত অথবা সমগ্র আরব দেশ তার কর্তৃত্বাধীন হত কিংবা হাবশার নৌবাহিনী এতই শক্তিশালী হত যে, তা ভারত মহাসাগর ও পারস্য উপ মহাসাগর অতিক্রম করে ইরাক দখল করতে সক্ষম হতো৷ দেশগুলোয় কখনো হাবশিদের কতৃর্ত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল অথবা তাদের নৌশক্তি কখনো এতো শক্তির অধিকারী ছিল এ ধরনের কোন কথা ইতিহাসে নেই৷ এ থেকে বুঝা যায় যে, নিজেদের ইতিহাস সম্পর্কে বনী ইসরাঈলের জ্ঞান কতটা অপরিপক্ক ছিল এবং কোরআন তাদের ভুলগুলো সংশোধন করে কেমন সুস্পষ্ট আকারে সঠিক ঘটনাবলী পেশ করেছেন৷ কিন্তু ইহুদী খ্রৃষ্টান প্রাচ্যবিদগণ একথা বলতে লজ্জা অনুভব করেন না যে, কোরআন এসব কাহিনী বনী ইসরাঈল থেকে সংগ্রহ করেছে৷
৩২. অর্থাৎ এমন পথ যার সাহায্যে সহজে মাদয়ানে পৌঁছে যাবো৷ উল্লেখ্য, সে সময় মাদয়ান ছিল ফেরাউনের রাজ্য-সীমার বাইরে ৷ সমগ্র সিনাই উপদ্বীপে মিসরের কর্তৃত্ব ছিল না৷ বরং তার কর্তৃত্ব সীমাবদ্ধ ছিল পশ্চিম ও দক্ষিণ এলাকা পর্যন্ত৷ আকাবা উপসাগরের পূর্ব ও পশ্চিম তীরে ছিল বনী মাদয়ানের বসতি এবং এ এলাকা ছিল মিসরীয় প্রভাব ও কর্তৃত্ব থেকে সম্পূর্ণরূপে মুক্ত৷ এ কারণে মূসা মিসর থেকে বের হয়েই মাদয়ানের পথ ধরেছিলেন৷ কারণ এটাই ছিল নিকটতম জনবসতিপূর্ণ স্বাধীন এলাকা৷ কিন্তু সেখানে যেতে হলে তাঁকে অবশ্যই মিসর অধিকৃত এলাকা দিয়েই এবং মিসরীয় পুলিশ ও সেনা-চৌকিগুলোর নজর এড়িয়ে যেতে হতো৷ তাই তিনি আল্লাহর কাছে দোয়া করেন, আমাকে এমন পথে নিয়ে যাও যেপথ দিয়ে আমি সহি-সালামতে মাদয়ান পৌঁছে যেতে পারি৷
৩৩. এ স্থানটি , যেখানে মূসা পৌঁছেছিলেন, এটি আকাবা উপসাগরের পশ্চিম তীরে মানকা থেকে কয়েক মাইল উত্তর দিকে অবস্থিত৷ বর্তমানে এ জায়গাটিকে আল বিদ্'আ বলা হয়৷ সেখানে একটি ছোট মতো শহর গড়ে উঠেছে৷ আমি ২০০৪ সালে তাবুক যাওয়ার পথে এ জায়গাটি দেখেছি৷ স্থানীয় অধিবাসীরা আমাকে জানিয়েছে, বাপ-দাদাদের আমল থেকে আমরা শুনে আসছি মাদয়ান এখানেই অবস্থিত ছিল৷ এর সন্নিকটে সামান্য দূরে একটি স্থানকে বর্তমানে "মাগায়েরে শু'আইব" বা "মাগারাতে শু'আইব" বলা হয়৷ সেখানে সামূদী প্যাটার্নের কিছু ইমারত রয়েছে৷ আর এর প্রায় এক মাইল দু'মাইল দূরে কিছু প্রাচীন ধ্বংসাবশেষ রয়েছে৷ এর মধ্যে আমরা দেখেছি দু'টি অন্ধকূপ৷ স্থানীয় লোকেরা আমাদের জানিয়েছে , নিশ্চিতভাবে আমরা কিছু বলতে পারি না তবে আমাদের এখানে একথাই প্রচলিত যে, এ দু'টি কূয়ার মধ্য থেকে একটি কূয়ায় মূসা তাঁর ছাগলের পানি পান করিয়েছেন৷ এ এলাকার অধিবাসীরা এ স্থানেই মূসার ঐ কূয়াটি চিহ্নিত করে থাকে৷ এ থেকে জানা যায়, এ বর্ণনাটি শত শত বছর থেকে সেখানকার লোকদের মুখে মুখে বংশানুক্রমে চলে আসছে এবং এটি ভিত্তিতে দৃঢ়তার সাথে বলা যেতে পারে, কুরআন মজীদে যে স্থানটির কথা বলা হয়েছে এটা সেই স্থান৷
৩৪. অর্থাৎ আমরা মেয়েমানুষ ৷ এ রাখালদের সাথে টক্কর দিয়ে ও সংঘর্ষ বাধিয়ে নিজেদের জানোয়ারগুলোকে আগে পানি পান করাবার সামর্থ্য আমাদের নেই৷ অন্যদিকে আমাদের পিতাও এতবেশি বয়ো:বৃদ্ধ হয়ে পড়েছেন যে, তিনি নিজে আর কষ্টের কাজ করতে পারেন না৷ আমাদের পরিবারে আর দ্বিতীয় কোন পুরুষ নেই৷ তাই আমরা মেয়েরাই এ কাজ করতে বের হয়েছি৷ সব রাখালদের তাদের পশুগুলোকে পানি পান করিয়ে নিয়ে চলে যাওয়া পর্যন্ত বাধ্য হয়ে আমাদের অপেক্ষা করতে হয়৷ মেয়ে দু'টি শুধুমাত্র একটি সংক্ষিপ্ত বাক্যের মাধ্যমে এ বক্তব্য উপস্থাপন করে৷ এ থেকে একদিকে তাদের লজ্জাশীলতার প্রকাশ ঘটে৷ অর্থ্যাৎ একজন পর পুরুষের সাথে তারা বেশি কথাও বলতে চাচ্ছিল না৷ আবার এটাও পছন্দ করছিল না যে, এ ভিন দেশী অপরিচিত লোকটি তাদের ঘটনা সম্পর্কে কোন ভুল ধারনা পোযণ করুক এবং মনে মনে ভাবুক যে, এরা কেমন লোক যাদের পুরুষরা ঘরে বসে রয়েছে আর ঘরের মেয়েদেরকে এ কাজ করার জন্য বাইরে পাঠিয়ে দিয়েছে৷

এ মেয়েদের বাপের ব্যাপারে আমদের এখানে এ কথা প্রচার হয়ে গেছে যে, তিনি ছিলেন হযরত শু'আইব আলাইহিস সালাম৷ কিন্তু কুরআন মজীদে ইশারা ইঙ্গিতে কোথাও এমন কথা বলা হয়নি যা থেকে বুঝা যেতে পারে তিনি শু'আইব আলাইহিস সালাম ছিলেন৷ অথচ শু'আইব আলাইহিস সালাম কুরআন মজীদে একটি পরিচিত ব্যক্তিত্ব৷ এ মেয়েদের পিতা যদি তিনিই হতেন তাহলে এখানে একথা সুস্পষ্ট করে দেয়ার কোন কারনই ছিল না৷ নিঃসন্দেহে কোন কোন হাদীসে তাঁর নাম স্পষ্ট করে বলা হয়েছে৷ কিন্তু আল্লামা ইবনে জারীর ও ইবনে কাসীর উভয়ে এ ব্যাপারে একমত যে, এগুলোর কোনটিরও সনদ তথা বর্ণনাসূত্র নির্ভুল নয়৷ তাই ইবনে আব্বাস, ইবনে বসরী, আবু উবাইদাহ ও সাঈদ ইবনে জুবাইরের ন্যায় বড় বড় তফসীরকারক বনী ইসরাইলের বর্ণনার উপর নির্ভর করে তালমূদ ইত্যাদি গ্রণ্থে এ মণীষীর যে নাম উল্লেখিত হয়েছে সেটিই বলেছেন৷ অন্যথায় বলা নিষ্প্রয়োজন, যদি নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে হযরত শুআইবের নাম স্পষ্ট করে বলা হতো তাহলে তাঁরা কখনো অন্য নাম উল্লেখ করতেন না৷

বাইবেলের এক জায়গায় এ মনীষীর নাম বলা হয়েছে রূয়েল এবং অন্য জায়গায় বলা হয়েছে যিথ্রো৷ এবং বলা হয়েছে তিনি মাদয়ানের যাজক ছিলেন৷ (যাত্রা পুস্তক ২: ১৬-১৮, ৩:১ এবং ১৮:৫) তালমূতদীয় সাহিত্যে রূয়েল, যিথ্রো ও হুবাব তিনটি ভিন্ন ভিন্ন নাম বলা হয়েছে৷ আধুনিক ইহুদী আলেমগণের মতে যিথ্রো ছিল 'হিজ এক্সেলেন্সী' এর সমার্থক একটি উপাধি এবং আসল নাম ছিল রূয়েল বা হুবাব৷ অনুরূপভাবে কাহেন বা যাজক (কড়যবহ গরফরধহ) শব্দটির ব্যাখ্যার ব্যাপারেও ইহুদী আলেমগণের মধ্যে মতভেদ রয়েছে৷ কেউ কেউ একে পুরোহিত (চৎরবংঃ) বা এর সমার্থক হিসেবে নিয়েছেন আবার কেউ রাইস বা আমীর (চৎরহপব) অর্থে নিয়েছেন৷

তালমূদে তাঁর যে জীবন বৃত্তান্ত বর্ণনা করা হয়েছে তা হচ্ছে এই যে, হযরত মূসার জন্মের পূর্বে ফেরাউনের কাছে তাঁর যাওয়া-আসা ছিল৷ ফেরাউন তাঁর জ্ঞান ও বিচক্ষণতার প্রতি আস্থা রাখতো৷ কিন্তু যখন বণী ইসরাইলের উপর জুলুম শোষন চালাবার জন্য মিশরের রাজ পরিষদে পরামর্শ হতে লাগলো এবং তাদের সন্তানদের জন্মের পর পরই হত্যা করার সিদ্ধান্ত হলো তখন তিনি ফেরাউনকে এ অন্যায় কাজ থেকে বিরত রাখার জন্য অনেক চেষ্টা চালান৷ তাকে এ জুলুমের অশুভ পরিণামের ভয় দেখালেন৷ তিনি পরামর্শ দিলেন, এদের অস্তিত্ব যদি আপনার কাছে এতই অসহনীয় হয়ে থাকে তাহলে এদেরকে মিশর থেকে বের করে এদের পিতৃ পুরুষের দেশ কেনানের দিকে পাঠিয়ে দিন৷ তাঁর এ ভূমিকায় ফেরাউন তাঁর প্রতি অসন্তষ্ট হয়ে তাঁকে অপদস্থ করে নিজের দরবার থেকে বের করে দিয়েছিল৷ এ সময় থেকে তিনি নিজের দেশ মাদ্‌য়ানে চলে এসে সেখানেই অবস্থান করছিলেন৷

তাঁর ধর্ম সম্পর্কে অনুমান করা হয়, হযরত মুসা আলাইহিস সালামের মত তিনিও ইবরাহীমী দীনের অনুসারী ছিলেন৷ কেননা, যেভাবে হযরত মুসা ছিলেন ইসহাক ইবনে ইবরাহীমের (আলাইহিস সালাম) আউলাদ ঠিক তেমনি তিনিও ছিলেন মাদ্‌য়ান ইবনে ইবরাহীমের বংশধর৷ এ সম্পর্কের কারনেই সম্ভবত তিনি ফেরাউনকে নবী ইসরাইলের উপর জুলুম-নির্যাতন-নিপীড়ণ করতে নিষেধ করেন এবং তার বিরাগভাজন হন৷ কুরআন ব্যাখ্যাতা নিশাপুরী হযরত হাসান বাসরীর বরাত দিয়ে লিখেছেন :

"তিনি একজন মুসলমান ছিলেন৷ হযরত শু'আইবের দীন তিনি গ্রহন করে নিয়েছিলেন৷"

তালমূদে বলা হয়েছে, তিনি মাদ্‌য়ানবসীদের মূর্তিপূজাকে প্রকাশ্যে নির্বুদ্ধিতা বলে সমালোচনা করতেন৷ তাই মাদয়ানবাসীরা তাঁর বিরোধী হয়ে গিয়েছিল৷
৩৫. উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু এ বাক্যাংশটির এরূপ ব্যাখ্যা করেছেন :
"সে নিজের মুখ ঘোমটার আড়ালে লুকিয়ে লজ্জাজড়িত পায়ে হেঁটে এলো৷ সেই সব ধিংগি চপলা মেয়েদের মতো হন হন করে ছুটে আসেনি, যারা যেদিকে ইচ্ছা যায় এবং যেখানে খুশী ঢুকে পড়ে৷" এ বিষয়বস্তু সম্বলিত কয়েকটি রেওয়ায়েত সাঈদ ইবনে মানসুর , ইবনে জারীর , ইবনে আবী হাতেম ও ইবনুল মুনযির নির্ভরযোগ্য সনদ সহকারে উমর থেকে উদ্ধৃত করেছেন৷ এ থেকে পরিষ্কার জানা যায়, সাহাবায়ে কেরামের যুগে কুরআন ও নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের বদৌলতে এ মনীষীগণ লজ্জাশীলতার ইসলামী ধারণা লাভ করেছিলেন তা অপরিচিত ও ভিন্ পুরুষদের সামনে চেহারা খুলে রেখে ঘোরাফেরা করা এবং বেপরোয়াভাবে ঘরের বাইরে চলাফেরা করার সম্পূর্ণ বিরোধী ছিল৷ উমর (রা) পরিষ্কার ভাষায় এখানে চেহারা ঢেকে রাখাকে লজ্জাশীলতার চিহ্ন এবং তা ভিন পুরুষের সামনে উন্মুক্ত রাখাকে নির্লজ্জতা গণ্য করেছেন৷
৩৬. একথাও সে বলে লজ্জা-শরমের কারণে৷ কেননা, নির্জনে একজন ভিন পুরুষের কাছে একাকী আসার কোন কারণ বলা জরুরী ছিল৷ অন্যথায় একথা সুস্পষ্ট ,একজন ভদ্রলোক যদি কোন মেয়ে মানুষকে পেরেশান দেখে তাকে কোন সাহায্য করে থাকে, তাহলে তার প্রতিদান দেবার কথা বলা কোন ভালো কথা ছিল না৷ তারপর এ প্রতিদানের নাম শোনা সত্ত্বেও মূসার মতো একজন মহানুভব ব্যক্তির উঠে এগিয়ে যাওয়া একথা প্রমাণ করে যে, তিনি সে সময় চরম দুরবস্থায় পতিত ছিলেন৷ একেবারে খালি হাতে অকস্মাৎ মিসর থেকে বের হয়ে পড়েছিলেন৷ মাদয়ান পর্যন্ত পৌঁছতে কমপক্ষে আটদিন লাগার কথা৷ ক্ষুধা, পিপাসা এবং সফরের ক্লান্তিতে অবস্থা কাহিল না হয়ে পারে না৷ বিদেশে-পরবাসে কোন থাকার জায়গা পাওয়া যায় কিনা এবং এমন কোন সমব্যথী পাওয়া যায় কিনা যার কাছে আশ্রয় নেয়া যেতে পারে, এ চিন্তা সম্ভবত তাকে সবচেয়ে বেশী পেরেশান করে দিয়েছিল৷ এ অক্ষমতার কারণেই এত সামান্য সেবা কর্মের পারিশ্রমিক দেবার জন্য ডাকা হচ্ছে শুনে মূসা যাওয়ার ব্যাপারে ইতস্তত করেননি৷ তিনি হয়তো ভেবেছিলেন যে, আল্লাহর কাছে এখনই আমি যে দোয়া করেছি তা কবুল করার এ ব্যবস্থা আল্লাহর পক্ষ থেকেই হয়েছে, তাই এখন অনর্থক আত্মমর্যাদার ভান করে আল্লাহর দেয়া আতিথ্যের আহ্বান প্রত্যাখ্যান করা সংগত নয়৷এ বিষয়বস্তু সম্বলিত কয়েকটি রেওয়ায়েত সাঈদ ইবনে মানসুর , ইবনে জারীর , ইবনে আবী হাতেম ও ইবনুল মুনযির নির্ভরযোগ্য সনদ সহকারে উমর থেকে উদ্ধৃত করেছেন৷ এ থেকে পরিষ্কার জানা যায়, সাহাবায়ে কেরামের যুগে কুরআন ও নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের বদৌলতে এ মনীষীগণ লজ্জাশীলতার ইসলামী ধারণা লাভ করেছিলেন তা অপরিচিত ও ভিন্ পুরুষদের সামনে চেহারা খুলে রেখে ঘোরাফেরা করা এবং বেপরোয়াভাবে ঘরের বাইরে চলাফেরা করার সম্পূর্ণ বিরোধী ছিল৷ উমর (রা) পরিষ্কার ভাষায় এখানে চেহারা ঢেকে রাখাকে লজ্জাশীলতার চিহ্ন এবং তা ভিন পুরুষের সামনে উন্মুক্ত রাখাকে নির্লজ্জতা গণ্য করেছেন৷
৩৭. হযরত মূসার সাথে প্রথম সাক্ষাতের সময় মেয়েটি তার বাপকে একথা বলেছিল কিনা এটা নিশ্চিত করে বলা যায় না৷ তবে বেশির ভাগ সম্ভবনা এটাই যে, তার বাপ পরিচিত মুসাফিরকে দু-একদিন নিজের কাছে রেখে থাকবেন এবং এ সময়ের মধ্যে কথনো মেয়ে তার বাপকে এ পরামর্শ দিয়ে থাকবে৷ এ পরামর্শের অর্থ ছিল, আপনার বার্ধক্যের কারণে বাধ্য হয়ে আমাদের মেয়েদের বিভিন্ন কাজে বাইরে বের হতে হয়৷ বাইরের কাজ করার জন্য আমাদের কোন ভাই নেই৷ আপনি এ ব্যক্তিকে কর্মচারী নিযুক্ত করুন৷ সুঠাম দেহের অধিকারী বলশালী লোক৷ সবরকমের পরিশ্রমের কাজ করতে পারবে৷ আবার নির্ভরযোগ্যও ৷ নিছক নিজের ভদ্রতা ও আভিজাত্যের কারণে সে আমাদের মতো মেয়েদেরকে অসহায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে আমাদের সাহায্য করেছে এবং আমাদের দিকে কখনো চোখ তুলে তাকায়ওনি৷
৩৮. এ কথাও জরুরী নয় যে, মেয়ের কথা শুনেই বাপ সংগে সংগেই হযরত মূসাকে এ কথা বলে তাকবেন৷ সম্ভবত তিনি মেয়ের পরামর্শ সম্পর্কে ভালভাবে চিন্তা-ভাবনা করার পর এই মত স্থির করেছিলেন যে, লোকটি ভদ্র ও অভিজাত, একথা ঠিক৷ কিন্তু ঘরে যেখানে জোয়ান মেয়ে রয়েছে সেখানে একজন জোয়ান, সুস্থ্য , সবল লোককে এমনি কর্মচারী হিসেবে রাখা ঠিক নয়৷ এ ব্যক্তি যখন ভদ্র, শিক্ষিত, সংস্কৃতিবান ও অভিজাত বংশীয় (যেমন হযরত মূসার মুখে তাঁর কাহিনী শুনে তিনি মনে করে থাকবেন) তখন একে জামাতা করেই ঘরে রাখা হোক৷ এ সিদ্ধান্ত গ্রহনের পর কোন উপযুক্ত সময়ে তিনি হযরত মূসাকে এ কথা বলে থাকবেন৷

এখানে দেখুন বনী ইসরাঈলের আর একটি কীর্তি৷ তারা তাদের মহান মর্যাদাসম্পন্ন নবী এবং নিজেদের সবচেয়ে বড় হিতকারী ও জাতীয় হিরোর কী দুর্গতি করেছে৷ তালমূদে বলা হয়েছে, "মূসা রূয়েলের বাড়িতে অবস্থান করতে থাকেন৷ তিনি নিজের মেজবানের মেয়ে সফুরার প্রতি অনুগ্রহ দৃষ্টি দিচ্ছিলেন৷ এমনকি শেষ পর্যন্ত তিনি তাকে বিয়ে করলেন৷" আর একটি ইহুদী বর্ণনা জুয়িশ ইনসাইক্লোপেডিয়ায় উদ্ধৃত হয়েছে৷ তাতে বলা হয়েছে, "হযরত মূসা যখন যিথ্রোকে সমস্ত ঘটনা শুনালেন তখন তিনি বুঝতে পারলেন এ ব্যক্তির হাতেই ফেরাউনের রাজ্য ধ্বংস হবার ভবিষ্যতদ্বানী করা হয়েছিল৷ তাই তিনি সংগে সংগেই হযরত মূসাকে বন্দী করে ফেললেন, যাতে তাঁকে ফেরাউনের হাতে সোপর্দ করে দিয়ে পুরস্কার লাভ করতে পারেন৷ সাত বা দশ বছল পর্যন্ত তিনি তার বন্দীশালায় থাকলেন৷ ভূ-গর্ভস্থ একটি অন্ধকার কুঠুরীতে তিনি বন্দী ছিলেন৷ কিন্তু যিথ্রোর মেয়ে সফূরা (বা সাফূরা), যার সাথে কূয়ার পাড়ে তাঁর প্রথম সাক্ষাত হয়েছিল, চুপি চুপি তার সাথে কারাগৃহে সাক্ষাত করতে থাকে৷ সে তাকে খাদ্য ও পানীয় সরবরাহ করতো৷ তাদের দুজনের মধ্যে বিয়ের গোপন চুক্তি হয়ে গিয়েছিল৷ সাত বা দশ বছর পর যাফূরা তার বাপকে বললো এত দীর্ঘকাল হয়ে গেল আপনি এক ব্যক্তিকে কারাগারে নিক্ষেপ করেছিলেন এবং তারপর তার কোন খবরও নেননি৷ এতদিন তার মরে যাবারই কথা৷ কিন্তু যদি জীবিত থাকে তাহলে নিশ্চয়ই সে কোন আল্লাহওয়ালা ব্যক্তি৷ যিথ্রো তার একথা শুনে কারাগারে গেলেন৷ সেখানে হযরত মূসাকে জীবিত থাকতে দেখে তার মনে বিশ্বাস জন্মালো অলৌকিকতার মাধ্যমে এ ব্যক্তি জীবিত আছে৷ তখন তিনি যাফূরার সাথে তার বিয়ে দিয়ে দিলেন৷"

যেসব পাশ্চাত্য প্রাচ্যবিদ কুরআনী কাহিনীগুলোর উৎস খুঁজে বেড়ান, কুরআনী বর্ণনা ও ইসরাঈলী বর্ণনার মধ্যে এই যে সুস্পষ্ট পার্থক্য এখানে দেখা যাচ্ছে তা কি কখনো তাদের চোখে পড়ে?
৩৯. কেউ কেউ হযরত মূসার সাথে মেয়ের বাপের এ কথাবার্তাকে বিয়ের ইজাব কবুল মনে করে নিয়েছেন৷ এ প্রসঙ্গে তাঁরা এ প্রশ্ন উত্থাপন করেছেন যে, বাপের সেবা মেয়ের বিয়ের মোহরানা হিসেবে গণ্য হতে পারে কিনা? এবং বিয়ে অনুষ্ঠানের ক্ষেত্রে এ ধরনের বাইরের শর্ত শামিল হতে পারে কি? অথচ আলোচ্য আয়াতের ভাষ্য থেকে স্বতস্ফূর্তভাবে একথা প্রমাণিত হচ্ছে যে, এটি বিয়ের অনুষ্ঠান ছিল না৷ বরং এটি ছিলো প্রাথমিক কথাবার্তা, বিয়ের পূর্বে বিয়ের প্রস্তাব আসার পর সাধারণভাবে দুনিয়ায় যে ধরনের কথাবার্তা হয়ে থাকে৷ এটা কেমন করে বিয়ের ইজাব কবুল হতে পারে যখন একথাই স্থিরীকৃত কৃত হয়নি দু'টি মেয়ের মধ্য থেকে কোনটি কোনটির সাথে বিয়ে দেয়া হচ্ছে? কথাবার্তা শুধূ এতটুকু হয়েছিল যে : "আমার মেয়েদের মধ্য থেকে একটির সাথে আমি তোমার বিয়ে দিতে চাই৷ তবে শর্ত হচ্ছে, তোমাকে প্রতিশ্রুতি দিতে হবে, আট দশ বছর আমার এখানে থেকে আমার কাজে সাহায্য করতে হবে৷ কারন এ আত্মীয়তা সম্পর্ক সংস্থাপনের পেছনে আমার আসল উদ্দেশ্য হচ্ছে, আমি বৃদ্ধ লোক কোন ছেলে সন্তান আমার নেই, যে আমার সম্পত্তি দেখাশুনা ও ব্যবস্থাপনা করতে পারে৷ আমার আছে মেয়ে৷ বাধ্য হয়ে তাদেরকে আমি বাইরে পাঠাই৷ আমি চাই আমার জামাতা আমার দক্ষিণ হস্ত হয়ে থাকবে৷ এ দায়িত্ব যদি তুমি পালন করতে পারো এবং বিয়ের পরেই স্ত্রীকে নিয়ে চলে যাওয়ার ইচ্ছা না তাকে তাহলে আমার মেয়ের বিয়ে আমি তোমার সাথে দেব৷ হযরত মূসা নিজেই এসময় একটি আশ্রয়ের সন্ধানে ছিলেন৷ তিনি এ প্রস্তাব মেনে নিলেন৷ বলা নিষ্প্রয়োজন, বিয়ের পূর্বে বর পক্ষ ও কনে পক্ষের মধ্যে যেসব চুক্তি হয়ে থাকে এটি ছিলো সে ধরনের একটি চুক্তি৷ এরপর যথারীতি আসল বিয়ে অনুষ্ঠিত হয়ে থাকবে এবং তাতে মোহরানাও নির্ধারিত হয়ে থাকবে৷ সে বিয়েতে সেবা কর্মের কোন শর্ত শামিল হওয়ার কোন কারন ছিল না৷