(২৬:৬৯) আর তাদেরকে ইবরাহীমের কাহিনী শুনিয়ে দাও, ৫০
(২৬:৭০) যখন সে তার বাপ ও তার সম্প্রদায়কে জিজ্ঞেস করেছিল, "তোমরা কিসের পূজা করো?" ৫১
(২৬:৭১) তারা বললো, "আমরা কতিপয় মূর্তির পূজা করি এবং তাদের সেবায় আমরা নিমগ্ন থাকি৷"৫২
(২৬:৭২) সে জিজ্ঞেস করলো, "তোমরা যখন তাদেরকে ডাকো তখন কি তারা তোমাদের কথা শোনে?
(২৬:৭৩) অথবা তোমাদের কি কিছু উপকার বা ক্ষতি করে?"
(২৬:৭৪) তারা জবাব দিল, "না, বরং আমরা নিজেদের বাপ-দাদাকে এমনটিই করতে দেখেছি৷" ৫৩
(২৬:৭৫) এ কথায় ইবরাহীম বললো, "কখনো কি তোমরা (চোখ মেলে)
(২৬:৭৬) সেই জিনিসগুলো দেখেছো যাদের বন্দেগী তোমরা এবং তোমাদের অতীত পূর্বপুরুষেরা করতে অভ্যস্ত? ৫৪
(২৬:৭৭) এরা তো সবাই আমার দুশমন ৫৫ একমাত্র রাব্বুল আলামীন ছাড়া,৫৬
(২৬:৭৮) যিনি আমাকে সৃষ্টি করেছেন,৫৭ তারপর তিনিই আমাকে পথ দেখিয়েছেন৷
(২৬:৭৯) তিনি আমাকে খাওয়ান ও পান করান
(২৬:৮০) এবং রোগাক্রান্ত হলে তিনিই আমাকে রোগমুক্ত করেন৷৫৮
(২৬:৮১) তিনি আমাকে মৃত্যু দান করবেন এবং পুনর্বার আমাকে জীবন দান করবেন৷
(২৬:৮২) তাঁর কাছে আমি আশা করি, প্রতিদান দিবসে তিনি আমার অপরাধ ক্ষমা করবেন৷" ৫৯
(২৬:৮৩) (এরপর ইবরাহীম দোয়া করলোঃ) "হে আমার রব! আমাকে প্রজ্ঞা দান কর ৬০ এবং আমাকে সৎকর্মশীলদের সাথে শামিল কর৷ ৬১
(২৬:৮৪) আর পরবর্তী প্রজন্মের মধ্যে আমার সত্যিকার খ্যাতি ছড়িয়ে দিও ৬২
(২৬:৮৫) এবং আমাকে নেয়ামতে পরিপূর্ণ জান্নাতের অধিকারীদের অন্তর্ভুক্ত করো৷
(২৬:৮৬) আর আমার বাপকে মাফ করে দিও, নিঃসন্দেহে তিনি পথভ্রষ্টদের দলভুক্ত ৬৩ ছিলেন
(২৬:৮৭) এবং সেদিন আমাকে লাঞ্ছিত করো না যেদিন সবাইকে জীবিত করে উঠানো হবে,৬৪
(২৬:৮৮) যেদিন অর্থ-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি কোন কাজে লাগবে না,
(২৬:৮৯) তবে যে বিশুদ্ধ অন্তঃকরণ নিয়ে আল্লাহর সামনে হাজির হবে৷" ৬৫
(২৬:৯০) (সেদিন )৬৬ জান্নাত মুত্তাকীদের কাছাকাছি নিয়ে আসা হবে
(২৬:৯১) এবং জাহান্নাম পথভ্রষ্টদের সামনে খুলে দেয়া হবে৷৬৭
(২৬:৯২) আর তাদেরকে জিজ্ঞেস করা হবে, "আল্লাহকে বাদ দিয়ে তোমরা যাদের ইবাদাত করতে তারা এখন কোথায়?
(২৬:৯৩) তারা কি এখন তোমাদের কিছু সাহায্য করছে অথবা আত্মরক্ষা করতে পারে? "
(২৬:৯৪) তারপর সেই উপাস্যদেরকে এবং
(২৬:৯৫) এই পথভ্রষ্টদেরকে আর ইবলীসের বাহিনীর সবাইকে তার মধ্যে নিক্ষেপ করা হবে৷৬৮
(২৬:৯৬) সেখানে এরা সবাই পরস্পর ঝগড়া করবে এবং পথভ্রষ্টরা (নিজেদের উপাস্যদেরকে) বলবে,
(২৬:৯৭) "আল্লাহর কসম আমরা তো স্পষ্ট ভ্রষ্টতার মধ্যে ছিলাম,
(২৬:৯৮) যখন তোমাদের দিচ্ছিলাম রাব্বুল আলামীনের সমকক্ষের মর্যাদা৷
(২৬:৯৯) আর এ অপরাধীরাই আমাদেরকে ভ্রষ্টতায় লিপ্ত করেছে৷৬৯
(২৬:১০০) এখন আমাদের কোন সুপারিশকারী নেই ৭০
(২৬:১০১) এবং কোন অন্তরংগ বন্ধুও নেই৷৭১
(২৬:১০২) হায় যদি আমাদের আবার একবার ফিরে যাওয়ার সুযোগ মিলতো, তাহলে আমরা মুমিন হয়ে যেতাম৷" ৭২
(২৬:১০৩) নিঃসন্দেহে এর মধ্যে একটি বড় নিদর্শন রয়েছে; ৭৩ কিন্তু এদের অধিকাংশ মুমিন নয়৷
(২৬:১০৪) আর প্রকৃতপক্ষে তোমার রব পরাক্রমশালীও এবং করুণাময়ও৷
৫০. এখানে হযরত ইব্রাহীমের পবিত্র জীবনের এক যুগের কাহিনী বর্ণনা করা হয়েছে যখন নবুয়ত লাভ করার পর শিরক ও তাওহীদের বিষয় নিয়ে তাঁর নিজের পরিবার ও নিজের সম্প্রদদায়ের সাথে সংঘাত শুরু হয়েছিল৷ সে যুগের ইতিহাসের বিভিন্ন ঘটনা কুরআন মজীদের নিম্নোক্ত সূরাগুলোতে বর্ণিত হয়েছেঃ সূরা আল বাকারাহ ৩৫ রুকু, আল আন'আম ৯ রুকু, মারয়াম ৩ রুকু, আল আম্বিয়া ৫ রুকু, আস্ সাফ্ফাত ৩ রুকু এবং আল মুমতাহিনাহ ১ রুকু৷

হযরত ইব্রাহীমের জীবনের এ যুগের ইতিহাস কুরআন মজীদ বিশেষভাবে বারবার সামনে এনেছে৷ এর কারণ হচ্ছে, আরবের লোকেরা সাধারণভাবে এবং কুরাইশরা বিশেষভাবে নিজেদেরকে হযরত ইব্রাহীম আলাইহিস সালামের অনুসারী মনে করতো৷ এ জন্য কুরআন মজীদ বিভিন্ন জায়গায় তাদেরকে এ মর্মে সতর্ক করেছে যে, ইব্রাহীম আলাইহিস সালাম যে দ্বীন নিয়ে এসেছিলেন তা ছিল সেই একই নির্ভেজাল দ্বীন যা আরবীয় নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এনেছেন এবং যার সাথে তোমরা সংঘাতে লিপ্ত হয়েছো৷ তিনি মুশরিক ছিলেন না৷ বরং শিরকের বিরুদ্ধেই ছিল তাঁর সংগ্রাম এবং এ সংগ্রামের কারণে তাকে নিজের বাপ, পরিবার, জাতি ও দেশ সবকিছু ত্যাগ করে সিরিয়া, ফিলিস্তিন এবং হিজাযে প্রবাসীর জীবন যাপন করতে হয়েছিল৷ অনুরূপভাবে তিনি ইহুদী ও খ্রিস্টানও ছিলেন না৷ বরং ইহুদীবাদ ও খ্রিস্টবাদ তো তাঁর বহু শতাব্দী পরে জন্ম নিয়েছিল৷ এ ঐতিহাসিক যুক্তির কোন জবাব মুশরিক, ইহুদী ও খ্রিস্টান কারো কাছে ছিল না৷ কারণ মুশরিকরাও স্বীকার করতো, আরবের মূর্তি পূজার প্রচলন হয়েছিল হযরত ইব্রাহীম আলাইহিস সালামের কয়েক শত বছর পরে৷ অন্যদিকে ইহুদীবাদ ও খ্রিস্টবাদের জন্মের বহু পূর্বে হযরত ইব্রাহীমের যুগ অতিবাহিত হয়ে গিয়েছিল, একথা ইহুদী ও খ্রিস্টানরা অস্বীকার করতো না৷ এর স্বতস্ফূর্ত ফল স্বরূপ বলা যায়, যেসব বিশেষ আক্বীদা বিশ্বাস ও কর্মকাণ্ডের ওপর তারা বিশ্বাস স্থাপন করে তা প্রথম থেকে প্রচলিত প্রাচীন দ্বীনের অংশ নয় এবং এসব মিশ্রণমুক্ত নির্ভেজাল আল্লাহর আনুগত্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত দ্বীনই সঠিক দ্বীন৷ এরই ভিত্তিতে কুরআন বলছেঃ

مَا كَانَ اِبْرَهِيْمِ يَهُوْدِيًّا وَّلاَ نَصْرَانِيَّا وِّلَكِنْ كَانَ حَنِيْفًا مُّسْلِمًا وَمَا كَانَ مِنَ المُشْرِكِيْنَ- اِنََّ اَوِّلَ النَّاسِ بِاِبْرأهِيْمَ لَلَّذِيْنَ اتَّبَعَوهُ وَهَذَا النَّبِىُّ وَالَّذِيْنَ اَمَنُوْا-

"ইব্রাহীম ইহুদীও ছিল না এবং খ্রিস্টানও ছিল না বরং সে একজন একনিষ্ট মুসলিম ছিল৷ আর সে মুশরিকও ছিল না৷ আসলে ইব্রাহীমের সাথে সম্পর্ক রাখার সবচেয়ে বেশী অধিকার তাদের, যারা তাঁর পদ্ধতি অনুসরণ করে এবং (এখন এ অধিকার) এ নবীর এবং এর সাথে যারা ঈমান এনেছে তাদের৷" (আলে ইমরানঃ ৬৭-৬৮)
৫১. তারা কিসের পূজা করছে তা জানা ইবরাহীমের প্রশ্নের উদ্দেশ্য ছিল না৷ কারণ সেখানে তারা যেসব মূর্তির পূজা করতো তা তিনি নিজে দেখতেন ৷ কাজেই তাঁর প্রশ্নের উদ্দেশ্য ছিল ভিন্ন৷ তিনি তাদের দৃষ্টি ও চিন্তা এদিকে আকৃষ্ট করতে চাচ্ছিলেন যে, তোমরা যেসব উপাস্যের সামনে নিজেদের নত করছো তাদের স্বরূপ কি ? সূরা আম্বিয়াতে এ প্রশ্নটিকে এভাবে করা হয়েছেঃ "এসব কেমন প্রতিমা যেগুলোর প্রতি ভক্তিতে তোমরা গদগদ হচ্ছো ?"
৫২. আমরা কিছু মূর্তির পূজা করি , এ জবাবও নিছক একটা সংবাদ জানিয়ে দেবার উদ্দেশ্যে বলা হয়নি৷ কারণ প্রশ্নকর্তা ও জবাবদাতা উভয়ের সামনে এ বিষয়টি সুস্পষ্ট ছিল৷ নিজেদের আকীদা-বিশ্বাসের প্রতি তাদের অবিচলতাই ছিল এ জবাবের আসল প্রাণসত্তা ৷ অর্থাৎ তারা আসলে বলতে চাচ্ছিল , হাঁ , আমরাও জানি এগুলো কাঠ ও পাথরের তৈরী প্রতিমা৷ আমরা এগুলোর পূজা করি৷ কিন্তু আমরা এ গুলোরই পূজা ও সেবা করে যাবো, এটিই আমাদের ধর্ম ও বিশ্বাস ৷
৫৩. অর্থাৎ এরা আমাদের প্রার্থনা , মুনাজাত ও ফরিয়াদ শোনে অথবা আমাদের উপকার বা ক্ষতি করে মনে করে আমরা এদের পূজা করতে শুরু করেছি তা নয়৷ আমাদের এ পূজা-অর্চনার কারণ এটা নয়৷ বরং আমাদের এ পূজা-অর্চনার আসল কারণ হচ্ছে , আমাদের বাপ-দাদার আমল থেকে তা এভাবেই চলে আসছে৷ এভাবে তারা নিজেরাই একথা স্বীকার করে নিয়েছে যে , তাদের ধর্মের পেছনে তাদের পূর্বপুরুষদের অন্ধ অনুকরণ ছাড়া আর কোন প্রমাণ নেই৷ অন্য কথায় তারা যেন বলছিল , তুমি আমাদের কি এমন নতুন কথা বলবে ? আমরা নিজেরা দেখছি না এগুলো কাঠ ও পাথরের মূর্তি ? আমরা কি জানি না , কাঠ শোনে না এবং পাথর কারো ইচ্ছা পূর্ণ করতে বা ব্যর্থ করে দিতে পারে না ? কিন্তু আমাদের শ্রদ্ধেয় পূবপুরুষরা শত শত বছর ধরে বংশ পরস্পরায় এদের পূজা করে আসছে৷ তোমার মতে তারা সবাই কি বোকা ছিল ? তারা এসব নিস্প্রাণ মূর্তিগুলোর পূজা করতো , নিশ্চয়ই এর কোন কারণ থাকবে ৷ কাজেই আমরাও তাদের প্রতি আস্থাশীল হয়ে এ কাজ করছি৷
৫৪. ব্যস, স্রেফ বাপ-দাদাদের আমল থেকে চলে আসছে বলেই তাকে সত্য ধর্ম বলে মেনে নিতে হবে, একটি ধর্মের সত্যতার জন্য শুধুমাত্র এতোটুকু যুক্তিই যথেষ্ট? চোখ বন্ধ করে প্রজন্মের পর প্রজন্ম গড্ডালিকা প্রবাহে ভেসে যাবে এবং কেউ একবার চোখ খুলে দেখবেও না যাদের বন্দেগী-পূজা-অর্চনা করা হচ্ছে তাদের মধ্যে সত্যিই আল্লাহর গুণাবলী পাওয়া যায় কি না এবং আমাদের ভাগ্যের ভাংগা-গড়ার ক্ষেত্রে তারা কোন ক্ষমতা রাখে কি না?
৫৫. অর্থাৎ চিন্তা করলে আমি দেখতে পাই, যদি আমি এদের পূজা করি তাহলে আমার দুনিয়া ও আখেরাত দুটোই বরবাদ হয়ে যাবে৷ আমি এদের ইবাদত করাকে শুধুমাত্র অলাভজনক ও অতিকর মনে করি না বরং উল্টো ক্ষতিকর মনে করি৷ তাই আমার মতে তাদেরকে পূজা করা এবং শক্রকে পূজা করা এক কথা৷ তাছাড়া হযরত ইব্রাহীমের এ উক্তির মধ্যে সূরা মারয়ামে বলা হয়েছেঃ

وَاتَخَذُوا من دون الله الهة لِّيَكُوْنوْا لهم عزََّ – كَلاًّ سَيَكفُرُون بعبَادتهِم وَيَكفرون عليهم ضدًا -

"তারা আল্লাহকে বাদ দিয়ে অন্য উপাস্য বানিয়ে নিয়েছে, যাতে তারা তাদের জন্য শক্তির মাধ্যম হয়৷ কখ্খনো না, শিগ্গিরই সে সময় আসবে যখন তারা তাদের পূজা-ইবাদত অস্বীকার করবে এবং উল্টো তাদের বিরোধী হয়ে যাবে৷" (৮১-৮২ আয়াত)

অর্থ কিয়ামতের দিন তারা তাদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেবে এবং পরিস্কার বলে দেবে, আমরা কখনো তাদেরকে আমাদের পূজা করতে বলিনি এবং তারা আমাদের পূজা করতো এ কথা আমরা জানিও না৷

এখানে প্রচারের কৌশলের একটি বিষয়ও প্রণিধানযোগ্য৷ হযরত ইব্রাহীম এ কথা বলেননি যে, এরা তোমাদের শত্রু বরং বলেছেন এরা আমার শত্রু৷ যদি তিনি বলতেন এরা তোমাদের শত্রু, তাহলে প্রতিপক্ষের হঠকারী হয়ে ওঠার বেশী সুযোগ থাকতো৷ তারা তখন বিতর্ক শুরু করতো এরা কেমন করে আমাদের শত্রু হয় বলো৷ পক্ষান্তরে যখন তিনি বললেন তারা আমার শত্রু তখন প্রতিপক্ষের জন্যও চিন্তা করার সুযোগ হলো৷ তারাও ভাবতে পারলো, ইব্রাহীম আলাইহিস সালাম যেমন নিজের ভাল-মন্দের চিন্তা করছেন তেমনি আমাদের নিজেদের ভাল-মন্দের চিন্তা করা উচিত৷ এভাবে হযরত ইব্রাহীম (আ.) যেন প্রত্যেক ব্যক্তির স্বভাবজাত আবেগ-অনুভূতির কাছে আবেদন জানিয়েছেন, যার ভিত্তিতে তারা নিজেরাই হয় নিজেদের শুভাকাঙ্খী এবং জেনে শুনে কখনো নিজেদের মন্দ চায় না৷ তিনি তাদেরকে বললেন, আমি তো এদের ইবাদত করার মধ্যে আগাগোড়াই ক্ষতি দেখি এবং জেনে বুঝে আমি নিজেই নিজের পায়ে কুড়াল মারতে পারি না৷ কাজেই দেখে নাও আমি নিজে তাদের ইবাদত-পূজা-অর্চনা থেকে পুরোপুরি দূরে থাকছি৷ এরপর প্রতিপক্ষ স্বাভাবিকভাবেই একথা চিন্তা করতে বাধ্য ছিল যে, তাদের লাভ কিসে এবং জেনে বুঝে তারা নিজেদের অমঙ্গল চাচ্ছে না তো৷
৫৬. অর্থাৎ পৃথিবীতে যেসব উপাস্যের বন্দেগী ও পূজা করা হয় তাদের মধ্যে একমাত্র আল্লাহ রব্বুল আলামীনই আছেন যার বন্দেগীর মধ্যে আমি নিজের কল্যাণ দেখতে পাই এবং যাঁর ইবাদত আমার কাছে শত্রুর নয় বরং একজন প্রকৃত পৃষ্ঠপোষকের ইবাদত বলে বিবেচিত হয়৷ এরপর হযরত ইব্রাহীম একমাত্র রব্বুল আলামীনই ইবাদতের হকদার কেন, এর কারণগুলো কয়েকটি বাক্যে বর্ণনা করেছেন৷ এভাবে তিনি নিজের প্রতিপক্ষের মনে এ অনুভূতি সৃষ্টি করার চেষ্টা করেছেন যে, তোমাদের কাছে তো আল্লাহকে বাদ দিয়ে অন্যান্য উপাস্যদের পূজা করার স্বপক্ষে বাপ-দাদার অনুকরণ ছাড়া বর্ণনা করার মতো আর কোন যুক্তিসংগত কারণ নেই কিন্তু আমার কাছে একমাত্র আল্লাহর বন্দেগী করার জন্য অত্যন্ত যুক্তিসংগত কারণ আছে, যা তোমরাও অস্বীকার করতে পারো না৷
৫৭. এটি প্রথম কারণ , যার ভিত্তিতে আল্লাহ এবং একমাত্র আল্লাহই ইবাদাতের হকদার৷ প্রতিপক্ষও এ সত্যটি জানতো এবং মেনেও নিয়েছিল যে , আল্লাহ তাদের সৃষ্টিকর্তা ৷ তাদের সৃষ্টিতে অন্য কারো কোন অংশ নেই, একথাও তারা স্বীকার করতো৷ এমন কি তাদের উপাস্যরা নিজেরাও যে আল্লাহর সৃষ্টি এ ব্যাপারে ইবরাহীমের জাতিসহ সকল মুশরিকদের বিশ্বাস ছিল ৷ নাস্তিকরা ছাড়া বাকি দুনিয়ার আর কোথাও কেউ একথা অস্বীকার করেনি৷ আল্লাহ বিশ্ব-জাহানের স্রষ্টা তাই ইবরাহীমের প্রথম যুক্তি ছিল , আমি একমাত্র তাঁর ইবাদাতকে সঠিক ও যথার্থ মনে করি যিনি আমাকে সৃষ্টি করেছেন৷ অন্য কোন সত্তা কেমন করে আমার ইবাদাতের হকদার হতে পারে , যেহেতু আমাকে সৃষ্টি করার ব্যাপারে তার কোন অংশ নেই৷ প্রত্যেক সৃষ্টি অবশ্যি তার নিজের স্রষ্টার বন্দেগী করবে৷ যে তার স্রষ্টা নয়, তার বন্দেগী করবে কেন ?
৫৮. একমাত্র আল্লাহর বন্দেগী করার স্বপক্ষে এটি হচ্ছে দ্বিতীয় যুক্তি৷ যদি তিনি মানুষকে কেবল সৃষ্টি করেই ছেড়ে দিতেন এবং সামনের দিকে তার দুনিয়ার জীবন যাপনের সাথে কোন প্রকার সম্পর্ক না রাখতেন তাহলেও মানুষের তাঁকে বাদ দিয়ে অন্য কারো সহায়তা চাওয়ার কোন যুক্তিসংগত কারণ থাকতো৷ কিন্তু তিনি তো সৃষ্টি করার সাথে সাথে পথনির্দেশনা, প্রতিপালন , দেখাশুনা , রক্ষণাবেক্ষণ ও প্রয়োজন পূর্ণ করার দায়িত্ব নিজেই নিয়েছেন৷ যে মুহূর্তে মানুষ দুনিয়ায় পদার্পণ করে তখনই তার মায়ের বুকে দুধের ধারা সৃষ্টি হয়৷ অন্যদিকে কোন অদৃশ্য শক্তি তাকে স্তন চোষার ও গলা দিয়ে দুধ নিচের দিকে নামিয়ে নেবার কায়দা শিখিয়ে দেয়৷ তারপর এ প্রতিপালন , প্রশিক্ষণ ও পথ প্রদর্শনের কাজ প্রথম দিন থেকে শুরু হয়ে মৃত্যুর শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত বরাবর চালু থাকে৷ জীবনের প্রতি পর্যায়ে মানুষের নিজের অস্তিত্ব, বিকাশ , উন্নয়ন ও স্থায়ীত্বের জন্য যেসব ধরনের সাজ-সরঞ্জামের প্রয়োজন হয় তা সবই তার স্রষ্ট পৃথিবী থেকে আকাশ পর্যন্ত সর্বত্রই সঠিকভাবে যোগান দিয়ে রেখেছেন ৷ এ সাজ-সরঞ্জাম থেকে লাভবান হবার এবং একে কাজে লাগাবার জন্য তার যে ধরনের শক্তি ও যোগ্যতার প্রয়োজন তা সবও তার আপন সত্তায় সমাহিত রাখা হয়েছে৷ জীবনের প্রতিটি বিভাগে তার যে ধরনের পথনির্দেশনার প্রয়োজন হয় তা দেবার পূর্ণ ব্যবস্থাও তিনি করে রেখেছেন৷ এ সংগে তিনি মানবিক অস্তিত্বের সংরক্ষণের এবং তাকে বিপদ-আপদ , রোগ-শোক , ধ্বংসকর জীবাণু ও বিষাক্ত প্রভাব থেকে রক্ষা করার জন্য তার নিজের শরীরের মধ্যে এমন শক্তিশালী ব্যবস্থা গড়ে তুলেছেন মানুষের জ্ঞান এখনো যার পুরোপুরি সন্ধান লাভ করতে পারেনি৷ আল্লাহর এ শক্তিশালী প্রাকৃতিক ব্যবস্থা যদি না থাকতো , তাহলে সামান্য একটি কাঁটা শরীরের কোন অংশে ফুটে যাওয়াও মানুষের জন্য ধ্বংসকর প্রমাণিত হতো এবং নিজের চিকিৎসার জন্য মানুষের কোন প্রচেষ্টাই সফল হতো না৷ স্রষ্টার এ সর্বব্যাপী অনুগ্রহ ও প্রতিপালন কর্মকাণ্ড যখন প্রতি মুহূর্তে সকল দিক থেকে মানুষকে সাহায্য করছে তখন মানুষ তাকে বাদ দিয়ে অন্য কোন সত্তার সামনে মাথা নত করবে এবং প্রয়োজন পূরণ ও সংকট উত্তরণের জন্য অন্য কারো আশ্রয় গ্রহণ করবে , এর চেয়ে বড় মূর্খতা ও বোকামী এবং এর চেয়ে বড় অকৃতজ্ঞতা আর কি হতে পারে ?
৫৯. আল্লাহ ছাড়া অন্য কারে ইবাদাত যে ঠিক নয় এ হচ্ছে তার তৃতীয় কারণ৷ আল্লাহর সাথে মানুষের সম্পর্ক কেবলমাত্র এ দুনিয়া এবং এখানে সে যে জীবন যাপন করে তার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়৷ অস্তিত্বের সীমানায় পা রাখার পর থেকে শুরু করে মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্তে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করার সাথে সাথেই তা খতম হয়ে যায় না৷ বরং এরপর তার পরিণামও পুরোপুরি ও পুরোপুরি আল্লাহরই হাতে আছে৷ আল্লাহই তাকে অস্তিত্ব দান করেছেন৷ সবশেষে তিনি তাকে দুনিয়া থেকে ফিরিয়ে নিয়ে যান৷ দুনিয়ায় এমন কোন শক্তি নেই যা মানুষের এ ফিরে যাওয়ার পথ রোধ করতে পারে ৷ যে হাতটি মানুষকে এখান থেকে বের করে নিয়ে যায় আজ পর্যন্ত কোন ঔষধ , চিকিৎসক দেব-দেবীর হস্তক্ষেপ তাকে পাকড়াও করতে পারেনি৷ এমন কি মানুষের যে একদল মানুষকে উপাস্য বানিয়ে পূজা-আরাধনা করেছে তারা নিজেরাও নিজেদের মৃত্যুকে এড়াতে পারেনি৷ একমাত্র আল্লাহই ফায়সালা করেন, কোন ব্যক্তিকে কখন এ দুনিয়া থেকে ফিরিয়ে নেবেন এবং যখন যার তাঁর কাছ থেকে চলে যাবার সমন এসে যায় তখন ইচ্ছায় অনিচ্ছায় তাকে চলে যেতেই হয়৷ তারপর আল্লাহ একাই ফায়সালা করেন , দুনিয়ায় যেসব মানুষ জন্ম নিয়েছিল তাদের সবাইকে কখন পূর্ণবার জীবন দান করবেন এবং তাদের পৃথিবীর জীবনের কাজ-কারবারের ব্যাপারে জিজ্ঞাসাবাদ করবেন৷ তখনো মৃত্যুর পর পুনরুজ্জীবন থেকে কাউকে রেহাই দেয়া বা নিজে রেহাই পাওয়া কারো পক্ষে সম্ভব হবে না৷ প্রত্যেককে তাঁর হুকুমে উঠতেই হবে এবং তাঁর আদালতে হাজির হতেই হবে৷ তারপর সেই আল্লাহ একাই সেই আদালতের বিচারপতি হবেন৷ তাঁর ক্ষমতায় কেউ সামান্যতমও শরীক হবে না৷ শাস্তি দেয়া বা মাফ করা উভয়টিই হবে সম্পূর্ণ তাঁর ইখতিয়ারভুক্ত৷ তিনি যাকে শাস্তি দিতে চান কেউ তাকে ক্ষমা করার ক্ষমতা রাখে না৷ অথবা তিনি কাউকে ক্ষমা করতে চাইলে কেউ তাকে শাস্তি দিতে পারবে না৷ দুনিয়ায় যাদেরকে ক্ষমা করিয়ে নেবার ইখতিয়ার আছে বলে মনে করা হয় তারা নিজেরাই নিজেদের ক্ষমার জন্য তাঁরই অনুগ্রহ ও দয়ার দুয়ারে ধর্ণা দিয়ে বসে থাকবে৷ এসব জাজ্বল্যমান সত্যের উপস্থিতিতে যে ব্যক্তি আল্লাহকে বাদ দিয়ে অন্য কারো বন্দেগী করে সে নিজেই নিজের অশুভ পরিণামের ব্যবস্থা করে৷ দুনিয়া থেকে নিয়ে আখেরাত পর্যন্ত মানুষের ভাগ্য পুরোপুরি ন্যস্ত থাকে আল্লাহর হাতে৷ আর সেই ভাগ্য গড়ার জন্য মানুষ এমন সব সত্তার আশ্রয় নেবে যাদের হাতে কিছুই নেই , এর চেয়ে বড় ভাগ্য বিপর্যয় আর কী হতে পারে ?
৬০. "হুকুম" অর্থ এখানে নবুওয়াত গ্রহণ করা সঠিক হবে না৷ কারণ এটা যে সময়ের দোয়া সে সময় হযরত ইব্রাহীম আলাইহিস সালামকে নবুওয়াত দান করা হয়ে গিয়েছিল৷ আর ধরে নেয়া যাক যদি এ দোয়া তার আগেরও হয়ে থাকে, তাহলে নবুওয়াত কেউ চাইলে তাকে দান করা হয় না বরং এটি এমন একটি দান যা আল্লাহ নিজেই যাকে চান তাকে দান করেন৷ তাই এখানে 'হুকুম' অর্থ জ্ঞান, হিকমত, প্রজ্ঞা, সঠিক বুঝ-বিবেচন ও সিদ্ধান্ত করার শক্তি গ্রহণ করাই সঠিক অর্থ হবে৷ হযরত ইব্রাহীমের (আ) দোয়াটি প্রায় সেই একই অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে যে অর্থে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে এ দোয়া উদ্ধৃত হয়েছে৷ তিনি বলেছেন, اَرِنَا الاَشْيَاء كَمَاهِىَ অর্থাৎ আমাদের এমন যোগ্যতা দাও যাতে আমরা প্রত্যেকটি জিনিসকে তার যথার্থ স্বরূপে দেখতে পারি এবং প্রত্যেকটি বিষয় সম্পর্কে এমন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারি যা তার প্রকৃত স্বরূপের প্রেক্ষিতে গ্রহণ করা উচিত৷
৬১. অর্থাৎ দুনিয়ায় আমাকে সৎ সমাজ-সংসর্গ দান করো এবং আখেরাতের ময়দানে সৎলোকদের সাথে আমাকে সমবেত করো৷ আখেরাতের ময়দানে সৎ লোকদের সাথে কারো সমবেত হওয়া তার মুক্তি লাভ করার সমার্থক হয়ে থাকে৷ তাই মৃত্যু পরের জীবন ও কিয়ামতের ময়দানে কর্মের প্রতিফল দানের উপর বিশ্বাস স্থাপনকারী প্রত্যেক ব্যক্তিরই এ দোয়া করা উচিত৷ কিন্তু দুনিয়াতেও পবিত্র জীবনের অধিকারী সৎকর্মশীল ব্যক্তির অন্তরের আকাংখাই এই হয়ে থাকে যে, আল্লাহ যেন তাকে একটি ফাসেক , নোংরা ও অসুস্থ সমাজে জীবন যাপন করার বিপদ থেকে নিষ্কৃতি দেন এবং সৎলোকদের সাথে উঠা-বসা ও চলা-ফেরা সুযোগ দান করেন৷ সামাজিক বিকৃতি ও অসুস্থতা যেখানে চারদিকে বিস্তার লাভ করে সেখানে কেবল মাত্র এটাই সর্বক্ষণ একজন লোককে মানষিক পীড়া দেয়না যে, তার চারদিকে সে কেবল নোংরামীই নোংরামী দেখছে বরং তার নিজের পবিত্র জীবন যাপন করা এবং দূষিত আবর্জনার ছিটা থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে চলাও তার পক্ষে কঠিন হয়ে থাকে৷ তাই একজন সৎ লোক ততক্ষণ পর্যন্ত অস্থির থাকে যতক্ষণ না তার নিজের সমাজ পবিত্র ও সুস্থ হয়ে যায় অথবা সে এ সমাজ থেকে বের হয়ে সত্য ও ন্যায়নীতির ভিত্তিতে পরিচালিত অন্য একটি সমাজের সাথে সংযুক্ত হয়ে যায়৷
৬২. অর্থাৎ ভবিষ্যত প্রজন্ম যেন মর্যাদা ও শুভেচ্ছা সহকারে আমার নাম স্মরণ করে৷ দুনিয়ায় যেন আমি এমন কাজ না করে যাই যার ফলে ভবিষ্যত বংশধররা আমার পরে আমাকে এমন সব জালেমদের দলভুক্ত করে যারা নিজেরাও ছিল অসৎ ও বিকৃত চরিত্রের অধিকারী এবং দুনিয়াকেও অসৎ ও বিকৃতির পথে চালিয়ে গেছে৷ বরং আমি যেন এমন সব কাজ করে যাই যার ফলে কিয়ামত পর্যন্ত আমার জীবন মানুষের জন্য আলোক বর্তিকার কাজ করে এবং আমাকে মানব হিতৈষী ও মানব জাতির সেবক গণ্য করা হয়৷ এটি নিছক লোক দেখানো খ্যাতি ও সুনাম অর্জনের দোয়া নয় বরং প্রকৃত সুখ্যাতি ও যথার্থ সুনাম অর্জনের দোয়া৷ নিশ্চিত খাঁটি জনকল্যাণমূলক কার্যক্রম ও সেবাকর্মের ফলে এ সুখ্যাতি অর্জিত হয়৷ কোন ব্যক্তির এ জিনিস অর্জিত হলে দুটো লাভ ও উপকার হয়৷ দুনিয়ায় এর ফলে মানব জাতির ভবিষ্যত বংশধররা খারাপ আর্দশের পরিবর্তে একটি ভালো আদর্শ পেয়ে যায়৷ এ থেকে তারা ভালো দৃষ্টান্ত লাভ করে এবং ভালো দৃষ্টান্ত থেকে পায় ভালো হবার শিক্ষা৷ প্রত্যেক সৎব্যক্তি এর মাধ্যমে সত্য-সঠিক পথে চলার প্রেরণা লাভ করে৷ আর আখেরাতে এর ফলে এক ব্যক্তির ভালো কর্মকাণ্ড অনুসরণ করে যত জন লোকই সৎপথের সন্ধান লাভ করে তাদের সওয়াব সে ও লাভ করবে এবং কিয়ামতের দিন তার নিজের কর্মকাণ্ডের সাথে সাথে কোটি কোটি মানুষের সাক্ষ্যও তার স্বপক্ষে উপস্থিত থাকবে যাতে বলা হবে , সে দুনিয়ায় কল্যাণ ও সৎকর্মের এমন স্রোত ধারা প্রবাহিত করে এসেছিল যে, প্রজন্মের পর প্রজন্ম যুগ যুগ ধরে সে ধারায় অবগাহন করেছে৷
৬৩. কোন কোন মুফাস্সির হযরত ইব্রাহীমের মাগফেরাতের দোয়ার ব্যাখ্যা এভাবে করেছেন যে, তাঁর এ মাগফেরাত কামনা ছিল ইসলামের শর্ত সাপেক্ষ ৷কাজেই তাঁর নিজের পিতার মাগফেরাতের জন্য দোয়া করাটা ছিল যেন আল্লাহ তাঁকে ইসলাম গ্রহণ করার তাওফীক দান করেন, এ ধরণের একটি দোয়া৷ কিন্তু কুরআন মজীদের বিভিন্ন স্থানে এ সম্পর্কে যে ব্যাখ্যা পাওয়া যায় তা সংশ্লিষ্ট মুফাস্সিরগণের এ ব্যাখ্যার সাথে মেলে না৷ কুরআন বলছে, হযরত ইব্রাহীম নিজের পিতার জুলুম সইতে না পেরে যখন ঘর থেকে বের হচ্ছিলেন তখন বলেনঃ

سَلامٌ عَليْك سَاَسْتَغْفِرُلَكَ رَبِّى اِنَّه كَانَ بِى حَفِيًّا -

"আপনাকে সালাম, আমি আপনাকে ক্ষমা করার জন্য নিজের রবের কাছে দোয়া করবো৷ তিনি আমার প্রতি বড়ই মেহেরবান৷" (মারয়াম, ৪৭ আয়াত)

এ প্রতিশ্রুতির ভিত্তিতে তিনি এ মাগফেরাতের দোয়া করেন কেবলমাত্র নিজের পিতার জন্য নয় বরং অন্য এক স্থানে বলা হয়েছে মাতা ও পিতা উভয়ের জন্য করেনঃ ربَّنا اِغفرلى ولوالدَىَّ "হে আমাদের রব! আমার গোনাহ মাফ করো এবং আমার মাতা-পিতারও৷" (ইবরাহীম, ৪১ আয়াত) কিন্তু পরে তিনি নিজেই অনুভব করেন যে,একজন সত্যের দুশমন একজন মুমিনের পিতা হলেও মাগফেরাতের দোয়ার হকদার হয় না৷

ما كان استغفار ابراهيم لابيه الا عن مَّوعدة وَّعَدَهَا ايَّاهُ فلمَّا تَبَيَّنَ لهُ انَّه عدُوّلإلِّله تَبَرَّا مشنْهُ

"ইব্রাহীমের নিজের পিতার জন্য মাগফেরাতের দোয়া করা নিছক তার প্রতিশ্রুতির কারণে ছিল, যা সে করেছিল৷ কিন্তু সে যে আল্লাহর দুশমন, একথা যখন তার কাছে পরিষ্কার হয়ে গেল তখন সে তার বিরুদ্ধে অসন্তোষ প্রকাশ করলো৷" (আত্ তাওবা, ১১৪ আয়াত)

৬৪. অর্থাৎ কিয়ামতের দিন আমাকে এমন অপমানকর অবস্থার সম্মুখীন করো না যেখানে হশরের ময়দানে পূর্বের ও পরের সমগ্র জনগোষ্ঠী একত্র হবে সেখানে তাদের সবার সামনে ইব্রাহীমের পিতা শাস্তি পেতে থআকবে এবং ইব্রাহীম তা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখবে৷
৬৫. এ বাক্যাংশ দু'টি কি হযরত ইব্রাহীমের (আ.) দোয়ার অংশ অথবা আল্লাহ তাঁর বক্তব্যের সাথে নিজে এটুকু বাড়িয়ে যোগ করে দিয়েছেন, একথা নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়৷ যদি প্রথম কথাটি মেনে নেয়া হয়, তাহলে এর অর্থ দাঁড়ায়, হযরত ইব্রাহীম (আ.) নিজের পিতার জন্য এ দোয়া করার সময় নিজেই এ সত্য সম্পর্কে সজাগ ছিলেন৷ আর দ্বিতীয় কথাটি মেনে নেয়া হলে এর অর্থ হবে, তাঁর দোয়ার ওপর মন্তব্য প্রসঙ্গে আল্লাহ এ কথা বলেছেন যে, কিয়ামতের দিন যদি কোন জিনিস মানুষের কাজে লাগতে পারে, তাহলে তা তার ধন-দৌলত ও সন্তান-সন্ততি নয় বরং একমাত্র প্রশান্ত চিত্ত এমন একটি অন্তর যা কুফুরী, শিরক, নাফরমানী, ফাসেকী ও অশ্লীল কার্যকলাপ মুক্ত৷ ধন-সম্পদ এবং সন্তান-সন্ততিও প্রশান্ত ও নির্মল অন্তরের সাথেই উপকারী হতে পারে৷ প্রশান্ত অন্তরকে বাদ দিয়ে এদের কোন উপকারিতা নেই৷ ধন সেখানে কেবলমাত্র এমন অবস্থায় উপকারী হবে যখন মানুষ দুনিয়ায় ঈমান ও আন্তরিকতা সহকারে তা আল্লাহর পথে ব্যয় করবে৷ নয়তো কোটিপতি ও বিলিয়ন সম্পদের মালিকরাও সেখানে পথের ভিখারীই হবে৷ সন্তানদেরও দুনিয়ায় মানুষ নিজের সামর্থ অনুযায়ী ঈমান ও সৎ কর্মের শিক্ষা দিলে তবেই তারা সেখানে কাজে লাগাতে পারে৷ অন্যথায় পুত্র যদি নবীও হয়ে থাকেন,তাহলে যে পিতা কুফুরী ও গোনাহের মধ্যে নিজের জীবনকাল শেষ করেছে এবং সন্তানের সৎ কাজে যার কোন অংশ নেই তার শাস্তি পাওয়া থেকে কোন নিষ্কৃতি নেই৷
৬৬. এখান থেকে শেষ প্যারাগ্রাফ পর্যন্ত সমস্ত বাক্য হযরত ইব্রাহীমের (আ) উক্তির অংশ মনে হয় না৷ বরং এর বক্তব্য থেকে পরিষ্কার মনে হয় যে, এগুলো আল্লাহর উক্তি৷
৬৭. অর্থাৎ একদিকে মুত্তাকিরা জান্নাতে প্রবেশ করার আগেই দেখতে থাকবে, আল্লাহর মেহেরবানীতে কেমন নিয়ামতে পরিপূর্ণ জায়গায় তারা যাবে৷ অন্যদিকে পথভ্রষ্টরা তখনো হাশরের ময়দানেই অবস্থান করবে৷ যে জাহান্নামে তাদের গিয়ে থাকতে হবে তার ভয়াবহ দৃশ্য তাদের সামনে উপস্থাপিত করা হবে৷
৬৮. মূলে ......... শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে৷ এর মধ্যে দু'টি অর্থ নিহিত৷ এক, একজনের উপর অন্য একজনকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেয়া হবে৷ দুই , তারা জাহান্নামের গর্তের তলদেশ পর্যন্ত গড়িয়ে যেতে থাকবে৷
৬৯. ভক্ত-অনুরক্তদের পক্ষ থেকে এভাবে তাদের খাতির তোয়াজ করা হবে৷ অথচ এ ভক্ত-অনুরক্তরাই দুনিয়ায় এদেরকে বুজর্গ , গুরু ও নেতা বলে মেনে নিয়েছিল ৷ এদের হাতে-পায়ে চুমো দেয়া হতো৷ এদের কথা ও কাজকে প্রামাণ্য ও আদর্শ বলে স্বীকার করা হতো৷ এদের সমীপে নজরানা ও মানত পেশ করা হতো৷ পরকালে গিয়ে যখন সত্য প্রকাশ হয়ে পড়বে এবং অনুসারীবৃন্দ জানতে পারবে অগ্রবর্তীরা কোথায় চলে এসেছে এবং তাদেরকে কোথায় নিয়ে এসেছে তখন এ ভক্ত-অনুরক্তের দল তাদেরকে অপরাধী গণ্য করবে এবং অভিশাপ দেবে৷ কুরআন মজীদের বিভিন্ন স্থানে পরকালীন জগতের এ শিক্ষণীয় চিত্র অংকন করা হয়েছে , যাতে দুনিয়ায় অন্ধ অনুসারীদের চোখ খুলে যায় এবং কারো পেছনে চলার আগে তারা দেখে নিতে পারে অগ্রবর্তীরা সঠিক পথে যাচ্ছে কিনা৷ সূরা আরাফে বলা হয়েছেঃ

-------------------------------------------------------

"প্রত্যেকটি দল যখন জাহান্নামে প্রবেশ করবে তখন তার নিজের সাথী দলের উপর অভিশাপ দিতে দিতে যাবে৷ এমনকি যখন সবাই সেখানে একত্র হয়ে যাবে তখন প্রত্যেক পরবর্তী দল পূর্ববর্তী দল সম্পর্কে বলবে, হে আমাদের রব ! এরাই আমাদের পথভ্রষ্ট করেছিল ,এখন এদেরকে দ্বিগুণ আগুনের শাস্তি দাও৷ রব বলবেন , সবার জন্য রয়েছে দ্বিগুণ শাস্তি কিন্তু তোমরা জানো না৷" (৩৮ আয়াত)

সূরা হা-মীম আস্ সাজদায় বলা হয়েছেঃ

-------------------------------------------------

"আর কাফেররা সে সময় বলবে , হে আমাদের রব ! জিন ও মানুষদের মধ্য থেকে তাদেরকে আমাদের সামনে নিয়ে আসেন যারা আমাদের পথভ্রষ্ট করেছিল , যাতে আমরা তাদেরকে পায়ের তলায় পিষে ফেলতে পারি এবং তারা লাঞ্ছিত ও অপমানিত হয়৷" (আয়াত ২৯)

এ বিষয়বস্তুটিই সূরা আহযাবে বলা হয়েছেঃ

------------------------------------------------------

"আর তারা বলবে , হে আমাদের রব ! আমরা নিজেদের সরদারদের ও বড়দের আনুগত্য করেছি এবং তারা আমাদের সোজা পথ থেকে ভুল পথে পরিচালিত করেছে৷ হে আমাদের রব ! তাদেরকে দ্বিগুণ আযাব দাও এবং তাদের প্রতি কঠোর লানত বর্ষণ করো৷" (৬৭-৬৮ আয়াত)

৭০. অর্থাৎ যাদেরকে আমরা দুনিয়ায় সুপারিশকারী মনে করতাম এবং যাদের সম্পর্কে আমাদের বিশ্বাস ছিল যে, তাদের পক্ষপুটে যে আশ্রয় নিয়েছে, সে বেঁচে গেছে৷ তাদের কেউ সুপারিশ করার জন্য মুখ খুলবে না৷
৭১. অর্থাৎ এমন কেউ নেই, যে আমাদের দুঃখে দুঃখ অনুভব করে এবং আমাদের ব্যথায় সমব্যথী হয়৷ অন্তত আমাদের ছাড়িয়ে নিতে না পারলেও আমাদের প্রতি সমবেদনা প্রকাশ করবে এমনও কেউ নেই৷ কুরআন মজীদ বলছে, আখেরাতে একমাত্র মুমিনদের মধ্যে বন্ধুত্ব অব্যাহত থাকবে৷ অন্যদিকে পথভ্রষ্টরা দুনিয়ায় যতই গভীর ও আন্তরিক বন্ধুত্ব সূত্রে আবদ্ধ থেকে থাক না কেন সেখানে পৌঁছে তারা পরস্পরের প্রাণের শত্রুতে পরিণত হবে৷ তারা পরস্পরকে অপরাধী গণ্য করবে এবং পরস্পরকে পরস্পরের ধ্বংস ও সর্বনাশের জন্য দায়ী করে একে অন্যকে বেশী শাস্তি দান করাবার চেষ্টা করবে৷

-------------------------------------

"বন্ধুরা সেদিন হবে একে অন্যের শত্রু কিন্তু মুত্তাকীদের বন্ধুত্ব অপরিবর্তিত থাকবে৷" (আয্ যুখ্রুফঃ ৬৭ আয়াত)

৭২. এ আকাংখার জবাবও কুরআনে দেয়া হয়েছেঃ

---------------------------------

"যদি তাদেরকে পূর্ববর্তী জীবনে ফিরিয়ে দেয়া হয় তাহলে তারা তাই করতে থাকবে যা করতে তাদেরকে নিষেধ করা হয়েছে৷" (আন'আমঃ ২৮ আয়াত)

যে সব কারণে তাদেরকে ফিরে যাবার সুযোগ দেয়া হবে না এর আরো বেশী ব্যাখ্যার জন্য দেখুন তাফহীমুল কুরআন,সূরা মুমিনুনের ৯০-৯২ টীকায়৷

৭৩. হযরত ইব্রাহীমের এ কাহিনীতে নিদর্শনের তথা শিক্ষার দু'টি দিক রয়েছে৷ একটি দিক হচ্ছে, আরবের মুশরিকরা একদিকে হযরত ইব্রাহীমের (আ) অনুসারী হবার দাবী করতো এবং তাঁর সাথে নিজেদের সম্পর্ক দেখিয়ে গর্ব করতো৷ কিন্তু অন্যদিকে তারা সেই একই শিরকে লিপ্ত রয়েছে যার বিরুদ্ধে তিনি সারা জীবন সংগ্রাম করেছেন এবং তিনি যে দ্বীনের দাওয়াত নিয়ে এসেছিলেন আজ যে নবী তা পেশ করছেন তার বিরুদ্ধে তারা ঠিক তাই করছে যা হযরত ইব্রাহীমের জাতি তাঁর সাথে যা করেছিল৷ তাদেরকে স্মরণ করিয়ে দেয়া হয় যে, হযরত ইব্রাহীম তো ছিলেন শিরকের শত্রু ও তাওহীদের দাওয়াতের পতাকাবাহী৷ তোমরা নিজেরাও জানো, হযরত ইব্রাহীম মুশরিক ছিলেন না৷ কিন্তু এরপরও তোমরা নিজেদের জিদ বজায় রেখে চলছো৷ এ কাহিনীতে নিদর্শনের দ্বিতীয় দিকটি হচ্ছে, ইব্রাহীমের জাতি দুনিয়ার বুক থেকে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে৷ এমনভাবে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে যে, কোথাও তাদের নাম নিশানাও নেই৷ তাদের মধ্যে থেকে যদি কারো বেঁচে থাকার সৌভাগ্য হয়ে থাকে তাহলে তারা হচ্ছেন কেবলমাত্র হযরত ইব্রাহীম আলাইহিস সালাম ও তাঁর দুই ছেলের (ইসমাইল ও ইসহাক) বংশধরগণ৷ হযরত ইব্রাহীম তাঁর জাতির মধ্য থেকে বের হয়ে যাবার পর তাদের ওপর যে আযাব আসে কুরআন মজীদে যদিও তার উল্লেখ নেই কিন্তু আযাব প্রাপ্ত জাতিদের মধ্যে তাদেরকে গণনা করা হয়েছে৷ যেমন বলা হয়েছেঃ

الم ياْتهم نباُ الّذِيْن من قيلهم قةمٍ نُوْحٍ وَّ عادٍ وَّ ثَمُوْدَ وقوم ابراهيمَ واصحاب مدينَ والمؤتَفِكاتِ (التوبة : ৭০)