(২৫:৬১) অসীম বরকত সম্পন্ন তিনি যিনি আকাশে বুরুজ নির্মাণ করেছেন ৭৫ এবং তার মধ্যে একটি প্রদীপ ৭৬ ও একটি আলোকময় চাঁদ উজ্জ্বল করেছেন৷
(২৫:৬২) তিনিই রাত ও দিনকে পরস্পরের স্থলাভিষিক্ত করেছেন এমন প্রত্যেক ব্যক্তির জন্য যে শিক্ষা গ্রহণ করতে অথবা কৃতজ্ঞ হতে চায়৷৭৭
(২৫:৬৩) রহমানের (আসল) বান্দা তারাই ৭৮ যারা পৃথিবীর বুকে নম্রভাবে চলাফেরা করে ৭৯ এবং মূর্খরা তাদের সাথে কথা বলতে থাকলে বলে দেয়,
(২৫:৬৪) তোমাদের সালাম৷৮০ তারা নিজেদের রবের সামনে সিজদায় অবনত হয়ে ও দাঁড়িয়ে রাত কাটিয়ে দেয়৷৮১
(২৫:৬৫) তারা দোয়া করতে থাকেঃ “হে আমাদের রব ! জাহান্নামের আযাব থেকে আমাদের বাঁচাও, তার আযাব তো সর্বনাশা৷
(২৫:৬৬) আশ্রয়স্থল ও আবাস হি্সেবে তা বড়ই নিকৃষ্ট জায়গা৷” ৮২
(২৫:৬৭) তারা যখন ব্যয় করে তখন অযথা ব্যয় করে না এবং কার্পণ্যও করেনা বরং উভয় প্রান্তিকের মাঝামাঝি তাদের ব্যয় ভারসাম্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকে৷৮৩
(২৫:৬৮) তারা আল্লাহ ছাড়া আর কোন উপাস্যকে ডাকে না, আল্লাহ যে প্রানকে হারাম করেছেন কেআন সংগত কারণ ছাড়া তাকে হত্যা করে নাএবং ব্যভিচার করে না৷ ৮৪ এসব যে-ই করে সে তার গোনাহের শাস্তি ভোগ করবে৷
(২৫:৬৯) কিয়ামতের দিন তাকে উপর্যুপরি শাস্তি দেয়া হবে ৮৫ এবং সেখানেই সে পড়ে থাকবে চিরকাল লাঞ্ছিত অবস্থায়৷
(২৫:৭০) তবে তারা ছাড়া যারা (ঐসব গোনাহের পর) তাওবা করেছে এবং ইমান এনে সৎকাজ করতে থেকেছে৷৮৬ এ ধরনের লোকদের সৎ কাজগুলোকে আল্লাহ সৎকাজের দ্বারা পরিবর্তন করে দেবেন ৮৭ এবং আল্লাহ বড়ই ক্ষমাশীল ও মেহেরবান ৷
(২৫:৭১) যে ব্যক্তি তাওবা করে সৎকাজের পথ অবলম্বন করে, সে তো আল্লাহর দিকে ফিরে আসার মতই ফিরে আসে৷৮৮
(২৫:৭২) (আর রহমানের বান্দা হচ্ছে তারা) যারা মিথ্যা সাক্ষ্য দেয় না ৮৯ এবং কোন বাজে জিনিসের কাছ দিয়ে পথ অতিক্রম করতে থাকলে ভদ্রলোকের মত অতিক্রম করে যায়৷৯০
(২৫:৭৩) তাদের যদি তাদের রবের আয়াত শুনিয়ে উপদেশ দেয় হয় তাহলে তারা তার প্রতি অন্ধ বধির হয়ে থাকে না৷৯১
(২৫:৭৪) তারা প্রার্থনা করে থাকে, “ হে আমাদের রব ! আমাদের নিজেদের স্ত্রীদের ও নিজেদের সন্তানদেরকে নয়ন শীতলকারী বানাও ৯২ এবং আমাদের করে দাও মুত্তাকীদের ইমাম৷”৯৩
(২৫:৭৫) (এরাই নিজেদের সবরের ৯৪ ফল উন্নত মনজিলের আকারে পাবে৷৯৫ অভিবাদন ও সালাম সহকারে তাদের সেখানে অভ্যর্থনা করা হবে৷
(২৫:৭৬) তারা সেখানে থাকবে চিরকাল৷ কী চমৎকার সেই আশ্রয় এবং সেই আবাস!
(২৫:৭৭) হে মুহাম্মদ! লোকদের বলো, “আমার রবের তোমাদের কি প্রয়োজন, যদি তোমারা তাকে না ডাকো৷৯৬ এখন যে তোমরা মিথ্যা আরোপ করেছো, শিগগীর এমন শাস্তি পাবে যে, তার হাত থেকে নিস্তার পাওয়া সম্ভব হবে না৷”
৭৫. ব্যাখ্যার জন্য দেখুন তাফহীমুল কুরআন, সূরা আল হিজর ৮-১২ টীকা৷
৭৬. অর্থাৎ সূর্য ৷ যেমন সূরা নূহে পরিষ্কার করে বলা হয়েছে ৷ وَجَعَلَ الشَّمْسَ سِرَاجًا (আর সূর্যকে প্রদীপ বানিয়েছেন) [১৬ আয়াত]
৭৭. এ দু'টি ভিন্ন ধরনের মর্যাদা কিন্তু স্বভাবের দিক দিয়ে এরা পরস্পরের জন্য অপরিহার্য৷ দিন-রাত্রির আবর্তন ব্যবস্থা সম্পর্কে চিন্তা করার ফলে মানুষ প্রথমে এ থেকে তাওহীদের শিক্ষা লাভ করে এবং আল্লাহ থেকে গাফেল হয়ে গিয়ে থাকলে সংগে সংগেই সজাগ হয়ে যায়৷ এর দ্বিতীয় ফল হয়, আল্লাহর রবুবীয়াতের অনুভূতি জাগ্রত হয়ে মানুষ আল্লাহর সমীপে মাথা নত করে এবং কৃতজ্ঞতার প্রতিমূর্তিতে পরিণত হয়৷


৭৮. অর্থাৎ যে রহমানকে সিজদা করার জন্য তোমাদের বলা হচ্ছে এবং তোমরা তা অস্বীকার করছো , সবাই তো তাঁর জন্মগত বান্দা কিন্তু সচেতনতা সহকারে বন্দেগীর পথ অবলম্বন করে যারা এসব বিশেষ গুণাবলী নিজেদের মধ্যে সৃষ্টি করে তারাই তাঁর প্রিয় ও পছন্দনীয় বান্দা৷ তাছাড়া তোমাদের যে সিজদা করার দাওয়াত দেয়া হচ্ছে তার ফলাফল তার বন্দেগীর পথ অবলম্বনকারীদের জীবনে দেখা যাচ্ছে এবং তা অস্বীকার করার ফলাফল তোমাদের নিজেদের জীবন থেকে পরিস্ফূট হচ্ছে৷ এখানে আসল উদ্দেশ্য হচ্ছে চরিত্র নৈতিকতার দু'টি আদর্শের তুলনা করা৷ একটি আদর্শ মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অনুসারীদের মধ্যে সৃষ্টি হচ্ছিল এবং দ্বিতীয় আদর্শটি জাহেলীয়াতের অনুসারী লোকদের মধ্যে সর্বত্র পাওয়া যাচ্ছিল ৷ কিন্তু এ তুলনামূলক আলোচনার জন্য শুধুমাত্র প্রথম আদর্শ চরিত্রের সুস্পষ্ট বৈশিষ্ট্যগুলো সামনে রাখা হয়েছে৷ দ্বিতীয় আদর্শকে প্রত্যেক চক্ষুষ্মান ও চিন্তাশীল ব্যক্তির দৃষ্টিশক্তি ও বুদ্ধিবৃত্তির উপর ছেড়ে দেয়া হয়েছে , যাতে সে নিজেই প্রতিপক্ষের ছবি দেখে নেয় এবং নিজেই উভয়ের তুলনামূলক পর্যালোচনা করে৷ তার চিত্র পৃথকভাবে পেশ করার প্রয়োজন ছিল না৷ কারণ চারপাশের সকল সমাজে তার সোচ্চার উপস্থিতি ছিল৷
৭৯. অর্থাৎ অহংকারের সাথে বুক ফুলিয়ে চলে না৷ গর্বিত স্বৈরাচারী ও বিপর্যয়কারীর মতো নিজের চলার মাধ্যমে নিজের শক্তি প্রকাশ করার চেষ্টা করে না৷ বরং তাদের চালচলন হয় একজন ভদ্র , মার্জিত ও সৎস্বভাব সম্পন্ন ব্যক্তির মতো৷ নম্রভাবে চলার মানে দুর্বল ও রুগীর মতো চলা নয় এবং একজন প্রদর্শন অভিলাষী নিজের বিনয় প্রদর্শন করার বা নিজের আল্লাহ ভীতি দেখাবার জন্য যে ধরনের কৃত্রিম চলার ভংগী সৃষ্টি করে সে ধরনের কোন চলাও নয়৷ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজে চলার সময় এমন শক্তভাবে পা ফেলতেন যেন মনে হতো উপর থেকে ঢালুর দিকে নেমে যাচ্ছেন৷ উমরের ব্যাপারে হাদীসে বলা হয়েছে , তিনি এক যুবককে দুর্বলভাবে হেঁটে যেতে দেখে তাকে থামিয়ে জিজ্ঞেস করেন , তুমি কি অসুস্থ ? সে বলে , না ৷ তিনি ছড়ি উঠিয়ে তাকে ধমক দিয়ে বলেন , শক্ত হয়ে সবল ব্যক্তির মতো চলো৷ এ থেকে জানা যায় , নম্রভাবে চলা মানে , একজন ভালো মানুষের স্বাভাবিকভাবে চলা৷ কৃত্রিম বিনয়ের সাহায্যে যে চলার ভংগী সৃষ্টি করা হয় অথবা যে চলার মধ্য দিয়ে বানোয়াট দীনতা ও দুর্বলতার প্রকাশ ঘটানো হয় তাকে নম্রভাবে চলা বলে না৷

কিন্তু চিন্তার বিষয় হচ্ছে , মানুষের চলার মধ্যে এমন কি গুরুত্ব আছে যে কারণে আল্লাহর সৎ বান্দাদের বৈশিষ্ট্যের উল্লেখ প্রসংগে সর্বপ্রথম এর কথা বলা হয়েছে ? এ প্রশ্নটিকে যদি একটু গভীর দৃষ্টিতে বিশ্লেষণ করা হয় তাহলে বুঝা যায় যে , মানুষের চলা শুধুমাত্র তার হাঁটার একটি ভংগীর নাম নয় বরং আসলে এটি হয় তার মন-মানস , চরিত্র ও নৈতিক কার্যাবলীর প্রত্যক্ষ প্রতিফলন৷ একজন আত্মমর্যাদা সম্পন্ন ব্যক্তির চলা , একজন গুণ্ডা ও বদমায়েশের চলা , একজন স্বৈরাচারী ও জালেমের চলা , একজন আত্মম্ভরী অহংকারীর চলা , একজন সভ্য-ভব্য ব্যক্তির চলা , একজন দরিদ্র-দীনহীনের চলা এবং এভাবে অন্যান্য বিভিন্ন ধরনের লোকদের চলা পরস্পর থেকে এত বেশী বিভিন্ন হয় যে, তাদের প্রত্যেককে দেখে কোন ধরনের চলার পেছনে কোন ধরনের ব্যক্তিত্ব কাজ করছে তা সহজেই অনুমান করা যেতে পারে৷ কাজেই আয়াতের মূল বক্তব্য হচ্ছে , রহমানের বান্দাদের তোমরা সাধারণ লোকদের মধ্যে চলাফেরা করতে দেখেই তারা কোন ধরনের লোক পূর্ব পরিচিত ছাড়াই আলাদাভাবে তা চিহ্নিত করতে পারবে৷ এ বন্দেগী তাদের মানসিকতা ও চরিত্র যেভাবে তৈরী করে দিয়েছে তার প্রভাব তাদের চালচলনেও সুস্পষ্ট হয়৷ এক ব্যক্তি তাদের দেখে প্রথম দৃষ্টিতে জানতে পারে , তারা ভদ্র , ধৈর্যশীল ও সহানুভূতিশীল হৃদয়বৃত্তির অধিকারী , তাদের দিক থেকে কোন প্রকার অনিষ্টের আশংকা করা যেতে পারে না৷(আরো বেশি ব্যাখ্যার জন্য দেখুন তাফহীমুল কুরআন, সূরা বনি ইসরাঈল ৪৩, সুরা লোকমান ৩৩ টীকা )

৮০. মূর্খ মানে অশিক্ষিত বা লেখাপড়া না জানা লোক নয় বরং এমন লোক যারা জাহেলী কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হবার উদ্যোগ নিয়েছে এবং কোন ভদ্রলোকের সাথে অশালীন ব্যবহার করতে শুরু করেছে৷ রহমানের বান্দাদের পদ্ধতি হচ্ছে, তারা গালির জবাবে গালি এবং দোষারোপের জবাবে দোষারোপ করে না৷ এভাবে প্রত্যেক বেহুদাপনার জবাবে তারাও সমানে বেহুদাপনা করে না৷ বরং যারাই তাদের সাথে এহেন আচরণ করে তাদের সালাম দিয়ে তারা অগ্রসর হয়ে যায় , যেমন কুরআনের অন্য জায়গায় বলা হয়েছে :

وَإِذَا سَمِعُوا اللَّغْوَ أَعْرَضُوا عَنْهُ وَقَالُوا لَنَا أَعْمَالُنَا وَلَكُمْ أَعْمَالُكُمْ سَلَامٌ عَلَيْكُمْ لَا نَبْتَغِي الْجَاهِلِينَ

"আর যখন তারা কোন বেহুদা কথা কথা শোনে , তা উপেক্ষা করে যায় ৷ বলে, আরে ভাই , আমাদের কাজের ফল আমরা পাবো এবং তোমাদের কাজের ফল তোমরা পাবে৷ সালাম তোমাদের , আমরা জাহেলদের সাথে কথা বলি না৷"(আল কাসাস : ৫৫) [ব্যাখ্যার জন্য দেখুন- তাফহীমুল কুরআন, আল কাসাস ৭২ ও ৭৮ টীকা]
৮১. অর্থাৎ ওটা ছিল তাদের দিনের জীবন এবং এটা হচ্ছে রাতের জীবন ৷ তাদের রাত আরাম , আয়েশে , নাচগানে , খেলা-তামাশায় , গপ-সপে এবং আড্ডাবাজী ও চুরি-চামারিতে অতিবাহিত হয় না৷ জাহেলীয়াতের এসব পরিচিত বদ কাজগুলোর পরিবর্তে তারা এ সমাজে এমন সব সৎকর্ম সম্পাদনকারী যাদের রাত কেটে যায় আল্লাহর দরবারে দাঁড়িয়ে , বসে শুয়ে দোয়া ও ইবাদাত করার মধ্য দিয়ে৷ কুরআন মজীদের বিভিন্ন স্থানে তাদের জীবনের এ দিকগুলো সুস্পষ্ট করে তুলে ধরা হয়েছে৷ যেমন সূরা সাজদায় বলা হয়েছে :

تَتَجَافَى جُنُوبُهُمْ عَنِ الْمَضَاجِعِ يَدْعُونَ رَبَّهُمْ خَوْفًا وَطَمَعًا

"তাদের পিঠ বিছানা থেকে আলাদা থাকে, নিজেদের রবকে ডাকতে থাকে আশায় ও আশংকায়৷" (১৬ আয়াত)

সূরা যারিয়াতে বলা হয়েছে :

كَانُوا قَلِيلًا مِنَ اللَّيْلِ مَا يَهْجَعُونَ O وَبِالْأَسْحَارِ هُمْ يَسْتَغْفِرُونَO

"এ সকল জান্নাতবাসী ছিল এমন সব লোক যারা রাতে সামান্যই ঘুমাতো এবং ভোর রাতে মাগফিরাতের দোয়া করতো৷" (১৭-১৮ আয়াত)

সূরা যুমারে বলা হয়েছে :

أَمْ مَنْ هُوَ قَانِتٌ آَنَاءَ اللَّيْلِ سَاجِدًا وَقَائِمًا يَحْذَرُ الْآَخِرَةَ وَيَرْجُو رَحْمَةَ رَبِّهِ

"যে ব্যক্তি হয় আল্লাহর হুকুম পালনকারী , রাতের বেলা সিজদা করে ও দাঁড়িয়ে থাকে , আখেরাতকে ভয় করে এবং নিজের রবের রহমতের প্রত্যাশা করে তার পরিণাম কি মুশরিকের মতো হতে পারে ?" (৯ আয়াত)

৮২. অর্থাৎ এ ইবাদাত তাদের মধ্যে কোন অহংকারের জন্ম দেয় না৷ আমরা তো আল্লাহর প্রিয়, কাজেই আগুন আমাদের কেমন করে স্পর্শ করতে পারে, এ ধরনের আত্মগর্বও তাদের মনে সৃষ্টি হয় না৷ বরং নিজেদের সমস্ত সৎকাজ ও ইবাদাত-বন্দেগী সত্ত্বেও তারা এ ভয়ে কাঁপতে থাকে যে, তাদের কাজের ভুল-ত্রুটিগুলো বুঝি তাদের আযাবের সম্মুখীন করলো৷ নিজেদের তাকওয়ার জোরে জান্নাত জয় করে নেবার অহংকার তারা করে না৷ বরং নিজেদের মানবিক দুর্বলতাগুলো মনে করে এবং এজন্যও নিজেদের কার্যাবলীর উপর নয় বরং আল্লাহর দয়া ও অনুগ্রহের উপর থাকে তাদের ভরসা৷
৮৩. অর্থাৎ তাদের অবস্থা এমন নয় যে , আরাম-আয়েশ , বিলাসব্যসন , মদ-জুয়া , ইয়ার-বন্ধু , মেলা-পার্বন ও বিয়েশাদীর পেছনে অঢেল পয়সা খরচ করছে এবং নিজের সামর্থ্যের চেয়ে অনেক বেশী করে নিজেকে দেখাবার জন্য খাবার-দাবার , পোষাক-পরিচ্ছদ , বাড়ি-গাড়ি , সাজগোজ ইত্যাদির পেছনে নিজের টাকা-পয়সা ছড়িয়ে চলছে৷ আবার তারা নিজের অর্থলোভীর মতো নয় যে এক একটা একটা পয়সা গুণে রাখে৷ এমন অবস্থাও তাদের নয় যে, নিজেও খায় না, নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী নিজের ছেলেমেয়ে ও পরিবারের লোকজনদের প্রয়োজনও পূর্ণ করে না এবং প্রাণ খুলে কোন ভালো কাজে কিছু ব্যয়ও করে না৷ আরবে এ দু'ধরনের লোক বিপুল সংখ্যায় পাওয়া যেতো৷ একদিকে ছিল একদল লোক যারা প্রাণ খুলে খরচ করতো৷ কিন্তু প্রত্যেকটি খরচের উদ্দেশ্য হতো ব্যক্তিগত বিলাসিতা ও আরাম-আয়েশ অথবা গোষ্ঠির মধ্যে নিজেকে উঁচু মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত রাখা এবং নিজের দানশীলতা ও ধনাঢ্যতার ডংকা বাজানো৷ অন্যদিকে ছিল সর্বজন পরিচিত কৃপণের দল৷ ভারসাম্যপূর্ণ নীতি খুব কম লোকের মধ্যে পাওয়া যেতো৷ আর এই কম লোকদের মধ্যে সবচেয়ে অগ্রগণ্য ছিলেন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও তাঁর সাহাবীগণ৷

এ প্রসংগে অমিতব্যয়িতা ও কার্পণ্য কি জিনিস তা জানা উচিত৷ ইসলামের দৃষ্টিতে তিনটি জিনিসকে অমিতব্যয়িতা বলা হয়৷ এক , অবৈধ কাজে অর্থ ব্যয় করা , তা একটি পয়সা হলেও ৷ দুই , বৈধ কাজে ব্যয় করতে গিয়ে সীমা ছাড়িয়ে যাওয়া৷ এ ক্ষেত্রে সে নিজের সামর্থের চাইতে বেশী ব্যয় করে অথবা নিজের প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেশী যে অর্থসম্পদ সে লাভ করেছে তা নিজেরই বিলাসব্যসনে ও বাহ্যিক আড়ম্বর অনুষ্ঠানে ব্যয় করতে পারে৷ তিন , সৎকাজে ব্যয় করা৷ কিন্তু আল্লাহর জন্য নয় বরং অন্য মানুষকে দেখাবার জন্য৷ পক্ষান্তরে কার্পণ্য বলে বিবেচিত হয় দু'টি জিনিস ৷ এক , মানুষ নিজের ও নিজের পরিবার-পরিজনদের প্রয়োজন পূরণের জন্য নিজের সামর্থ ও মর্যাদা অনুযায়ী ব্যয় করে না৷ দুই , ভালে ও সৎকাজে তার পকেট থেকে পয়সা বের হয় না৷ এ দু'টি প্রান্তিকতার মাঝে ইসলামই হচ্ছে ভারসাম্যের পথ৷ এ সম্পর্কে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন :

مِنْ فِقْهِ الرَّجُلِ رِفْقُهُ فِي مَعِيشَتِهِ

"নিজের অর্থনৈতিক বিষয়াদিতে মধ্যম পন্থা অবলম্বন করা মানুষের ফকীহ (জ্ঞানবান) হবার অন্যতম আলামত৷" (আহমদ ও তাবারানী , বর্ণনাকারী আবুদ দার্দা)
৮৪. "অর্থাৎ আরববাসীরা যে তিনটি বড় গোনাহের সাথে বেশী করে জড়িত থাকে সেগুলো থেকে তারা দূরে থাকে৷ একটি হলো শির্ক, দ্বিতীয়টি অন্যায়ভাবে হত্যা করা এবং তৃতীয়টি যিনা৷ এ বিষয়বস্তুটিই নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বিপুল সংখ্যক হাদীসে বর্ণনা করেছেন৷ যেমন আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা) বর্ণিত হাদীস৷ তাতে বলা হয়েছেঃ একবার নবীকে (সা) জিজ্ঞেস করা হলো, সবচেয়ে বড় গোনাহ কি? তিনি বললেন: أَنْ تَجْعَلَ لِلَّهِ نِدًّا وَهُوَ خَلَقَكَ "তুমি যদি কাউকে আল্লাহর সমকক্ষ প্রতিদ্বন্দী দাঁড় করাও৷ অথচ আল্লাহই তোমাকে সৃষ্টি করেছেন৷" জিজ্ঞেস করা হলো, তারপর? বললেন: َأَنْ تَقْتُلَ وَلَدَكَ تَخَافُ أَنْ يَطْعَمَ مَعَكَ"তুমি যদি তোমার সন্তানকে হত্যা কর এই ভয়ে যে সে তোমার সাথে আহারে অংশ নেবে৷" জিজ্ঞেস করা হলো, তারপর? বললেন: أَنْ تُزَانِيَ حَلِيلَةَ جَارِكَ "তুমি যদি তোমার প্রতিবেশীর স্ত্রীর সাথে যিনা কর৷" (বুখারী, মুসলিম, তিরমিযী, নাসাঈ, আহমদ) যদিও আরো অনেক কবীরা গোনাহ আছে কিন্তু সেকালের আরব সমাজে এ তিনটি গোনাহই সবচেয়ে বেশী জেঁকে বসেছিল৷ তাই এক্ষেত্রে মুসলমানদের এ বৈশিষ্ট্য সুস্পষ্ট করে তুলে ধরা হয়েছিল যে, সমগ্র আরব সমাজে মাত্র এ গুটিকয় লোকই এ পাপগুলো থেকে মুক্ত আছে৷

এখানে প্রশ্ন করা যেতে পারে, মুশরিকদের দৃষ্টিতে তো শির্ক থেকে দূরে থাকা ছিল একটি মস্ত বড় দোষ, এক্ষেত্রে একে মুসলমানদের একটি প্রধান গুণ হিসেবে তাদের সামনে তুলে ধরার যৌক্তিকতা কি ছিল? এর জবাব হচ্ছে আরববাসীরা যদিও শিরকে লিপ্ত ছিল এবং এ ব্যাপারে তারা অত্যন্ত বিদ্বিষ্ট মনোভাবের অধিকারী ছিল কিন্তু আসলে এর শিকড় উপরিভাগেই সীমাবদ্ধ ছিল, গভীর তলদেশে পৌঁছেনি৷ দুনিয়ার কোথাও কখনো শিরকের শিকড় মানব প্রকৃতির গভীরে প্রবিষ্ট থাকে না৷ বরঞ্চ নির্ভেজাল আল্লাহ বিশ্বাসের মহত্ব তাদের মনের গভীরে শিকড় গেড়ে বসেছিল৷ তাকে উদ্দীপিত করার জন্য শুধুমাত্র উপরিভাগে একটুখানি আঁচড় কাটার প্রয়োজন ছিল৷ জাহেলিয়াতের ইতিহাসের বহুতর ঘটনাবলী এ দু'টি কথার সাক্ষ্য দিয়ে থাকে৷ যেমন আবরাহার হামলার সময় কুরাইশদের প্রত্যেকটি শিশুও জানতো যে, কাবাগৃহে রক্ষিত মূর্তিগুলো এ বিপদ থেকে উদ্ধার করতে পারবে না বরং একমাত্র এ গৃহের মালিক আল্লাহই এ বিপদ থেকে রক্ষা করতে পারেন৷ হাতি সেনাদের ধ্বংসের পর সমকালীন কবিরা যে সব কবিতা ও কাসীদা পাঠ করেছিলেন এখনো সেগুলো সংরক্ষিত আছে৷ সেগুলোর প্রতিটি শব্দ সাক্ষ্য দিচ্ছে, তারা এ ঘটনাকে নিছক মহান আল্লাহর শক্তির প্রকাশ মনে করতো এবং এতে তাদের উপাস্যদের কোন কৃতিত্ব আছে বলে ভুলেও মনে করতো না৷ এ সময় কুরাইশ ও আরবের সমগ্র মুশরিক সমাজের সামনে শিরকের নিকৃষ্টতম পরাকাষ্ঠাও প্রদর্শিত হয়েছিল৷ আবরাহা মক্কা যাওয়ার পথে তায়েফের কাছাকাছি পৌঁছে গেলে তায়েফবাসীরা আবরাহা কর্তৃক তাদের "লাত" দেবতার মন্দির বিধ্বস্থ হওয়ার আশংকায় তাকে কাবা ধ্বংসের কাজে সহযোগিতা করার আশ্বাস দিয়েছিল এবং পার্বত্য পথে তার সৈন্যদের নিরাপদে মক্কায় পৌঁছিয়ে দেবার জন্য পথ প্রদর্শকও দিয়েছিল৷ এ ঘটনার তিক্ত স্মৃতি কুরাইশদেরকে দীর্ঘদিন পর্যন্ত মানসিকভাবে পীড়ন করতে থাকে এবং বছরের পর বছর তারা তায়েফের পথ প্রদর্শকের কবরে প্রস্তর নিক্ষেপ করতে থাকে৷ তাছাড়া কুরাইশ ও অন্যান্য আরববাসীরা নিজেদের দ্বীনকে হযরত ইবরাহীমের আনীত দ্বীন মনে করতো৷ নিজেদের বহু ধর্মীয় ও সামাজিক রীতিনীতি এবং বিশেষ করে হজ্জ্বের নিয়মকানুন ও রসম রেওয়াজকে ইবরাহীমের দ্বীনের অংশ গণ্য করতো৷ তারা একথাও মানতো যে, হযরত ইবরাহীম একমাত্র আল্লাহর বন্দেগী করতেন এবং তিনি কখনো মূর্তিপূজা করেননি৷ তাদের মধ্যে যেসব কথা ও কাহিনী প্রচলিত ছিল তাতে মূর্তি পূজার প্রচলন তাদের দেশে কবে থেকে শুরু হয়েছিল এবং কোন্ মূর্তিটি কে কবে কোথায় থেকে এনেছিলেন তার বিস্তারিত বিবরণ সংরক্ষিত ছিল৷ একজন সাধারণ আরবের মনে নিজের উপাস্য দেবতাদের প্রতি যে ধরনের ভক্তি-শ্রদ্ধা ছিল তা এভাবে অনুমান করা যেতে পারে যে, কখনো তার প্রার্থনা ও আশা-আকাংখা বিরোধী কোন ঘটনা ঘটে গেলে অনেক সময় নিজের উপাস্য দেবতাদেরকেই সে তিরষ্কার করতো, তাদেরকে অপমান করতো এবং তাদের সামনে নযরানা পেশ করতো না৷ একজন আরব নিজের পিতার হত্যাকারী থেকে প্রতিশোধ নিতে চাচ্ছিল৷ 'যুল খালাসাহ' নামক ঠাকুরের আস্তানায় গিয়ে সে ধর্না দেয় এবং এ ব্যাপারে তার ভবিষ্যত কর্মপন্থা জানতে চায়৷ সেখান থেকে এ ধরনের কাজ না করার জবাব আসে৷ এত আরবটি ক্রুব্ধ হয়ে বলতে থাকে :

لو كنتَ يا ذا الخَلَص الموتورا ... مِثْلي وكان شيخُك المقبورا

لَمْ تنهَ عن قتل العُداة زُوراً ...

অর্থাৎ "হে যুল খালাস! তুমি যদি হতে আমার জায়গায়
   নিহত হতো যদি তোমার পিতা
   তাহলে কখনো তুমি মিথ্যাচারী হতে না
 বলতে না প্রতিশোধ নিয়ো না জালেমদের থেকে৷"

অন্য একজন আরব তার উটের পাল নিয়ে যায় সা'দ নামক দেবতার আস্তানায় তাদের জন্য বরকত লাভ করার উদ্দেশ্যে৷ এটি ছিল একটি লম্বা ও দীর্ঘ মূর্তি৷ বলির পশুর চাপ চাপ রক্ত তার গায়ে লেপ্টেছিল৷ উটেরা তা দেখে লাফিয়ে ওঠে এবং চারিদিকে ছুটে পালিয়ে যেতে থাকে৷ আরবটি তার উটগুলো এভাবে চারিদিকে বিশৃংখলভাবে ছুটে যেতে দেখে ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে৷ সে মূর্তিটির গায়ে পাথর মারতে মারতে বলতে থাকে : "আল্লাহ তোর সর্বনাশ করুক৷ আমি এসেছিলাম বরকত নেবার জন্য কিন্তু তুই তো আমার এই বাকি উটগুলোকেও ভাগিয়ে দিয়েছিস৷" অনেক মূর্তি ছিল যেগুলো সম্পকে বহু ন্যাক্কারজনক গল্প প্রচলিত ছিল৷ যেমন ছিল আসাফ ও নায়েলার ব্যাপার৷ এ দু'টি মূর্তি রতি ছিল সাফা ও মারওয়াও ওপর৷ এদের সম্পর্কে প্রচলিত ছিল যে, এরা দু'জন ছিল মূলত একজন পুরুষ ও একজন স্ত্রীলোক৷ এরা কাবাঘরের মধ্যে যিনা করে৷ ফলে আল্লাহ তাদেরকে পাথরে পরিণত করে দেন৷ যেসব দেবতার এ হচ্ছে আসল রূপ, তাদের পূজারী ও ভক্তদের মনে তাদের কোন যথার্থ মর্যাদা থাকতে পারে না৷ এসব দিক সামনে রাখলে এ কথা সহজে অনুধাবন করা যায় যে, আল্লাহর প্রতি নির্ভেজাল আনুগত্যের একটি সুগভীর মূল্যবোধ তাদের অন্তরের অন্তস্থলে বিরাজিত ছিল৷ কিন্তু একদিকে অন্ধ রক্ষণশীলতা তাকে দমিয়ে রেখেছিল এবং অন্যদিকে কুরাইশ পুরোহিতরা এর বিরুদ্ধে হিংসা ও বিদ্বেষ উদ্দীপিত করে তুলছিল৷ কারণ তারা আশংকা করছিল দেবতাদের প্রতি ভক্তি-শ্রদ্ধা খতম হয়ে গেলে আরবে তাদের যে কেন্দ্রীয় প্রভাব প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে তা খতম হয়ে যাবে এবং তাদের অর্থোপার্জনও বাধাগ্রস্থ হবে৷ এসব উপাদানের ভিত্তিতে যে মুশরিকী প্রতিষ্ঠিত ছিল তা তাওহীদের দাওয়াতের মোকাবিলায় কোন গুরুত্ব ও মর্যাদা সহকারে দাঁড়াতে পারতো না৷ তাই কুরআন নিজেই মুশরিদেরকে সম্বোধন করে উদাত্ত কণ্ঠে বলেছে : তোমাদের সমাজে যেসব কারণে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অনুসারীরা শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করেছে তার মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হচ্ছে, তারা শির্কমুক্ত এবং নির্ভেজাল আল্লাহর বন্দেগী ও আনুগত্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত৷ এদিক থেকে মুসলমানদের শ্রেষ্ঠত্বকে মুশরিকরা মুখে মেনে নিতে না চাইলেও মনে মনে তারা এর ভারীত্ব অনুভব করতো ৷"
৮৫. এর দু'টি অর্থ হতে পারে৷ এক, এ শান্তির ধারা খতম হবে না বরং একের পর এক জারী থাকবে৷ দুই , যে ব্যক্তি কুফরী , শির্ক বা নাস্তিক্যবাদের সাথে হত্যা ও অন্যান্য গোনাহের বোঝা মাথায় নিয়ে যাবে সে বিদ্রোহের শাস্তি আলাদাভাবে ভোগ করবে এবং অন্যান্য প্রত্যেকটি অপরাধের শাস্তি ভোগ করবে আলাদা আলাদাভাবে ৷ তার ছোট বড় প্রত্যেকটি অপরাধ শুমার করা হবে৷ কোন একটি ভুলও ক্ষমা করা হবে না৷ হত্যার জন্য একটি শাস্তি দেয়া হবে না বরং হত্যার প্রত্যেকটি কর্মের জন্য পৃথক পৃথক শাস্তি দেয়া হবে৷ যিনার শাস্তিও একবার হবে না বরং যতবারই সে এ অপরাধটি করবে প্রত্যেকবারের জন্য পৃথক পৃথক শাস্তি পাবে৷ তার অন্যান্য অপরাধ ও গোনাহের শাস্তিও এ রকমই হবে৷
৮৬. যারা ইতিপূর্বে নানা ধরনের অপরাধ করেছে এবং এখন সংশোধন প্রয়াসী হয়েছে তাদের জন্য এটি একটি সুসংবাদ৷ এটি ছিল সাধারণ মার (General Amnesty) একটি ঘোষণা৷  এ ঘোষণাটিই সেকালের বিকৃত সমাজের লাখো লাখো লোককে স্থায়ী বিকৃতি থেকে বাঁচাতে সাহায্য করে৷ এটিই তাদেরকে আশার আলো দেখায় এবং অবস্থা সংশোধনে উদ্বুদ্ধ করে৷ অন্যথায় যদি তাদেরকে বলা হতো, তোমরা যে পাপ করেছো তার শাস্তি থেকে এখন কোন প্রকারেই নিষ্কৃতি পেতে পারো না, তাহলে এটি তাদেরকে হতাশ করে চিরকালের জন্য পাপ সাগরে ডুবিয়ে দিতো এবং তাদের সংশোধনের আর কোন সম্ভাবনাই থাকতো না৷ অপরাধীকে একমাত্র ক্ষমার আশাই অপরাধের শৃংখল থেকে মুক্ত করতে পারে৷ নিরাশ হবার পর সে ইবলিসে পরিণত হয়৷ তাওবার এ নিয়ামতটি আরবের বিভ্রান্ত ও পথভ্রষ্ট লোকদেরকে কিভাবে সঠিক পথে এনেছে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আমলে সংঘটিত বিভিন্ন ঘটনা থেকে তা অনুমান করা যায়৷ দৃষ্টান্তস্বরূপ একটি ঘটনা উল্লেখ করা যেতে পারে৷ ইবনে জারীর ও তাবারানী এ ঘটনাটি উদ্ধৃত করেছেন৷ হযরত আবু হুরাইরা (রা) বলেন, একদিন আমি মসজিদে নববী থেকে এশার নামায পড়ে ফিরছি এমন সময় দেখি এক ভদ্রমহিলা আমার দরজায় দাঁড়িয়ে৷ আমি তাকে সালাম দিয়ে আমার কামরায় চলে গেলাম এবং দরজা বন্ধ করে নফল নামাজ পড়তে থাকলাম৷ কিছুক্ষণ পর সে দরজার কড়া নাড়লো৷ আমি উঠে দরজা খুলে দিয়ে জিজ্ঞেস করলাম কি চাও? সে বলতে লাগলো, আমি আপনার কাছে একটি প্রশ্ন করতে এসেছি৷ আমি যিনা করেছি৷ আমার পেটে অবৈধ সন্তান ছিল৷ সন্তান ভূমিষ্ট হবার পরে আমি তাকে মেরে ফেলেছি৷ এখন আমি জানতে চাই আমার গোনাহ মাফ হবার কোন পথ আছে কি না? আমি বললাম, না কোনক্রমেই মাফ হবে না৷ সে বড়ই আক্ষেপ সহকারে হা-হুতাশ করতে করতে চলে গেলো৷ সে বলতে থাকলো : "হায়! এ সৌন্দর্য আগুনের জন্য সৃষ্টি হয়েছিল৷" সকালে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পেছনে নামায শেষ করার পর আমি তাঁকে রাতের ঘটনা শুনালাম৷ তিনি বললেন : আবু হুরাইরা, তুমি বড়ই ভুল জবাব দিয়েছো৷ তুমি কি কুরআনে এ আয়াত পড়নি-

وَالَّذِينَ لَا يَدْعُونَ مَعَ اللَّهِ إِلَهًا آَخَرَ. . . . . . . . . . . . . . إِلَّا مَنْ تَابَ وَآَمَنَ وَعَمِلَ عَمَلًا صَالِحًا (الفرقان: 68-70)

 নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের এ জবাব শুনে আমি সংগে সংগেই বের হয়ে পড়লাম৷ মহিলাটিকে খুঁজতে লাগলাম৷ রাতে এশার সময়ই তাকে পেলাম৷ আমি তাকে সুখবর দিলাম৷ তাকে বললাম, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তোমার প্রশ্নের এ জওয়াব দিয়েছেন৷ শোনার সাথে সাথেই সে সিজদানত হলো এবং বলতে থাকলো, সেই আল্লাহর শোকর যিনি আমার জন্য ক্ষমার দরজা খুলে দিয়েছেন৷ তারপর সে গোনাহ থেকে তাওবা করলো এবং নিজের বাঁদীকে তার পুত্রসহ মুক্ত করে দিল৷ হাদীসে প্রায় একই ধরনের অন্য একটি ঘটনার উল্লেখ পাওয়া যায়৷ সেটি একটি বৃদ্ধের ঘটনা৷ তিনি এসে রসূলুল্লাহর (সা) কাছে আরজ করছিলেন : হে আল্লাহর রাসূল! সারা জীবন গোনাহের মধ্যে কেটে গেলো৷ এমন কোন গোনাহ নেই যা করিনি৷ নিজের গোনাহ যদি দুনিয়ার সমস্ত লোকদের মধ্যে ভাগ করে দেই তাহলে সবাইকে গোনাহের সাগরে ডুবিয়ে দেবে৷ এখনো কি আমার মার পথ আছে৷? জবাব দিলেন : তুমি কি ইসলাম গ্রহণ করেছো? বৃদ্ধ বললেন : আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, আল্লাহ ছাড়া আর কোন মাবুদ নেই এবং মুহাম্মাদ (সা) আল্লাহর রসূল৷ রসূলুল্লাহ (সা) বললেন : যাও, আল্লাহ গোনাহ মাফ করবেন এবং তোমার গোনাহগুলোকে নেকীতে পরিণত করে দেবেন৷ বৃদ্ধ বললেন : আমার সমস্ত অপরাধ ও পাপ কি ক্ষমা করবেন? জবাব দিলেন : হাঁ, তোমার সমস্ত অপরাধ ও পাপ ক্ষমা করে দেবেন৷ (ইবনে কাসীর, ইবনে আবী হাতেমের বরাত দিয়ে)
৮৭. এর দু'টি অর্থ হয়৷ এক, যখন তারা তাওবা করবে তখন ইতিপূর্বে কুফরী জীবনে তারা যে সমস্ত খারাপ কাজ করতো তার জায়গায় এখন ঈমান আনুগত্যের জীবনে মহান আল্লাহ তাদের সৎকাজ করার সুযোগ দেবেন এবং তারা সৎকাজ করতে থাকবে৷ ফলে সৎকাজ তাদের অসৎ কাজের জায়গা দখল করে নেবে৷ দুই , তাওবার ফলে কেবল তাদের আমলনামা থেকে তারা কুফরী ও গোনাহগারির জীবনে যেসব অপরাধ করেছিল সেগুলো কেটে দেয়া হবে না বরং তার পরিবর্তে প্রত্যেকের আমলনামায় এ নেকী লেখা হবে যে , এ হচ্ছে সেই বান্দা যে বিদ্রোহ ও নাফরমানির পথ পরিহার করে আনুগত্য ও হুকুম মেনে চলার পথ অবলম্বন করেছে৷ তারপর যতবারই সে নিজের পূর্ববর্তী জীবনের খারাপ কাজগুলো স্মরণ করে লজ্জিত হয়ে থাকবে এবং নিজের প্রভূ রব্বুল আলামীনের কাছে তাওবা করে থাকবে ততটাই নেকী তার ভাগ্যে লিখে দেয়া হবে৷ কারণ ভুলের জন্য লজ্জিত হওয়া ও ক্ষমা চাওয়াই একটি নেকীর কাজ৷ এভাবে তার আমলনামায় পূর্বেকার সমস্ত পাপের জায়গা দখল করে নেবে পরবর্তীকালের নেকীসমূহ এবং কেবলমাত্র শাস্তি থেকে নিষ্কৃতি পাওয়ার মধ্যেই তার পরিণাম সীমিত থাকবে না বরং উল্টো তাকে পুরষ্কৃতও করা হবে৷
৮৮. অর্থাৎ প্রকৃতিগতভাবে তাঁর দরবারই বান্দার আসল ফিরে আসার জায়গা এবং নৈতিক দিক দিয়েও তাঁর দরবারই এমন একটি জায়গা যেদিকে তার ফিরে আসা উচিত৷ আবার ফলাফলের দিক দিয়েও তাঁর দরবারের দিকে ফিরে আসা লাভজনক৷ নয়তো দ্বিতীয় এমন কোন জায়গা নেই যেখানে এসে মানুষ শাস্তি থেকে বাঁচতে পারে অথবা পুরষ্কার পেতে পারে৷ এছাড়া এর অর্থ এও হয় যে, এমন একটি দরবারের দিকে ফিরে যায় যেখানে সত্যি ফিরে যাওয়া যেতে পারে , যেটি সর্বোত্তম দরবার , সমস্ত কল্যাণ যেখান থেকে উৎসারিত হয় , যেখান থেকে লজ্জিত অপরাধীকে খেদিয়ে দেওয়া হয় না বরং ক্ষমা ও পুরস্কৃত করা হয় , যেখানে ক্ষমা প্রার্থনাকারীর অপরাধ গণনা করা হয় না বরং দেখা হয় সে তাওবা করে নিজের কতটুকু সংশোধন করে নিয়েছে এবং যেখানে বান্দা এমন প্রভুর সাক্ষাত পায় যিনি প্রতিশোধ নেবার জন্য উঠেপড়ে লাগেন না বরং নিজের লজ্জাবনত গোলামের জন্য রহমতের দরজা খুলে দেন৷
৮৯. এরও দু'টি অর্থ হয়৷ এক, তারা কোন মিথ্যা সাক্ষ্য দেয় না এবং এমন কোন জিনিসকে প্রকৃত ঘটনা ও সত্য হিসেবে গণ্য করে না যাকে প্রকৃত ঘটনা ও সত্য বলে তারা জানে না৷ অথবা তারা যাকে প্রকৃত ঘটনা ও সত্যের বিরোধী ও বিপরীত বলে নিশ্চিতভাবে জানে ৷ দুই , তারা মিথ্যা প্রত্যক্ষ করে না , দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মিথ্যাচার দেখে না এবং তা দেখার সংকল্প করে না৷ এ দ্বিতীয় অর্থের দিক দিয়ে মিথ্যা শব্দটি বাতিল ও অকল্যাণের সমার্থক৷ খারাপ কাজের গায়ে শায়তান যে বাহ্যিক স্বদ চাকচিক্য ও লাভের প্রলেপ লাগিয়ে রেখেছে তার প্রতি আকৃষ্ট হয়েই মানুষ সেদিকে যায়৷ এ প্রলেপ অপসৃত হলে প্রত্যেকটি অসৎ কাজ মিথ্যা ও কৃত্রিমতায় পরিপূর্ণ দেখা যায়৷ এ ধরনের মিথ্যার জন্য মানুষ কখনো প্রাণপাত করতে পারে না৷ কাজেই প্রত্যেকটি বাতিল , গোনাহ ও খারাপ কাজ এদিক দিয়ে মিথ্যা যে , তা মিথ্যা চাকচিক্যের কারণে মানুষকে নিজের দিকে টেনে নেয়৷ মু'মিন যেহেতু সত্যের পরিচয় লাভ করে তাই এ মিথ্যা যতই হৃদয়গ্রাহী যুক্তি অথবা দৃষ্টিনন্দন শিল্পকারিতা কিংবা শ্রুতিমধুর সুকণ্ঠের পোষাক পরিহিত হয়ে আসুক না কেন এসব যে তার নকল রূপ , তা সে চিনে ফেলে৷
৯০. এখানে মুলে لـغـو শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে৷ উপরে যে মিথ্যার ব্যাখ্যা করা হয়েছে لـغـو শব্দটি তার উপরও প্রযুক্ত হয় এবং এই সংগে সমস্ত অর্থহীন ,আজেবাজে ফালতু কথাবার্তা ও কাজও এর অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়৷ আল্লাহর সৎ বান্দাদের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে তারা জেনে শুনে এ ধরনের কথা ও কাজ দেখতে বা শুনতে অথবা তাতে অংশ গ্রহণ করতে যায় না৷ আর যদি কখনো তাদের পথে এমন কোন জিনিস এসে যায় , তাহলে তার প্রতি একটা উড়ো নজর না দিয়েও তারা এভাবে সে জায়গা অতিক্রম করে যেমন একজন অত্যন্ত সুরুচিসম্পন্ন ব্যক্তি কোন ময়লার স্তূপ অতিক্রম করে চলে যায়৷ ময়লা ও পচা দুর্গন্ধের ব্যাপারে একজন কুরুচিসম্পন্ন ও নোংরা ব্যক্তিই আগ্রহ পোষণ করতে পারে কিন্তু একজন সুরুচিসম্পন্ন ভদ্রলোক বাধ্যতামূলক পরিস্থিতির শিকার হওয়া ছাড়া কখনো তার ধারে কাছে যাওয়াও বরদাশত করতে পারে না৷ দুর্গন্ধের স্তুপের কাছে বসে আনন্দ পাওয়ার তো প্রশ্নই উঠে না৷ (আরো বেশি ব্যাখ্যার জন্য দেখুন তাফহীমুল কুরআন, সূরা আল মূ'মিনূন ৪ টীকা৷)
৯১. মূল শব্দগুলো হচ্ছে لَمْ يَخِرُّوا عَلَيْهَا صُمًّا وَعُمْيَانًا এর শাব্দিক তরজমা হচ্ছে, "তারা তার ওপর অন্ধ ও বোবা হয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে না৷ কিন্তু এখানে "ঝাঁপিয়ে পড়া আভিধানিক অর্থে নয় বরং পারিভাষিক অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে৷ যেমন আমরা কথায় বলি, "জিহাদের হুকুম শুনে বসে রইলো৷" এখানে বসে থাকা শব্দটি আভিধানিক অর্থে নয় বরং জিহাদের জন্য না ওঠা ও নড়াচড়া না করা অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে৷ কাজেই আয়াতের অর্থ হচ্ছে, তারা এমন লোক নয় যারা আল্লাহর আয়াত শুনে একটুও নড়ে না বরং তারা তার দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত হয়৷ সংশ্লিষ্ট আয়াতগুলোতে যেসব নির্দেশ দেয়া হয়েছে তারা সেগুলো মেনে চলে৷ যেটি ফরয করা হয়েছে তা অবশ্য পালন করে৷ যে কাজের নিন্দা করা হয়েছে তা থেকে বিরত থাকে৷ যে আযাবের ভয় দেখানো হয়েছে তার কল্পনা করতেই তাদের হৃদয় কেঁপে ওঠে৷
৯২. অর্থাৎ তাদেরকে ঈমান ও সংকাজের তাওফীক দান করো এবং পবিত্র-পরিচ্ছন্ন চারিত্রিক গুণাবলীর অধিকারী করো কারণ একজন মু'মিন তার স্ত্রী ও সন্তানদের দৈহিক সৌন্দর্য ও আয়েম-আরাম থেকে নয় বরং সদাচার ও সচ্চরিত্রতা থেকেই মানসিক প্রশান্তি লাভ করে৷ দুনিয়ায় যারা তার সবচেয়ে প্রিয় তাদেরকে দোজখের ইন্ধনে পরিণত হতে দেখার চাইতে বেশী কষ্টকর জিনিস তার কাছে আর কিছুই নেই৷ এ অবস্থায় স্ত্রীর সৌন্দর্য ও সন্তানদের যৌবন ও প্রতিভা তার জন্য আরো বেশী মর্মজ্বালার কারণ হবে৷ কারণ সে সব সময় এ মর্মে দু:খ করতে থাকবে যে, এরা সবাই নিজেদের এসব যোগ্যতা ও গুণাবলী সত্ত্বেও আল্লাহর আযাবের শিকার হবে৷এখানে বিশেষ করে এ বিষয়টি দৃষ্টি সমক্ষে রাখা উচিত যে, এ আয়াতটি যখন নাযিল হয় তখন মক্কার মুসলমানদের মধ্যে এমন একজনও ছিলেন না যার প্রিয়তম আত্মীয় কুফরী ও জাহেলিয়াতের মধ্যে অবস্থান করছিল না৷ কোন স্বামী ঈমান এনে থাকলে তার স্ত্রী তখনো কাফের ছিল৷ কোন স্ত্রী ঈমান এনে থাকলে তার স্বামী তখনো কাফের ছিল৷ কোন যুবক ঈমান এনে থাকলে তার মা-বাপ, ভাই, বোন সবাই তখনো কাফের ছিল৷ আর কোন বাপ ঈমান এনে থাকলে তার যুবক পুত্ররা কুফরীর ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল৷ এ অবস্থায় প্রত্যেকটি মুসলমান একটি কঠিন আত্মিক যন্ত্রণা ভোগ করছিল এবং তার অন্তর থেকে যে দোয়া বের হচ্ছিল তার সর্বোত্তম প্রকাশ এ আয়াতে করা হয়েছে৷ "চোখের শীতলতা" শব্দ দু'টি এমন একটি অবস্থার চিত্র অংকন করেছে যা থেকে বুঝা যায়, নিজের প্রিয়জনদেরকে কুফরী ও জাহেলিয়াতের মধ্যে ডুবে থাকতে দেখে এক ব্যক্তি এতই কষ্ট অনুভব করছে যেন তার চোখ ব্যথায় টনটন করছে এবং সেখানে খচখচ করে কাঁটার মতো বিঁধছে৷ দ্বীনের প্রতি তারা যে ঈমান এনেছে তা যে পূর্ণ আন্তরিকতা সহকারেই এনেছে- একথাই এখানে বর্ণনা করা হয়েছে৷ তাদের অবস্থা এমন লোকদের মতো নয় যাদের পরিবারের লোকেরা বিভিন্ন ধর্মীয় দল ও উপদলে যোগ দেয় এবং সব ব্যাংকে আমাদের কিছু না কিছু পুঁজি আছে এই ভেবে সবাই নিশ্চিন্ত থাকে৷
৯৩. অর্থাৎ তাকওয়া-আল্লাহভীতি ও আল্লাহর প্রতি আনুগত্যের ক্ষেত্রে আমরা সবার চেয়ে এগিয়ে যাবো৷ কল্যাণ ও সৎকর্মশীলতার ক্ষেত্রে সবার অগ্রগামী হবো৷ নিছক সৎকর্মশীলই হবো না বরং সৎকর্মশীলদের নেতা হবো এবং আমাদের বদৌলতে সারা দুনিয়ায় কল্যাণ ও সৎকর্মশীলতা প্রসারিত হবে৷ একথার মর্মার্থ এই যে , এরা এমন লোক যারা ধন-দৌলত ও গৌরব-মাহাত্মের ক্ষেত্রে নয় বরং আল্লাহভীতি ও সৎকর্মশীলতার ক্ষেত্রে পরস্পরের অগ্রবর্তী হবার চেষ্টা করে৷ কিন্তু আমাদের যুগে কিছু লোক এ আয়াতটিকেও নেতৃত্ব লাভের জন্য প্রার্থী হওয়া ও রাষ্ট্রক্ষমতা লাভের জন্য অগ্রবর্তী হওয়ার বৈধতার প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করেছে৷ তাদের মতে আয়াতের অর্থ হচ্ছে, "হে আল্লাহ! মুত্তাকীদেরকে আমাদের প্রজা এবং আমাদেরকে তাদের শাসকে পরিণত করো৷" বস্তুত, ক্ষমতা ও পদের প্রার্থীরা ছাড়া আর কারে কাছে এ ধরনের ব্যাখ্যা প্রশংসনীয় হতে পারে না৷
৯৪. সবর শব্দটি এখানে ব্যাপকতর অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে৷ যেমন সত্যের শত্রুদের জুলুম-নির্যাতনের মোকাবিলা সহিষ্ণুতা ও দৃঢ়তার সাথে করা৷ সত্য দীনকে প্রতিষ্ঠিত ও তার মর্যাদা সমুন্নত রাখার প্রচেষ্টা ও সংগ্রামে সব ধরনের বিপদ-আপদ ও কষ্ট বরদাশত করা৷ সব রকমের ভীতি ও লোভ-লালসার মোকাবিলায় সঠিক পথে দৃঢ়পদ থাকা৷ শয়তানের সমস্ত প্ররোচনা ও প্রবৃত্তির যাবতীয় কামনা সত্ত্বেও কর্তব্য সম্পাদন করা৷ হারাম থেকে দূরে থাকা এবং আল্লাহ নির্ধারিত সীমার মধ্যে অবস্থান করা৷ গোনাহের যাবতীয় স্বাদ ও লাভ প্রত্যাখ্যান করা এবং সৎকাজে ও সঠিক পথে অবস্থানের প্রত্যেকটি ক্ষতি ও তার বদৌলতে অর্জিত প্রতিটি বঞ্চনা মেনে নেওয়া ৷ মোটকথা এ একটি শব্দের মধ্যে দ্বীন এবং দ্বীনী মনোভাব , কর্মনীতি ও নৈতিকতার একটি বিশাল জগত আবদ্ধ করে রাখা হয়েছে৷
৯৫. মূলে ْغُرْفَه শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে৷ এর মানে উঁচু দালান৷ সাধারণত এর অনুবাদে "বালাখানা" শব্দটি ব্যবহার করা হয়৷ এ থেকে একতলা বা দোতলা করে ধারণা মনের পাতায় ভেসে ওঠে৷ অথচ সত্য বলতে কি দুনিয়ায় মানুষ যতই বৃহদাকার ও উচ্চতম ইমারত তৈরি করুক না কেন এমন কি মানুষের অবচেতন মনে জান্নাতের ইমারতের যেসব নকশা সংরক্ষিত আছে ভারতের তাজমহল ও আমেরিকার আকাশচুম্বী ইমারতগুলো (Sky-scrapers)ও তার কাছে নিছক কতিপয় কদাকার কাঠামো ছাড়া আর কিছুই নয়৷
৯৬. অর্থাৎ যদি তোমরা আল্লাহর কাছে প্রার্থনা না করো , তাঁর ইবাদাত না করো এবং নিজেদের প্রয়োজন ও অভাব পূরণের জন্য তাঁকে সাহায্যের জন্য না ডাকো , তাহলে আল্লাহর দৃষ্টিতে তোমাদের কোন গুরুত্বই নেই৷ এ কারণে তিনি নগণ্য তৃণখণ্ডের সমানও তোমাদের পরোয়া করবেন না৷ নিছক সৃষ্টি হবার দিক দিয়ে তোমাদের ও পাথরের মধ্যে কোন ফারাক নেই৷ আল্লাহর কোন প্রয়োজন পূরণ করতে হলে তোমাদের উপর নির্ভর করতে হয় না৷ তোমরা বন্দেগী না করলে তাঁর কোন কাজ ব্যাহত হবে না৷ তোমাদের তাঁর সামনে হাত পাতা এবং তাঁর কাছে প্রার্থনা করাই তাঁর দৃষ্টিকে তোমাদের প্রতি আকৃষ্ট করে৷ এ কাজ না করলে তোমরা নিক্ষিপ্ত হবে ময়লা আবর্জনার মতো৷