(২৬:১৭৬) আইকাবাসীরা রাসূলদের প্রতি মিথ্যারোপ করলো৷১১৫
(২৬:১৭৭) যখন শো’আইব তাদেরকে বলেছিল, “তোমরা কি ভয় করো না?
(২৬:১৭৮) আমি তোমাদের জন্য একজন আমানতদার রসূল৷
(২৬:১৭৯) কাজেই তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং আমার আনুগত্য করো৷
(২৬:১৮০) আমি এ কাজে তোমাদের কাছ থেকে কোন প্রতিদান প্রতাশী নই৷ আমার প্রতিদান দেবার দায়িত্ব তো রব্বুল আলামীনের৷
(২৬:১৮১) তোমরা মাপ পূর্ণ করে দাও এবং কাউকে কম দিয়ে না৷
(২৬:১৮২) সঠিক পাল্লায় ওজন করো
(২৬:১৮৩) এবং লোকদেরকে তাদের জিনিস কম দিয়ো না৷ যমীনে বিপর্যয় ছড়িয়ে বেড়িয়ো না
(২৬:১৮৪) এবং সেই সত্ত্বাকে ভয় করো যিনি তোমাদের ও অতীতের প্রজন্মকে সৃষ্টি করেছেন৷”
(২৬:১৮৫) তারা বললো, “তুমি নিছক একজন যাদুগ্রস্থ ব্যক্তি
(২৬:১৮৬) এবং তুমি আমাদের মতো মানুষ ছাড়া আর কিছুই নও৷ আর আমরা তো তোমাকে একেবারেই মিথ্যুক মনে করি৷
(২৬:১৮৭) যদি তুমি সত্যবাদী হও তাহলে আকাশের একটি টুকরো ভেঙ্গে আমাদের ওপর ফেলে দাও৷”
(২৬:১৮৮) শো’আইব বললো, আমার রব জানেন তোমরা যা কিছু করছো৷” ১১৬
(২৬:১৮৯) তারা তাঁকে প্রত্যাখ্যান করলো৷ শেষ পর্যন্ত ছাতার দিনের আযাব তাদের ওপর এসে পড়ল ১১৭ এবং তা ছিল বড়ই ভয়াবহ দিনের আযাব৷
(২৬:১৯০) নিশ্চিতভাবেই এর মধ্যে রয়েছে একটি নিদর্শন৷ কিন্তু তাদের অধিকাংশ মান্যকারী নয়৷
(২৬:১৯১) আর প্রকৃতপক্ষে তোমার রব পরাক্রমশালী এবং দয়াময়ও৷
১১৫. আইকাবাসীদের সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত আলোচনা ইতিপূর্বে সূরা আল হিজরের ৭৮-৮৪ আয়াতে করা হয়েছে৷ এখানে করা হচ্ছে তার বিস্তারিত আলোচনা৷ মাদ্য়ান ও আইকাবাসীরা দু'টি আলাদা জাতি অথবা একটি জাতির পৃথক নাম, এ ব্যাপারে মুফাসসিরগণের মধ্যে মতভেদ দেখা যায়৷ একদল মনে করেন, তারা দুটি পৃথক জাতি৷ এজন্য তাদের সবচেয়ে বড় যুক্তি হচ্ছে, সূরা আ'রাফে হযরত শো'আইবকে মাদ্য়ানবাসীদের ভাই বলা হয়েছেঃ (والى مدين اخاهم شعيبًا) আর এখানে আইকাবাসীদের উল্লেখ করতে গিয়ে শুধুমাত্র বলা হয়েছে اِذْ قَال لهم شعيب (যখন শু'আইব তাদেরকে বললো)৷ এখানে তাদের ভাই (اخوهم) শব্দ ব্যবহার করা হয়নি৷ পক্ষান্তরে কোন কোন মুফাসসির উভয়কে একই জাতি গণ্য করেছেন৷ কারণ, সূরা আ'রাফ ও সূরা হূদে মাদ্য়ানবাসীদের যেসব রোগ ও গুণাবলীর কথা বলা হয়েছে এখানে আইকাবাসীদের যেসব রোগ ও গুণাবলীর কথা বলা হয়েছে ৷হযরত শো'আইবের দাওয়াত ও উপদেশও একই এবং শেষে তাদের পরিণতির মধ্যেও কোন ফারাক নেই৷

গবেষণা ও অনুসন্ধানের মাধ্যমে জানা যায়, এ দু'টি উক্তি মূলতঃ সঠিক৷ সন্দেহাতীতভাবে মাদ্য়ানবাসী ও আইকাবাসীরা দু'টি আলাদা গোত্র৷ কিন্তু মূলত তারা একই বংশধারার দু'টি পৃথক শাখা৷ হযরত ইব্রাহীম আলাইহিস সালামের স্ত্রী বা দাসী কাতুরার গর্ভজাত সন্তানরা আরব ও ইসরাঈলী ইতিহাসে বনী কাতুরা নামে পরিচিত৷ এদের একটি গোত্র সবচেয়ে বেশী খ্যাতি লাভ করে৷ মাদ্য়ান ইবনে ইব্রাহীমের বংশোদ্ভূত হবার ফলে তাদেরকে মাদ্য়ানী বা মাদ্য়ানবাসী বলা হয়৷ এদের বসতি উত্তর হেজায থেকে ফিলিস্তীনের দক্ষিণ পর্যন্ত এবং সেখান থেকে সিনাই বদ্বীপের শেষ কিনারা পর্যন্ত লোহিত সাগর ও আকাবা উপসাগরের পশ্চিম উপকূল এলাকায় বিস্তৃত হয়৷ এর কেন্দ্রস্থল ছিল মাদ্য়ান শহর৷ আবুল ফিদার মতে এটি আকাবা উপসাগরের উপকূলে আইলা (বর্তমান আকাবা) থেকে পাঁচ দিনের দুরত্বে অবস্থিত৷ বনী কাতুরার অন্যান্য গোত্রের মধ্যে বনী দীদান (dedanties) তুলনামূলকভাবে বেশী পরিচিত৷ উত্তর আরবে তাইমা, তাবুক ও আলা'উলার মাঝামাঝি স্থানে তারা বসতি গড়ে৷ তাদের কেন্দ্রীয় স্থান ছিল তাবুক৷ প্রাচীনকালে একে আইকা বলা হতো৷ (মু'জামুল বুলদান গ্রন্থে ইয়াকূত আইকা শব্দের আলোচনায় বলেছেন, এটি তাবুকের পুরাতন নাম এবং তাবুকবাসীদের মধ্যে একথা ব্যাপকভাবে প্রচলিত ছিল যে, এ স্থানটিই এক সময় আইকা নামে পরিচিত ছিল৷)

মাদ্য়ানবাসী ও আইকাবাসীদের জন্য একজন রসূল পাঠাবার কারণ সম্ভবত এছিল যে, তারা একই বংশধারার সাথে সম্পর্কিত ছিল, একই ভাষায় কথা বলতো এবং তাদের এলাকাও পরস্পরের সাথে সংযুক্ত ছিল৷ বরং বিচিত্র নয়; কোন কোন এলাকায় তাদের বসতি একই সংগে গড়ে উঠেছিল এবং তাদের পরস্পরের মধ্যে বৈবাহিক সম্পর্কও স্থাপিত হয়ে সমাজে তারা মিশ্রিত হয়ে গিয়েছিল৷ তাছাড়া বনী কাতুরার এ দু'শাখার লোকদের পেশাও ছিল ব্যবসা৷ তাদের মধ্যে একই ধরণের ব্যবসায়িক অসততা এবং ধর্মীয় ও চারিত্রিক দোষ পাওয়া যেত৷ বাইবেলের প্রথম দিকের পুস্তকগুলোতে বিভিন্ন জায়গায় এ আলোচনা পাওয়া যায় যে, এরা বা'লে ফুগূরের পূজা করতো৷ বনী ইসরাঈল যখন মিসর থেকে বের হয়ে এদের এলাকায় আসে তখন তাদের মধ্যেও এরা শিরক ও ব্যভিচারের রোগ ছড়িয়ে দেয়৷ (গণনা পুস্তক ২৫:১-৫ এবং ৩১:১৬-১৭) তাছাড়া দু'টি বড় বড় আন্তর্জাতিক বাণিজ্য পথের ওপর এদের বসতি গড়ে উঠেছিল৷ এপথ দু'টি ইয়ামন থেকে সিরিয়া এবং পারস্য উপসাগর থেকে মিসরের দিকে চলে গিয়েছিল৷ এ দু'টি রাজপথের ধারে বসতি হবার কারণে এদের লুটতরাজ ও রাহাজানির কারবার ছিল খুবই রমরমা৷ অন্যসব জাতির বাণিজ্য কাফেলাকে বিপুল পরিমাণ কর না দিয়ে তারা এ এলাকা অতিক্রম করতে দিতো না৷ নিজেরা আন্তর্জাতিক পথ দখল করে রাখার ফলে পথের শান্তি ও নিরাপত্তা বিঘ্নিত করে রেখেছিল৷ কুরআন মজীতে তাদের এ অবস্থানকে এভাবে বর্ণনা করা হয়েছেঃ انَّهمَا لبِامَامٍ مُّبِيْنٍ "এ জাতি দু'টি (লূতের জাতি ও আইকাবাসী) প্রকাশ্য রাজপথের ওপর বসবাস করতো৷" এদের রাহাজানির কথা সূরা আ'রাফে এভাবে বলা হয়েছেঃ ولا تقعدوا بكُلِّ صراطٍ تُوْعدَوْنَ "আর প্রত্যেক পথের ওপর লোকদেরকে ভয় দেখাবার জন্য বসে যেয়ো না৷" এ সমস্ত কারণে আল্লাহ এ উভয় সম্প্রদায়ের জন্য একই নবী পাঠিয়েছিলেন এবং তাদেরকে একই ধরণের শিক্ষা দিয়েছিলেন৷

হযরত শো'আইব ও মাদ্য়ানবাসীদের কাহিনী বিস্তারিত জানার জন্য পড়ুন আল আ'রাফের ৮৫-৯৩, হূদের ৮৪-৯৫ এবং আল আনকাবুতের ৩৬-৩৭ আয়াত৷

১১৬. অর্থাৎ আযাব নাযিল করা আমার কাজ নয়৷ এটা তো আল্লাহ রব্বুল আলামীনের ক্ষমতার অন্তর্ভুক্ত এবং তিনি তোমাদের কার্যকলাপ দেখছেন৷ যদি তিনি তোমাদেরকে এ আযাবের উপযুক্ত মনে করেন তাহলে তিনি নিজেই আযাব পাঠাবেন৷ আইকাবাসীদের এ দাবী ও শো'আইবের এ জবাবের মধ্যে কুরাইশ বংশীয় কাফেরদের জন্য একটি সতর্কবাণী ছিল ৷ অর্থাৎ তারাও রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে এ একই দাবী করছিলঃ


--------------------------------------

"অথবা ফেলে দাও আমাদের উপর আকাশের একটি টুকরা যেমন তুমি দাবী করছো"৷ (বনী ইসরাঈলঃ ৯২)

তাই তাদেরকে বলা হচ্ছে , এ ধরনের দাবী আইকাবাসীরাও তাদের নবীর কাছে করেছিল , তার যে জবাব তারা পেয়েছিল মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পক্ষ থেকে তোমাদের দাবীর জন্যও রয়েছে সেই একই জবাব৷
১১৭. এ আযাবের কোন বিস্তারিত বিবরণ কুরআন মজীদে বা কোন সহীহ হাদীসে উল্লেখিত হয়নি৷ শব্দের বাহ্যিক অর্থ থেকে যা বুঝা যায় তা হচ্ছে এই যে, তারা যেহেতু আসমানী আযাব চেয়েছিল তাই আল্লাহ তাদের ওপর পাঠিয়ে দিলেন একটি মেঘমালা৷ এ মেঘমালাটি আযাবের বৃষ্টি বর্ষণ করে তাদেরকে পুরোপুরি ধ্বংস করে না দেয়া পর্যন্ত ছাতার মত তাদের ওপর ছেয়ে রইলো৷ কুরআন থেকে একথা পরিষ্কারভাবে জানা যায় যে, মাদ্য়ানবাসীদের আযাবের ধরণ আইকাবাসীদের আযাব থেকে আলাদা ছিল৷ যেমন এখানে বলা হয়েছে এরা ছাতার দিনের আযাবে ধ্বংস হয়েছিল৷ আর তাদের ওপর আযাব এসেছিল একটি বিষ্ফোরণ ও ভূমিকম্পের মাধ্যমে৷

فاخذتهم الرَّجفة فاصبحوا فى دارهم جاثمينَ এবং وَاخذَتِ الَّذين ظلموا الصَّيحة فاصبحوا فى دارهم جاثمينَ

তাই উভয় সম্প্রদায়কে মিলিয়ে একটি কাহিনী বানিয়ে দেবার চেষ্টা করা ঠিক নয়৷ কোন কোন তাফসীরকার "ছাতার দিনের আযাব"-এর কিছু ব্যাখ্যা দিয়েছেন৷ কিন্তু তাদের এসব তথ্যের উৎস আমাদের জানা নেই৷ ইবনে জারীর হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাসের এ উক্তি উদ্ধৃত করেছেনঃ

من حدَّثَكَ من العلماء ما عذَاب يَونِ الظُّلَّةِ فَكَذِّبْهُ-

"আলেমদের মধ্য থেকে যে ব্যক্তিই ছাতার দিনের আযাব কি ছিল সে সম্পর্কে তোমাকে কোন তথ্য জানাবে, তা সঠিক বলে মেনে নিয়ো না৷"