(২৭:১৫) (অন্যদিকে) আমি দাউদ ও সুলাইমানকে জ্ঞান দান করলাম ১৮ এবং তারা বললো, সেই আল্লাহর শোকর যিনি তাঁর বহু মু’মিন বান্দার ওপর আমাদের শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন৷ ১৯
(২৭:১৬) আর দাউদের উত্তরাধিকারী হলো সুলাইমান ২০ এবং সে বললো, “হে লোকেরা আমাকে শেখানো হয়েছে পাখিদের ভাষা ২১ এবং আমাকে দেয়া হয়েছে সবরকমের জিনিস৷ ২২ অবশ্যই এ (আল্লাহর) সুস্পষ্ট অনুগ্রহ৷”
(২৭:১৭) সুলাইমানের জন্য জিন, মানুষ ও পাখিদের সৈন্য সমবেত করা হয়েছিল ২৩ এবং তাদেরকে পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রাখা হতো৷
(২৭:১৮) (একবার সে তাদের সাথে চলছিল) এমন কি যখন তারা সবাই পিঁপড়ের উপত্যকায় পৌঁছুল তখন একটি পিঁপড়ে বললো, “হে পিঁপেড়েরা! তোমাদের গর্তে ঢুকে পড়ো৷ যেন এমন না হয় যে, সুলাইমান ও তার সৈন্যরা তোমাদের পিশে ফেলবে এবং তারা টেরও পাবে না৷” ২৪
(২৭:১৯) সুলাইমান তার কথায় মৃদু হাসলো এবং বললো- “হে আমার রব! আমাকে নিয়ন্ত্রণে রাখো, ২৫ আমি যেন তোমার এ অনুগ্রহের শোকর আদায় করতে থাকি যা তুমি আমার প্রতি ও আমার পিতা-মাতার প্রতি করেছো এবং এমন সৎকাজ করি যা তুমি পছন্দ করো এবং নিজ অনুগ্রহে আমাকে তোমার সৎকর্মশীল বান্দাদের দলভুক্ত করো৷” ২৬
(২৭:২০) (আর একবার) সুলাইমান পাখিদের খোঁজ-খবর নিল ২৭ এবং বললো, “কি ব্যাপার, আমি অমুক হুদহুদ পাখিটিকে দেখছিনা যে! সে কি কোথাও অদৃশ্য হয়ে গেছে?
(২৭:২১) আমি তাকে কঠিন শাস্তি দেবো অথবা জবাই করে ফেলবো, নয়তো তাকে আমার কাছে যুক্তিসংগত কারণ দর্শাতে হবে৷” ২৮
(২৭:২২) কিছুক্ষণ অতিবাহিত না হতেই সে এসে বললো, “আমি এমন সব তথ্য লাভ করেছি যা আপনি জানেন না৷ আমি সাবা সম্পর্কে নিশ্চিত সংবাদ নিয়ে এসেছি৷ ২৯
(২৭:২৩) আমি সেখানে এক মহিলাকে সে জাতির শাসকরূপে দেখেছি৷ তাকে সবরকম সাজ সরঞ্জাম দান করা হয়েছে এবং তার সিংহাসন খুবই জমকালো৷
(২৭:২৪) আমি তাকে ও তার জাতিকে আল্লাহর পরিবর্তে সূর্যের সামনে সিজদা করতে দেখেছি” ৩০-- শয়তান ৩১ তাদের কার্যাবলী তাদের জন্য শোভন করে দিয়েছে ৩২ এবং তাদেরকে সঠিক পথ থেকে বিচ্যুত করে দিয়েছেন এ কারণে তারা সোজা পথ পায় না৷
(২৭:২৫) (শয়তান তাদেরকে বিপথগামী করেছে এ জন্য ) যাতে তারা সেই আল্লাহকে সিজদা না করে যিনি আকাশ ও পৃথিবীর গোপন জিনিসসমূহ বের করেন ৩৩ এবং সে সবকিছু জানেন যা তোমরা গোপন করো ও প্রকাশ করো৷ ৩৪
(২৭:২৬) আল্লাহ, ছাড়া আর কেউ ইবাদতের হকদার নয় তিনি মহান আরশের মালিক৷ ৩৫
(২৭:২৭) সুলাইমান বললো: “এখনই আমি দেখছি তুমি সত্য বলছো অথবা মিথ্যাবাদীদের অন্তরভুক্ত৷
(২৭:২৮) আমার এ পত্র নিয়ে যাও এবং এটি তাদের প্রতি নিক্ষেপ করো, তারপর সরে থেকে দেখো তাদের মধ্যে কি প্রতিক্রিয়া হয়৷” ৩৬
(২৭:২৯) রাণী বললো, “হে দরবারীরা! আমার প্রতি একটি বড় গুরুত্বপূর্ণ পত্র নিক্ষেপ করা হয়েছে৷
(২৭:৩০) তা সুলাইমানের পক্ষ থেকে এবং আল্লাহ্ রহমানুর রহীমের নামে শুরু করা হয়েছে৷”
(২৭:৩১) বিষয়বস্তু হচ্ছে: “আমার অবাধ্য হয়ো না এবং মুসলিম হয়ে আমার কাছে হাজির হয়ে যাও৷” ৩৭
১৮. অর্থাৎ সত্যের জ্ঞান৷ আসলে তাদের কাছে নিজস্ব কোন জ্ঞান নেই, যা কিছু আছে তা আলাহর দেয়া এবং তা ব্যবহার করার যে মতা তাদেরকে দেয়া হয়েছে তাকে আল্লাহর ইচ্ছা ও মর্জি অনুযায়ী ব্যবহার করা উচিত৷ আর এ মতার সঠিক ব্যবহার ও অপব্যবহারের জন্য তাদেরকে প্রকৃত মালিকের কাছে জবাবদিহি করতে হবে৷ ফেরাউন যে মূর্খতায় নিমজ্জিত ছিল এ জ্ঞান তার বিপরীতধর্মী৷ ফেরাউনী অজ্ঞতা ও মূর্খতার ফলে যে চরিত্র গড়ে উঠেছিল তার নমুনা উপরে আলোচিত হয়েছে৷ এ জ্ঞান কোন্ ধরনের নৈতিক চরিত্রের আদর্শ পেশ করে এখন তা বলা হচ্ছে ৷ শাসন মতা ধন-সম্পদ, মান-মর্যাদা, শক্তি দু'পরেই সমান৷ ফেরাউনও এগুলো লাভ করেছিল এবং দাউদ ও সুলাইমান আলাইহিমাস সালামও লাভ করেছিলেন৷ কিন্তু অজ্ঞতা তাদের মধ্যে কত বড় ব্যবধান সৃষ্টি করে দিয়েছে৷
১৯. অর্থাৎ অন্য মু'মিন বান্দাও এমন ছিল যাদেরকে খেলাফত দান করা যেতে পারতো৷ কিন্তু এটা আমাদের কোন ব্যক্তিগত গুণ নয় বরং নিছক আলাহর অনুগ্রহ৷ তিনি নিজ অনুগ্রহে আমাদের এ রাজ্যের শাসন কর্তৃত্ব পরিচালনার জন্য নির্বাচিত করেছেন৷
২০. উত্তরাধিকার বলতে ধন ও সম্পদ-সম্পত্তির উত্তরাধিকার বুঝানো হয়নি৷ বরং নবুওয়াত ও খিলাফতের ক্ষেত্রে দাউদের স্থলাভিষিক্ত হওয়ার কথা বলা হয়েছে৷ সম্পদ-সম্পত্তির উত্তরাধিকার বলতে যদি ধরে নেয়াও যায় তা স্থানান্তরিত হয়, তাহলে তা এককভাবে হযরত সুলাইমানের দিকেই স্থানান্তরিত হতে পারতো না৷ কারণ হযরত দাউদের অন্য সন্তানরাও ছিল৷ তাই এ আয়াদ দ্বারা নবী (সা) এর নিম্নোক্ত হাদীস দুটিকে খণ্ডন করা যায় নাঃ لا نورث ما تركنا صدقة "আমাদের নবীদের উত্তরাধিকার বন্টন করা হয় না, যা কিছু আমরা পরিত্যাগ করে যাই তা হয় সাদকা৷" (বুখারী, খুমুস প্রদান করা ফরয অধ্যায়) এবং

انَّ النَّبىَّ لا يورث انَّما ميراثه فى فقراء والمسلمين والمساكين

"নবীর কোন উত্তরাধিকারী হয় না৷ যা কিছু তিনি ত্যাগ করে যান তা মুসলমানদের গরীব ও মিসকীনদের মধ্যে ভাগ করে দেয়া হয়৷" (মুসনাদে আহমদ, আবু বকর সিদ্দিক বর্ণিত ৬০ ও ৭৮ নং হাদীস)৷

হযরত সুলাইমান আলাইহিস সালাম ছিলেন হযরত দাউদের (আ) সবচেয়ে ছোট ছেলে৷ তাঁর আসল ইবরানী নাম ছিল সোলোমোন৷ এটি ছিল "সলীম" শব্দের সমার্থক৷ খৃস্ট পূর্ব ৯৬৫ অব্দে তিনি হযরদ দাউদেও স্থলাভিষিক্ত হন এবং খৃঃ পূর্ব ৯২৬ পর্যন্ত প্রায় ৪০ বছর শাসনকার্য পরিচালনা করেন৷ (তাঁর বিস্তারিত জীবন বৃত্তান্ত জানার জন্য পড়–ন তাফহীমুল কুরআন, আল হিজর, ৭ টীকা, আল আম্বিয়া ৭৪-৭৫ টীকা৷) তাঁর রাজ্যসীমা সম্পর্কে আমাদের মুফাসসিরগণ অতি বর্ণনের আশ্রয় নিয়েছেন অনেক বেশী৷ তারা তাঁকে দুনিয়ার অনেক বিরাট অংশের শাসক হিসাবে দেখিয়েছেন৷ অথচ তাঁর রাজ্য কেবলমাত্র বর্তমান ফিলিস্তিন ও জর্ডান রাষ্ট্র সমন্বিত ছিল এবং সিরিয়ার একটি অংশ এর অর্ন্তভূক্ত ছিল৷ (দেখুন বাদশাহ সুলাইমানের রাজ্যের মানচিত্র, তাফহীমুল কুরআন সূরা বনী ইসরাঈল)৷
২১. হযরত সুলাইমানকে (আ) যে পশু-পাখির ভাষা শেখানো হয়েছিল, বাইবেলে সে কথা আলোচিত হয়নি৷ কিন্তু বনী ইসরাঈলের বর্ণনাসমূহে এর সুস্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে৷ (জুয়িশ ইনসাইকোপেডিয়া, ১১ খণ্ড, ৪৩৯ পৃষ্ঠা)৷
২২. অর্থাৎ আল্লাহর দেয়া সবকিছু আমার কাছে আছে ৷ একথাটিকে শাব্দিক অর্থে গ্রহণ করা ঠিক নয়৷ বরং এর অর্থ হচ্ছে, আলাহর দেয়া ধন-দৌলত ও সাজ-সরঞ্জামের আধিক্য৷ সুলাইমান অহংকারে স্ফীত হয়ে একথা বলেননি৷ বরং তাঁর উদ্দেশ্য ছিল আল্লাহর অনুগ্রহ এবং তাঁর দান ও দাক্ষিণ্যের শোকর আদায় করা৷
২৩. জ্বীনেরা যে হযরত সুলাইমানের সেনাবাহিনীর অংশ ছিল এবং তিনি তাদের কাজে নিয়োগ করতেন, বাইবেল একথারও উল্লেখ নেই৷ কিন্তু তালমূদে ও রাব্বীদের বর্ণনায় এর বিস্তারিত উল্লেখ রয়েছে৷ (জুয়িশ ইনসাইকোপেডিয়া, ১১ খণ্ড, ৪৪০ পৃষ্ঠা৷) বর্তমান যুগের কোন কোন ব্যক্তি একথা প্রমাণ করার জন্য সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালিয়েছেন যে, জ্বীন ও পাখি বলে আসলে জ্বীন ও পাখির কথা বুঝানো হয়নি বরং মানুষের কথা বুঝানো হয়েছে৷ মানুষরাই হযরত সুলাইমানের সেনাবাহিনীর বিভিন্ন কাজে নিয়োজিত ছিল৷ তারা বলেন, জ্বীন মানে পার্বত্য উপজাতি৷ এদের উপর হযরত সুলাইমান বিজয় লাভ করেছিলেন৷ তাঁর অধীনে তারা বিষ্ময়কর শক্তি প্রয়োগের ও মেহনতের কাজ করতো৷ আর পাখি মানে অশ্বারোহী সেনাবাহিনী৷ তারা পদাতিক বাহিনীর তুলনায় অনেক বেশী দ্রুততা সম্পন্ন ছিল৷ কিন্তু এটি কুরআন মজীদের শব্দের অযথা বিকৃত অর্থ করার নিকৃষ্টতম প্রয়াস ছাড়া আর কিছুই নয়৷ কুরআন এখানে জ্বীন, মানুষ ও পাখি তিনটি আলাদা আলাদা প্রজাতির সেনাদলের কথা বর্ণনা করছে এবং তিনের ওপর ال (আলিফ লাম) বসানো হয়েছে তাদের পৃথক পৃথক প্রজাতিকে চিহ্নিত করার উদ্দেশ্যে৷ তাই আল জ্বীন (জ্বীন জাতি) ও আত্ তাইর (পাখি জাত) কোন ক্রমেই আল ইন্স (মানুষ জাতি)-এর অর্ন্তভূক্ত হতে পারে না৷ বরং তারা তার থেকে আলাদা দুটি প্রজাতিই হতে পারে৷ তাছাড়া যে ব্যক্তি সামান্য আরবী জানে সে-ও কখনো এ কথা কল্পনা করতে পারে না যে, এ ভাষায় নিছক জ্বীন শব্দ বলে তার মাধ্যমে মানুষদের কোন দল বা নিছক পাখি (তাইর) শব্দ বলে তার মাধ্যমে অশ্বারোহী বাহিনী অর্থ করা যেতে পারে এবং কোন আরব এ শব্দগুলো শুনে তার এ অর্থ বুঝতে পারে৷ নিছক প্রচলিত বাগধারা অনুযায়ী কোন মানুষকে তার অস্বাভাবিক কাজের কারণে জ্বীন অথবা কোন মেয়েকে তার সৌন্দর্যের কারণে পরী কিংবা কোন দ্রুতগতি সম্পন্ন পুরুষকে পাখি বলা হয় বলেই এর অর্থ এই হয় না যে, এখন জ্বীন মানে শক্তিশালী লোক, পরী মানে সুন্দরী মেয়ে এবং পাখি মানে দ্রুতগতি সম্পন্ন মানুষই হবে৷ এ শব্দগুলোর অসেব অর্থ তো তাদের রূপক অর্থ, প্রকৃত অর্থ নয়৷ আর কোন ব্যক্যের মধ্যে কোন শব্দকে তার প্রকৃত অর্থ বাদ দিয়ে রূপক অর্থে তখনই ব্যবহার করা হয় বা শ্রোতা তার রূপক অর্থ তখনই গ্রহণ করে যখন আশেপাশে এমন কোন সুস্পষ্ট প্রসংগ বা পূর্বাপর সামঞ্জস্য পাওয়া যায় যার ভিত্তিতে এ ধারণা করা যেতে পারে যে, জ্বীন ও পাখি শব্দ দু'টি তাদের প্রকৃত অর্থে নয় বরং রূপক অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে? বরং সামনের দিকে ঐ দু'টি দলের প্রত্যেক ব্যক্তির যে অবস্থা ও কাজ বর্ণনা করা হয়েছে তা এ পেঁচালো ব্যাখ্যার সম্পূর্ণ বিরোধী অর্থ প্রকাশ করছে৷ কুরআনের কথায় কোন ব্যক্তির মন যদি পুরোপুরি নিশ্চিত হতে না পারে, তাহলে তার পরিষ্কার বলে দেয়া উচিত এ কথা আমি মানি না৷ কিন্তু মানুষ কুরআনের পরিষ্কার ও দ্ব্যর্থহীন শব্দগুলোকে দুমড়ে মুচড়ে নিজের মনের মতো অর্থের ছাঁচে সেগুলো ঢালাই করবে এবং এ কথা প্রকাশ করতে থাকবে যে, সে কুরআনের বর্ণনা মানে, অথচ আসলে কুরআন যা কিছু বর্ণনা করেছে সে তাকে নয় বরং নিজের জোর করে তৈরী করা অর্থই মানে-এটি মানুষের একটি মস্তবড় চারিত্রিক কাপুরুষতা ও তাত্ত্বিক খেয়ানত ছাড়া আর কী হতে পারে?
২৪. আজকালকার কোন কোন মুফাসসির এ আয়াতটিরও পেঁচালো ব্যাখ্যা করেছেন৷ তারা বলেন, "ওয়াদী-উন্-নাম্ল" মানে পিঁপড়ের উপত্যকা নয় বরং এটি ছিল সিরীয় এলাকায় অবস্থিত একটি উপত্যকার নাম৷ আর নামলাহ্ মানে একটি পিঁপড়ে নয় বরং এটি একটি গোত্রের নাম৷ এভাবে তারা এ আয়াতের অর্থ বর্ণনা করে বলেন, "যখন হযরত সুলাইমান আলাইহিস সালাম নাম্লুপত্যকায় পৌঁছেন তখন একজন নাম্লী বললো, "হে নামল গোত্রের লোকেরা.......৷" কিন্তু এটিও এমন একটি পেঁচালো ব্যাখ্যা কুরআনের শব্দ যার সহযোগী হয় না৷ ধরে নেয়া যাক, "ওয়াদিউন নামল" বলতে যদি ঐ উপত্যকা মনে করা হয় এবং সেখানে বনী নাম্ল নামে কোন গোত্র বাস করতো বলে যদি ধরে নেয়া যায়, তাহলেও নাম্ল গোত্রের এক ব্যক্তিকে "নামলাহ্" বলা আরবী ভাষার বাকরীতির সম্পূর্ণ বিরোধী৷ যদিও পশুদের নামে আরবে বহু গোত্রের নাম রয়েছে৷ যেমমম কাল্ব (কুকুর), আসাদ (সিংহ) ইত্যাদি কিন্তু কোন আরববাসী কাল্ব গোত্রের কোন ব্যক্তি সম্পর্কে قال كلب (একজন কুকুর একথা বললো) এবং আসাদ গোত্রের কোন ব্যক্তি সম্পর্কে قال اسد (একজন সিংহ বললো) কখনো বলবে না৷ তাই বনী নাম্লের এক ব্যক্তি সম্পর্কে এভাবে বলা, قَالَتْ نَمْلَةٌ (একজন পিঁপড়ে একথা বললো) পুরোপুরি আরবী বাগধারা ও আরবী বাক্য প্রয়োগ রীতির সম্পূর্ণ পরিপন্থি৷ তারপর নাম্ল গোত্রের এক ব্যক্তির বনী নামল্কে চিৎকার করে একথা বলা, "হে নাম্ল গোত্রীয় লোকেরা! নিজ নিজ গ্রহে ঢুকে পড়ো৷ এমন যেন না হয়, সুলাইমানের সৈন্যরা তোমাদের পিষে ফেলবে এবং তারা জানতেও পারবে না," একেবারেই অর্থহীন৷ কারণ কোন সেনাদল মানুষের কোন দলকে অজ্ঞাতসারে পদদলিত করে না৷ যদি তারা তাদেরকে আক্রমণ করার সংকল্প নিয়ে এসে থাকে, তাহলে তাদের নিজেদের ঘরে ঢুকে পড়া অর্থহীন৷ আক্রমণকারীরা ঘরে ঢুকে তাদেরকে ভালভাবে কচুকাটা করবে৷ আর যদি তারা নিছক কুচকাওয়াজ করতে করতে অতিক্রম করতে থাকে, তাহলে তো তাদের জন্য শুধুমাত্র পথ ছেড়ে দেয়াই যথেষ্ঠ৷ কুচকাওয়াজকারীদের আওতায় এলে মানুষের তি অবশ্যই হতে পারে কিন্তু চলাচলকারী মানুষকে দলে পিষে রেখে যাবে এমনটি তো হতে পারে না৷ কাজেই বনী নাম্ল যদি কোন মানবিক গোত্র হতো এবং তাদের কোন ব্যক্তি নিজের গোত্রকে সতর্ক করতে চাইতো, তাহলে আক্রন্ত হবার আশংকার প্রেক্ষিতে সে বলতো, "হে নাম্ল গোত্রীয়রা! পালাও; পালাও; পাহাড়ের মধ্যে আশ্রয় নাও, যাতে সুলাইমানের সৈন্যরা তোমাদের ধ্বংস করে না দেয়৷" আর আক্রমণের আশংকা না থাকলে সে বলতো, "হে নামল গোত্রীয়রা! পথ থকে সরে যাও, যাতে তোমাদের কেউ সুলাইমানের সেনাদলের সামনে না পড়ে৷"

এ পেঁচালো ব্যাখ্যার মধ্যে আরবী ভাষা ও বিষয়বস্তুর দিক দিয়ে তো এ ভুল ছিল৷ এখন নাম্ল উপত্যকা এবং বনী নামল নামক একটি গোত্রের বাস সম্পর্কে বলা যায়, এটি আসলে একটি কল্পনা ছাড়া আর কিছুই নয়৷ এর পেছনে আদৌ কোন তাত্ত্বিক প্রমাণ নেই৷ যারা একে উপত্যকার নাম বলেছেন তারা নিজেরাই এ বিষয়টির সুস্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, পিঁপড়ের আধিক্যের কারণে একে এ নামে অভিহিত করা হয়েছিল৷ কাতাদাহ্ ও মুকাতিল বলেন, واد بارض الشام كثير النَّمل "সেটি সিরিয়া দেশের একটি উপত্যকা এবং সেখানে পিঁপড়ের আধিক্য রয়েছে৷ কিন্তু ইতিহাস ও ভূগোলের কোন বইতে এবং পুরাতত্ত্বের কোন গবেষণাও এ উপত্যকায় বনী নাম্ল নামক কোন উপজাতির কথা উল্লেখিত হয়নি৷ এটি নিছক একটি মনগড়া কথা৷ নিজেদের কল্পিত ব্যাখ্যাকে সঠিক প্রমাণ করার জন্য এটি উদ্ভাবন করা হয়েছে৷

বনী ইসরাঈলের বর্ণনাসমূহেও এ কাহিনী পাওয়া যায়৷ কিন্তু তার শেষাংশ কুরআনের বর্ণনার বিপরীত এবং হযরত সুলাইমানের মর্যাদার বিরোধী৷ সেখানে বলা হয়েরেছ, হযরত সুলাইমন যখন এমন একটি উপত্যকা অতিক্রম করছিলেন যেখানে খুব বেশী পিঁপড়ে ছিল তখন তিনি শুনলেন একটি পিঁপড়ে চিতকার করে অন্য পিঁপড়েদেরকে বলছে, "নিজেদের ঘরে ঢুকে পড়ো, নয়তো সুলাইমানের সৈন্যরা তোমাদের পিষে ফেলবে৷" একথা শুনে হযরত সুলাইমান (আ) সেই পিঁপড়ের সামনে বড়ই আত্মম্ভরিতা প্রকাশ করলেন৷ এর জবাবে পিঁপড়েটি তাঁকে বললো, তুমি কোথাকার কে? তুমি তো নগণ্য একটি ফোঁটা থেকে তৈরী হয়েছো৷ একথা শুনে হযরত সুলাইমান লজ্জিত হলেন৷ (জুয়িশ ইনসাইকোপিডিয়া ১১ খণ্ড, ৪৪০ পৃষ্ঠা) এ থেকে অনুমান করা যায়, কুরআন কিভাবে বনী ইসরাঈলের বর্ণনাসমূহ সংশোধন করেছে এবং তারা নিজেদের নবীদের চরিত্রে যেসব কলঙ্ক লেপন করেছিল কিভাবে সেগুলো দূর করেছে৷ এসব বর্ণনা থেকে কুরআন সবকিছু চুরি করেছে বলে পশ্চিমী প্রাচ্যবিদরা নির্লজ্জভাবে দাবী করে৷

একটি পিঁপড়ের পক্ষে নিজের সমাজের সদস্যদেরকে কোন একটি আসন্ন বিপদ থেকে সতর্ক করে দেয়া এবং এ জন্য তাদের নিজেদের গর্তে ঢুকে যেতে বলা বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে মোটেই অস্বাভাবিক ব্যাপার নয়৷ এখণ হযরত সুলাইমান একথাটি কেমন করে শুনতে পেলেন এ প্রশ্ন থেকে যায়৷ এর জবাবে বলা যায়, যে ব্যক্তির শ্রবণেন্দ্রিয় আল্লাহর কালামের মতো সূক্ষ্মতর জিনিস আহরণ করতে পারে তার পে পিঁপড়ের কথার মতো স্থুল (ঈৎঁফব) জিনিস আহরণ করা কোন কঠিন ব্যাপার হতে যাবে কেন?
২৫. মূল শব্দ হচ্ছে رَبِّ أَوْزِعْنِي এখানে আরবী ভাষায় وزعٌ এর অর্থ হচ্ছে রুখে দেয়া৷ এ সময় হযরত সুলাইমানের একথা বলা اوْ زعنى ان اشكر نعملتك (আমাকে রুখে দাও, আমি তোমার অনুগ্রহের জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করবো)৷ আমাদের কাছে আসলে এ অর্থ প্রকাশ করে যে, হে আমার রব! তুমি আমাকে যে বিরাট শক্তি ও যোগ্যতা দান করেছো তা এমন যে, যদি আমি সামান্য গাফিল হয়ে যাই তাহলে নাজানি বন্দেগীর সীমানা থেকে বের হয়ে আমি নিজের অহংকারে মত্ত হয়ে কোথা থেকে কোথায় চলে যাই৷ তাই হে আমার পরওয়ারদিগার! তুমি আমাকে নিয়ন্ত্রণে রাখো, যাতে আমি অনুগ্রহ অস্বীকারকারীর পরিবর্তে অনুগ্রহের জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশকারীতে পরিণত হতে পারি৷
২৬. সৎকর্মশীল বান্দাদের দলভূক্ত করার অর্থ সম্ভবত এ হবে যে, আখেরাতে আমার পরিণতি যেন সৎকর্মশীল লোকদের সাথে হয় এবং আমি যেন তাদের সাথে জান্নাতে প্রবেশ করতে পারি৷ কারণ মানুষ যখন সতকাজ করবে তখন সৎকর্মশীল তো সে আপনা আপনিই হয়ে যাবে৷ তবে আখেরাতে কারো জান্নাতে প্রবেশ করা নিছক তার সতকর্মের ভিত্তিতে হতে পারে না বরং এটি আল্লাহর রহমতের ওপর নির্ভর করে৷ হাদীসে বলা হয়েছে, একবার নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, لن يدخل احدكم الجنَّة عمله "তোমাদের কারো নিছক আমল তাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবে না৷" বলা হলো, ولا انت يا رسول الله "আপনার বেলায়ও কি একথা খাটে?" জবাব দিলেন, ولا انا الا ان يتغمدنى الله تعالى برحمته "হ্যাঁ, আমিও নিছক আমার আমলের জোরে জান্নাতে প্রবেশ করবো না, যতণ না আল্লাহ তাঁর রহমত দিয়ে আমাকে ঢেকে নেবেন৷" যদি 'আন নামল, মানে হয় মানুষের একটি উপজাতি এবং 'নামলাহ্' মানে হয় নাম্ল উপজাতির এক ব্যক্তি তাহলে সুলাইমান আলাইহিস সালামের এ দোয়া এ সময় একেবারেই নিরর্থক হয়ে যায়৷ এক বাদশাহর পরাক্রমশালী সেনাবাহিনীর ভয়ে কোন মানবিক গোত্রের এক ব্যক্তির নিজের গোত্রকে বিপত সম্পর্কে সজাগ করা এমন কোন্ ধরণের অস্বাভাবিক কথা যে, এমন একজন সুমহান মর্যাদাশালী পরাক্রান্ত বাদশাহ এ জন্য আল্লাহর কাছে এ দোয়া চাইবেন৷ তবে এক ব্যক্তির দূর থেকে একটু পিপড়ের আওয়াজ শুনার এবং তার অর্থ বুঝার মতো জবরদস্ত শ্রবণ ও জ্ঞান শক্তির অধিকারী হওয়াটা অবশ্যই এমন একটি বিষয় যার ফলে মানুষের আত্মম্ভরিতায় লিপ্ত হয়ে যাওয়ার আশংকা দেখা দেয়৷ এ ধরণের অবস্থায় হযরত সুলাইমানের এ দোয়া যথার্থ ও যথাযথ৷
২৭. অর্থাৎ এমন সব পাখিদের খোঁজ-খবর যাদের সম্পর্কে ওপরে বলা হয়েছে যে, জ্বিন ও মানুষের মতো তাদের সেনাদলও হযরত সুলাইমানের সেনাবাহিনীর অন্তর্ভূক্ত ছিল৷ সম্ভবত হযরত সুলাইমান তাদের মাধ্যমেই সংবাদ আদান-প্রদান, শিকার এবং এ ধরণের অন্যান্য কাজ করতেন৷
২৮. বর্তমান যুগের কোন কোন লোকও বলেন, আরবী ও আমাদের দেশীয় ভাষায় যে পাখিটিকে হুদ্হুদ পাখি বলা হয় হুদ্হুদ আসলে সে পাখিটিকে বুঝানো হয়নি৷ বরং এটি এক ব্যক্তির নাম৷ সে ছিল হযরত সুলাইমান (আ)-এর সেনাবাহিনীর একজন অফিসার৷ এ দাবীর ভিত্তি এ নয় যে, উতিহাসে তারা হযরত সুলাইমান আলাইহিস সালামের সেনাবাহিনীতে হুদ্হুদ নামে একজন সেনা অফিসারের সন্ধান পেয়েছেন৷ বরং শুধুমাত্র এ যুক্তির ভিত্তিতে এ দাবী খাড়া করা হয়েছে যে, প্রাণীদের নামে মানুষের নামকরণ করার রীতি দুনিয়ার সকল ভাষার মতো আরবীতেও প্রচলিত আছে এবং হিব্রু ভাষাতেও ছিল৷ তাছাড়া সামনের দিকে হুদ্হুদের যে কাজ বর্ণনা করা হয়েছে এবং হযরত সুলাইমান (আ) এর সাথে তার যে কথাবার্তা উল্লিখিত হয়েছে তা তাদের মতে একমাত্র একজন মানুষই করতে পারে৷ কিন্তু এ ক্ষেত্রে কুরআন মজীদের পূর্বাপর আলোচনা দেখলে মানুষ পরিষ্কার জানতে পারে যে, এটা কুরআনের তাফসীর নয় বরং তার বিকৃতি এবং এর চেয়ে অগ্রসর হয়ে বলা যায়, তার প্রতি মিথ্যাচারিতা৷ মানুষের বুদ্ধিবৃত্তির সাথে কুরআনের কি কোন শত্রুতা আছে? সে বলতে চায়, হযরত সুলাইমান আলাহিস সালামের সেনাবাহিনী বা পল্টন অথবা তথ্য বিভাগের এক ব্যক্তি অনুপস্থিত ছিল৷ তিনি তার খোঁজ করছিলেন৷ সে হাজির হয়ে এই এই খবর দিলো৷ হযরত সুলাইমান তাকে এই এই কাজে পাঠালেন৷ একথাটা বলতে গিয়ে কুরআন অনবরত এমন হেঁয়ালিপূর্ণ ভাষা ব্যবহার করছে যা পাঠ করে একজন পাঠক প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত তাকে পাখিই মনে করতে বাধ্য হচ্ছে৷ এ প্রসঙ্গে কুরআনের বর্ণনা বিন্যাসের প্রতি একটু দৃষ্টি দিনঃ

প্রথমে বলা হয়, হযরত সুলাইমান আল্লাহর এ অনুগ্রহের জন্য এভাবে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন, "আমাকে পাখির ভাষার জ্ঞান দেয়া হয়েছে" এ বাক্যে তো প্রথমত পাখি শব্দটি ব্যাপক অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে, যার ফলে প্রত্যেকটি আরব ও আরবী জানা লোক এ শব্দটিকে পাখি অর্থে গ্রহণ করবে৷ কারণ এখানে এমন কোন পূর্বাপর প্রসঙ্গ বা সম্পর্ক নেই যা এ শব্দটিকে রূপক বা অপ্রকৃত অর্থে ব্যবহার করার পথ সুগম করতে পারে৷

দ্বিতীয়ত এ মূলে ব্যবহৃত "তাইর" শব্দের অর্থ পাখি না হয়ে যদি মানুষের কোন দল থাকে, তাহলে তার জন্য "মানতিক" (বুলি) শব্দ না বলে "লুগাত" বা "লিসান" (অর্থাত ভাষা) শব্দ বলা বেশী সঠিক হতো৷ আর তাছাড়া কোন ব্যক্তির অন্য কোন মানব গোষ্ঠীর ভাষা জানাটা এমন কোন বিরাট ব্যাপার নয় যে, বিশেষভাবে সে তার উল্লেখ করবে৷ আজকাল আমাদের মধ্যে হাজার হাজার লোক অনেক বিদেশী ভাষা জানে ও বোঝে৷ এটা এমন কি কৃতিত্ব যে জন্য একে মহান আল্লাহর অস্বাভাবিক দান ও অনুগ্রহ গণ্য করা যেতে পারে?

এরপর বলা হয়, "সুলাইমানের জন্য জ্বিন, মানুষ ও পাখি সেনাদল সমবেত করা হয়েছিল"৷ এ বাক্যে প্রথমত জ্বিন, মানুষ ও পাখি তিনটি পরিচিত পাখির নাম ব্যবহার করা হয়েছে৷ আরবী ভাষায় এ তিনটি শব্দ তিনটি বিভিন্ন ও সর্বজন পরিচিতি জাতির জন্য ব্যবহৃত হয়ে হয়ে থাকে৷ তারপর এ শব্দগুলো ব্যাপক অর্থে ব্যবহার করা হয়েছে৷ এদের কোনটির রূপক ও অপ্রকৃত অর্থে বা উপমা হিসেবে ব্যবহারের স্বপে কোন পূর্বাপর প্রাসাঙ্গিক সূত্রও নেই৷ ফলে ভাষার পরিচিত অর্থগুলোর পরিবর্তে অন্য অর্থে কোন ব্যক্তি এগুলোকে ব্যবহার করতে পারেনা৷ তাছাড়া "মানুষ" শব্দটি "জ্বিন" ও "পাখি" শব্দ দু'টির মাঝখানে বসেছে, যার ফলে জ্বিন ও পাখি আসলে মানুষ প্রজাতিরই দুটি দল ছিল এ অর্থ গ্রহণ করার পথে কোন সুস্পষ্ট বাঁধার সৃষ্টি হয়েছে৷ যদি এ ধরণের অর্থ গ্রহণ করা উদ্দেশ্য হতো তাহলে من الجنِّ والانس والطير না বলে বলা হতো والطير من الانس الجنِّ
সামনের দিকে অগ্রসর হয়ে বলা হয়, হযরত সুলাইমান আলাহিস সালাম পাখির খোঁজ খবর নিচ্ছিলেন৷ এ সময় হুদ্হুদকে অনুপস্থিত দেখে তিনি একথা বলেন৷ যদি এ পাখি মানুষ হয়ে থাকে এবং হুদ্হুদও কোন মানুষের নাম হয়ে থাকে তাহলে কমপে তিনি এমন কোন শব্দ বলতেন যা থেকে বেচারা পাঠক তাকে প্রাণী মনে করতো না৷ দলের নাম বলা হচ্ছে পাখি এবং তার একজন সদস্যের নাম বলা হচ্ছে হুদ্হুদ, এরপরও আমরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে তাকে মানুষ মনে করে নেব, আমাদের কাছে এ আশা করা হচ্ছে৷

তারপর হযরত সুলাইমান বলেন, হুদ্হুদ হয় তার নিজের অনুপস্থিতির সংগত কারণ বলবে নয়তো আমি তাকে কঠিন শাস্তি দেব অথবা তাকে জবাই করে ফেলবো৷ মানুষকে হত্যা করা হয়, ফাঁসি দেয়া হয়, মৃত্যু দণ্ড দেয়া হয়, জবাই করে কে? কোন ভয়ংকর পাষাণ হৃদয় ও নিষ্ঠুর প্রকৃতির মানুষ প্রতিশোধ স্পৃহায় পাগল হয়ে গেলে হয়তো কাউকে জবাই করে ফেলে৷ কিন্তু আল্লাহর নবীর কাছেও কি আমরা এ আশা করবো যে, তিনি নিজের সেনাদলের এক সদস্যকে নিছক তার গরহাজির (Deserter) থাকার অপরাধে জবাই করার কথা ঘোষণা করে দেবেন এবং আল্লাহর প্রতি এ সুধারণা পোষণ করবো যে, তিনি এ ধরণের একটি মারাত্মক কথার উল্লেখ করে তার নিন্দায় একটি শব্দও বলবেন না?

আর একটু সামনের দিকে এগিয়ে গেলে দেখা যাবে, হযরত সুলাইমান আলাহিস সালাম এ হুদ্হুদের কাছে সাবার রাণীর নামে পত্র দিয়ে পাঠাচ্ছেন এবং সেটি তাদের কাছে ফেলে দিতে বা নিপে করতে বলেছেন (القه اليهم) বলা নিষ্প্রয়োজন, এ নির্দেশ পাখিদের প্রতি দেয়া যেতে পারে কিন্তু কোন মানুষকে রাষ্ট্রদূত করে পাঠিয়ে তাকে এ ধরণের নিক্ষেপ করার নির্দেশ দেয়া একেবারে অসংগত হয়৷ কেউ বুদ্ধিভ্রষ্ট হয়ে থাকলে সে একথা মেনে নেবে যে, একদেশের বাদাশাহ অন্য দেশের রাণীর নামে পত্র দিয়ে নিজের রাষ্ট্রদূতকে এ ধরণের নির্দেশ সহকারে পাঠাতে পারে যে, পত্রটি নিয়ে রাণীর সামনে ফেলে দাও বা নিপে করো৷ আমাদের মতো মামুলি লোকেরাও নিজেদের প্রতিবেশীর কাছে নিজের কোন কর্মচারীকে পাঠাবার ক্ষেত্রেও ভদ্রতা ও শিষ্টাচারের যে প্রাথমিক রীতি মেনে চলি হযরত সুলাইমানকে কি তার চেয়েও নিম্নমানের মনে করতে হবে? কোন ভদ্রলোক কি কখনো নিজের কর্মচারীকে বলতে পারে, যা আমার এ পত্রটি অমুক সাহেবের সামনে ছুঁড়ে দিয়ে আয়?

এসব নিদর্শন ও চিহ্ন পরিষ্কার জানিয়ে দিচ্ছে, এখানে হুদ্হুদ অভিধানিক অর্থেই ব্যবহৃত হয়েছে৷ অর্থাত সে মানুষ নয় বরং একটি পাখি ছিল৷ এখন যদি কোন ব্যক্তি একথা মেনে নিতে প্রস্তুত না হয় যে, কুরআন হুদহুদের বলা যেসমস্ত কথা উদ্ধৃত করছে একুট হুদহুদ তা বলতে পারে, তাহলে তার পরিষ্কার বলে দেয়া উচিত আমি কুরআনের একথাটি মানি না৷ কুরআনের স্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীন শব্দগুলোর মনগড়া অর্থ করে তার আড়ালে নিজের অবিশ্বাসকে লুকিয়ে রাখা জঘন্য মুনাফিকী ছাড়া আর কিছুই নয়৷
২৯. সাবা ছিল আরবের দক্ষিণ এলাকার একটি বিখ্যাত ব্যবসাজীবী জাতি৷ তাদের রাজধানী মারিব বর্তমান ইয়ামনের রাজধানী সান্আ থেকে ৫৫ মাইল উত্তরপূর্বে অবস্থিত ছিল৷ তাঁর উত্থানের যুগ মাঈনের রাষ্ট্রের পতনের পর প্রায় খৃষ্টপূর্ব ১১০০ অব্দে শুরু হয়৷ এরপর থেকে প্রায় এক হাজার বছর পর্যন্ত ৷ আরব দেশে তাদের দোর্দণ্ড প্রতাপ অব্যাহত থাকে৷ তারপর ১১৫ খৃষ্টপূর্বাব্দে দক্ষিণ আরবের দ্বিতীয় খ্যাতিমান জাতি হিম্য়ার তাদের স্থান দখল করে৷ আরবে ইয়ামন ও হাদরামউত এবং আফ্রিকায় হাব্শা (ইথিয়োপিয়া) পর্যন্ত তাদের সাম্রাজ্য বিস্তৃত ছিল৷ পূর্ব আফ্রিকা, হিন্দুস্থান ,দূর প্রাচ্য এবং আরবের যত বাণিজ্য মিসর, সিরিয়া গ্রীস ও ইতালীর নিজের ধনাঢ্যতা ও সম্পদশালীতার জন্য ধনী জাতি বলে উলেখ করেছেন৷ ব্যবসায় ছাড়া তাদের সমৃদ্ধির বড় কারণটি ছিল এই যে, তারা দেশের জায়গায় জায়গায় বাঁধ নির্মাণ করে পানি সেচের উন্নততর ব্যবস্থা গড়ে তুলেছিল৷ ফলে তাদের সমগ্র এলাকা সবুজ শ্যামল উদ্যানে পরিণত হয়েছিল৷ তাদের দেশের এ অস্বাভাবিক শস্য শ্যামলিমার কথা গ্রীক ঐতিহাসিকরাও উল্লেখ করেছেন এবং কুরআন মজীদেও সূরা সাবায় এদিকে ইংগিত করেছে৷

হুদ্হুদের একথা, "আমি এমন তথ্য সংগ্রহ করেছি যা আপনি জানেন না" বলার অর্থ এ নয় যে, হযরত সুলাইমান আলাইহিস সালাম সাবার ব্যাপারে কিছুই জানতেন না৷ একথা সুস্পষ্ট ফিলিস্তিন ও সিরিয়ার যে শাসকের রাজ্য লোহিত সাগরের দণি কিনারে (ইয়ামন) বসবাসরত এমন একটি জাতি সম্পর্কে একেবারে অজ্ঞ থাকতে পারেন না যারা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য পথের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ নিয়ন্ত্রণ করতো৷ তাছাড়া যাবুর থেকে জানা যায়, হযরত সুলাইমানেরও পূর্বে তাঁর মহান পিতা হযরত দাউদ (আ) সাবা সম্পর্কে জানতেন৷ যাবুরে আমরা তাঁর দোয়ার এ শব্দগুলো পাইঃ

"হে ইশ্বর, তুমি রাজাকে (অর্থাৎ স্বয়ং হযরত দাউদকে) তোমার শাসন, রাজপুত্রকে (অর্থাত সুলাইমানকে) তোমার ধর্মমশীলতা প্রদান কর.................৷ তর্শীশ ও দ্বীপগণের রাজগণ নৈবেদ্য আনিবেন৷ শিবা (অর্থাত সাবার ইয়ামনী ও হাবশী শাখাসমূহ) সাবার রাজগণ উপহার দিবেন৷" (গীত সংহিতা ৭২: ১-২, ১০-১১)

তাই হুদ্হুদের কথার অর্থ মনে হয় এই যে, সাবা জাতির কেন্দ্রস্থলে আমি স্বচে যা দেখে এসেছি তার কোন খবর এখনো পর্যন্ত আপনার কাছে পৌঁছেনি৷
৩০. এ থেকে জানা যায়, সেকালে এ জাতিটি সূর্য দেবতার পূজা করতো৷ আরবের প্রাচীন বর্ণনাগুলো থেকেও এ জাতির এ একই ধর্মের কথা জানা যায়৷ ইবনে ইসহাক কুলজি বিজ্ঞান (Genenalogies) অভিজ্ঞদের উক্তি উদ্ধৃত করে বলেন, সাবা জাতির প্রাচীনতম পূর্ব পুরুষ হলো আব্দে শাম্স ( অর্থাত সূর্যের দাস বা সূর্য উপাসক) এবং উপাধি ছিল সাবা৷ বনী ইসরাঈলের বর্ণনাও এর সমর্থক৷ সেখানে বলা হয়েছে, হুদ্হুদ যখন সুলাইমানের (আ) পত্র নিয়ে পৌঁছে যায় সাবার রাণী তখন সূর্য দেবতার পূজা করতে যাচ্ছিলেন ৷ হুদ্হুদ পথেই পত্রটি রাণীর সামনে ফেলে দেয়৷
৩১. বক্তব্যের ধরণ থেকে অনুমিত হয় যে, এখান থেকে শেষ প্যারা পর্যন্তকার বাক্যগুলো হুদ্হুদের বক্তব্যের অংশ নয়৷ বরং "সূর্যের সামনে সিজদা করে" পর্যন্ত তার বক্তব্য শেষ হয়ে যায়৷ এরপর এ উক্তিগুলো আলাহর পক্ষ থেকে করা হয়েছে এ অনুমানকে যে জিনিস শক্তিশালী করে তা হচ্ছে এ বাক্যটি وَيَعْلَمُ مَا تُخْفُونَ وَمَا تُعْلِنُونَ "আর তিনি সবকিছু জানেন, যা তোমরা লুকাও ও প্রকাশ করো৷" এ শব্দগুলো থেকে প্রবল ধারণা জন্মে যে, বক্তা হুদ্হুদ এবং শ্রোতা সুলাইমান ও তার দরবারীগণ নন বরং বক্তা হচ্ছেন আলাহ এবং তিনি সম্বোধন করছেন মক্কার মুশরিকদেরকে, যাদেরকে নসিহত করার জন্যই এ কাহিনী শুনানো হচ্ছে৷ মুফাস্সিরগণের মধ্যে রূহুল মা'আনী-এর লেখক আল্লামা আলূসীও এ অনুমানকে অগ্রগণ্য মনে করেছেন৷
৩২. অর্থাৎ দুনিয়ার ধন-সম্পদ উপার্জন এবং নিজের জীবনকে অত্যাধিক জাঁকালো ও বিলাসী করার যে কাজে তারা নিমগ্ন ছিল, শয়তান তাদেরকে বুঝিয়ে দেয় যে, বুদ্ধি ও চিন্তার এটিই একমাত্র নিয়োগ ত্রে এবং দৈহিক ও মানসিক শক্তিসমূহ প্রয়োগের একমাত্র উপযুক্ত স্থান৷ তাই এ পার্থিব জীবন ও তার আরাম আয়েশ ছাড়া আর কোন জিনিস সম্পর্কে গুরুত্ব সহকারে চিন্তা-ভাবনা করার দরকার নেই৷ এ আপাতদৃষ্ট পার্থিব জীবনের পিছনে কোন বাস্তব সত্য নিহিত রয়েছে এবং তোমাদের প্রচলিত ধর্ম, নৈতিকতা, সভ্যতা, সংস্কৃতি ও জীবন ব্যবস্থার ভিত্তিসমূহ এ সত্যের সাথে সামঞ্জস্য রাখে, না পুরোপুরি তার বিরুদ্ধে চলে যাচ্ছে সেসব নিয়ে অযথা মাথা ঘামাবার দরকার নেই বলে শয়তান তাদেরকে নিশ্চিন্ত করে দেয় যে, তোমরা যখন ধন-দৌলত, শক্তি-সামর্থ ও শান-শওকতের দিক দিয়ে দুনিয়ায় অগ্রসর হয়েই যাচ্ছো তখন আবার তোমাদের প্রচলিত আকিদা-বিশ্বাস ও মতবাদকে সঠিক কিনা, তা চিন্তা করার প্রয়োজনই বা কি! এসব সঠিক হবার স্বপে তো এই একটি প্রমাণই যথেষ্ট যে, তোমরা আরামে ও নিশ্চিন্তে অর্থ ও বিত্তের পাহাড় গড়ে তুলছো এবং আয়েশী জীবন যাপন করছো৷
৩৩. যিনি প্রতি মুহূর্তে এমন সব জিনিসের উদ্ভব ঘটাচ্ছেন যেগুলো জন্মের পূর্বে কোথায় কোথায় লুকিয়ে ছিল কেউ জানে না৷ ভূ-গর্ভ থেকে প্রতি মুহূর্তে অসংখ্য উদ্ভিদ এবং নানা ধরনের খনিজ পদার্থ বের করছেন৷ উর্ধ জগত থেকে প্রতিনিয়ত এমন সব জিনিসের আর্বিভাব ঘটাচ্ছেন, যার আর্বিভাব না ঘটলে মানুষের ধারণা ও কল্পনায়ও কোনদিন আসতে পারতো না৷
৩৪. অর্থাৎ সকল জিনিসই তাঁর জ্ঞানের আওতাধীন৷ তাঁর কাছে গোপন ও প্রকাশ্যে সব সমান৷ সবকিছুই তার সামনে সমুজ্জ্বল ও উন্মুক্ত৷নমুনা হিসেবে মহান আল্লাহর এ দু'টি গুণ বর্ণনা করার আসল উদ্দেশ্য হচ্ছে এমন বুঝিয়ে দেয়া যে, যদি তারা শয়তানের প্রতারণার জালে আবদ্ধ না হতো তাহলে এ সোজা পথটি পরিষ্কার দেখতে পেতো যে, সূর্যনামের একটি জ্বলন্ত জড় পদার্থ, যার নিজের অস্তিত্ব সম্পর্কেই কোন অনুভূতি নেই, সে কোন ইবাদাতের হকদার নয় বরং একমাত্র সর্বজ্ঞ ও সর্বদর্শী মহান সত্তা যাঁর অসীম শক্তি প্রতি মুহূর্তে নতুন নতুন অভাবনীয় কৃর্তির উদ্ভব ঘটাচ্ছেন, তিনিই এর হকদার৷
৩৫. এখানে সিজদা করা ওয়াজিব৷ কুরআনের যেসব জায়গায় সিজদা করা ওয়াজিব বলে ফকীহগণ একমত, এটি তার অন্যতম৷ এখানে সিজদা করার উদ্দেশ্য হচ্ছে একজন মু'মিনের সূর্যপূজারীদের থেকে নিজেকে সচেতনভাবে পৃথক করা এবং নিজের কর্মের মাধ্যমে একথার স্বীকৃতি দেয়া ও একথা প্রকাশ করা উচিত যে, সে সূর্যকে নয় বরং একমাত্র আলাহ রব্বুল আলামীনকেই নিজের সিজদার ও ইবাদাতের উপযোগী এবং যোগ্য মনে করে৷
৩৬. এখানে এসে হুদ্হুদের ভূমিকা শেষ হয়ে যায়৷ যুক্তিবাদের প্রবক্তারা যে কারণে তাকে পাখি বলে মেনে নিতে অস্বীকার করেছে সেটি হচ্ছে এই যে, তাদের মতে একটি পাখি এতোটা পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা, বিচার মতা ও বাকশক্তি সম্পন্ন হওয়া অসম্ভব৷ সে একটা দেশের ওপর দিয়ে উড়ে যাওয়ার সময় বুঝে ফেলবে যে, এটি সাবা জাতির দেশে, এ দেশের রাষ্ট্র ব্যবস্থা এ ধরণের, এর শাসক অমুক মহিলা, এদের ধর্ম সূর্যপূজা, এদের এক আল্লাহর পূজারী হওয়া উচিত ছিল কিন্তু এরা ভ্রষ্টতায় লিপ্ত রয়েছে ইত্যাদি, আর সে এসে হযরত সুলাইমানের সামনে নিজের এসব উপলব্ধি এতো স্পষ্টভাবে বর্ণনা করবে এটা তাদের দৃষ্টিতে একটি অসম্ভব ব্যাপার৷ এসব কারণে কট্টর নাস্তিকরা কুরআনের বিরুদ্ধে অভিযোগ উত্থাপন করে বলে, কুরআন "কালীলাহ ও দিমনা" (পশু-পাখির মুখ দিয়ে বর্ণিত উপদেশ মূলক কল্পকাহিনী) ধরণের কথা বলে৷ আর কুরআনের যুক্তিবাদী তাফসীর যারা করেন তারা তার শব্দগুলোকে তাদের প্রত্য অর্থ থেকে সরিয়ে নিয়ে একথা প্রমাণ করার চেষ্টা করেন যে, এই হুদ্হুদ তো আসলে কোন পাখিই ছিল না৷ কিন্তু জিজ্ঞাস্য এই যে, ভদ্র মহোদয়গণের কাছে এমন কি বৈজ্ঞানিক তথ্যাবলী আছে যার ভিত্তিতে তারা চূড়ান্তভাবে একথা বলতে পারেন যে, পশু পাখি ও তাদের বিভিন্ন প্রজাতি এবং বিভিন্ন সুনির্দিষ্ট পাখির শক্তি, দতা, নৈপুন্য ও ধীশক্তি কতটুকু এবং কতটুকু নয়? যে জিনিসগুলোকে তারা অর্জিত জ্ঞান মনে করছেন সেগুলো আসলে প্রাণীদের জীবন ও আচার আচরণের নিছক অকিঞ্চিত ও ভাসাভাসা পর্যবেণ ফল ছাড়া আর কিছুই নয়৷ বিভিন্ন ধরণের ও বিভিন্ন প্রজাতির প্রাণীরা কে কি জানে, শোনে ও দেখে, কি অনুভব করে, কি চিন্তা করে ও বোঝে এবং তাদের প্রত্যেকের মন ও বুদ্ধিশক্তি কিভাবে কাজ করে, এসব সম্পর্কে মানুষ আজ পর্যন্ত কোন নিশ্চিত উপায়ে সঠিক তথ্য সংগ্রহ করতে পারেনি৷ এরপরও বিভিন্ন প্রজাতির প্রাণীর জীবনের যে সামান্যতম পর্যবেণ করা সম্ভব হয়েছে তা থেকে তাদের বিষ্ময়কর যোগ্যতা ও মতার সন্ধান পাওয়া গেছে৷ এখন মহান আল্লাহ যিনি এসব প্রাণীর স্রষ্টা তিনি যদি আমাদের বলেন, তিনি তাঁর একজন নবীকে এসব প্রাণীর ভাষা বুঝার এবং এদের সাথে কথা বলার যোগ্যতা দান করেছিলেন এবং সেই নবীর কাছে প্রতিপালিত ও প্রশিণ প্রাপ্ত হবার কারণে একটি হুদ্হুদ পাখি এমনি যোগ্যতা সম্পন্ন হয়েছিল যার ফলে ভিন দেশ থেকে এই এই বিষয় দেখে এসে নবীকে সে তার খবর দিতো, তাহলে আল্লাহর এ বর্ণনার আলোকে আমাদের প্রাণীজগত সম্পর্কে নিজেদের এ পর্যন্তকার যতসামান্য জ্ঞান ও বিপুল সংখ্যক অনুমানের পুর্নবিবেচনা করা উচিত ছিল না? তা না করে নিজেদের এ অকিঞ্চিত জ্ঞানকে মানদণ্ড হিসেবে ধরে নিয়ে আল্লাহর এ বর্ণনার প্রতি মিথ্যা আরোপ অথবা তাঁর মধ্যে সূক্ষ্ম অর্থগত বিকৃতি সাধন করা আমাদের কোন্ ধরণের বৃদ্ধিমত্তার পরিচায়ক?
৩৭. অর্থাৎ কয়েকটি কারণে পত্রটি গুরুত্বপূর্ণ৷ এক, পত্রটি এসেছে অদ্ভুত ও অস্বাভাবিক পথে৷ কোন রাষ্ট্রদূত এসে দেয়নি৷ বরং তার পরিবর্তে এসেছে একটি পাখি৷ সে পত্রটি আমার কাছে ফেলে দিয়েছে৷ দুই, পত্রটি হচ্ছে,ফিলিস্তীন ও সিরিয়ার মহান শাসক সুলাইমানের (আ) প থেকে৷ তিন, এটি শুরু করা হয়েছে আলাহ রহমানুর রহীমের নামে৷ অথচ দুনিয়ার কোথাও চিঠিপত্র লেখার ক্ষেত্রে এ পদ্ধতি অবলম্বন করা হয় না৷ তারপর সকল দেবতাকে বাদ দিয়ে একমাত্র মহান ও শ্রেষ্ট আলাহর নামে পত্র লেখাও আমাদের দুনিয়ায় একটি অস্বাভাবিক ও অভিনব ব্যাপার৷ সর্বোপরি যে বিষয়টি এর গুরুত্ব আরো বেশী বাড়িয়ে দিয়েছে তা হচ্ছে এই যে, পত্রে আমাকে একেবারে পরিষ্কার ও দ্ব্যর্থহীন ভাষায় দাওয়াত দেয়া হয়েছে, আমি যেন অবাধ্যতার পথ পরিহার করে আনুগত্যের পথ অবলম্বন করি এবং হুকুমের অনুগত না বা মুসলমান হয়ে সুলাইমানের সামনে হাজির হয়ে যাই৷"মুসলিম" হয়ে হাজির হবার দু'টি অর্থ হতে পারে৷ এক, অনুগত হয়ে হাজির হয়ে যাও৷ দুই, দীন ইসলামের গ্রহণ করে হাজির হয়ে যাও৷ প্রথম হুকুমটি সুলাইমানের শাসকসুলভ মর্যাদার সাথে সামঞ্জস্য রাখে ৷ দ্বিতীয় হুকুমটি সামঞ্জস্য রাখে তাঁর নবীসুলভ মর্যাদার সাথে৷ সম্ভবত এই ব্যাপক অর্থবোধক শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে পত্রে উভয় উদ্দেশ্য অন্তরভুক্ত থাকার কারণে ৷ ইসলামের পক্ষ থেকে স্বাধীন জাতি ও সরকারদেরকে সবসময় এ মর্মে দাওয়াত দেয়া হয়েছে যে, তোমরা আলাহর সত্য দীন গ্রহণ করো এবং আমাদের সাথে ইসলামী জীবন ব্যবস্থায় সমান অংশীদার হয়ে যাও অথবা নিজেদের রাজনৈতিক স্বাধীনতা পরিত্যাগ করে ইসলামী জীবন ব্যবস্থার অধীনতা গ্রহণ করো এবং নিসংকোচে জিযিয়া দাও৷