(২৬:১) তা-সীন-মীম৷
(২৬:২) এগুলো সুস্পষ্ট কিতাবের আয়াত৷
(২৬:৩) হে মুহাম্মাদ! এ লোকেরা ঈমান আনছে না বলে তুমি যেন দুঃখে নিজের প্রাণ বিনষ্ট করে দিতে বসেছ৷
(২৬:৪) আমি চাইলে আকাশ থেকে এমন নিদর্শন অবতীর্ণ করতে পারতাম যার ফলে তাদের ঘাড় তার সামনে নত হয়ে যেতো৷
(২৬:৫) তাদের কাছে দয়াময়ের পক্ষ থেকে যে নতুন নসীহতই আসে, তা থেকে তারা মুখ ফিরিয়ে নেয়৷
(২৬:৬) এখন যখন তারা মিথ্যা আরোপ করেছে৷ তখন তারা যে জিনিসের প্রতি বিদ্রূপ করে চলেছে, অচিরেই তার প্রকৃত স্বরূপ (বিভিন্ন পদ্ধতিতে) তারা অবগত হবে৷
(২৬:৭) আর তারা কি কখনো পৃথিবীর প্রতি দৃষ্টিপাত করেনি? আমি কত রকমের কত বিপুল পরিমাণ উৎকৃষ্ট উদ্ভিদ তার মধ্যে সৃষ্টি করেছি?
(২৬:৮) নিশ্চয়ই তার মধ্যে একটি নিদর্শন রয়েছে, কিন্তু তাদের অধিকাংশই মু'মিন নয়৷
(২৬:৯) আর যথার্থই তোমার রব পরাক্রান্ত এবং অনুগ্রহশীলও৷
১. অর্থাৎ এ সূরার যে আয়াতগুলো পেশ করা হচ্ছে এগুলো এমন একটি কিতাবের আয়াত যা তার বক্তব্য পরিষ্কার ও দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বর্ণনা করেছে৷ এগুলো পড়ে বা শুনে যে কোন ব্যক্তি বুঝতে পারে এগুলো কোন জিনিসের দিকে আহ্বান জানাচ্ছে, কোন জিনিস থেকে বিরত রাখছে, কাকে সত্য বলছে এবং কাকে মিথ্যা গণ্য করছে৷ মেনে নেয়া বা না মেনে নেয়া আলাদা কথা কিন্তু এর শিক্ষা বুঝা যায়নি এবং এ কিতাব কি ত্যাগ করার এবং কি গ্রহণ করার আহ্বান জানাচ্ছে এ থেকে তা জানতেই পারা যায়নি এমন কথা বলার অবকাশ কোন ব্যক্তির নেই৷

কুরআনকে "আল কিতাবুল মুবীন" বা সুস্পষ্ট কিতাব বলার আরো একটি অর্থও আছে৷ সেটি হচ্ছে , এটি যে আল্লাহর কিতাব সে ব্যাপারটি সুস্পষ্ট ও সর্বজনবিদিত ৷ এর ভাষা , বর্ণনা , বিষয়বস্তু এবং এর উপস্থাপিত সত্য ও এর নাযিল হবার অবস্থা সবকিছু পরিষ্কার বলে দিচ্ছে এটি বিশ্ব-জগতের প্রভুরই কিতাব ৷ এদিক দিয়ে বিচার করলে এ কিতাবের প্রত্যেকটি বাক্যই একটি নিদর্শন ও মু'জিযা ৷ কোন ব্যক্তি নিজের বুদ্ধি-বিবেক ব্যবহার করলে তার মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নবুওয়াতে বিশ্বাস স্থাপন করার জন্য পৃথক কোন নিদর্শনের প্রয়োজনই হয় না৷ সুস্পষ্ট কিতাবের এ "আয়াত" তথা নিদর্শন তাকে নিশ্চিন্ত করার জন্য যথেষ্ট৷

সামনের দিকে এ সূরায় যে বিষয়বস্তুর অবতারণা করা হয়েছে এ ছোট্ট প্রারম্ভিক বাক্যটি নিজের দ্বিবিধ অর্থের দৃষ্টিতে তার সাথে পুরোপুরি সম্পর্ক রাখে৷ মক্কার কাফেররা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে মু'জিযার দাবী জানাচ্ছিল ৷ তাদের বক্তব্য ছিল , এ মু'জিযা দেখে তিনি যে সত্যিই আল্লাহর পক্ষ থেকে এ পয়গাম এনেছেন সে ব্যাপারে তারা নিশ্চিন্ত হয়ে যেতে পারবে৷ বলা হয়েছে , সত্যিই যদি ঈমান আনার জন্য কেউ নিদর্শনের দাবী করে থাকে, তাহলে তো "কিতাবুল মুবীন" তথা সুস্পষ্ট কিতাবের এ আয়াতগুলোই সে জন্য যথেষ্ট৷ অনুরূপভাবে কাফেররা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বিরুদ্ধে দোষারোপ করতো এ মর্মে যে , তিনি কবি বা গণক ৷ বলা হয়েছে , এ কিতাবটি তো কোন হেঁয়ালী বা ধাঁধা নয়৷ কিতাবটি পরিষ্কারভাবে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় নিজের শিক্ষা পেশ করছে৷ নিজেই দেখে নাও, এ শিক্ষা কি কোন কবি বা গণকের হতে পারে ? (তারা তো সচরাচর হেঁয়ালীপূর্ণ কথা বলতে অভ্যস্ত)
২. কুরআন মজীদের বিভিন্ন স্থানে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের এ অবস্থার উল্লেখ করা হয়েছে৷ যেমন সূরা কাহফে বলা হয়েছেঃ

-------------------------------------------------------------------------------

"এরা এ শিক্ষা প্রতি ঈমান না আনলে সম্ভবত তুমি এদের পেছনে ঘুরতে ঘুরতে ও আক্ষেপ করতে করতে মারা যাবে ৷" (৬ আয়াত)

আবার সূরা ফাতের-এ বলা হয়েছেঃ------------------- "তাদের অবস্থার প্রতি দুঃখ ও আক্ষেপ করে যেন তোমার প্রাণ ধ্বংস না হয়ে যায়৷" (৮ আয়াত) এ থেকে সে যুগে নিজের জাতির পথভ্রষ্টতা, তার নৈতিক অবক্ষয় ও গোয়ার্তুমি শুধরানোর জন্য তাঁর সকল প্রচেষ্টার প্রবল বিরোধিতা দেখে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কেমন হৃদয়বিদারক ও কষ্টকর অবস্থায় তাঁর দিবারাত্র অতিবাহিত করতেন তা আন্দাজ করা যায় ...... শব্দের প্রকৃত অর্থ হচ্ছে , পুরোপুরি জবেহ করা৷ ......... এর আভিধানিক অর্থ হয় , তুমি নিজেই নিজেকে হত্যা করে ফেলছো৷
৩. অর্থাৎ এমন কোন নিদর্শন অবতীর্ণ করা যার ফলে সমগ্র কাফেরকুল ঈমান ও আনুগত্যের নীতি অবলম্বন করতে বাধ্য হয় , এটা আল্লাহর জন্য কোন কঠিন ব্যাপার ছিল না ৷ যদি তিনি এমনটি না করে থাকেন তাহলে তার কারণ এ নয় যে, এ কাজটি তাঁর শক্তির বাইরে বরং এর কারণ হচ্ছে , এভাবে জোরপূর্বক ঈমান আদায় করে নিতে তিনি চান না৷ তিনি চান লোকেরা বুদ্ধি-বিবেক ব্যবহার করে এমন সব আয়াতের মাধ্যমে সত্যকে চিনে নিক, যেগুলো আল্লাহর কিতাবে পেশ করা হয়েছে, যেগুলো সমগ্র বিশ্ব জগতে চারদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে এবং যেগুলো তাদের নিজেদের সত্তার মধ্যেই বিরাজিত রয়েছে৷ তারপর যখন তাদের অন্তর এ মর্মে সাক্ষ্য দেবে যে, নবীগণ যা পেশ করেছেন তাই যথার্থ সত্য এবং তার বিরুদ্ধে যেসব আকীদা-বিশ্বাস ও পদ্ধতির প্রচলন রয়েছে তা মিথ্যা , তখন তারা জেনে বুঝে মিথ্যা ত্যাগ করে সত্যকে গ্রহণ করবে৷ আল্লাহ মানুষের কাছ থেকে এ স্বেচ্ছাকৃত ঈমান , মিথ্যা পরিহার ও সত্য অনুসৃতিই চান৷ এ জন্য তিনি মানুষকে ইচ্ছা ও সংকল্পের স্বাধীনতা দিয়েছেন৷ এ জন্যই তিনি মানুষের মধ্যে ভালো ও মন্দ উভয় প্রবণতাই রেখে দিয়েছেন৷ অশ্লীলতা ও তাকওয়া উভয় পথই তার সামনে খুলে দিয়েছেন৷ শয়তানকে পথভ্রষ্ট করার স্বাধীনতা দান করেছেন৷ সঠিক পথ দেখাবার জন্য নবুওয়াত , অহী ও কল্যাণের প্রতি আহ্বানের ধারা প্রতিষ্ঠিত করেছেন৷ পথ বাছাই করে নেবার জন্য মানুষকে সময়োপযোগী যাবতীয় যোগ্যতা দিয়ে তাকে পরীক্ষার স্থলে দাঁড় করিয়ে দিয়েছেন, সে চাইলে কুফরী ও ফাসেকীর পথ অথবা ঈমান ও আনুগত্যের পথ অবলম্বন করতে পারে৷ যদি আল্লাহ এমন কোন কৌশল ও ব্যবস্থা অবলম্বন করেন যা মানুষকে ঈমান আনতে ও আনুগত্য করতে বাধ্য করে দেয়, তাহলে এ পরীক্ষার সমস্ত উদ্দেশ্যই ব্যর্থ হয়ে যাবে৷ বাধ্যতামূলক ঈমানই যদি কাংখিত হতো, তাহলে নিদর্শন অবতীর্ণ করার কি প্রয়োজন ছিল ? আল্লাহ মানুষকে এমন প্রকৃতি ও কাঠামোয় সৃষ্টি করতে পারতেন যেখানে কুফরী , নাফরমানী ও অসৎকর্মের কোন সম্ভবনাই থাকতো না৷ বরং ফেরেশতাদের মতো মানুষও জন্মগত বিশ্বস্ত ও অনুগত হতো ৷ কুরআন মজীদের বিভিন্ন স্থানে এ সত্যটির প্রতি ইংগিত করা হয়েছে৷ যেমন বলা হয়েছেঃ

--------------------------------------------------------------

"যদি তোমার রব চাইতেন , তাহলে পৃথিবীর সমস্ত মানুষ ঈমান আনতো৷ এখন তুমি কি লোকদের ঈমান আনতে বাধ্য করবে ?" (ইউনুস ৯৯ আয়াত)

আরো বলা হয়েছেঃ

-----------------------------------------------------------

"যদি তোমার রব চাইতেন , তাহলে সমস্ত মানুষকে একই উম্মতে পরিণত করে দিতে পারতেন৷ তারা তো বিভিন্ন পথেই চলতে থাকবে এবং একমাত্র তারাই পথভ্রষ্ট হবে না যাদের প্রতি রয়েছে তোমার রবের অনুগ্রহ , এ জন্যই তো তিনি তাদেরকে সৃষ্টি করেছিলেন৷ (হূদ , ১১৮ ও ১১৯ আয়াত)

(আরো বেশী ব্যাখ্যার জন্য দেখুন তাফহীমুল কুরআন,সূরা ইউনুস ১০১ ও১০২ এবং সূরা হূদ ১১৬ টীকা)
৪. অর্থাৎ যাদের অবস্থা হচ্ছে এই যে,যুক্তি সহকারে তাদেরকে কিছু বুঝাবার ও সঠিক পথ দেখাবার যে কোন চেষ্টাই করা হলে তারা প্রত্যাখ্যান ও অনাগ্রহের মাধ্যমে তার জবাব দেয়, তাদের অন্তরে জোরপূর্বক ঈমান স্থাপন করার জন্য আকাশ থেকে নিদর্শন অবতীর্ণ করে তাদের চিকিৎসা করানো যায় না বরং এ ধরণের লোকদের যখন একদিকে পুরোপুরি বুঝানো হয়ে গিয়ে থাকে এবং অন্যদিকে তারা প্রত্যাখ্যানের পর্যায় অতিক্রম করে চূড়ান্ত ও প্রকাশ্য মিথ্যা আরোপ করতে এবং সেখান থেকেও অগ্রসর হয়ে প্রকৃত সত্যের প্রতি বিদ্রুপ করতে শুরু করে তখন তাদের পরিণাম দেখিয়ে দেয়াই উচিত৷ এ অশুভ পরিণাম তাদেরকে এভাবেও দেখানো যেতে পারে যে, তাদের ওপর একটি যন্ত্রণাদায়ক আযাব নাযিল হবে এবং তাদেরকে ধ্বংস করে দেয়া হবে৷ এ পরিণাম এভাবেও তাদের সামনে আসতে পারে যে, কয়েক বছর নিজেদের ভ্রান্ত ধারণায় নিমজ্জিত থাকার পর তারা অনিবার্য মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়বে এবং অবশেষে তাদের কাছে এ কথা প্রমাণিত হয়ে যাবে যে, যে পথে তারা নিজেদের জীবনের সমস্ত পুঁজি নিয়োগ করেছিল সেটি ছিল পুরোপুরি মিথ্যা এবং নবীগণ যে পথ পেশ করতেন এবং যার প্রতি তারা সারা জীবন ঠাট্টা-বিদ্রূপ করে এসেছে সেটিই ছিল সত্য৷ এ অশুভ পরিণাম সামনে আসার যেহেতু অনেকগুলো পথ ছিল এবং বিভিন্ন লোকের সামনে তা বিভিন্ন আকারে আসতে পারে এবং চিরকালই এসেছে৷ তাই আয়াতে একবচনে نباء এর পরিবর্তে বহুবচনে انباء শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে৷ অর্থাৎ যে জিনিসের প্রতি এরা বিদ্রুপ করছে তার প্রকৃত অবস্থা বিভিন্ন আকারে তারা জানতে পারবে৷
৫. অর্থাৎ সত্যের অনুসন্ধানের জন্য কারো নিদর্শনের প্রয়োজন হলে তার দূরে যাবার প্রয়োজন নেই৷ এ পৃথিবীর শ্যামল প্রকৃতির প্রতি একবার চোখ মেলে দেখুক৷ সে জানতে পারবে, বিশ্ব ব্যবস্থার যে স্বরূপ নবীগণ পেশ করেন (অর্থাৎ আল্লাহর একত্ব) এবং মুশরিক বা আল্লাহর অস্তিত্ব অস্বীকারকারীরা যে মতবাদ পেশ করে তার মধ্যে কোনটি সঠিক৷ পৃথিবীতে মাটিতে যেসব রকমারি জিনিস যে বিপুল পরিমাণে উৎপন্ন হচ্ছে , যেসব উপাদান ও শক্তির বদৌলতে উৎপন্ন হচ্ছে , যেসব নিয়মের আওতায় উৎপাদিত হচ্ছে , তারপর তাদের বৈশিষ্ট্য ও গুণাবলীতে এবং অসংখ্য সৃষ্টির অসংখ্য প্রয়োজনের মধ্যে যে সুস্পষ্ট সম্পর্ক বিদ্যমান , সেসব জিনিস দেখে কেবলমাত্র একজন নির্বোধই এ সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারে যে, এসব কিছু কোন মহাকৌশলীর কৌশল , কোন জ্ঞানীর জ্ঞান , কোন শক্তিমানের শক্তি এবং কোন স্রষ্টার এ সমগ্র পরিকল্পনা ছাড়া শুধুমাত্র এমনিই আপনাআপনি হচ্ছে, অথবা কোন একজন স্রষ্টার এ সমগ্র পরিকল্পনা প্রণয়ন ও পরিচালনা করছেন না বরং বহু খোদার কৌশল ও ব্যবস্থাপনাই পৃথিবী , সূর্য ,চন্দ্র এবং বায়ু ও পানির মধ্যে এ সামঞ্জস্য এবং এসব উপাদান থেকে সৃষ্ট উদ্ভিদ ও বিভিন্ন শ্রেণীর অসংখ্য প্রাণীর প্রয়োজনের মধ্যে সম্পর্ক সৃষ্টি করে রেখেছে৷ একজন বিবেক-বুদ্ধিমান মানুষ , সে যদি কোন প্রকার হঠকারী ও পূর্ব-বিদ্বেষ পোষণকারী না হয়ে থাকে , তাহলে এ দৃশ্য দেখে স্বতস্ফূর্তভাবে এই বলে চিৎকার করে উঠবে , নিশ্চয়ই এগুলো আল্লাহর অস্তিত্বের এবং এক ও একক আল্লাহর অস্তিত্বের সুস্পষ্ট আলামত৷ এসব নিদর্শন থাকতে আবার কোন ধরনের মু'জিযার প্রয়োজন , যা না দেখলে মানুষ তাওহীদের সত্যতায় বিশ্বাস করতে পারে না ?
৬. অর্থাৎ তিনি এমন শক্তিধর যে, যদি কাউকে শাস্তি দিতে চান , তাহলে মুহূর্তের মধ্যেই ধ্বংস করে দেন৷ কিন্তু এ সত্ত্বেও শাস্তি দেবার ব্যাপারে তিনি কখনো তাড়াহুড়ো করেন না, এটা তাঁর দয়ার মূর্ত প্রকাশ ৷ বছরের পর বছর এবং শতাব্দি কাল ধরে ঢিল দিতে থাকেন৷ চিন্তা করার , বুঝার ও সামলে নেবার সুযোগ দিয়ে যেতে থাকেন ৷ সারা জীবনের সমস্ত নাফরমানী একটিমাত্র তাওবায় মাফ করে দেবার জন্য প্রস্তুত থাকেন৷