(২৬:৩৪) ফেরাউন তার চারপাশে উপস্থিত সরদারদেরকে বললো, "এ ব্যক্তি নিশ্চয়ই একজন দক্ষ যাদুকর৷
(২৬:৩৫) নিজের যাদুর জোরে সে তোমাদেরকে তোমাদের দেশ থেকে বের করে দিতে চায়৷ ২৯ এখন বলো তোমরা কী হুকুম দিচ্ছো?" ৩০
(২৬:৩৬) তারা বললো, "তাকে ও তার ভাইকে আটক করো এবং শহরে শহরে হরকরা পাঠাও৷
(২৬:৩৭) তারা প্রত্যেক সুদক্ষ যাদুকরকে তোমার কাছে নিয়ে আসুক৷"
(২৬:৩৮) তাই একদিন নির্দিষ্ট সময়ে ৩১ যাদুকরদেরকে একত্র করা হলো৷
(২৬:৩৯) এবং লোকদেরকে বলা হলো, "তোমরাও কি সমাবেশে যাবে? ৩২
(২৬:৪০) হয়তো আমরা যাদুকরদের ধর্মের অনুসরণের উপরই বহাল থাকবো, যদি তারা বিজয়ী হয়৷" ৩৩
(২৬:৪১) যখন যাদুকররা ময়দানে এলো, তারা ফেরাউনকে বললো, "আমরা কি পুরস্কার পাবো, যদি আমরা বিজয়ী হই?" ৩৪
(২৬:৪২) সে বললো, "হাঁ, আর তোমরা তো সে সময় নিকটবর্তীদের মধ্যে শামিল হয়ে যাবে৷"৩৫
(২৬:৪৩) মূসা বললো, "তোমাদের যা নিক্ষেপ করার আছে নিক্ষেপ কর৷"
(২৬:৪৪) তারা তখনই নিজেদের দড়িদড়া ও লাঠিসোঁটা নিক্ষেপ করলো এবং বললো, "ফেরাউনের ইজ্জতের কসম, আমরাই বিজয়ী হবো৷" ৩৬
(২৬:৪৫) তারপর মূসা নিজের লাঠিটি নিক্ষেপ করলো৷ অকস্মাত সে তাদের কৃত্রিম কীর্তিগুলো গ্রাস করতে থাকলো৷
(২৬:৪৬) তখন সকল যাদুকর স্বতস্ফূর্তভাবে সিজদাবনত হয়ে পড়লো৷
(২৬:৪৭) এবং বলে উঠলো, "মেনে নিলাম আমরা রাব্বুল 'আলামীনকে.........
(২৬:৪৮) মূসা ও হারুনের রবকে৷" ৩৭
(২৬:৪৯) ফেরাউন বললো, "তোমরা মূসার কথা মেনে নিলে আমি তোমাদের অনুমতি দেবার আগেই! নিশ্চয়ই এ তোমাদের প্রধান, যে তোমাদের যাদু শিখিয়েছে৷ ৩৮ বেশ, এখনই তোমরা জানবে৷ আমি তোমাদের হাত-পা বিপরীত দিক থেকে কর্তন করাবো এবং তোমাদের সবাইকে শূলবিদ্ধ করবো৷" ৩৯
(২৬:৫০) তারা বলল, "কোন পরোয়া নেই, আমরা নিজেদের রবের কাছে পৌঁছে যাবো৷
(২৬:৫১) আর আমরা আশা করি আমাদের রব আমাদের গোনাহ্ মাফ করে দেবেন, কেননা, সবার আগে আমরা ঈমান এনেছি”৷ ৪০
২৯. মুজি'যা দু'টির শ্রেষ্ঠত্ব এ থেকেই অনুমান করা যেতে পারে৷ মাত্র এক মূহুর্ত আগে নিজের এক সাধারণ প্রজাকে দরবারের মধ্যে রিসালতের কথাবার্তা ও বনী ইসরাঈলের মুক্তির দাবী করতে দেখে ফেরাউন তাকে পাগল ঠাউরিয়েছিল৷ (কারণ, তার দৃষ্টিতে একটি গোলাম জাতির কোন ব্যক্তির পক্ষে তার মতো পরাক্রমশালী বাদশাহর সামনে এ ধরণের দুঃসাহস করা পাগলামি ছাড়া আর কিছুই হতে পারে না৷) এবং এই বলে ধমক দিচ্ছিল যে, তুমি যদি আমাকে ছাড়া অন্য কাউকে উপাস্য বলে মেনে নাও, তাহলে তোমাকে কারাগারে আটকে মারবো৷ আর এখন মাত্র এক মূহুর্ত পরে এ নিদর্শনগুলো দেখার সাথে সাথেই তার মধ্যে এমন ভীতির সঞ্চার হলো যে, নিজের বাদশাহী ও রাজ্য হারাবার ভয়ে সে ভীত হয়ে পড়লো এবং কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে প্রকাশ্য দরবারে নিজের অধস্থন কর্মচারীদের সামনে সে যে কেমন অসংলগ্ন কথাবার্তা বলে চলছে সে অনুভূতিই সে হারিয়ে ফেললো৷ বনী ইসরাঈলের মতো একটি নির্যাতিত-নিপীড়িত জাতির দুটি লোক যুগের সবচেয়ে বড় শক্তিশালী বাদশাহর সামনে দাঁড়িয়েছিলেন৷ তাদের সাথে কোন লোক-লস্কর ছিলো না৷ তাদের জাতির মধ্যে কোন সক্রিয়তা ও প্রাণশক্তি ছিলো না৷ দেশের কোথাও বিদ্রোহের সামান্যতম আলামতও ছিলো না৷ এ অবস্থায় শুধুমাত্র একটি লাঠিকে সর্পে পরিণত হতে ও একটি হাতকে ঔজ্জ্বল্য বিকীরণ করতে দেখে অকস্মাৎ তার এই বলে চিৎকার করে ওঠা যে, এ দুটি সহায়-সম্বলহীন লোক আমাকে সিংহাসনচ্যুত করবে এবং সমগ্র শাসক শ্রেণীকে ক্ষমতার কেন্দ্র থেকে বেদখল করে দেবে-একথার কি অর্থ হতে পারে? এ ব্যক্তি যাদুবলে এসব করে ফেলবে-একথা বলাও তার অত্যাধিক হতবুদ্ধি হওয়ারই প্রমাণ৷ যাদুবলে দুনিয়ার কখনো কোথাও কোন রাজনৈতিক বিপ্লব সাধিত হয়নি, কোন দেশ বিজিত হয়নি, কোন যুদ্ধ জয়ও হয়নি৷ যাদুকররা তো তার নিজের দেশেই ছিল এবং তারা বড় বড় তেলেসমাতি দেখাতে পারতো৷ কিন্তু সে নিজে জানতো, ভেল্কিবাজীর খেলা দেখিয়ে পুরষ্কার নেয়া ছাড়া তাদের আর কোন কৃতিত্ব নেই৷ রাজ্য তো দূরের কথা, সে বেচারারা তো রাজ্যের একজন সামান্য পুলিশ কনস্টেবলকেও চ্যালেঞ্জ করার হিম্মত রাখতো না৷
৩০. ফেরাউন যে অত্যাধিক হতবুদ্ধি হয়ে পড়েছিল , এ বাক্যাংশটি সে কথাই প্রকাশ করে৷ সে নিজেকে উপাস্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে রেখেছিল এবং এদের সবাইকে করে রেখেছিল নিজের গোলাম৷ কিন্তু এখন উপাস্য সাহেব ভয়ের চোটে অস্থির হয়ে বান্দাদের কাছেই জিজ্ঞেস করছে তোমরা কি হুকুম দাও৷ অন্য কথায় বলা যায় , সে যেন বলতে চাচ্ছে , আমার বুদ্ধি তো এখন বিকল হয়ে গেছে , তোমরাই বলো আমি কিভাবে এ বিপদের মোকাবিলা করতে পারি৷
৩১. সূরা তা-হা-এ উল্লেখিত হয়েছে , কিবতীদের জাতীয় ঈদের দিনকে ----------এ প্রতিদ্বন্দ্বীতার দিন হিসেবে নির্দিষ্ট করা হয়েছিল ৷ দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে উৎসব ও মেলা উপলক্ষে আগত সমস্ত লোকেরা এ বিরাট প্রতিযোগিতা দেখতে পাবে এটাই ছিল উদ্দেশ্য৷ এ জন্য সময় নির্ধারিত করা হয়েছিল সূর্য আকাশে উঠে চারদিকে আলো ছড়িয়ে পড়ার পর৷ এভাবে প্রকাশ্যে দিবালোকে সবার চোখের সামনে উভয় পক্ষের শক্তির প্রদর্শনী হবে এবং আলোর অভাবে কোন প্রকার সন্দেহ-সংশয় সৃষ্টি হবার অবকাশ থাকবে না৷
৩২. অর্থাৎ শুধুমাত্র ঘোষণা ও বিজ্ঞাপনের উপর নির্ভর করা হয়নি বরং জনগণকে উদ্দীপিত ও উত্তেজিত করে প্রতিদ্বন্দ্বিতা দেখার জন্য ময়দানে হাজির করার উদ্দেশ্যে লোকও নিয়োগ করা হয়৷ এ থেকে জানা যায় , প্রকাশ্যে দরবারে মূসা যেসব মু'জিযা দেখিয়েছিলেন সেগুলোর খবর সাধারণ লোকদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছিল এবং দেশের লোকেরা এতে প্রভাবিত হতে চলেছে বলে ফেরউনের মনে আশংকা দেখা দিয়েছিল ৷ তাই সে চাচ্ছিল বেশী বেশী জনসমাগম হোক এবং লোকেরা দেখে নিক লাঠির সাপে পরিণত হওয়া কোন বড় কথা নয় , আমাদের দেশের প্রত্যেক যাদুকরও এ ভেল্কিবাজী দেখাতে পারে৷
৩৩. এ বাক্যাংশটি প্রমাণ করছে যে, ফেরাউনের দরবারের যেসব লোক মূসার মু'জিযা দেখেছিল এবং দরবারের বাইরের যেসব লোকের কাছে এর নির্ভরযোগ্য খবর পৌঁছে গিয়েছিল , নিজেদের পিতৃপুরুষের ধর্মের উপর তাদের বিশ্বাসের ভিত নড়ে যাচ্ছিল এবং এখন মূসা আলাইহিস সালাম যে কাজ করেছেন তাদের যাদুকররাও কোনক্রমে তা করিয়ে দেখিয়ে দিক, এরি উপর তাদের ধর্মের টিকে থাকা নির্ভর করছিল৷ ফেরাউন ও তার রাজ্যের কর্মকর্তাগণ একে একটি চূড়ান্ত সিদ্ধান্তকর মোকাবিলা মনে করছিল ৷ তাদের প্রেরিত লোকেরা সাধারণ মানুষের মগজে এ চিন্তা প্রবেশ করাবার চেষ্টা করছিল যে, যাদুকররা যদি কামিয়াব হয়ে যায়, তাহলে মূসার ধর্ম গ্রহণ করার হাত থেকে আমরা বেঁচে যাবো , অন্যথায় আমাদের ধর্ম ও বিশ্বাসের অপমৃত্যু ঘটবে৷
৩৪. এ ছিল মুশরিকী ধর্মের রক্ষকদের অবস্থা৷ মূসা আলাইহিস সালামের হামলা থেকে তারা নিজেদের ধর্মকে বাঁচাতে চাচ্ছিল৷ এ জন্য চূড়ান্ত মোকাবিলার সময় তাদের মধ্যে যে পবিত্র আবেগের সঞ্চার হয়েছিল তা ছিল এই যে, তারা বাজী জিততে পারলে সরকার বাহাদুর থেকে কিছু পুরষ্কার পাওয়া যাবে৷
৩৫. আর এ ছিল সমকালীন বাদশাহর পক্ষ থেকে ধর্ম ও জাতির খিদমতগারদেরকে প্রদান করার মতো সবচেয়ে বড় ইনাম৷ অর্থাৎ কেবল টাকা পয়সাই পাওয়া যাবে না, দরবারে আসনও পাওয়া যাবে৷ এভাবে ফেরউন ও তার যাদুকররা প্রথম পর্যায়েই নবী ও যাদুকরের বিরাট নৈতিক পার্থক্য সুস্পষ্ট করে দিয়েছে৷ একদিকে ছিল উন্নত মনোবল ৷ বনী ইসরাঈলের মতো একটি নিগৃহীত জাতির এক ব্যক্তি দশ বছর যাবত নরহত্যার অভিযোগে আত্মগোপন করে থাকার পর ফেরাউনের দরবারে বুক টান করে এসে দাঁড়াচ্ছেন৷ নির্ভীক কণ্ঠে বলে যাচ্ছেন , আল্লাহ রব্বুল আলামীন আমাকে পাঠিয়েছেন , বনী ইসরাঈলকে আমার হাতে সোপর্দ করে দাও৷ ফেরাউনের সাথে মুখোমুখি বিতর্ক করতে তিনি সামান্যতম সংকোচ অনুভব করছেন না৷ তার হুমকি ধমকিকে তিলার্ধও গুরুত্ব দিচ্ছেন না৷ অন্যদিকে হীন মনোবলের প্রকাশ৷ বাপ-দাদার ধর্মকে রক্ষা করার দায়িত্ব পালনের উদ্দেশ্যে যাদুকরদেরকে ফেরউনের দরবারেই ডেকে পাঠানো হচ্ছে৷ এরপরও হাত জোড় করে তারা বলছে, জনাব ! কিছু ইনাম তো মিলবে ? আর জবাবে অর্থ পুরষ্কার ছাড়াও রাজ নৈকট্যও লাভ করা যাবে শুনে খুশীতে বাগেবাগ ৷ নবী কোন প্রকৃতির মানুষ এবং তাঁর মোকাবিলায় যাদুকররা কেমন ধরনের লোক, এ দু'টি বিপরীত চরিত্র আপনা আপনি একথা প্রকাশ করে দিচ্ছে৷ কোন ব্যক্তি নির্লজ্জতার সকল সীমালংঘন না করলে নবীকে যাদুকর বলার দুঃসাহস দেখাতে পারে না৷
৩৬.

এখানে এ আলোচনা বাদ দেয়া হয়েছে যে, হযরত মূসার মুখে এ ধরণের বাক্য উচ্চারিত হবার সাথে সাথেই যখন যাদুকররা নিজেদের দড়িদড়া ও লাঠিসোটা ছুঁড়ে দিল তখন অকস্মাত সেগুলোকে বহু সাপের আকারে কিলবিল করতে করতে হযরত মূসার দিকে দৌড়ে যেতে দেখা গেলো৷ কুরআন মজীদের অন্যান্য স্থানে এর বিস্তারিত আলোচনা এসেছে৷ সূরা আরাফে বলা হয়েছেঃ

فَلَمَّا اَلقَوْا سَحَرُوا اَعْيُنَ النَّاسِ وَاسْتَر هَبُوْهُمْ وَجَاءُوْا بِسِحْرٌ عَظِيْمٍ

"যখন তারা নিজেদের মন্ত্র নিক্ষেপ করলো তখন লোকদের দৃষ্টিকে যাদুগ্রস্থ করে দিল, সবাইকে আতংকিত করে ফেললো এবং বিরাট যাদু বানিয়ে নিল৷"

সূরা তা-হা-এ এমন এক সময়ের চিত্র আঁকা হয়েছে যখনঃ

فاذَ حِبالهم وَعِصِيُّهم يُخَيَّلُ اِلَيْهِ من سحرهم اَنَّهَا تَسْعَى – فَاَوجَسَ فِى نَفْسِهِ خِيْفَةً مُّوْسَى-

"সহসা তাদের যাদুর ফলে হযরত মূসার মনে হলো যেন তাদের রশি ও লাঠিগুলো দৌড়ে চলে আসছে৷ এতে মূসা মনে মনে ভয় পেয়ে গেলো৷"
৩৭. এটা মূসার মোকাবিলায় তাদের পক্ষ থেকে নিছক পরাজয়ের স্বীকৃতি ছিল না৷ ব্যাপারটা এমন ছিল না যে, কেউ বলতো , আরে ছেড়ে দাও, একজন বড় যাদুকর ছোট যাদুকরদেরকে হারিয়ে দিয়েছে৷ বরং তাদের সিজদানত হয়ে আল্লাহ রব্বুল আলামীনের প্রতি ঈমান আনা যেন প্রকাশ্যে সর্ব সমক্ষে হাজার হাজার মিসরবাসীর সামনে একথার স্বীকৃতি ও ঘোষণা দিয়ে দেয়া যে , যা কিছু এনেছেন তা আমাদের যাদু শিল্পের অন্তরগত নয় , এ কাজ তো একমাত্র আল্লাহ রব্বুল আলামীনের কুদরতেই হতে পারে৷
৩৮. এখানে যেহেতু বক্তব্য পরস্পরার সাথে সম্পর্ক রেখে কেবলমাত্র এতটুকু দেখানো উদ্দেশ্য যে , কোন জেদী ও হঠকারী ব্যক্তি একটি সুস্পষ্ট মু'জিযা দেখার এবং তার মু'জিযা হবার সপক্ষে স্বয়ং যাদুকরদের সাক্ষ্য শুনার পরও কিভাবে তাকে যাদুকর আখ্যা দিয়ে যেতে থাকে, তাই ফেরউনের শুধুমাত্র এতটুকু উক্তি এখানে উদ্ধৃত করাই যথেষ্ট বিবেচনা করা হয়েছে৷ কিন্তু সূরা আ'রাফে বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করা হয়েছেঃ

----------------------------------------------

"এ একটি ষড়যন্ত্র , যা তোমরা সবাই মিলে এ রাজধানী নগরে তৈরী করছো, যাতে এর মালিকদেরকে কর্তৃত্ব থেকে বেদখল করে দাও৷"

এভাবে ফেরাউন সাধারণ জনতাকে একথা বিশ্বাস করাবার চেষ্টা করে যে, যাদুকরদের এ ঈমান মু'জিযা কারণে নয় বরং এটি নিছক একটি যোগসাজশ ৷ এখানে আসার আগে মূসার সাথে এদের এ মর্মে সমঝোতা হয়ে গিয়েছিল যে , এখানে এসে এরা মূসার মোকাবিলায় পরাজয় বরণ করে নেবে এবং এর ফলে যে রাজনৈতিক বিপ্লব সাধিত হবে তার সুফল এরা উভয় গোষ্ঠী মিলে ভোগ করবে৷

৩৯. যাদুকররা আসলে মূসা আলাইহিস সালামের সাথে যোগসাজশ করে প্রতিযোগিতায় নেমেছিল , নিজের এ অভিমতকে সফল করে তোলার জন্য ফেরাউন এ ভয়ংকর হুমকি দিয়েছিল ৷ তার উদ্দেশ্য ছিল , এভাবে এরা প্রাণ বাঁচাবার জন্য ষড়যন্ত্র স্বীকার করে নেবে এবং এর ফলে পরাজিত হবার সাথে সাথে তাদের সিজদাবনত হয়ে ঈমান আনার ফলে হাজার হাজার দর্শকের উপর যে নাটকীয় প্রভাব পড়েছিল তা মির্মূল হয়ে যাবে৷ এ দর্শকবৃন্দ স্বয়ং ফেরাউনের আমন্ত্রণে এ চূড়ান্ত মোকাবিলা উপভোগ করার জন্য সমবেত হয়েছিল৷ তার প্রেরিত লোকেরাই তাদেরকে এ ধারণা দিয়েছিল যে, মিসরীয় জাতির ধর্ম বিশ্বাস এখন এ যাদুকরদের সহায়তার উপর নির্ভরশীল রয়েছে৷ এরা সফলকাম হলে জাতি তার পূর্বপুরুষের ধর্মের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকতে পারবে , অন্যথায় মূসার দাওয়াতের সয়লাব তাকে ও তার সাথে ফেরাউনের রাজত্বকেও ভাসিয়ে নিয়ে যাবে৷
৪০. অর্থাৎ আমাদের একদিন তো আমাদের রবের কাছে অবশ্যই ফিরে যেতে হবে৷ এখন যদি তুমি আমাদের হত্যা করো, তাহলে এর ফলে যেদিনটি আসবার ছিল সেটি আজ এসে যাবে, এর বেশী কিছু হবে না৷ এ অবস্থায় ভয় পাওয়ার প্রশ্ন কেন উঠবে? বরং উল্টো আমাদের তো মাগফেরাত পাওয়ার ও গোনাহ মাফের আশা আছে৷ কারণ আজ এখানে সত্য প্রকাশিত হবার সাথে সাথেই আমরা তা মেনে নেবার ক্ষেত্রে এক মূহুর্তও দেরি করিনি এবং এ বিশাল সমাবেশে আমরাই প্রথমে অগ্রবর্তী হয়ে ঈমান এনেছি৷

ফেরাউন ঢেঁড়া পিটিয়ে যে জনগোষ্ঠীকে সমবেত করেছিল তাদের সবার সামনে যাদুকরদের এ জবাব দু'টি কথা স্পষ্ট করে দিয়েছেঃ

এক. ফেরাউন একজন মহা মিথ্যুক, হটকারী ও প্রতারক৷ সে নিজে ফয়সালা করার জন্য যে প্রতিযোগিতার আয়োজন করেছিলো তাতে মূসা আলাইহিস সালামের সুস্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীন বিজয়কে সোজাভাবে মেনে নেবার পরিবর্তে এখন সে সহসা একটি মিথ্যা ষড়যন্ত্রের গল্প ফেঁদে বসেছে এবং হত্যা ও শাস্তির হুমকি দিয়ে জোরপূর্বক তার স্বীকৃতি আদায় করার চেষ্টা করছে৷ এ গল্প যদি সামান্যও সত্য হতো, তাহলে যাদুকররা হাত-পা কাটাবার ও শূলবিদ্ধ হয়ে প্রাণ দেবার জন্য এতো হন্যে হয়ে যেতো না৷ এ ধরণের কোন ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে যদি কোন রাজত্ব লাভের লোভ থেকে থাকতো, তাহলে এখন তো আর তার কোন অবকাশ নেই৷ কারণ রাজত্ব এখন যাদের ভাগ্যে আছে তারাই তা ভোগ করবে, এ ভাগ্যাহতরা এখন শুধুমাত্র নিহত হওয়া ও শাস্তি লাভ করার জন্য রয়ে গেছে৷ এ ভয়াবহ বিপদ মাথায় নিয়েও এ যাদুকরদের নিজেদের ঈমানের ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকা পরিস্কারভাবে একথা প্রমাণ করে যে, তাদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের অভিযোগ সবৈর্ব মিথ্যা৷ বরং এ ক্ষেত্রে সত্য কথা হচ্ছে, যাদুকররা নিজেদের যাদুবিদ্যায় পারদর্শী হবার কারণে যথার্থই জানতে পেরেছে যে, মূসা আলাইহিস সালাম যা কিছু দেখিয়েছেন তা কোনক্রমেই যাদু নয় বরং প্রকৃতপক্ষে তা আল্লাহ রব্বুল আলামীনের কুদরতের প্রকাশ৷

দুই. এ সময় দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে আগত হাজার হাজার জনতার সামনে যে কথাটি সুস্পষ্ট হয়ে উঠেছিল সেটি ছিল এই যে, আল্লাহ রব্বুল আলামীনের প্রতি ঈমান আনার সাথে সাথেই এ যাদুকরদের চরিত্রে কেমন নৈতিক বিপ্লব সাধিত হয়ে গেলো৷ ইতিপূর্বে তাদের অবস্থা ছিলঃ তারা পূর্বপুরুষদের ধর্মকে সাহায্য করার জন্য এগিয়ে এসেছিল এবং এ জন্য ফেরাউনের সামনে হাত জোড় করে ইনাম চাইছিল৷ আর এখন মুহূর্তের মধ্যে তাদের হিম্মত ও সংকল্পের বলিষ্ঠতা এমনি উন্নত পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছিল যার ফলে সেই ফেরাউন তাদের কাছে তুচ্ছ হয়ে গিয়েছিল, তার সমগ্র রাজশক্তিকে তারা হেয় প্রতিপন্ন করেছিল এবং নিজেদের ঈমানের খাতিরে মৃত্যু ও নিকৃষ্টতম শারীরিক শাস্তি বরদাশ্ত করতে প্রস্তুত হয়ে গিয়েছিল৷ এ নাজুক মনস্তাত্বিক পরিবেশে মিসরীয়দের মুশরীকি ধর্মের লাঞ্ছনা এবং মূসা আলাইহিস সালাম প্রচারিত সত্য দ্বীনের বলিষ্ঠ প্রচারণা সম্ভবত এর চাইতে বেশী আর হতে পারতো না৷