(২৫:৩৫) আমি মুসাকে কিতাব দিয়েছিলাম ৪৮ এবং তার সাথে তার ভাই হারুনকে সাহায্যকারী হিসেবে লাগিয়েছিলাম
(২৫:৩৬) আর তাদের বলেছিলাম, যাও সেই সম্প্রদায়ের কাছে যারা আমার আয়াতকে মিথ্যা বলেছে৷৪৯ শেষ পর্যন্ত তাদের আমি ধ্বংস করে দিলাম৷
(২৫:৩৭) একই অবস্থা হলো নূহের সম্প্রদায়েরও যখন তারা রসূলদের প্রতি মিথ্যা আরোপ করলো,৫০ আমি তাদের ডুবিয়ে দিলাম এবং সারা দুনিয়ার লোকদের জন্য একটি শিক্ষণীয় বিষয়ে পরিণত করলাম, আর এ জালেমদের জন্য আমি যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি ঠিক করে রেখেছি৷ ৫১
(২৫:৩৮) এভাবে আদ ও সামূদ এবং আসহাবুর রস্ ৫২ ও মাঝখানের শতাব্দীগুলোর বহু লোককে ধ্বংস করে দেয়া হয়েছে৷
(২৫:৩৯) তাদের প্রত্যেককে আমি (পূর্বে ধ্বংস প্রাপ্তদের) দৃষ্টান্ত দিয়ে দিয়ে বুঝিয়েছি এবং শেষ পর্যন্ত প্রত্যেককে ধ্বংস করে দিয়েছি৷
(২৫:৪০) আর সেই জনপদের ওপর দিয়ে তো তারা যাতায়াত করেছে যার ওপর নিকৃষ্টতম বৃষ্টি বর্ষণ করা হয়েছিল৷৫৩ তারা কি তার অবস্থা দেখে থাকেনি? কিন্তু তারা মৃত্যুর পরের জীবনের আশাই করে না৷৫৪
(২৫:৪১) তারা যখন তোমাকে দেখে, তোমাকে বিদ্রুপের পাত্রে পরিণত করে৷ (বলে), “এ লোককে আল্লাহ রসূল করে পাঠিয়েছেন?
(২৫:৪২) এতো আমাদের পথভ্রষ্ট করে নিজেদের দেবতাদের থেকেই সরিয়ে দিতো যদি না আমরা তাদের প্রতি অঠল বিশ্বাসী হয়ে থাকতাম৷৫৫ বেশ, সে সময় দূরে নয় যখন শাস্তি দেখে তারা নিজেরাই জানবে ভ্রষ্টতায় কে দূরে চলে গিয়েছিল৷
(২৫:৪৩) কখনো কি তুমি সেই ব্যক্তির অবস্থা ভেবে দেখেছো, যে তার নিজের প্রবৃত্তির কামনাকে প্রভু রূপে গ্রহণ করেছে? ৫৬ তুমি কি এহেন ব্যক্তিকে সঠিক পথে নিয়ে আসার দায়িত্ব নিতে পার৷
(২৫:৪৪) তুমি কি মনে করো তাদের অধিকাংশ লোক শোনে ও বোঝে? তারা পশুর মতো বরং তারও অধম৷৫৭
৪৮. এখানে কিতাব বলে সম্ভবত তাওরাত নামে পরিচিতি গ্রন্থটিকে বুঝানো হচ্ছে না, যা মিসর থেকে বনী ইসরাঈলদের নিয়ে বের হবার সময় হযরত মূসাকে দেয়া হয়েছিল৷ বরং এখানে এমন সব নির্দেশের কথা বলা হচ্ছে, যেগুলো নবুওয়াতের দায়িত্বে নিয়োজিত হবার সময় থেকে নিয়ে মিসর থেকে বের হওয়া পর্যন্ত হযরত মূসাকে দেয়া হয়েছিল৷ এর অন্তর্ভুক্ত রয়েছে ফেরাউনের দরবারে হযরত মূসা যে ভাষণ দিয়েছিলেন সেটি এবং ফেরাউনের বিরুদ্ধে সংগ্রাম চালাবার সময় যে সব নির্দেশ তাঁকে দেয়া হয়েছিল সেগুলোও৷ কুরআন মজীদের বিভিন্নস্থানে এগুলোর উল্লেখ আছে৷ কিন্তু যতদূর মনে হয় তাওরাতে এগুলো অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি৷ দশটি বিধানের মাধ্যমে তাওরাতের সূচনা হয়েছে৷ বনী ইসলাঈলকে নিয়ে মিসর ত্যাগ করার সময় সিনাই এলাকার তূর পাহাড়ে প্রস্তর ফলকে লিখিত আকারে তাঁকে এগুলো দেয়া হয়েছিল৷
৪৯. অর্থাং হযরত ইয়াকুব (আ) ও হযরত ইউসূফের (আ) মাধ্যমে যেসব আয়াত তাদের কাছে পৌছেছিল এবং পরবর্তীকালে বনী ইসরাঈলের সংকর্মশীলরা তাদের কাছে যেগুলো প্রচার করেছিলেন৷
৫০. যেহেতু মানুষ কখনো নবী হতে পারে একথা মেনে নিতে তারা অস্বীকার করেছিল , তাই তাদের এ মিথ্যাচার কেবলমাত্র নূহের বিরুদ্ধেই ছিল না বরং মূলত নবুওয়াতের পদকেই তারা অস্বীকার করেছিল৷
৫১. অর্থাৎ আখেরাতের শাস্তি৷
৫২. আসহাবুর রস্ কারা ছিল, এ সম্পর্কে অনুসন্ধান করা সম্ভব হয়নি৷ তাফসীরকারগণ এ সম্পর্কে বিভিন্ন বর্ণনার উল্লেখ করেছেন৷ কিন্তু তাদের কোন বর্ণনাই সন্তোষজনক নয়৷ বড় জোর এতটুকু বলা যেতে পারে, তারা এমন এক সম্প্রদায় ছিল যারা তাদের নবীকে কূয়ার মধ্যে ফেলে দিয়ে বা ঝুলিয়ে রেখে হত্যা করেছিল৷ আরবী ভাষায় "রাস্স" বলা হয় পুরাতন বা অন্ধ কূপকে৷
৫৩. অর্থাৎ লূত জাতির জনপদ৷ নিকৃষ্টতম বৃষ্টি মানে পাথর বৃষ্টি ৷ কুরআনের বিভিন্ন জায়গায় একথা বলা হয়েছে৷ হিজায বাসীদের বানিজ্য কাফেলা ফিলিস্তিন ও সিরিয়া যাবার পথে এ এলাকা অতিক্রম করতো৷ সেখানে তারা কেবল ধ্বংসাবশেষ দেখতো না বরং আশপাশের বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মুখে লূত জাতির শিক্ষণীয় ধ্বংস কাহিনীও শুনতো৷
৫৪. অর্থাৎ যেহেতু তারা পরকাল বিশ্বাস করে না তাই নিছক একজন দর্শক হিসেবে এ ধ্বংসাবশেষ প্রত্যক্ষ করেছে৷ এ থেকে কোন শিক্ষা নেয়নি৷ এ থেকে জানা যায় , পরকাল বিশ্বাসী ও পরকাল অবিশ্বাসীর দৃষ্টির মধ্যে রয়েছে কত বড় ফারাক ৷ একজন নিছক বা কীর্তিকলাপ দেখে অথবা বড়জোড় ইতিহাস রচনা করে৷ কিন্তু অন্যজন ঐসব জিনিস থেকেই নৈতিক শিক্ষা গ্রহণ করে এবং জীবনের অন্তরালে প্রচ্ছন্ন প্রকৃত সত্যের নাগাল পায়৷
৫৫. কাফেরদের এ দু'টি কথা পরস্পর বিরোধী৷ প্রথম কথাটি থেকে জানা যায়, তারা নবীকে (সা) তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করছে এবং তাঁকে বিদ্রুপ করে তাঁর মর্যাদা হ্রাস করতে চাচ্ছে৷ তারা যেন বলতে চাচ্ছে, নবী (সা) তাঁর মর্যাদার চাইতে অনেক বেশী বড় দাবী করেছেন৷ দ্বিতীয় কথা জানা যায়, তারা তাঁর যুক্তির শক্তি ও ব্যক্তিত্বের মতা মেনে নিচ্ছে এবং স্বতস্ফূর্তভাবে স্বীকার করে নিচ্ছে যে, তারা সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ ও হঠকারিতার আশ্রয় নিয়ে নিজেদের আরাধ্য দেবতাদের বন্দনায় অবিচল না থাকলে এ ব্যক্তি তাদের পায়ের তলা থেকে মাটি সরিয়ে নিতেন৷ ইসলামী আন্দোলন তাদেরকে কি পরিমাণ আতংকিত করে তুলছিল এই পরস্পর বিরোধী কথা থেকে স্পষ্ট হয়ে উঠছে৷ বেহায়ার মতো যখন তামাশা-বিদ্রুপ করতো তখন হীনমন্যতা বোধের পীড়নে অনিচ্ছাকৃতভাবে তাদের মুখ থেকে এমন সব কথা বের হয়ে যেতো যা থেকে এ শক্তিটি তাদের মনে কি পরিমাণ আতংক সৃষ্টি করেছে তা স্পষ্ট বুঝা যেতো৷
৫৬. প্রবৃত্তির কামনাকে মাবুদে পরিণত করার মানে হচ্ছে , তার পূজা করা৷ আসলে এটাও ঠিক মূর্তি পূজা করা বা কোন সৃষ্টিকে উপাস্য পরিণত করার মতই শির্ক ৷ আবু উমামাহ রেওয়ায়াত করেছেন , রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন :

مَا تَحْتَ ظِلِّ السَّمَاءِ مِنْ إِلَهٍ يُعْبَدُ مِنْ دُونِ اللَّهِ، أَعْظَمُ مِنْ عِنْدِ اللَّهِ مِنْ هَوًى مُتَّبَعٍ

"এ আকাশের নীচে যতগুলো উপাস্যের উপাসনা করা হয়ে থাকে , তাদের মধ্যে আল্লাহর কাছে সবচেয়ে নিকৃষ্ট উপাস্য হচ্ছে এমন প্রবৃত্তির কামনা করা যার অনুসরণ করা হয়৷" (তাবরানী) [আরো বেশী ব্যাখ্যার জন্য দেখুন আল কাহ্ফ ৫০ টীকা৷]

যে ব্যক্তি নিজের কামনাকে বুদ্ধির অধীনে রাখে এবং বুদ্ধি ব্যবহার করে নিজের জন্য ন্যায় ও অন্যায়ের পথের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেয় , সে যদি কোন ধরনের শির্কী বা কুফরী কর্মে লিপ্ত হয়েও পড়ে তাহলে তাকে বুঝিয়ে সঠিক পথে আনা যেতে পারে এবং সে সঠিক পথ অবলম্বন করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করার পর তার উপর অবিচল থাকবে এ আস্থাও পোষণ করা যেতে পারে৷ কিন্তু প্রবৃত্তির দাস হচ্ছে একটি লাগামহীম উট৷ তার কামনা তাকে যেদিকে নিয়ে যাবে সে পথহারা হয়ে সেদিকেই দৌড়াতে থাকবে৷ তার মনে ন্যায় ও অন্যায় এবং হক ও বাতিলের মধ্যে ফারাক করার এবং একটিকে ত্যাগ করে অন্যটিকে গ্রহণ করার কোন চিন্তা আদৌ সক্রিয় থাকে না৷ তাহলে কে তাকে বুঝিয়ে সঠিক পথে আনতে পারে ? আর ধরে নেয়া যাক ,যদি সে মেনেও নেয় তাহলে তাকে কোন নৈতিক বিধানের অধীন করে দেয়া কোন মানুষের সাধ্যয়ত্ত নয়৷
৫৭. অর্থাৎ গরু-ছাগলের দল যেমন জানে না তাদের যারা হাঁকিয়ে নিয়ে যাচ্ছে তারা তাদের চারণক্ষেত্রের দিকে নিয়ে যাচ্ছে , না কসাইখানার দিকে নিয়ে যাচ্ছে , তারা কেবল চোখ বন্ধ করে যারা হাঁকিয়ে নিয়ে যাচ্ছে তাদের ইশারায় চলতেই থাকে , ঠিক তেমনি এ জনসাধারণও তাদের নিজেদের শয়তানী প্রবৃত্তি ও পথ ভ্রষ্টকারী নেতাদের ইশারায় চোখ বন্ধ করে চলতেই থাকছে৷ তারা জানে না তাদের হাঁকিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে কল্যাণের দিকে , না ধ্বংসের দিকে৷ এ পর্যন্ত তাদের অবস্থা গরু-ছাগলের সাথে তুলনীয় ৷ কিন্তু গরু-ছাগলকে আল্লাহ বুদ্ধিজ্ঞান ও চেতনা শক্তি দান করেননি৷ তারা যদি চারণক্ষেত্র ও কসাইখানার মধ্যে কোন পার্থক্য না করে থাকে তাহলে এতে অবাক হবার কিছু নেই৷ তবে অবাক হতে হয় যখন দেখা যায় একদল মানুষ যাদের আল্লাহ বুদ্ধি-জ্ঞান ও চেতনা শক্তি দান করেছেন এবং তারপরও তারা গরু-ছাগলের মতো অসচেতনতা ও গাফলতির মধ্যে ডুবে রয়েছে৷

কেউ যেন প্রচার-প্রচারণাকে অর্থহীন গণ্য করা এ ভাষণের উদ্দেশ্য বলে মনে না করেন৷ আর নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সম্বোধন করে এ কথাগুলো এজন্য বলা হচ্ছে না যে, তিনি যেন লোকদেরকে অনর্থক বুঝাবার চেষ্টা ত্যাগ করেন৷ আসলে শ্রোতাদের উদ্দেশ্যেই এ বক্তব্য রাখা হয়েছে, যদিও বাহ্যত সম্বোধন নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি বলে প্রতীয়মান হচ্ছে৷ আসলে তাদের এ কথা শুনানো উদ্দেশ্য যে, ওহে গাফেলরা! তোমাদের এ অবস্থা কেন? আল্লাহ্ কি তোমাদের বুদ্ধি-বিবেক এজন্য দিয়েছেন যে, তোমরা দুনিয়ায় পশুদের মত জীবন যাপন করবে?