(২৬:১৪১) সামূদ জাতি রাসূলদের প্রতি মিথ্যারোপ করলো৷৯৫
(২৬:১৪২) স্মরণ করো যখন তাদের ভাই সালেহ তাদেরকে বললোঃ “তোমরা কি ভয় করো না?
(২৬:১৪৩) আমি তোমাদের জন্য একজন আমানতদার রসূল৷৯৬
(২৬:১৪৪) কাজেই তোমার আল্লাহকে ভয় করো এবং আমার আনুগত্য করো৷
(২৬:১৪৫) এ কাজের জন্য আমি তোমাদের কাছে কোন প্রতিদান প্রত্যাশী নই৷ আমার প্রতিদান দেবার দায়িত্ব তো রব্বুল আলামীনের৷
(২৬:১৪৬) এখানে যেসব জিনিস আছে সেগুলোর মাঝখানে কি তোমাদের এমনিই নিশ্চিন্তে থাকতে দেয়া হবে? ৯৭
(২৬:১৪৭) এসব উদ্যান ও প্রস্রবনের মধ্যে?
(২৬:১৪৮) এসব শস্য ক্ষেত ও রসালো গুচ্ছ বিশিষ্ট খেজুর বাগানের মধ্যে? ৯৮
(২৬:১৪৯) তোমরা পাহাড় কেটে তার মধ্যে সগর্বে ইমারত নির্মান করছো৷৯৯
(২৬:১৫০) আল্লাহকে ভয় করো এবং আমার আনুগত্য করো৷
(২৬:১৫১) যেসব লাগামহীন লোক পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করে
(২৬:১৫২) এবং কোন সংস্কার সাধন করে না তাদের আনুগত্য করো না৷১০০
(২৬:১৫৩) তারা জবাব দিল, “তুমি নিছক একজন যাদুগ্রস্থ ব্যক্তি৷১০১
(২৬:১৫৪) তুমি আমাদের মতো একজন মানুষ ছাড়া আর কি? কোন নিদর্শন আনো, যদি তুমি সত্যবাদী হয়ে থাকো৷” ১০২
(২৬:১৫৫) সালেহ বললো, “এ উটনীটি রইলো৷১০৩ এর পানি পান করার জন্য একটি দিন নির্দিষ্ট এবং তোমাদের সবার পানি পান করার জন্য একটি দিন নির্দিষ্ট রইলো৷ ১০৪
(২৬:১৫৬) একে কখনো পীড়ন করো না, অন্যথায় একটি মহা দিবসের আযাব তোমাদের উপর আপতিত হবে৷”
(২৬:১৫৭) তারা তার পায়ের গিঁঠের রগ কেটে দিল ১০৫ এবং শেষে অনুতপ্ত হতে থাকলো৷
(২৬:১৫৮) আযাব তাদেরকে গ্রাস করলো৷১০৬ নিশ্চিতভাবেই এর মধ্যে রয়েছে একটি নিদর্শন৷ কিন্তু তাদের অধিকাংশই মান্যকারী নয়৷
(২৬:১৫৯) আর প্রকৃতপক্ষে তোমার রব হচ্ছেন পরাক্রমশালী এবং দয়াময়ও৷
৯৫. তুলনামূলক অধ্যয়নের জন্য দেখুন সূরা আল আ'রাফ ৭৩-৭৯ আয়াত, হূদ ৬১-৬৮ আয়াত, আল হিজর ৮০-৮৪ আয়াত এবং বনী ইসরাঈল ৫৯ আয়াত৷ আরো বিস্তারিত জানার জন্য দেখুন কুরআন মজীদের নিম্নোক্ত স্থানগুলোঃ আন্ নামল ৪৫-৫৯, আয্ যারিয়াত ৪৩-৪৫, আল কামার ২৩-৩১, আল হাক্কাহ ৪-৫, আল ফজর ৯ এবং আশ্ শামস১১ আয়াত৷

এ জাতিটি সম্পর্কে কুরআন মজীদের বিভিন্ন স্থানে যে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে তা থেকে জানা যায়, আদ জাতির পরে দুনিয়ায় এ সামুদ জাতিই উন্নতি, অগ্রগতি ও সমৃদ্ধি লাভ করেছিল৷ جَعَلَكم خُلَفَاء من بعد عَادٍ (الاعراف : ৭৪) ৷ কিন্তু তাদের সভ্যতার অগ্রগতিও শেষ পর্যন্ত আদ জাতির উন্নতি ও অগ্রগতির মতো একই রূপ পরিগ্রহ করে৷ অর্থাৎ জীবন যাত্রার মান উন্ন থেকে উন্নততর এবং মনুষ্যত্বের মান নিম্নতর থেকে নিম্নতর হতে থাকে৷ একদিকে সমতল এলাকায় সুউচ্চ ও সুরম্য প্রাসাদোপম অট্টালিকা এবং পার্বত্য এলাকায় অজন্তা-ইলোরার পর্বত গূহার মতো সূরম্য প্রাসাদ নির্মিত হতে থাকে৷ আর অন্যদিকে সমাজে শিরক ও মূর্তি পূজার প্রবল জোয়ার চলতে থাকে এবং পৃথিবী পৃষ্ঠ ভরে উঠতে থাকে জুলুম-নিপীড়নের প্রাবল্যে৷ জাতির সবচেয়ে অসৎ দুষ্কৃতিকারীরা তার নেতৃত্বের আসনে বসেছিল৷ হযরত সালেহের সত্যের দাওয়াত কেবলমাত্র নিম্নশ্রেণীর দুর্বল লোকদেরকেই প্রভাবিত করছিল৷ উচ্চ শ্রেণীর লোকেরা শুধুমাত্র এ কারণেই তা মেনে নিতে অস্বীকার করেছিল যে, انَّا بالَّذِى امنتم به كَافِرُوْنَ"যে বিষয়ের প্রতি তোমরা বিশ্বাস স্থাপন করেছো তা আমরা মেনে নিতে পারি না৷"

৯৬. হযরত সালেহের বিশ্বস্ততা ও আমানতদারী এবং অসাধারণ যোগ্যতার সাক্ষ্য তাঁর জাতির লোকদের মুখ দিয়ে কুরআন মজীদের ভাষায় নিম্নোক্তভাবে ব্যক্ত হয়েছেঃ

قالوا ياصالح قد كنت فيها مرجُوَّا قَبْل هَذَا-

"তারা বললো, হে সালেহ! এর আগে তুমি আমাদের মধ্যে এমন লোক ছিলে যার ওপর আমাদের অনেক আশা ভরসা ছিল৷" (হূদঃ ৬২ আয়াত)

৯৭. অর্থাৎ তোমরা কি মনে করো, তোমাদের এ আয়েশ আরাম স্থায়ী ও চিরন্তন? এসব কোন দিন বিনষ্ট হবে না? তোমাদের থেকে কখনো এসব নিয়ামতের হিসাব নেয়া হবে না? তোমরা যেসব কাজ কারবার করে যাচ্ছো কখনো এগুলো সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে না?
৯৮. মূলে هَضِيْم শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে৷ এর অর্থ হচ্ছে খেঁজুরের এমন কাঁদি যা ফলভারে নুয়ে পড়েছে এবং যার ফল পেকে যাবার পর রসালো ও কোমল হবার কারণে ফেটে যায়৷
৯৯. আদ জাতির সভ্যতার উল্ল্যেখযোগ্য বৈশিষ্ট ছিল, তারা উচু উচু স্তম্ভ বিশিষ্ট ইমারত নির্মান করতো৷ ঠিক তেমনি সামুদ জাতির সভ্যতা তার চেয়ে যে সবচেয়ে বেশী উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্টের জন্য প্রাচীনকালের জাতিসমূহের মধ্যে খ্যাতি অর্জন করেছিল, তা ছিল এই যে, তারা পাহাড় কেটে তার মধ্যে ইমারত নির্মাণ করতো৷ তাই সূরা আল ফজরে যেভাবে আদকে 'যাতুল ইমাদ' (ذات العماد) বলে অর্থাৎ স্তম্ভের অধিকারী পদবী দেয়া হয়েছে ঠিক তেমনি সামুদ জাতির বর্ণনা একথার মাধ্যমে করা হয়েছেঃ

الَّذِيْنَ جَبُوا الصََّخْرَ بِالوَادِ -

"এমন সব লোক যার উপত্যাকায় পাহাড় কেটেছে৷" এ ছাড়া কুরআনে একথাও বলা হয়েচে যে, তারা নিজেদের দেশের সমতল ভূমিতে বড় বড় প্রাসাদ নির্মান করতোঃ

تَتَّخِذُوْن َ من سُهًولِهَا قُصُوْرًا -

এসব গৃহ নির্মাণের উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য কি ছিল? فَرِهِيْنَ শব্দের মাধ্যমে কুরআন-এর ওপর আলোকপাত করে৷ অর্থাৎ এসব কিছু ছিল তাদের নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব, সম্পদ, শক্তি ও প্রযুক্তির নৈপুন্যের প্রদর্শনী৷ কোন যথার্থ প্রয়োজনের তাগিদ এর পেছনে কার্যকর ছিল না৷ একটি বিকৃত ও ভ্রষ্ট সভ্যতার ধরণ এমনিই হয়ে থাকে৷ একদিকে সমাজের গরীব লোকেরা মাথা গোঁজারও ঠাঁই পায় না আর অন্যদিকে ধনী নেতৃস্থানীয় লোকেরা থাকার জন্য যখন প্রয়োজনের অতিরিক্ত প্রাসাদ নির্মাণ করে ফেলে তখন প্রয়োজন ছাড়াই নিছক লোক দেখাবার জন্য স্মৃতিস্তম্ভসমূহ নির্মাণ করতে থাকে৷

সামুদ জাতির এ ইমারতগুলোর কিছু সংখ্যক এখনো টিকে আছে৷ ১৯৫৯ সালের ডিসেম্বর মাসে আমি নিজে এগুলো দেখেছি৷ পাশের পৃষ্ঠায় এগুলোর কিছু ছবি দেয়া হলো৷ এ জায়গাটি মদীনা তাইয়্যেবা ও তাবুকের মধ্যবর্তী হিজাযের বিখ্যাত আল'উলা নামক স্থান, (যাকে নবীর জামানায় 'ওয়াদিউল কুরা' বলা হতো) থেকে কয়েক মাইল উত্তরে অবস্থিত৷ স্থানীয় লোকেরা আজও এ জায়গাকে 'আল হিজর' ও 'মাদ্য়ানে সালেহ' নামে স্মরণ করে থাকে৷ এ এলাকায় 'আল উলা' এখনো একটি শস্য শ্যামল উপত্যকা৷ এখানে রয়েছে বিপুল সংখ্যক পানির নহর ও বাগিচা৷ কিন্তু আজ হিজরের আশেপাশে বড়ই নির্জন ও ভীতিকর পরিবেশ বিরাজমান৷ লোকবসতি নামমাত্র৷ সবুজের উপস্থিতি ক্ষীণ৷ কূয়া আছে কয়েকটি৷ এরই মধ্যে একটি কূয়ার ব্যাপারে স্থানীয় লোকদের মধ্যে একথা প্রচলিত আছে যে, হযরত সালেহ (আ)-এর উটনী সেখান থেকে পানি পান করতো৷ বর্তমানে এটি তুর্কী আমলের একটি বিরান ক্ষুদ্র সামরিক চৌকির মধ্যে অবস্থিত৷ কূয়াটি একবারেই শুকনা৷ (এর ছবিও পাশের পাতায় দেখানো হয়েছে)৷ এ এলাকায় প্রবেশ করে আল উলা'র কাছাকাছি পৌঁছুতেই আমরা সর্বত্র এমনসব পাহাড় দেখলাম যা একেবারেই ভেংগে টুকরো টুকরো হয়ে গেছে৷ পরিষ্কার মনে হচ্ছিল, কোন ভয়াবহ ভূমিকম্প এগুলোকে নীচে থেকে উপর পর্যন্ত ঝাঁকানি দিয়ে ফালি ফালি করে দিয়ে গেছে৷ (এ পাহাড়গুলোরও কিছু ছবি পাশের পাতাগুলোয় দেয়া হয়েছে)৷ এ ধরণের পাহাড় আমরা দেখতে দেখতে গিয়েছি পূর্বের দিকে আল'উলা থেকে খায়বার যাবার সময় প্রায় ৫০ মাইল পর্যন্ত এবং উত্তর দিকে জর্ডানে রাজ্যের সীমানার মধ্যে ৩০ থেকে ৪০ মাইল অভ্যন্তর পর্যন্ত৷ এর অর্থ দাঁড়ায়, তিন চারশো মাইল দীর্ঘ ও একশো মাইল প্রস্থ বিশিষ্ট একটি এলাকা ভূমিকম্পে একেবারে ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল৷

আল হিজরে আমরা সামুদ জাতির যেসব ইমারত দেখেছিলাম ঠিক একই ধরণের কতিপয় ইমারত আমরা পেলাম আকাবা উপসাগরের কিনারে মাদ্য়ানে এবং জর্ডান রাজ্যের পেট্টা (PETRA) নামক স্থানেও৷ বিশেষ করে পেট্টায় সামূদী প্যাটার্নের ইমারত এবং নিবতীদের তৈরী করা অট্টালিকা পাশাপাশি দেখা গেছে৷ এগুলোর কারুকাজ ও নির্মাণ পদ্ধতিতে এত সুস্পষ্ট পার্থক্য রয়েছে যে, প্রত্যেক ব্যক্তিই এক নজর দেখার সাথে সাথেই বুঝতে পারবে এগুলো এক যুগেরও নয় এবং একই জাতির স্থাপত্যের নিদর্শনও নয়৷ এগুলোরও আলাদা আলাদা ছবি আমি পাশের পৃষ্ঠায় দিয়েছি৷ ইংরেজ প্রাচ্যবিদ ডটি (Daughty) কুরআনকে হেয় প্রতিপন্ন করার জন্য আল হিজরের ইমারত সম্পর্কে দাবী করেছেন, এগুলো সামূদের নির্মিত নয় বরং নিবতীদের তৈরী ইমারত৷ কিন্তু উভয় জাতির স্থাপত্য পদ্ধতির মধ্যে বিস্তর ও সুস্পষ্ট ফারাক দেখা যায়৷ ফলে কেবলমাত্র একজন অন্ধই এগুলোকে একই জাতির নির্মিত বলে দাবী করতে পারে৷ আমার অনুমান, পাহাড় কেটে তার মধ্যে গৃহ নির্মাণ কৌশল সামূদই উদ্ভাবন করে এবং এর হাজার হাজার বছর পরে নিবতীরা খ্রীস্টপূর্ব দ্বিতীয় ও প্রথম শতকে একে উন্নতির উচ্চ শিখরে পৌঁছিয়ে দেয়৷ অতপর ইলোরায় (পেট্টার প্রায় সাতশো বছর পরে নির্মিত গূহা) এ শিল্পটির চরম উৎকর্ষ সাধিত হয়৷
১০০. অর্থাৎ তোমাদের যেসব রাজনৈতিক ও সামাজিক নেতৃবৃন্দ এবং শাসকদের নেতৃত্বে এ ভ্রান্ত বিকৃত জীবন ব্যবস্থা পরিচালিত হচ্ছে তাদের আনুগত্য পরিহার করো৷ এরা সব লাগাম ছাড়া৷ নৈতিকতার সমস্ত সীমা লংঘন করে এরা লাগামহীন পশুতে পরিণত হয়েছে৷ এদের দ্বারা সমাজ-সভ্যতার কোন সংস্কার হতে পারে না৷ এরা যে ব্যবস্থা পরিচালনা করবে তার মধ্যে বিকৃতিই ছড়িয়ে পড়বে৷ তোমাদের জন্য কল্যাণের কোন পথ যদি থাকে তাহলে তা কেবলমাত্র একটিই৷ অর্থাৎ তোমরা নিজেদের মধ্যে আল্লাহর ভয় সৃষ্টি করো এবং বিপর্যয় সৃষ্টিকারীদের আনুগত্য পরিহার করে আমার আনুগত্য করো৷ কারণ আমি আল্লাহর রসূল৷ আমার আমানতদারী ও বিশ্বস্ততা সম্পর্কে তোমরা পূর্ব থেকেই অবগত আছো৷ আমি একজন নিস্বার্থ ব্যক্তি৷ নিজের কোন ব্যক্তিগত লাভের জন্য আমি এ সংস্কারমূলক কাজে হাত দেইনি- এ ছিল হযরত সালেহ আলাইহিস সালামের ঘোষণাপত্রের সংক্ষিপ্ত সার৷ নিজের জাতির সামনে তিনি এটি পেশ করেছিলেন৷ এর মধ্যে শুধু ধর্মীয় প্রচারণাই ছিল না বরং একই সঙ্গে তামাদ্দুনিক ও নৈতিক সংস্কার এবং রাজনৈতিক বিপ্লবের দাওয়াতও ছিল৷
১০১. "যাদুগ্রস্ত" অর্থাৎ দিওয়ানা ও পাগল তথা যার বুদ্ধি ভ্রষ্ঠ হয়ে গেছে৷ প্রাচীনকালের ধারণা অনুযায়ী জ্বীনের বা যাদুর প্রভাবে পাগলামি দেখা দেয়৷ তাই তারা যাকে পাগল বলতে চাইতো তাকে বলতো "মাজনুন" (জ্বীনগ্রস্ত) বা "মাসহুর" (যাদুগ্রস্ত) ও মুসাহ্হার৷
১০২. অর্থাৎ আমরা তোমাকে আল্লাহর প্রেরিত বলে মেনে নেব বাহ্যত তোমার ও আমাদের মধ্যে তেমন কোন পার্থক্য চিহ্ন তো আমরা দেখছি না৷ কিন্তু যদি তুমি নিজেকে আল্লাহর নিযুক্ত ও তাঁর প্রেরিত বলে দাবী করো, তাহলে এমন কোন চাক্ষুস মু'জিযা পেশ করো, যা থেকে এ বিশ্ব-জাহানের স্রষ্টা এবং পৃথিবী ও আকাশের মালিক মহান আল্লাহ যে তোমাকে আমাদের কাছে পাঠিয়েছেন সে ব্যাপারে আমাদের মনে দৃঢ় বিশ্বাস জন্মে যায়৷
১০৩. মু'জিযার দাবীর জবাবে উটনী হাজির করার ফলে পরিষ্কার বুঝা যায়, সেটি নিছক সেখানে সাধারণ আরবদের কাছে যেমন উটনী পাওয়া যেত সে ধরণের এমন কোন উটনী ছিল সাধারণ উটনী ছিল না৷ বরং মু'জিযা দেখাবার দাবীর জবাবে পেশ করা যায় এমন কোন জিনিস নিশ্চয়ই তার জন্ম ও প্রকাশ বা সৃষ্টির মধ্যে ছিল৷ যদি হযরত সালেহ তাদের দাবীর জবাবে এমনই কোন একটি সাধারণ উটনী ধরে এনে দাঁড় করিয়ে দিতেন তাহলে এটা হতো অবশ্যই একটি অর্থহীন কাজ৷ কোন নবী তো দূরের কথা একজন সাধারণ বিবেকবান ব্যক্তির কাছ থেকেও এ ধরণের আচরণ আশা করা যেতে পারে না৷ এখানে তো একথা শুধুমাত্র বক্তব্যের প্রেক্ষাপট থেকেই অনুধাবন করা যায়৷ কিন্তু অন্যান্য স্থানে কুরআনে সুস্পষ্ট ভাষায় এ উটনীর অস্তিত্বকে মু'জিযা গণ্য করা হয়েছে৷ সূরা আ'রাফ ও সূরা হূদে বলা হয়েছেঃ

هذه ناقة الله لكم ايةً- "এ হলো আল্লাহর উটনী, তোমাদের জন্য রইলো নিদর্শন হিসেবে৷" আর সূরা বনী ইসরাঈলে এর চাইতেও বেশী বলিষ্ঠ ভাষায় বলা হয়েছেঃ

وما منعنا ان نرسل بالايات الا ان كذَّبَ بها الاوَّلون واتينا ثمود النَّاقة مبصرَةً فظلموا بها وما نرسل بالايات الاَّ تخْوِيْفًا-

"পূর্ববর্তী লোকদের নিদর্শন অস্বীকার করাই আমাকে নিদর্শন পাঠানো থেকে বিরত রাখে৷ সামূদদের সামনে আমি চোখে দেখা উটনী নিয়ে আসি৷ তবুও তারা তার ওপর জুলুম করে৷ নিদর্শন তো আমি পাঠাই ভয় দেখাবার জন্য (তামাসা দেখাবার জন্য না)৷" (৫৯ আয়াত)

উটনীকে মাঠে-ময়দানে ছেড়ে দেবার পর এ কাফের জাতিকে চ্যালেঞ্জ দেয়া হয় তা ছিল এর অতিরিক্ত৷ কেবলমাত্র একটি মু'জিযা পেশ করেই এ ধরণের একটি চ্যালেঞ্জ দেয়া যেতে পারে৷
১০৪. অর্থাৎ পালাক্রমে একদিন এ উটনী একাই তোমাদের কূয়া ও প্রস্রবনগুলো থেকে পানি পান করবে এবং একদিন জাতির সমস্ত লোকজন ও জন্তু-জানোয়ার পানি পান করবে৷ সাবধান, তার পানি পান করার দিন যেন কোন ব্যক্তি পানি নেবার জায়গায় না যায়৷ এটি ছিল অত্যন্ত কঠিন চ্যালেঞ্জ৷ কিন্তু আরবের বিশেষ অবস্থায় কোন ব্যক্তির জন্য এর চেয়ে বড় আর কোন চ্যালেঞ্জ হতে পারতো না৷ সেখানে তো পানিই ছিল জীবনের মুখ্য বিষয় এবং এ বিষয়টি নিয়ে ঝগড়া ঝাঁটি করে খুনাখুনি হয়ে যেতো৷ গোত্রগুলো পারস্পারিক যুদ্ধে লিপ্ত হতো৷ তারপর প্রাণের বিনিময়ে কেউ কোন ঝরণা বা কূয়া থেকে পানি নেবার অধিকার লাভ করতো৷ সেখানে জাতির এক ব্যক্তি দাঁড়িয়ে বলে দিলেন, একদিন শুধুমাত্র আমার উটনী একাই সমস্ত কূয়া ও ঝরণা থেকে পানি পান করবে এবং জাতির সমস্ত লোক ও জন্তু-জানোয়াররা কেবলমাত্র দ্বিতীয় দিনেই পানি নিতে পারবে৷ তাঁর একথা বলার ছিল এই যে, তিনি যেন সমগ্র জাতিকে যুদ্ধ করার জন্য চ্যালেঞ্জ দিচ্ছেন৷ একটি বিরাট ও পরাক্রমশালী সেনাবাহিনী ছাড়া আরবে কোন ব্যক্তি এ ধরণের কথা মুখে উচ্চারণ করতে পারতো না৷ অন্যদিকে কোন জাতি যতক্ষণ না স্বচক্ষে দেখতে পেতো, চ্যালেঞ্জদানকারীর পেছনে এত বিপুল সংখ্যক তরবারী ও এত বড় তীরন্দাজ বাহিনী রয়েছে যারা প্রতিপক্ষের যে কোন পদক্ষেপকে পিষে গুড়িয়ে দিতে পারে৷ ততক্ষণ তার একথা শুনতে প্রস্তুত হতো না৷ কিন্তু হযরত সালেহ (আ) কোন সেনাবাহিনীর শক্তি ছাড়াই একাকী দাঁড়িয়ে নিজের জাতিকে এ চ্যালেঞ্জ দিলেন এবং জাতি কেবল কান পেতে তা শুনলই না বরং বহুদিন পর্যন্ত ভয়ে ভয়ে তা পালনও করতে থাকলো৷

সূরা আ'রাফ ও হূদে এর ওপর আরো এতটুকু বাড়ানো হয়েছেঃ

هذه ناقة الله لكم اياة فذروها تأكل فى الارض الله ولا تمسُّها بِسوءٍ-

"এ হচ্ছে আল্লাহর উটনী, তোমাদের জন্য নিদর্শন স্বরূপ৷ একে আল্লাহর জমীনে চরে বেড়াবার জন্য ছেড়ে দাও৷ কখনো খারাপ মতলবে এর গায়ে হাত দিয়ো না৷"

অর্থাৎ চ্যালেঞ্জ কেবল এতটুকুই ছিল না যে, কেবল একদিন পর পর উটনীটি একাই হবে সারাদিন সমস্ত এলাকার পানির ইজারাদার বরং এর ওপর বাড়তি চ্যালেঞ্জ ছিল এই যে, সে সারাদিন তোমাদের ক্ষেতে-খামারে, ফলের বাগানে, খেজুর উদ্যানে ও চারণেক্ষেত্র স্বাধীনভাবে চরে বেড়াবে, যেখানে চাইবে যাবে, যা ইচ্ছা খাবে, খবরদার! তোমরা কেউ তার গায়ে হাত দিতে পারবে না৷
১০৫. এর অর্থ এ নয় যে , সালেহের এ চ্যালেঞ্জ শোনার সাথে সাথেই তারা উটনীর উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে এবং তার পায়ের রগ কেটে দেয়৷ বরং দীর্ঘদিন পর্যন্ত এ উটনীটি সমগ্র জাতির জন্য একটি সমস্যা হয়ে থাকে৷ লোকেরা মনে মনে এর বিরুদ্ধে ফুঁসতে থাকে৷ পরামর্শ করতে থাকে৷ শেষমেশ জাতিকে এ আপদমুক্ত করার দায়িত্ব গ্রহণ করে একজন কাণ্ডজ্ঞানহীন সরদার ৷ সূরা আশ্ শামসে এ ব্যক্তির উল্লেখ এভাবে করা হয়েছেঃ------------------ "যখন এ জাতির সবচেয়ে বড় পাপিষ্ঠ লোকটি উদ্যোগী হলো" এবং সূরা আল কামারে বলা হয়েছেঃ -----------------"তারা নিজেদের সাথীকে আহ্বান জানালো , শেষ পর্যন্ত সে একাজটি নিজের দায়িত্বে নিয়ে নিল এবং সে গিঁঠের রগ কেটে দিল৷"
১০৬. কুরআনের অন্যান্য স্থানে এ ঘটনার যে বিস্তারিত বিবরণ এসেছে তা হচ্ছে এই যে, উটনীকে মেরে ফেলার পর সালেহ ঘোষণা করেনঃ "তিনদিন নিজেদের গৃহে আয়েশ করে নাও" (হূদ ৬৫ আয়াত) এ বিজ্ঞপ্তির মেয়াদ শেষ হবার পর রাতের শেষ প্রহরে ভোরের কাছাকাছি সময়ে একটি প্রচণ্ড বিষ্ফোরণ ঘটে৷ এ সংগে সংঘটিত হয় ভয়াবহ ভূমিকম্প ৷ ফলে মুহূর্তের মধ্যে সমগ্র জাতি ধ্বংস হয়ে যায়৷ সকাল হবার পর চারদিকে লাশের পর লাশ এমনভাবে ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল যেন মনে হচ্ছিল , শুকনো লতাগুল্ম জন্তু-জানোয়ারের পদদলনে বিধ্বস্ত ও ছিন্নভিন্ন হয়ে গেছে৷ তাদের সুরম্য প্রাসাদ এবং পার্বত্য গূহাগুলো তাদেরকে এ ভয়াবহ বিপদ থেকে রক্ষা করতে পারেনি৷----------------------------------------------