(২৭:১) ত্বা-সীন৷ এগুলো কুরআনের ও এক সুস্পষ্ট কিতাবের আয়াত,
(২৭:২) পথনির্দেশ ও সুসংবাদ এমন মুমিনদের জন্য
(২৭:৩) যারা নামায কায়েম করে ও যাকাত দেয় এবং তারা এমন লোক যারা আখেরাতে পুরোপুরি বিশ্বাস করে
(২৭:৪) আসলে যারা আখেরাত বিশ্বাস করে না তাদের জন্য আমি তাদের কৃতকর্মকে সুদৃশ্য করে দিয়েছি, ফলে তারা দিশেহারা হয়ে ঘুরে বেড়ায়৷
(২৭:৫) এদের জন্য রয়েছে নিকৃষ্ট শাস্তি এবং আখেরাতে এরাই হবে সবচেয়ে বেশী ক্ষতিগ্রস্ত৷
(২৭:৬) আর ( হে মুহাম্মদ !) নিসন্দেহে তুমি এ কুরআন লাভ করছো এক প্রাজ্ঞ ও সর্বজ্ঞ সত্তার পক্ষ থেকে৷
(২৭:৭) (তাদেরকে সেই সময়ের কথা শুনাও) যখন মূসা তার পরিবারবর্গ বললো “আমি আগুনের মতো একটা বস্তু দেখেছি৷ এখনি আমি সেখান থেকে কোন খবর আনবো অথবা কোন অংগার, যাতে তোমরা উষ্ণতা লাভ করতে পারো৷”
(২৭:৮) সেখানে পৌঁছুবার পর আওয়াজ এলো ১০ “ ধন্য সেই সত্তা যে এ আগুনের মধ্যে এবং এর চারপাশে রয়েছে, পাক-পবিত্র আল্লাহ সকল বিশ্ববাসীর প্রতিপালক৷ ১১
(২৭:৯) হে মূসা, এ আর কিছু নয়, স্বয়ং আমি আল্লাহ, মহাপরাক্রমশালী ও জ্ঞানী ৷
(২৭:১০) এবং তুমি তোমার লাঠিটি একটু ছুঁড়ে দাও৷” যখনই মূসা দেখলো লাঠি সাপের মত মোচড় খাচ্ছে ১২ তখনই পেছন ফিরে ছুটতে লাগলো এবং পেছন দিকে ফিরেও দেখলো না৷ “ হে মূসা! ভয় পেয়ো না, আমার সামনে রাসূলরা ভয় পায় না৷ ১৩
(২৭:১১) তবে হ্যাঁ, যদি কেউ ভুল-ত্রুটি করে বসে৷ ১৪ তারপর যদি সে দুষ্কৃতির পরে সুকৃতি দিয়ে (নিজের কাজ) পরিবর্তিত করে নেয় তাহলে আমি ক্ষমাশীল ও করুণাময়৷ ১৫
(২৭:১২) আর তোমার হাতটি একটু তোমার বক্ষস্থলের মধ্যে ঢুকাও তো, তা উজ্জ্বল হয়ে বের হয়ে আসবে কোন প্রকার ক্ষতি ছাড়াই৷ এ (দু’টি নিদর্শন) ন’টি নিদর্শনের অন্তরভুক্ত ফেরাউন ও তার জাতির কাছে (নিয়ে যাবার জন্য) ১৬ তারা বড়ই বদকার৷”
(২৭:১৩) কিন্তু যখন আমার সুস্পষ্ট নিদর্শনসমূহ তাদের সামনে এসে গেলো তখন তারা বলল, এতো সুস্পষ্ট যাদু৷
(২৭:১৪) তারা একেবারেই অন্যায়ভাবে ঔদ্ধত্যের সাথে সেই নিদর্শনগুলো অস্বীকার করলো অথচ তাদের মন মগজ সেগুলোর সত্যতা স্বীকার করে নিয়েছিল৷ ১৭ এখন এ বিপর্যয় সৃষ্টিকারীদের পরিণাম কি হয়েছিল দেখে নাও৷
১. "সুস্পষ্ট কিতাবের" একটি অর্থ হচ্ছে, এ কিতাবটি নিজের শিক্ষা , বিধান ও নিদের্শগুলোর একেবারে দ্ব্যর্থহীন পদ্ধতিতে বর্ণনা করে দেয়৷ এর দ্বিতীয় অর্থ হচ্ছে, এটি সত্য ও মিথ্যার পার্থক্য সুস্পষ্ট পদ্ধতিতে তুলে ধরে৷ আর তৃতীয় একটি অর্থ এই হয় যে , এটি যে আল্লাহর কিতাব সে ব্যাপারটি সুস্পষ্ট৷ যে ব্যক্তি চোখ খুলে এ বইটি পড়বে, এটি যে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিজের তৈরী করা কথা নয় তা তার কাছে পরিষ্কার হয়ে যাবে৷
২. অর্থাৎ এ আয়াতগুলো হচ্ছে পথনির্দেশ ও সুসংবাদ৷ "পথনির্দেশকারী" ও "সুসংবাদদানকারী" বলার পরিবর্তে এগুলোকেই বলা হয়েছে "পথনির্দেশ" ও "সুসংবাদ" এর মাধ্যমে পথনির্দেশনা ও সুসংবাদ দানের গুণের ক্ষেত্রে তাদের পূর্ণতার প্রকাশই কাম্য৷ যেমন কাউকে দাতা বলার পরিবর্তে 'দানশীলতার প্রতিমূর্তি' এবং সুন্দর বলার পরিবর্তে 'আপাদমস্তক সৌন্দর্য' বলা৷
৩. অর্থাৎ কুরআন মজীদের এ আয়াতগুলোর কেবলমাত্র এমনসব লোকদেরই পথ নির্দেশনা দেয় এবং শুভ পরিণামের সুসংবাদও একমাত্র এমনসব লোকদের দান করে যাদের মধ্যে দু'টি বৈশিষ্ট্য ও গুণাবলী পাওয়া যায়৷ একটি হচ্ছে, তারা ঈমান আনে৷ ঈমান আনার অর্থ হচ্ছে তারা কুরআন ও মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দাওয়াত গ্রহণ করে৷ এক আলাহকে নিজেদের একমাত্র উপাস্য ও রব বলে মেনে নেয়৷ কুরআনকে আলাহর কিতাব হিসেবে স্বীকার করে নেয়৷ মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সালামের সত্য নবী বলে মেনে নিয়ে নিজেদের নেতা রূপে গ্রহণ করে৷ এ সংগে এ বিশ্বাসও পোষণ করে যে, এ জীবনের পর দ্বিতীয় আর একটি জীবন আছে, সেখানে আমাদের নিজেদের কাজের হিসেব দিতে এবং প্রত্যেকটি কাজের প্রতিদান লাভ করতে হবে৷ দ্বিতীয়টি হচ্ছে , তারা এ বিষয়গুলো কেবলমাত্র মেনে নিয়েই বসে থাকে না বরং কার্যত এগুলোর অনুসরণ ও আনুগত্য করতে উদ্বুদ্ধ হয়৷ এ উদ্বুদ্ধ হবার প্রথম আলামত হচ্ছে এই যে, তারা নামায কায়েম করে ও যাকাত দেয়৷ এ দু'টি শর্ত যারা পূর্ণ করবে কুরআন মাজীদের আয়াত তাদেরকেই দুনিয়ায় সত্য সরল পথের সন্ধান দেবে৷ এ পথের প্রতিটি পর্যায়ে তাদেরকে শুদ্ধ ও অশুদ্ধ এবং ন্যায় ও অন্যায়ের পার্থক্য বুঝিয়ে দেবে৷ তার প্রত্যেকটি চৌমাথায় তাদেরকে ভুল পথের দিকে অগ্রসর হবার হাত থেকে রক্ষা করবে৷ তাদেরকে এ নিশ্চয়তা দান করবে যে, সত্য-সঠিক পথ অবলম্বন করার ফল দুনিয়ায় যাই হোক না কেন শেষ পর্যন্ত তারই বদৌলতে চিরন্তন সফলতা তারাই অর্জন করবে এবং তারা মহান আলাহর সন্তুষ্টি লাভের সৌভাগ্য লাভে সক্ষম হবে৷ এটা ঠিক তেমনি একটা ব্যাপার যেমন একজন শিক্ষকের শিক্ষা থেকে কেবলমাত্র এমন এক ব্যক্তি লাভবান হতে পারে যে তার প্রতি আস্থা স্থাপন করে যথার্থই তার ছাত্রত্ব গ্রহণ করে নেয় এবং তার নির্দেশ অনুযায়ী কাজও করতে থাকে৷ একজন ডাক্তার থেকে উপকৃত হয়ে পারে একমাত্র পারে একমাত্র এমনই একজন রোগী যে তাকে নিজের চিকিৎসক হিসেবে গ্রহণ করে এবং ঔষধপত্র ও পথ্যাদির ব্যাপারে তার ব্যবস্থাপত্র অনুযায়ী কাজ করে৷ একমাত্র এ অবস্থায়ই একজন শিক্ষক ও ডাক্তার মানুষকে তার কাঙ্খিত ফলাফল লাভ করার নিশ্চয়তা দান করতে পারে৷ কেউ কেউ এ আয়াতে يؤتوا الزكوة বাক্যাংশের অর্থ গ্রহণ করেছেন, যারা চারিত্রিক পবিত্রতা ও পরিচ্ছন্নতা লাভ করবে৷ কিন্তু কুরআন মজীদে নামায কায়েম করার সাথে যাকাত আদায় করার শব্দ যেখানেই ব্যবহার করা হয়েছে সেখানেই এর অর্থ হয়েছে যাকাত দান করা৷ নামাযের সাথে এটি ইসলামের দ্বিতীয় স্তম্ভ৷ এ ছাড়াও যাকাতের জন্য ايتاء শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে৷ এটি সম্পদের যাকাত দান করার সুনির্দিষ্ট অর্থ ব্যক্ত করে৷ কারণ আরবী ভাষায় পবিত্রতা অর্জন করার ক্ষেত্রে تزكى শব্দ বলা হয়ে থাকে, ايتاء زكوة বলা হয় না৷ আসলে এখানে যে কথাটি মনে বদ্ধমূল করে দেয়া উদ্দেশ্য সেটি হচ্ছে এই যে, কুরআনের পথনির্দেশনা থেকে লাভবান হবার জন্য ঈমানের সাথে কার্যত আনুগত্য ও অনুসরণের নীতি অবলম্বন করাও জরুরী৷ আর মানুষ যথার্থই আনুগত্যের নীতি অবলম্বন করছে কিনা নামায কায়েম ও যাকাত দান করাই হচ্ছে তা প্রকাশ করার প্রথম আলামত৷ এ আলামত যেখানেই অদৃশ্য হয়ে যায় সেখানেই বুঝা যায় যে, মানুষ বিদ্রোহী হয়ে গেছে, শাসককে সে শাসক বলে মেনে নিলেও তার হুকুম মেনে চলতে রাজী নয়৷
৪. যদিও আখেরাত বিশ্বাস ঈমানের অঙ্গ এবং এ কারণে মু'মিন বলতে এমন সব লোক বুঝায় যারা তাওহীদ ও রিসালতের সাথে সাথে আখেরাতের প্রতিও ঈমান আনে কিন্তু এটি আপনা আপনি ঈমানের অন্তর্ভূক্ত হওয়া সত্ত্বেও এ বিশ্বাসটির গুরুত্ব প্রকাশ কারার জন্য বিশেষ জোর দিয়ে একে পৃথকভাবে বর্ণনা করা হয়েছে৷ এর মাধ্যমে একথাই বুঝানো হয়েছে যে, যারা পরকাল বিশ্বাস করে না তাদের জন্য এ কুরআন উপস্থাপিত পথে চলা বরং এর উপর পা রাখাও সম্ভব নয়৷ কারণ এ ধরণের চিন্তাধারা যারা পোষণ করে তারা স্বাভাবিকভাবেই নিজেদের ভালমন্দের মানদণ্ড কেবলমাত্র এমন সব ফলাফলের মাধ্যমে নির্ধারিত করে থাকে যা এ দুনিয়ায় প্রকাশিত হয় বা হতে পারে৷ তাদের জন্য এমন কোন পথনির্দেশনা গ্রহণ করা সম্ভব হয় না যা পরকালের পরিণাম ফলকে লাভ-ক্ষতির মানদণ্ড গণ্য করে ভালো ও মন্দ নির্ধারণ করে৷ কিন্তু এ ধরণের লোকেরা প্রথমত আম্বিয়া আলাইহিমুস সালামের শিক্ষায় কর্ণপাত করে না৷ কিন্তু যদি কোন কারণে তারা মুমিন দলের মধ্যে শামিল হয়েও যায় তাহলে আখিরাতের প্রতি বিশ্বাস না থাকার ফলে তাদের জন্য ঈমান ও ইসলামের পথে এক পা চলাও কঠিন হয়৷ এ পথে প্রথম পরীক্ষাটিই যখন অনুষ্ঠিত হবে, যেখানে ইহকালীন লাভ ও পরকালীন ক্ষতির দাবী তাদেরকে দুটি ভিন্ন ভিন্ন দিকে টানতে থাকবে তখন মুখে যতই ঈমানের দাবী করতে থাকুক না কেন নিসংকোচে তারা ইহকালীন লাভের প্রতি আকৃষ্ট হবে এবং পরকালীন ক্ষতির সামান্যতমও পরোয়া করবে না৷
৫. অর্থাৎ এটি আল্লাহর প্রাকৃতিক নিয়ম আর মানবিক মনস্তত্বের স্বাভাবিক যুক্তিবাদিতাও একথাই বলে যে, যখন মানুষ জীবন এবং তার কর্ম ও প্রচেষ্টার ফলাফলকে কেবলমাত্র এ দুনিয়া পর্যন্ত সীমাবদ্ধ মনে করবে , যখন সে এমন কোন আদালত স্বীকার করবে না যেখানে মানুষের সারা জীবনের সমস্ত কাজ যাচাই-পর্যালোচনা করে তার দোষ-গুণের শেষ ও চূড়ান্ত ফায়সালা করা হবে, এবং যখন সে মৃত্যুর পরে এমন কোন জীবনের কথা স্বীকার করবে না যেখানে দুনিয়ার জীবনের কর্মকাণ্ডের প্রকৃত মূল্য ও মর্যাদা অনুযায়ী যথাযথ পুরষ্কার ও শাস্তি দেয়া হবে তখন অনিবার্যভাবে তার মধ্যে একটি বস্তুবাদী দৃষ্টিভংগী বিকাশ লাভ করবে৷ তার কাছে সত্য ও মিথ্যা, শির্ক ও তাওহীদ, পাপ ও পুণ্য এবং সচ্চরিত্র ও অসচ্চরিত্রের যাবতীয় আলোচনা একেবারেই অর্থহীন মনে হবে৷ এ দুনিয়ায় যা কিছু তাকে ভোগ, আয়েশ-আরাম , বস্তুগত উন্নতি, সমৃদ্ধি এবং শক্তি ও কর্তৃত্ব দান করবে, তা কোন জীবন দর্শন, জীবন পদ্ধতি ও নৈতিক ব্যবস্থা হোক না কেন, তার কাছে তাই হবে কল্যাণকর ৷ প্রকৃত তত্ত্ব ও সত্যের ব্যাপারে তার কোন মাথাব্যাথা থাকবে না৷ তার মৌল আকাংখা হবে কেবলমাত্র দুনিয়ার জীবনের সৌন্দর্য ও সাফল্য ৷ এগুলো অর্জন করার চিন্তা তাকে সকল পথে বিপথে টেনে নিয়ে যাবে৷ এ উদ্দেশ্যে সে যা কিছুই করবে তাকে নিজের দৃষ্টিতে মনে করবে বড়ই কল্যাণকর এবং যারা এ ধরনের বৈষয়িক স্বার্থোদ্ধারে ডুব দেয়নি এবং চারিত্রিক সততা ও অসততা থেকে বেপরোয়া হয়ে স্বেচ্ছাচারীর মত কাজ করে যেতে পারেনি তাদেরকে সে নির্বোধ মনে করবে৷ কারো অসৎকার্যাবলীকে তার জন্য শোভন বানিয়ে এ কাজকে কুরআন মজীদে কখনো আল্লাহর কাজ আবার কখনো শয়তানের কাজ বলা হয়েছে৷ যখন বলা হয় যে, অসৎকাজগুলোকে আল্লাহ শোভন করে দেন তখন তার অর্থ হয়, যে ব্যক্তি এ দৃষ্টিভংগী অবলম্বন করে তার কাছে স্বভাবতই জীবনের এ সমতল পথই সুদৃশ্য অনুভূত হতে থাকে৷ আর যখন বলা হয় যে, শয়তান ওগুলোকে সুদৃশ্য করে দেয়৷ তখন এর অর্থ হয়, এ চিন্তা ও কর্মপদ্ধতি অবলম্বনকারী ব্যক্তির সামনে শয়তান সবসময় একটি কাল্পনিক জান্নাত পেশ করতে থাকে এবং তাকে এই বলে ভালোভাবে আশ্বাস দিতে থাকে, শাবাশ! বেটা খুব চমৎকার কাজ করছ৷
৬. এ নিকৃষ্ট শাস্তিটি কিভাবে , কখন ও কোথায় হবে ৷ তা নির্দিষ্ট করে বলা হয়নি৷ কারণ এ দুনিয়া ও বিভিন্ন ব্যক্তি, দল ও জাতি নানাভাবে এ শাস্তি লাভ করে থাকে৷ এ দুনিয়া থেকে বিদায় নেবার সময় একেবারে মৃত্যুর দ্বারদেশেও জালেমরা এর একটি অংশ লাভ করে৷ মৃত্যুর পরে "আলমে বরযখে" ও (মৃত্যুর পর থেকে কিয়ামত পূর্ববর্তী সময়) মানুষ এর মুখোমুখি হয়৷ আর তারপর হাশরের ময়দানে এর একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া শুরু হয়ে যাবে এবং তারপর এক জায়গায় গিয়ে তা আর কোনদিন শেষ হবে না৷
৭. অর্থাৎ এ কুরআনে যেসব কথা বলা হচ্ছে এগুলো কোন উড়ো কথা নয়৷ এগুলো কোন মানুষের আন্দাজ অনুমান ও মতামত ভিত্তিকও নয়৷ বরং এক জ্ঞানবাদ প্রাজ্ঞ সত্তা এগুলো নাযিল করছেন৷ তিনি নিজের সৃষ্টির প্রয়োজন ও কল্যাণ এবং তার অতীত, বর্তমান, ভবিষ্যত সম্পর্কে পুরোপুরি জানেন৷ বান্দাদের সংশোধন ও পথনির্দেশানার জন্য তাঁর জ্ঞান সর্বোত্তম কৌশল ও ব্যবস্থা অবলম্বন করে৷
৮. এটা তখনকার ঘটনা যখন হযরত মূসা আলাইহিস সালাম মাদ্য়ানে আট দশ বছর অবস্থান করার পর নিজের পরিবার পরিজন নিয়ে কোন বাসস্থানের সন্ধানে বের হয়েছিলেন৷ মাদ্য়ান এলাকাটি ছিল আকাবা উপসাগরের তীরে আরব ও সীনাই উপদ্বীপের উপকূলে (দেখুন তাফহীমুল কুরআন, সূরা আশ্ শুয়ারা, ১১৫ টীকা) সেখান থেকে যাত্র করে হযরত মূসা সীনাই উপদ্বীপের দণি অংশে পৌছেন৷ এ অংশের যে স্থানটিতে তিনি পৌছেন বর্তমানে তাকে সীনাই পাহাড় ও মূসা পর্বত বলা হয়৷ কুরআন নাযিলের সময় এটি তুর নামে পরিচিত ছিল৷ এখানে যে ঘনটনাটির কথা বলা হয়েছে সেটি এরই পাদদেশে সংঘটিত হয়েছিল৷ এখানে যে ঘটনাটি বর্ণনা করা হচ্ছে তার বিস্তারিত বিবরণ ইতিপূর্বে সূরা "ত্বা-হা"-এর প্রথমে রুকূতে উল্লিখিত হয়েছে এবং সামনের দিকে সূরা কাসাসেও (চতুর্থ রুকূ) আসছে৷
৯. আলোচনার প্রেক্ষাপট থেকে মনে হয় যে, এটা ছিল শীত কালের একটি রাত৷ হযরত মূসা একটি অপরিচিত এলাকা অতিক্রম করছিলেন৷ এ এলাকার ব্যপারে তাঁর বিশেষ জানা শোনা ছিল না৷ তাই তিনি নিজের পরিবারের লোকদের বললেন, আমি সামনের দিকে গিয়ে একটু জেনে আসি আগুন জ্বলছে কোন্ জনপদে, সামনের দিকে পথ কোথায় কোথয় গিয়েছে এবং কাছাকাছি কোন্ কোন্ জনপদ আছে৷ তবুও যদি দেখা যায় ওরাও আমাদের মত চলমান মুসাফিল যাদের কাছ থেকে কোন তথ্য সংগ্রহ করা যাবে না, তাহলেও অন্ততপক্ষে ওদের কাছ থেকে একটু অংগার তো আনা যাবে৷ এ থেকে আগুন জ্বালিয়ে তোমরা উত্তাপ লাভ করতে পারবে৷ হযরত মূসা (আ) যেখানে কুঞ্জবনের মধ্যে আগুন লেগেছে বলে দেখিয়েছিলেন সে স্থানটি তুর পাহাড়ের পাদদেশে সমুদ্র পৃষ্ঠ থেকে প্রায় পাঁচ হাজার ফুট ওপরে অবস্থিত৷ রোমান সাম্রাজ্যের প্রথম খৃস্টান বাদশাহ কনষ্টানটাইন ৩৬৫ খৃষ্টাব্দের কাছাকাছি সময়ে ঠিক যে জায়গায় এ ঘটনাটি ঘটেছিল সেখানে একটি গীর্জা নির্মাণ করে দিয়েছিলেন৷ এর দু'শো বছর পরে সম্রাট জাষ্টিনিয়ান এখানে একটি আশ্রম (Monasterery) নির্মান করেন৷ কনষ্টান্টাইনের গীর্জাকেও এর অর্ন্তভূক্ত করা হয়৷ এ আশ্রম ও গীর্জা আজো অক্ষুন্ন রয়েছে৷ এটি গ্রীক খৃষ্টীয় গীর্জার (Greek Orthodox Church) পাদরী সমাজের দখলে রয়েছে৷ আমি ১৯৬০ সালের জানুয়ারী মাসে এ জায়গাটি দেখি৷ পাশের পাতায় এ জায়গার কিছু ছবি দেয়া হলো৷
১০. সূরা কাসাসে বলা হয়েছে, আওয়াজ আসছিল একটি বৃক্ষ থেকেঃ فِي الْبُقْعَةِ الْمُبَارَكَةِ مِنَ الشَّجَرَةِ এ থেকে ঘটনাটির যে দৃশ্য সামনে ভেসে ওঠে তা হচ্ছে এই যে, উপত্যাকার এক কিনারে আগুনের মতো লেগে গিয়েছিল কিন্তু কিছু জ্বলছিল না এবং ধোঁয়াও উড়ছিল না৷ আর এ আগুনের মধ্যে একটি সবুজ শ্যামল গাছ দাঁড়িয়েছিল৷ সেখান থেকে সহসা এ আওয়াজ আসতে থাকে৷ আম্বিয়া আলাইহিমুস সালামের সাথে এ ধরণের অদ্ভূত ব্যাপার ঘটা চিরাচরিত ব্যাপার৷ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন প্রথম বার নবুওয়াতের মর্যাদায় অধিষ্ঠিত হন তখন হেরা গিরিগূহায় একান্ত নির্জনে সহসা একজন ফেরেশতা আসেন৷ তিনি তাঁর কাছে আল্লাহর পয়গাম পৌঁছাতে থাকেন৷ হযরত মূসার ব্যাপারেও একই ঘটনা ঘটে৷ এক ব্যক্তি সফর কালে এক জায়গায় অবস্থান করছেন৷ দূর থেকে আগুন দেখে পথের সন্ধান নিতে বা আগুন সংগ্রহ করার উদ্দেশ্যে আসেন৷ অকস্মাত সকল প্রকার আন্দাজ অনুমানের উর্দ্ধে অবস্থানকারী স্বয়ং আল্লাহ তাঁকে সম্বোধন করেন৷ এসব সময় আসলে এমন একটি অস্বাভাবিক অবস্থা বাইরেও এবং নবীগণের মনের মধ্যেও বিরাজমান থাকে যার ভিত্তিতে তাঁদের মনে এরূপ প্রত্যয় জন্মে যে, এটা কোন জ্বিন বা শয়তানের কারসাজী অথবা তাদের নিজেদের কোন মানসিক ভাবান্তর নয় কিংবা তাঁদের ইন্দ্রিয়ানুভূতিও কোন প্রকার প্রতারিত হচ্ছে না বরং প্রকৃতপক্ষে বিশ্ব-জাহানের মালিক ও প্রভু অথবা তাঁর ফেরেশতাই তাঁদের সাথে কথা বলছেন৷ (আরো বেশী ব্যাখ্যার জন্য দেখুন, তাফহীমুল কুরআন, আন নাজম, ১০ নং টীকা)
১১. এ অবস্থায় "পাক-পবিত্র আল্লাহ" বলার মাধ্যমে আসলে হযরত মূসাকে এ ব্যাপারে সতর্ক করা হচ্ছে যে, বিভ্রান্ত চিন্তা ও বিশ্বাস থেকে পুরোপুরি মুক্ত হয়েই এ ঘটনাটি ঘটছে৷ অর্থাৎ এমন নয় যে, আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এ গাছের ওপর বসে আছেন অথবা এর মধ্যে অনুপ্রবেশ করে এসেছেন কিংবা তাঁর একচ্ছত্র নূর তোমাদের দৃষ্টিসীমায় বাঁধা পড়েছে বা কারো মুখে প্রবিষ্ট কোন জিহ্বা নড়াচড়া করে এখানে কথা বলছে৷ বরং এ সমস্ত সীমাবদ্ধতা থেকে মুক্ত ও পরিচ্ছন্ন থেকে সেই সত্তা নিজেই তোমার সাথে কথা বলছেন৷
১২. সূরা আ'রাফে ও সূরা শু'আরাতে এ জন্য ثعبانٌ (অজগর) শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে৷ কিন্তু এখানে একে جانٌ শব্দের মাধ্যমে প্রকাশ করা হচ্ছে৷ "জান" শব্দটি বলা হয় ছোট সাপ অর্থে৷ এখানে "জান" শব্দ ব্যবহার করার কারণ হচ্ছে এই যে, দৈহিক দিক দিয়ে সাপটি ছিল অজগর কিন্তু তার চলার দ্রুততা ছিল ছোট সাপদের মতো৷ সূরা তা-হা-য় حيَّة تَسْعَى (ছুটন্ত সাপ) এর মধ্যেও এ অর্থই বর্ণনা করা হয়েছে৷
১৩. অর্থাৎ আমার কাছে রাসূলদের ক্ষতি হবার কোন ভয় নেই৷ রিসালাতের মহান মর্যাদায় অভিসিক্ত করার জন্য যখন আমি কাউকে নিজের কাছে ডেকে আনি তখন আমি নিজেই তার নিরাপত্তার দায়িত্ব নিয়ে থাকি৷ তাই যে কোন প্রকার অস্বাভাবিক ঘটনা ঘটলেও রাসুলকে নির্ভীক ও নিশ্চিন্ত থাকা উচিত৷ আমি তার জন্য কোন প্রকার ক্ষতিকারক হবো না৷
১৪. আরবী ব্যাকরণের সূত্র অনুসারে এ বাক্যাংশের দু'রকম অর্থ হতে পারে৷ প্রথম অর্থ হলো, ভয়ের কোন যুক্তিসংগত কারণ যদি থাকে তাহলে তা হচ্ছে এই যে, রসূল কোন ভুল করেছেন ৷ আর দ্বিতীয় অর্থ হলো, যতণ কেউ ভুল না করে ততণ আমার কাছে তার কোন ভয় নেই৷
১৫. অর্থাৎ অপরাধকারীও যদি তওবা করে নিজের নীতি সংশোধন করে নেয় এবং খারাপ কাজের জায়গায় ভাল কাজ করতে থাকে, তাহলে আমার কাছে তার জন্য উপেক্ষা ও ক্ষমা করার দরজা খোলাই আছে৷ প্রসংগক্রমে একথা বলার উদ্দেশ্য ছিল একদিকে সতর্ক করা এবং অন্যদিকে সুসংবাদ দেয়াও৷ হযরত মূসা আলাইহিমুস্ সালাম অজ্ঞতা বশত একজন কিবতীকে হত্যা করে মিসর থেকে বের হয়েছিলেন৷ এটি ছিল একটি ত্রুটি৷ এদিকে সূক্ষ্ম ইংগিত করা হয়৷ এ ত্রুটিটি যখন অনিচ্ছাকৃতভাবে তাঁর দ্বারা সংঘটিত হয়েছিল তখন তিনি পরক্ষণেই আল্লাহর কাছে ক্ষমা চেয়েছিলেন এই বলেঃ

رَبِّ إِنِّي ظَلَمْتُ نَفْسِي فَاغْفِرْ لِي -
"হে আমার রব! আমি নিজের প্রতি জুলুম করেছি৷ আমাকে মা করে দাও৷"

আল্লাহ সংগে সংগেই তাঁকে মাফ করে দিয়েছিলেনঃ فَغَفَرَ لَهُ আল্লাহ তাঁকে মাফ করে দিলেন৷ (আল কাসাস, ১৬) এখানে সেই মার সুসংবাদ তাঁকে দেয়া হয়৷ অর্থাত এ ভাষণের মর্ম যেন এই দাঁড়ালোঃ হে মূসা! আমার সামনে তোমার ভয় পাওয়ার একটি কারণ তো অবশ্যই ছিল৷ কারণ তুমি একটি ভুল করেছিলে৷ কিন্তু তুমি যখন সেই দুষ্কৃতিকে সুকৃতিতে পরিবর্তিত করেছো তখন আমার কাছে তোমার জন্য মাগফিরাত ও রহমত ছাড়া আর কিছুই নেই৷ এখন আমি তোমাকে কোন শাস্তি দেবার জন্য ডেকে পাঠাইনি বরং বড় বড় মু'জিযা সহকারে তোমাকে এখন আমি একটি মহান দায়িত্ব সম্পাদনে পাঠাবো৷
১৬. সূরা বনী ইসরাঈলে বলা হয়েছে মূসাকে আমি সুস্পষ্টভাবে দৃষ্টিগোচর হয় এমন ধরনের নয়টি নিদর্শন (تِسْعَ آَيَاتٍ بَيِّنَاتٍ) দিয়ে পাঠিয়েছিলাম৷ সূরা আ'রাফে এগুলোর বিস্তারিত বিবরণ এভাবে বর্ণনা করা হয়েছেঃ (১) লাঠি, যা অজগর হয়ে যেতো (২) হাত, যা বগলে রেখে বের করে আনলে সূর্যের মতো ঝিকমিক করতো৷ (৩) যাদুকরদের প্রকাশ্য জনসমে পরাজিত করা (৪) মূসার পূর্ব ঘোষণা অনুযায়ী সারা দেশে দুর্ভি দেখা দেয়া৷ (৫) বন্যা ও ঝড় (৬) পংগপাল (৭) সমস্ত শস্য গুদামে শস্যকীট এবং মানুষ-পশু নির্বিশেষে সবার গায়ে উকুন ৷ (৮) ব্যাঙয়ের আধিক্য (৯) রক্ত ৷ (আরো ব্যাখ্যার জন্য দেখুন তাফহীমুল কুরআন, সূরা আয্ যুখরুফ, ৪৩ টীকা)
১৭. কুরআনের অন্যান্য স্থানে বলা হয়েছে যে, যখন মূসা আলাইহিস সালামের ঘোষণা অনুযায়ী মিসরের উপর কোন সাধারণ বালা-মুসীবত নাযিল হতো তখন ফেরাউন মূসাকে বলতো , আপনার আল্লাহর কাছে দোয়া করে এ বিপদ থেকে উদ্ধার করুন তারপর আপনি যা বলবেন তা মেনে নেবো ৷ কিন্তু যখন সে বিপদ সরে যেতো তখন ফেরাউন আবার তার আগের হঠকারিতায় ফিরে যেতো ৷ (সূরা আরাফ, ১৩৪ এবং আয্ যুখরুফ, ৪৯-৫০ আয়াত) তাছাড়া এমনিতেও একটি দেশের সমগ্র এলাকা দুর্ভি, বন্যা ও ঘূর্ণি কবলিত হওয়া, সারা দেশের উপর পংগপাল ঝাঁপিয়ে পড়া এবং ব্যাং ও শস্যকীটের আক্রমণ কোন যাদুকরের তেলসমাতি হতে পারে বলে কোনক্রমেই ধারণা করা যেতে পারে না৷ এগুলো এমন প্রকাশ্য মু'জিযা ছিল যেগুলো দেখে একজন নিরেট বোকাও বুঝতে পারতো যে, নবীর কথায় এ ধরনের দেশ ব্যাপী বালা-মুসীবতের আগমন এবং আবার তাঁর কথায় তাদের চলে যাওয়া একমাত্র আলাহ রব্বুল আলামীনেরই হস্তক্ষেপের ফল হতে পারে৷ এ কারণে মূসা ফেরাউনকে পরিষ্কার বলে দিয়েছিলেনঃ

لَقَدْ عَلِمْتَ مَا أَنْزَلَ هَؤُلَاءِ إِلَّا رَبُّ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ

"তুমি খুব ভালো করেই জানো, এ নিদর্শনগুলো পৃথিবী ও আকাশের মালিক ছাড়া আর কেউ নাযিল করেনি৷" (বনী ইসরাঈল, ১০২)

কিন্তু যে কারণে ফেরাউন ও তার জাতির সরদাররা জেনে বুঝে সেগুলো অস্বীকার করে তা এই ছিলঃ

أَنُؤْمِنُ لِبَشَرَيْنِ مِثْلِنَا وَقَوْمُهُمَا لَنَا عَابِدُونَ -

"আমরা কি আমাদের মতই দু'জন লোকের কথা মেনে নেবো, অথচ তাদের জাতি আমাদের গোলাম?" (আল মু'মিনূন, ৪৭)