(২৬:১০) তাদেরকে সে সময়ের কথা শুনাও যখন তোমার রব মূসাকে ডেকে বলেছিলেন, "যালেম সম্প্রদায়ের কাছে যাও-
(২৬:১১) ফেরাউনের সম্প্রদায়ের কাছে তারা কি ভয় করে না?"
(২৬:১২) সে বললো, "হে আমার রব! আমার ভয় হয় তারা আমাকে মিথ্যা বলবে, ১০
(২৬:১৩) আমার বক্ষ সংকুচিত হচ্ছে এবং আমার জিহ্বা সঞ্চালিত হচ্ছে না৷ আপনি হারুনের প্রতি রিসালাত পাঠান৷ ১১
(২৬:১৪) আর আমার বিরুদ্ধে তো তাদের একটি অভিযোগও আছে৷ তাই আমার আশংকা হয় তারা আমাকে হত্যা করে ফেলবে৷" ১২
(২৬:১৫) আল্লাহ্ বললেন, "কখ্খনো না, তোমরা দু'জন যাও আমার নিদর্শনগুলো নিয়ে,
(২৬:১৬) ফেরাউনের কাছে যাও এবং তাকে বলো, রাব্বুল আলামীন আমাদের পাঠিয়েছেন, ১৩
(২৬:১৭) যাতে তুমি বনী ইসরাঈলকে আমাদের সাথে পাঠিয়ে দাও সে জন্য৷" ১৪
(২৬:১৮) ফেরাউন বললো, "আমরা কি তোমাকে আমাদের এখানে প্রতিপালন করিনি যখন ছোট্ট শিশুটি ছিলে? বেশ ক'টি বছর আমাদের এখানে কাটিয়েছো,১৫
(২৬:১৯) এবং তারপর তুমি যে কর্মটি করেছ তাতো করেছোই; তুমি বড়ই অকৃতজ্ঞ৷" ১৬
(২৬:২০) মূসা জবাব দিল, "সে সময় অজ্ঞতার মধ্যে আমি সে কাজ করেছিলাম৷
(২৬:২১) তারপর তোমাদের ভয়ে আমি পালিয়ে গেলাম৷ এরপর আমার রব আমাকে "হুকম" দান করলেন ১৭ এবং আমাকে রাসূলদের অন্তর্ভুক্ত করে নিলেন৷
(২৬:২২) আর তোমার অনুগ্রহের কথা যা তুমি আমার প্রতি দেখিয়েছো, তার আসল কথা হচ্ছে এই যে, তুমি বনী ইসরাঈলকে দাসে পরিণত করেছিলে৷" ১৮
(২৬:২৩) ফেরাউন বললো,১৯ "রাব্বুল আলামীন আবার কে? ২০
(২৬:২৪) মূসা জবাব দিল, "আকাশসমূহ ও পৃথিবীর রব এবং আকাশ ও পৃথিবীর মাঝখানে যা কিছু আছে তাদেরও রব, যদি তোমরা নিশ্চিত বিশ্বাস স্থাপনকারী হও৷" ২১
(২৬:২৫) ফেরাউন তার আশপাশের লোকদের বললো, "তোমরা শুনছো তো!"
(২৬:২৬) মূসা বললো, "তোমাদেরও রব এবং তোমাদের বাপ-দাদাদেরও রব যারা অতিক্রান্ত হয়ে গেছে৷" ২২
(২৬:২৭) ফেরাউন (উপস্থিত লোকদের) বললো, "তোমাদের কাছে প্রেরিত তোমাদের এ রসূল সাহেবটি তো দেখছি একেবারেই পাগল৷"
(২৬:২৮) মূসা বললো, "পূর্ব ও পশ্চিম এবং যা কিছু তার মাঝখানে আছে সবার রব, যদি তোমরা কিছু বুদ্ধি-জ্ঞানের অধিকারী হতে৷" ২৩
(২৬:২৯) ফেরাউন বললো, "যদি তুমি আমাকে ছাড়া অন্য কাউকে মাবুদ বলে মেনে নাও, তাহলে কারাগারে যারা পচে মরছে তোমাকেও তাদের দলে ভিড়িয়ে দেবো৷" ২৪
(২৬:৩০) মূসা বললো, "আমি যদি তোমার সামনে একটি সুস্পষ্ট জিনিস আনি তবুও?" ২৫
(২৬:৩১) ফেরাউন বললো, "বেশ তুমি আনো যদি তুমি সত্যবাদী হও৷" ২৬
(২৬:৩২) (তার মুখ থেকে একথা বের হতেই) মূসা নিজের লাঠিটি ছুঁড়ে মারলো৷ তৎক্ষনাৎ সেটি হলো একটি সাক্ষাৎ অজগর৷" ২৭
(২৬:৩৩) তারপর সে নিজের হাত (বগলের ভেতর থেকে) টেনে বের করলো এবং তা সকল প্রত্যক্ষদর্শীর সামনে চকমক্ করছিল৷ ২৮
৭. ভূমিকার আকারে ওপরের সংক্ষিপ্ত ভাষণের পর এবার ঐতিহাসিক বর্ণনার সূচনা হচ্ছে৷ হযরত মূসা ও ফেরাউনের কাহিনী দিয়ে এ বর্ণনার শুরু৷ এর মাধ্যমে বিশেষভাবে যে শিক্ষা দেয়া উদ্দেশ্য তা নিম্নরূপঃ................................................
৮. এ বর্ণনাভংগী ফেরাউন এর সম্প্রদায়ের চরম নির্যাতনের কথা প্রকাশ করছে৷ "জালেম সম্প্রদায়" হিসেবে তাদেরকে পরিচিত করানো হচ্ছে৷ যেন তাদের আসল নামই হচ্ছে জালেম সম্প্রদায় এবং ফেরাউন এর সম্প্রদায় হচ্ছে তার তরজমা ও ব্যাখা৷
৯. অর্থাৎ হে মুসা! দেখ কেমন অদ্ভুত ব্যাপার, এরা নিজেদেরকে সর্বময় ক্ষমতা সম্পন্ন মনে করে দুনিয়ায় জুলুম নিপীড়ণ চালিয়ে যাচ্ছে এবং উপরে আল্লাহ আছেন, তিনি তাদেরকে জিজ্ঞাসাবাদ করবেন, এ ভয় তাদের নেই৷
১০. সূরা তা-হা এর ২ এবং সূরা কাসাস-এর ৪ রুকুতে এর বিস্তারিত বিবরণ এসেছে৷ সেই আলোচনাগুলোকে এর সাথে মিলিয়ে দেখলে জানা যায়, হযরত মূসা আলাইহিস্ সালাম প্রথমত এত বড় গুরুত্বপূর্ণ কাজে একাকী যেতে ভয় পাচ্ছিলেন৷ (আমার বক্ষ সংকুচিত হচ্ছে এ বাক্যটি এ কথাই প্রকাশ করছে) দ্বিতীয়ত তাঁর মধ্যে এ অনুভূতি ছিল, তিনি বাকপটু নন এবং অনর্গল ও দ্রুত কথা বলার মতা তাঁর নেই৷ তাই তিনি হযরত হারুনকে সাহায্যকারী হিসেবে নবী বানিয়ে তাঁর সাথে পাঠাবার জন্য আল্লাহর কাছে আবেদন জানান৷ কারণ, হযরত হারুন অত্যন্ত বাকপটু, প্রয়োজনে তিনি হযরত মূসাকে সমর্থন দেবেন এবং তাঁর বক্তব্যকে সত্য প্রমাণ করে তাঁর হাতকে শক্তিশালী করবেন৷ হতেপারে, প্রথমদিকে হযরত মূসা তাঁর পরিবর্তে হযরত হারুনকে এ দায়িত্বে নিযুক্ত করার আবেদন জানান, কিন্তু পরে যখন তিনি অনুভব করেন আল্লাহ তাঁকেই নিযুক্ত করতে চান তখন আবার তাঁকে নিজের সাহায্যকারী করার আবেদন জানান৷ এ সন্দেহ হবার কারণ হচ্ছে, হযরত মূসা এখানে তাঁকে সাহায্যকারী করার আবেদন জানাচ্ছেন না বরং বলছেনঃ فَارْسِلْ اِلَى هَا رُونَ"আপনি হারুনের কাছে রিসালত পাঠান৷" আর সূরা তা-হা-এ তিনি আবেদন জানানঃ

وَاجْغَلْ لِّى وَزِيْرًا مِنْ اَهْلى هَارُوْنَ اَخِى

"আমার জন্য আমার পরিবার থেকে একজন সাহায্যকারী নিযুক্ত করে দিন, আমার ভাই হারুনকে৷"

এছাড়া সূরা কাসাসে তিনি আবেদন জানানঃ وَاَخِىْ هَارُوْنَ هُوَ اَفْصَحُ مِنِّى لِسَانًا فَارْسِلْهَ مَعِىَ رِداً يُّصَدِّقُنِى

"আর আমার ভাই হারুন আমার চেয়ে বেশী বাকপটু, কাজেই আপনি তাকে সাহায্যকারী হিসেবে আমার সাথে পাঠিয়ে দিন, যাতে সে আমার সত্যতা প্রমাণ করে৷"

এ থেকে মনে হয়, সম্ভবত এই পরবর্তী আবেদন দুটি পরে করা হয়েছিল এবং এ সূরায় হযরত মূসা থেকে যে কথা উদ্ধৃত করা হয়েছে সেটিই ছিল প্রথম কথা৷

বাইবেলের বর্ণনা এ থেকে ভিন্ন৷ বাইবেল বলছে, ফেরাউনের জাতি তাকে মিথ্যুক বলে প্রত্যাখ্যান করতে পারে এ ভয়ে এবং নিজের কন্ঠের জড়তার ওজর পেশ করে হযরত মূসা এ দায়িত্ব গ্রহণ করতে পুরোপুরি অস্বীকারই করে বলেছিলেনঃ "হে প্রভূ, বিনয় করি, অন্য যাহার হাতে পাঠাইতে চাও, এ বার্তা পাঠাও৷" তারপর আল্লাহ নিজেই হযরত হারুনকে তাঁর জন্য সাহায্যকারী নিযুক্ত করে তাঁকে এ মর্মে রাজী করান যে, তারা দু'ভাই মিলে ফেরাউনের কাছে যাবেন৷ (যাত্রা পুস্তক ৪:১-১৭), আরো বেশী জানার জন্য দেখুন তাফহীমুল কুরআন, সূরা তা-হা ১৯ নং টীকা৷
১১. সূরা কাসাসের ২ রুকুতে যে ঘটনার কথা বলা হয়েছে এখানে সেদিকে ইংগিত করা হয়েছে৷ হযরত মূসা ফেরাউনের সম্প্রদায়ের এক ব্যক্তিকে একজন ইসরাঈলীর সাথে লড়তে দেখে একটি ঘুঁষি মেরেছিলেন৷ এতে সে মারা গিয়েছিল৷ তারপর হযরত মূসা যখন জানতে পারলেন, এ ঘটনার খবর ফেরাউনের লোকেরা জানতে পেরেছে এবং তারা প্রতিশোধ নেবার প্রস্তুতি চালাচ্ছে তখন তিনি দেশ ছেড়ে মাদ্য়ানের দিকে পালিয়ে গেলেন৷ এখানে আট-দশ বছর আত্মগোপন করে থাকার পর যখন তাঁকে হুকুম দেয়া হলো তুমি রিসালাতের বার্তা নিয়ে সেই ফেরাউনের দরবারে চলে যাও, যার ওখানে আগে থেকেই তোমার বিরুদ্ধে হত্যার মামলা ঝুলছে, তখন যথার্থই হযরত মূসা আশংকা করলেন, বার্তা শুনাবার সুযোগ আসার আগেই তারা তাঁকে হত্যার অভিযোগে গ্রেফতার করে ফেলবে৷
১২. নিদর্শনাদি বলতে এখানে লাঠি ও সাদা হাতের কথা বলা হয়েছে৷ সূরা আ'রাফ ১৩, ১৪, তা-হা ১, নামল ১ ও কাসাসের ৪ রুকুতে এর বিস্তারিত বিবরণ এসেছে৷
১৩. হযরত মূসা ও হারুনের দাওয়াতের দু'টি অংশ ছিল৷ একটি ছিল ফেরাউনকে আল্লাহর বন্দেগীর দিকে আহ্বান করা৷ সকল নবীর দাওয়াতের আসল উদ্দেশ্য ছিল এটিই৷ দ্বিতীয়টি ছিল বনী ইসরাঈলকে ফেরাউনের গোলামীর বন্ধন মুক্ত করা৷ এটি ছিল বিশেষভাবে কেবলমাত্র তাঁদের দু'জনেরই আল্লাহর পক্ষ হতে অর্পিত দায়িত্ব ৷ কুরআন মজীদে কোথাও শুধুমাত্র প্রথম অংশটির উল্লেখ করা হয়েছে (যেমন সূরা নাযি'আতে) আবার কোথাও শুধুমাত্র দ্বিতীয় অংশটির৷
১৪. এ থেকে মূসা যে ফেরাউনের গৃহে লালিত পালিত হয়েছিলেন, এ ফেরাউন যে সে ব্যক্তি নয়, এ চিন্তার প্রতি সমর্থন মেলে ৷ বরং এ ফেরাউন ছিল তার পুত্র৷ এ যদি সে ফেরাউন হতো , তাহলে বলতো ,আমি তোমাকে লালন-পালন করেছিলাম ৷ কিন্তু এ বলছে, আমাদের এখানে তুমি ছিলে৷ আমরা তোমাকে লালন-পালন করেছিলাম৷ (এ বিষয়টি সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনার জন্য দেখুন তাফহীমুল কুরআন, সূরা আল আ'রাফ ৮৫-৯৩ টীকা)
১৫. হযরত মুসার মাধ্যমে যে হত্যা কার্য সংঘটিত হয়েছিল সে ঘটনার প্রতি এখানে ইংগিত করা হয়েছে৷
১৬. মূলে ................. বলা হয়েছে৷অর্থাৎ "আমি তখন গোমরাহীর মধ্যে অবস্খান করছিলাম৷" অথবা "আমি সে সময় এ কাজ করেছিলাম পথভ্রষ্ট থাকা অবস্থায়৷ " এ ................ শব্দটি অবশ্যই গোমরাহী বা পথভ্রষ্ট তারই সমার্থক ৷ বরং আরবী ভাষায় এ শব্দটি অজ্ঞতা , অজ্ঞানতা , ভুল , ভ্রান্তি, বিস্মৃতি ইত্যাদি অর্থে ব্যবহৃত হয়৷ সূরা কাসাসে যে ঘটনা বর্ণিত হয়েছে সে সম্পর্কে চিন্তা করলে এখানে ........ শব্দটিকে অজ্ঞতা অর্থে গ্রহণ করাই বেশী সঠিক হবে৷ মূসা সেই কিবতীকে একজন ইসরাঈলীর উপর জুলুম করতে দেখে শুধুমাত্র একটি ঘুঁষি মেরেছিলেন ৷ সবাই জানে , ঘুঁষিতে সাধারণত মানুষ মরে না৷ আর তিনি হত্যা করার উদ্দেশ্যেও ঘুঁষি মারেননি৷ ঘটনাক্রমে এতেই সে মরে গিয়েছিল ৷ তাই সঠিক এ ছিল যে , এটি ইচ্ছাকৃত হত্যা ছিল না বরং ছিল ভুলক্রমে হত্যা৷ হত্যা নিশ্চয়ই হয়েছে কিন্তু ইচ্ছা করে হত্যা করার সংকল্প করে হত্যা করা হয়নি৷ হত্যা করার জন্য যেসব অস্ত্র বা উপায় কায়দা ব্যবহার করা হয় অথবা যেগুলোর সাহায্যে হত্যাকার্য সংঘটিত হতে পারে তেমন কোন অস্ত্র , উপায় বা কায়দাও ব্যবহার করা হয়নি৷
১৭. অর্থাৎ জ্ঞান ও প্রজ্ঞা এবং নবুওয়াতের পরোয়ানা৷ "হুকুম" অর্থ জ্ঞান ও প্রজ্ঞা হয় আবার আল্লাহর পক্ষ থেকে নবীকে কর্তৃত্ব করার অনুমতিও (Authority) হয়৷ এরি ভিত্তিতে তিনি ক্ষমতা সহকারে কথা বলেন৷
১৮. অর্থাৎ তোমরা যদি বনী ইসরাঈলের প্রতি জুলুম-নিপীড়ন না চালাতে তাহলে আমি প্রতিপালিত হবার জন্য তোমাদের গৃহে কেন আসতাম ? তোমাদের জুলুমের কারণেই তো আমার মা আমাকে ঝুড়িতে ভরে নদীতে ভাসিয়ে দিয়েছিলেন ৷ নয়তো আমার লালন-পালনের জন্য কি আমার নিজের গৃহ ছিল না ? তাই এ লালন-পালনের জন্য অনুগৃহীত করার খোটা দেয়া তোমার মুখে শোভা পায় না৷
১৯. হযরত মূসাকে ফেরাউনের কাছে যে বাণী পৌছাবার জন্য পাঠনো হয়েছিল তিনি নিজেকে রাব্বুল আলামীনের রসূল হিসেবে পেশ করে তা তাকে শুনিয়ে দিয়েছিলেন, এ বিস্তারিত বিবরণটি এখানে বাদ দেয়া হয়েছে৷ একথা স্বতস্ফুর্তভাবে প্রকাশিত যে, যে বাণী পৌছিয়ে দেয়ার জন্য নবীকে নিযুক্ত করা হয়েছিল তিনি নিশ্চয় তা পৌছিয়ে দিয়ে থাকবেন৷ তাই তা উল্লেখ করার কোন প্রয়োজন ছিল না৷ সেটি বাদ দিয়ে এবার এমন সংলাপ উদ্ধৃত করা হয়েছে যা এ বাণী প্রচারের পর ফেরাউন ও মূসার মধ্যে হয়েছিল৷
২০. এ প্রশ্নটি করা হয় হযরত মূসার উক্তির ওপর ভিত্তি করে৷ তিনি বলেন, আমি রব্বুল আলামীনের (সমস্ত বিশ্ব-জাহানের মালিক, প্রভু ও শাসকের) পক্ষ থেকে প্রেরিত হয়েছি এবং এ জন্য প্রেরিত হয়েছি যে, তুমি বনী ইসরাঈলকে আমার সাথে যেতে দিবে৷ এটি ছিল সুস্পষ্ট রাজনৈতিক বক্তব্য৷ এর পরিস্কার অর্থ ছিল, হযরত মূসা যার প্রতিনিধিত্বের দাবীদার তিনি সারা বিশ্ব-জাহানের সকল সৃষ্টির ওপর সার্বভৌম কর্তৃত্ব ও শাসনের অধিকারী এবং তিনি ফেরাউনকে নিজের অনুগত গণ্য করে তার শাসন কর্তৃত্বের পরিসরে একজন উর্দ্ধতন শাসনকর্তা হিসেবে কেবল হস্তক্ষেপই করছেন না বরং তার নামে এ ফরমানও পাঠাচ্ছেন যে, তোমার প্রজাদের একটি অংশকে আমার মনোনীত প্রতিনিধির হাতে সোপর্দ করো, যাতে সে তাদেরকে তোমার রাষ্ট্রসীমার বাইরে বের করে আনতে পারে৷ এ কথায় ফেরাউন জিজ্ঞেস করছে, এ সারা বিশ্ব-জাহানের মালিক ও শাসনকর্তাটি কে? যিনি মিসরের বাঁদশাহকে তার প্রজাকূলের অর্ন্তভুক্ত সামান্য এক ব্যক্তির মাধ্যমে এ ফরমান পাঠাচ্ছেন?
২১. অর্থাৎ আমি পৃথিবীতে বসবাসকারী কোন সৃষ্টি ও ধ্বংসশীল শাসন কর্তৃত্বের দাবীদারের পক্ষ থেকে আসিনি বরং এসেছি আকাশ ও পৃথিবীর মালিকের পক্ষ থেকে৷ যদি তোমরা বিশ্বাস করো এ বিশ্ব-জাহানের কোন স্রষ্টা-মালিক ও শাসনকর্তা আছেন তাহলে বিশ্বাসীর রব কে এ কথা বুঝা তোমাদের পক্ষে কঠিন হবার কথা নয়৷
২২. হযরত মূসা (আ) ফেরাউনের দাবীদারদেরকে সম্বোধন করে এ ভাষণ দিচ্ছিলেন৷ তাদেরকে উদ্দেশ্য করে ফেরাউস বলেছিল, তোমরা শুনছো? হযরত মূসা তাদেরকে বলেন, আমি এমন সব মিথ্যা রবের প্রবক্তা নই যারা আজ আছে, কাল ছিল না এবং কাল ছিল কিন্তু আজ নেই৷ তোমাদের এ ফেরাউন যে আজ তোমাদের রবে পরিণত হয়েছে সে কাল ছিল না এবং কাল তোমাদের বাপ-দাদারা যেসব ফেরাউনকে রবে পরিণত করেছিল তারা আজ নেই৷ আমি কেবলমাত্র সেই রবের সার্বভৌম কর্তৃত্ব ও শাসনাধিকার স্বীকার করি যিনি আজও তোমাদের এবং এই ফেরাউনের রব এবং এর পূর্বে তোমাদের ও এর যে বাপ-দাদারা চলে গেছেন তাদের সবারও রব ছিলেন৷
২৩. অর্থাৎ আমাকে পাগল গণ্য করা হচ্ছে৷ কিন্তু আপনারা যদি বুদ্ধিমান হয়ে থাকেন , তাহলে নিজেরাই ভেবে দেখুন , প্রকৃতপক্ষে কি এ বেচারা ফেরাউন যে পৃথিবীর সামান্য একটু ভূখণ্ডের বাদশাহ হয়ে বসেছে সে রব ? অথবা পূর্ব ও পশ্চিমের মালিক এবং মিসরসহ পূর্ব ও পশ্চিম দ্বারা পরিব্যাপ্ত প্রত্যেকটি জিনিসের মালিক যিনি তিনি রব ? আমি তো তাঁরই শাসন কর্তৃত্ব মানি এবং তাঁরই পক্ষ থেকে এ হুকুম তাঁর এক বান্দার কাছে পৌঁছিয়ে দিচ্ছি৷
২৪. এ কথোপকথনটি বুঝতে হলে এ বিষয়টি সামনে থাকতে হবে যে,আজকের মতো প্রাচীন যুগেও "উপাস্য"-এর ধারণা কেবলমাত্র ধর্মীয় অর্থের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল৷ অর্থাৎ পূজা, অরাধনা, মানত ও নজরানা লাভের অধিকারী৷ তার অতি প্রাকৃতিক প্রাধান্য ও কর্তৃত্বের কারণে মানুষ নিজের ব্যবহারিক জীবনের বিভিন্ন বিষয়ে তার কাছে সাহায্য ও সহযোগিতা লাভের জন্য প্রার্থনা করবে, এ মর্যাদাও তার আছে৷ কিন্তু কোন উপাস্য আইনগত ও রাজনৈতিক দিক দিয়েও প্রাধান্য বিস্তার করার এবং পার্থিব বিষয়াদিতে তার ইচ্ছামত যে কোন হুকুম দেবে আর তার সামনে মানুষকে মাথা নত করতে হবে৷ এ কথা পৃথিবীর ভূয়া শাসনকর্তারা আগেও কখনো মেনে নেয়নি এবং আজো মেনে নিতে প্রস্তুত নয়৷ তারা সব সময় একথা বলে এসেছে, দুনিয়ার বিভিন্ন ব্যাপারে আমরা পূর্ণ স্বাধীন৷ কোন উপাস্যের আমাদের রাজনীতিতে ও আইনে হস্তক্ষেপ করার কোন অধিকার নেই৷ এটিই ছিল পার্থিব রাষ্ট্র ও সাম্রাজ্যসমূহের সাথে আম্বিয়া আলাইহিমুস সালাম ও তাঁদের অনুসারী সংস্কারকদের সংঘাতের আসল কারণ৷ তাঁরা এদের কাছ থেকে সমগ্র বিশ্ব-জাহানের মালিক আল্লাহর সার্বভৌম মতা, কর্তৃত্ব ও শ্রেষ্ঠত্বের স্বীকৃতি আদায় করার চেষ্টা করেছেন এবং এরা এর জবাবে যে কেবলমাত্র নিজেদের স্বয়ংসম্পূর্ণ প্রভূত্ব ও কর্তৃত্বের দাবী পেশ করতে থেকেছে তাই নয় বরং এমন প্রত্যেক ব্যক্তিকে অপরাধী ও বিদ্রোহ গণ্য করেছে, যে তাদের ছাড়া অন্য কাউকে আইন ও রাজনীতির ময়দানে উপাস্য হিসেবে মেনে নিয়েছে৷ এ ব্যাখ্যা থেকে ফেরাউনের এ কথাবার্তার সঠিক মর্ম উপলব্ধি করা যেতে পারে৷ যদি কেবলমাত্র পূজা-অর্চনা ও নজরানা-মানত পেশ করার ব্যাপার হতো, তাহলে হযরত মূসা অন্য দেবতাদের বাদ দিয়ে একমাত্র আল্লাহ রাব্বুল আলামীনকে এর একমাত্র হকদার মনে করেন এটা তার কাছে কোন আলোচনার বিষয় হতো না৷ যদি কেবলমাত্র এ অর্থেই মূসা আলাইহিস সালাম তাকে ইবাদতের ক্ষেত্রে তাওহীদমুখী হবার দাওয়াত দিতেন তাহলে তার ক্রোধান্বত্ত হবার কোন কারণই ছিল না৷ বড়জোর সে যদি কিছু করতো তাহলে নিজের পিতৃপুরুষের ধর্ম ত্যাগ করতে অস্বীকার করতো অথবা হযরত মূসাকে বলতো, আমার ধর্মের পণ্ডিতদের সাথে বিতর্ক করে নাও৷ কিন্তু যে জিনিসটি তাকে ক্রোধান্বত্ত করে দিয়েছে সেটি ছিল এই যে, হযরত মূসা আলাইহিস সালাম রব্বুল আলামীনের প্রতিনিধি হিসেবে নিজেকে পেশ করে তাকে এমনভাবে একটি রাজনৈতিক হুকুম পৌছিয়ে দিয়েছেন যেন সে একজন অধীনস্থ শাসক এবং একজন উর্দ্ধতন শাসনকর্তার দূত এসে তার কাছে এ হুকুমের প্রতি আনুগত্য করার দাবী করেছেন৷ এ অর্থে সে নিজের ওপর কোন রাজনৈতিক ও আইনগত প্রাধান্য মেনে নিতে প্রস্তুত ছিল না৷ বরং তার কোন প্রজা তাকে ছাড়া অন্য কাউকে উর্দ্ধতন শাসনকর্তা হিসেবে মেনে নেবে, এটাও সে বরদাশত করতে পারতো না৷ তাই সে প্রথমে চ্যালেঞ্জ করলো "রব্বুল আলামীন"-এর পরিভাষাকে৷ কারণ, তাঁর পক্ষ থেকে যে বার্তা নিয়ে আসা হয়েছিল তার মধ্যে শুধুমাত্র ধর্মীয় উপসনার নয় বরং সার্বভৌম রাজনৈতিক কর্তৃত্বের ভাবধারা সুস্পষ্ট ছিল৷ তারপর হযরত মূসা যখন বারবার ব্যাখ্যা করে বললেন- তিনি যে রাব্বুল আলামীনের বার্তা এনেছেন তিনি কে? তখন সে পরিস্কার হুমকি দিল, মিসর দেশে তুমি যদি আমার ছাড়া অন্য কারো সার্বভৌম কর্তৃত্বের নাম উচ্চারণ করবে তাহলে তোমাকে জেলখানার ভাত খেতে হবে৷
২৫. অর্থাৎ যদি আমি সত্যিই সমগ্র বিশ্ব-জাহানের , আকাশ ও পৃথিবীর এবং পূর্ব ও পশ্চিমের রবের পক্ষ থেকে যে আমাকে পাঠানো হয়েছে এর সপক্ষে সুস্পষ্ট আলামত পেশ করি , তাহলে এ অবস্থায়ও কি আমার কথা মেনে নিতে অস্বীকার করা হবে এবং আমাকে কারাগারে পাঠানো হবে ?
২৬. হযরত মূসার প্রশ্নের জবাবে ফেরাউনের এ উক্তি স্বতস্ফূর্তভাবে প্রকাশ করে যে, প্রাচীন ও আধুনিক কালের মুশরিকদের থেকে তার অবস্থা ভিন্নতর ছিল না৷ অন্য সব মুশরিকদের মতোই সে আল্লাহকে অতিপ্রাকৃত অর্থে সকল উপাস্যের উপাস্য বলে বিশ্বাস করতো এবং তাদের মতো একথাও স্বীকার করতো যে , বিশ্ব-জাহানের সকল দেবতার চাইতে তাঁর শক্তি বেশী৷ তাই মূসা তাঁকে বলেন , যদি তুমি আমাকে আল্লাহর পক্ষ থেকে নিযুক্ত বলে বিশ্বাস না করো , তাহলে আমি এমন সব নিদর্শন পেশ করবো যা থেকে আমি যে তাঁর প্রেরিত তা প্রমাণ হয়ে যাবে৷ আর এ কারণে সে-ও জবাব দেয়, ঠিক আছে যদি তোমার দাবী সত্য হয়ে থাকে , তাহলে আনো তোমার নিদর্শন৷ অন্যথায় সোজা কথা , যদি সে আল্লাহর অস্তিত্ব অথবা তাঁর বিশ্ব-জাহানের মালিক হবার ব্যাপারেই সন্দিহান হতো ,তাহলে নিদর্শনের প্রশ্নই উঠতে পারতো না ৷ নিদর্শনের প্রশ্ন তো তখনই সামনে আসতে পারে যখন আল্লাহর অস্তিত্ব ও তাঁর সার্বভৌম ক্ষমতার মালিক হওয়া স্বীকৃত হয় কিন্তু মূসা তাঁর প্রেরিত কি না এ ব্যাপারে প্রশ্ন দেখা দেয়৷
২৭. কুরআন মজীদে কোন জায়গায় এ জন্য ....... (সাপ) আবার কোথাও ....... (সাধারণত ছোট ছোট সাপকে বলা হয়) শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে৷ আর এখানে বলা হচ্ছে ...... (অজগর) ৷ এর ব্যাখ্যা এভাবে করা যায় যে .... আরবী ভাষায় সর্পজাতির সাধারণ নাম৷ তা ছোট সাপও হতে পারে আবার বড় সাপও হতে পারে ৷ আর ........ শব্দ ব্যবহার করার কারণ হচ্ছে এই যে, দৈহিক আয়তন ও স্থূলতার দিক দিয়ে তা ছিল অজগরের মতো৷ অন্যদিকে ....... শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে ছোট সাপের মতো তার ক্ষীপ্রতা ও তেজস্বীতার জন্য৷
২৮. কোন কোন তাফসীরকারক ইহুদীদের বর্ণনায় প্রভাবিত হয়ে بَيْضَاء এর অর্থ করেছেন "সাদা" এবং এর অর্থ এভাবে নিয়েছেন, বগল থেকে বের হতেই স্বাভাবিক রোগমুক্ত হাত ধবল কুষ্ঠরোগীর মত সাদা হয়ে গেলো? কিন্তু ইবনে জারীর, ইবনে কাসীর, যামাখশারী, রাযী, আবুস সাউদ ঈমাদী, আলূসী ও অন্যান্য বড় বড় মুফাস্সিরগণ এ ব্যাপারে একমত হয়েছেন যে, এখানে بَيْضَاء মানে হচ্ছে, উজ্জ্বল ও চাকচিক্যময়৷ যখনই হযরত মূসা বগল থেকে হাত বের করলেন তখনই আকস্মাত সমগ্র পরিবেশ আলোকোজ্জ্বল হয়ে উঠলো এবং অনুভূত হতে লাগলো যেন সূর্য উদিত হয়েছে৷ (আরো বেশী ব্যাখ্যার জন্য দেখুন তাফহীমুল কুরআন,সূরা তা-হা, ১৩ টীকা৷)