(২৫:১) বড়ই বরকত সম্পন্ন তিনি যিনি এ ফুরকান যাতে সে সারা বিশ্ববাসীর জন্য সতর্ককারী হয়৷ তারঁ বান্দার ওপর নাযিল করেছেন
(২৫:২) যিনি পৃথিবী ও আকাশের রাজত্বের মালিক, যিনি কাউকে পুত্র হিসেবে গ্রহণ করেননি, যাঁর সাথে রাজত্বে কেউ শরীক নেই, যিনি প্রত্যেকটি জিনিস সৃষ্টি করেছেন তারপর তার একটি তাকদীর নির্ধারিত করে দিয়েছেন৷
(২৫:৩) লোকেরা তাঁকে বাদ দিয়ে এমন সব উপাস্য তৈরি করে নিয়েছে যারা কোন জিনিস সৃষ্টি করে না বরং নিজেরাই সৃষ্ট, যারা নিজেদের জন্যও কোন উপকার বা অপকার করার ক্ষমতা রাখে না, যারা না জীবন -মৃত্যু দান করতে পারে আর না মৃতদেরকে আবার জীবিত করতে পারে৷ ১০
(২৫:৪) যারা নবীর কথা মেনে নিতে অস্বীকার করেছে তারা বলে, এ ফুরকান একটি মনগড়া জিনিস, যাকে এ ব্যক্তি নিজেই তৈরি করেছে এবং অপর কিছু লোক তার এ কাজে তাকে সাহায্য করেছে৷ বড়ই জুলুম ১১ ও ডাহা মিথ্যায় তারা এসে পৌছেছে৷
(২৫:৫) বলে, এসব পুরাতন লোকদের লেখা জিনিস - যেগুলো এ ব্যক্তি লিখিয়ে নিয়েছে এবং তা তাকে সকাল-সাঁঝে শুনানো হয়৷
(২৫:৬) হে মুহাম্মদ! বলো, “একে নাযিল করেছেন তিনিই যিনি পৃথিবী ও আকাশমন্ডলীর রহস্য জানেন৷” ১২ আসলে তিনি বড়ই ক্ষমাশীল ও দয়ার্দ্র৷১৩
(২৫:৭) তার বলে, “এ কেমন রসূল, যে খাবার খায় এবং হাটে বাজারে ঘুরে বেড়ায়?১৪ কেন তার কাছে কোন ফেরেশতা পাঠানো হয়নি, যে তার সাথে থাকতো এবং (অস্বীকারকারীদেরকে)১৫ ধমক দিতো?
(২৫:৮) অথবা আর কিছু না হলেও তার জন্য অন্তত কিছু ধন-সম্পদ অবতীর্ণ করা হতো অথবা তার কাছে থাকতো অন্তত কোন বাগান, যা থেকে সে (নিশ্চিন্তে ) রুজি সংগ্রহ করতো ?”১৬ আর জালেমরা বলে, “তোমরা তো একজন যাদুগ্রস্ত ১৭ ব্যক্তির অনুসরণ করছো৷”
(২৫:৯) দেখো, কেমন সব উদ্ভট ধরনের যুক্তি তারা তোমর সামনে খাড়া করেছে, তারা এমন বিভ্রান্ত হয়েছে যে, কোন কাজের কথাই তাদের মাথায় আসে না ৷১৮
১. মূলে تَبَارَكَ শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে৷ এর পূর্ণ অর্থ এক শব্দে তো দূরের কথা এক বাক্যে বর্ণনা করাও কঠিন৷ এর শব্দমূল রয়েছে ب - ر - ك অক্ষরত্রয়৷ এ থেকে بَرَكَة ও بُرُوك দু'টি ধাতু নিষ্পন্ন হয়৷ بَرَكَة এর মধ্যে রয়েছে বৃদ্ধি, সমৃদ্ধি, বিপুলতা, প্রাচুর্যের ধারণা৷ আর بُرُوك এর মধ্যে স্থায়িত্ব, দৃঢ়তা, অটলতা ও অনিবার্যতার ধারণা রয়েছে৷ তারপর এ ধাতু থেকে যখন تَبَارَكَ এর ক্রিয়াপদ তৈরী করা হয় তখন تفاعل এর বৈশিষ্ট্য হিসেবেএর মধ্যে বাড়াবাড়ি , অতিরঞ্জন ও পূর্ণতার প্রকাশের অর্থ শামিল হয়ে যায়৷ এ অবস্থায় এর অর্থ দাঁড়ায় চরম প্রাচুর্য , বর্ধমান প্রাচুর্য ও চূড়ান্ত পর্যায়ের স্থায়িত্ব৷ এ শব্দটি বিভিন্ন সময় বিভিন্ন রূপে কোন জিনিসের প্রাচুর্য বা তার দৃঢ়তা ও স্থায়িত্বের অবস্থা বর্ণনা করার জন্য বলা হয়ে থাকে৷ যেমন কখনো এর অর্থ হয় উচ্চতায় অনেক বেশী এগিয়ে যাওয়া৷ বলা হয়, تباركت النخلة অর্থাৎ অমুক খেজুর গাছটি অনেক উঁচু হয়ে গেছে৷ আসমায়ী বলেন , এক বন্ধু একটি উঁচু টিলায় উঠে পড়ে এবং নিজের সাথীদেরকে বলতে থাকে تَبَارَكْتُ عَلَيْكُمْ "আমি তোমাদের চাইতে উঁচু হয়ে গেছি৷" কখনো মর্যাদায় ও শ্রেষ্ঠত্বে বেশী অগ্রসর হবার ক্ষেত্রে এ শব্দটি বলা হয়৷ কখনো একে ব্যবহার করা হয় দয়া ও সমৃদ্ধি পৌঁছানো এবং শুভ ও কল্যাণের ক্ষেত্রে অগ্রসরতার জন্য৷ কখনো এ থেকে পবিত্রতার পূর্ণতা ও চূড়ান্ত বিশুদ্ধতার অর্থ গ্রহণ করা হয়৷ এর স্থায়িত্ব ও অনিবার্যতার অর্থের অবস্থাও একই৷ পরিবেশ ও পরিস্থিতি এবং পূর্বাপর বক্তব্যই বলে দেয় কোথায় একে কোন উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হয়েছে৷ এখানে সামনের দিকে যে বিষয়বস্তু বর্ণনা করা হয়েছে তাকে দৃষ্টি সমক্ষে রাখলে বুঝা যায় , এ ক্ষেত্রে আল্লাহর জন্য تَبَارَكَ শব্দটি এক অর্থে নয় বরং বহু অর্থে ব্যবহার করা হয়েছে৷ যেমন :

এক : মহা অনুগ্রহকারী ও সর্বজ্ঞ৷ কারণ , তিনি নিজের বান্দাকে ফুরকানের মহান নিয়ামত দান করে সারা দুনিয়াকে জানিয়ে দেবার ব্যবস্থা করেছেন৷

দুই : বড়ই মর্যাদাশালী ও সম্মানীয় ৷ কারণ , পৃথিবী ও আকাশে তাঁরই রাজত্ব চলছে৷

তিন : বড়ই পবিত্র ও পরিচ্ছন্ন ৷ কারণ , তাঁর সত্তা সকল প্রকার শির্কের গন্ধমুক্ত৷ তাঁর সমজাতীয় কেউ নেই৷ ফলে আল্লাহর সত্তার সার্বভৌমত্বে তাঁর কোন নজির ও সমকক্ষ নেই৷ তাঁর কোন ধ্বংস ও পরিবর্তন নেই৷ কাজেই তাঁর স্থলভিষিক্তের জন্য কোন পুত্রের প্রয়োজন নেই৷

চার : বড়ই উন্নত ও শ্রেষ্ঠ ৷ কারণ , সমগ্র রাজত্ব তাঁরই কতৃর্ত্বাধীন৷ তাঁর ক্ষমতায় অংশীদার হবার যোগ্যতা ও মর্যাদা কারো নেই৷

পাঁচ : শক্তির পূর্ণতার দিক দিয়ে শ্রেষ্ঠ৷ কারণ, তিনি বিশ্ব-জাহানের প্রত্যেকটি জিনিস সৃষ্টিকারী ও তার ক্ষমতা নির্ধারণকারী৷ (আরো বেশী ব্যাখ্যার জন্য দেখুন- তাফহীমুল কুরআন, আল মু'মিনূন ১৪ ও আল ফুরকান ১৯ নং টীকা৷)
২. অর্থাৎ কুরআন মজীদ৷ فُرقَان শব্দটি ধাতুগত অর্থে ব্যবহার করা হয়েছে৷ এর শব্দমূল হচ্ছে ف - ر - ق অক্ষরত্রয়৷ এর অর্থ হচ্ছে দু'টি জিনিসকে আলাদা করা৷ অথবা একই জিনিসের অংশ আলাদা আলাদা হওয়া৷ কুরআন মজীদের জন্য এ শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে পার্থক্যকারী হিসেবে অথবা যার মধ্যে পার্থক্য করা হয়েছে অর্থে৷ অথবা এর উদ্দেশ্য হচ্ছে অতিরঞ্জন৷ অর্থাৎ পৃথক করার ব্যাপারে এর পারদর্শিতা এতই বেশী যেন সে নিজেই পৃথক৷ যদি একে প্রথম ও তৃতীয় অর্থে নেয়া হয়৷ তাহলে এর সঠিক অনুবাদ হবে মানদণ্ড , সিদ্ধান্তকর জিনিস ও নির্ণায়ক (CRITERION)৷ আর যদি দ্বিতীয় অর্থে নেয়া হয় তাহলে এর অর্থ হবে পৃথক পৃথক অংশ সম্বলিত এবং পৃথক পৃথক সময়ে আগমনকারী অংশ সম্বলিত জিনিস৷ কুরআন মজীদকে এ দু'টি দিক দিয়েই আল ফুরকান বলা হয়েছে৷
৩. মূলে نَزَّلَ শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে৷ এর মানে হয় ক্রমান্বয়ে ও সামান্য সামান্য করে নাযিল করা৷ এ মুখবন্ধসূচক বিষয়বস্তুর সম্পর্ক সামনের দিকে ৩২ আয়াত অধ্যায়নকালে জানা যাবে৷ সেখানে "এ কুরআন সম্পূর্ণটা একই সময় নাযিল করা হয়নি কেন" মক্কার কাফেরদের এ আপত্তি আলোচনা করা হয়েছে৷
৪. অর্থাৎ সাবধান বাণী উচ্চারণকারী এবং গাফিলতি ও ভ্রষ্টতার অশুভ ফলাফলের ভীতি প্রদর্শনকারী৷ এ ভীতি প্রদর্শনকারী ফুরকানও হতে পারে আবার যে বান্দার উপর ফুরকান নাযিল করা হয়েছে তিনিও হতে পারেন৷ শব্দটি এমন ব্যাপক অর্থবোধক যে, উভয় অর্থই এখানে প্রযোজ্য হতে পারে৷ আর প্রকৃত অর্থে যেহেতু উভয়ই এক এবং উভয়কে একই কাজে পাঠানো হয়েছে তাই বলা যায়, উভয় অর্থই এখানে লক্ষ্য৷ তারপর সারা বিশ্ববাসীর জন্য সতর্ককারী হবার যে কথা এখানে বলা হয়েছে এ থেকে জানা যায় যে, কুরআনের দাওয়াত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের রিসালাত কোন একটি দেশের জন্য নয় বরং সারা দুনিয়ার জন্য এবং কেবলমাত্র নিজেরই যুগের জন্য নয় বরং ভবিষ্যতের সকল যুগের জন্য৷ এ বিষয়বস্তুটি কুরআনের বিভিন্ন স্থানে বিবৃত হয়েছে৷ যেমন বলা হয়েছে :

يَا أَيُّهَا النَّاسُ إِنِّي رَسُولُ اللَّهِ إِلَيْكُمْ جَمِيعًا

"হে মানুষেরা ! আমি তোমাদের সবার প্রতি আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রেরিত"৷ (আ'রাফ, ১৫৮ আয়াত)

وَأُوحِيَ إِلَيَّ هَذَا الْقُرْآَنُ لِأُنْذِرَكُمْ بِهِ وَمَنْ بَلَغَ

"আমার কাছে এ কুরআন পাঠানো হয়েছে যাতে এর মাধ্যমে আমি তোমাদের এবং যাদের কাছে এটা পৌঁছে যায় তাদের সতর্ক করে দেই৷" (আন'আম , ১৯ আয়াত)

وَمَا أَرْسَلْنَاكَ إِلَّا كَافَّةً لِلنَّاسِ بَشِيرًا وَنَذِيرًا

"আমি তোমাকে সমগ্র মানব জাতির জন্য সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারী করে পাঠিয়েছি"৷ ( সাবা, ২৮ আয়াত)

وَمَا أَرْسَلْنَاكَ إِلَّا رَحْمَةً لِلْعَالَمِينَ

"আর আমি তোমাকে সারা দুনিয়াবাসীর জন্য রহমত বানিয়ে পাঠিয়েছি"৷ (আল আম্বিয়া , ১০৭ আয়াত)

এ বিষয়বস্তুটিকে আরো সুস্পষ্টভাবে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হাদীসে বার বার বর্ণনা করেছেন : بعثت إلى الأحمر والأسود "আমাকে সাদা-কালো সবার কাছে পাঠানো হয়েছে৷"

كان النبي يبعث إلى قومه خاصة بعثت إلى الناس عامة

"প্রথমে একজন নবীকে বিশেষ করে তাঁর নিজেরই জাতির কাছে পাঠানো হতো এবং আমাকে সাধারণভাবে সমগ্র মানব জাতির কাছে পাঠানো হয়েছে৷" (বুখারী ও মুসলিম)

وارسلت إلى الخلق كافة وختم بي النبيون

"আমাকে সমস্ত সৃষ্টির কাছে পাঠানো হয়েছে এবং আমার আগমনে নবীদের ধারাবাহিক আগমন বন্ধ করে দেয়া হয়েছে৷" (মুসলিম)
৫. অন্য অনুবাদ এও হতে পারে, "আকাশ ও পৃথিবীর রাজত্ব তারই জন্য৷" অর্থাৎ এটা তাঁরই অধিকার এবং তারই জন্য এটা নির্দিষ্ট৷ অন্য কারো এ অধিকার নেই এবং এর মধ্যে কারো কোন অংশও নেই৷
৬. অর্থাৎ কারো সাথে তার কোন বংশীয় সম্পর্ক নেই এবং কাউকে তিনি দত্তকও নেননি৷ বিশ্ব-জাহানের এমন কোন সত্তা নেই , আল্লাহর সাথে যার বংশগত সম্পর্ক বা দত্তক সম্পর্কের কারণে সে মাবুদ হবার অধিকার লাভ করতে পারে৷ তাঁর সত্তা একান্ত একক৷ কেউ নেই তাঁর সমজাতীয়৷ আল্লাহর কোন বংশধর নেই যে, নাউযুবিল্লাহ এক আল্লাহর ঔরস থেকে কোন প্রজন্ম চালু হবে এবং একের পর এক বহু আল্লাহর জন্ম নিতে থাকবে৷ কাজেই যে মুশরিক সমাজ ফেরেশতা , জিন বা কোন কোন মানুষকে আল্লাহর সন্তান মনে করে তাদেরকে দেবতা ও উপাস্য গণ্য করেছে তারা পুরোপুরি মূর্খ, অজ্ঞ ও পথভ্রষ্ট৷ এভাবে যারা বংশীয় সম্পর্কের ভিত্তিতে না হলেও কোন বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে একথা মনে করে নিয়েছে যে, বিশ্ব-জাহানের প্রভু আল্লাহ কোন ব্যক্তিকে নিজের পুত্র বানিয়ে নিয়েছেন তারাও নিরেট মূর্খতা ও ভ্রষ্টতার মধ্যে অবস্থান করছে৷ "পুত্র করে নেবার " এ ধারণাটিকে যেদিক থেকেই বিশ্লেষণ করা যাবে অত্যন্ত অযৌক্তিক মনে হবে৷ এর কোন বাস্তব ও ন্যায়সংগত বিষয় হবার প্রশ্নই উঠে না৷ যারা এ ধারণাটি উদ্ভাবন বা অবলম্বন করে তাদের নিকৃষ্ট মানসিকতা ইলাহী সত্তার শ্রেষ্ঠত্ব কল্পনায় অক্ষম ছিল৷ তারা এ অমুখাপেক্ষী ও অসমকক্ষ সত্তাকে মানুষের মতো মনে করে , যে একাকীত্ব ও নির্জনতার ভয়ে ভীত হয়ে অন্য কারো শিশুকে কোলে নিয়ে নেয় কিংবা সবার পরে কেউ তার উত্তরাধিকারী হবে এবং তার নাম ও কাজকে জীবিত রাখবে তাই দত্তক নেবার প্রয়োজন অনুভব করে৷ এ তিনটি কারণেই মানুষের মনে দত্তক নেবার চিন্তা জাগে৷ এর মধ্য থেকে যে কারণটিকেই আল্লাহর ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা হবে তা অবশ্যই মহামূর্খতা বেআদবী ও স্বল্পবুদ্ধিতাই প্রমাণ করবে৷ (আরো বেশি ব্যাখ্যার জন্য দেখুন তাফহীমুল কোরআন, সুরা ইউনুস, ৬৬-৬৮ টীকা)
৭. মূলে مـلـك শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে৷ আরবী ভাষায় এ শব্দটি বাদশাহী , রাজত্ব , সর্বময় কর্তত্ব ও সার্বভৌমত্বের (Sovereignty) অর্থে বলা হয়ে থাকে৷ এর অর্থ হচ্ছে ,মহান আল্লাহই এ বিশ্ব-জাহানের সর্বময় কর্তৃত্বের মালিক এবং তাঁর শাসন ক্ষমতায় কারো সামান্যতমও অংশ নেই৷ একথার স্বতঃস্ফূর্ত ও অনিবার্য ফল এই যে, তাহলে তিনি ছাড়া আর কোন মাবুদ নেই৷ কারণ , মানুষ যাকেই মাবুদে পরিণত করে একথা মনে করেই করে যে, তার কাছে কোন শক্তি আছে যে , তার কাছে কোন শক্তি আছে যে কারণে সে আমাদের উপকার বা ক্ষতি করতে পারে এবং আমাদের ভাগ্যের উপর ভালো-মন্দ প্রভাব ফেলতে পারে৷ শক্তিহীন ও প্রভাবহীন সত্তাদেরকে আশ্রয়স্থল করতে কোন একান্ত নির্বোধ ব্যক্তিও রাজি হতে পারে না৷ এখন যদি একথা জানা যায় যে, মহান আল্লাহ ছাড়া এ বিশ্ব-জাহানে আর কারো কোন শক্তি নেই তাহলে বিনয়-নম্রতা ও অক্ষমতা প্রকাশ করার জন্য কোন মাথা তাঁর ছাড়া আর কারো সামনে ঝুঁকবে না , কোন হাতও তাঁর ছাড়া আর কারো সামনে নজরানা পেশ করার জন্য এগিয়ে যাবে না , কোন কণ্ঠও তাঁর ছাড়া আর কারো প্রশংসা গীতি গাইবে না বা কারো কাছে প্রার্থনা করবে না ও ভিক্ষা চাইবে না এবং দুনিয়ার কোন নিরেট মূর্খ ও অজ্ঞ ব্যক্তিও কখনো নিজের প্রকৃত ইলাহ ছাড়া আর কারো আনুগত্য ও বন্দেগী করার মতো বোকামী করবে না অথবা কারো স্বয়ংসম্পূর্ণ শাসনাধিকার মেনে নেবে না৷"আকাশ ও পৃথিবীর রাজত্ব তাঁরই এবং তাঁরই জন্য" ওপরের এ বাক্যাংশটি থেকে এ বিষয়বস্তুটি আরেআ বেশী শক্তি অর্জন করে৷
৮. অন্য অনুবাদ এও হতে পারে যে , "প্রত্যেকটি জিনিসকে একটি বিশেষ পরিমাণ অনুযায়ী রেখেছেন ৷" অথবা প্রত্যেক জিনিসের জন্য যথাযথ পরিমাপ নির্ধারণ করেছেন৷ কিন্তু যে কোন অনুবাদই করা হোক না কেন তা থেকে পূর্ণ অর্থ প্রকাশ হয় না৷ এর পূর্ণ অর্থ হচ্ছে , আল্লাহ বিশ্ব-জাহানের প্রত্যেকটি জিনিসের কেবল অস্তিত্বই দান করেননি বরং তিনিই প্রত্যেকটি জিনিসকে তার সত্তার সাথে সম্পর্কিত আকার-আকৃতি , দেহ সৌষ্ঠব , শক্তি , যোগ্যতা , গুণাগুণ , বৈশিষ্ট্য , কাজ ও কাজের পদ্ধতি , স্থায়িত্বের সময়-কাল , উত্থান ও ক্রমবিকাশের সীমা এবং অন্যান্য যাবতীয় বিস্তারিত বিষয় নির্ধারণ করেছেন৷ তারপর যেসব কার্য-কারণ , উপায়-উপকরণ ও সুযোগ-সুবিধার বদৌলতে প্রত্যেকটি জিনিস এখানে নিজ পরিসরে নিজের উপর আরোপিত কাজ করে যাচ্ছে তা বিশ্ব-জগতে তিনিই সৃষ্টি করে দিয়েছেন৷

তাওহীদের সমগ্র শিক্ষা এ একটি আয়াতের মধ্যেই ভরে দেয়া হয়েছে৷ এটি কুরআন মজীদের সর্বাত্মক তাৎপর্যবহ আয়াতগুলোর মধ্যে একটি মহান মর্যাদাপূর্ণ আয়াত৷ এর মাত্র কয়েকটি শব্দের মধ্যে এত বিশাল বিষয়বস্তু ভরে দেয়া হয়েছে যে , এর ব্যাপ্তি পরিবেষ্টন করার জন্য পুরোপুরি একটি কিতাব যথেষ্ট বিবেচিত হতে পারে না৷ হাদীসে বলা হয়েছে :

كان النبي صلى الله عليه وسلم : إذا افصح الغلام من بني عبد المطلب علمه هذه الآية -

"নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিয়ম ছিল , তাঁর বংশের কোন শিশু যখন কথা বলা শুরু করতো তখন তিনি তাকে এ আয়াতটি শিখিয়ে দিতেন৷" (মুসান্নাফ আব্দুর রাজ্জাক ও মুসান্নাফ ইবনে আবী শাইবাহ ৷ আমর ইবনে শু'আইব তাঁর পিতা থেকে এবং তিনি তাঁর পিতা থেকে এ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন৷)

এ থেকে জানা যায় মানুষের মনে তাওহীদের পুরোপুরি ধারণা বসিয়ে দেবার জন্য এ আয়াতটি একটি উত্তম মাধ্যম৷ প্রত্যেক মুসলমানের সন্তানের শৈশব যখন বুদ্ধির প্রাথমিক উন্মেষ ঘটে তখনই তার মন-মগজে শুরুতেই এ নকশাটি বসিয়ে দেয়া উচিত৷
৯. এ শব্দগুলো ব্যাপক ও পূর্ণ অর্থ প্রকাশ করে এবং এ থেকে সব ধরনের মনগড়া মাবুদ ও উপাস্য বুঝায়৷ আল্লাহর অনেক সৃষ্টিকে মানুষ মাবুদ বানিয়ে নিয়েছে, যেমন ফেরেশতা , জিন , নবী , আউলিয়া , সূর্য , চাঁদ , গ্রহ-নক্ষত্র , নদ-নদী , গাছ-পালা , পশু ইত্যাদি ৷ আবার মানুষ নিজেই কিছু জিনিস থেকে তৈরী করে তাদেরকে মাবুদ ও উপাস্য বানিয়ে নিয়েছে , যেমন পাথর , কাঠ ও মাটির তৈরী মূর্তি৷
১০. বক্তব্যের সার নির্যাস হচ্ছে মহান আল্লাহ তাঁর এক বান্দার কাছে প্রকৃত সত্য কি তা দেখিয়ে দেবার জন্য এ ফুরকান নাযিল করেন কিন্তু লোকেরা তা থেকে গাফেল হয়ে এ গোমরাহিতে লিপ্ত হয়েছে৷ কাজেই সতর্ককারী ও ভীতি প্রদর্শনকারী করে এক বান্দাকে পাঠানো হয়েছে৷ তিনি লোকদেরকে এ বোকামির অশুভ পরিণাম সম্পকে সতর্ক করবেন৷ তাঁর প্রতি পর্যায়ক্রমে এ ফুরকান নাযিল করা শুরু হয়েছে৷ এর মাধ্যমে তিনি হককে বাতিল থেকে এবং আসলকে নকল থেকে আলাদা করে দেখিয়ে দেবেন৷
১১. অন্য অনুবাদ "বড়ই অন্যায় এ বেইনসাফির কথা"ও হতে পারে৷
১২. বর্তমান যুগে পাশ্চাত্যের প্রাচ্যবিদরা কুরআন মজীদের বিরুদ্ধে এ আপত্তিটিই উত্থাপন করে থাকে৷ কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার হচ্ছে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সমকালীন বৈরী সমাজের একজনও একথা বলেনি যে , শিশুকালে খৃষ্টীয় যাজক বুহাইরার সাথে যখন তোমার দেখা হয়েছিল তখন তার কাছ থেকে এ সমস্ত বিষয় তুমি শিখে নিয়েছিলে ৷ তাদের কেউ একথাও বলেনি যে , যৌবনকালে বাণিজ্যিক সফরে তুমি যখন বাইরে যেতে সে সময় খৃষ্টীয় পাদ্রী ও ইহুদী রাব্বীদের কাছ থেকে তুমি এসব তথ্য সংগ্রহ করেছিলে৷ কারণ এসব সফরের অবস্থা তাদের জানা ছিল ৷ তিনি একাকী এসব সফর করেননি৷ বরং তাদের নিজস্ব কাফেলার সাথে সফর করেছিলেন৷ তারা জানতো , এগুলোর সাথে জড়িত করে বাইরে থেকে কিছু শিখে আসার অভিযোগ তাঁর বিরুদ্ধে উত্থাপন করলে তাদের নিজেদের শহরের হাজার হাজার লোক তাদের মিথ্যুক বলবে৷ তাছাড়া মক্কার প্রত্যেক সাধারণ লোক জিজ্ঞেস করবে , যদি এসব তথ্য এ ব্যক্তি বারো তেরো বছর বয়সেই বুহাইরা থেকে লাভ করে থাকে অথবা ২৫ বছর বয়সে যখন থেকে তার বাণিজ্যিক সফর শুরু হয় তখন থেকেই লাভ করতে থাকে , তাহলে এ ব্যক্তি তো বাইরে কোথাও থাকতো না , আমাদের এ শহরে আমাদের মধ্যেই বাস করতো , এ অবস্থায় চল্লিশ বছর বয়স হওয়া পর্যন্ত তার এসব জ্ঞান অপ্রকাশ থাকলো কেমন করে ? কখনো তার মুখ থেকে এমন একটি শব্দও বের হলো না কেমন করে যার মাধ্যমে তার এ জ্ঞানের প্রকাশ ঘটতো ? এ কারণেই মক্কার কাফেররা এ ধরনের ডাহা মিথ্যার আশ্রয় নেয়নি৷ এটা তারা ছেড়ে দিয়েছিল পরবর্তীকালের আরো বেশী নির্লজ্জ লোকদের জন্য৷ নবুওয়াত পূর্বকাল সম্পর্কে কোন কথা তারা বলতো না৷ তাদের কথা ছিল নবুওয়াত দাবীর সময়ের সাথে সম্পর্কিত ৷ তারা বলতো , এ ব্যক্তি তো নিরক্ষর, নিজে পড়াশুনা করে নতুন জ্ঞান আহরণ করতে পারে না৷ ইতিপূর্বে কিছু শেখেনি৷ আজ এর মুখ থেকে যেসব কথা বের হচ্ছে চল্লিশ বছর বয়স হওয়া পর্যন্ত এগুলোর কোন কথাই সে জানতো না ৷ তাহলে এখন হঠাৎ এসব জ্ঞান আসছে কোথা থেকে ? এগুলোর উৎস নিশ্চয়ই আগের যুগের লোকদের কিছু কিতাব৷ রাতের বেলা চুপিসারে সেগুলো থেকে কিছু কিছু অংশ অনুবাদ করিয়ে লেখানো হয়৷ কাউকে দিয়ে তার অংশ বিশেষ পড়িয়ে এ ব্যক্তি শুনতে থাকে তারপর সেগুলো মুখস্থ করে নিয়ে দিনের বেলা আমাদের শুনিয়ে দেয়৷ হাদীস থেকে জানা যায় , এ প্রসংগে তারা বেশ কিছু লোকের নামও নিতো৷ তারা ছিল আহলি কিতাব৷ তারা লেখাপড়া জানতো এবং মক্কায় বাস করতো৷ অর্থাৎ আদ্দাস (হুওয়াইতিব ইবনে আবদুল উয্যার আজাদকৃত গোলাম) , ইয়াসার (আলা আল-হাদারামির আজাদ করা গোলাম) এবং জাবর (আমের ইবনে রাবী'আর আজাদকৃত গোলাম)৷

আপাতদৃষ্টিতে এটা বড়ই শক্তিশালী অভিযোগ মনে হয়৷ অহীর দাবী নাকচ করার জন্য নবী কোথা থেকে জ্ঞান অর্জন করেন তা চিহ্নিত করার চাইতে বড় ওজনদার আপত্তি আর কি হতে পারে ৷ কিন্তু প্রথম দৃষ্টিতে মানুষ এ ব্যাপারটি দেখে অবাক হয়ে যায় যে , এর জবাবে আদৌ কোন যুক্তিই পেশ করা হয়নি বরং কেবলমাত্র একথা বলেই শেষ করে দেয়া হয়েছে যে , তোমরা সত্যের প্রতি জুলুম করছো , পরিষ্কার বে-ইনসাফীর কথা বলছো , ডাহা মিথ্যার বেসাতি করছো৷ এতো এমন আল্লাহর কালাম যিনি আকাশ ও পৃথিবীর গোপন রহস্য জানেন৷ এ ধরনের কঠোর বিরোধিতার পরিবেশে এমনইতর কঠিন অভিযোগ পেশ করা হয় এবং তাকে এভাবে তাচ্ছিল্য ভরে রদ করে দেয়া হয়, এটা কি বিস্ময়কর নয়? সত্যিই কি এটা এমনি ধরনের তুচ্ছ ও নগণ্য অভিযোগ ছিল? এ জবাবে কি শুধু মাত্র " মিথ্যা ও জুলুম " বলে দেয়াই যথেষ্ট ছিল? এ সংক্ষিপ্ত জবাবের পর সাধারন মানুষ আর কোন বিস্তারিত ও সুস্পষ্ট জবাবের দাবী করেনি, নতুন মু'মিনদের মনেও কোন সন্দেহ দেখা দেয় নি এবং বিরোধীদের কেউও একথা বলার হিম্মত করেনি যে, দেখো, আমাদের এ শক্তিশালী অভিযোগের জবাব দিতে পারছে না, নিছক "মিথ্যা ও জুলুম" বলে একে এড়িয়ে যাবার চেষ্টা চালানো হচ্ছে, এর কারণ কি?

ইসলাম বিরোধীরা যে পরিবেশে এ অভিযোগ করেছিল সেখানেই আমরা এ সমস্যার সমাধান পেয়ে যাবো:

প্রথম কথা ছিল, মক্কার যেসব জালেম সরদার মুসলমানদের মারপিট করছিল ও কষ্ট দিচ্ছিল তারা যেসব লোক সম্পর্কে বলতো যে , তারা পুরাতন কিতাব থেকে অনুবাদ করে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে মুখস্থ করাচ্ছে তাদের গৃহ এবং নবীর (সা) গৃহ অবরোধ করে তাদের নিজেদের কথামত এ কাজের জন্য যেসব বই ও কাগজপত্র জমা করা হয়েছিল সেসব আটক করা তাদের পক্ষে মোটেই কঠিন ব্যাপার ছিল না৷ ঠিক যে সময় এ কাজ করা হচ্ছিল তখনই তারা সেখানে অতর্কিত হামলা চালিয়ে মূল প্রমাণপত্র লোকদের দেখাতে পারতো এবং বলতে পারতো , দেখো, এ তোমাদের নবুওয়াতের প্রস্তুতি চলছে৷ বেলালকে যারা মরুভূমির তপ্ত বালুর বুকে পায়ে দড়ি বেঁধে টেনে ফিরছিল তাদের পক্ষে এ কাজ করার পথে কোন নিয়ম ও আইন-কানুন বাধ্য ছিল না৷ এ পদক্ষেপ গ্রহণ করে তারা চিরকালের জন্য মুহাম্মাদী নবুয়াতের বিপদ দূর করতে পারতো৷ কিন্তু তারা কেবল মুখেই অভিযোগ করে থাকে৷ কোনদিনও এ ধরনের চূড়ান্ত পদক্ষেপ প্রহণে এগিয়ে আসেনি৷

দ্বিতীয় কথা ছিল, এ প্রসংগে তারা যেসব লোকের নাম নিতো তারা কেউ বাইরের লোক ছিল না৷ সবাই ছিল এ মক্কা শহরেরই বাসিন্দা৷ তাদের যোগ্যতা গোপন ছিল না৷ সামান্য বুদ্ধি-বিবেক সম্পন্ন ব্যক্তিও দেখতে পারতো যে , মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যা পেশ করছেন তা কোন পর্যায়ের , তার ভাষা কত উচ্চ পর্যায়ের , সাহিত্য মর্যাদা কত উন্নত , শব্দ ও বাক্য কেমন শিল্পসমৃদ্ধ এবং সেখানে কত উন্নত পর্যায়ের চিন্তা ও বিষয়বস্তুর সমাবেশ ঘটানো হয়েছে৷ অন্যদিকে মুহাম্মাদ (সা) যাদের থেকে এসব কিছু হাসিল করছেন বলে তারা দাবী করছে তারা কোন পর্যায়ের লোক ৷ এ কারণে এ অভিযোগকে কেউই এক কানাকড়ি গুরুত্ব দেয়নি৷ প্রত্যেক ব্যক্তি মনে করতো , এসব কথায় মনের জ্বালা মেটানো হচ্ছে , নয়তো এ কথার মধ্যে সন্দেহ করার মতো একটুও প্রাণশক্তি নেই৷ যারা এসব লোককে জানত না তারাও শেষমেষ এটুকুন কথাও চিন্তা করতে পারত যে, যদি তারা এতই যেআগ্যতা সম্পন্ন হয়ে থাকত, তাহলে তারা নিজেরাই নিজেদের পান্ডিত্যের প্রদীপ জ্বালালো না কেন? অন্য এক জনের প্রদীপে তেল যোগান দেবার কি প্রয়োজন তাদের পড়েছিল? তাও আবার চুপিসারে, যাতে একাজের খ্যাতির সামান্যতম অংশও তাদের ভাগে না পড়ে?

তৃতীয় কথা ছিল, এ প্রসংগে যেসব লোকের নাম নেয়া হচ্ছিল তারা সবাই ছিল বিদেশাগত গোলাম৷ তাদের মালিকরা তাদেরকে স্বাধীন করে দিয়েছিল৷ সেকালের আরবের গোত্রীয় জীবনে কোন ব্যক্তিও কোন শক্তিশালী গোত্রের সাহায্য-সমর্থন ছাড়া বাঁচতে পারতো না৷ কোন সচেতন বুদ্ধিমান ব্যক্তি কি একথা চিন্তা করতো পারতো যে , এরা নিজেদের পৃষ্ঠপোষকদেরকে নারাজ করে দিয়ে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে এ ষড়যন্ত্রে শরীক হয়ে গিয়ে থাকবে ? কি এমন লোভ হতে পারতো যেজন্য তারা সমগ্র জাতির ক্রোধ ও তিরস্কারের লক্ষ্যবস্তু এবং সমগ্র জাতি যাকে শত্রু বলে চিহ্নিত করেছে তার সাথে সহযোগিতা করতো এবং এ ধরনের বিপদগ্রস্ত লোকের কাছ থেকে কোন লাভের আশায় নিজের পৃষ্ঠপোষকদের থেকে বিছিন্ন হয়ে যাওয়ার ক্ষতি বরদাশত করতো ? তারপর তাদের মারধর করে ঐ ব্যক্তির সাথে তাদের ষড়যন্ত্রের স্বীকারোক্তি আদায় করার সুযোগ তাদের পৃষ্ঠপোষকদের তো ছিলই , এটাও চিন্তা করার ব্যাপার ছিল ৷ তারা এ সুযোগ ব্যবহার করেনি কেন ? কেনই বা তারা সমগ্র জাতির সামনে তাদের নিজেদের মুখে এ স্বীকৃতি প্রকাশ করেনি যে , তাদের কাছ থেকে শিখে ও জ্ঞান নিয়ে নবুওয়াতের এ দোকান জমজমাট করা হচ্ছে ?

সবচেয়ে বিস্ময়কর ব্যাপার ছিল এই যে , তারা সবাই মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের উপর ঈমান আনে এবং সাহাবায়ে কেরাম রসূলের পবিত্র সত্তার প্রতি যে নজিরবিহীন ভক্তি-শ্রদ্ধা পোষণ করতেন তারাও তার অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়৷ বানোয়াট ও ষড়যন্ত্রমূলক নবুওয়াত তৈরীর পেছনে যারা নিজেরাই মাল-মশলা যুগিয়েছে তারাই আবার তার প্রতি ঈমান আনবে এবং প্রাণঢালা শ্রদ্ধা সহকারে ঈমান আনবে এটা কি সম্ভব ? আর ধরে নেয়া যাক যদি এটা সম্ভব হয়ে থেকেও থাকে , তাহলে মু'মিনদের জামায়াতে তাদের তো কোন উল্লেখযোগ্য মর্যাদা লাভ করা উচিত ছিল ? আদ্দাস , ইয়াসার ও জাবরের শক্তির উপর নির্ভর করে নবুওয়াতের কাজ-কারবার চলবে আর নবীর দক্ষিণ হস্ত হবেন আবু বকর , উমর ও আবু উবাইদাহ , এটা কেমন করে সম্ভব হলো ?

অনুরূপভাবে এ ব্যাপারটিও ছিল বড়ই অবাক করার মতো , যদি কয়েকজন লোকের সহায়তায় রাতের বেলা বসে নবুওয়াতের এ ব্যবসায়ের কাগজ-পত্র তৈরী করা সম্ভব হয়ে থাকে তাহলে যায়েদ ইবনে হারেসা , আলী ইবনে আবু তালেব , আবু বকর সিদ্দীক ও মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দিবারাত্রের সহযোগী অন্যান্য লোকদের থেকে তা কিভাবে গোপন থাকতে পারতো ? এ অভিযোগের মধ্যে যদি সত্যের সামান্যতম গন্ধও থাকতো , তাহলে এ লোকগুলো কেমন করে এ ধরনের আন্তরিকতা সহকারে নবীর প্রতি ঈমান আনলো এবং তাঁর সমর্থনে সব ধরনের বিপদ-আপদ ও ক্ষতি কিভাবে বরদাশত করলো? এটা কি কোনক্রমেই সম্ভব ছিল ? এসব কারণে প্রত্যেক শ্রোতার কাছে এ অভিযোগ এমনিতেই ছিল অর্থহীন ও অযৌক্তিক ৷ তাই কোন গুরুত্বপূর্ণ অভিযোগের জবাব দেবার জন্য কুরআনে একে উদ্ধৃত করা হয়নি বরং একথা বলার জন্য উদ্ধৃত করা হয়েছে যে , দেখো সত্যের বিরুদ্ধাচরণ করার ক্ষেত্রে এরা কেমন অন্ধ হয়ে গেছে এবং কেমন ডাহা মিথ্যা , অন্যায় ও বে-ইনসাফীর আশ্রয় নিয়েছে৷
১৩. এখানে এ বাক্যাংশটি বড়ই তাৎপর্যপূর্ণ ৷ এর মানে হচ্ছে আল্লাহ কি অপরূপ দয়া ও ক্ষমার আধার ! যারা সত্যকে অপদস্ত করার জন্য এমন সব মিথ্যার পাহাড় সৃষ্টি করে তাদেরকেও তিনি অবকাশ দেন এবং তাদের অপরাধের কথা শুনার সাথে সাথেই তাদের উপর আযাব নাযিল করা আরম্ভ করেন না৷ এ সাবধান বাণীর সাথে সাথে এর মধ্যে উপদেশেরও একটি দিক আছে ৷ সেটি যেন ঠিক এমনি ধরনের যেমন , "হে জালেমরা ! এখনো যদি নিজেদের হিংসা-দ্বেষ থেকে বিরত হও এবং সত্য কথাকে সোজাভাবে মেনে নাও তাহলে আজ পর্যন্ত যা কিছু করতে থেকেছো সবই ক্ষমা করা যেতে পারে ৷"
১৪. অর্থাৎ প্রথমত মানুষের রসূল হওয়াটাই তো অদ্ভূত ব্যাপার৷ আল্লাহর পয়গাম নিয়ে যদি কোন ফেরেশতা আসতো তাহলে না হয় বুঝতাম ৷ কিন্তু একজন রক্ত-মাংসের মানুষ জীবিত থাকার জন্য যে খাদ্যের মুখাপেক্ষী সে কেমন করে আল্লাহর পয়গাম নিয়ে আসে ! যাহোক তবুও যদি মানুষকেই রসূল করা হয়ে থাকে তবে তাকে তো অন্তত বাদশাহ ও দুনিয়ার বড় লোকদের মতো উন্নত পর্যায়ের ব্যক্তিত্ব হওয়া উচিত ছিল৷ তাকে দেখার জন্য চোখ উন্মুখ হয়ে থাকতো এবং তার দরবারে হাজির হবার সৌভাগ্য হতো অনেক দেন-দরবার ও সাধ্য-সাধনার পর৷ কিন্তু তা না হয়ে এমন এক জন্য সাধারণ লোককে কিভাবে পয়গম্বর করে দেয়া হয় যে , বাজারের মধ্যে ঘুরে ঘুরে জুতোর তলা ক্ষয় করতে থাকে ? পথ চলতে মানুষ যাকে প্রতিদিন দেখে এবং কোন দিক দিয়েই যার মধ্যে কোন অসাধারণত্বের সন্ধান পায় না , কে তাকে গ্রাহ্য করবে ? অন্য কথায় রসুলের প্রয়োজন থাকলে তা সাধারণ মানুষকে পথনির্দেশনা দেবার জন্য ছিল না বরং ছিল বিস্ময়কর ব্যাপার ঘটাবার এবং ঠাটবাট দেখাবার ও ভীতি প্রদর্শন করার জন্য৷(আরো বেশি ব্যাখ্যার জন্য দেখুন তাফহীমুল কোরআন, আল মু'মিনূন, ২৬ টীকা )
১৫. অর্থাং যদি মানুষকেই নবী করা হয়ে থাকে তাহলে একজন ফেরেশতাকে তার সংগে দেয়া হতো৷ তিনি সব সময় একটি চাবুক হাতে নিয়ে ঘুরতেন এবং লোকদের বলতেন "এ ব্যক্তির কথা মেনে নাও, নয়তো এখনই আল্লাহর আযাব বর্ষণ করার ব্যবস্থা করছি৷" বিশ্বজাহানের সর্বময় কর্তৃত্বের মালিক এক ব্যক্তিকে নবুওয়াতের মহান মর্যাদাসম্পন্ন দায়িত্ব প্রদান করে এমনি একাকী ছেড়ে দেবেন লোকদের গালিগালাজ ও দ্বারে দ্বারে ধাক্কা খাবার এটা তো বড়ই অদ্ভুত ব্যাপার৷
১৬. এটা যেন ছিল তাদের শেষ দাবী৷ অর্থাৎ আল্লাহ অন্তত এতটুকুই করতেন যে , নিজের রসূলের গ্রাসাচ্ছাদনের কোন ভালো ব্যবস্থা করে দিতেন৷ এ কেমন ব্যাপার , আল্লাহর রসূল আমাদের একজন সাধারণ পর্যায়ের ধনী লোকের চেয়েও খারাপ অবস্থায় থাকেন ! নিজের খরচ চালাবার মতো ধন-সম্পদ নেই , ফল ফলাদি খাবার মতো বাগান নেই একটিও , আবার দাবী করেন তিনি রব্বুল আলামীন, আল্লাহর নবী৷
১৭. অর্থাৎ পাগল৷ আরবদের দৃষ্টিতে পাগলামির কারণ ছিল দু'টো৷ কারো উপর জিনের ছায়া পড়লে সে পাগল হয়ে যেতো অথবা যাদু করে কাউকে পাগল করা হতো৷ তাদের দৃষ্টিতে তৃতীয় আরো একটি কারণও ছিল৷ সেটি ছিল এই যে , কোন দেবদেবীর বিরুদ্ধে কেউ বেআদবী করলে তার অভিশাপ তার উপর পড়তো এবং তার ফলে সে পাগল হয়ে যেতো৷ মক্কার কাফেররা প্রায়ই নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বিরুদ্ধে এ কারণগুলো বর্ণনা করতো৷ কখনো বলতো , এ ব্যক্তির উপর কোন জিন চেপে বসেছে৷ কখনো বলতো , বেচারার উপর কোন দুশমন যাদু করে দিয়েছে৷ আবার কখনো বলতো , আমাদের কোন দেবতার সাথে বেআদবী করার খেসারত এ বেচারা ভুগছে৷ কিন্তু এই সংগে তাঁকে আবার এতটা বুদ্ধিমান ও ধীশক্তি সম্পন্নও মনে করতো যে , এ ব্যক্তি একটি অনুবাদ ভবন কায়েম করেছে এবং সেখানে পুরাতন সব গ্রন্থাদি সংগ্রহ করে তার অংশ বিশেষ বাছাই করে করে মুখস্থ করছে৷ এছাড়া তারা তাঁকে যাদুকরও বলতো৷ অর্থাৎ তিনি নিজে যাদুকরও ছিলেন আবার অন্যের যাদুতে প্রভাবিতও ছিলেন৷ এরপর আর একটি বাড়তি দোষারোপ এও ছিল যে , তিনি কবিও ছিলেন৷
১৮. এ আপত্তি ও অভিযোগগুলোও এখানে মূলত জবাব দেবার জন্য নয় বরং অভিযোগকারীরা হিংসা ও বিদ্বেষে কি পরিমাণ অন্ধ হয়ে গেছে তা বুঝবার জন্য উদ্ধৃত করা হয়েছে৷ উপরে তাদের যেসব কথা উদ্ধৃত করা হয়েছে তার মধ্যে কোন একটিও গুরুত্বসহকারে আলোচনা করার মতো নয়৷ তাদের শুধুমাত্র উল্লেখ করাই একথা বলার জন্য যথেষ্ট যে, বিরোধীদের কাছে ন্যায়সংগত যুক্তির অভাব অত্যন্ত প্রকট এবং নেহাতই বাজে ও বস্তাপঁচা কথার সাহায্যে তার একটি যুক্তি সিদ্ধ ও নীতিগত দাওয়াতের মোকাবিলা করছে৷ এক ব্যক্তি বলছেন, হে লোকেরা! এই যে শিরকের ওপর তোমরা নিজেদের ধর্ম ও সংস্কৃতি-সভ্যতার বুনিয়াদ কায়েম করে রেখেছো এ তো একটি মিথ্যা ও ভ্রান্ত বিশ্বাস এবং এর মিথ্যা ও ভ্রান্ত হবার পেছনে এ যুক্তি কাজ করছে৷ জবাবে শিরকের সত্যতার সপক্ষে কোন যুক্তি পেশ করা হয় না বরং শুধুমাত্র এভাবে একটি বিরূপ ধ্বনি উঠানো হয় যে, আরে এ লোকের ওপর তো যাদু করা হয়েছে৷ তিনি বলছেন, বিশ্ব-জাহানের সমগ্র ব্যবস্থা চলতে তাওহীদের ভিত্তিতে এবং এইসব বিভিন্ন সত্য এর সাক্ষ্য দিচ্ছে৷ জবাবে বড় গলায় ধ্বনিত হচ্ছে- এ ব্যক্তি যাদুকর৷ তিনি বলছেন, দুনিয়ায় তোমাদের লাগামহীন উটের মতো ছেড়ে দেয়া হয়নি বরং তোমাদের রবের কাছে তোমাদের ফিরে যেতে হবে এবং এসব বিবিধ নৈতিক, ঐতিহাসিক এবং যুক্তি ও তথ্যগত বিষয় এ সত্যটি প্রমাণ করছে৷ জবাবে বলা হচ্ছে, আরে এতো একজন কবি৷ তিনি বলছেন, আমি আল্লাহর পক্ষ থেকে তোমাদের কাছে এসেছি সত্যের শিক্ষা নিয়ে এবং সে শিক্ষাটি হচ্ছে এই৷ জবাবে এ শিক্ষার ওপর কোন আলোচনা সমালোচনা করা হয় না বরং প্রমাণ ছাড়াই একটি দোষারোপ করা হয় এই মর্মে যে, এসব কিছুই কোথাও থেকে নকল করা হয়েছে৷ নিজের জীবন ও নিজের চরিত্র ও কার্যাবলী পেশ করছেন এবং তার প্রভাবে তার অনুসারীদের জীবনে যে নৈতিক বিপ্লবের সূচনা হচ্ছিল তাও পেশ করছেন৷ কিন্তু বিরোধিতাকারীরা এর কোনটিও দেখে না৷ তারা কেবল জিজ্ঞেস করছে, তুমি খাও কেন? বাজারে চলাফেরা করো কেন? কোন ফেরেশতাকে তোমার আরদালী হিসেবে দেয়া হয়নি কেন? তোমার কাছে কোন অর্থভান্ডার বা বাগান নেই কেন? এ পক্ষদ্বয়ের মধ্যে কে সত্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত এবং কে এর মোকাবিলায় অক্ষম হয়ে আজেবাজে ও উদ্ভট কথা বলে চলছে এসব কথা আপনাআপনিই তা প্রমাণ করে দিচ্ছিল৷