(২৬:১২৩) আদ জাতি রাসূলদের প্রতি মিথ্যারোপ করলো৷৮৮
(২৬:১২৪) স্মরণ করো যখন তাদের ভাই হুদ তাদেরকে বলেছিলো, ৮৯ “তোমরা ভয় করছো না ?
(২৬:১২৫) আমি তোমাদের জন্য একজন আমানতদার রসূল৷
(২৬:১২৬) কাজেই তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং আমার আনুগত্য করো৷
(২৬:১২৭) আমি এ কাজে তোমাদের কাছ থেকে কোন প্রতিদান চাই না৷ আমার প্রতিদান দেবার দায়িত্ব তো রব্বুল আলামীনের৷
(২৬:১২৮) তোমাদের এ কী অবস্থা, প্রত্যেক উঁচু জায়গায় অনর্থক একটি ইমারত বানিয়ে ফেলেছো ৯০
(২৬:১২৯) এবং বড় বড় প্রাসাদ নির্মান করছো, যেন তোমরা চিরকাল থাকবে? ৯১
(২৬:১৩০) আর যখন কারো ওপর হাত ওঠাও প্রবল এক নায়ক হয়ে হাত ওঠাও৷ ৯২
(২৬:১৩১) কাজেই তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং আমার আনুগত্য করো৷
(২৬:১৩২) তাকে ভয় করো যিনি এমন কিছু তোমাদের দিয়েছেন যা তোমরা জানো৷
(২৬:১৩৩) তোমাদের দিয়েছেন পশু,
(২৬:১৩৪) সন্তান-সন্ততি, উদ্যান ও পানির প্রস্রবনসমূহ৷
(২৬:১৩৫) আমি ভয় করছি তোমাদের ওপর একটি বড় দিনের আযাবের৷”
(২৬:১৩৬) তারা জবাব দিল, “তুমি উপদেশ দাও বা না দাও, আমাদের জন্য এ সবই সমান৷
(২৬:১৩৭) এ ব্যাপারগুলো তো এমনিই ঘটে চলে আসছে ৯৩
(২৬:১৩৮) এবং আমরা আযাবের শিকার হবো না৷”
(২৬:১৩৯) শেষ পর্যন্ত তারা তাকে প্রত্যাখ্যান করলো এবং আমি তাদেরকে ধ্বংস করে দিলাম৷ ৯৪ নিশ্চিতভাবেই এর মধ্যে আছে একটি নিদর্শন৷ কিন্তু তাদের অধিকাংশই মেনে নেয়নি৷
(২৬:১৪০) আর প্রকৃতপক্ষে তোমার রব যেমন পরাক্রমশালী তেমন করুণাময়ও৷
৮৮. তুলনামূলক অধ্যায়নের জন্য দেখুন আল আ'রাফ ৬৫-৭২ ও হূদ ৫০-৬০ আয়াত৷ এ ছাড়া এ কাহিনী সম্পর্কে বিস্তারিত জানার জন্য কুরআন মজীদের নিম্নোক্ত স্থানগুলো পড়ুনঃ হা-মীম আস্ সাজদাহ ১৩-১৬, আল আহক্বাফ ২১-২৬, আয্ যারিয়াত ৪১-৪৫, আল ক্বামার ১৮-২২, আল হাক্কাহ ৪-৮ এবং আল ফজর ৬-৮ আয়াত৷
৮৯. হযরত হূদের এ ভাষণটি অনুধাবন করার জন্য এ জাতিটি সম্পর্কিত ত্যথাবলী আমাদের সামনে থাকা প্রয়োজন৷ কুরআন মজীদ বিভিন্ন স্থানে আমাদের কাছে এ তথ্য পরিবেশেন করেছে৷ এতে বলা হয়েছে, নূহের জাতির ধ্বংসের পর দুনিয়ায় যে জাতির উত্থান ঘটানো হয়েছিল তারা ছিল এই আদ জাতিঃ

وَاذكؤوا اِذْ جعلكم خلفاء من بعد قوم نوحٍ -

"স্মরণ করো (আল্লাহর অনুগ্রহ ও দানের কথা) তিনি নূহের জাতির পরে তোমাদেরকে খলীফা তথা প্রতিনিধি নিয়োগ করেন৷" (সূরা আল আ'রাফ ৬৯ আয়াত)

শারীরিক দিক দিয়ে তারা ছিল অত্যন্ত স্বাস্থ্যবান ও বলিষ্ঠ জাতি৷

وَزَادَكم فى الخلقِ بصْطَةً -

"আর শারীরিক গঠন শৈলীতে তোমাদেরকে অত্যন্ত বলিষ্ঠ ও সুস্বাস্থ্যের অধিকারী করি৷" (আল আ'রাফ ৬৯ আয়াত) সেকালে তারা ছিল নজিরবিহীন জাতি৷ তাদের সমকক্ষ অন্য কোন জাতিই ছিল নাঃ

الَّتِى لَمْ يُخْلَقْ مِثْلُها فى البِلاَدِ-

"তাদের সমকক্ষ কোন জাতি দেশে সৃষ্টি করা হয়নি৷" (আল ফজরঃ ৮ আয়াত )

তাদের সভ্যতা ছিল বড়ই উন্নত ও গৌরবোজ্জ্বল৷ সুউচ্চ ইমারত নির্মাণ করা ছিল তাদের বৈশিষ্ট এবং এজন্য তদানীন্তন বিশ্বে তারা প্রসিদ্ধি লাভ করেছিলঃ

الم تر كيف فعل ربُّك بعاد- اِرَمَ ذَاتِ العِمَاد-

"তুমি কি দেখোনি তোমাদের রব কি করেছেন সুউচ্চ স্তম্ভের অধিকারী ইরমের আদদের সাথে?" (আল ফজরঃ ৬-৭ আয়াত)

এ বস্তুগত উন্নতি ও শারীরিক শক্তি তাদেরকে অহংকারী করে দিয়েছিল এবং নিজেদের শক্তির গর্বে তারা মত্ত হয়ে উঠেছিলঃ

فاما عادٌ فاستكبروا فى الارض بغير الحق وقالوا من اشَدُّ منَّا قُوَّةً -

"আর আদ জাতি, তারা তো পৃথিবীতে সত্যের পথ থেকে সরে গিয়ে অহংকার করতে থাকে এবং বলতে থাকে, কে আছে আমাদের চেয়ে বেশী শক্তিশালী?" (হা-মীম আস্ সাজদাহঃ ১৫ আয়াত)

তাদের রাজনৈতিক ব্যবস্থা ছিল কয়েকজন বড় বড় জালেম এক নায়কের হাতে৷ তাদের সামনে কেউ 'টু' শব্দটিও পর্যন্ত করতে পারতো নাঃ

واتَّبَعُوا امركُلِّ جبَّارٍ عَنِيْدٍ-

"আর তারা প্রত্যেক সত্যের দুশমন জালেম এক নায়কের হুকুম পালন করে৷" (হূদঃ ৫৯ আয়াত)

ধর্মীয় দিক থেকে তারা আল্লাহর অস্তিত্ব স্বীকার করতো না বরং শিরকে লিপ্ত ছিল৷ বন্দেগী একমাত্র আল্লাহর জন্য নির্ধারিত হওয়া উচিত, একথা তারা অস্বীকার করতোঃ

قَالُوا أجئتنا لِنَعْبد الله وَحٍدَهُ وَنَذَرَ ما كان يَعْبُدُ اباؤنَا -

"তারা (হূদ আলাইহিস্ সালামকে) বললো, তুমি কি আমাদের কাছে এ জন্য এসেছো যে আমরা, একমাত্র আল্লাহর বন্দেগী করবো এবং আমাদের বাপ-দাদারা যাদের ইবাদত করতো তাদেরকে বাদ দেবো?" (আল আ'রাফঃ ৭০ আয়াত)

এ বৈশিষ্টগুলো সামনে রাখলে হযরত নূহের দাওয়াতের এ ভাষণ ভালোভাবে অনুধাবন করা যেতে পারে৷

৯০. অর্থাৎ নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব ও সমৃদ্ধির প্রদর্শনী করার উদ্দেশ্যে এমনসব বিশাল সুরম্য অট্টলিকা নির্মাণ করছো; যেগুলোর কোন প্রয়োগ ক্ষেত্রে ও প্রয়োজনীয়তা নেই এবং নিছক তোমাদের সম্পদশালীতা ও শানশওকতের প্রদর্শনীর নিদর্শন হিসেবে এগুলো টিকে থাকবে, এছাড়া যেগুলোর কোন উপযোগিতাও নেই৷
৯১. অর্থাৎ তোমাদের অন্যান্য ইমারতগুলো ব্যবহারের জন্য নির্মিত হয়েছে ঠিকই কিন্তু সেগুলোকে সুরম্য , কারুকার্যময় ও সুদৃঢ় করার ব্যাপারে তোমরা এতবেশী অর্থ , শ্রম ও যোগ্যতা নিয়োগ করছো যেন তোমরা এ দুনিয়ায় চিরকাল বসবাস করার ব্যবস্থা করছো, যেন শুধুমাত্র এখানকার আয়েশ আরামের ব্যবস্থা করাই তোমাদের জীবনের উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য এবং এ ছাড়া আর কোন কথাই চিন্তা করার নেই৷

এ প্রসংগে একথাও মনে রাখতে হবে যে, অপ্রয়োজনে বা প্রয়োজনের অতিরিক্ত সুরম্য অট্টালিকা নির্মাণ করা এমন কোন বিচ্ছিন্ন কর্মকাণ্ড নয়, যার প্রকাশ কোন জাতির মধ্যে এভাবে হতে পারে যে, তার অন্য সমস্ত কাজ কারবার তো ভালোই শুধুমাত্র এ একটি খারাপ ও ভুল কাজ সে করেছে৷ এ অবস্থা একটি জাতির মধ্যে সৃষ্টিই হয় এমন এক সময় যখন একদিকে তার মধ্যে দেখা দেয় সম্পদের প্রাচুর্য এবং অন্যদিকে প্রবৃত্তি পূজা ও বৈষয়িক স্বার্থপরতা প্রবল হতে হতে উন্মাত্ততার পর্যায়ে পৌঁছে যায়৷ যখন কোন জাতির মধ্যে এ অবস্থা সৃষ্টি হয়ে যায় তখন তার সভ্যতা-সংস্কৃতির সমগ্র ব্যবস্থাটিই পচে দুর্গন্ধময় হয়ে পড়ে৷ হূদ (আ) তাঁর জাতির ইমারত নির্মাণের যে সমালোচনা করেন তার উদ্দেশ্য এ ছিল না যে, তিনি শুধুমাত্র তাদের এ ইমারত নির্মাণকেই আপত্তিকর মনে করতেন বরং তিনি সামগ্রিকভাবে তাদের সভ্যতা ও সংস্কৃতির বিকৃতির সমালোচনা করছিলেন এবং এ ইমারতগুলোর কথা তিনি এমন ভাবে উচ্চারণ করেছিলেন যেন সারা দেশে সর্বত্র এ বড় বড় ফোড়াগুলো সেই বিকৃতির সবচেয়ে সুস্পষ্ট আলামত হিসেবে পরিদৃষ্ট হচ্ছে ৷

৯২. অর্থাৎ নিজেদের জীবন যাত্রার মান উন্নত করার ক্ষেত্রে তোমরা এত বেশী সীমালংঘন করে গেছো যার ফলে মনে হয়েছে তোমাদের বাসগৃহ নয়, সদৃশ্য মহল ও প্রাসাদের প্রয়োজন৷ আর এতেও পরিতৃপ্ত না হয়ে তোমরা অপ্রয়োজনে সুউচ্চ নয়নাভিরাম ইমারতসমূহ নির্মাণ করছো৷ শক্তি ও সম্পদের প্রদর্শনী ছাড়া এগুলোর আর কোন স্বার্থকতা নেই৷ কিন্তু তোমাদের মানুষ্যত্বের মানদণ্ড এত নিচে নেমে গেছে, যার ফলে দুর্বলদের জন্য তোমাদের অন্তরে একটুও দয়া মায়া নেই৷ গরীবদের জন্যে তোমাদের দেশে কোন ইনসাফ নেই৷ আশপাশের দুর্বল জাতিগুলো হোক বা তোমাদের নিজেদের দেশের পশ্চাতপদ শ্রেণীগুলো, সবাই তোমাদের জুলুম নিপীড়নের যাঁতাকলে নিষ্পেষিত হচ্ছে এবং তোমাদের নির্মম নির্যাতনের হাত থেকে কেউ রেহাই পাচ্ছে না৷
৯৩. এর দুটি অর্থ হতে পারে৷ এক. যা কিছু আমরা করছি এগুলো কোন নতুন জিনিস নয়, শত শত বছর থেকে আমাদের বাপ-দাদারা এসব করে আসছে৷ এসবই ছিল তাদের ধর্ম, সংস্কৃতি, চরিত্রনীতি ও ব্যবহারিক জীবনধারা৷ তাদের ওপর এমন কি বিপদ নেমে এসেছিল যে, আজ আমাদের ওপর তা নেমে আসার আশংকা করবো? এ জীবন ধারায় যদি কোন অন্যায় ও দুষ্কৃতির অংশ থাকতো, তাহলে তুমি যে আযাবের ভয় দেখাচ্ছো তা আগেই নেমে আসতো৷ দুই. তুমি যেসব কথা বলছো এমনি ধারার কথা ইতিপূর্বেও বহু ধর্মীয় উম্মাদ ও এবং যারা নৈতিকতার বুলি আওড়ায় তারা আওড়িয়ে এসেছে৷ কিন্তু দুনিয়ার রীতি অপরিবর্তিত রয়েছে৷ তোমাদের মত লোকদের কথা না মানার ফলে কখনো এক ধাক্কায় এ রীতির মধ্যে ওলট-পালট হয়ে যায়নি৷
৯৪. এ জাতির ধ্বংসের যে বিস্তারিত বিবরণ কুরআন মজীদে এসেছে তা হচ্ছে এইঃ হঠাৎ প্রবল ঘূণিঝড় উঠে ৷ লোকেরা দূর থেকে নিজেদের উপত্যকার দিকে এ ঘূণিঝড় আসতে দেখে মনে করে মেঘ ছেয়ে যাচ্ছে৷ তারা আনন্দে উতলা হয়ে উঠে৷ কারণ জোর বৃষ্টিপাত হবে৷ কিন্তু তা ছিল আল্লাহর আযাব৷ আট দিন ও সাত রাত পর্যন্ত এমন ঝড়ো হাওয়া অনবরত বইতে থাকে যার ফলে প্রত্যেকটি জিনিসই ধ্বংস হয়ে যায়৷ হাওয়া প্রবল বেগে প্রবহিত হয়ে মানুষজনকে উড়িয়ে নিয়ে যায় এবং তাদেরকে চতুরদিকে নিক্ষেপ করতে থাকে৷ বাতাস এ বেশী গরম ও শুকনা ছিল যে , যার উপর দিয়ে তা একবার প্রবাহিত হয় তাকে নড়বড়ে ও অকেজো করে দিয়ে যায়৷ এ জালেম জাতির প্রত্যেকটি লোক খতম না হয়ে যাওয়া পর্যন্ত এ ঝড় থামেনি৷ তাদের জনপদের ধ্বংসাবশেষগুলোই শুধু তাদের পরিণামের কাহিনী শুনাবার জন্য টিকে আছে৷ আর আজ এ ধ্বংসাবশেষও নেই৷ আহকাফের সমগ্র এলাকা একটি ভয়াবহ মরুভূমিতে পরিণত হয়েছে৷ আরো বেশী ব্যাখ্যার জন্য দেখুন তাফহীমুল কুরআন,সূরা আহকাফ ২৫ টীকা৷