(২৭:৬৭) এ অস্বীকারকারীরা বলে থাকে “ যখন আমরা ও আমাদের বাব দাদীরা মাটি হয়ে যাব তখন তাদের সত্যিই কবর থেকে বের করা হবে নাকি?
(২৭:৬৮) এখবর আমাদেরও অনেক দেয়া হয়েছে এবং ইতিপূর্বে আমাদের বাব দাদাদেরকেও অনেক দেয়া হয়েছিল, কিন্তু এসব নিছক কল্পকাহিনী ছাড়া আর কিছুই নয়, যা আগের জামানা থেকে শুনে আসছি৷”
(২৭:৬৯) বল, পৃথিবী পরিভ্রমন করে দেখ অপরাধীদের পরিণতি কি হয়েছে৷ ৮৬
(২৭:৭০) হে নবী! তাদের অবস্থার জন্য দুঃখ করো না এবং তাদের চক্রান্তের জন্য মনঃক্ষুন্ন হয়োনা৷ ৮৭
(২৭:৭১) তারা বলে, “ যদি তোমরা সত্যবাদী হও, তাহলে এ হুমকি কবে সত্য হবে?” ৮৮
(২৭:৭২) বল বিচিত্র কি যে, আযাবের ব্যপারে তোমরা ত্বরান্বিত করতে চাচ্ছো তার একটি অংশ তোমাদের নিকটবর্তী হয়ে যাবে৷ ৮৯
(২৭:৭৩) আসলে তোমার রব তো মানুষের প্রতি বড়ই অনুগ্রহ কারী৷ কিন্তু অধিকাংশ লোক শোকর গুজারি করে না৷ ৯০
(২৭:৭৪) নিঃসন্দেহে তোমার রব ভাল ভাবেই জানেন যা কিছু তাদের অন্তর নিজের মধ্যে লুকিয়ে রাখে এবং যা কিছু তারা প্রকাশ করে৷ ৯১
(২৭:৭৫) আকাশ ও পৃথিবীর এমন কোন গোপন জিনিস নাই যা একটি সুস্পষ্ট কিতাবে লিখিত আকারে নেই৷ ৯২
(২৭:৭৬) যথার্থই এই কোরআন বনীইসরাইলকে বেশিরভাগ এমন সব কথার স্বরূপ বর্ণনা করে যেগুলোতে তারা মতভেদ করে৷ ৯৩
(২৭:৭৭) আর এ হচ্ছে পথ নির্দেশনা ও রহমত মুমিনদের জন্য৷ ৯৪
(২৭:৭৮) নিশ্চয় (এভাবে) তোমার রব তাদের মধ্যেও ৯৫ নিজের হুকুমের মাধ্যমে ফায়সালা করে দিবেন, তিনি পরাক্রমশালী ও সব কিছুই জানেন৷ ৯৬
(২৭:৭৯) কাজেই হে নবী! আল্লাহর উপর ভরসা করো, নিশ্চয় তুমি সুস্পষ্ট সত্তের উপর প্রতিষ্ঠিত আছ৷
(২৭:৮০) তুমি মৃতদেরকে শুনাতে পারোনা৷ ৯৭ যেসব বধির পিছন ফিরে দৌড়ে পালিয়ে যাচ্ছে তাদের কাছে নিজের আহবান পৌছাতে পারনা৷ ৯৮
(২৭:৮১) এবং অন্ধদেরকে পথ বাতলে দিয়ে বিপথগামী হওয়া থেকে বাঁচাতে পারোনা৷ ৯৯ তুমি তো নিজের কথা তাদেরকে শুনাতে পারো যারা আমার আয়াতর প্রতি ঈমান আনে এবং তারপর অনুগত হয়ে যায়৷
(২৭:৮২) আর যখন আমার কথা সত্য হওয়ার সময় তাদের কাছে এসে যাবে ১০০ তখন আমি তাদের জন্য মৃতিকাগর্ভ থেকে একটি জীব বের করব সে তাদের সাথে কথা বলবে যে, লোকেরা আমাদের আয়াত বিশ্বাস করতো না৷ ১০১
৮৬. এ সংক্ষিপ্ত বাক্যটিতে আখেরাতের পক্ষে দু'টি মোক্ষম যুক্তি রয়েছে এবং উপদেশও ৷

প্রথম যুক্তিটি হচ্ছে, দুনিয়ার যেসব জাতি আখেরাতকে উপেক্ষা করেছে তারা অপরাধী না হয়ে পারেনি৷ তারা দায়িত্বজ্ঞান বর্জিত হয়ে গেছে৷ জুলুম নির্যাতনে অভ্যস্ত হয়েছে৷ ফাসেকী ও অশ্লীল কাজের মধ্যে ডুবে গেছে৷ নৈতিক চরিত্র বিনষ্ট হবার ফলে শেষ পর্যন্ত তারা ধ্বংস হয়ে গেছে৷ এটি মানুষের ইতিহাসের একটি ধারাবাহিক অভিজ্ঞতা৷ দুনিয়ার দিকে দিকে বিধ্বস্ত জাতিসমূহের ধ্বংসাবশেষগুলো এর সাক্ষ্য দিচ্ছে৷ এগুলো পরিষ্কারভাবে এ কথা জানিয়ে দিচ্ছে যে, আখেরাত মানা ও না মানার সাথে মানুষের মনোভাব ও কর্মনীতি সঠিক কিনা, তার অত্যন্ত গভীর সম্পর্ক রয়েছে৷ তাকে মেনে নিলে এ মনোভাব ও কর্মনীতি সঠিক থাকে এবং তাকে না মানলে তা ভুল ও অশুদ্ধ হয়ে যায়৷ একে মেনে নেয়া যে প্রকৃত সত্যের সাথে সামঞ্জস্যশীল, এটি এর সুস্পষ্ট প্রমাণ৷ এ কারণে একে মেনে নিলেই মানুষের জীবন সঠিক পথে চলতে থাকে৷ আর একে অস্বীকার করলে প্রকৃত সত্যের বিরুদ্ধাচরণ করাই হয়৷ ফলে রেলগাড়ি তার বাঁধানো রেলপথ থেকে নেমে পড়ে৷

দ্বিতীয় যুক্তি হচ্ছে, ইতিহাসের এ সুদীর্ঘ অভিজ্ঞতায় অপরাধীর কাঠগড়ায় প্রবেশকারী জাতিসমূহের ধ্বংস হয়ে যাওয়া এ চিরায়ত সত্যটিই প্রকাশ করছে যে, এ বিশ্ব-জাহানে চেতনাহীন শক্তিসমূহের অন্ধ ও বধির শাসন চলছে না বরং এটি বিজ্ঞ ও বিজ্ঞানসম্মত ব্যবস্থা, যার মধ্যে সক্রিয় রয়েছে একটি অভ্রান্ত প্রতিদান ও প্রতিবিধানমূলক আইন৷ বিশ্বের বিভিন্ন জাতির উপর পুরোপুরি নৈতিকতার ভিত্তিতে সে তার শাসন চালিয়ে যাচ্ছে৷ কোন জাতিকে এখানে অর্থাৎ কাজ করার জন্য স্বাধীনভাবে ছেড়ে দেয়া হয় না৷ একবার কোন জাতির উত্থান হবার পর সে এখানে চিরকাল আয়েশ আরাম করতে থাকবে এবং অবাধে জুলুম নিপীড়ন চালিয়ে যেতে থাকবে এমন ব্যবস্থা এখানে নেই৷ বরং একটি বিশেষ সীমায় পৌঁছে যাবার পর একটি মহা শক্তিশালী হাত এগিয়ে এসে তাকে পাকড়াও করে লাঞ্ছনা ও অপমানের গভীরতম গহ্বরে নিক্ষেপ করে৷ যে ব্যক্তি এ সত্যটি অনুধাবন করবে সে কখনো এ ব্যাপারে সন্দেহ পোষণ করতে পারে না যে, এ প্রতিদান ও প্রতিবিধানের আইনই এ দুনিয়ার জীবনের পরে অন্য একটি জীবনের দাবী করে৷ সেখানে ব্যক্তিবর্গ ও জাতিসমূহ এবং সামগ্রিকভাবে সমগ্র বিশ্বমানবতার প্রতি ইনসাফ করা হবে৷ কারণ শুধুমাত্র একটি জালেম জাতি ধ্বংস হয়ে গেলেই ইনসাফের সমস্ত দাবী পূর্ণ হয়ে যায় না৷ এর ফলে যেসব মজলুমের লাশের উপর সে তার মর্যাদার প্রাসাদ নির্মাণ করেছিল তাদের প্রতি অন্যায় অত্যাচারের কোন প্রতিবিধান হয় না৷ ধ্বংস আসার পূর্বে যেসব দুষ্কৃতিকারী বংশ পরস্পরায় নিজেদের পরে আগত প্রজন্মের জন্য বিভ্রান্তি ও ব্যাভিচারের উত্তরাধিকার রেখে চলে গিয়েছিল তাদের সে সব অসৎকাজেরও কোন জবাবদিহি হয় না৷ দুনিয়ায় আযাব পাঠিয়ে শুধুমাত্র তাদের শেষ বংশধরদের আরো বেশী জুলুম করার সূত্রটি ছিন্ন করা হয়েছিল৷ আদালতের আসল কাজ তো এখনো হয়ইনি৷ প্রত্যেক জালেমকে তার জুলুমের প্রতিদান দিতে হবে৷ প্রত্যেক মজলুমের প্রতি জুলুমের ফলে যে ক্ষতি সাধিত হয়েছে তাকে তার ক্ষতিপূরণ করে দিতে হবে৷ আর যেসব লোক অসৎকাজের এ দুর্বার স্রোতের মোকাবিলায় ন্যায়, সত্য ও সততার পথে অবিচল থেকে সৎকাজ করার জন্য সর্বক্ষণ তৎপর থেকেছে এবং সারাজীবন এ পথে কষ্ট সহ্য করেছে তাদেরকে পুরষ্কার দিতে হবে৷ অপরিহার্যভাবে এসব কাজ কোন এক সময় হতেই হবে৷ কারণ দুনিয়ায় প্রতিদান ও প্রতিবিধান আইনের নিরবিচ্ছিন্ন কার্যকারিতা পরিষ্কারভাবে জানিয়ে দিচ্ছে যে, মানুষের কার্যাবলীকে তার নৈতিক মূল্যমানের ভিত্তিতে ওজন করা এবং পুরষ্কার ও শাস্তি প্রদান করাই বিশ্ব পরিচালনার চিরন্তন রীতি ও পদ্ধতি৷ এ দু'টি যুক্তির সাথে সাথে আলোচ্য আয়াতে আরো একটি উপদেশ রয়েছে৷ সেটি এই যে, পূর্ববর্তী অপরাধীদের পরিণতি দেখে তা থেকে শিক্ষা গ্রহণ করো এবং আখেরাত অস্বীকার করার যে নির্বোধসূলভ বিশ্বাস তাদেরকে অপরাধীতে পরিণত করেছিল তার উপর টিকে থাকার চেষ্টা করো না৷
৮৭. অর্থাৎ তুমি তোমার বুঝাবার দায়িত্ব পালন করেছো৷ এখন যদি তারা না মেনে নেয় এবং নিজেদের নির্বোধসুলভ কর্মকাণ্ডের ওপর জিদ ধরে আল্লাহর আযাবের ভাগী হতে চায়, তাহলে অনর্থক তাদের অবস্থার জন্য হৃদয় দুঃখ ভরাক্রান্ত করে নিজেকে কষ্ট দান কেন? আবার তারা সত্যের সাথে লড়াই এবং তোমার সংশোধন প্রচেষ্টাবলীকে হেয় প্রতিপন্ন করার জন্য যেসব হীন চক্রান্ত করছে সেজন্য তোমার মনঃকষ্ট পাবার কোন কারণ নেই৷ তোমার পেছনে আছে আল্লাহর শক্তি৷ তারা তোমার কথা না মানলে তাদের নিজেদেরই ক্ষতি হবে, তোমার কোন ক্ষতি হবে না৷
৮৮. উপরের আয়াতের মধ্যে যে হুমকি প্রচ্ছন্ন রয়েছে তার কথাই এখানে বলা হয়েছে৷ এর অর্থ ছিল এই যে, এ আয়াতে পরোক্ষভাবে আমাদের শাস্তি দেবার যে কথা বলা হচ্ছে, তা কবে কার্যকর হবে? আমরা তো তোমার আহ্বান প্রত্যাখ্যান করেছি এবং তোমাকে হেয় প্রতিপন্ন করার জন্যও আমরা যথাসাধ্য চেষ্টা করেছি৷ তাহলে এখন আমাদের শাস্তি দেয়া হচ্ছে না কেন?
৮৯. এটি একটি রাজসিক বাকভংগীমা৷ সর্বশক্তিমানের বাণীর মধ্যে যখন "সম্ভবত", "বিচিত্র কি" এবং "অসম্ভব কি" ধরনের শব্দাবলী এসে যায় তখন তার মধ্যে সন্দেহের কোন অর্থ থাকে না বরং তার মাধ্যমে একটি বেপরোয়া ভাব ফুটে উঠে৷ অর্থাৎ তাঁর শক্তি এতই প্রবল ও প্রচণ্ড যে, তাঁর কোন জিনিস চাওয়া এবং তা হয়ে যাওয়া যেন একই ব্যাপার৷ তিনি কোন কাজ করতে চান এবং তা করা সম্ভব হলো না এমন কোন কথা কল্পনাও করা যেতে পারে না৷ এজন্য তাঁর পক্ষে "এমন হওয়া বিচিত্র কি" বলা এ অর্থ প্রকাশ করে যে, যদি তোমরা সোজা না হও তাহলে এমনটি হবেই৷ সামান্য একজন দারোগাও যদি পল্লীর কোন অধিবাসীকে বলে তোমার দুর্ভাগ্য হাতছানি দিচ্ছে৷ তাহলে তার রাতের ঘুম হারাম হয়ে যায়৷ সেক্ষেত্রে সর্বশক্তিমান আল্লাহ যদি কাউকে বলেন, তোমার দুঃসময় তেমন দূরে নয়, তাহলে এরপরও সে কিভাবে নির্ভয়ে দিন কাটায়৷
৯০. অর্থাৎ লোকেরা দোষী সাব্যস্ত হওয়ার সাথে সাথেই আল্লাহ তাদেরকে পাকড়াও করেন না বরং তাদের সামলে নেবার সুযোগ দেন, এটা তো রব্বুল আলামীনের অনুগ্রহ৷ কিন্তু অধিকাংশ লোক এজন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে এ সুযোগ ও অবকাশকে নিজেদের সংশোধনের জন্য ব্যবহার করে না৷ বরং পাকড়াও হতে দেরি হচ্ছে দেখে মনে করে এখানে কোন পাকড়াওকারী নেই, কাজেই যা মন চায় করে যেতে থাকো এবং যে বুঝাতে চায় তার কথা বুঝতে যেয়ো না৷
৯১. অর্থাৎ তিনি যে শুধু তাদের প্রকাশ্য কর্মতৎপরতাই জানেন তাই নয় বরং তারা মনের মধ্যে যেসব মারাত্মক ধরণের হিংসা-বিদ্বেষ লুকিয়ে রাখে এবং যেসব চক্রান্ত ও কূটকৌশলের কথা মনে মনে চিন্তা করতে থাকে, সেগুলোও তিনি জানেন৷ তাই যখন তাদের সর্বনাশের সময় এসে যাবে তখন তাদেরকে পাকড়াও করা যেতে পারে এমন একটি জিনিসও বাদ রাখা হবে না৷ এটি ঠিক এমন এক ধরণের বর্ণনা ভংগী যেমন একজন শাসক নিজ এলাকার কোন বদমায়েশকে বলে, তোমার সমস্ত কীর্তি-কলাপের খবর আমি রাখি৷ এর অর্থ কেবল এতটুকুই হয় না যে, তিনি যে সব কিছুই জানেন একথা তাকে শুধু জানিয়েই দিচ্ছেন বরং এই সংগে এ অর্থও হয় যে, তুমি নিজের তৎপরতা থেকে বিরত হও, নয়তো মনে রেখো, যখন পাকড়াও হবে তখন প্রত্যেকটি অপরাধের জন্য তোমাকে পুরোপুরি শাস্তি দেয়া হবে৷
৯২. এখানে কিতাব মানে কুরআন নয় বরং বরং মহান সর্বশক্তিমান আল্লাহর রেকর্ড, যাতে ছোট বড় ও ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র সবকিছু রক্ষিত আছে৷
৯৩. পূর্ববর্তী ও পরবর্তী উভয় বক্তব্যের সাথে একথাটির সম্পর্ক রয়েছে৷ পূর্ববর্তী বক্তব্যের সাথে এর সম্পর্ক হচ্ছে নিম্নরূপঃ এই অদৃশ্যজ্ঞানী আল্লাহর জ্ঞানের একটি প্রকাশ হচ্ছে এই যে, একজন নিরক্ষর ব্যক্তির মুখ থেকে এ কুরআনে এমন সব ঘটনার স্বরূপ উদ্ঘাটন করা হচ্ছে যা বনী ইসরাঈলের ইতিহাসে ঘটেছে৷ অথচ বনী ইসরাঈলদের আলেমদের মধ্যেও তাদের নিজেদের ইতিহাসের এসব ঘটনার ব্যাপারে মতভেদ রয়েছে (এর নজির সূরা নমলের প্রথম দিকের রুকূগুলোতেই পাওয়া যাবে, যেমন আমরা টীকায় বলেছি)৷ আর পরবর্তী বিষয়বস্তুর সাথে এর সম্পর্ক হচ্ছে নিম্নরূপ : যেভাবে মহান আল্লাহ ঐ সমস্ত মতবিরোধের ফয়সালা করে দিয়েছেন অনুরূপভাবে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও তাঁর বিরোধীদের মধ্যেও যে মতবিরোধ চলছে তারও ফায়সালা করে দেবেন৷ তাদের মধ্যে কে সত্যপন্থী এবং কে মিথ্যাপন্থী তা তিনি সুস্পষ্টভাবে প্রকাশ করে দেবেন৷ কার্যত এ আয়াতগুলো নাযিল হওয়ার পর মাত্র কয়েক বছর অতিক্রান্ত হতেই এ ফায়সালা দুনিয়ার সামনে এসে গেলো৷ গোটা আরব ভূমিতে এবং সমগ্র কুরাইশ গোত্রে এমন এক ব্যক্তি ছিল না যে একথা মেনে নেয়নি যে, আবু জেহেল ও আবু লাহাব নয় বরং মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামই সত্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিলেন৷ তাদের নিজেদের সন্তানরাও একথা মেনে নিয়েছিল যে, তাদের বাপ-দাদারা ভুল ও মিথ্যার ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল৷
৯৪. অর্থাৎ তাদের জন্য যারা এ কুরআনের দাওয়াত গ্রহণ করে এবং কুরআন যা পেশ করেছ তা মেনে নেয়৷ এ ধরণের লোকেরা তাদের জাতি যে গোমরাহীতে লিপ্ত রয়েছে তা থেকে রক্ষা পাবে৷ এ কুরআনের বদৌলতে তারা জীবনের সহজ সরল পথ লাভ করবে এবং তাদের প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহ বর্ষিত হবে৷ কুরাইশ বংশীয় কাফেররা এর কল্পনাও আজ করতে পারে না৷ এ অনুগ্রহের বারিধারাও মাত্র কয়েক বছর পরই দুনিয়াবাসী দেখে নিয়েছে৷ দুনিয়াবাসী দেখেছে, যেসব লোক আরব মরুর এক অখ্যাত অজ্ঞাত এলাকায় অবহেলিত জীবন যাপন করছিল এবং কুফুরী জীবনে বড়জোর একদল সফল নিশাচর দস্যু হতে পারতো তারাই এ কুরআনের প্রতি ঈমান আনার পর সহসাই সারা দুনিয়ার একটি বিশাল ভূখণ্ডের শাসনকর্তায় পরিণত হয়ে গেছে৷
৯৫. অর্থাৎ কুরাইশ বংশীয় কাফের ও মু'মিনদের মধ্যে৷
৯৬. অর্থাৎ তাঁর ফয়সালা প্রবর্তন করার পথে কোন শক্তি বাঁধা দিতে পারে না এবং তাঁর ফায়সালার মধ্যে কোন ভুলের সম্ভবনাও নেই৷
৯৭. অর্থাৎ এমন ধরণের লোকদেরকে, যাদের বিবেক মরে গেছে এবং জিদ, একগুয়েমী ও রসমপূজা যাদের মধ্যে সত্য মিথ্যার পার্থক্য উপলব্ধি করার কোন প্রকার যোগ্যতাই বাকি রাখেনি৷
৯৮. অর্থাৎ যারা তোমার কথা শুনবে না বলে শুধু কান বন্ধ করেই ক্ষান্ত হয়না বরং যেখানে তোমাদের কথা তাদের কানে প্রবেশ করতে পারে বলে তারা আশংকা করে সেখান থেকে তারা পাশ কাটিয়ে চলে যায়৷
৯৯. অর্থাৎ তাদের হাত ধরে জোর করে সোজা পথে টেনে আনা এবং তাদেরকে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে চলা তোমার কাজ নয়৷ তুমি তো কেবলমাত্র মুখের কথা এবং নিজের চারিত্রিক উদাহরণের মাধ্যমেই জানাতে পারো যে, এটি সোজা পথ এবং এসব লোক যে পথে চলছে সেটি ভুল পথ৷ কিন্তু যে নিজের চোখ বন্ধ করে নিয়েছে এবং যে একদম দেখতেই চায় না তাকে তুমি কেমন করে পথ দেখাতে পারো!
১০০. অর্থাৎ কিয়ামত নিকটবর্তী হবে, যার প্রতিশ্রুতি তাদেরকে দেয়া হচ্ছে৷
১০১. হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমরের (রা) বক্তব্য হচ্ছে, যখন দুনিয়ার বুকে সৎকাজের আদেশ দেয়া ও অসৎকাজ থেকে বিরত রাখার মতো কোন লোক থাকবে না তখনই এ ঘটনা ঘটবে৷ ইবনে মারদুইয়াহ হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রা.) থেকে একটি হাদীস উদ্ধৃত করেছেন৷ তাতে তিনি বলছেন, তিনি একথাটি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে শুনেছিলেন৷ এ থেকে জানা যায়, যখন মানুষ সৎকাজের আদেশ করা ও অসৎকাজ থেকে বিরত রাখার দায়িত্ব পালন করবে না তখন কিয়ামত অনুষ্ঠিত হওয়ার পূর্বে আল্লাহ একটি জীবের মাধ্যমে শেষ ফায়সালা করবেন৷ এটি একটি জীব হবে অথবা একটি বিশেষ ধরণের প্রজাতির জীব বহু সংখ্যায় সারা দুনিয়ায় ছড়িয়ে পড়বে, একথা সুস্পষ্ট নয়৷

- دابَّة من الارض শব্দগুলোর মধ্যে দু'ধরণের অর্থের সম্ভাবনা আছে৷ মোটকথা, সে যে কথা বলবে তা হবে এই : আল্লাহর যেসব আয়াতের মাধ্যমে কিয়ামত আসার ও আখেরাত প্রতিষ্ঠিত হওয়ার খবর দেয়া হয়েছিল লোকেরা সেগুলো বিশ্বাস করেনি, কাজেই এখন দেখো সেই কিয়ামতের সময় এসে গেছে এবং জেনে রাখো, আল্লাহর আয়াত সত্য ছিল৷ "আর লোকেরা আমাদের আয়াত বিশ্বাস করতো না৷" এ বাক্যাংশটি সেই জীবের নিজের উক্তির উদ্ধৃতি হতে পারে অথবা হতে পারে আল্লাহর পক্ষ থেকে তার উক্তির বর্ণনা৷ যদি এটা তার কথার উদ্ধৃতি হয়ে থাকে, তাহলে এখানে "আমাদের" শব্দটি সে ঠিক তেমনিভাবে ব্যবহার করবে যেমন প্রত্যেক সরকারি কর্মচারী "আমরা" অথবা "আমাদের" শব্দ ব্যবহার করে থাকে৷ অর্থাৎ সে সরকারের পক্ষ থেকে কথা বলছে, ব্যক্তিগতভাবে নিজের পক্ষ থেকে কথা বলছে না৷ দ্বিতীয় অবস্থায় কথা একেবারে সুস্পষ্ট যে, আল্লাহ তার কথাকে যেহেতু নিজের ভাষায় বর্ণনা করছেন, তাই তিনি "আমাদের আয়াত" শব্দ ব্যবহার করেছেন৷

এ জীব কখন বের হবে? এ সম্পর্কে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন : "সূর্য পশ্চিম দিক থেকে উদিত হবে এবং একদিন দিন দুপুরে এ জানোয়ার বের হয়ে আসবে৷ এর মধ্যে যে নিদর্শনটিই আগে দেখা যাবে সেটির প্রকাশ ঘটবে অন্যটির কাছাকাছিই" (মুসলিম)৷ মুসলিম, ইবনে মাজাহ, তিরমিযী, মুসনাদে আহমদ ইত্যাদি হাদীস গ্রন্থগুলোতে অন্য যে হাদীসগুলো বর্ণিত হয়েছে তাতে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন : কিয়ামতের নিকটবর্তী সময়ে দাজ্জালের আর্বিভাব, ভূগর্ভের প্রাণীর প্রকাশ, ধোঁয়া ও সূর্যের পশ্চিম দিক থেকে উদিত হওয়া, এগুলো এমন সব নিদর্শন যা একের পর এক প্রকাশ হতে থাকবে৷

এ জীবের সারবস্তু (Quiddity) ও আকৃতি-প্রকৃতি কি, কোথায় থেকে এর প্রকাশ ঘটবে এবং এ ধরণের অন্যান্য অনেক বিস্তারিত বিবরণ সম্পর্কে বিভিন্ন প্রকার হাদীসে বর্ণিত হয়েছে৷ এগুলো পরস্পর বিভিন্ন ও বিপরীতধর্মী৷ এগুলোর আলোচনা কেবলমাত্র অস্থিরতা ও চাঞ্চল্য সৃষ্টিতে সাহায্য করবে এবং এগুলো জেনে কোন লাভও নেই৷ কারণ কুরআনে যে উদ্দেশ্যে এর উল্লেখ করা হয়েছে এ বিস্তারিত বর্ণনার সাথে তার কোন সম্পর্ক নেই৷

এখন ব্যাখ্যা সাপেক্ষ ব্যাপার হলো, একটি প্রাণী এভাবে মানুষের সাথে মানুষের ভাষায় কথা বলার হেতু কি? আসলে এটি আল্লাহর অসীম শক্তির একটি নিদর্শন৷ তিনি যাকে ইচ্ছা তাকে বাকশক্তি দান করতে পারেন৷ কিয়ামতের পূর্বে তিনি তো শুধুমাত্র একটি প্রাণীকে বাকশক্তি দান করবেন কিন্তু যখন কিয়ামত কায়েম হয়ে যাবে তখন আল্লাহর আদালতে মানুষের চোখ, কান ও তার গায়ের চামড়া পর্যন্ত কথা বলতে থাকবে৷ যেমন কুরআনে সুস্পষ্ট ভাষায় বলা হয়েছে :

حَتَّى إِذَا مَا جَاءُوهَا شَهِدَ عَلَيْهِمْ سَمْعُهُمْ وَأَبْصَارُهُمْ وَجُلُودُهُمْ بِمَا كَانُوا يَعْمَلُونَ-------وَقَالُوا لِجُلُودِهِمْ لِمَ شَهِدْتُمْ عَلَيْنَا قَالُوا أَنْطَقَنَا اللَّهُ الَّذِي أَنْطَقَ كُلَّ شَيْءٍ (حـــم السجدة: ২১-২০)