(২৫:৪৫) তুমি কি দেখ না কিভাবে তোমার রব ছায়া বিস্তার করেন? তিনি চাইলে একে চিরন্তন ছায়ায় পরিণত করতেন৷ আমি সূর্যকে করেছি তার পথ-নির্দেশক৷৫৮
(২৫:৪৬) তারপর (যতই সূর্য উঠতে থাকে) আমি এ ছায়াকে ধীরে ধীরে নিজের দিকে গুটিয়ে নিতে থাকি৷৫৯
(২৫:৪৭) আর তিনিই রাতকে তোমাদের জন্য পোশাক,৬০ ঘুমকে মৃত্যুর শান্তি এবং দিনকে জীবন্ত হয়ে উঠার সময়ে পরিণত করেছেন৷৬১
(২৫:৪৮) আর নিজের রহমতের আগেভাগে বাতাসকে সুসংবাদদাতারুপে পাঠান৷ তারপর আকাশ থেকে বর্ষণ করেন বিশুদ্ধ পানি ৬২
(২৫:৪৯) একটি মৃত এলাকাকে তার মাধ্যমে জীবন দান করার এবং নিজের সৃষ্টির মধ্য থেকে বহুতর পশু ও মানুষকে তা পান করবার জন্য৷৬৩
(২৫:৫০) এ বিস্ময়কর কার্যকলাপ আমি বার বার তাদের সামনে আনি ৬৪ যাতে তারা কিছু শিক্ষা গ্রহণ করে কিন্তু অধিকাংশ লোক কুফরী ও অকৃতজ্ঞতা ছাড়া অন্য কোন মনোভাব পোষণ করতে অস্বীকার করে৷৬৫
(২৫:৫১) যদি আমি চাইতাম তাহলে এক একটি জনবসতিতে এক একজন ভীতিপ্রদর্শনকারী পাঠাতে পারতাম৷” ৬৬
(২৫:৫২) কাজেই হে নবী, কাফেরদের কথা কখনো মেনে নিয়ো না এবং এ কুরআন নিয়ে তাদের বিরুদ্ধে বৃহত্তম জিহাদ করো৷৬৭
(২৫:৫৩) আর তিনিই দুই সাগরকে মিলিত করেছেন৷ একটি সুস্বাদু ও মিষ্ট এবং অন্যটি লোনা ও খার৷ আর দু’য়ের মাঝে একটি অন্তরাল রয়েছে, একটি বাধা তাদের একাকার হবার পথে প্রতিবন্ধক সৃষ্টি করে রেখেছে৷৬৮
(২৫:৫৪) আর তিনিই পানি থেকে একটি মানুষ তৈরি করেছেন, আবার তার থেকে বংশীয় ও শ্বশুরালয়ের দু’টি আলাদা ধারা চালিয়েছেন৷৬৯ তোমার রব বড়ই শক্তি সম্পন্ন৷
(২৫:৫৫) এক আল্লাহকে বাদ দিয়ে লোকেরা এমন সব সত্তার পূজা করছে যারা না তাদের উপকার করতে পারে, না অপকার৷ আবার অতিরিক্ত হচ্ছে এই যে, কাফের নিজের রবের মোকাবিলায় প্রত্যেক বিদ্রোহীর সাহায্যকারী হয়ে আছে৷৭০
(২৫:৫৬) হে মুহাম্মদ৷ তোমাকে তো আমি শুধুমাত্র একজন সুসংবাদ দানকারী ও সতর্ককারী করে পাঠিয়েছি৷৭১
(২৫:৫৭) এদের বলে দাও “একাজের জন্য আমি তোমাদের কাছ থেকে কোন প্রতিদান চাই না, যে চায় সে তার নিজের রবের পথ অবলম্বন করুক, এটিই আমার প্রতিদান৷৭১(ক)(ক)
(২৫:৫৮) হে মুহাম্মদ ! ভরসা করো এমন আল্লাহর প্রতি যিনি জীবিত এবং কখনো মরবেন না৷ তাঁর সপ্রশংস পবিত্রতা ও মহিমা বর্ণনা করো৷ নিজের বান্দাদের গোনাহের ব্যাপারে কেবল তাঁরই জানা যথেষ্ট
(২৫:৫৯) তিনিই ছয়দিনে আকাশ মন্ডলী ও পৃথিবী এবং তাদের মাঝখানে যা কিছু আছে সব তৈরি করে রেখে দিয়েছেন, তারপর তিনিই (বিশ্ব-জাহানের সিংহাসন) আরশে সমাসীন হয়েছেন,৭২ তিনিই রহমান, যে জানে তাকে জিজ্ঞেস করো তাঁর আবস্থা সম্পর্কে৷
(২৫:৬০) তাদেরকে যখন বলা হয়, এই রহমানকে সিজদাহ করো তখন তারা বলে, “রহমান কি? তুমি যার কথা বলবে তাকেই কি আমারা সিজদা করেত থাকবো”? ৭৩ এউপদেশটি উল্টো তাদের ঘৃণা আরো বাড়িয়ে দেয়৷৭৪
৫৮. মূলে "দলীল" (دليل) শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে৷ এ শব্দটি এখানে ব্যবহার করা হয়েছে ঠিক এমন একটি অর্থে যে অর্থে ইংরেজী ভাষায় Pilotশব্দটির ব্যবহার হয়৷ মাঝি-মাল্লাদের পরিভাষায় "দলীল" এমন এক ব্যক্তিকে বলা হয় যে নৌকাকে পথ-নির্দেশনা দিয়ে চালাতে থাকে৷ ছায়ার উপর সূর্যকে দলীল করা অর্থ হচ্ছে এই যে , ছায়ার ছড়িয়ে পড়া ও সংকুচিত হওয়া সূর্যের উপরে ওঠা ও নেমে যাওয়া এবং তার উদয় হওয়া ও অস্তে যাওয়ার উপর নির্ভরশীল এবং তার আলামত৷

ছায়া অর্থ আলোক ও অন্ধকারের মাঝামাঝি এমন অবস্থা যা সকঅল বেলা সূর্য ওঠার আগে হয় এবং সারাদিন ঘরের মধ্যে, দেয়ালের পেছনে ও গাছের নিচে থাকে৷

৫৯. নিজের দিকে গুটিয়ে নেয়া মানে হচ্ছে , অদৃশ্য ও বিলীন করে দেয়া ৷ কারণ যে কোন জিনিস ধ্বংস হয় তা আল্লাহরই দিকে ফিরে যায়৷ প্রত্যেকটি জিনিস তাঁর দিক থেকেই আসে এবং তাঁরই দিকে ফিরে যায়৷

এ আয়াতের দু'টি দিক৷ বাহ্যিক ও আভ্যন্তরিক ৷ বাহ্যিক দিক থেকে আয়াতটি মুশরিকদের বলছে , যদি তোমরা পৃথিবীতে পশুর মতো জীবন ধারণ না করতে এবং কিছুটা বুদ্ধি-বিবেচনা ও সচেতনতার সাথে এগিয়ে চলতে , তাহলে প্রতিনিয়ত তোমরা এই যে ছায়া দেখতে পাচ্ছে এটিই তোমাদের এ শিক্ষা দেবার জন্য যথেষ্ঠ ছিল যে , নবী তোমাদের যে তাওহীদের শিক্ষা দিচ্ছেন তা যথার্থই সত্য ও সঠিক৷ তোমাদের সারা জীবন এ ছায়ায় জোয়ার-ভাটার সাথে বিজরিত ৷ যদি চিরন্তন ছায়া হয়ে যায় , তাহলে পৃথিবীতে কোন প্রাণী এমন কি উদ্ভিদও জীবিত থাকতে পারে না৷ কারণ সূর্যের আলো ও উত্তাপের উপর তাদের সবার জীবন নির্ভর করে৷ ছায়া যদি একেবারেই না থাকে তাহলেও জীবন অসাধ্য৷ কারণ সর্বক্ষণ সূর্যের মুখোমুখি থাকার এবং তার রশ্মি থেকে কোন আড়াল না পাওয়ার ফলে কোন প্রাণী এবং কোন উদ্ভিদও বেশীক্ষণ টিকে থাকতে পারে না৷ বরং পানিও উধাও হয়ে যাবে৷ রোদ ও ছায়ার মধ্যে যদি হঠাৎ করে পরিবর্তন হতে থাকে তাহলে পৃথিবীর সৃষ্টিকূল পরিবেশের এসব আকস্মিক পরিবর্তন বেশীক্ষণ বরদাশত করতে পারবে না৷ কিন্তু একজন মহাজ্ঞানী স্রষ্টা ও সর্বময় ক্ষমতাসম্পন্ন সত্তা পৃথিবী ও সূর্যের মধ্যে এমন একটি ভারসাম্য প্রতিষ্ঠিত করে রেখেছেন যার ফলে স্থায়ীভাবে একটি নির্দিষ্ট নিয়মে ধীরে ধীরে ছায়া পড়ে ও হ্রাস-বৃদ্ধি হয় এবং রোদ ক্রমান্বয়ে বের হয়ে আসে এবং বাড়তে ও কমতে থাকে৷ এ ধরনের বিজ্ঞ ব্যবস্থাপনা কোন অন্ধ প্রকৃতির হাতে আপনা আপনি প্রতিষ্ঠিত হতে পারে না৷ অথবা বহুসংখ্যক ক্ষমতাসম্পন্ন প্রভুও একে প্রতিষ্ঠিত করে এভাবে একটি ধারাবাহিক নিয়ম-শৃংখলা সহকারে চালিয়ে আসতে পারে না৷

কিন্তু এসব বাহ্যিক শব্দের অভ্যন্তরে থেকে আর একটি সূক্ষ্ম ইংগিতও পাওয়া যায়৷ সেটি হচ্ছে , বর্তমানে এই যে কুফরী ও শির্কের অজ্ঞতায় ছায়া চতুর্দিকে ছেয়ে আছে এটা কোন স্থায়ী জিনিস নয়৷ কুরআন ও মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আকারে হেদায়াতের সূর্য উদিত হয়েছে৷ বাহ্যত ছায়া বিস্তার লাভ করেছে দূর দূরান্তে৷ কিন্তু এ সূর্য যতই উপরে উঠতে থাকবে ততই ছায়া সংকুচিত হতে থাকবে ৷ তবে একটু সবরের প্রয়োজন ৷ আল্লাহর আইন কখনো আকস্মিক পরিবর্তন আনে না৷ বস্তুজগতে যেমন সূর্য ধীরে ধীরে উপরে উঠে এবং ছায়া ধীরে ধীরে সংকুচিত হয় ঠিক তেমনি চিন্তা ও নৈতিকতার জগতেও হেদায়াতের সূর্যের উত্থান ও ভ্রষ্টতার ছায়ার পতন ধীরে ধীরেই হবে৷
৬০. অর্থাৎ ঢাকবার ও লুকাবার জিনিস৷
৬১. এ আয়াতের তিনটি দিক রয়েছে৷ একদিক থেকে এখানে তাওহীদের যুক্তি পেশ করা হচ্ছে৷ দ্বিতীয় দিক থেকে নিত্যদিনকার মানবিক অভিজ্ঞতা ও পর্যবেক্ষণের সাহায্যে মৃত্যুর পরের জীবনের সম্ভাবনার যুক্তি পেশ করা হচ্ছে৷ তৃতীয় দিক থেকে যেভাবে সুসংবাদ দেয়া হচ্ছে যে, জাহেলীয়াতের রাত শেষ হয়ে গেছে, এখন জ্ঞান, চেতনা ও হেদায়াতের উজ্জ্বল দিবালোকের স্ফূরণ ঘটেছে৷ এবং শিগগির বা দেরীতে যেমনি করেই হোক নিদ্রিতরা জেগে উঠবেই৷ তবে যাদের জন্য রাতের ঘুম ছিল মৃত্যু ঘুম তারা আর জাগবে না এবং তাদের না জেগে ওঠা হবে তাদের নিজেদের জন্যই জীবন থেকে হারিয়ে যাওয়া, দিনের কাজ কারবার তাদের কারণে বন্ধ হয়ে যাবে না৷


৬২. অর্থাৎ এমন পানি যা সব ধরনের পংকিলতা থেকেও মুক্ত হয় আবার কোন প্রকার বিষাক্ত পদার্থ ও জীবানুও তার মধ্যে থাকে না৷ যার সাহায্যে নাপাকি ধুয়ে সাফ করা যায় এবং মানুষ, পশু, পাখি, উদ্ভিদ সবাই জীবনী শক্তি লাভ করে৷
৬৩. উপরের আয়াতটির মতো এ আয়াতটিরও তিনটি দিক রয়েছে৷ এর মধ্যে তাওহীদের যুক্তি রয়েছে, পরকালের যুক্তিও রয়েছে এবং এ সংগে এ সূক্ষ বিষয়বস্তুটিও এর মধ্যে প্রচ্ছন্ন রয়েছে যে, জাহেলীয়াতের যুগ ছিল মূলত খরা ও দূর্ভিক্ষের যুগ৷ সে যুগে মানবিকতার ভূমি অনুর্বর ও অনাবাদী থেকে গিয়েছিল৷ এখন আল্লাহ অনুগ্রহ করে নবুওয়াতের রহমতের মেঘমালা পাঠিয়েছেন৷ তা থেকে অহী জ্ঞানের নির্ভেজাল জীবনবারি বর্ষিত হচ্ছে৷ সবাই না হলেও আল্লাহর বহু বান্দা তার স্বচ্ছ ধারায় অবগাহন করতে পারবেই৷
৬৪. মূল শব্দগুলো হচ্ছে وَلَقَدْ صَرَّفْنَاهُ -এর তিনটি অর্থ হতে পারে৷ এক, বারিধারা বর্ষণের এ বিষয়বস্তুটি আমি কুরআনের বিভিন্ন জায়গায় বারবার বর্ণনা করে প্রকৃত সত্য বুঝাবার চেষ্টা করেছি৷ দুই , আমি বারবার গ্রীষ্ম ও খরা, মওসূমী বায়ু , মেঘ , বৃষ্টি এবং তা থেকে আবর্তিত করতে থাকি৷ অর্থাৎ সব সময় সব জায়গায় সমান বৃষ্টিপাত হয় না৷ বরং কখনো কোথাও চলে একদম খরা, কোথাও কম বৃষ্টিপাত হয় , কোথাও চাহিদা অনুযায়ী বৃষ্টিপাত হয় , কোথাও ঘূর্ণিঝড় ও বন্যার আবির্ভাব হয় এবং এসব অবস্থায় বিভিন্ন বিচিত্র ফলাফল সামনে আসতে থাকে৷
৬৫. যদি প্রথম দিক থেকে (অর্থাৎ তাওহীদের যুক্তির দৃষ্টিতে) দেখা যায় , তাহলে আয়াতের অর্থ দাঁড়ায় : লোকেরা যদি চোখ মেলে তাকায় তাহলে নিছক বৃষ্টির ব্যবস্থপনারই মধ্যে আল্লাহর অস্তিত্ব , তাঁর গুণাবলী তাঁর একক রব্বুল আলামীন হবার প্রমাণ স্বরূপ এত বিপুল সংখ্যক নিদর্শন দেখতে পাবে যে , একমাত্র সেটিই নবীর তাওহীদের শিক্ষা সত্য হবার পক্ষে তাদের নিশ্চিন্ত করতে পারে৷ কিন্তু আমি বারবার এ বিষয়বস্তুর প্রতি তাদের দৃষ্টি আর্কষণ করা সত্ত্বেও এবং দুনিয়ায় পানি বণ্টনের এ কার্যকলাপ নিত্যনতুনভাবে একের পর এক তাদের সামনে আসতে থাকলেও এ জালেমরা কোন শিক্ষা গ্রহণ করে না৷ তারা সত্য ও ন্যায়নীতিকে মেনে নেয় না৷ তাদের আমি বুদ্ধি ও চিন্তার যে নিয়ামত দান করেছি তার জন্য কৃতজ্ঞতাও প্রকাশ করে না৷ এমন কি তারা নিজেরা যা কিছু বুঝতো না তা তাদের বুঝাবার জন্য কুরআনের বার বার প্রচেষ্টা চালানো হচ্ছে-এ অনুগ্রহের জন্য শোকর গুজারীও করে না৷

দ্বিতীয় দিক থেকে (অর্থাৎ আখেরাতের যুক্তির দৃষ্টিতে) দেখলে এর অর্থ দাঁড়ায় : প্রতি বছর তাদের সামনে গ্রীষ্ম ও খরায় অসংখ্য সৃষ্টির মৃত্যুমুখে পতিত হবার এবং তারপর বর্ষার বদৌলতে মৃত উদ্ভিদ ও কীটপতঙ্গের জীবিত হয়ে উঠার নাটক অভিনীত হতে থাকে৷ কিন্তু সবকিছু দেখেও এ নির্বোধের দল মৃত্যুর পরের জীবনকে অসম্ভব বলে চলছে৷ বারবার সত্যের এ দ্ব্যর্থহীন নিদর্শনের প্রতি তাদের দৃষ্টি আর্কষণ করা হয় কিন্তু কুফরী ও অস্বীকৃতির অচলায়তন কোনক্রমেই টলে না৷ তাদের বুদ্ধি ও দৃষ্টিশক্তির যে অতুলনীয় নিয়ামত দান করা হয়েছে তার অস্বীকৃতির ধারা কোনক্রমে খতমই হয় না৷ শিক্ষা ও উপদেশ দানের যে অনুগ্রহ তাদের প্রতি করা হয়েছে তার প্রতি অকৃতজ্ঞ মনোভাব তাদের চিরকাল অব্যাহত রয়েছে৷

যদি তৃতীয় দিকটি (অর্থাৎ খরার সাথে জাহেলীয়াতের এবং রহমতের বারিধারার সাথে অহী ও নবুওয়াতের তুলনাকে) সামনে রেখে দেখা হয় তাহলে আয়াতের অর্থ দাঁড়ায় : মানব জাতির ইতিহাসে এ দৃশ্য বার বার সামনে এসেছে যে যখনই এ দুনিয়া নবী ও আল্লাহর কিতাবের কল্যাণসুধা থেকে বঞ্চিত হয়েছে তখনই মানবতা বন্ধ্যা হয়ে গেছে এবং চিন্তা ও নৈতিকতার ভূমিতে কাঁটাগুল্ম ছাড়া আর কিছুই উৎপন্ন হয়নি৷ আর যখনই অহী ও রিসালাতের জীবন বারি এ পৃথিবীতে পৌঁছে গেছে তখনই মানবতার উদ্যান ফলেফুলে সুশোভিত হয়েছে৷ জ্ঞান-বিজ্ঞান মূর্খতা ও জাহেলীয়াতের স্থান দখল করেছে৷ জুলুম-নিপীড়ণের জায়গায় ইনসাফ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে৷ ফাসেকী ও অশ্লীলতার জায়গায় নৈতিক ও চারিত্রিক মাহাত্মের ফুল ফুটেছে৷ যেদিকে তার দান যতটুকু পৌঁছেছে সেদিকেই অসদাচার কমে গেছে এবং সদাচার বেড়ে গেছে৷ নবীদের আগমন সবসময় একটি শুভ ও কল্যাণকর চিন্তা ও নৈতিক বিপ্লবের সূচনা করেছে৷ কখনো এর ফল খারাপ হয়নি৷ আর নবীদের বিধান ও নির্দেশাবলী প্রত্যাখ্যান করে বা তা থেকে বঞ্চিত হয়ে মানব জাতি সব সময় ক্ষতিগ্রস্তই হয়েছে৷ কখনো এর ফল ভালো হয়নি৷ ইতিহাস এ দৃশ্য বারবার দেখিয়েছে এবং কুরআনও বার বার এদিকে ইশারা করেছে৷ কিন্তু এরপরও লোকেরা শিক্ষা নেয় না৷ এটি একটি অমোঘ সত্য৷ হাজার বছরের মানবিক অভিজ্ঞতার ছাপ এর গায়ে লেগে আছে৷ কিন্তু একে অস্বীকার করা হচ্ছে৷ আর আজ নবী ও কিতাবের নিয়ামত দান করে আল্লাহর যে জনপদকে ধন্য করেছেন সে এর শোকর গুজারী করার পরিবর্তে উল্টো অকৃতজ্ঞ মনোভাব প্রকাশের প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে৷
৬৬. অর্থাং এমনটি করা আমার ক্ষমতার বাইরে ছিল না৷ চাইলে আমি বিভিন্ন স্থানে নবীর আবির্ভাব ঘটাতে পারতাম৷ কিন্তু তা আমি করিনি৷ বরং সারা দুনিয়ার জন্য মাত্র একজন নবী পাঠিয়েছি৷ একটি সূর্য যেমন সারা দুনিয়ার জন্য যথেষ্ট ঠিক তেমনি সঠিক পথ প্রদর্শনের এ একমাত্র সূর্যই সারা দুনিয়াবাসীর জন্য যথেষ্ট৷


৬৭. বৃহত্তম জিহাদের তিনটি অর্থ৷ এক, চূড়ান্ত প্রচেষ্টা, অর্থাং চেষ্টা ও প্রাণপাত করার ব্যাপারে মানুষের চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌছে যাওয়া৷ দুই, বড় আকারের প্রচেষ্টা৷ অর্থাং নিজের সমস্ত উপায়-উপকরণ তার মধ্যে নিয়োজিত করা৷ তিন, ব্যাপক প্রচেষ্টা৷ অর্থাং এক্ষেত্রে  প্রচেষ্টার কোন দিক এবং মোকাবিলার কোন ময়দান ছেড়ে না দেয়া৷ প্রতিপক্ষের শক্তি যেসব ময়দানে কাজ করছে সেসব ময়দানে নিজের শক্তি নিয়োজিত করা এবং সত্যের শির উঁচু করার জন্য যেসব দিক থেকে কাজ করার প্রয়োজন হয় সেসব দিক থেকে কাজ করা৷ কণ্ঠ ও কলমের জিহাদ, ধন ও প্রাণের জিহাদ এবং বন্দুক ও কামানের যুদ্ধ সবই এর অন্তর্ভুক্ত৷
৬৮. যেখানে কোন বড় নদী এসে সাগরে পড়ে এমন প্রত্যেক জায়গায় এ অবস্থা হয়৷ এছাড়া সমুদ্রের মধ্যে বিভিন্ন জায়গায় মিঠা পানির স্রোত পাওয়া যায়৷ সমুদ্রের ভীষণ লবণাক্ত পানির মধ্যেও সে তার মিষ্টতা পুরোপুরি বজায় রাখে৷ তুর্কী নৌসেনাপতি সাইয়েদী আলী রইস তাঁর ষোড়শ শতকে লেখিত "মিরআতুল মামালিক" গ্রন্থে পারস্য উপসাগরে এমনিধারার একটি স্থান চিহ্নিত করেছেন৷ তিনি লিখেছেন, সেখানে লবণাক্ত পানির নিচে রয়েছে মিঠা পানির স্রোত৷ আমি নিজে আমাদের নৌসেনাদের জন্য সেখান থেকে পানি সংগ্রহ করেছি৷ বর্তমান যুগে আমেরিকান কোম্পানী যখন সউদী আরবে তেল উত্তোলনের কাজ শুরু করে তখন তারাও শুরুতে পারস্য উপসাগরের এসব স্রোত থেকে পানি সংগ্রহ করতে থাকে৷পরে দাহরানের কাছে পানির কূয়া খনন করা হয় এবং তা থেকে পানি উঠানো হতে থাকে৷ বাহরাইনের কাছেও সমুদ্রের তলায় মিঠা পানির স্রোত রয়েছে৷ সেখান থেকে লোকেরা কিছুদিন আগেও মিঠা পানি সংগ্রহ করতে থেকেছে৷

এ হচ্ছে আয়াতের বাহ্যিক বিষয়বস্তু৷ আল্লাহর শক্তিমত্তার একটি প্রকাশ থেকে এটি তাঁর একক ইলাহ ও একক রব হবার প্রমাণ পেশ করে৷ কিন্তু এর শব্দাবলীর অভ্যন্তর থেকে একটি সূক্ষ ইশারা অন্য একটি বিষয়বস্তুর সন্ধান দেয়৷ সেটি হচ্ছে, মানব সমাজের সমুদ্র যতই লোনা ও ক্ষার হয়ে থাক না কেন আল্লাহ যখনই চান তার তলদেশ থেকে একটি সংকর্মশীল দলের মিঠা স্রোত বের করে আনতে পারেন এবং সমুদ্রের লোনা পানির তরংগগুলো যতই শক্তি প্রয়োগ করুক না কেন তারা এই স্রোত গ্রাস করতে সক্ষম হবে না৷

৬৯. অর্থাৎ নগণ্য এক ফোঁটা পানি থেকে মানুষের মতো এমনি ধরনের একটি বিস্ময়কর সৃষ্টি তৈরি করাটা তো সামান্য কৃতিত্বের ব্যাপার ছিল না কিন্তু তার উপর আরো কৃতিত্ব হচ্ছে এই যে, তিনি মানুষের একটি নয় বরং দু'টি আলাদা আলাদা নমুনা (নর ও নারী) তৈরি করেছেন৷ তারা মানবিক গুণাবলীর দিক দিয়ে একই পর্যায়ভুক্ত হলেও দৈহিক ও মানসিক বৈশিষ্ট্যের ক্ষেত্রে তাদের মধ্যে বিভিন্নতা অনেক বেশী৷ কিন্তু এ বিভিন্নতার কারণে তারা পরস্পর বিরোধী ও বিপরীতমুখী নয় বরং পরস্পরের পুরোপুরি জোড়ায় পরিণত হয়েছে৷ তারপর এ জোড়াগুলো মিলিয়ে তিনি অদ্ভুত ভারসাম্য সহকারে (যার মধ্যে অন্যের কৌশল ও ব্যবস্থাপনার সামান্যতম দখলও নেই) দুনিয়ায় পুরুষও সৃষ্টি করছেন আবার নারীও৷ তাদের থেকে একদিকে পুত্র ও নাতিদের একটি ধারা চলছে৷ তারা অন্যের ঘর থেকে বিয়ে করে স্ত্রী নিয়ে আসছে৷ আবার অন্যদিকে কন্যা ও নাতনীদের একটি ধারা চলছে৷ তারা স্ত্রী হয়ে অন্যের ঘরে চলে যাচ্ছে৷ এভাবে এক পরিবারের সাথে অন্য পরিবার মিশে সারা দেশ এক বংশ ও এক সভ্যতা-সংস্কৃতির সাথে সম্পর্কিত হয়ে যাচ্ছে৷

এখানেও এ বিষয়বস্তুর দিকে একটি সূক্ষ ইংগিত আছে যে, এ সমগ্র জীবন সেক্ষেত্রে যে কর্মকৌশলটি সক্রিয় রয়েছে তার কর্মধারাই কিছুটা এমনি ধরনের যার ফলে এখানে বিভিন্নতা ও বিরোধ এবং তারপর বিভিন্ন বিরোধীয় পক্ষকে জোড়া থেকেই যাবতীয় ফলাফলের উদ্ভব ঘটে৷ কাজেই তোমরা যে বিভিন্নতা ও বিরোধের মুখোমুখি হয়েছো তাতে ভয় পাবার কিছু নেই৷ এটিও একটি ফলদায়ক জিনিস৷

৭০. আল্লাহর বাণীকে সমুন্নত ও তাঁর আইন বিধানকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য দুনিয়ার যেখানে যা কিছু প্রচেষ্টা চলছে কাফেরের সমবেদনা তার প্রতি হবে না বরং তার সমবেদনা হবে এমন সব লোকদের প্রতি যারা সেই প্রচেষ্টা ব্যর্থ করার জন্য নিজেদের সর্বশক্তি নিয়োগ করেছে৷ ৷ অনুরূপভাবে কাফেরের সমস্ত আগ্রহ আল্লাহর হুকুম মেনে চলার ও তাঁর আনুগত্য করার সাথে সম্পৃক্ত হবে না বরং তাঁর হুকুম অমান্য করার সাথে সম্পৃক্ত হবে৷ আল্লাহর হুকুম অমান্য করার কাজ যে যেখানেই করবে কাফের যদি কার্যত তার সাথে শরীক না হতে পারে তাহলে অন্ততপক্ষে জিন্দাবাদ ধ্বনি দিয়েই দেবে৷ এভাবে সে আল্লাহর বিরুদ্ধে বিদ্রোহকারীদের বুকে সাহস যোগাবে৷ অপরদিকে , যদি কেউ আল্লাহর হুকুম পালন করতে থাকে তাহলে কাফের তাকে বাধা দেবার ব্যাপারে একটুও ইতস্তত করবে না৷ নিজে বাধা দিতে না পারলে তাকে হিম্মতহারা করার জন্য যা কিছু সে করতে পারে তা করে ফেলবে৷ এমনকি যদি তার শুধুমাত্র নাক সিটকাবার ক্ষমতা বা সুযোগ থাকে তাহলে তাও করবে৷ আল্লাহর হুকুম অমান্য করার প্রতিটি খবর তার জন্য হবে হৃদয় জুড়ানো সুখবর ৷ অন্যদিকে আল্লাহর হুকুম মেনে চলার প্রতিটি খবর যেন তার কলিজায় তীরের মত বিঁধবে৷
৭১. অর্থাৎ কোন ঈমানদারকে পুরষ্কার এবং কোন অস্বীকারকারীকে শাস্তি দেয়া আপনার কাজ নয়৷ কাউকে জোর করে ঈমানের দিকে টেনে আনা এবং কাউকে জবরদস্তি অস্বীকার করা থেকে দূরে রাখার কাজেও আপনি নিযুক্ত হননি৷ যে ব্যক্তি সত্য-সঠিক পথ গ্রহণ করবে তাকে শুভ পরিণামের সুসংবাদ দেবে এবং যে ব্যক্তি নিজের কু পথে অবিচল থাকবে তাকে আল্লাহর পাকড়াও ও শাস্তির ভয় দেখাবে , তোমার দায়িত্ব এতটুকুই , এর বেশী নয়৷

কুরআন মজীদের যেখানেই এ ধরনের উক্তি এসেছে সেখানেই তার বক্তব্যের মূল লক্ষ্য হচ্ছে কাফের সমাজ ৷ সেখানে এ কথা বলাই তাদের উদ্দেশ্য যে নবী হচ্ছেন একজন নি:স্বার্থ সংস্কারক ,যিনি আল্লাহর সৃষ্টির কল্যাণার্থে আল্লাহর পয়গাম পৌঁছিয়ে থাকেন এবং তাদের শুভ ও অশুভ পরিণাম সম্পর্কে তাদের অবহিত করেন৷ তিনি জোরপূর্বক তোমাদের এ পয়গাম গ্রহণ করতে বাধ্য করেন না৷ এভাবে বাধ্য করলে তোমরা অনর্থক বিক্ষুব্ধ হয়ে সংঘাত সংঘর্ষে লিপ্ত হতে৷ তোমরা যদি মেনে নাও তা হলে এতে তোমাদের নিজেদেরই কল্যাণ হবে , তাঁর কোন ক্ষতি হবে না৷ পয়গাম পৌঁছিয়ে দিয়েই তাঁর দায়িত্ব শেষ, মুসলমানদের ব্যাপারে শুধু তা নন মুসলমানদের জন্য নবী কেবল সুসংবাদদাতাই নন বরং শিক্ষক , পরিশুদ্ধকারী এবং কর্মের আদর্শও৷ মুসলমানদের জন্য তিনি শাসক , বিচারক এবং এমন আমীরও যার আনুগত্য করতে হবে৷ তাঁর মুখ থেকে বের হয়ে আসা প্রতিটি ফরমান তাদের জন্য আইনের মর্যাদা রাখে৷ সর্বান্তকরণে তাদের এ আইন মেনে চলতে হবে৷ কাজেই যার

وَمَا أَرْسَلْنَاكَ إِلَّا مُبَشِّرًا وَنَذِيرًا ও مَا عَلَى الرَّسُولِ إِلَّا الْبَلَاغُ এবং এ ধরনের বিষযবস্তু সম্বলিত অন্যান্য আয়াতকে নবী ও মূ'মিনদের পারস্পরিক সম্পর্কের ভিত্তি হিসেবে গণ্য করেন তারা বিরাট ভুল করে যাচ্ছেন৷

৭১(ক). ব্যাখ্যার জন্য দেখুন তাফহীমুল কুরআন, সূরা আল মূ'মিনূন ৭০ টীকা৷
৭২. মহান আল্লাহর আরশের ওপর সমাসীন হবার বিষয়টি ব্যাখ্যার জন্য দেখুন তাফহীমুল কুরআন, সূরা আল আরাফ ৪১-৪২, ইউনুস ৪ এবং হূদ ৭ টীকা৷

পৃথিবী ও আকাশমন্ডলী ছ'দিনে তৈরি করার বিষয়টি মুতাশাবিহাতের অন্তরভূক্ত৷ এর অর্থ নির্ধারণ করা কঠিন৷ হতে পারে একদিন অর্থ একটি যুগ, আবার এও হতে পারে, দুনিয়ায় আমরা একদিন বলতে যে সময়টুকু বুঝি একদিন অর্থ সেই পরিমাণ সময়৷ (বিস্তারিত ব্যাখ্যার জন্য দেখুন তাফহীমুল কুরআন সূরা হা-মীম-আস্ সাজদাহ ১১-১৫ টীকা)৷


৭৩. একথা তারা বলতো আসলে নিছক কাফের সুলভ ঔদ্ধত্য ও গোয়ার্তুমির বশে৷ যেমন ফেরাউন মূসাকে বলেছিল وَمَا رَبُّ الْعَالَمِينَ "রব্বুল আলামীন আবার কি ?" অথচ মক্কার কাফেররা রহমান তথা দয়াময় আল্লাহ সম্পর্কে বেখবর ছিল না এবং ফেরাউনও রব্বুল আলামীন সম্পর্কে অনবহিত ছিল না৷ কোন কোন মুফাসসির এর ব্যাখ্যা এভাবে করেছেন যে, আরবদের মধ্যে আল্লাহর "রহমান" নামটি বেশী প্রচলিত ছিল না , তাই তারা এ আপত্তি করেছে৷ কিন্তু আয়াতের প্রকাশ ভংগী থেকে প্রতীয়মান হচ্ছে যে, না জানার কারণে এ আপত্তি করা হয়নি বরং করা হয়েছিল জাহেলীয়াতের প্রাবল্যের কারণে৷ নয়তো এজন্য পাকড়াও করার পরিবর্তে আল্লাহ নরমভাবে তাদের বুঝিয়ে দিতেন যে , এটাও আমারই একটি নাম , এতে অবাক হবার কিছু নেই৷ তা ছাড়া একথা ঐহিহাসিকভাবেও প্রমাণিত যে, আরবে প্রাচীনকাল থেকে রহমান শব্দটি আল্লাহর জন্য ব্যবহৃত হয়ে আসছে এবং এটা বহুল প্রচলিত ও পরিচিত শব্দ ছিল৷ দেখুন তাফহীমুল কুরআন, সুরা আস সাজদা-৫ ও সাবা ৩৫ টীকা৷
৭৪. এখানে তেলাওয়াতের সিজদা করার ব্যাপারে সকল আলেম একমত৷ প্রত্যেক কুরআন পাঠক ও শ্রোতার এ জায়গায় সিজদা করা উচিত৷ তাছাড়া যখনই কেউ এ আয়াতটি শুনবে জবাবে বলবে, زَادَنا اللهُ خُضُوْعًا مَّا زَادَ لِلْأَعْدَاءِ نُفُوْرًا "আল্লাহ করুন, ইসলামের দুশমনদের ঘৃণা যত বাড়ে আমাদের আনুগত্য ও বিনয় যেন ততই বাড়ে৷" এটি একটি সুন্নাত৷