(২৬:১৯২) এটি ১১৮ রব্বুল আলামীনের নাযিল করা জিনিস৷ ১১৯
(২৬:১৯৩) একে নিয়ে আমানতদার রূহ ১২০
(২৬:১৯৪) অবতরন করেছে তোমার হৃদয়ে, যাতে তুমি তাদের অন্তর্ভূক্ত হয়ে যাও যারা (আল্লাহর পক্ষ থেকে আল্লাহর সৃষ্টির জন্য) সতর্ককারী হয়,
(২৬:১৯৫) পরিস্কার আরবী ভাষায়৷১২১
(২৬:১৯৬) আর আগের লোকদের কিতাবেও এ কথা আছে৷১২২
(২৬:১৯৭) এটা কি এদের (মক্কাবাসীদের) জন্য কোন নিদর্শন নয় যে, বনীইসরাইলে আলেম সমাজ একে জানে? ১২৩
(২৬:১৯৮) (কিন্তু এদের হঠকারিতা ও গোয়ার্তুমি এতদূর গড়িয়েছে যে) যদি আমি এটা কোন অনারব ব্যক্তির উপর নাযিল করে দিতাম
(২৬:১৯৯) এবং সে এই (প্রাঞ্জল আরবীয় বাণী) তাদেরকে পড়ে শোনাত তবুও এরা মেনে নিত না৷১২৪
(২৬:২০০) অনুরূপভাবে একে (কথা) আমি অপরাধীদের হৃদয়ে বিদ্ধ করে দিয়েছি৷ ১২৫
(২৬:২০১) তারা এর প্রতি ঈমান আনে না যতক্ষন না কঠিন শাস্তি দেখে নেয়৷১২৬
(২৬:২০২) তারপর যখন তা অসচেতন অবস্থায় তাদের ওপর এসে পড়ে
(২৬:২০৩) তখন তারা বলে, “এখন আমরা কি অবকাশ পেতে পারি”? ১২৭
(২৬:২০৪) এরা কি আমার আযাব ত্বরান্বিত করতে চাচ্ছে?
(২৬:২০৫) তুমি কি কিছু ভেবে দেখেছো, যদি আমি তাদেরকে বছরের পর বছর ভোগ বিলাসের অবকাশও দিই
(২৬:২০৬) এবং তারপর আবার সেই একই জিনিস তাদের ওপর এসে পড়ে যায় ভয় তাদেরকে দেখানো হচ্ছে,
(২৬:২০৭) তাহলে জীবন যাপনের এ উপকরণগুলো যা তার এ যাবত পেয়ে আসছে এগুলো তাদের কোন কাজে লাগবে না? ১২৮
(২৬:২০৮) (দেখো) আমি কখনো কোন জনপদকে তার জন্য উপদেশ
(২৬:২০৯) দেয়ার যোগ্য সতর্ককারী না পাঠিয়ে ধ্বংস করিনি এবং আমি জালেম ছিলাম না৷ ১২৯
(২৬:২১০) এ (সুস্পষ্ট কিতাবটি) নিয়ে শয়তানরা অবতীর্ণ হয়নি৷ ১৩০
(২৬:২১১) এ কাজটি তাদের শোভাও পায় না৷১৩১ এবং তারা এমনটি করতেই পারে না৷ ১৩২
(২৬:২১২) তাদের কে তো এর শ্রবন থেকেও দূরে রাখা হয়েছে৷১৩৩
(২৬:২১৩) কাজেই হে মুহাম্মদ! আল্লাহর সাথে অন্য কোন মাবুদকে ডেকো না, নয়তো তুমিও শাস্তি লাভকারীদের অন্তর্ভূক্ত হয়ে যাবে৷ ১৩৪
(২৬:২১৪) নিজের নিকটতম আত্নীয়-পরিজনদের ভয় দেখাও ১৩৫
(২৬:২১৫) এবং মুমিনদের মধ্য থেকে যারা তোমার অনুসরন করে তাদের সাথে বিনম্র ব্যবহার করো৷
(২৬:২১৬) কিন্তু যদি তারা তোমার নাফরমানী করে তাহলে তাদেরকে বলে দাও, তোমরা যা কিছু করো আমি তা থেকে দায়মুক্ত৷১৩৬
(২৬:২১৭) আর সেই পরাক্রান্ত ও দয়াময়ের উপর নির্ভর করো ১৩৭
(২৬:২১৮) যিনি তোমাকে দেখতে থাকেন যখন তুমি ওঠো ১৩৮
(২৬:২১৯) এবং সিজ্‌দাকারীদের মধ্যে তোমার ওঠা-বসা ও নড়া-চড়ার প্রতি দৃষ্টি রাখেন৷ ১৩৯
(২৬:২২০) তিনি সব কিছুই শোনেন ও জানেন৷
(২৬:২২১) হে লোকেরা! আমি তোমাদের জানাবো শয়তানরা কার উপর অবতীর্ণ হয়?
(২৬:২২২) তারা তো প্রত্যেক জালিয়াত বদকারের উপর অবতীর্ণ হয়৷ ১৪০
(২৬:২২৩) শোনা কথা কানে ঢুকিয়ে দেয় এবং এর বেশির ভাগই হয় মিথ্যা৷ ১৪১
(২৬:২২৪) আর কবিরা! তাদের পেছনে চলে পথভ্রান্ত যারা৷ ১৪২
(২৬:২২৫) তুমি কি দেখ না তারা উপতক্যায় উপত্যকায় উদভ্রান্তের মতো ঘুরে বেড়ায় ১৪৩
(২৬:২২৬) এবং এমনসব কথা বলে যা তারা করে না? ১৪৪
(২৬:২২৭) তারা ছাড়া যারা ঈমান আনে ও সৎ কাজ করে এবং আল্লাহকে বেশি বেশি স্মরন করে তারা তাদের প্রতি জুলুম করা হলে শুধুমাত্র প্রতিশোধ নেয়৷ ১৪৫ আর জুলুমকারীরা শীঘ্রই জানবে তাদের পরিণাম কি! ১৪৬
১১৮. ঐতিহাসিক বর্ণনা শেষ করে এবার আলোচনার ধারা ফিরিয়ে দেয়া হয়েছে এমন এক ভিষয়ের দিকে যার মাধ্যমে সূরার সূচনা করা হয়েছিল৷ এ বিষয়টি বুঝতে হলে আর একবার পেছন ফিরে প্রথম রুকু'টি দেখে নেয়া উচিত৷
১১৯. অর্থাৎ এ "সুস্পষ্ট কিতাব" টি যার আয়াত এখানে শোনানো হচ্ছে এবং এ "কথা" যা থেকে লোকেরা মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে৷ এটা কোন মানুষের মনগড়া জিনিস নয়৷ মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজে রচনা করেননি৷ বরং রব্বুল আলামীন নাযিল করেছেন৷
১২০. অর্থাৎ জিব্রাইল আলাইহিস সালাম, যেমন কুরআনের অন্যত্র বলা হয়েছেঃ

قل من كان عدوَّا لِّجِبْرِيْلَ فانَّه نزِّله على قلبك بِاِذْنِ اللهِ-

"বলে দাও, যে ব্যক্তি জিব্রীলের সাথে শত্রুতা রাখে তার জানা উচিত, সে-ই এ কুরআন আল্লাহর হুকুমে তোমার অন্তরে নাযিল করেছে৷" (আল বাকারাহঃ ৯৭ আয়াত)

এখানে তাঁর নাম না নিয়ে তাঁর জন্য "রূহুল আমীন" (আমানতদার বা বিশ্বস্ত রূহ) পদবী ব্যবহার করে একথা ব্যক্ত করতে চাওয়া হয়েছে যে, রব্বুল আলামীনের পক্ষ থেকে এ নাযিলকৃত জিনিসটি নিয়ে কোন বস্তুগত শক্তি আসেনি, যার মধ্যে পরিবর্তন ও অবক্ষয়ের সম্ভাবনা আছে বরং এসেছে একটি নির্ভেজাল রূহ৷ তাঁর মধ্যে বস্তুবাদিতার কোন গন্ধ নেই৷ তিনি পুরোপুরি আমানতদার৷ আল্লাহর বাণী যেভাবে তাঁকে সোপর্দ করে দেয়া হয় ঠিক তেমনি হুবহু তিনি তা পৌঁছিয়ে দেন৷ নিজের পক্ষ থেকে কিছু বাড়ানো বা কমানো অথবা নিজেই কিছু রচনা করে নেয়া তার পক্ষে সম্ভব নয়৷
১২১. এ বাক্যটির সম্পর্ক "আমানতদার রূহ অবতরণ করেছে" এর সাথেও হতে পারে আবার "যারা সতর্ককারী হয়" এর সাথেও হতে পারে৷ প্রথম অবস্থায় এর অর্থ হবে, সেই আমানতদার রূহ তাকে এনেছেন পরিষ্কার আরবী ভাষায় এবং দ্বিতীয় অবস্থায় এর অর্থ হবে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এমন সব নবীদের অর্ন্তভূক্ত যাদেরকে আরবী ভাষার মাধ্যমে মানুষকে সতর্ক করার জন্য পাঠানো হয়েছিল৷ এ নবীগণ ছিলেন হূদ, সালেহ, ইসমাঈল ও শো'আইব আলাইহিমুস সালাম৷ উভয় অবস্থায় বক্তব্যের উদ্দেশ্য একই এবং তা হচ্ছে রব্বুল আলামীনের পক্ষ থেকে এ শিক্ষা যেন কোন মৃত ভাষায় বা জ্বীনদের ভাষায় আসেনি এবং এর মধ্যে ধাঁধাঁ বা হেঁয়ালী মার্কা কোন গোলমেলে ভাষা ব্যবহার করা হয়নি৷ বরং এটা এমন প্রাঞ্জল, পরিষ্কার ও উন্নত বাগধারা সম্পন্ন আরবী ভাষায় রচিত, যার অর্থ ও বক্তব্য প্রত্যেক আরবী ভাষাভাষী ও আরবী জ্ঞানসম্পন্ন ব্যক্তি অতি সহজে ও স্বাভাবিকভাবে অনুধাবন করতে পারে৷ তাই যার এর দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে তারা এর শিক্ষা বুঝতে পারেনি তাদের দিক থেকে এ ধরণের ওজর পেশ করার কোন সুযোগ নেই৷ বরং তাদের মুখ ফিরিয়ে নেয়া ও অস্বীকার করার কারণ হচ্ছে শুধুমাত্র এই যে, তারা মিসরের ফেরাউন, ইব্রাহীমের জাতি, নূহের জাতি, লূতের জাতি, আদ ও সামূদ জাতি এবং আইকাবাসীদের মতো একই রোগে ভূগছিল৷
১২২. অর্থাৎ একথা, এ অবতীর্ণ বিষয় এবং এ আল্লাহ প্রদত্ত শিক্ষা ইতিপূর্বেকার আসমানী কিতাবগুলোতে রয়েছে৷ এক আল্লাহর বন্দেগীর একই আহ্বান, পরকালের জীবনের এই একই বিশ্বাস নবীদের পথ অনুসরণের একই পদ্ধতি সেসব কিতাবেও পেশ করা হয়েছে৷ আল্লাহর পক্ষ থেকে যেসব কিতাব এসেছে সেগুলো শিরকের নিন্দাই করে৷ সেগুলো বস্তুবাদী জীবনাদর্শ ত্যাগ করে এমন সত্য জীবনাদর্শ গ্রহণের আহ্বান জানায় যেগুলোর ভিত্তি আল্লাহর সামনে মানুষের জবাবদিহিতার ধারণার ওপর প্রতিষ্ঠিত৷ সে সকল কিতাবের অভিন্ন দাবী এই যে, মানুষ নিজের স্বাধীন ইচ্ছা শক্তি ও ক্ষমতা পরিত্যাগ করে নবীদের আনীত আল্লাহর বিধান অনুসরণ করে চলুক৷ এসব কথার মধ্যে কোনটাই নতুন নয়৷ দুনিয়ায় কুরআনই প্রথমবার একথাগুলো পেশ করছে না৷ কোন ব্যক্তি বলতে পারবে না, তোমরা এমনসব কথা বলছো যা পূর্বের ও পরের কেউ কখনো বলেনি৷

ইমাম আবু হানিফা রহমাতুল্লাহি আলাইহির একটি পুরাতন অভিমতের সপক্ষে যেসব যুক্তি দেখানো হয়ে থাকে এ আয়াতটি তার অন্যতম৷ ইমাম সাহেবের মতটি হচ্ছেঃ

যদি কোন ব্যক্তি নামাজে কুরআনের অনুবাদ পড়ে নেয় সে আরবীতে কুরআন পড়তে সক্ষম হলেও বা না হলেও, তার নামাজ হয়ে যায়৷ আল্লামা আবু বকর জাস্সাসের ভাষায় এ যুক্তির ভিত্তি হলো, আল্লাহ এখানে বলেছেন, এ কুরআন পূর্ববর্তী আসমানী কিতাবগুলোর মধ্যেও ছিল৷ আর একথা সুস্পষ্ট, সে কিতাবগুলোতে কুরআন আরবী ভাষার শব্দ সমন্বয়ে ছিল না৷ অন্য ভাষায় কুরআনের বিষয়বস্তু উদ্ধৃত করে দেয়া সত্ত্বেও তা কুরআনই থাকে৷ কুরআন হওয়াকে বাতিল করে দেয় না৷ (আহকামুল কুরআন, তৃতীয় খণ্ড, ৪২৯ পৃষ্ঠা) কিন্তু এ যুক্তির দুর্বলতা একেবারেই সুস্পষ্ট৷ কুরআন মজীদ বা অন্য কোন আসমানী কিতাবের কোনটিরও নাযিল হবার ধরণ এমন ছিল না যে, আল্লাহ নবীর অন্তরে কেবল অর্থই সঞ্চার করে দিয়েছেন এবং তারপর নবী তাকে নিজের ভাষায় বর্ণনা করেছেন৷ বরং প্রত্যেকটি কিতাব যে ভাষায় এসেছে আল্লাহর পক্ষ থেকে শব্দ ও বিষয়বস্তু উভয়টি সহকারেই এসেছে৷ পূর্ববর্তী যেসব কিতাবে কুরআনের শিক্ষা ছিল মানবিক ভাষা সহকারে নয় বরং আল্লাহর ভাষা সহকারেই ছিল এবং সেগুলোর কোনটির অনুবাদকেও আল্লাহর কিতাব বলা যেতে পারে না এবং তাকে আসলের স্থলাভিষিক্ত করাও সম্ভব নয়৷ আর কুরআন সম্পর্কে বার বার দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলা হয়েছে তার প্রতিটি শব্দ আরবী ভাষায় হুবহু নাযিল হয়েছেঃ انِّا انْزَلناه قُرانًا عَرَبِيًّا (يوسف : ২) "নিশ্চিতভাবে আমি তা নাযিল করেছি আরবী ভাষায় কুরআন আকারে৷" وكذالك انزلناه حكمًا عَرَبِيًّا "আর এভাবে আমি তা নাযিল করেছি একটি নির্দেশ আরবী ভাষায়৷" (আর রা'দঃ ৩৭) قرعنًا عربيًّأ غير ذى عِوَجٍ ( الزُّمر : ২৮) "আরবী ভাষায় এ কুরআন বক্রতা মুক্ত৷" (আয্ যুমারঃ ২৮) তারপর আলোচ্য আয়াতের সাথে সংযুক্ত পূর্ববর্তী আয়াতেই বলা হয়েছে, রূহুল আমীন আরবী ভাষায় একে নিয়ে নাযিল হয়েছেন৷ এখন তাঁর সম্পর্কে কেমন করে এ কথা বলা যেতে পারে যে, কোন মানুষ অন্য ভাষায় তার যে অনুবাদ করেছে তাও কুরআনই হবে এবং এবং তার শব্দাবলী আল্লাহর শব্দাবলীর স্থলাভিষিক্ত হবে৷ মনে হচ্ছে যুক্তির এ দুর্বলতাটি মহান ইমাম পরবর্তী সময়ে উপলব্ধি করে থাকতে পারেন৷ তাই নির্ভরযোগ্য বর্ণনায় এ কথা উদ্ধৃত হয়েছে যে, এ বিষয়ে নিজের অভিমত পরিবর্তন করে তিনি ইমাম আবু ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মাদের মত গ্রহণ করে নিয়েছিলেন অর্থাৎ যে ব্যক্তি আরবী ভাষায় ক্বিরাত তথা কুরআন পড়তে সক্ষম নয় সে ততক্ষণ পর্যন্ত নামাজে কুরআনের অনুবাদ পড়তে পারে যতক্ষণ সে আরবী শব্দ উচ্চারণ করার যোগ্যতা অর্জন না করে৷ কিন্তু যে ব্যক্তি আরবীতে কুরআন পড়তে পারে যে যদি কুরআনের অনুবাদ পড়ে তাহলে তার নামাজ হবে না৷ আসলে ইমামদ্বয় এমন সব আজমী তথা অনারব নওমুসলিমকে এ সুযোগটি দেবার প্রস্তাব করেছিলেন যারা ইসলাম গ্রহণ করার পরপরই আরবী ভাষায় নামাজ পড়ার যোগ্যতা অর্জন করতে পারতো না৷ এ ব্যাপারে কুরআনের অনুবাদও কুরআন এটা তাদের যুক্তির ভিত্তি ছিল না৷ বরং তাদের যুক্তি ছিল, ইশারায় রুকু সিজদা করা যেমন রুকু সিজদা করতে অক্ষম ব্যক্তির জন্য জায়েয ঠিক তেমনি আরবী ছাড়া অন্য ভাষায় নামাজ পড়াও এমন ব্যক্তির জন্য জায়েয যে আরবী হরফ উচ্চারণ করতে অক্ষম৷ অনুরূপভাবে যেমন অক্ষমতা দূর হবার ইশারায় রুকু সিজদাকারীর নামাজ হবে না ঠিক তেমনি কুরআন পড়ার ক্ষমতা অর্জন করার পর অনুবাদ পাঠকারীর নামাজও হবে না৷ (এ বিষয়টি সম্পর্কে বিস্তারিত জানার জন্য দেখুন সারখসী লিখিত মাব্সূত, প্রথম খণ্ড, ৩৭ পৃষ্ঠা এবং ফাতহুল কাদীর ও শারহে ইনায়াহ আলাল হিদায়াহ প্রথম খণ্ড, ১৯০-২০১ পৃষ্ঠা)
১২৩. অর্থাৎ বনী ইসরাঈলের আলেমেরা এ কথা জানে যে, কুরআন মজীদে যে শিক্ষা দেয়া হয়েছে তা, ঠিক সেই একই শিক্ষা যা পূর্ববর্তী আসমানী কিতাবগুলোতে দেয়া হয়েছিল৷ মক্কাবাসীরা কিতাবের জ্ঞান না রাখলেও আশেপাশের এলাকায় বনী ইসরাঈলের বিপুল সংখ্যক আলেম ও বিদ্বান রয়েছে৷ তারা জানে, মুহাম্মাদ ইবনে আব্দুল্লাহ আজ প্রথমবার তাদের সামনে কোন অভিনব ও অদ্ভূত 'কথা' রাখেননি বরং হাজার হাজার বছর থেকে আল্লাহর নবীগণ এই একই কথা বারবার এনেছেন৷ এ নাযিলকৃত বিষয়ও সেই একই রব্বুল আলামীনের পক্ষ থেকে এসেছে যিনি পূর্ববর্তী কিতাবগুলো নাযিল করেছিলেন, একথাটি কি এ বিষয়ে নিশ্চিন্ততা অর্জন করার জন্য যথেষ্ঠ নয়?

সীরাতে ইবনে হিশাম থেকে জানা যায়, এ আয়াতগুলো নাযিল হবার কাছাকাছি সময়ে হাব্শা (বর্তমানে ইথিয়োপিয়া) থেকে হযরত জা'ফর রাদিয়াল্লাহু আনহুর দাওয়াত শুনে ২০ জনের একটি প্রতিনিধি দল মক্কায় আসে৷ তারা মসজিদে হারামে কুরাইশ বংশীয় কাফেরদের সামনে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সহিত মোলাকাত করে তাঁকে জিজ্ঞেস করেন আপনি কি শিক্ষা নিয়ে এসেছেন? তিনি জবাবে কুরআনের কিছু আয়াত শুনান৷ এগুলো শুনে তাদের চোখ দিয়ে অশ্রু ঝরতে থাকে এবং তারা তখনই তাঁর প্রতি ঈমান আনে৷ তারপর যখন তারা তার কাছ থেকে উঠে যায় তখন আবু জাহেল কয়েকজন কুরাইশকে সাথে নিয়ে তাদের সাথে দেখা করে এবং তাদেরকে কঠোরভাবে তিরষ্কার করে৷ সে বলে "তোমাদের চেয়ে বেশী নির্বোধ কাফেলা কখনো এখানে আসেনি৷ হে হতভাগার দল! তোমাদের দেশের লোকেরা তোমাদের এখানে পাঠিয়েছিল এ ব্যক্তির অবস্থা অনুসন্ধান করে তাদের কাছে সঠিক তথ্য নিয়ে যাবার জন্য৷ কিন্তু তোমরা তো তার সাথে সাক্ষাত করার সাথে সাথেই নিজেদের ধর্ম বিসর্জন দিয়ে বসলে?" তারা ছিল ভদ্র ও শরীফ লোক৷ আবু জাহেলের এ নিন্দাবাদ ও ভৎসনায় বিতর্কে জড়িয়ে পড়ার পরিবর্তে তারা সালাম দিয়ে সরে গেল এবং বলতে থাকলোঃ আমরা আপনার সাথে বিতর্ক করতে চাইনা৷ আপনার ধর্ম আপনার ইচ্ছা ও আপনার ক্ষমতার আওতাধীন এবং আমাদের ধর্মও আমাদের ইচ্ছা ও আমাদের ক্ষমতার আওতাধীন৷ যে জিনিসের মধ্যে নিজেদের কল্যাণ দেখেছি সেটিই আমরা গ্রহণ করে নিয়েছি৷ (দ্বিতীয় খণ্ড, ৩২ পৃষ্ঠা) সূরা কাসাসে এ ঘটনার আলোচনা এভাবে এসেছেঃ

الَّذين اتيناهم الكتاب من قبله هم به يؤمنون- واذا يتلى عليهم قالوا امنَّا به انَّه الحقُّ من رَّبِّنَا انَّا كُنِّا من قبله مسلمين .................... واذَا سمعوا الَّغوَ اعرضوا عنه وقالوا لنا اعمالنا ولكم اعمالكم سلامٌ عليكم لا نبتغى الجاهلينَ-

"এর আগে যাদেরকে আমি কিতাব দিয়েছিলাম তারা এ কুরআনের প্রতি ঈমান আনে এবং যখন তাদেরকে তা শুনানো হয় তখন বলে, আমরা তার প্রতি ঈমান এনেছি৷ এ হচ্ছে আমাদের রবের পক্ষ থেকে সত্য৷ আমরা এর আগেও এই দ্বীন ইসলামের ওপর ছিলাম৷.........আর যখন তারা অর্থহীন কথাবার্তা শুনলো তখন বিতর্ক এড়িয়ে গেলো এবং বললো আমাদের কাজ আমাদের জন্য এবং তোমাদের কাজ তোমাদের জন্য৷ তোমাদের সালাম জানাই৷ আমরা মূর্খদের পদ্ধতি পছন্দ করি না৷ (অর্থাৎ তোমরা আমাদের দু'টি কথা শুনালে জবাবে আমরাও তোমাদের দু'টি কথা শুনালাম)
১২৪. অর্থাৎ এখন তাদেরই জাতির এক ব্যক্তি পরিষ্কার আরবী ভাষায় এ কালাম পড়ে শুনাচ্ছেন৷ এতে তারা বলছে, এ ব্যক্তি নিজেই এ কালাম রচনা করেছে৷ আরবী ভাষীর মুখ থেকে আরবী ভাষণ উচ্চারিত হবার মধ্যে অলৌকিকতার কি আছে যে, তাকে আল্লাহর কালাম বলে মেনে নিতে হবে? কিন্তু এ উচ্চাংগের আরবী কালাম যদি আল্লাহর পক্ষ থেকে কোন অনারব ব্যক্তির ওপর অলৌকিক কার্যক্রম হিসেবে নাযিল করা হতো এবং সে এসে আরবদের কাছে অত্যন্ত নির্ভুল আরবীয় কায়দায় তা পড়ে শুনাতো তাহলে তারা ঈমান না আনার জন্য অন্য কোন বাহানা তালাশ করতো৷ তখন তারা বলতো, এর ওপর কোন জ্বীন ভর করেছে, সে আজমীর কন্ঠে আরবী বলে যাচ্ছে৷ (ব্যাখ্যার জন্য দেখুন তাফহীমুল কুরআন, সূরা হা-মীম আস্ সাজদাহ, ৫৪-৫৮ টীকা) আসল জিনিস হচ্ছে, সত্য প্রিয় ব্যক্তির সামনে যে কথা পেশ করা হয় সে তার ওপর চিন্তা করে এবং ঠাণ্ডা মাথায় ভেবে চিন্তে কথাটা ন্যায় সংগত কি-না সে ব্যাপারে অভিমত প্রতিষ্ঠিত করে৷ আর যে ব্যক্তি হঠকারী হয়, না মেনে নেয়ার ইচ্ছাই যে প্রথম থেকে লালন করে রেখেছে সে আসল বিষয় বস্তুর দিকে দৃষ্টি দেয় না বরং তা প্রত্যাখ্যান করার জন্য নানান টালবাহানা তালাশ করতে থাকে৷ তার সামনে কথা যেভাবেই পেশ করা হোক না কেন সে তা প্রত্যাখ্যান করার জন্য কোন না কোন অজুহাত বা ছূতো তৈরি করে নেবেই৷ কুরাইশ বংশীয় কাফেরদের এই হঠকারীতার পরদা কুরআনের বিভিন্ন জায়গায় উন্মোচন করা হয়েছে এবং তাদেরকে পরিষ্কার বলে দেয়া হয়েছে, তোমরা কোন্ মুখে ঈমান আনার জন্য মুজি'যা দেখাবার শর্ত আরোপ করছো? তোমরা তো এমন লোক যাদেরকে যে কোন বাহানা তালাশ করে নেবেই৷ কারণ তোমাদের মধ্যে সত্য কথা মেনে নেবার প্রবণতা নেইঃ

ولو نزَّلنا عليك كتابا فى قرطاسٍ فلمسوه بِايْديهم لَقَالَ الَّذِين كفروا ان هذا الاَّ سحرٌ مُّبِيْنٌ-

"যদি আমি তোমাদের ওপর কোন কাগজে লেখা কিতাব নাযিল করে দিতাম এবং এরা হাত দিয়ে তা ছুঁয়েও দেখে নিতো, তাহলেও যাদের না মানার তারা বলতো, এতো পরিষ্কার যাদু৷" (আল আনআমঃ ৭ আয়াত)

ولو فتحنا عليهم بابا من السَّمَاء فظلُّوا فيه يَعرجون لقالَوا انَّما سُكِّرت ابصارنا بل نحن قَومٌ مَّسحورون-

"আর যদি আমি তাদের ওপর আকাশের কোন দরজাও খুলে দিতাম এবং তারা তার মধ্যে চড়ে থাকতো, তাহলে তারা বলতো আমাদের চোখ প্রতারিত হচ্ছে বরং আমাদের ওপর যাদু করা হয়েছে৷" (আল হিজরঃ ১৪-১৫)
১২৫. অর্থাৎ এটা সত্যপন্থীদের দিলে যেমন আধ্যাত্মিক প্রশান্তি ও হৃদয়ের শান্তনা হয়ে দেখা দেয় তাদের দিলে এর প্রতিক্রিয়া ঠিক সেভাবে হয় না৷ বরং একটি গরম লোহার শলাকা হয়ে এটা তাদের হৃদয়ে এমনভাবে বিদ্ধ হয় যে, তারা অস্থির হয়ে ওঠে এবং এর বিষয়বস্তু সম্পর্কে চিন্তা-ভাবনা করার পরিবর্তে তার প্রতিবাদ করার উপায় খুঁজতে থাকে৷
১২৬. ঠিক তেমনি আযাব যেমন বিভিন্ন জাতি দেখেছে বলে এ সূরায় ইতিপূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে৷
১২৭. অর্থাৎ আযাব সামনে দেখেই অপরাধীরা বিশ্বাস করতে থাকে যে, নবী যা বলেছিলেন তা ছিল যথার্থ সত্য৷ তখন তারা আক্ষেপ সহকারে হাত কচলাতে থাকে এবং বলতে থাকে হায় যদি আমরা এখন কিছু অবকাশ পাই৷ অথচ অবকাশের সময় পার হয়ে গেছে৷
১২৮. এ বাক্যটি ও এর আগের বাক্যটির মাঝখানে একটি সূক্ষ্ম শূণ্যতা রয়ে গেছে৷ শ্রোতা একটু চিন্তা-ভাবনা করলে নিজেই এ শূণ্যতা ভরে ফেলতে পারে৷ আযাব আসার কোন আশংকা তারা করতো না, তাই তারা তাড়াতাড়ি আযাব আসার জন্য হৈ চৈ করছিল৷ তাদের বিশ্বাস ছিল, যেমন সুখের বাঁশি এ পর্যন্ত তারা বাঁজিয়ে এসেছে তেমনি তারা চিরকালই তা বাজাতে থাকবে৷ এ ভরসায় তারা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে চ্যালেঞ্জ দিতো এ মর্মে যে, যদি সত্যি আপনি আল্লাহর রসূল হন এবং আমরা আপনার প্রতি মিথ্যা আরোপ করে আল্লাহর আযাবের হকদার হয়ে থাকি, তাহলে নিন আমরা তো আপনার প্রতি ম্যিথা আরোপ করলাম, এবার নিয়ে আসুন সেই আযাব যার ভয় আমাদের দেখিয়ে আসছেন৷ এ কথায় বলা হচ্ছে, ঠিক আছে, যদি ধরে নেয়া যায় তাদের এ ভরসা সঠিকই হয়ে থাকে, যদি তাদের ওপর তাৎক্ষণিকভাবে কোন আযাব না আসে, যদি দুনিয়ার আয়েশী জীবন যাপন করার জন্য তারা একটি সুদীর্ঘ অবকাশই পেয়ে যায়, যার আশায় তারা বুক বেঁধেছে, তাহলে প্রশ্ন হচ্ছে, যখনই তাদের ওপর আদ, সামূদ বা লূতের জাতি অথবা আইকাবাসীদের মতো আকস্মিক বিপর্যয় আপতিত হবে, যার হাত থেকে নিরাপদ থাকার নিশ্চয়তা কারো কাছে নেই অথবা অন্য কিছু না হলেও অন্তত মৃত্যুর শেষ মূহুর্তই এসে পৌঁছবে, যার বেষ্টনী ভেদ করে পালাবার সাধ্য কারোর নেই, তাহলে সে সময় দুনিয়ার আয়েশ আরাম করার এ কয়েকটি বছর তাদের জন্য কি লাভজনক প্রমাণিত হবে?
১২৯. অর্থাৎ যখন তারা সতর্ককারীদের সতর্কবাণী এবং উপদেশ দাতাদের উপদেশ গ্রহণ করেনি এবং আমি তাদেরকে ধ্বংস করে দিলাম তখন এ কথা সুস্পষ্ট যে, এটা আমার পক্ষ থেকে তাদের প্রতি কোন জুলুম ছিল না৷ ধ্বংস করার আগে তাদেরকে বুঝিয়ে সঠিক পথে আনার চেষ্টা না করা হলে অবশ্য তাদের প্রতি জুলুম করা হয়েছে একথা বলা যেতো৷
১৩০. প্রথমে এ বিষয়টির ইতিবাচক দিকের কথা বলা হয়েছিল৷ বলা হয়েছিল, এটি রব্বুল আলামীনের নাযিলকৃত কিতাব এবং রূহুল আমীন এটা নিয়ে অবতীর্ণ হয়েছেন৷ এখন নেতিবাচক দিক বর্ণনা করা হচ্ছে৷ বলা হয়েছে, শয়তানরা একে নিয়ে অবতীর্ণ হয়নি, যেমন সত্যের দুশমনরা দোষারোপ করছে৷ কুরাইশ বংশীয় কাফেররা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দাওয়াতকে হেয় প্রতিপন্ন করার জন্য যে মিথ্যার অভিযান চালিয়ে যাচ্ছিল সেখানে তাদের জন্য সবচেয়ে বড় সমস্যা দেখা দিয়েছিল এই যে, কুরআনের আকারে যে বিষ্ময়কর বাণী মানুষের সামনে আসছিল এবং তাদের হৃদয়ের গভীরে অনুপ্রবেশ করে চলছিল তার কি ব্যাখ্যা করা যায়৷ এ বাণী মানুষের কাছে পৌঁছাবার পথ বন্ধ করার ক্ষমতা তাদের ছিল না৷ লোকদের মনে এ সম্পর্কে কুধারণার সৃষ্টি করা এবং এর প্রভাব থেকে তাদেরকে রক্ষা করার জন্য কি ব্যবস্থা অবলম্বন করা যায়, এটাই ছিল এখন তাদের জন্য একটি পেরেশানীর ব্যাপার৷ এ পেরেশানীর অবস্থার মধ্যে তারা জনগণের মধ্যে যেসব অপবাদ ছড়িয়েছিল তার মধ্যে একটি ছিল এই যে, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম (নাউযুবিল্লাহ) একজন গণক এবং একজন সাধারণ গণকদের মতোও তাঁর মনের মধ্যেও এ বাণী শয়তানরা সঞ্চার করে দেয়৷ এ অপবাদটিকে তারা নিজেদের সবচেয়ে বেশী কার্যকর হাতিয়ার বলে মনে করতো৷ তাদের ধারণা ছিল, এ বাণী কোন ফেরেশতা নিয়ে আসে না বরং নিয়ে আসে শয়তান, কারো কাছে একথা যাচাই করার কি মাধ্যমই বা থাকতে পারে এবং শয়তান মনের মধ্যে সঞ্চার করে দেয়, এ অভিযোগের প্রতিবাদ যদি কেউ করতে চায় তাহলে কিভাবে করবে?
১৩১. অর্থাৎ এ বাণী এবং এ বিষয়বস্তু শয়তানের মুখে তো সাজেই না৷ যে কোন বুদ্ধিমান ব্যক্তি নিজেই বুঝতে পারে, কুরআনে যেসব কথা বর্ণনা করা হচ্ছে সেগুলো কি শয়তানের পক্ষ থেকে হতে পারে ? তোমাদের জনপদগুলোতে কি গণৎকার নেই এবং শয়তানদের সাথে যোগসাজস করে যেসব কথা এ ব্যক্তি বলছেন তা কখনো তোমরা কোথাও শুনেছো ? তোমরা কি কখনো শুনেছো , কোন শয়তান কোন গণৎকারের মাধ্যমে লোকদেরকে আল্লাহর প্রতি আনুগত্য ও আল্লাহকে ভয় করার শিক্ষা দিয়েছে ? শির্ক ও মূর্তিপূজা থেকে বিরত রেখেছে ? পরকালে জিজ্ঞাসাবাদ করার ভয় দেখিয়েছে ? জুলুম-নিপীড়ন , অসৎ-অশ্লীল কাজ ও নৈতিকতা বিগর্হিত কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দিয়েছে ? সৎপথে চলা, সততা ও ন্যায়পরায়ণতা অবলম্বন এবং আল্লাহর সৃষ্টির সাথে সদাচার করার উপদেশ দিয়েছে ? শয়তানরা এ প্রকৃতি কোথায় পাবে ? তাদের স্বভাব হচ্ছে তারা মানুষের মধ্যে বিপর্যয় সৃষ্টি করে এবং তাদেরকে অসৎকাজে উৎসাহিত করে৷ তাদের সাথে সম্পর্ক রক্ষাকারী গণকদের কাছে লোকেরা যে কথা জিজ্ঞেস করতে যায় তা হচ্ছে এই যে, প্রেমিক তার প্রেমিকাকে পাবে কি না ? জুয়ায় কোন দাঁওটা মারলে লাভ হবে ? শত্রুকে হেয় করার জন্য কোন চালটা চালতে হবে ? অমুক ব্যক্তির উট কে চুরি করেছে ? এসব সমস্যা ও বিষয় বাদ দিয়ে গণক ও তার পৃষ্ঠপোষক শয়তানরা আবার কবে থেকে আল্লাহর সৃষ্টির কল্যাণ ও সংস্কারের শিক্ষা এবং অসৎ কাজে বাধা দেবার ও সেগুলো উৎখাত করার চিন্তা-ভাবনা করেছে?
১৩২. অর্থাৎ শয়তানরা করতে চাইলেও একাজ করার ক্ষমতাই তাদের নেই৷ সামান্য সময়ের জন্যও নিজেদেরকে মানুষের যথার্থ শিক্ষক ও প্রকৃত আত্ম শুদ্ধিকারীর স্থানে বসিয়ে কুরআন যে নির্ভেজাল সত্য ও নির্ভেজাল কল্যাণের শিক্ষা দিচ্ছে সে শিক্ষা দিতে তারা সক্ষম নয়৷ প্রতারণা করার জন্যও যদি তারা এ কৃত্রিম রূপে আত্মপ্রকাশ করে , তাহলে তাদের কাজ এমন মিশ্রণমুক্ত হতে পারে না , যাতে তাদের মূর্খতা ও তাদের মধ্যে লুকানো শয়তানী স্বভাবের প্রকাশ হবে না৷ যে ব্যক্তি শয়তানদের 'ইলহাম' তথা আসমানী প্রেরণা লাভ করে নেতা হয়ে বসে তার জীবনেও তার শিক্ষার মধ্যে অনিবার্যভাবে নিয়তের ত্রুটি , সংকল্পের অপবিত্রতা ও উদ্দেশ্যের মালিন্য দেখা দেবেই৷ নির্ভেজাল সততা ও নির্ভেজাল সৎকর্মশীলতা কোন শয়তান মানুষের মনে সঞ্চার করতে পারে না এবং শয়তানের সাথে সম্পর্ক রক্ষাকারী কখনো এর ধারক হতে পারে না৷ এরপর আছে শিক্ষার উন্নত মান ও পবিত্রতা এবং এর উপর বাড়তি সুনিপুন বাগধারা ও সাহিত্য-অলংকার এবং গভীর তত্ত্বজ্ঞান , যা কুরআনে পাওয়া যায়৷ এরি ভিত্তিতে কুরআনে বারবার চ্যালেঞ্জ করা হয়েছে , মানুষ ও জীনরা মিলে চেষ্টা করলেও এ কিতাবের মতো কিছু একটা রচনা করে আনতে পারবে নাঃ ------------------------------------------------- (সূরা ইউনুসঃ ৩৮)
১৩৩. অর্থাৎ কুরআনের বাণী হৃদয়ে সঞ্চার করার ক্ষেত্রে হস্তক্ষেপ করা তো দূরের কথা যখন আল্লাহর পক্ষ থেকে রুহুল আমীন তা নিয়ে চলতে থাকেন এবং যখন মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মনোরাজ্যে তিনি তা নাযিল করেন তখন এ সমগ্র ধারাবাহিক কার্যক্রমের কোন এক জায়গায়ও শয়তানদের কান লাগিয়ে শোনারও কোন সুযোগ মেলে না৷ আশেপাশে কোথাও তাদের ঘুরে বেড়াবার কোন অবকাশই দেয়া হয় না৷ কোথাও থেকে কোনভাবে কিছু শুনে টুনে দু'একটি কথা চুরি করে নিয়ে গিয়ে তারা নিজেদের বন্ধু বান্ধবদের বলতে পারতো না যে, আজ মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এ বাণী শুনাবেন অথবা তাঁর ভাষণে অমুক কথা বলা হবে৷ (ব্যাখ্যার জন্য দেখুন তাফহীমুল কুরআন, আল হিজর ৮-১২ ও আস সাফফাত ৫-৭ টীকা, সূরা আল জিন ৮-৯ও ২৭ আয়াত)
১৩৪. এর অর্থ এই নয়, নাউযুবিল্লাহ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে শিরকের অপরাধ সংঘটিত হবার ভয় ছিল এবং এ জন্য তাঁকে ধমক দিয়ে এ থেকে বিরত রাখা হয়েছে৷ আসলে কাফের ও মুশরিকদেরকে সতর্ক করাই এর উদ্দেশ্য৷ বক্তব্যের মূল প্রতিপাদ্য হচ্ছে, কুরআন মজীদে যে শিক্ষা পেশ করা হচ্ছে তা যেহেতু বিশ্ব-জাহানের শাসনকর্তার পক্ষ থেকে নির্ভেজাল সত্য এবং তার মধ্যে শয়তানী মিশ্রণের সামান্যও দখল নেই, তাই এখানে সত্যের ব্যাপারে কাউকে কোন প্রকার সুযোগ-সুবিধা দেবার কোন প্রশ্নই দেখা দেয় না৷ সৃষ্টির মধ্যে আল্লাহর সবচেয়ে প্রিয় যদি কেউ হতে পারেন তবে তিনি হচ্ছেন তাঁর রসূল৷ কিন্তু ধরে নেয়া যাক যদি তিনিও বন্দেগীর পথ থেকে এক তিল পরিমাণ সরে যান এবং এক আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে মাবুদ হিসেবে ডাকেন তাহলে পাকড়াও থেকে বাঁচতে পারবেন না৷ এক্ষেত্রে অন্যরা তো ধর্তব্যের মধ্যে গণ্য নয়৷ এ ব্যাপারে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকেই যখন কোন সুবিধা দেয়া হয়নি তখন আর কোন্ ব্যক্তি আছে যে আল্লাহর সার্বভৌম ক্ষমতায় কাউকে শরীক করার পর আবার এ আশা করতে পারে যে, সে রক্ষা পেয়ে যাবে অথবা কেউ তাকে রক্ষা পেতে সাহায্য করবে৷
১৩৫. অর্থাৎ আল্লাহর এ পবিত্র পরিচ্ছন্ন দীনের মধ্যে যেমন নবীকে কোন সুবিধা দেয়া হয়নি ঠিক তেমনি নবীর পরিবার ও তাঁর নিকটতম আত্মীয়-বান্ধবদের জন্যও কোন সুবিধার অবকাশ রাখা হয়নি৷ এখানে যার সাথেই কিছু করা হয়েছে তার গুণাগুণের (merits) প্রেক্ষিতেই করা হয়েছে৷ কারো বংশ মর্যাদা বা কারো সাথে কোন ব্যক্তির সম্পর্ক কোন উপকার করতে পারে না৷ পথ ভ্রষ্টতা ও অসৎকর্মের জন্য আল্লাহর আযাবের ভয় সবার জন্য সমান৷ এমন নয় যে, অন্য সবাই তো এসব জিনিসের জন্য পাকড়াও হবে কিন্তু নবীর আত্মীয়রা রক্ষা পেয়ে যাবে৷ তাই হুকুম দেয়া হয়েছে, নিজের নিকটতম আত্মীয়দেরকেও পরিষ্কার ভাষায় সতর্ক করে দাও৷ যদি তারা নিজেদের আকীদা-বিশ্বাস ও কার্যকলাপ পরিচ্ছন্ন না রাখে তাহলে তারা যে নবীর আত্মীয় একথা তাদের কোন কাজে লাগবেনা৷

নির্ভরযোগ্য হাদীসে বলা হয়েছে , এ আয়াত নাযিল হবার পর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সবার আগে নিজের দাদার সন্তানদের ডাকলেন এবং তাদের একেক জনকে সম্বোধন করে বললেনঃ

---------------------------------------

"হে বনী আবদুল মুত্তালিব, হে আব্বাস , হে আল্লাহর রসূলের ফুফী সফীয়াহ , হে মুহাম্মাদের কন্যা ফাতিমা, তোমরা আগুনের আযাব থেকে নিজেদেরকে রক্ষা করার চিন্তা করো৷ আমি আল্লাহর আযাব থেকে তোমাদের বাঁচাতে পারবো না৷ তবে হাঁ আমার ধন-সম্পত্তি থেকে তোমরা যা চাও চাইতে পারো৷"

তারপর তিনি অতি প্রত্যুষে সাফা পাহাড়ের সবচেয়ে উঁচু জায়গায় উঠে দাঁড়িয়ে ডাক দিলেনঃ ........ (হায় , সকালের বিপদ !) হে কুরাইশের লোকেরা ! হে বনী কা'ব ইবনে লুআই ! হে বনী মুর্রা ! হে কুসাইর সন্তান সন্ততিরা ! হে বনী আবদে মান্নাফ ! হে বনী আব্দে শামস ! হে বনী হাশেম , হে বনী আবদুল মুত্তালিব ! এভাবে কুরাইশদের প্রত্যেকটি গোত্র ও পরিবারের নাম ধরে তিনি আওয়াজ দেন৷ আরবে একটি প্রচলিত নিয়ম ছিল , অতি প্রত্যুষে যখন কোন বহিশত্রুর হামলার আশংকা দেখা দিতো , ওয়াকিফহাল ব্যক্তি এভাবেই সবাইকে ডাকতো এবং লোকেরা তার আওয়াজ শুনতেই চারদিকে থেকে দৌড়ে যেতো৷ কাজেই নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের এ আওয়াজ শুনে লোকেরা যার যার ঘর থেকে বের হয়ে এলো৷ তখন তিনি বললেনঃ "হে লোকেরা ! যদি আমি বলি , এ পাহাড়ের পেছনে একটি বিশাল সেনাবাহিনী তোমাদের উপর আক্রমণ করার জন্য ওৎ পেতে আছে৷ তাহলে কি তোমরা আমার কথা সত্য বলে মেনে নেবে ?" সবাই বললো , হ্যাঁ আমাদের অভিজ্ঞতা হচ্ছে, তুমি কখনো মিথ্যা বলনি৷ তিনি বললেন , "বেশ , তাহলে আমি আল্লাহর কঠিন আযাব আসার আগে তোমাদের সতর্ক করে দিচ্ছি ৷ তাঁর পাকড়াও থেকে নিজেদের বাঁচাবার চিন্তা করো৷ আল্লাহর মোকাবিলায় আমি তোমাদের কোন কাজে লাগতে পারবোনা৷ কিয়ামতের দিন কেবলমাত্র মুত্তাকীরাই হবে আমার আত্মীয়৷ এমন যেন না হয় , অন্য লোকেরা সৎকাজ নিয়ে আসবে এবং তোমরা দুনিয়ার জঞ্জাল মাথায় করে নিয়ে উপস্থিত হবে৷ সে সময় তোমরা ডাকবে, হে মুহাম্মাদ ! কিন্তু আমি তোমাদের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে বাধ্য হবো৷ তবে দুনিয়ায় আমার সাথে তোমাদের রক্তের সম্পর্ক এবং এখানে আমি তোমাদের সাথে আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখবো৷" এ বিষয়বস্তু সম্বলিত অনেকগুলো হাদীস বুখারী , মুসলিম, মুসনাদে আহমদ, তিরমিযী , নাসাঈ , তাফসীরে ইবনে জারীরে হযরত আয়েশা ,আবু হুরাইরা , আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস , যুহাইর ইবনে আমর ও কুবাইসাহ ইবনে মাহারিক থেকে বর্ণিত হয়েছে৷

কুরআনে ........... এর হুকুম হলো এবং নবী (সা) তাঁর আত্মীয়দেরকে একত্র করে একথা জানিয়ে দিয়ে সে হুকুম তামিল করলেন, ব্যাপারটির এখানেই শেষ নয়৷ আসলে এর মধ্যে যে মূলনীতি সুস্পষ্ট করা হয়েছিল তা ছিল এই যে, দীনের মধ্যে নবী ও তাঁর বংশের জন্য এমন কোন বিশেষ সুবিধা নেই যা থেকে অন্যরা বঞ্চিত৷ যে জিনিসটি প্রাণ সংহারক বিষ সেটি সবারই জন্য প্রাণ সংহারক৷ নবীর কাজ হচ্ছে সবার আগে নিজে তা থেকে বাঁচবেন এবং নিজের নিকটবর্তরী লোকদেরকে তার ভয় দেখাবেন৷ তারপর সাধারণ অসাধারণ নির্বিশেষে সবাইকে এ মর্মে সতর্ক করে দেবেন যে, এটি যে-ই খাবে সে-ই মারা পড়বে৷ আর যে জিনিসটি লাভজনক তা সবার জন্য লাভজনক৷ নবীর দায়িত্ব হচ্ছে , সবার আগে তিনি নিজে সেটি অবলম্বন করবেন এবং নিজের আত্মীয়দেরকে সেটি অবলম্বন করার উপদেশ দেবেন৷ এর ফলে প্রত্যেক ব্যক্তি দেখে নেবে এ ওয়াজ-নসিহত শুধুমাত্র অন্যের জন্য নয় বরং নিজের দাওয়াতের ব্যাপারে নবী আন্তরীক৷ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সারা জীবন এ পদ্ধতি অবলম্বন করে গেছেন৷ মক্কা বিজয়ের দিন যখন তিনি শহরে প্রবেশ করলেন তখন ঘোষণা করে দিলেনঃ

---------------------------------------

"লোকদের কাছে অনাদায়কৃত জাহেলী যুগের প্রত্যেকটি সুদ আমার এ দু'পায়ের তলে পিষ্ট করা হয়েছে৷ আর সবার আগে যে সুদকে আমি রহিত করে দিচ্ছি তা হচ্ছে আমার চাচা আব্বাসের সুদ৷"

(উল্লেখ্য, সুদ হারাম হবার আগে আব্বাস (রা) সুদে টাকা খাটাতেন এবং সে সময় পর্যন্ত লোকদের কাছে তাঁর বহু টাকার সুদ পাওনা ছিল) একবার চুরির অভিযোগে তিনি কুরাইশদের ফাতিমা নামের একটি মেয়ের হাত কাটার হুকুম দিলেন ৷ উসামা ইবনে যায়েদ (রা) তার পক্ষে সুপারিশ করলেন৷ এতে তিনি বললেন , আল্লাহর কসম , যদি মুহাম্মাদের মেয়ে ফাতিমাও চুরি করতো তাহলে আমি তার হাত কেটে দিতাম৷
১৩৬. এর দু'টি অর্থ হতে পারে৷ এক. তোমার আত্মীয় পরিজনদের মধ্যে থেকে যারা ঈমান এনে তোমার অনুসরণ করবে তাদের সাথে কোমল, স্নেহপূর্ণ ও বিনম্র ব্যবহার করো৷ আর যারা তোমার কথা মানবে না তাদের দায় মুক্ত হবার কথা ঘোষণা করে দাও৷ দুই. যেসব আত্মীয়কে সতর্ক করার হুকুম দেয়া হয়েছিল এ উক্তি কেবলমাত্র তাদের সাথে সম্পর্কিত নয় বরং এটি ব্যাপকভাবে সবার জন্য৷ অর্থাৎ যারা ঈমান এনে তোমার আনুগত্য করে তাদের সাথে বিনম্র আচরণ করো এবং যারাই তোমার নাফরমানি করে তাদেরকে এ মর্মে সতর্ক করে দাও যে, তোমাদের কার্যকলাপের সমস্ত দায়-দায়িত্ব থেকে আমি মুক্ত৷ এ আয়াত থেকে জানা যায়, সে সময় কুরাইশ ও তার আশেপাশের আরববাসীদের মধ্যে এমন কিছু লোকও ছিল যারা রসূলুল্লাহর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সত্যতার স্বীকৃতি দিয়েছিল কিন্তু কার্যত তারা তাঁর আনুগত্য করছিল না বরং তারা যথারীতি তাদের ভ্রষ্ঠ ও বিভ্রান্ত সমাজ কাঠামোর মধ্যে ঠিক তেমনিভাবে জীবন যাপন করে যাচ্ছিল যেমন অন্যান্য কাফেররা করছিল৷ আল্লাহ এ ধরণের স্বীকৃতি দানকারীদেরকে এমন সব মু'মিনদের থেকে আলাদা গণ্য করেছিলেন যারা নবীর (সা) স্বীকৃতি দান করার পর তাঁর আনুগত্যের নীতি অবলম্বন করেছিল৷ বিনম্র ব্যবহার করার হুকুম শুধুমাত্র এ শেষোক্ত দলটির জন্য দেয়া হয়েছিল৷ আর যারা নবীর (সা) আনুগত্য করা থেকে মুখ ফিরিয়ে ছিল, যার মধ্যে তাঁর সত্যতার স্বীকারকারী এবং তাঁকে অস্বীকারকারীও ছিল, তাদের সম্পর্কে নবীকে (সা) নির্দেশ দেয়া হয়েছিল, তাদের সাথে সম্পর্ক ছেদের কথা প্রকাশ করে দাও এবং পরিষ্কার বলে দাও, নিজেদের কর্মকাণ্ডের ফলাফলে তোমরা নিজেরাই ভুগবে এবং তোমাদের সতর্ক করে দেবার পর এখন আর তোমাদের কোন কাজের দায়-দায়িত্ব আমার ওপর নেই৷
১৩৭. অর্থাৎ দুনিয়ার বৃহত্তম শক্তিরও পরোয়া করো না এবং মহাপরাক্রমশালী ও দয়াময় সত্তার উপর নির্ভর করে কাজ করে যাও৷ তাঁর পরাক্রমশালী হওয়াই একথার নিশ্চয়তা বিধান করে যে, যার পেছনে তাঁর সমর্থন আছে তাকে দুনিয়ায় কেউ হেয় প্রতিপন্ন করতে পারে না৷ আর তাঁর দয়াময় হওয়া এ নিশ্চিন্ততার জন্য যথেষ্ট যে, তাঁর জন্য যে ব্যক্তি সত্যের ঝাণ্ডা বুলন্দ করার কাজে জীবন উৎসর্গ করবে তার প্রচেষ্টাকে তিনি কখনো নিষ্ফল হতে দেবেন না৷
১৩৮. উঠার অর্থ রাতে নামাযের জন্য উঠাও হতে পারে, আবার রিসালাতের দায়িত্ব পালনের জন্য উঠাও হতে পারে৷
১৩৯.  এর কয়েকটি অর্থ হতে পারে ৷ এক, আপনি যখন জামায়াতের সাথে নামায পড়ার সময় নিজের মুকতাদীদের সাথে উঠা-বসা ও রুকূ'-সিজ্দা করেন তখন আল্লাহ আপনাকে দেখতে থাকেন৷ দুই , রাতের বেলা উঠে যখন নিজের সাথিরা (যাদের বৈশিষ্ট্যসূচক গুণ হিসেবে "সিজদাকারী" শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে ) তাদের পরকাল গড়ার জন্য কেমন তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে তা দেখার উদ্দেশ্যে ঘোরাফেরা করতে থাকেন তখন আপনি আল্লাহর দৃষ্টির আড়ালে থাকেন না৷ তিন, আপনি নিজের সিজদাকারী সাথিদেরকে সংগে নিয়ে আল্লাহর বান্দাদের সংশোধন করার জন্য যেসব প্রচেষ্টা ও সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছেন আল্লাহ তা অবগত আছেন৷ চার, সিজদাকারী লোকদের দলে আপনার যাবতীয় তৎপরতা আল্লাহর নজরে আছে৷ তিনি জানেন আপনি কিভাবে তাদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন , কিভাবে ও কেমন পর্যায়ে তাদের আত্মশুদ্ধি করছেন এবং কিভাবে ভেজাল সোনাকে খাঁটি সোনায় পরিণত করেছেন৷


নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও তাঁর সাহাবায়ে কেরামের এসব গুণের উল্লেখ এখানে যে উদ্দেশ্যে করা হয়েছে তার সম্পর্কে উপরের বিষয়বস্তুর সাথেও এবং সামনের বিষয়বস্তুর সাথেও আছে৷ উপরের বিষয়বস্তুর সাথে তার সম্পর্ক হচ্ছে এই যে, তিনি প্রকৃতপক্ষে আল্লাহর রহমত ও তাঁর শক্তিশালী সমর্থনলাভের যোগ্য৷ কারন আল্লাহ কোন অন্ধ ও বধির মাবুদ নন বরং একজন চক্ষুষ্মান ও শ্রবণশক্তি সম্পন্ন শাসক৷ তাঁর পথে আপনার সংগ্রাম-সাধনা এবং সিজদাকারী সাথিদের মধ্যে আপনার তৎপরতা সবকিছু তাঁর দৃষ্টিতে আছে৷ পরবর্তী বিষয়বস্তুর সাথে এর সম্পর্ক হচ্ছে এই যে, মুহাম্মাদ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মতো যে ব্যক্তি জীবন এবং যার সাথিদের গুণাবলী মুহাম্মাদ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথিদের মতো , তার উপর শয়তান অবতীর্ণ হয় অথবা সে কবি একথা কেবলমাত্র একজন বুদ্ধিভ্রষ্ট ব্যক্তিই বলতে পারে৷ শয়তান যেসব গণকের কাছে আসে তাদের এবং কবি ও তাদের সাথি সহযোগীদের আচার আচরণ কেমন হয়ে থাকে তা কি কারো অজানা ? তোমাদের নিজেদের সমাজে এ ধরনের লোক বিপুল সংখ্যায় পাওয়া যায়৷ কোন চক্ষুষ্মান ব্যক্তি কি ঈমানদারীর সাথে একথা বলতে পারে , সে মুহাম্মাদ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও তাঁর সাথিদের জীবন এবং কবি ও গণকদের জীবনের মধ্যে কোন ফারাক দেখে না ? এখন এর চেয়ে বড় বেহায়াপনা আর কি হতে পারে যে, আল্লাহর এ বান্দাদেরকে প্রকাশ্যে কবি ও গণৎকার বলে পরিহাস করা হচ্ছে অথচ কেউ একটু লজ্জাও অনুভব করছে না৷
১৪০. এখানে গণৎকার , জ্যোতিষী , ভবিষ্যত বক্তা ,"আমলকারী" ইত্যাদি লোক , যারা ভবিষ্যতের খবর জানে বলে ভণ্ড প্রতারকের অভিনয় করে অথবা যারা দ্ব্যর্থবোধক শব্দগুচ্ছ উচ্চারণ করে মানুষের ভাগ্য গণনা করে কিংবা ধড়িবাজের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে জিন, আত্মা ও মক্কেলদের সহায়তায় মানুষের নিরসনের ব্যবসায় করে থাকে তাদের কথা বলা হয়েছে৷
১৪১. এর দু'টি অর্থ হতে পারে৷ একটি হচ্ছে , শয়তানরা কিছু শুনেটুনে নিয়ে নিজেদের চেলাদেরকে জানিয়ে দেয় এবং তাতে সামান্যতম সত্যের সাথে বিপুল পরিমাণ মিথ্যার মিশ্রণ ঘটায় ৷ দ্বিতীয় অর্থ হচ্ছে , মির্থুক-প্রতারক গণৎকাররা শয়তানের কাছ থেকে কিছু শুনে নেয় এবং তারপর তার সাথে নিজের পক্ষ থেকে অনেকটা মিথ্যা মিশিয়ে মানুষের কানে ফুঁকে দিতে থাকে৷ একটি হাদীসে এর আলোচনা এসেছে৷ হাদীসটি বুখারী শরীফে আয়েশার (রা) বর্ণনায় উদ্ধৃত হয়েছে৷ তাতে আয়েশা (রা) বলেনঃ কোন কোন লোক নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে গণকদের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করে৷ জবাবে তিনি বলেন ,ওসব কিছুই নয়৷ তারা বলে , হে আল্লাহর রসূল ! কখনো কখনো তারা তো আবার ঠিক সত্যি কথাই বলে দেয়৷ রসূলুল্লাহ (সা) বলেন, সত্যি কথাটা কখনো কখনো জিনেরা নিয়ে আসে এবং তাদের বন্ধুদের কানে ফুঁকে দেয় তারপর তারা তার সাথে নানা রকম মিথ্যার মিশ্রণ ঘটিয়ে একটি কাহিনী তৈরী করে৷
১৪২. অর্থাৎ কবিদের সাথে যারা থাকে ও চলাফেরা করে তারা মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে যাদেরকে চলাফেরা করতে তোমরা দেখছো তাদের থেকে স্বভাবে-চরিত্রে ,চলনে-বলনে , অভ্যাসে-মেজাজে সম্পূর্ণ আলাদা ৷ উভয় দলের ফারাকটা এতই সুস্পষ্ট যে, এক নজর দেখার পর যে কোন ব্যক্তি উভয় দলের কোনটি কেমন তা চিহ্নিত করতে পারে৷ একদিকে আছে একান্ত ধীর-স্থির ও শান্ত শিষ্ঠ আচরণ , ভদ্র ও মার্জিত রুচি এবং সততা , ন্যায়পরায়ণতা ও আল্লাহভীতি ৷ প্রতিটি কথায় ও কাজে আছে দায়িত্বশীলতার অনুভূতি৷ আচার-ব্যবহারে মানুষের অধিকারের প্রতি সজাগ দৃষ্টি৷ লেনদেনে চূড়ান্ত পর্যায়ের আমানতদারী ও বিশ্বস্ততা ৷ কথা যখনই বলা হয় শুধুমাত্র কল্যাণ ও ন্যায়ের জন্যই বলা হয় , অকল্যাণ বা অন্যায়ের একটি শব্দও কখনো উচ্চারিত হয় না৷ সবচেয়ে বড় কথা,এদেরকে দেখে পরিষ্কার জানা যায়, এদের সামনে রয়েছে একটি উন্নত ও পবিত্র উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য , এ উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য অর্জনের নেশায় এরা রাতদিন সংগ্রাম করে চলেছে এবং এদের সমগ্র জীবন একটি উদ্দেশ্যে উৎসর্গীত হয়েছে৷ অন্যদিকে অবস্থা হচ্ছে এই যে, সেখানে কোথাও প্রেম চর্চা ও শরাব পানের বিষয় আলোচিত হচ্ছে এবং শ্রোতাবর্গ লাফিয়ে লাফিয়ে তাতে বাহবা দিচ্ছে ৷ কোথাও কোন দেহপশারিণী অথবা কোন পুরনারী বা গৃহ-ললনার সৌন্দর্যের আলোচনা চলছে এবং শ্রোতারা খুব স্বাদ নিয়ে নিয়ে তা শুনছে "কোথাও অশ্লীল কাহিনী বর্ণনা করা হচ্ছে এবং সমগ্র সমাবেশের উপর যৌন কামনার প্রেত চড়াও হয়ে বসেছে৷ কোথাও মিথ্যা ও ভাঁড়ামির আসর বসেছে এবং সমগ্র মাহফিল ঠাট্টা-তামাশায় মশগুল হয়ে গেছে৷ কোথাও কারোর দুর্নাম গাওয়া ও নিন্দাবাদ করা হচ্ছে এবং লোকেরা তাতে বেশ মজা পাচ্ছে৷ কোথাও কারো অযথা প্রশংসা করা হচ্ছে এবং শাবাশ ও বাহবা দিয়ে তাকে আরো উসকিয়ে দেয়া হচ্ছে৷ আবার কোথাও কারো বিরুদ্ধে শত্রুতা ও প্রতিশোধের আগুন জ্বালিয়ে দেয়া হচ্ছে এবং তা শুনে মানুষের মনে আগুন লেগে যাচ্ছে৷ এসব মজলিসে কবির কবিতা শোনার জন্য যে বিপুল সংখ্যক লোক জমায়েত হয় এবং বড় বড় কবিদের পেছনে যেসব লোক ঘুরে বেড়ায় তাদেরকে দেখে কোন ব্যক্তি একথা অনুভব না করে থাকতে পারে না যে, এরা হচ্ছে নৈতিকতার বন্ধনমুক্ত, আবেগ ও কামনার স্রোতে ভেসে চলা এবং ভোগ ও পাপ-পংকিলতার পূজারী অর্ধ-পাশবিক একটি নরগোষ্ঠি দুনিয়ায় মানুষের যে কোন উন্নত জীবনাদর্শ ও লক্ষ্যও থাকতে পারে এ চিন্তা কখনো এদের মন-মগজ স্পর্শও করতে পারে না৷ এ দু'দলের সুস্পষ্ট পার্থক্য ও ফারাক যদি কারো নজরে না পড়ে তাহলে সে অন্ধ৷ আর যদি সবকিছু দেখার পরও কোন ব্যক্তি নিছক সত্যকে হেয় প্রতিপন্ন করার জন্য ঈমানকে বেমালুম হজম করে একথা বলতে থাকে যে মুহাম্মাদ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং তাঁর আশেপাশে যারা সমবেত হয়েছে তারা কবি ও কবিদের সাংগোপাংগদের মতো , তাহলে নিশ্চিতভাবে বলা যায় যে ,তারা মিথ্যা বলার ক্ষেত্রে নির্লজ্জতার সমস্ত সীমা অতিক্রম করে গেছে৷
১৪৩. "অর্থাৎ তাদের নিজস্ব চিন্তার ও বাকশক্তি ব্যবহার করার কোন একটি নির্ধারিত পথ নেই৷ বরং চিন্তার পাগলা ঘোড়া বল্গাহারা অশ্বের মতো পথে বিপথে মাঠে ঘাটে সর্বত্র উদভ্রান্তের মতো ছুটে বেড়ায়৷ আবেগ, কামনা-বাসনা বা স্বার্থের প্রতিটি নতুন ধারা তাদের কণ্ঠ থেকে একটি নতুন বিষয়ের রূপে আবির্ভূত হয়৷ চিন্তা ও বর্ণনা করার সময় এগুলো সত্য ও ন্যায়সংগত কিনা সেদিকে দৃষ্টি রাখার কোন প্রয়োজনই অনুভব করা হয় না৷ কখনো একটি তরংগ জাগে , তখন তার স্বপক্ষে জ্ঞান ও নীতিকথার ফুলঝুরি ছড়িয়ে দেয়া হয়৷ আবার কখনো দ্বিতীয় তরংগ জাগে ,সেই একই কণ্ঠ থেকে এবার একেবারেই পুতিগন্ধময় নীচ, হীন ও নিম্নমুখী আবেগ উৎসারিত হতে থাকে৷ কখনো কারোর প্রতি সন্তুষ্ট হলে তাকে আকাশে চড়িয়ে দেয়া হয় আবার কখনো নারাজ হলে সেই একই ব্যক্তিকেই পাতালের গভীর গর্ভে ঠেলে দেয়া হয়৷ আল্লাহ বিশ্বাস ও নাস্তিক্যবাদ, বস্তুবাদিতা ও আধ্যাত্মিকতা , সদাচার ও অসদাচার, পবিত্রতা-পরিচ্ছন্নতা ও অপবিত্রতা-অপরিচ্ছন্নতা , গাম্ভীর্য ও হাস্য-কৌতুক এবং প্রশংসা ও নিন্দাবাদ সবকিছুর একই কবির একই কাব্যে পাশাপাশি দেখা যাবে৷ কবিদের এ পরিচিত বৈশিষ্ট্য যারা জানে তারা কেমন করে এ কুরআনের বাহককে কবিত্বের অভিযোগে অভিযুক্ত করতে পারে ? কারণ তাঁর ভাষণ মাপাজোকা , তাঁর বক্তব্য দ্ব্যর্থহীন ,তাঁর পথ একেবারে সুস্পষ্ট ও নির্ধারিত এবং সত্য , সততা ন্যায় ও কল্যাণের দিকে আহ্বান করা ছাড়া তাঁর কণ্ঠ থেকে অন্য কোন কথাই বের হয়নি৷ কুরআন মজীদের অন্য এক জায়গায় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সম্পর্কে বলা হয়েছে , কবিত্বের সাথে তাঁর প্রকৃতি ও মেজাজের আদৌ কোন সম্পর্ক নেইঃ

----------------------------------------

""আমি তাকে কবিতা শিখাইনি এবং এটা তার করার মতো কাজও নয়৷"" (ইয়াসিন, ৬৯)

এটি এমন একটি সত্য ছিল , যারা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে ব্যক্তিগতভাবে জানতেন তাঁরা সবাই একথা জানতেন৷ নির্ভরযোগ্য হাদীসে বলা হয়েছে: কোন একটি কবিতাও নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্রামের মুখস্থ ছিল না৷ কথাবার্তার মাঝখানে কোন কবির ভালো কবিতার চরণ তাঁর মুখে এলেও তা অনুপযোগীভাবে পড়ে যেতেন অথবা তার মধ্যে শব্দের হেরফের হয়ে যেতো৷ হযরত হাসান বাসরী বলেন, একবার ভাষণের মাঝখানে তিনি এক কবিতার চরণ এভাবে পড়লেন:

.....................................

হযরত আবু বকর (রা) বললেন, হে আল্লাহর রসূল! চরণটি হবে এ রকম,

..........................

একবার তিনি আব্বাস ইবনে মিরদাস সুলামীকে জিজ্ঞেস করলেন, এ কবিতাটা কি তোমার:

.......................

আব্বাস বললেন, শেষ বাক্যাংশটি ওভাবে নয়, বরং এভাবে হবে: ..................একথায় রসূলুল্লাহ (সা) বললেন, কিন্তু অর্থ তো উভয়ের এক৷

হযরত আয়েশাকে (রা) জিজ্ঞেস করা হয়, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কি কখনো নিজের ভাষণের মধ্যে কবিতা ব্যবহার করতেন? তিনি বলেন, কবিতার চেয়ে বেশী তিনি কোন জিনিসকে ঘৃণা করতেন না৷ তবে কখনো কখনো তিনি বনী কায়েসের কবিতা পড়তেন৷ কিন্তু প্রথমটা শেষে এবং শেষেরটা প্রথম দিকে পড়ে ফেলতেন৷ হযরত আবু বকর (রা) বলতেন, হে আল্লাহর রসূল! এভাবে নয় বরং এভাবে ৷ তখন তিনি বলতেন, "আমি কবি নই এবং কবিতা পাঠ করা আমার কাজ নয়৷ " আরবের কবিতা অংগনে যে ধরনের বিষয়বস্তুর সমাবেশ ঘটেছিল তা ছিল যৌন আবেদন ও অবৈধ প্রেমচর্চা অথবা শরাব পান কিংবা গোত্রীয় ঘৃণা, বিদ্বেষ ও যুদ্ধবিগ্রহ বা বংশীয় ও বর্ণগত অহংকার৷ কল্যাণ ও সুকৃতির কথার স্থান সেখানে অতি অল্পই ছিল৷ এ ছাড়া মিথ্যা, অতিরঞ্জন, অপবাদ, নিন্দাবাদ, অযথা প্রশংসা, আত্মগর্ব, তিরস্কার, দোষারোপ, পরিহাস ও মুশরিকী অশ্লীল পৌরনিকতা তো এ কাব্যধারার শিরায় শিরায় প্রবাহিত ছিল৷ তাই এ কাব্য সাহিত্য সম্পর্কে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের রায় ছিল:

...................................................

"তোমাদের কারো পেটে পুঁজে ভরা থাকা কবিতায় ভরা থাকার চেয়ে ভালো৷ তবুও যে কবিতায় কোন ভালো কথা থাকতো তিনি তার প্রশংসা করতেন৷" তাঁর উক্তি ছিল : ........................... "তার কবিতা মু'মিন কিন্তু অন্তর কাফের৷ " একবার একজন সাহাবী একশোটা ভালো ভালো কবিতা তাঁকে শুনান এবং তিনি বলে যেতে থাকলে বলেন:.......... অর্থাৎ "আরো শুনাও৷"

১৪৪. এটি হচ্ছে কবিদের আরেকটি বৈশিষ্ট্য ৷ এটি ছিল নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কর্মধারার সম্পূর্ণ বিপরীত৷ নবী (সা) সম্পর্কে তাঁর প্রত্যেক পরিচিত জন জানতেন , তিনি যা বলতেন তাই করতেন এবং যা করতেন তাই বলতেন৷ তাঁর কথা ও কর্মের সামঞ্জস্য এমনই একটি জাজ্বল্যমান সত্য ছিল যা তাঁর আশেপাশের সমাজের কেউ অস্বীকার করতে পারতো না৷ অথচ সাধারণ কবিদের সম্পর্কে সবাই জানতো যে, তারা বলতেন এক কথা এবং করতেন অন্য কিছু ৷ তাদের কবিতায় দানশীলতার মাহাত্ম এমন উচ্চ কণ্ঠে প্রচারিত হবে যেন মনে হবে তাদের চেয়ে বড় আর কোন দাতা নেই৷ কিন্তু তাদের কাজ দেখলে বুঝা যাবে তারা বড়ই কৃপণ৷ বীরত্বের কথা তারা বলবেন কিন্তু নিজেরা হবেন কাপুরুষ৷ অমুখাপেক্ষিতা, অল্পে তুষ্টি ও আত্মমর্যাদাবোধ হবে তাদের কবিতার বিষয়বস্তু কিন্তু নিজেরা লোভ , লালসা ও আত্ম বিক্রয়ের শেষ সীমানাও পার হয়ে যাবেন৷ অন্যের সামান্যতম দুর্বলতাকেও কঠোরভাবে পাকড়াও করবেন কিন্তু নিজেরা চরম দুর্বলতার মধ্যে হাবুডুবু খাবেন৷
১৪৫. উপরে সাধারণভাবে কবিদের প্রতি যে নিন্দাবাদ উচ্চারিত হয়েছে তা থেকে এমন সব কবিদেরকে এখানে আলাদা করা হয়েছে যাদের মধ্যে রয়েছে চারটি বৈশিষ্ট্য৷

একঃ যারা মু'মিন অর্থাৎ আল্লাহ , তাঁর রসূল ও তাঁর কিতাবগুলো যারা মানেন এবং আখেরাত বিশ্বাস করেন৷

দুইঃ নিজেদের কর্মজীবনে যারা সৎ , যারা ফাসেক , দুষ্কৃতিকারী ও বদকার নন৷ নৈতিকতার বাঁধন মুক্ত হয়ে যারা নির্বুদ্ধিতার পরিচয় না দেন৷

তিনঃ আল্লাহকে যারা বেশী বেশী করে স্মরণ করেন নিজেদের সাধারণ অবস্থায় , সাধারণ সময়ে এবং নিজেদের রচনায়ও৷ তাদের ব্যক্তি জীবনে আল্লাহভীতি ও আল্লাহর আনুগত্য রয়েছে কিন্তু তাদের কবিতা পাপ-পংকিলতা , লালসা , কামনা রসে পরিপূর্ণ , এমন যেন না হয়৷ আবার এমনও যেন না হয় , কবিতায় বড়ই প্রজ্ঞা ও গভীর তত্ত্বকথা আওড়ানো হচ্ছে কিন্তু ব্যক্তি জীবনে আল্লাহর স্মরণের কোন চিহ্ন নেই৷ আসলে এ দু'টি অবস্থা সমানভাবে নিন্দনীয় ৷ তিনিই একজন পছন্দনীয় কবি যার ব্যক্তিজীবন যেমন আল্লাহর স্মরণে পরিপূর্ণ তেমনি নিজের সমগ্র কাব্য প্রতিভাও এমন পথে উৎসর্গীকৃত যা আল্লাহ থেকে গাফিল লোকদের নয় বরং যারা আল্লাহকে জানে, আল্লাহকে ভালোবাসে ও আল্লাহর আনুগত্য করে তাদের পথ৷

চতুর্থ বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করা হয়েছে এমন সব ব্যতিক্রমধর্মী কবিদের যারা নিজেদের ব্যক্তিগত স্বার্থে কারোর নিন্দা করে না এবং ব্যক্তিগত, বংশীয় বা গোত্রীয় বিদ্বেষে উদ্বুদ্ধ হয়ে প্রতিশোধের আগুন জ্বালায় না৷ কিন্তু যখন জালেমের মোকাবিলায় সত্যের প্রতি সমর্থন দানের প্রয়োজন দেখা দেয় তখন তার কণ্ঠকে সেই একই কাজে ব্যবহার করে যে কাজে একজন মুজাহিদ তার তীর ও তরবারিকে ব্যবহার করে৷ সবসময় আবেদন নিবেদন করতেই থাকা এবং বিনীতভাবে আর্জি পেশ করেই যাওয়া মু'মিনের রীতি নয়৷এ সম্পর্কেই হাদীসে বলা হয়েছে , কাফের ও মুশরিক কবিরা ইসলাম ও নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বিরুদ্ধে অভিযোগ ,দোষারোপ , অপবাদের যে তাণ্ডব সৃষ্টি করতো এবং ঘৃণা ও বিদ্বেষের যে বিষ ছড়াতো তার জবাব দেবার জন্য নবী (সা) নিজে ইসলামী কবিদেরকে উদ্বুদ্ধ করতেন ও সাহস যোগাতেন ৷ তাই তিনি কা'ব ইবনে মালেককে (রা) বলেনঃ

-------------------------------------------

"ওদের নিন্দা করো , কারণ সেই আল্লাহর কসম , যার হাতের মুঠোয় আমার প্রাণ আবদ্ধ, তোমার কবিতা ওদের জন্য তীরের চেয়েও বেশী তীক্ষ্ন ও ধারালো৷"

হাসসান ইবনে সাবেত রাদিয়াল্লাহু আনহুকে বলেনঃ

---------------------------

"তাদের মিথ্যাচারের জবাব দাও এবং জিব্রীল তোমার সঙ্গে আছে৷" এবং "বলো এবং পবিত্র আত্মা তোমার সংগে আছে৷

তাঁর উক্তি ছিলঃ

---------------------------------

"মু'মিন তলোয়ার দিয়েও লড়াই করে এবং কণ্ঠ দিয়েও৷"

১৪৬. জুলুমকারী বলতে এখানে এমনসব লোকদের কথা বুঝানো হয়েছে যারা সত্যকে খাটো ও হেয় প্রতিপন্ন করার জন্য সম্পূর্ণ হঠকারীতার পথ অবলম্বন করে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের উপর কবি, গণক ,যাদুকর ও পাগল হবার অপবাদ দিয়ে বেড়াতো ৷ এ ধরনের অপবাদ দেবার পেছনে তাদের উদ্দেশ্য ছিল , যারা তাঁর সম্পর্কে জানে না তাঁর দাওয়াত সম্পর্কে তাদের মনে কু-ধারণা সৃষ্টি করা এবং তাঁর শিক্ষার প্রতি যাতে তারা আকৃষ্ট না হয় সে ব্যবস্থা করা৷