(২৪:২৭) হে ঈমানদাগণ !২৩ নিজেদের গৃহ ছাড়া অন্যের গৃহে প্রবেশ করো না যতক্ষণ না গৃহবাসীদের সম্মতি লাভ করো২৪ এবং তাদেরকে সালাম করো ৷ এটিই তোমাদের জন্য ভালো পদ্ধতি, আশা করা যায় তোমরা এদিকে নজর রাখবে ৷২৫
(২৪:২৮) তারপর যদি সেখানে কাউকে না পাও, তাহলে তাতে প্রবেশ করো না যতক্ষণ না তোমাদের অনুমতি না দেয়া হয় ৷২৬ আর যদি তোমাদের বলা হয় , ফিরে যাও তাহলে ফিরে যাবে, এটিই তোমাদের জন্য বেশী শালীন ও পরিচ্ছন্ন পদ্ধতি২৭ এবং যা কিছু তোমরা করো আল্লাহ তা খুব ভালোভাবেই জানেন ৷
(২৪:২৯) তবে তোমাদের জন্য কোন ক্ষতি নেই যদি তোমরা এমন গৃহে প্রবেশ করো যেখানে কেউ বাস করে না এবং তার মধ্যে তোমাদের কোন কাজের জিনিস আছে২৮ তোমরা যা কিছু প্রকাশ করো ও যা কিছু গোপন করো আল্লাহ সবই জানেন ৷
(২৪:৩০) নবী ! মু’মিন পুরুষদের বলে দাও তারা যেন নিজেদের দৃষ্টি সংযত করে রাখে ২৯ এবং নিজেদের লজ্জাস্থানসমূহের হেফাজত করে ৷৩০ এটি তাদের জন্য বেশী পবিত্র পদ্ধতি ৷ যা কিছু তারা করে আল্লাহ তা জানেন ৷
(২৪:৩১) আর হে নবী! মু’মিন মহিলাদের বলে দাও তারা যেন তাদের দৃষ্টি সংযত করে রাখে৩১ এবং তাদের লজ্জাস্থানগুলোর হেফাজত করে ৩২ আর ৩৩ তাদের সাজসজ্জা না দেখায়, ৩৪ যা নিজে নিজে প্রকাশ হয়ে যায় তা ছাড়া ৷৩৫ আর তারা যেন তাদের ওড়নার আঁচল দিয়ে তাদের বুক ঢেকে রাখে৷৩৬ তারা যেন তাদের সাজসজ্জা প্রকাশ না করে, তবে নিম্নোক্তদের সামনে ছাড়া ৩৭ স্বামী,বাপ,স্বামীর বাপ,৩৮ নিজের ছেলে, স্বামীর ছেলে,৩৯ ভাই,৪০ ভাইয়ের ছেলে,৪১ বোনের ছেলে,৪২ নিজের মেলামেশার মেয়েদের ,৪৩ নিজের মালিকানাধীনদের,৪৪ অধীনস্থ পুরুষদের যাদের অন্য কোন রকম উদ্দেশ্য নেই ৪৫ এবং এমন শিশুদের সামনে ছাড়া যারা মেয়েদের গোপন বিষয় সম্পর্কে এখনো অজ্ঞ ৷৪৬ তারা যেন নিজেদের যে সৌন্দর্য তারা লুকিয়ে রেখেছে তা লোকদের সামনে প্রকাশ করে দেবার উদ্দেশ্য সজোরে পদক্ষেপ না করে৷৪৭ হে মু’মিনগণ! তোমরা সবাই মিলে আল্লাহর কাছে তাওবা করো,৪৮ আশা করা যায় তোমরা সফলকাম হবে৷৪৯
(২৪:৩২) তোমাদের মধ্যে যারা একা ও নিসংগ৫০ এবং তোমাদের গোলাম ও বাঁদীদের মধ্যে যারা সৎ৫১ ও বিয়ের যোগ্য তাদের বিয়ে দাও ৷৫২ যদি তারা গরীব হয়ে থাকে , তাহলে আল্লাহ আপন মেহেরবানীতে তাদেরকে ধনী করে দেবেন,৫৩ আল্লাহর বড়ই প্রাচুর্যময় ও সবজ্ঞ৷
(২৪:৩৩) আরা যারা বিয়ে করার সুযোগ পায় না তাদের পবিত্রতা ও সাধুতা অবলম্বন করা উচিত, যতক্ষণ না আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে তাদেরকে অভাবমুক্ত করে দেন৷৫৪ আর তোমাদের মালিকানাধীনদের মধ্যে থেকে যারা মুক্তির জন্য লিখিত চুক্তির আবেদন করে ৫৫ তাদের সাথে চুক্তিবদ্ধ হও ৫৬ যদি তাদের মধ্যে কল্যাণের সন্ধান পাও৷ ৫৭ আর আল্লাহ তোমাদের যে সম্পদ দিয়েছেন তা থেকে তাদেরকে দাও৷ ৫৮ আর তোমাদের বাঁদীরা যখন নিজেরাই সতী সাধ্বী থাকতে চায় তখন দুনিয়াবী স্বার্থলাভের উদ্দেশ্যে তাদেরকে দেহ বিক্রয়ে বাধ্য করো না ৷ ৫৯ আর যে তাদেরকে বাধ্য করে, তবে এ জোর-জবরদস্তির পর আল্লাহ তাদের জন্য ক্ষমাশীল ও করুণাময় ৷
(২৪:৩৪) আমি দ্ব্যর্থহীন পথনির্দেশক আয়াত তোমাদের কাছে পাঠিয়েছি, তোমাদের পূর্বে অতিক্রান্ত জাতিদের শিক্ষণীয় দৃষ্টান্তও তোমাদের সামনে উপস্থাপন করেছি এবং মুত্তাকীদের জন্য উপদেশও দিয়েছি৷৬০
২৩. সূরার শুরুতে যেসব বিধান দেয়া হয়েছিল সেগুলো ছিল সমাজে অসৎপ্রবণতা ও অনাচারের উদ্ভব হলে কিভাবে তার গতিরোধ করতে হবে তা জানাবার জন্য৷ এখণ যেসব বিধান দেয়া হচ্ছে সেগুলোর উদ্দেশ্য হচ্ছে সমাজে অসৎবৃত্তির উৎপত্তিটাই রোধ করা এবং সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড এমনভাবে শুধরানো যাতে করে এসব অসৎপ্রবণতা সৃষ্টির পথ বন্ধ হয়ে যায়৷ এসব বিধান অধ্যায়ন করার আগে দু'টি কথা ভালোভাবে মনের মধ্য গেঁথে নিতে হবেঃ

একঃ অপবাদের ঘটনার পরপরই এ বিধান বর্ণনা করা পরিষ্কারভাবে একথাই ব্যক্ত করে যে, রসূলের স্ত্রীর ন্যায় মহান ও উন্নত ব্যক্তিত্বের বিরুদ্ধে এত বড় একটি ডাহা মিথ্যা অপবাদের এভাবে সমাজের অভ্যন্তরে ব্যাপক প্রচারলাভকে আল্লাহ আসলে একটি যৌন কামনাতাড়িত পরিবেশের উপস্থিতির ফল বলে চিহ্নিত করেছেন৷ আল্লাহর দৃষ্টিতে এ যৌন কামনা তাড়িত পরিবেশের বদলানর একমাত্র উপায় এটাই ছিল যে, লোকদের পরস্পরের গৃহে নিসংকোচে আসা যাওয়া বন্ধ করতে হবে, অপরিচিত নারী-পুরুষদের পরস্পর দেখা-সাক্ষাত ও স্বাধীনভাবে মেলামেশার পথ রধ করতে হবে, মেয়েদের্ একটি অতি নিকট পরিবেশের লোকজন ছাড়া গায়ের মুহাররাম আত্মীয়-স্বজন ও অপরিচিতদের সামনে সাজসজ্জা করে যাওয়া নিষিদ্ধ করতে হবে, পতিতাবৃত্তির পেশাকে চিরতরে বন্ধ করে দিতে হবে, পুরুষদের ও নারীদের দীর্ঘকাল অবিবাহিত রাখা যাবে না, এমনকি গোলাম ও বাঁদীদেরও বিবাহ দিতে হবে৷ অন্য কথায় বলা যায়, মেয়েদের পরদাহীনতা ও সমাজে বিপুল সংখ্যক লোকের অবিবাহিত থাকাই আল্লাহর জ্ঞান অনুআয়ী এমন সব মৌলিক কার্যকারণ যেগুলোর মাধ্যমে সামাজিক পরিবশে একটি অননুভূত যৌন কামনা সর্বক্ষণ প্রবাহমান থাকে এবং এ যৌন কামনার বশবর্তী হয়ে লোকদের চোখ, কাণ, কণ্ঠ, মন-মানস সবকিছুই কোন বাস্তব বা কাল্পনিক কেলেংকারিতে (Scandal) জড়িত হবার জন্য সবসময় তৈরী থাকে৷ এ দোষ ও ত্রুটি সংশোধন করার জন্য আলোচ্য পরদার বিধিসমূহের চেয়ে বেশী নির্ভুল, উপযোগী ও প্রভাবশালী অন্য কোন কর্মপন্থা আল্রাহর জ্ঞান-ভাণ্ডারে ছিল না৷ নয়তো তিনি এগুলো বাদ দিয়ে অন্য বিধান দিতেন৷

দুইঃ এ সুযোগে দ্বিতীয় যে কথাটি বুঝে নিতে হবে সেটি হচ্ছে এই যে, আল্লাহর শরীয়াত কোন অসৎকাজ নিছক হারাম করে দিয়ে অথবা তাকে অপরাধ গন্য করে তার জন্য শাস্তি নির্ধারিত করে দেয়াই যথেষ্ট মনে করে না বরং যেসব কার্যকারণ কোন ব্যক্তিকে ঐ অসৎকাজে লিপ্ত হতে উৎসাহিত করে অথবা তার জন্য সুযোগ সৃষ্টি করে দেয় কিংবা তাকে তা করতে বাধ্য করে, সেগুলোকেও নিশ্চিহ্ন করে দেয়৷ তাছাড়া শরীয়াত অপরাধের সাথে সাথে অপরাধের কারণ, অপরাধের উদ্যোক্তা ও অপরাধের উপায়-উপকরণাদির ওপরও বিধি নিষেধ আরোপ করে৷ এভাবে আসল অপরাধের ধারে আছে পৌছার আগেই অনেক দূর থেকেই মানুষকে রুখে দেয়া হয়৷ মানুষ সবসময় অপরাধের কাছ দিয়ে ঘোরাফেরা করতে থাকবে এবং প্রতিদিন পাকড়াও হতে ও শাস্তি পেতে থাকবে, এটাও সে পছন্দ করে না৷ সে নিছক একজন অভিযোক্তাই (Prosecutor) নয় বরং একজন সহানুভূতিশীল সহযোগী, সংস্কারকারী ও সাহায্যকারীও৷ তাই সে মানুষকে অসৎকাজ থেকে নিষ্কৃতিলাভের ক্ষেত্রে সাহায্য করার উদ্দেশ্যই সকল প্রকার শিক্ষামূলক, নৈতিক ও সামাজিক ব্যবস্থা অবলম্বন করে৷
২৪. মূলে ----- শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে৷ লোকেরা সাধারণত একে ----- (অর্থাৎ যতক্ষণ না অনুমতি নাও) অর্থে ব্যবহার করে৷ কিন্তু আসলে উভয় ক্ষেত্রে শাব্দিক অর্থের মধ্যে সূক্ষ্ম পার্থক্য আছে৷ একে উপেক্ষা করা চলে না৷ ----- বললে আয়াতের অর্থ হতোঃ ''কারোর বাড়িতে প্রবেশ করো না যতক্ষণ না অনুমতি নিয়ে নাও৷'' এ প্রকাশ ভংগী পরিহার করে আল্লাহ ----- শব্দ ব্যবহার করেছেন৷ ----- শব্দ ----- ধাতু থেকে উৎপন্ন হয়েছে৷ আমাদের ভাষায় এর মানে হয় পরিচিত, অন্তরংগতা, সম্মতি ও প্রীতি৷ এ দাতু থেকে উৎপন্ন ----- শব্দ যখনই বলা হবে তখনই এর মানে হবে, সম্মতি আছে কি না জানা অথবা নিজের সাথে অন্তরংগ করা৷ কাজেই আয়াতের সঠি অর্থ হবেঃ ''লোকদের গৃহে প্রবেশ করো না যতক্ষণ না তাদেরকে অন্তরংগ করে নেবে অথবা তাদের সম্মতি জেনে নেবে৷'' অর্থাৎ একথা না জেনে নেবে যে, গৃহমালিক তোমার আসাকে অপ্রীতিকর বা বিরক্তিকর মনে করছে না এবং তার গৃহে তোমার প্রবেশকে সে পছন্দ করছে৷ এ জন্য আমি অনুবাদে ''অনুমতি নেবা'র পরিবর্তে 'সম্মতি লাভ' শব্দ ব্যবহার করেছি৷ কারণ এ অর্থটি মূলের নিকটতর৷
২৫. জাহেলী যুগে আরববাসীদের নিয়ম ছিল, তারা ----- (সুপ্রভাত, শুভ সন্ধ্যা) বলতে বলতে নিসংকোচ সরাসরি একজন অন্যজনের গৃহে প্রবেশ করে যেতো৷ অনেক সময় বহিরাগত ব্যক্তি গৃহ মালিক ও তার বাড়ির মহিলাদেরকে বেসামাল অবস্থায় দেখে ফেলতো৷ আল্লাহ এর সংশোধনের জন্য্ এ নীতি নির্ধারণ করেন যে, প্রত্যেক ব্যক্তির যেখানে সে অবস্থান করে সেখানে তার ব্যক্তিগত গোপনীয়তা (Privacy) রক্ষা করার অধিকার আছে এবং তার সম্মতি ও অনুমতি ছাড়া তার এ গোপনীয়তায় হস্তক্ষেপ করা অন্য ব্যক্তির জন্য জায়েয নয়৷ এ হুকুমটি নাযিল হবার পর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সমাজে যেসব নিয়ম ও রীতিনীতির প্রচলন করেন আমি নীচে সেগুলো বর্ণনা করছিঃ

একঃ নবী সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম ব্যক্তিগত গোপনীয়তার এ অধিকারটিকে কেবলমাত্র গৃহের চৌহদ্দীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখেননি৷ বরং একে একটি সাধারণ অধীকার গণ্য করেন৷ এ প্রেক্ষিতে অন্যের গৃহে উঁকি ঝুঁকি মারা, বাহির থেকে চেয়ে দেখা এমনি অন্যের চিঠি তার অনুমতি ছাড়া পড়ে ফেলা নিষিদ্ধ৷ হযরত সওবান (নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আজাদ করা গোলাম) বর্ণনা করেছেন, নবী করীম (সা) বলেনঃ

-----

''দৃষ্টি যখন একবার প্রবশ করে গেছে তখন আর নিজের প্রবেশ করার জন্য অনুমতি নেবার দরকার কি?'' (আবু দাউদ)

হযরত হুযাইল ইবনে শুরাহবীল বলেন, এক ব্যক্তি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সালামের কাছে এলেন এবং ঠিক তাঁর দরজার ওপর দাঁড়িয়ে অনুমতি চাইলেন৷ নবী (সা) তাকে বললেন, ----- ''পিছনে সরে গিয়ে দাঁড়াও, যাতে দৃষ্টি না পড়ে সে জন্যই তো অনুমতি চাওয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে৷' (আবু দাউদ) নবী করীমের (সা) নিজের নিয়ম ছিল এই যে, যখন কারোর বাড়িতে যেতেন, দরজার ঠিক সামনে কখনো দাঁড়াতেন না৷ কারণ সে যুগে ঘরের দরজায় পরদা লটকানো থাকত না৷ তিনি দরজার ডান পাশে বা বাম পাশে দাঁড়িয়ে অনুমতি চাইতেন৷ (আবু দাউদ) রসূলুল্লাহর (সা) খাদেম হযরত আনাস বলন, এক ব্যক্তি বাইরে থেকে রসূলের (সা) কামরার মধ্যে উঁকি দিলেন৷ রসূলুল্লাহর (সা) হাতে সে সময় একটি তীর ছিল৷ তিনি তার দিকে এভাবে এগিয়ে এলেন যেন তীরটি তার পেটে ঢুকিয়ে দেবেন৷ (আবু দাউদ) হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস বর্ণনা করেন, নবী (সা) বলেছেনঃ

-----

''যে ব্যক্তি তার ভাইয়ের অনুমতি ছাড়া তার পত্রে চোখ বুলালো সে যেন আগুনের মধ্যে দৃষ্টি ফেলছে৷'' (আবুদ দাউদ)

বুখারী ও মুসলিমে উদ্ধৃত হয়েছে,নবী (সা) বলেছেনঃ

-----

''যদি কোন ব্যক্তি তোমার গৃহে উঁকি মারে এবং তুমি একটি কাঁকর মেরে তার চোখ কানা করে দাও, তাহলে তাতে কোন গোনাহ হবে না৷''

এ বিষয়বস্তু সম্বলিত অন্য একটি হাদীসে বলা হয়েছেঃ

----------

''যে ব্যক্তি কারোর ঘরে উঁকি মারে এবং ঘরের লোকেরা তার চোখ ছেঁদা করে দেয়, তবে তাদের কোন জবাবদিহি করতে হবে না৷''

ইমাম শাফঈ এ হাদীসটিকে একদম শাব্দিক অর্থে গ্রহণ করেছেন এবং তিনি কেউ ঘরের মধ্যে উঁকি দিলে তার চোখ ছেঁদা করে দেবার অনুমতি দিয়েছেন৷ কিন্তু হানাফীগণ এর অর্থ নিযেছেন এভাবে যে, নিছক দৃষ্টি দেবার ক্ষেত্রে এ হুকুমটি দেয়া হয়নি৷ বরং এটি এমন অবস্থায় প্রযোজ্য যখন কোন ব্যক্তি বিনা অনুমতিতে গৃহমধ্যে প্রবেশ করে, গৃহবাসীদের বাধা দেয়ায়ও সে নিরস্ত হয় না এবং গৃহবাসীরা তার প্রতিরোধ করতে থাকে৷ এ প্রতিরোধ ও সংঘাতের মধ্যে যদি তার চোখ ছেঁদা হয়ে যায় বা শরীরের কোন অংগহানি হয় তাহলে এ জন্য গৃহবাসীরা দায়ী হবে না৷ (আহকামুল কুরআন-জাস্‌সাস, ৩য় খন্ড, ৩৮৫ পৃষ্ঠা)

দুইঃ ফকীহগণ শ্রবণ শক্তিকেও দৃষ্টিশক্তির হুকুমের অন্তরভূক্ত করেছেন৷ যেমন অন্ধ ব্যাক্তি যদি বিনা অনুমতিতে আসে তাহলে তার দৃষ্টি পড়বে না ঠিকই কিন্তু তার কান তো গৃহবাসীদের কথা বিনা অনুমতিতে শুনে ফেলবে ৷ এ জিনিসটিও দৃষ্টির মতো ব্যক্তিগত গোপনীয়তার অধিকারে অবৈধ হস্তক্ষেপ৷

তিনঃ কেবলমাত্র অন্যের গৃহে প্রবেশ করার সময় অনুমতি নেবার হুকুম দেয়া হয়নি৷ বরং নিজের মা-বোনদের কাছে যাবার সময়ও অনুমতি নিতে হবে৷ এ ব্যক্তি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জিজ্ঞেস করলো, আমি কি আমার মায়ের কাছে যাবার সময়ও অনুমতি চাইবো? জবাব দিলেন, হাঁ৷ সে বললো, আমি ছাড়া তাঁর সেবা কারার আর কেউ নেই৷ এক্ষেত্রে কি আমি যতবার তাঁর কাছে যাবো প্রত্যেকবার অনুমতি নেবো? জবাব দিলেন, ----- ''তুমি কি তোমার মাকে উলংগ অবস্থায় দেখতে পছন্দ কর?'' (ইবনে জারীর এ মুরসাল হাদীসটি আতা ইবনে ইয়াসার থেকে বর্ণনা করেছেন) আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদের উক্তি হচ্ছে, ----- ''নিজেদের মা-বোনদের কাছে যাবার সময়ও অনুমতি নিয়ে যাও৷'' (ইবনে কাসীর) বরং ইবনে মাসউদ তো বলেন, নিজের ঘরে নিজের স্ত্রীর কাছে যাবার সময়ও অন্ততপক্ষে গলা খাঁকারী দিয়ে যাওয়া উচিত৷ তাঁর স্ত্রীর যয়নবের বর্ণনা হচ্ছে, হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ যখনই গৃহে আসতে থাকেন তখনই আগেই এমন কোন আওয়াজ করে দিতেন যাতেন তিনি আসছেন বলে জানা যেতো৷ তিনি হঠাৎ ঘরের মধ্যে এসে যাওয়া পছন্দ করতেন না৷ (ইবনে জারীর)

চারঃ শুধুমাত্র এমন অবস্থায় অনুমতি চাওয়া জরুরী নয় যখন কারোর ঘরে হঠাৎ কোন বিপদ দেখা দেয়া৷ যেমন, আগুন লাগে অথবা কোন চোর ঢোকে৷ এ অবস্থায় সাহায্য দান করার জন্য বিনা অনুমতিতে প্রবেশ করা যায়৷

পাঁচঃ প্রথম প্রথম যখন অনুমতি চাওয়ার বিধান জারি হয় তখন লোকেরা তার নিয়ম কানুন জানতো না৷ একবার এক ব্যক্তি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে আসে এবং দরজা থেকে চিৎকার করে বলতে থাকে ----- ( আমি কি ভেতরে ঢুকে যাবো?) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর বাঁদী রওযাহকে বলেন, এ ব্যক্তি অনুমতি চাওয়ার নিয়ম জানে না৷ একটু উঠে গিয়ে তাকে বলে এস, ----- (আসসালামু আলাইকুম, আমি কি ভিতরে আসতে পারি?) বলতে হবে৷ (ইবনে জারির ও আবু দাউদ) জাবের ইবনে আবদুল্লাহ বলে, আমি আমার বাবার ঋণের ব্যাপারে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে গেলাম এবং দরজায় করাঘাত করলাম৷ তিনি জিজ্ঞেস করলেন, কে? আমি বললাম, আমি ৷ তিনি দু-তিনবার বললেন, ''আমি? আমি?' অর্থাৎ এখানে আমি বললে কে কি বুঝবে যে, তুমি কে? (আবু দাউদ) কালাদাহ ইবনে হাম্বল নামে এক ব্যক্তি কাজে নবী সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে গেলেন৷ সালাম ছাড়াই এমনই সেখানে গিয়ে বসলেন৷ তিনি বললেন, বাইরে যাও এবং আস্‌সালামু আলাইকুম বলে ভেতরে এসো৷ (আবু দাউদ) অনুমতি চাওয়ার সঠিক পদ্ধতি ছিল, মানুষ নিজের নাম বলে অনুমতি চাইবে৷ হযরত উমরের (রা) ব্যাপারে বর্ণিত আছে নবী করীমের (সা) খিদমতে হাজির হয়ে তিনি বলতেনঃ

-----

''আসসালামু আলাইকুম, হে আল্লাহর রসূল ! উমর কি ভেতরে যাবে?''(আবু দাউদ) অনুমতি নেবার জন্য নবী করীম (সা) বড় জোর তিনবার ডাক দেবার সীমা নির্দেশ করেছেন এবং বলেছেন যদি তিনবার ডাক দেবার পরও জবাব না পাওয়া যায়, তাহলে ফিরে যাও৷ (বুখারী মুসলিম, আবু দাউদ) নবী (সা) নিজেও এ পদ্ধতি অনুসরণ করতেন৷ একবার তিনি হযরত সা'দ ইবনে উবাদার বাড়ীতে গেলেন এবং আসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহ বলে দু'বার অনুমতি চাইলেন ৷ কিন্তু ভেতর থেকে জবাব এলো না ৷ তৃতীয় বার জবাব না পেয়ে তিনি ফিরে গেলেন ৷ হযরত সা'দ ভেতর থেকে দৌড়ে এলেন এবং বললেনঃ হে আল্লাহর রসূল ! আমি আপনার আওয়াজ শুনছিলাম ৷ কিন্তু আমার মন চাচ্ছিল আপনার মুবারক কন্ঠ থেকে আমার জন্য যতবার সালাম ও রহমতের দোয়া বের হয় ততই ভালো, তাই আমি খুব নীচু স্বরে জবাব দিচ্ছিলাম ৷ ( আবু দাউদ ও আহমাদ) এ তিনবার ডাকা একের পর এক হওয়া উচিত নয় বরং একটু থেমে হতে হবে৷ এর ফলে ঘরের লোকেরা যদি কাজে ব্যস্ত থাকে এবং সে জন্য তারা জবাব দিতে না পারে তাহলে সে কাজ শেষ করে জবাব দেবার সুযোগ পাবে৷

ছয়ঃ গৃহমালিক বা গৃহকর্তা অথবা এমন এক ব্যক্তির অনুমতি গ্রহণযোগ্য হবে যার সম্পর্কে মানুষ যথার্থই মনে করবে যে, গৃহকর্তার পক্ষ থেকে সে অনুমতি দিচ্ছে ৷ যেমন, গৃহের খাদেম অথবা কোন দায়িত্বশীল ব্যক্তি ৷ কোন ছোট শিশু যদি বলে, এসে যান, তাহলে তার কথায় ভেতর প্রবেশ করা উচিত নয় ৷

সাতঃ অনুমতি চাওয়ার ব্যাপারে অযথা পীড়াপীড়ি করা অথবা অনুমতি না পাওয়ায় দরজার ওপর অনড় হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা জায়েয নয়৷ যদি তিনবার অনুমতি চাওয়ার পর গৃহকর্তার পক্ষ থেকে অনুমতি না পাওয়া যায় বা অনুমতি দিতে অস্বীকার জানানো হয়, তাহলে ফিরে যাওয়া উচিত ৷
২৬. অর্থাৎ কারোর শূন্য গৃহে প্রবেশ করা জায়েয নয়৷ তবে যদি গৃহকর্তা নিজেই প্রবেশকারীকে তার খালি ঘরে প্রবেশ করার অনুমতি দিয়ে থাকে, তাহলে আপনি আমার কামরায় বসে যাবেন ৷ অথবা গৃহকর্তা অন্য কোন জায়গায় আছেন এবং আপনার আসার খবর পেয়ে তিনি বলে পাঠিয়েছেন, আপনি বসুন,আমি এখনই এসে যাচ্ছি ৷ অন্যথায় গৃহে কেউ নেই অথবা ভেতর থেকে কেউ বলছে না নিছক এ কারণে বিনা অনুমতিতে ভেতরে ঢুকে যাওয়া কারোর জন্য বৈধ নয় ৷
২৭. অর্থাৎ এ জন্য নারাজ হওয়া মন খারাপ করা উচিত নয় ৷ কোন ব্যক্তি যদি করো সাথে দেখা করতে না চায় তাহলে তার অস্বীকার করার অধিকার আছে৷ অথবা কোন কাজে ব্যস্ত থাকার কারণে সে অক্ষমতা জানিয়ে দিতে পারে ৷ ফকীহগণ -----(ফিরে যাও) এর হুকুমের এ অর্থ নিয়েছেন যে, এ অবস্থায় দরজার সামনে গ্যাঁট হয়ে দাঁড়িয়ে যাওয়ার অনুমতি নেই বরং সেখান থেকে সরে যাওয়া উচিত ৷ অন্যকে সাক্ষাত দিতে বাধ্য করা অথবা তার দোর গোড়ায় দাঁড়িয়ে তাকে বিরক্ত করতে থাকার অধিকার কোন ব্যক্তির নেই৷
২৮. এখানে মূলত হোটেল, সরাইখানা, অতিথিশালা, দোকান, মুসাফির খানা ইত্যাদি যেখানে লোকদের জন্য প্রবেশের সাধারণ অনুমতি আছে সেখানকার কথা বলা হচ্ছে ৷
২৯. মূল শব্দগুলো হচ্ছে ------------ এখানে --মানে হচ্ছে, কোন জিনিস কম করা, হ্রাস করা ও নিচু করা ৷ ----- এর অনুবাদ সাধারণত করা হয়, ''দৃষ্টি নামিয়ে নেয়া বা রাখা৷'' কিন্তু আসলে এ হুকুমের অর্থ সবসময় দৃষ্টি নিচের দিকে রাখা নয়৷ বরং এর অর্থ হচ্ছে, পূর্ন দৃষ্টিভরে না দেখা এবং দেখার জন্য দৃষ্টিকে স্বাধীনভাবে ছেড়ে না দেয়া ৷ ''দৃষ্টি সংযত রাখা'' থেকে এ অর্থ ভালোভাবে প্রকাশ পায় ৷ অর্থাৎ যে জিনিসটি দেখা সংগত নয় তার ওপর থেকে দৃষ্টি সরিয়ে নিতে হবে ৷ এ জন্য দৃষ্টি নত করাও যায় আবার অন্য কোন দিকে নজর ঘুরিয়েও নেয়া যায় ৷ ---------- এর মধ্যে (মিন) ''কিছূ'' বা ''কতক'' অর্থ প্রকাশ করছে ৷ অর্থাৎ সমস্ত দৃষ্টি সংযত করার হুকুম দেয়া হয়নি বরং কোন কোন দৃষ্টি সংযত করতে বলা হয়েছে৷ অন্য কথায় বলা যায়, আল্লাহর উদ্দেশ্য এ নয় যে, কোন জিনিসই পূর্ণ দৃষ্টিতে দেখা উচিত নয় বরং তিনি কেবল মাত্র একটি বিশেষ গন্ডীর মধ্যে দৃষ্টির ওপর এ বিধি-নিষেধ যে জিনিসের ওপর আরোপ করা হয়েছে সেটি হচ্ছে, পুরুষদের মহিলাদরকে দেখা অথবা অন্যদের লজ্জাস্থানে দৃষ্টি দেয়া কিংবা অশ্লীল দৃশ্যের দিকে তাকিয়ে থাকা ৷

আল্লাহর কিতাবের এ হুকুমটির যে ব্যাখ্যা হাদীস করেছে তার বিস্তারিত বিবরণ নিচে দেয়া হলঃ

একঃ নিজের স্ত্রী বা মুহাররাম নারীদের ছাড়া কাউকে নজর ভরে দেখা মানুষের জন্য জায়েয নয় ৷ একবার হঠাৎ নজর পড়ে গেলে ক্ষমাযোগ্য৷ কিন্তু প্রথম দৃষ্টিতে আকর্ষণীয় মনে হলে সেখানে আবার দৃষ্টিপাত করা ক্ষমারযোগ্য নয়৷ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ ধরনের দেখাকে চোখের যিনা বলেছেন ৷ তিনি বলেছেনঃ মানুষ তার সমগ্র ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে যিনা করে৷ দেখা হচ্ছে চোখের যিনা, ফুসলানো কন্ঠের যিনা, তৃপ্তির সাথে কথা শোনা কানের যিনা, হাত লাগানো ও অবৈধ উদ্দেশ্য নিয়া চলা হাত ও পায়ের যিনা ৷ ব্যভিচারের এ যাবতীয় ভূমিকা যখন পুরোপুরি পালিত হয় তখন লজ্জাস্থানগুলো তাকে পূর্ণতা দান করে অথবা পূর্ণতা দান থেকে বিরত থাকে ৷ (বুখারী, মুসলিম ও আবু দাউদ ) হযরত বুরাইদাহ বর্ণনা করেছেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হযরত আলীকে (রা) বলেনঃ ----------''হে আলী! এক নজরের পর দ্বিতীয় নজর দিয়ো না ৷ প্রথম নজর তো ক্ষমাপ্রাপ্ত কিন্তু দ্বিতীয় নজরের ক্ষমা নেই৷''(আহমাদ,তিরমিযী, আবু দাউদ, দারেমী)

হযরত জারীর ইবনে আবদুল্লাহ বাজালী বলেন, আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জিজ্ঞেস করলাম, হঠাৎ চোখ পড়ে গেলে কি করবো? বললেন, চোখ ফিরিয়ে নাও অথবা নামিয়ে নাও৷ (মুসলিম, আহমাদ, তিরমিযী, আবু দাউদ, নাসাঈ) আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাদিয়ালাহু আনহু রেওয়ায়াত করেছেন, নবী (সা) আল্লাহর উক্তি বর্ণনা করেছেনঃ

-----

''দৃষ্টি হচ্ছে ইবলীসের বিষাক্ত তীরগুলোর মধ্য থেকে একটি তীর, যে ব্যক্তি আমাকে ভয় করে তা ত্যাগ করবে আমি তার বদলে তাকে এমন ঈমান দান করবো যার মিষ্টি সে নিজের হৃদয়ে অনুভব করবে''৷ (তাবারানী)

আবু উমামাহ রেওয়ায়াত করেছেন, নবী (সা) বলেনঃ

-----

'' যে মুসলমানের দৃষ্টি কোন মেয়ের সৌন্দর্যের ওপর পড়ে এবং এ দৃষ্টি সরিয়ে নেয়, এ অবস্থায় আল্লাহ তার ইবাদাতে বিশেষ স্বাদ সৃষ্টি করে দেন৷'' (মুসনাদে আহমাদ)

ইমাম জা'ফর সাদেক তাঁর পিতা ইমাম মুহাম্মাদ বাকের থেকে এবং তিনি হযরত জাবের ইবনে আবদুল্লাহ আনসারীর থেকে রেওয়ায়াত করেছেনঃ বিদায় হজ্জের সময় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের চাচাত ভাই ফযল ইবনে আব্বাস (তিনি সে সময় ছিলেন একজন উঠতি তরুণ) মাশ্আরে হারাম থেকে ফেরার পথে নবী করীমের (সা) সাথে তাঁর উটের পিঠে বসেছিলেন৷ পথে মেয়েরা যাচ্ছিল৷ ফযল তাদেরকে দেখতে লাগলেন৷ নবী সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার মুখের ওপর হাত রাখলেন এবং তাকে অন্যদিকে ফিরিয়ে দিলেন৷ (আবু দাউদ) এ বিদায় হজ্জেরই আর একটি ঘটনা৷ খাস্‌'আম গোত্রের একজন মহিলা পথে রসূলুল্লাহক (সা) থামিয়ে দিয়ে হজ্জ সম্পর্কে একটি বিধান জিজ্ঞেস করছিলেন৷ ফযল ইবনে আব্বাস তার দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন৷ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার মুখ ধরে অন্য দিকে ফিরিয়ে দিলেন৷ (বুখারী, তিরমিযী, আবু দাউদ)

দুইঃ এ থেকে কেউ যেন এ ভুল ধারণা করে না বসেন যে, নারীদের মুখ খুলে চলার সাধারণ অনুমতি ছিল তাইতো চোখ সংযত করার হুকুম দেয়া হয়৷ অন্যথায় যদি চেহারা ঢেকে রাখার হুকুম দেয়া হয়ে থাকে, তাহলে আবার দৃষ্টি সংযত করার বা না করার প্রশ্ন আসে কেন? এ যুক্তি বুদ্ধুবৃত্তিক দিক দিয়েও ভুল এবং ঘটনার দিক দিয়েও সঠিক নয়৷ বুদ্ধিবৃত্তিক দিক দিয়ে এর ভুল হবার কারণ হচ্ছে এ যে, চেহারার পরদা সাধারণভাবে প্রচলিত হয়ে যাবার পরও হঠাৎ কোন নারী ও পুরুষের সামনাসামনি হয়ে যাবার মতো অবস্থা সৃষ্টি হয়ে যেতে পারে৷ আর একজন পরদানশীন মহিলারও কখনো মুখ খোলার প্রয়োজন দেখা দিতে পারে৷ অন্যদিকে মুসলমান মহিলারা পরদা করা সত্ত্বেও অমুসলিম নারীরা তো সর্বাবস্থায় পরদার বাইরেই থাকবে৷ কাজেই নিছক দৃষ্টি সংযত করার হুকুমটি মহিলাদের মুখ খুলে ঘোরাফেরা করাকে অনিবার্য করে দিয়েছে, এ যুক্তি এখানে পেশ করার যেতে পারে না৷ আর ঘটনা হিসেবে এটা ভুল হবার কারণ এই যে, সূরা আহযাবে হিজাবের বিধান নাযিল হবার পরে মুসলিম সমাজে যে পরদার প্রচলন করা হয়েছিল৷ চেহারার পরদা তার অন্তরভুক্ত ছিল৷ নবী সাল্লাল্লাহু আলইহি ওয়া সাল্লামে মুবারক যুগে এর প্রচলন হবার ব্যাপারটি বহু হাদীস দ্বারা প্রমাণিত৷ অপবাদের ঘটনা সম্পর্কে হযরত আয়েশার হাদীস অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য সূত্র পরস্পরায় বর্ণিত৷ তাতে তিনি বলেন, জংগল থেকে ফিরে এসে যখন দেখলাম কাফেলা চলে গেছে তখন আমি বসে পড়লাম এবং ঘুম আমার দু'চোখের পাতায় এমনভাবে জেঁকে বসলো যে, আমি ওখানেই ঘুমিয়ে পড়লাম৷ সকালে সাফওয়ান ইবনে মু'আত্তাল সেখান দিয়ে যাচ্ছিলেন৷ দূর থেকে কাউকে ওখানে পড়ে থাকতে দেখে কাছে এলেন৷

-----''তিনি আমাকে দেখতেই চিনে ফেললেন৷ কারণ পরদার হুকুম নাযিল হবার আগে তিনি আমাকে দেখেছিলেন৷ আমাকে চিনে ফেলে যখন তিনি ''ইন্নালিল্লাহে ওয়া ইন্না ইলাইহে রাজেউন'' পড়লেন তখন তাঁর আওয়াজে আমার চোখ খুলে গেলো এবং নিজের চাদরটি দিয়ে মুখ ঢেকে নিলাম৷'' (বুখারী, মুসলিম, আহমাদ, ইবনে জারীর, সীরাতে ইবনে হিশাম)৷

আবু দাউদের কিতাবুল জিহাদে একটি ঘটনা উল্লেখিত হয়েছে৷ তাতে বলা হয়েছে উম্মে খাল্লাদ নাম্নী এক মহিলার ছেলে এক যুদ্ধে শহীদ হয়ে গিয়েছিল৷ তিনি তার সম্পর্কে জানার জন্য নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে এলেন৷ কিন্তু এ অবস্থায়ও তার চেহারা নেকাব আবৃত ছিল৷ কোন কোন সাহাবী অবাক হয়ে বললেন, এ সময়ও তোমার মুখ নেকাবে আবৃত৷ অর্থাৎ ছেলের শাহাদাতের খবর শুনে তো একজন মায়ের শরীরের প্রতি কোন নজর থাকে না, বেহুঁশ হয়ে পড়ে অথচ তুমি এক দম নিশ্চিন্তে নিজেকে পরদাবৃত করে এখানে হাজির হয়েছো! জবাবে তিনি বলতে লাগলেনঃ ----- ''আমি পুত্র তো হারিয়েছি ঠিকই কিন্তু লজ্জা তো হারাইনি''৷ আবু দাউদেই হযরত আয়েশার হাদীস উদ্ধৃত হয়েছে৷ তাতে বলা হয়েছে, এক মহিলা পরদার পেছন থেকে হাত বাড়িয়ে রসূলুল্লাহ সাল্লালআহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে আবেদন পেশ করেন৷ রসূলুল্লাহ (সা) জিজ্ঞেস করেন, এটা মহিলার হাত না পুরুষের? মহিলা বলেন, মহিলারই হাত৷ বলেন, ''নারীর হাত হলে তো কমপক্ষে নখ মেহেদী রঞ্জিত হতো৷' আর হজ্জের সময়ের যে দু'টি ঘটনার কথা আমরা ওপরে বর্ণনা করে এসেছি সেগুলো নববী যুগে চেহারা খোলা রাখার পক্ষে দলীল হতে পারে না৷ কারণ ইহ্‌রামের পোশাকে নেকাব ব্যবহার নিষিদ্ধ৷ তবুও এ অবস্থায়ও সাবধানী মেয়েরা ভিন্ পুরুষদের সামনে চেহারা খোলা রাখা পছন্দ করতেন না৷ হযরত আয়েশার বর্ণনা, বিদায় হজ্জের সফরে আমরা ইহ্‌রাম বাঁধা অবস্থায় মক্কার দিকে যাচ্ছিলাম৷ মুসাফিররা যখন আমাদের কাছ দিয়ে যেতে থাকতো তখন আমরা মেয়েরা নিজেদের মাথা থেকে চাদর টেনে নিয়ে মুখে ঢেকে নিতাম এবং তারা চলে যাবার পর মুখ আবরণমুক্ত করতাম৷ (আবু দাউদ, অধ্যায়ঃ মুখ আবৃত করা যেখানে হারাম)

তিনঃ যেসব অবস্থায় কোন স্ত্রীলোককে দেখার কোন যথার্থ প্রয়োজন থাকে কেবলমাত্র সেগুলোই দৃষ্টি সংযত করার হুকুমের বাইরে আছে৷ যেমন কোন ব্যক্তি কোন মেয়েকে বিয়ে করতে চায়৷ এ উদ্দেশ্য শুধুমাত্র মেয়েটিকে দেখার অনুমতি আছে৷ বরং দেখাটা কমপক্ষে মুস্‌তাহাব তো অবশ্যই৷ মুগীরাহ ইবনে শু'বা বর্ণনা করেন, আমি এক জায়াগায় বিয়ের প্রস্তাব দেই৷ রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জিজ্ঞেস করেন, মেয়েটিকে দেখে নিয়েছো তো? আমি বলি, না৷ বলেনঃ

-----

''তাকে দেখে নাও৷ এর ফলে তোমাদের মধ্যে অধিকতর একাত্মতা সৃষ্টি হওয়ার আশা আছে৷' (আহমদ, তিরমিযী, নাসাঈ, ইবনে মাজাহ, দারেমী)

আবু হুরাইরা (রা) বর্ণনা করেছেন, এক ব্যক্তি কোথাও বিয়ের পয়গাম দেয়৷ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেনঃ ---------- ''মেয়েটিকে দেখে নাও৷ কারণ আনসারদের চোখে কিছু দোষ থাকে৷'' (মুসলিম, নাসাঈ, আহমাদ)

জাবের ইবনে আবদুল্লাহু (রা) বলেন, রসূলুল্লাহ (সা) বলেছেনঃ

-----

''তোমাদের কেউ যখন কোন মেয়েকে বিয়ে করার ইচ্ছা করে তখন যতদূর সম্ভব তাকে দেখে নিয়ে এ মর্মে নিশ্চিন্ত হওয়া উচিত যে, মেয়েটির মধ্যে এমন কোন গুন আছে যা তাকে বিয়ে করার প্রতি আকৃষ্ট করে৷'' (আহমাদ ও আবু দাউদ)

মুসনাদে আহমাদে আবু হুমাইদাহর বর্ণনা উদ্ধৃত করা হয়েছে৷ তাতে বলা হয়েছে রসূলুল্লাহ (সা) এ উদ্দেশ্যে দেখার অনুমতিকে ----- শব্দগুলোর সাহায্যে বর্ণনা করেছেন৷ অর্থাৎ এমনটি করার ক্ষতির কিছু নেই৷ তাছাড়া মেয়েটির অজান্তেও তাকে দেখার অনুমতি দিয়েছেন৷ এ থেকেই ফকিহগণ প্রয়োজনের ক্ষেত্র অন্যভাবে দেখার বৈধতার বিধানও উদ্ভাবন করেছেন৷ যেমন অপরাধ অনুসন্ধান প্রসংগে কোন সন্দেহজনক মহিলাকে দেখা অথবা আদালতে সাক্ষ দেবার সময় কাযীর কোন মহিলা সাক্ষীকে দেখা কিংবা চিকিৎসার জন্য চিকিৎসকের রুগিনীকে দেখা ইত্যাদি৷

চারঃ দৃষ্টি সংযত রাখার নির্দেশের এ অর্থও হতে পারে যে, কোন নারী বা পুরুষের সতরের প্রতি মানুষ দৃষ্টি দেবে না৷ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ

-----

কোন পুরুষ কোন পুরুষের লজ্জাস্থানের প্রতি দৃষ্টি দেবে না এবং কোন নারী কোন নারীর লজ্জাস্থানের প্রতি দৃষ্টি দেবে না৷'' (আহমাদ, মুসলিম, আবুদ দাউদ, তিরমিযী)

হযরত আলী (রা) রেওয়ায়াত করেছেন, নবী করীম (সা) আমাকে বলেনঃ ----- ''কোন জীবিত বা মৃত মানুষের রানের ওপর দৃষ্টি দিয়ো না৷''

(আবু দাউদ ও ইবনে মাজাহ)
৩০. লজ্জাস্থানের হেফাজত অর্থ নিছক প্রবৃত্তির কামনা থেকে দূরে থাকা নয় বরং নিজের লজ্জাস্থানকে অন্যের সামনে উন্মুক্ত করা থেকে দূরে থাকাও বুঝা৷ পুরুষের জন্য সতর তথা লজ্জাস্থানের সীমানা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নাভী থেকে হাঁটু পর্যন্ত নির্ধারণ করেছেন৷ তিনি বলেছেনঃ ---------- ''পুরুষের সতর হচ্ছর তার নাভী থেকে হাঁটু পর্যন্ত''৷ (দারুকুত্‌নী ও বাইহাকী) শরীরের এ অংশ স্ত্রী ছাড়া কারোর আমনে ইচ্ছাকৃতভাবে খোলা হারাম৷ আসহাবে সুফ্‌ফার দলভুক্ত হযরত জারহাদে আসলামী বর্ণনা করেছেন, একবার রসূলল্লাহু আল্লাইহি ওয়া সাল্লামের মজলিসে আমার রান খোলা অবস্থায় ছিল্ নবী করীম (সা) বললেনঃ ----- '' তুমি কি জানো না, রান ঢেকে রাখার জিনিস'' (তিরমিযী, আবুদ দাউদ, মুআত্তা) হযরত আলী (রা) বর্ণনা করেন, রসূলুল্লাহ (সা) বলেছেনঃ ----- ''নিজের রান কখনো খোলা রাখবে না৷''´(আবু দাউদ ও হবনে মাজাহ) কেবল অন্যের সামনে নয়, একান্তেও উলংগ থাকা নিষিদ্ধ৷ তাই নবী করীম (সা) বলেছেনঃ

-----

''সাবধান, কখনো উলংগ থেকো না৷ কারণ তোমাদের সাথে এমন সত্তা আছে যারা কখনো তোমাদের থেকে আলাদা হয় না( অর্থাৎ কল্যাণ ও রহমতের ফেরেশতা), তোমরা যখন প্রকৃতির ডাকে সাড়া দাও অথবা স্ত্রীদের কাছে যাও সে সময় ছাড়া, কাজেই তাদের থেকে লজ্জা করো এবং তাদেরকে সম্মান করো৷''´(তিরমিযী)

অন্য একটি হাদীসে নবী করীম (সা) বলেনঃ-----

''নিজের স্ত্রী ও ক্রীতদাসী ছাড়া বাকি সবার থেকে নিজের সতরের হেফাজত করো৷'

এক ব্যক্তি জিজ্ঞেস করে, আর যখন আমরা একাকী থাকি? জবাব দেনঃ ----- ''এ অবস্থায় আল্লাহ থেকে লজ্জা করা উচিত, তিনিই এর বেশী হকদার৷' (আবু দাউদ, তিরমিযী, ইবনে মাজাহ)৷
৩১. নারীদের জন্যও পুরুষদের মতো দৃষ্টি সংযমের একই বিধান রয়েছে৷ অর্থাৎ তাদের ইচ্ছা করে ভিন্‌ পুরুষদের দেখা উচিত নয়৷ ভিন্‌ পুরষদের প্রতি দৃষ্টি পড়ে গেলে ফিরিয়ে নেয়া উচিত এবং অন্যদের সতর দেখা থেকে দূরে থাকা উচিত৷ কিন্তু পুরুষদের পক্ষে মেয়েদেরকে দেখার তুলনায় মেয়েদের পক্ষে পুরুষদেরকে দেখার ব্যাপারে কিছু ভিন্ন বিধান রয়েছে৷ এদিকে হাদীসে আমরা এ ঘটনা পাচ্ছি যে, হযরত উম্মে সালামাহ ও হযরত উম্মে মাইমূনাহ নবী সাল্লাল্লাহু আল্লাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে বসেছিলেন এমন সময় হযরত ইবনে উম্মে মাকতুম এসে গেলেন৷ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উভয় স্ত্রীকে বললেন, ----- ''তার থেকে পরদা করো৷'' স্ত্রীরা বললেনঃ

-----

''হে আল্লাহর রসূল! তিনি কি অন্ধ নন? তিনি আমাদের দেখতে পাচ্ছেন না এবং চিনতেও পাচ্ছেন না৷'' বললেনঃ ----- ''তোমরা দুজনও কি অন্ধ? তোমরা কি তাকে দেখতে পাচ্ছো না?'' হযরত উম্মে সালামাহ (রা) পরিষ্কার ভাষায় বলেছেন, ----- এটা যখন পরদার হুকুম নাযিল হয়নি সে সময়কার ঘটনা৷'' (আহমাদ, আবু দাউদ, তিরমিযী এবং মুআত্তার একটি রেওয়ায়াত এর সমর্থন করে, যাতে বলা হয়েছেঃ হযরত আয়েশা কাছে একজন অন্ধ এলেন এবং তিনি তার থেকে পরদা করলেন ৷বলা হলো, আপনি এর থেকে পরদা করছেন কেন? এ­-তো আপনাকে দেখতে পারে না৷ উম্মুল মু'মিনীন (রা) এর জবাবে বললেনঃ -----'' কিন্তু আমি তো তাকে দেখছি৷'' অন্যদিকে আমরা হযরত আয়েশার একটি হাদীস পাই, তাতে দেখা যায়, ৭ হিজরী সনে হাবশীদের প্রতিনিধি দল মদীনায় এলো এবং তারা মসজিদে নববীর চত্বরে একটি খেলার আয়োজন করলো৷ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজে হযরত আয়েশাকে এ খেলা দেখালেন৷ (বুখারী,মুসলিম, আহমাদ) তৃতীয় দিকে আমরা দেখী,ফাতেমা বিনতে কায়েসকে যখন তাঁর স্বামী তিন তালাক দিলেন তখন প্রশ্ন দেখা দিল তিনি কোথায় ইদ্দত পালন করবেন৷ প্রথমে নবী করীম (সা) বললেন, উম্মে শরীক আনসারীয়ার কাছে থাকো৷ তারপর বললেন, তার কাছে আমার সাহাবীগণ অনেক বেশী যাওয়া আশা করে (কারণ তিনি ছিলেন একজন বিপুল ধনশালী ও দানশীলা মহিলা৷ বহু লোক তাঁর বাড়িতে মেহমান থাকতেন এবং তিনি তাদের মেহমানদারী করতেন৷) কাজেই তুমি ইবনে উম্মে মাকতুমের ওখানে থাকো৷ সে অন্ধ৷ তুমি তার ওখানে নিসংকোচে থাকতে পারবে৷'' (মুসলিম ও আবু দাউদ)

এসব বর্ণনা একত্র করলে জানা যায়, পুরুষদেরকে দেখার ব্যাপার মহিলাদের ওপর তেমন বেশী কড়াকড়ি নেই যেমন মহিলাদেরকে দেখার ব্যাপারে পুরুষের ওপর আরোপিত হয়েছে৷ এক মজলিসে মুখোমুখি বসে দেখা নিষিদ্ধ৷ পথ চলার সময় অথবা দূর থেকে কোন কোন জায়েয খেলা দেখতে গিয়ে পুরুষদের ওপর দৃষ্টি পড়া নিষিদ্ধ নয়৷ আর কোন যর্থার্থ প্রয়োজন দেখা দিলে একই বাড়িতে থাকা অবস্থায়ও দেখলে কোন ক্ষতি নেই৷ ইমাম গায্‌যালী ও ইবনে হাজার আসকালানীও হাদীসগুলো থেকে প্রায় এ একই ধরনের সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন৷ শাওকানী নাইলুল আওতারে ইবনে হাজারের এ উক্তি উদ্ধৃত করেছেন যে, ''এ থেকেও বৈধতার প্রতি সমর্থন পাওয়া যায় যে, মেয়েদের বাইরে বের হবার ব্যাপারে সবসময় বৈধতাকেই কার্যকর করা হয়েছে৷ মসজিদে, বাজারে এবং সফরে মেয়েরা তো মুখে নেকাব দিয়ে যেতো, যাতে পুরুষরা তাদেরকে না দেখে৷ কিন্তু পুরুষদেরকে কখনো এ হুকুম দেয়া হয়না যে, তোমরাও নেকার পরো, যাতে মেয়েরা তোমাদেরকে না দেখে৷ এ থেকে জানা যায়, উভয়ের ব্যাপারে হুকুমের মধ্যে বিভিন্নতা রয়েছে৷'' (৬ষ্ঠ খণ্ড, ১০১ পৃষ্ঠা) তবুও মেয়েরা নিশ্চিন্ত পুরুষদেরকে দেখবে এবং তাদের সৌন্দর্য উপভোগ করতে থাকবে, এটা কোনক্রমেই জায়েয নয়৷
৩২. অর্থাৎ অবৈধ যৌন উপভোগ থেকে দূরে থাকে এবং নিজের সতর অন্যের সামনে উন্মুক্ত করাও পরিহার করে৷ এ ব্যাপার মহিলাদের ও পুরুষদের জন্য একই বিধান, কিন্তু নারীদের সতরের সীমানা পুরুষদের থেকে আলাদা৷ তাছাড়া মেয়েদের সতর মেয়েদের ও পুরুষদের জন্য আবার ভিন্ন ভিন্ন৷

পুরুষদের জন্য মেয়েদের সতর হাত ও মুখ ছাড়া তার সারা শরীর৷ স্বামী ছাড়া অন্য কোন পুরুষ এমন কি বাপ ও ভাইয়ের সামনেও তা খোলা উচিত নয়৷ মেয়েদের এমন পাতলা বা চোস্ত পোশাক পরা উচিত নয় যার মধ্য দিয়ে শরীর দেখা যায় বা শরীরের গঠন কাঠামো ভেতরে থেকে ফুটে উঠতে থাকে৷ হযরত আয়েশা (রা) বর্ণনা করেন, তাঁর বোন হযরত আসমা বিনতে আবু বকর রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সামনে আসনে৷ তখন তিনি পাত্‌লা কাপড় পড়ে ছিলেন৷ রসূলুল্লাহু (সা) সংগে সংগেই মুখ ফিরিয়ে নেন এবং বলেনঃ

-----

''হে আসমা! কোন মেয়ে যখন বালেগ হয়ে যায় তখন তার মুখ ও হাত ছাড়া শরীরের কোন অংশ দেখা যাওয়া জায়েয নয়৷'' (আবুদ দাউদ)

এ ধরনের আর একটি ঘটনা ইবনে জারীর হযরত আয়েশা থেকে উদ্ধৃত করেছেনঃ তাঁর কাছে তাঁর বৈপিত্রেয় ভাই আবদুল্লাহ ইবনুত তোফায়েলের মেয়ে আসেন৷ রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম গৃহে প্রবেশ করে তাকে দেখেই মুখ ফিরিয়ে নেন৷ হযরত আযেশা বললেন,হে আল্লাহর রসূল! এ হচ্ছে আমার ভাইয়ের মেয়ে৷ তিনি বলেনঃ

----------

'' মেয়ে যখন বালেগ হয়ে যায় তখন তার জন্য নিজের মুখ ও হাত ছাড়া আর কিছু বের করে রাখা হালাল নয়, আর নিজের কব্জির ওপর হাত রেখে হাতের সীমানা তিনি এভাবে বর্ণনা করেছেন যে, তাঁর মুঠি ও হাতের তালুর মধ্যে মাত্র একমুঠি পরিমাণ জায়গা খালি থাকে৷'

এ ব্যাপারে শুধুমাত্র এতটুকু সুযোগ আছে যে, ঘরে কাজকর্ম করার জন্য মেয়েদের শরীরের যতটুকু অংশ খোলার প্রয়োজন দেখা দেয় নিজেদের মুহাররাম আত্মীয়দের (যেমন বাপ-ভাই ইত্যাদি) সামনে মেয়েরা শরীরে কেবলমাত্র ততটুকু অংশই খুলতে পারে৷ যেমন আটা মাখাবার সময় হাতের আস্তিন গুটনো অথবা ঘরের মেঝে ধুয়ে ফেলার সময় পায়ের কাপড় কিছু ওপরের দিকে তুলে নেয়া৷

আর মহিলদের জন্য মহিলাদের সতরের সীমারেখা হচ্ছে পুরুষদের জন্য পুরুষদের সতরের সীমা রেখার মতই৷ অর্থাৎ নাভী ও হাঁটুর মাঝখানের অংশ৷ এর অর্থ এ নয় যে, মহিলাদের সামনে মহিলারা অর্ধ উলংগ থাকবে৷ বরং এর অর্থ শুধুমাত্র এই যে, নাভী ও হাঁটুর মাঝাখানের অংশটুকু ঢাকা হচ্ছে ফরয এবং অন্য অংশগুলো ঢাকা ফরয নয়৷
৩৩. এ বিষয়টি মনে রাখতে হবে যে, আল্লাহর শরীয়াত নারীদের কাছে শুধুমাত্র এতটুকুই দাবী করেন না যতটুকু পুরুষদের কাছে করে৷ অর্থাৎ দৃষ্টি সংযত করা এবং লজ্জাস্থানের হেফাজাত করা৷ বরং তাদের কাছ থেকে আরো বেশী কিছু দাবী করে৷ এ দাবী পুরুষদের কাছে করেনি৷ পুরুষ ও নারী যে এ ব্যাপারে সমান নয় তা এ থেকে পরিষ্কার প্রকাশ হয়৷
৩৪. আমি ----- শব্দের অনুবাদ করেছি ''সাজসজ্জা''৷ এর দ্বিতীয় আর একটি অনুবাদ হতে পারে প্রসাধন৷ তিনটি জিনিসের ওপর এটি প্রযুক্ত হয়৷ সুন্দর কাপড় অলংকার এবং মাথা, মুখ, হাত পা, ইত্যাদির বিভিন্ন সাজসজ্জা, যেগুলো সাধারণত মেয়েরা করে থাকে৷ আজকের দুনিয়ায় এ জন্য ''মেকআপ'' (Makeup) শব্দ ব্যবহার করা হয়৷ এ সাজসজ্জা কাকে দেখানো যাবে না এ ব্যাপারে বিস্তারিত বর্ণনা সামনের দিকে আসছে৷
৩৫. তাফসীরগুলোর বিভিন্ন বর্ণনা এ আয়াতটির অর্থ যথেষ্ট অস্পষ্ট করে তুলেছে৷ অন্যথায় কথাটি মোট অস্পষ্ট নয়, একেবারেই পরিষ্কার৷ প্রথম বাক্যাংশে বলা হয়েছে ----- অর্থাৎ ''তোরা যেন নিজেদের সাজসজ্জা ও প্রসাধন প্রকাশ না করে৷'' আর দ্বিতীয় বাক্যাংশে ----- শব্দটি বলে এ নিষেধাজ্ঞায় যেসব জিনিসকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে তার মধ্যে যাকে আলাদা তথা নিষেধাজ্ঞার বাইরে রাখা হয়েছে তা হচ্ছে, ----- ''যা কিছু এ সাজসজ্জা থেকে আপনা আপনি প্রকাশ হয় বা প্রকশ হয়ে যায়৷' এর পরিষ্কার অর্থ হচ্ছে, মহিলাদের নিজেদের স্বেচ্ছায় এগুলো প্রকাশ ও এসবের প্রদর্শনী না করা উচিত৷ তবে যা নিজে নিজে প্রকাশ হয়ে যায় (যেমন চাদ বাতাসে উড়ে যাওয়া এবং কোন আভরণ উন্মুক্ত হয়ে যাওয়া) অথবা যা নিজে নিজে প্রকাশিত (যেমন ওপরে যে চারদটি জড়ানো থাকে, কোণ কোনক্রমেই তাকে লুকানো তো সম্ভব নয় আর নারীদের শরীরের সাথে লেপটে থাকার কারণে মোটামুটিভাবে তার মধ্যেও স্বতষ্ফুর্তভাবে একটি আকর্ষন সৃষ্টি হয়ে যায়) সে জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে কোন জবাবদিহি নেই৷ এ আয়াতের এ অর্থই বর্ণনা করেছেন হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ, হাসান বসরী, ইবনে সীরীন ও ইবরাহীম নাখ্‌ঈ৷ পক্ষান্তরের কোন কোন মুফাসসির ----- এর অর্থ নিয়েছেনঃ ----- (মানুষ স্বাভাবিকভাবে যা প্রকাশ করে দেয়) এবং তারপর তারা এর মধ্যে শামিল করে দিয়েছেন মুখ ও হাতকে তাদের সমস্ত সাজসজ্জাসহ৷ অর্থাৎ তাদের মতে মহিলারা তাদের গালে রুজ পাউডার, ঠোঁটে লিপষ্টিক ও চোখে সুরমা লাগিয়ে এবং হাতে আংটি, চুড়ি ও কংকন ইত্যাদি পরে তা উন্মুক্ত রেখে লোকদের সামনে চলাফেরা করবে৷ ইবনে আব্বাস (রা) ও তাঁর শিষ্যগণ এ অর্থ বর্ণনা করেছেন৷ হানাফী ফকীহদের একটি বিরাট অংশও অর্থ গ্রহণ করেছেন৷ (আহকামুল কুরআন-জাস্‌সাস, ৩য় খণ্ড, ৩৮৮-৩৮৯ পৃষ্ঠা) কিন্তু আরবী ভাষার কোন্‌ নিয়মে ----- কে ----- এর অর্থে ব্যবহার করা যেতে পারে তা আমি বুঝতে অক্ষম৷ ''প্রকাশ হওয়া'' ও ''প্রকাশ করার'' মধ্যে সুস্পষ্ট পার্থক্য রয়েছে ৷ এবং আমরা দেখি কুরআন স্পষ্টভাবে ''প্রকাশ করার''থেকে বিরত রেখে ''প্রকাশ হওয়া''র ব্যাপারে অবকাশ দিচ্ছে৷ এ অবকাশকে ''প্রকাশ করা'' পর্যন্ত বিস্তৃত করা কুরআনেরও বিরোধী এবং এমন সব হাদীসেরও বিরোধ যেগুলো থেকে প্রমাণ হয় যে, নববী যুগে হিজাবের হুকুম এসে যাবার পর মহিলারা মুখে খুলে চলতো না, হিজাবের হুকুম এসে যাবার পর মহিলারা মুখ খুলে চলতো না, হিজাবের হুকুমের মধ্যে চেহারার পরদাও শামিল ছিল এবং ইহরাম ছাড়া অন্যান্য সব অবস্থায় নেকাবকে মহিলাদের পোশাকের একটি অংশে পরিণত করা হয়েছিল৷ তারপর এর চাইতেও বিস্ময়কর ব্যাপার হচ্ছে এই যে, এ অবকাশের পক্ষে যুক্তি হিসেবে একথা পেশ করা হয় যে, মুখ ও হাত মহিলাদের সতরের অন্তরভূক্ত নয়৷ অথচ সতর ও হিজাবের মধ্যে যমীন আসমান ফারাক৷ সতর মুহাররাম পুরুষদের সামনে খোলাও জায়েয নয়৷ আর হিজাব তো সতরের অতিরিক্ত এটি জিনিস, যাকে নারীদের ও গায়ের মুহাররামে পুরুষদের মাঝখানে আটকে দেয়া হয়েছে এবং এখানে সতরের নয় বরং হিজাবের বিধান আলোচ্য বিষয়৷
৩৬. জাহেলী যুগে মহিলারা মাথায় এক ধরনের আঁটসাঁট বাঁধন দিতো৷ মাথার পেছনে চুলের খোঁপার সাথে এর গিরো বাঁধা থাকতো৷ সামনের দিকে বুকের একটি অংশ খোলা থাকত৷ সেখানে গলা ও বুকের ওপরের দিকে অংশটি পরিষ্কার দেখা যেতো৷ বুকে জামা ছাড়া আর কিছুই থাকতো না৷ পেছনের দিকে দুটো তিনটে খোঁপা দেখা যেতো৷ (তাফসীরে কাশ্‌শাফ, ২য় খণ্ড, ৯০ পৃষ্ঠা, ইবনে কাসীর, ৩য় খণ্ড ২৮৩-২৮৪ পৃষ্ঠা) এ আয়াত নাযিল হবার পর মুসলমান মহিলাদের মধ্যে ওড়নার প্রচলন করা হয়৷ আজকালকার মেয়েদের মতো তাকে ভাঁজ করে পেঁচিয়ে গলার মালা বানানো এর উদ্দেশ্য ছিল না৷ বরং এটি শরীরে জড়িয়ে মাথা, কোমর, বুক ইত্যাদি সব ভালোভাবে ঢেকে নেয়া ছিল এর উদ্দেশ্য৷ মু'মিন মহিলারা কুরআনের এ হুকুমটি শোনার সাথে সাথে যেভাবে একে কার্যকর করে হযরত আয়েশা (রা) তার প্রশংসা করে বলেনঃ সূরা নূর নাযিল হয়ে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মুখ থেকে তা শুনে লোকেরা ঘরে ফিরে আসে এবং নিজেদের স্ত্রী, মেয়ে ও বোনদের আয়াতগুলো শোনায়৷ আনসারদের মেয়েদের মধ্যে এমন একজনই ছিল না ----- বাক্যাংশ শোনার পর নিজের জায়গায় চুপটি করে বসে ছিল৷ প্রত্যেক উঠে দাঁড়িয়েছিল৷ অনেকে নিজের কোমরে বাঁধা কাপড় খুলে নিয়ে আবার অনেকে চাদর তুলে নিয়ে সংগে সংগেই ওড়না বানিয়ে ফেলল এবং তা দিয়ে শরীর ঢেকে ফেললো৷ পরদিন ফজরের নামাযের সময় যতগুলো মহিলা মসজিদে নববীতে হাজির হয়েছিল তাদের সবাই দোপাট্টা ও ওড়ানা পরা ছিল৷ এ সম্পর্কিত অন্য একটি হাদীসে হযরত আয়েশা (রা) আরো বিস্তারিত বর্ণনা করা বলেনঃ মহিলারা পাত্‌লা কাপড় পরিত্যাগ করে নিজেদের মোটা কাপড় বাছাই করে তা দিয়ে ওড়না তৈরী করলেন৷ (ইবনে কাসীর, ৩য় খন্ড, ২৮৪ পৃঃ এবং আবু দাউদ, পোশাক অধ্যায়) ওড়না পাত্‌লা কাপড়ের না হওয়া উচিত৷ এ বিধানগুলোর মেজাজ ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে চিন্তা করলে এ বিষয়টি নিজে নিজেই উপলব্ধি করা যায়৷ কাজেই আনসারদের মহিলারা হুকুম শুনেই বুঝতে পেরেছিল কোন্‌ ধরনের কাপড় দিয়ে ওড়না তৈরী করলে এ উদ্দেশ্য পূর্ণ হবে৷ কিন্তু শরীয়াত প্রবর্তক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একথাটিকে শুধুমাত্র লোকদের বোধ ও উপলব্ধির ওপর ছেড়ে দেননি বরং তিনি নিজেই এর ব্যাখ্যা করে দিয়েছেন৷ দেহ্‌ইয়াহ কাল্‌বী বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে মিসরের তৈরী সূক্ষ্ম মল্‌মল্ (কাবাতী) এলো৷ তিনি তা থেকে এটুকরা আমাকে দিলেন এবং বললেন, এখন থেকে কেটে এক খণ্ড দিয়ে তোমার নিজের জামা তৈরী করে নাও এবং এক অংশ দিয়ে তোমার স্ত্রীর দোপাট্টা বানিয়ে দাও, কিন্তু তাকে বলে দেবে---------- এর নিচে যেন আর একটি কাপড় লাগিয়ে নেয়, যাতে শরীরের গঠন ভেতর থেকে দেখা না যায়৷'' (আবু দাউদ, পোশাক অধ্যায়) ৷
৩৭. অর্থাৎ যাদের মধ্য একটি মহিলা তার পূর্ণ সৌন্দর্য ও সাজসজ্জা সহকারে স্বাধীনভাবে থাকতে পারে এসব লোক হচ্ছে তারাই৷ এ জনগোষ্ঠীর বাইরে আত্মীয় বা অনাত্মীয় যে-ই থাক না কেন কোন নারীর তার সামনে সাজগোজ করে আসা বৈধ নয়৷ ----- বাক্যে যে হুকুম দেয়া হয়েছিল তার অর্থ এখানে প্রকাশ করে দেয়া হয়েছে এভাবে যে, এ সীমিত গোষ্ঠীর বাইরে যারাই আছেন তাদের সামনে নারীর সাজসজ্জা ইচ্ছাকৃত বা বেপরোয়াভাবে নিজেই প্রকাশ করা উচিত নয়,তবে তার প্রচেষ্টা সত্ত্বেও অথবা তার ইচ্ছা ছাড়াই যা প্রকাশ হয়ে যায় অথবা যা গোপন করা সম্ভব না হয় তা আল্লাহর কাছে ক্ষমাযোগ্য৷
৩৮. মূলে ----- শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে৷ এর অর্থ শুধু বাপ নয় বরং দাদা ও দাদার বাপ এবং নানা ও নানার বাপও এর অন্তরভূক্ত৷ কাজেই একটি মহিলা যেভাবে তার বাপ ও শ্বশুরের সামনে আসতে পারে ঠিক তেমনিভাবে আসতে পারে তার বাপের ও নানার বাড়ির এসব মুরব্বীদের সামনেও৷
৩৯. ছেলের অন্তরভুক্ত হবে নাতি, নাতির ছেলে, দৌহিত্র ও দৌহিত্রের ছেলে সবাই৷ আর এ ব্যাপারে নিজের ও সতীনের মধ্যে কোন ফারাক নেই৷ নিজের সতীন পুত্রদের সন্তানদের সামনে নারীরা ঠিক তেমনি স্বাধীনভাবে সাজসজ্জার প্রকাশ করতে পারে যেমন নিজের সন্তানদের ও সন্তানদের সন্তানদের সামনে করতে পারে৷
৪০. ভাইয়ের মধ্যে সহোদর ভাই, বৈমাত্রেয় এবং বৈপিত্রেয় ভাই সবাই শামিল৷
৪১. ভাইবোনদের ছেলে বলতে তিন ধরনের ভাই বোনদের সন্তান বুঝানো হয়েছে অর্থাৎ তাদের নাতি, নাতির ছেলে এবং দৌহিত্র ও দোহিত্রের ছেলে সবাই এর অন্তভুক্ত৷
৪২. এখানে যেহেতু আত্মীয়দের গোষ্ঠী খতম হয়ে যাচ্ছে তাই সামনে দিকে অনাত্মীয় লোকদের কথা বলা হচ্ছে৷ এ জন্য সামনের দিকে এগিয়ে যাবার আগে তিনটি বিষয় ভালোভাবে বুঝে নিতে হবে৷ কারণ এ বিষয়গুলোর না বুঝলে বিভিন্ন ধরনের সমস্যা দেখা দেয়৷

প্রথম বিষয়টি হচ্ছে,কেউ কেউ সাজসজ্জা প্রকাশের স্বাধীনতাকে কেবলমাত্র এমন সব আত্মীয় পর্যন্ত সীমাবদ্ধ মনে করেন যাদের নাম এখানে উচ্চারণ করা হয়েছে৷ বাকি সবাইকের এমনকি আপন চাচা ও আপন মামাকে যেসব আত্মীয়দের থেকে পরদা করতে হবে তাদের মধ্য গণ্য করেন৷ তাদের যুক্তি হচ্ছে, এদের নাম কুরআনে বলা হয়নি৷ কিন্তু একথা সঠিক নয়৷ আপন চাচা ও মামা তো দূরের কথা রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তো দুধ চাচা ও দুধ মামা থেকেও পরদা করতে হযরত আয়েশাকে অনুমতি দেননি৷ সিহাহেসিত্তা ও মুসনাদে আহমাদে হযরত আয়েশা বর্ণিত একটি হাদীসে বলা হয়েছেঃ আবুল কু'আইসের তাই আফ্‌লাহ তাঁর কাছে এলেন এবং ভেতর প্রবেশের অনুমতি চাইলে৷ যেহেতু তখন পরদা হুকুম নাযিল হয়ে গিয়েছিল, তাই হযরত আয়েশা অনুমতি দিলেন না৷ তিনি বলেন পাঠালেন, তুমি তো আমার ভাইঝি, কারণ তুমি আমার ভাই আবুল কু'আইসের স্ত্রীর দুধপান করেছো৷ কিন্তু এ সম্পর্কটা কি এমন পর্যায়ের যেখানে পরদা উঠিয়ে দেয়া জায়েযর এ ব্যাপারে হযরত আয়েশা কোন সিদ্ধান্ত নিতে পারছিলেন না৷ ইত্যবসরে নবী সাল্লালআহু আল্লাইহি ওয়া সাল্লাম এসে গেলেন৷ তিনি বললেন, সে তোমার কাছে আসতে পারে৷ এ থেকে জানা যায়, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজেই এ আয়াতকে এ অর্থে নেননি যে, এর মধ্যে যেসব আত্মীয়ের কথা বলা হয়েছে কেবল তাদের থেকে পরদা করা হবে না এবং বাকি সবার থেকে পরদা করা হবে৷ বরং তিনি এ থেকে নীতি নির্ধারণ করেছেন যে, যেসব আত্মীয়ের সাথে একটি মেয়ের বিয়ে হারাম তারা সবাই এ আয়াতের হুকুমের অন্তরভুক্ত৷ যেমন চাচা, মামা, জামাতা ও দুধ সম্পর্কীয় আত্মীয়-স্বজন৷ তাবে'ঈদের মধ্য হযরত হাসান বসরীও এ মত প্রকাশ করেছেন এবং আল্লাম আবু বকর জাস্‌সাস আহকামুল কুরাআনে এর প্রতিই সমর্থন জানিয়েছেন৷ (৩য় খন্ড, ৩৯০ পৃষ্ঠা)

দ্বিতীয় বিষয়টি হচ্ছে, যেসব আত্মীয়ের সাথে চিরন্তন হারামের সম্পর্ক নয় (অর্থাৎ যাদের সাথে একজন কুমারী বা বিধবার বিয়ে বৈধ) তারা মুহাররাম আত্মীয়দের অন্তরভূক্ত নয়৷ মেয়েরা নিসংকোছে সাজসজ্জা করে তাদের সামনে আসবে না৷ আবার একবারে অনাত্মীয় অপরিচিতদের মতো তাদের থেকে তেমনি পূর্ণ পরদাও করবে না যেমন ভিন পুরুষদের থেকে করে৷ এ দুই প্রান্তিকতার মাঝামাঝি কি দৃষ্টিভংগী হওয়া উচিত তা শরীয়াতে নির্ধারিত নেই৷ কারণ এটা নির্ধারিত হতে পারে না৷ এর সীমানা বিভিন্ন আত্মীয়ের ব্যাপারে তাদের আত্মীয়তা, বয়স, পারিবারিক সম্পর্ক ও সম্বন্ধ এবং উভয়পক্ষের অবস্থার (যেমন এক গৃহে বা আলাদা আলাদা বাস করা) প্রেক্ষিতে অবশ্যি বিভিন্ন হবে এবং হওয়া উচিত৷ এ ব্যাপারে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিজের নিয়ম ও কর্মপদ্ধতি যা কিছু ছিল তা থেকে আমরা এ দিকনির্দেশনাই পাই৷ হযরত আসরা বিনতে আবু বকর ছিলেনা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের শ্যালিকা৷ বহু হাদীস থেকে প্রমাণ পাওয়া যায়, তিনি রসূলের (সা) সামনে আসতেন এবং শেষ সময় পর্যন্ত তাঁর ও নবী সালাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মধ্যে কমপক্ষে চেহারা ও হাতের ক্ষেত্রে কোন পরদা ছিল না৷ বিদায় হজ্জ অনুষ্ঠিত হয় নবীর (সা) ইন্তিকালের মাত্র কয়েক মাস আগে এবং সে সময়্ এ অবস্থাই বিরাজিত ছিল (দেখুন আবু দাউদ, হজ্জ অধ্যায়, অনুচ্ছেদঃ মুহাররাম তার গোলামকে আদব শিক্ষা দেবে)৷ অনুরূপভাবে হযরত উম্মেহানী ছিলে আবু তালেবের মেয়ে ও নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের চাচাতে বোন৷ জীবনের শেষ সময় পর্যন্ত তিনি নবী করীমের (সা) আসতেন এবং কমপক্ষে তাঁর সামনে কখনো নিজের মুখ ও চেহারার পরদা করেননি৷ মক্কা বিজয়ের সময়ের একটি ঘটনা তিনি নিজেই বর্ণনা করেছেন৷ এ থেকে এর প্রমাণ পাওয়া যায়৷ (দেখুন আবু দাউদ, কিতাবুস সওম, বাবুন ফীন নীয়্যাত ফিস সওমে ওয়ার রূখসাতে ফকীহ৷) অন্যদিক আমরা দেখি, হযরত আব্বাস তার ছেলে ফযলকে এবং বারী'আহ ইবনে হারেস ইবনে আবদুল মুত্তালিব (নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আপন চাচাত ভাই) তাঁর ছেলে আবদুল মুত্তালিবকে নবী সাল্লাল্লাহু আল্লাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে এ বলে পাঠালেন যে, এখণ তোমরা যুবক হয়ে গেছো, তোমরা রোজাগারের ব্যবস্থা করতে না পারলে তোমাদের বিয়ে হতে পারে না, কাজেই তোমরা রসূলের (সা) কাছে গিয়ে কোন চাকরির দরখাস্ত করো৷ তারা দু'জন হযরত যয়নবের গৃহে গিয়ে রসূলুল্লাহর খিদমতে হাযির হলেন ৷ হযরত যয়নব ছিলেন ফযলের আপন ফুপাত বোন আর আবদল মুত্তালিব ইবনে রাবী'আর বাপের সাথেও তাঁর ফযলের সাথে যেমন তেমনি আত্মীয় সম্পর্ক ছিল৷ কিন্তু তিনি তাদের দু'জনের সামনে হাযির হলেন না এবং রসূলের (সা) উপস্থিতিতে পরদার পেছন থেকে তাদের সাথে কথা বলতে থাকলেন৷ (আবু দাউদ, কিতাবুল খারাজ) এ দু'ধরনের ঘটনাবলী মিলিয়ে দেখলে ওপরে আমি যা বর্ণনা করে এসেছি বিষয়টির সে চেহারাই বোধগম্য হবে৷

তৃতীয় বিষয় হচ্ছে, যেখানে আত্মীয়তা সন্দেহপূর্ণ হয়ে যায় সেখানে মুহাররাম আত্মীয়দের থেকেও সতর্কতা হিসেবে পরদা করা উচিত৷ বুখারা, মুসলিম ও আবুদ দাউদে উদ্ধৃত হয়েছে, উম্মুল মু'মিনীন হযরত সওদার (রা) এক ভাই ছিল বাঁদিপুত্র (অর্থাৎ তাঁর পিতার ক্রীতদাসীর গর্ভজাত ছিল)৷ তাঁর সম্পর্ক হযরত সা'দ ইবনে আবী ওয়াক্কাসকে (রা) তাঁর ভাই উত্‌বা এ মর্মে অসীয়াত করেন যে, এ ছেলেকে নিজের ভাতিজা মনে করে তার অভিভাবকত্ব করবে কারণ সে আসলে আমার ওরসজাত৷ এ মামলাটি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে এলো৷ তিনি হযরত সাদের দাবী এই বলে নাকচ করে দিলেন যে, ''যার বিছানায় সন্তানের জন্ম হয়েছে সে-ই সন্তানের পিতা৷ আর ব্যভিচারীর জন্য রয়েছে পাথর৷'' কিন্তু সাথে সাথেই তিনি হযরত সওদাকে বলে দিলেন, এ ছেলেটি থেকে পরদা করবে ----- কারণ সে যে সত্যিই তার ভাই এ ব্যাপারে নিসন্দেহ হওয়া যায়নি৷
৪৩. মূলে ----- শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে৷ এ শাব্দিক অনুবাদ হচ্ছে, ''তাদের মহিলারা'' এখানে কোন্‌ মহিলাদের কথা বলা হয়েছে সে বির্তকে পরে আসা যাবে৷ এখন সবার আগে যে কথাটি উল্লেখযোগ্য এবং যেদিকে দৃষ্টি দেয়া উচিত সেটি হচ্ছে, এখানে নিছক ''মহিলারা'' ----- বলা হয়নি, যার ফলে মুসলমান মহিলার জন্য সমস্ত মহিলাদের এবং সব ধরনের মেয়েদের সামনে বেপরদা হওয়া ও সাজসজ্জা প্রকাশ করা জায়েয হয়ে যেতো৷ বরং ----- বলে মহিলাদের সাথে তার স্বাধীনতাকে সর্বাবস্থায় একটি বিশেষ গন্ডীর মধ্যে সীমাবদ্ধ করে দিয়েছে৷ সে গণ্ডীর যে কোন পর্যায়েরই হোক না কেন তাতে কিছু আসে যায় না৷ এখন প্রশ্ন থেকে যায়, এটা কোন্ গণ্ডী এবং সে মহিলারাই বা আরা যাদের ওপর ----- শব্দ প্রযুক্ত হয়? এর জবাব হচ্ছে এ ব্যাপারে ফকীহ ও মুফাসসিরগণের উক্তি বিভিন্নঃ

একটি দল বলেন, এখানে কেবলমাত্র মুসলমান মেয়েদের কথা বলা হয়েছে৷ যিম্মী বা অন্য যে কোন ধরনের অমুসলিম মেয়েরাই হোক না কোন মুসলমান মেয়েদেরকে তাদের থেকে পুরুষদের থেকে যেমন করা হয় তেমনি পরদা করা উচিত ৷ ইবনে আব্বাস, মুজাহিদ ও জুরাইজ এ মত পোষণ করেন৷ এরাঁ নিজেদের সমর্থনে এ ঘটনাটিও পেশ করে থাকেন যে, হযরত উমর (রা) হযরত আবু উবাইদাহকে লেখেন, ''আমি শুনেছি কিছু কিছু মুসলিম নারী অমুসলিম নারীদের সাথে হাম্মামে যাওয়া শুরু করেছেন ৷ অথচ যে নারী আল্লাহ ও আখেরাতের প্রতি ঈমান রাখে তার জন্য তার শরীরের ওপর তার মিল্লাতের অন্তরভুক্তদের ছাড়া অন্য কারোর দৃষ্টি পড়া হালাল নয় ৷'' এ পত্র যখন হযরত আবু উবাইদাহ পান তখন তিনি হঠাৎ ভীত হয়ে দাঁড়িয়ে পড়েন এবং বলতে থাকেন, ''হে আল্লাহ ! যে সব মুসলমান মহিলা নিছক ফর্সা হবার জন্য এসব হাম্মামে যায় তাদের মুখ যেন আখেরাতে কালো হয়ে যায় ৷'' (ইবনে জারীর, বায়হাকী ও ইবনে কাসীর )

দ্বিতীয় দলটি বলেন, এখানে সব নারীদের কথা বলা হয়েছে৷ ইমাম রাযীর দৃষ্টিতে এ মতটিই সঠিক ৷ কিন্তু একথা বোধগম্য নয় যে, যদি সত্যিই আল্লাহর উদ্দেশ্য এটিই হয়ে থাকে তাহলে আবার -----বলার অর্থ কি? এ অবস্থায় তো শুধু -- বলা উচিত ছিল৷

তৃতীয় মতটিই যুক্তিসংগত এবং কুরআনের শব্দের নিকটতরও৷ সেটি হচ্ছে, যেসব নারীদের সাথে তারা মেলামেশা করে, যাদের সাথে তাদের জানাশোনা আছে, যাদের সাথে তারা সম্পর্কে রাখে এবং যারা তাদের কাজে কর্মে অংশ নেয় তাদের কথা এখানে বলা হয়েছে ৷ তারা মুসলিমও হতে পারে আবার অমুসলিমও ৷ অপরিচিত মহিলাদের যাদের স্বভাব-চরিত্র, আচার-আচরণের অবস্থা জানা নেই অথবা যাদের বাইরের অবস্থা সন্দেহজনক এবং যারা নির্ভরযোগ্য নয়, তাদেরকে এ গন্ডীর বাইরে রাখাই এর উদ্দেশ্য ৷ কিছু সহীহ হাদীস থেকে এ মতের প্রতি সমর্থন পাওয়া যায় ৷ হাদীসগুলোতে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পবিত্র স্ত্রীদের কাছে যিম্মি মহিলাদের উপস্থিতির কথা বলা হয়েছে ৷ এ ব্যাপারে যে আসল জিনিসটির প্রতি দৃষ্টি দেয়া হবে সেটি ধর্মীয় বিভিন্নতা নয় বরং নৈতিক অবস্থা৷ অমুসলিম হলেও পরিচিত ও নির্ভরযোগ্য পরিবারের ভদ্র, লজ্জাশীলা ও সদাচারী মহিলাদের সাথে মুসলিম মহিলারা পুরোপুরি নিসংকোচে মেলামেশা করতে পারে৷ কিন্তু মুসলমান মেয়েরাও যদি বেহায়া, বেপরদা ও অসদাচারী হয় তাহলে প্রত্যেক শরীফ ও ভদ্র পরিবারের মহিলার তাদের থেকে পরদা করা উচিত৷ কারণ নৈতিকতার জন্য তাদের সাহচার্য ভিন্ন পুরুষদের সাহচর্যের তুলনায় কম ক্ষতিকর নয়৷ আর অপরিচিত মহিলারা যাদের অবস্থা জানা নেই, তাদের সাথে মেলামেশা করার সীমানা আমাদের মতে গায়ের মুহাররাম আত্মীয়দের সামনে স্বাধীনভাবে চলাফেরা করার সর্বাধিক সীমানার সমপরিমাণ হতে পারে৷ অর্থাৎ তাদের সামনে মহিলারা কেবলমাত্র মুখ ও হাত খুলতে পারে, বাকি সারা শরীর ও অংগসজ্জা ঢেকে রাখতে হবে৷
৪৪. এ নির্দেশটির অর্থ বুঝার ব্যাপারেও ফকীহদের মধ্যে মতবিরোধ হয়েছে ৷ একটি দল এর অর্থ করেছেন এমন সব বাঁদী যারা কোন মহিলার মালিকানাধীন আছে ৷ তাদের মতে, আল্লাহর উক্তির অর্থ হচ্ছে,বাঁদী মুশরিক বা আহলি কিতাব যে দলেরই অন্তরভুক্ত হোক না কেন মুসলিম মহিলা মালিক তার সামনে তো সাজসজ্জা প্রকাশ করতে পারে কিন্তু মহিলার নিজেরই মালিকানাধীন গোলামের থেকেও পরদা করার ব্যাপারটি অপরিচিত স্বাধীন পুরুষের থেকে পরদার সমপর্যায়ের ৷ এটি আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা) মুজাহিদ,হাসান বসরী, ইবনে সীরীন, সা'ঈদ ইবনে মুসাইইব, তাউস ও ইমাম আবু হানীফার মত ৷ ইমাম শাফেঈ'র একটি উক্তিও এর সমর্থনে পাওয়া যায়৷ এ মনীষীদের যুক্তি হচ্ছে, গোলামের জন্য তার মহিলা মালিক মুহাররাম নয় ৷ যদি সে স্বাধীন হয়ে যায় , তাহলে তার আগের মহিলা মালিককে বিয়েও করতে পারে৷ কাজেই নিছক গোলামী এমন কোন কারণ হতে পারে না যার ফলে মহিলারা তাদের সামনে এমন স্বাধীনভাবে চলাফেরা করবে যার অনুমতি মুহাররাম পুরুষদের সামনে চলাফেরা করার জন্য দেয়া হয়েছে৷ এখন বাকী থাকে এ প্রশ্নটি যে, ----- শব্দাবলী ব্যাপক অর্থবোধক, গোলাম ও বাঁদী উভয়ের জন্য ব্যবহার হয়, তাহলে আবার বিশেষভাবে বাঁদীদের জন্য একে ব্যবহার করার যুক্তি কি? এর জবাব তারা এভাবে দেন যে, এ শব্দাবলী যদিও একে ব্যবহার করার যুক্তি কি? এর জবাব তারা এভাবে দেন যে, এ শব্দাবলী যদিও ব্যাপক অর্থবোধক তবুও পরিবেশ ও পরিস্থিতি এগুলোর অর্থকে মহিলাদের জন্য বিশেষভাবে নির্দেশ করছে৷ প্রথমে ----- বলা হয় তারপর বলা হয় -----প্রথমে ----- শব্দ শুনে সাধারণ মানুষ মনে করতে পারতো এখানে এমন নারীদের কথা বলা হয়েছে যারা কোন নারীর পরিচিত মহলের বা আত্মীয়-স্বজনদের অন্তরভুক্ত হবে ৷ এ থেকে হয়তো বাঁদীরা এর অন্তরভুক্ত নয়, এ ভুল ধারণা সৃষ্টি হবার সম্ভাবনা ছিল ৷ তাই ----- বলে দিয়ে একথা পরিষ্কার করে দেয়া হয়েছে যে, স্বাধীন মেয়েদের মতো বাঁদীদের সামনেও সাজসজ্জার প্রদর্শনী করা যেতে পারে ৷

দ্বিতীয় দলের মতে এ অনুমতিতে বাঁদী ও গোলাম উভয়েই রয়েছে৷ এটি হযরত আয়েশা (রা) ও হযরত উম্মে সালামাহ (রা) ও অন্য কতিপয় আহলে বায়েত ইমামের অভিমত ৷ ইমাম শাফে'ঈর একটি বিখ্যাত উক্তিও এর সপক্ষে রয়েছে ৷ তাদের যুক্তি শুধুমাত্র -----এর ব্যাপক অর্থ থেকে নয় বরং তারা সুন্নাতে রসূল থেকেও এর সমর্থনে প্রমাণ পেশ করেন৷ যেমন এ ঘটনাটিঃ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আবদুল্লাহ ইবনে মাসআদাতিল ফাযারী নামক এক গোলামকে নিয়ে হযরত ফাতেমার বাড়িতে গেলেন ৷ তিনি সে সময় এমন একটি চাদর গায়ে দিয়ে ছিলেন যা দিয়ে মাথা ঢাকতে গেলে পা খুলে যেতো এবং পা ঢাকতে গেলে মাথা খুলে যেতো ৷ নবী সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর হতবিহবল ভাব দেখে বললেন,----------''কোন দোষ নেই, এখানে আছে তোমার বাপ ও তোমার গোলাম৷'' (আবু দাউদ, আহমাদ ও বায়হাকী আনাস ইবনে মালেকের উদ্ধৃতি থেকে ৷ ইবনে আসাকির তাঁর ইতিহাস গ্রন্থে লিখেছেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হযরত ফতেমাকে এ গোলামটি দিয়ে দিয়েছিলেন ৷ তিনি একে লালন পালন করেছিলেন এবং তারপর মুক্ত করে দিয়েছিলেন ৷ কিন্তু এ উপকারের প্রতিদান সে এভাবে দিয়েছিলেন যে, সিফফীনের যুদ্ধের সময় হযরত আলীর প্রতি চরম শক্রতার প্রকাশ ঘটিয়ে আমীর মু'আবিয়ার একান্ত সমর্থকে পরিণত হয়েছিল৷ ) অনুরূপভাবে তারা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের এ উক্তিটি থেকেও যুক্তি প্রদর্শন করেন—

---------------

''যখন তোমাদের কেউ তার গোলামের সাথে ''মুকাতাবত''তথা অর্থ আদায়ের বিনিময়ে মুক্তি দেবার লিখিত চুক্তি করে এবং চুক্তিকৃত অর্থ আদায় করার ক্ষমতা রাখে তখন তার সে গোলাম থেকে পরদা করা উচিত৷'' (আবু দাউদ ও তিরমিযী এবং ইবনে মাজাহ উম্মে সালামার রেওয়ায়াত থেকে৷ )
৪৫. মূলে ---------- শব্দাবলী বলা হয়েছে ৷ এর শাব্দিক অনুবাদ হবে, ''পুরুষদের মধ্য থেকে এমন সব পুরুষ যারা অনুগত, কামনা রাখে না ৷'' এ শব্দগুলো থেকে প্রকাশ হয়, মুহাররাম পুরুষদের ছাড়া অন্য কোন পুরুষের সামনে একজন মুসলমান মহিলা কেবলমাত্র এমন অবস্থায় সাজসজ্জার প্রকাশ করতে পারে, যখন তার মধ্যে দু'টি গুণ পাওয়া যায়, এক, সে অনুগত অর্থাৎ অধীনস্থ ও কর্তৃত্বের অধীন ৷ দুই, তার মধ্যে কামনা নেই৷ অর্থাৎ নিজের বয়স, শারীরিক অসামর্থ, বুদ্ধিবৃত্তিক দুর্বলতা, দারিদ্র ও অর্থহীনতা অথবা অন্যের পদানত হওয়া ও গোলামীর কারণে তার মনে গৃহকর্তার স্ত্রী, মেয়ে, বোন বা মা সম্পর্কে কোন কুসংকল্প সৃষ্টি হবার শক্তি বা সাহস থাকে না ৷ এ হুকুমকে যে ব্যক্তিই নাফরমানীর অবকাশ অনুসন্ধানের নিয়তে নয় বরং আনুগত্য করার নিয়তে পড়বে সে প্রথম দৃষ্টিতেই অনুভব করবে যে, আজকালকার বেয়ারা, খানসাম, শোফার ও অন্যান্য যুবক কর্মচারীরা অবশ্য এ সংজ্ঞার আওতাভুক্ত হবে না ৷ মুফাসসির ও ফকীহগণ এর যে ব্যাখ্যা করেছেন তার ওপর একবার নজর বুলালে জ্ঞানী ও বিশেষজ্ঞগণ এ শব্দগুলোর কি অর্থ বুঝেছেন তা জানা যেতে পারেঃ

ইবনে আব্বাস : এর অর্থ হচ্ছে এমন সব সাদাসিধে বোকা ধরনের লোক যারা মহিলাদের ব্যাপারে আগ্রহী নয় ৷

কাতাদাহ : এমন পদানত ব্যক্তি যে নিজের পেটের খাবার যোগাবার জন্য তোমার পেছনে পড়ে থাকে ৷

মুজাহিদ: এমন লোক যে ভাত চায়, মেয়েলোক চায় না ৷থাকে৷

শা'বী : যে ব্যক্তি কোন পরিবারের সাথে লেগে থাকে৷ এমনকি তাদের ঘরের লোকে পরিণত হয় এবং সে পরিবারে প্রতিপালিত হয়ে বড় হয়৷ ঘরের মেয়েদের প্রতি সে নজর দেয় না এবং এ ধরনের নজর দেবার হিম্মতই করতে পারে না৷ পেটের ক্ষুদা নিবৃত্তির জন্যই সে তাদের সাথে লেগে থাকে৷

তাউস ও যুহ্‌রী : নির্বোধ ব্যক্তি, যার মধ্যে মেয়েদের প্রতি উৎসাহ নেই এবং এর হিম্মতও নেই৷

(ইবনে জারীর, ১৮ খন্ড, ৯৫-৯৬ পৃষ্ঠা এবং ইবনে আসীর, ৩য় খণ্ড, ২৮৫ পৃষ্ঠা)

এ ব্যাখ্যাগুলোর চাইতেও বেশী স্পষ্ট ব্যাখ্যা পাওয়া যায় একটি ঘটনা থেকে৷ এটি ঘটেছিল নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জামানায়৷ বুখারী, মুসলিম আবু দাউদ, নাসাঈ ও আহমাদ প্রমুখ মুহাদ্দিসগণ এটি হযরত আয়েশা (রা) ও উম্মে সালামাহ (রা) থেকে রেওয়ায়াত করেছেন৷ ঘটনাটি হচ্ছেঃ মদীনা তাইয়েবায় ছিল এক নপুংশক হিজড়ে৷ নবীর পবিত্র স্ত্রীগণ ও অন্য মহিলারা তাকে ----- এর মধ্যে গণ্য করে নিজেদের কাছে আসতে দিতেন ৷ একদিন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উম্মুল মু'মিনীন হযরত উম্মে সালামাহর কাছে গেলেন৷ সেখানে তিনি তাকে উম্মে সালামার (রা) ভাই আবদুল্লাহ ইবনে আবু উমাইয়ার সাথে কথা বলতে শুনলেন৷ সে বলছিল, কাল যদি তায়েফ জয় হয়ে যায়, তাহলে আপনি গাইলান সাকাফির মেয়ে বাদীয়াকে না নিয়ে ক্ষান্ত হবেন না৷ তারপর সে বাদীয়ার সৌন্দর্য ও তার দেহ সৌষ্ঠবের প্রশংসা করতে থাকলে এমনকি তার গোপন অংগগুলোর প্রশংসামূলক বর্ণনাও দিলে দিল৷ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তা কথা শুনে বললেন, ''ওরে আল্লার দুশমন! তুই তো তাকে খুবই লক্ষ করে দেখেছিস বল মনে হয়৷'' তারপর তিনি হুকুম দিলেন, তার সাথে পরদা করো এবং ভবিষ্যতে যেন সে গৃহে প্রবেশ করতে না পারে৷ এরপর তিনি তাকে মদীনা থেকে বের করে দিলেন এবং অন্যান্য নপুংশক পুরুষদেরকেও অন্যের গৃহে প্রবেশ করা নিষিদ্ধ করে দিলেন৷ কারণ তাদেরকে নপুংশক মনে করে মেয়েরা তাদের সামন সতর্কতা অবলম্বন করতো না এবং তারা এক ঘরের মেয়েদের অবস্থা অন্য ঘরের পুরুষদের কাছে বর্ণনা করতো৷ এ থেকে জানা যায়, কারো ----- (কামনাহীন) হবার জন্য কেবলমাত্র এতটকুই যথেষ্ট নয় যে, সে শারীরিক দিক দিয়ে ব্যভিচার করতে সমর্থ নয়৷ যদি তার মধ্যে প্রচ্ছন্ন যৌন কামনা থেকে তাকে এবং সে মেয়েদের ব্যাপারে আগ্রহান্বিত হয় তাহলে অবশ্যি সে অনেক রকমের বিপদের কারণ হতে পারে৷
৪৬. অর্থাৎ যাদের মধ্যে এখনো যৌন কামনা সৃষ্টি হয়নি৷ বড় জোর দশ-বারো বছরের ছেলেদের ব্যাপারে একথা বলা যেতে পারে৷ এর বেশী বয়সের ছেলেরা অপ্রাপ্ত বয়স্ক হলেও তাদের মধ্যে যৌন কামনার উন্মেষ হতে থাকে৷
৪৭. নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ হুকুমটিকে কেবলমাত্র অলংকারের ঝংকারের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেননি৷ বরং এ থেকে এ নীতি নির্ধারণ করেছেন যে, দৃষ্টি ছাড়া অন্যান্য ইন্দ্রিয়গুলোকে উত্তেজিতকারী জিনিসগুলোও আল্লাহ তা'আলা মহিলাদেরকে যে উদ্দেশ্যে সাজসজ্জা ও সৌন্দর্যের প্রকাশনী করতে নিষেধ করেছেন তার বিরোধী৷ তাই তিনি মহিলাদেরকে খোশ্‌বু লাগিয়ে বাইরে বের না হবার হুকুম দিয়েছেন৷ হযরত আবু হুরাইরার (রা) রেওয়ায়াত হচ্ছে, রসূলুল্লাহ (সা) বলেনঃ

----------

''আল্লাহর দাসীদেরকে আল্লাহর মসজিদে আসতে নিষেধ করো না৷ কিন্তু তারা যেন খোশ্‌বু লাগিয়ে না আসে৷' (আবু দাউদ ও আহমাদ) একই বক্তব্য সম্বলিত অন্য একটি হাদীসে বলা হয়েছে, একটি মেয়েটি খোশ্‌বু মেখেছে৷ তিনি তাকে থামিয়ে দিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ''হে মহাপরাক্রমশালী আল্লাহর দাসী! তুমি কি মসজিদ থেকে আসছো? সে বললো হাঁ? বললেন 'আমি আমার প্রিয় আবুল কাসেম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছি, যে মেয়ে মসজিদে খোশ্‌বু মেখে আসে তার নামায ততক্ষন কবুল হয় না যতক্ষন না সে বাড়ি ফিরে ফরয গোসলের মত গোসল করে৷' (আবু দাউদ, ইবনে মাজাহ, আহমাদ নাসাঈ)৷ আবু মূসা আশআরী বলেন, নবী সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ

----------''যে নারী আতর মেখে পথ দিয়ে যায়, যাতে লোকেরা তার সুবাসে বিমোহিত হয়, সে এমন ও এমন৷ তিনি তার জন্য খুবই কঠিন শব্দ ব্যবহার করেছেন৷'' (তিরমিযী, আবু দাউদ, নাসাঈ) তাঁর নির্দেশ ছিল, মেয়েদের এমন খোশ্‌বু ব্যবহার করা উঁচিত, যার রং প্রগাঢ় কিন্তু সুবাস হাল্‌কা৷ (আবু দাউদ)৷

অনুরূপভাবে নারীরা প্রয়োজন ছাড়া নিজেদের আওয়াজ পুরুষদেরকে শোনাবে এটাও তিনি অপছন্দ করতেন৷ প্রয়োজনে কথা বলার অনুমতি কুরআনেই দেয়া হয়েছে এবং নবী সাল্লাল্লাহুআলাইহি ওয়া সাল্লামের পবিত্র স্ত্রীগণ নিজেরাই লোকদেরকে দীনী মাসায়েল বর্ণনা করতেন৷ কিন্তু যেখানে এর কোন প্রয়োজন নেই এবং কোন দীনী বা নৈতিক লাভও নেই সেখানে মহিলারা নিজেদের আওয়াজ ভিন্‌ পুরুষদেরকে শুনাবে, এটা পছন্দ করা হয়নি৷ কাজেই নামাযে যদি ইমাম ভুলে যান তাহলে পুরুষদের সুবহানাল্লাহ বলার হুকুম দেয়া হয়েছে কিন্তু মেয়েদেরকে এক হাতের ওপর অন্য হাত মেরে ইমামকে সতর্ক করে দেবার নিদের্শ দেয়া হয়েছে৷ ------------ (বুখারী, মুসলিম, আহমাদ, তিরমিযী, আবু দাউদ, নাসাঈ, ইবনে মাজাহ )৷
৪৮. অর্থাৎ এ ব্যাপারে এ পর্যন্ত যেসব ভুল-ভ্রান্তি তোমরা করেছো তা থেকে তাওবা করো এবং ভবিষ্যতের জন্য আল্লাহ ও তাঁর রসূল যেসব নির্দেশ দিয়েছেন সে অনুযায়ী নিজেদের কর্মপদ্ধতি সংশোধন করে নাও৷
৪৯. প্রসংগত এ বিধানগুলো নাযিল হবার পর কুরআনের মর্মবাণী অনুযায়ী নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইসলামী সমাজে অন্য যেসব সংস্কারমূলক বিধানের প্রচলন করেন সেগুলোর একটি সংক্ষিপ্তসারও এখানে বর্ণনা করা সংগত মনে করছিঃ

একঃ মুহাররাম আত্মীয়ের অনুপস্থিতিতে তিনি অন্য লোকদেরকে (আত্মীয় হলেও) কোন মেয়ের সাথে একাকী সাক্ষাত করতে ও তার কাছে নির্জনে বসতে নিষেধ করেছেন ৷ হযরত জাবের ইবনে আবদুল্লাহর রেওয়ায়াত হচ্ছে, নবী করীম (সা) বলেছেনঃ

--------------------

''যেসব নারীর স্বামী বাইরে গেছে তাদের কাছে যেয়ো না ৷ কারণ শয়তান তোমাদের মধ্য থেকে প্রত্যেকের রক্ত ধারায় আবর্তন করছে৷'' (তিরমিযী)

হযরত জাবের থেকে অন্য একটি হাদীস বর্ণিত হয়েছে , তাতে রসূলুল্লাহ (সা) বলেছেনঃ

---------------

‍‍‌‌'' যে ব্যক্তি আল্লাহ ও আখেরাতের দিনের প্রতি ঈমান রাখে সে যেন কখনো কোন মেয়ের সাথে নির্জনে সাক্ষাত না করে যতক্ষণ না ঐ মেয়ের কোন মুহাররাম তার সাথে থাকে ৷ কারণ সে সময় তৃতীয়জন থাকে শয়তান ৷''(আহমাদ)

প্রায় এ একই ধরনের বিষয়বস্তু সম্বলিত তৃতীয় একটি হাদীস ইমাম আহমাদ আমের ইবনে রাবীআহ থেকে উদ্ধৃত করেছেন ৷ এ ব্যাপারে রসূলুল্লাহর (সা) নিজের সতর্কতা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে, একবার রাতের বেলা তিনি হযরত সাফিয়ার সাথে তাঁর গৃহের দিকে যাচ্ছিলেন ৷ পথে দু'জন আনসারী তাঁর পাশ দিয়ে গেলেন ৷ তিনি তাদেরকে থামিয়ে বললেন, আমার সাথের এ মহিলা হচ্ছে আমার স্ত্রী সাফিয়া৷ তারা বললেন, সুবহানাল্লাহ! হে আল্লাহর রসূল! আপনার সম্পর্কেও কি কোন কুধারণা হতে পারে? বললেন, শয়তান মানুষের মধ্যে রক্তের মতো চলাচল করে৷ আমার আশংকা হলো সে আবার তোমাদের মনে কোন কুধারণা সৃষ্টি না করে বসে৷ (আবু দাউদ , সওম অধ্যায়)৷

দুইঃ কোন পুরুষের হাত কোন গায়ের মুহাররাম মেয়ের গায়ে লাগুক এটাও তিনি বৈধ করেননি৷ তাই তিনি পুরুষদের হাতে হাত রেখে বাই'আত করতেন৷ কিন্তু মেয়েদের বাই'আত নেবার সময় কখনো এ পদ্ধিত অবলম্বন করতেন না৷ হযরত আয়েশা (রা) বলেন, ''নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাত কখনো কোন ভিন্‌ মেয়ের শরীরে লাগেনি৷ তিনি মেয়েদের থেকে শুধুমাত্র মৌখিক শপথ নিতেন এবং শপথ নেয়া শেষ হলে বলতেন, যাও তোমাদের বাই'আত হয়ে গেছে৷' (আবু দাউদ, কিতাবুল খারাজ)৷

তিনঃ তিনি মেয়েদের মুহাররাম ছাড়া একাকী অথবা গায়ের মুহাররামের সাথে সফল করতে কঠোরভাবে নিষেধ করতেন৷ বুখারী ও মুসলিম ইবনে আব্বাসের রেওয়ায়াত উদ্ধৃত হয়েছে৷ তাতে বলা হয়েছে, রসূলুল্লাহ (সা) খুতবায় বলেনঃ

-----

''কোন পুরুষ যেন কোন মহিলার সাথে একান্তে সাক্ষাত না করে যতক্ষন তার সাথে তার মুহাররাম না থাকে এবং কোন মহিলা যেন সফর না করে যতক্ষন না তার কোন মুহাররাম তার সাথে থাকে৷''

এক ব্যক্তি উঠে বললো, আমার স্ত্রী হজ্জে যাচ্ছে এবং আমার নাম অমুক অভিযানে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে লেখা হয়ে গেছে৷ রসূলুল্লাহ (সা) বললেন, ---------- ''বেশ, তুমি তোমার স্ত্রীর সাথে হজ্জে চলে যাও৷' এ বিষয়বস্তু সম্বলিত বহু হাদীস ইবনে উমর, আবু সাঈদ খুদরী ও আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহুম থেকে নির্ভরযোগ্য হাদীসের কিতাবগুলোতে বর্ণিত হয়েছে৷ সেগুলোতে শুধুমাত্র সফরের সময়সীমা অথবা সফরের দূরত্বের ক্ষেত্রে বিভিন্নতা আছে কিন্তু এ ব্যাপারে সবাই একমত যে, আল্লাহ ও আখেরাতে বিশ্বাসী মু'মিন মহিলার পক্ষে মুহাররাম ছাড়া সফর করা বৈধ নয়৷ এর মধ্যে কোন হাদীসে ১২ মাইল বা এর চেয়ে বেশী দূরত্বের সফরের ওপর বিধি-নিষেধের কথা বলা হয়েছে৷ কোনটিতে একদিন, কোনটিত এক দিন এক রাত, কোনটিতে দু'দিন আবার কোনটিতে তিন দিনের সীমা নির্দেশ করা হয়েছে৷ কিন্তু এ বিভিন্নতা এ হাদীসগুলোর নির্ভরযোগ্যতা খতম করে দেয় না এবং এ কারণে এর মধ্য থেকে কোন একটি হাদীসকে অন্য সব হাদীসের ওপর প্রাধান্য দিয়ে এ হাদীসে বর্ণিত সীমারেখাকে আইনগত পরিমাপ গণ্য করার চেষ্টা করাও আমাদের জন্য অপরিহার্য হয় না৷ কারণ এ বিভিন্নতার একটি যুক্তিসংগত কারণ বোধগম্য হতে পারে৷ অর্থাৎ বিভিন্ন সময় ঘটনার যেমন অবস্থা রসূলের (রা) সামনে এসেছে সে অনুযায়ী তিনি তার হুকুম বর্ণনা করেছেন৷ যেমন কোন মহিলা যাচ্ছেন তিনি দিনের দূরত্বের সফরে এবং এ ক্ষেত্র তিনি মুহাররাম ছাড়া তাকে যেতে নিষেধ করেছেন৷ আবার কেউ এক দিনের দূরত্বের সফরে যাচ্ছেন এবং তিনি তাকেও থামিয়ে দিয়েছেন৷ এখানে বিভিন্ন প্রশ্নকারীর বিভিন্ন অবস্থা এবং তাদের প্রত্যেককে তাঁর পৃথক পৃথক জবাব আসল জিনিস নয়৷ বরং আসল জিনিস হচ্ছে ওপরে ইবনে আব্বাসের রেওয়ায়াতে যে নিয়ম বর্ণনা করা হয়েছে সেটি৷ অর্থাৎ সফর, সাধারণ পরিভাষায় যাকে সফর বলা হয় কোন মেয়ের মুহাররাম ছাড়া এ ধরনের সফর করা উচিত নয়৷

চারঃ রসূলুল্লাহ (সা) মৌখিকভাবে এবং কার্যতও নারী ও পুরুষের মেলামেশা রোধ করার প্রচেষ্ট চালান৷ ইসলামী জীবনে জুম'আ ও জামা'আতের গুরুত্ব কোন ইসলামী জ্ঞানের অধিকারী ব্যক্তির অজানা নয়৷ জুম্‌আকে আল্লাহ নিজেই ফরয করেছেন৷ আর জামা'আতের সাথে নামায পড়ার গুরুত্ব এ থেকেই অনুধাবন করা যেতে পারে যে, যদি কোন ব্যক্তি কোন প্রকার অক্ষমতা ছাড়াই মসজিদে হাজির না হয়ে নিজ গৃহে নামায পড়ে নেয় তাহলে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের উক্তি অনুযায়ী তার নামায গৃহীতই হয় না৷ আবু দাউদ, ইবনে মাজাহ, দারুকুত্‌নী ও হাকেম ইবনে আব্বাসের রেওয়ায়াতের মাধ্যমে) কিন্তু নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জুম্‌আর নামায ফরয হওয়া থেকে মেয়েদেরকে বাদ রেখেছেন৷ (আবু দাউদ উম্মে আতীয়্যার রেওয়ায়াতের মাধ্যমে দারুকুত্‌নী ও বাইহাকী জাবেরের রেওয়ায়াতের মাধ্যমে এবং আবু দাউদ ও হাকেম তারেক ইবনে শিহাবের রেওয়ায়াতের মাধ্যমে) আর জামা'আতের সাথে নামাযে শরিক হওয়াকে মেয়েদের জন্য বাধ্যতামূরক তো করেনইনি৷ বরং এর অনুমতি দিয়েছে এভাবে যে, যদি তারা আসতে চায় তাহলে তাদেরকে বাধা দিয়ো না৷ তারপর এ সাথে একথাও বলে দিয়েছেন যে, তাদের জন্য ঘরের নামায মসজিদের নামাযের চেয়ে ভালো ৷ইবনে উমর (রা) ও আবু হুরাইরার (রা) রেওয়ায়াত হচ্ছে, নবী করীম (সা) বলেছেনঃ ----------'' আল্লাহর দাসীদেরকে আল্লাহ মসজিদে যেতে বাধা দিয়ো না৷''´(আবু দাউদ) অন্য রেওয়ায়াতগুলো বর্ণিত হয়েছে ইবনে উমর থেকে নিম্নোক্ত শব্দাবলী এবং এর সাথে সামঞ্জস্যশীল শব্দাবলি সহকারেঃ

----------

''মহিলাদেরকে রাতের বেলা মসজিদে আসার অনুমতি দাও৷'' (বুখারী, মুসলিম, তিরমিযী, নাসাঈ, আবু দাউদ)

অন্য একটি রেওয়ায়াতের শব্দাবলি হচ্ছেঃ

-----

''তোমাদের নারীদেরকে মসজিদে আসতে বাধা দিয়ো না, তবে তাদের ঘরে তাদের জন্য ভালো৷' (আহমাদ, আবু দাউদ)

উম্মে হুমাইদ সায়েদীয়া বলেনঃ হে আল্লাহর রসূল! আপনার পেছনে নামায পড়তে আমার খুবই ইচ্ছা হয়৷ তিনি বললেন, ''তোমার নিজের কামরায় নামায পড়া বারান্দায় নামায পড়ার চাইতে ভালো, তোমার নিজের ঘরে নামায পড়া নিজের মহল্লার মসিজদে নামায পড়ার চাইতে ভালো এবং তোমার মহল্লার মসজিদে নামায পড়া জামে মসজিদে নামায পড়ার চেয়ে ভালো৷' (আহমাদ ও তাবারানী) প্রায় এই একই ধরনের বিষয়বস্তু সম্বলিত হাদীস আবু দাউদে আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা) থেকে বর্ণিত হয়েছে৷ আর হযরত উম্মে সালামার (রা) রেওয়ায়াতে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের শব্দাবলী হচ্ছেঃ ---------- ''মহিলাদের জন্য তাদের ঘরের অভ্যন্তর ভাগ হচ্ছে সবচেয়ে ভালো মসজিদ৷'' (আহমদ, তাবারানী) কিন্তু হযরত আয়েশা (রা) বনী উমাইয়া আমলের অবস্থা দেখে বলেন, ''যদি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নারীদের আজকের অবস্থা দেখতেন তাহলে তাদের মসজিদে আসা ঠিক তেমনিভাবে বন্ধ করতেন যেমনভাবে বনী ইসরাঈলদের নারীদের আসা বন্ধ করা হয়েছিল৷ (বুখারী, মুসলিম, আবু দাউদ) মসজিদে নববীতে নারীদের প্রবেশের জন্য নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একটি দরজা নির্দিস্ট করে দিয়েছিলেন৷ হযরত উমর (রা) নিজেদের শাসনামলে এ দরজা দিয়ে পুরুষদের যাওয়া আসা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেছিলেন৷ (আবু দাউদ ই'তিযালুন নিসা ফিল মাসাজিদ ও মা জাআ ফী খুরুজিন নিসা ইলাল মাসাজিদ অধ্যায়) জামা'আতে মেয়েদের লাইন রাখা হতো পুরুষেদের লাইনের পেছনে এবং নামায শেষে রসূলুল্লাহ (সা) সালাম ফেরার পর কিছুক্ষন বসে থাকতেন, যাতে পুরুষদের ওঠার আগে মেয়েরা উঠে চলে যেতে পারে৷ (আহমাদ, বুখারী উম্মে সালামার রেওয়ায়াতের মাধ্যমে) রসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, পুরুষদের সর্বোত্তম লাইন হচ্ছে তাদের সর্বপ্রথম লাইনটি এবং নিকৃষ্ঠতম লাইনটি হচ্ছে সবচেয়ে পেছনের (অর্থাৎ মেয়েদের নিকটবর্তী)লাইন এবং মেয়েদের সর্বোত্তম লাইন হচ্ছে সবচেয়ে পেছনের লাইন এবং তাদের নিকৃষ্টতম লাইন হচ্ছে সবার আগের (অর্থাৎ পুরুষদের নিকটবর্তী) লাইন৷ (মুসলিম, আবু দাউদ, তিরমিযী, নাসাঈ ও আহমাদ) দুই ঈদের নামাযে মেয়েলোকেরা শরীক হতো কিন্তু তাদের জায়গা ছিল পুরুষদের থেকে দূরে৷ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম খুতবার পরে মেয়েলোকদের দিকে গিয়ে তাদেরকে পৃথকভাবে সম্বোধন করতেন৷ (আবু দাউদ, জাবের ইবনে আবদুল্লার বর্ণনার মাধ্যমে বুখারী ও মুসলিম ইবনে আব্বাসের বর্ণনার মাধ্যমে) একবার মসজিদে নববীর বাইরে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সালাম দেখলেন, পথে নারী-পুরুষ এক সাথে মিশে গেছে৷ এ অবস্থা দেখে তিনি নারীদেরেক বললেন,

-----

''থেমে যাও, তোমাদের পথের মাঝখান দিয়ে চলা ঠিক নয়, কিনারা দিয়ে চলো৷'' এ কথা শুনতেই মহিলারা এক পাশে হয়ে গিয়ে একবারে দেয়ালের পাশ দিয়ে চলতে লাগলো৷ (আবু দাউদ )

এসব নির্দেশ থেকে পরিষ্কার জানা যায়, নারী-পুরুষেদের মিশ্র সমাবেশাদি ইসলামের প্রকৃতির সাথে কত বেশী বেখাপ্পা! যে দীন আল্লাহর ঘরে ইবাদাত করার সময়ও উভয় গোষ্ঠীকে পরস্পর মিশ্রিত হতে দেয় না তার সম্পর্কে কে ধারণা করতে পারে যে, সে স্কুল-কলেজ, অফিস-আদালত, ক্লাব-রেস্তরাঁ ও সভা-সমিতিতে তাদের মিশ্র হওয়াকে বৈধ করে দেবে?

পাঁচঃ নারীদেরকে ভারসাম্য সহকারে সাজসজ্জা করার তিনি কেবল অনুমতিই দেননি বরং অনেক সময় নিজেই এর নির্দেশ দিয়েছেন৷ কিন্তু এ ব্যাপারে সীমা অতিক্রম করা থেকে কঠোরভাবে বাধা দিয়েছেন৷ সেকালে আরবের মহিলা সমাজে যে ধরনের সাজসজ্জার প্রচলন ছিল তার মধ্য থেকে নিম্নোক্ত জিনিসগুলোকে তিনি অভিস্পাতযোগ্য এবং মানব জাতির ধ্বংসের কারণ হিসেব গণ্য করেছেনঃ

নিজের চুলের সাথে পরচুলা লাগিয়ে তাকে বেশী লম্বা ও ঘন দেখাবার চেষ্টা করা৷

শরীরের বিভিন্ন জায়গায় উল্‌কি আঁকা ও কৃত্রিম তিল বসানো৷

ভ্রূর চুল উপড়ে ফেলে বিশেষ আকৃতির ভূ নির্মাণ করা এবং লোম ছিঁড়ে মুখ পরিষ্কার করা৷

দাঁত ঘসে ঘসে সুঁচালো ও পাত্‌লা করা অথবা দাঁতের মাঝখানে কৃত্রিম ছিদ্র তৈরী করা৷

জাফরান ইত্যাদি প্রসাধনীর মাধ্যমে চেহারায় কৃত্রিম রং তৈরী করা৷

এসব বিধান সিহাহে সিত্তা ও মুসনাদে আহমাদে হযরত আয়েশা (রা), হযরত আসমা বিনতে আবু বকর (রা), হযরত আবদুল্লাহু ইবনে মাসউদ (রা),হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা), হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা) ও আমীর মুআবীয়া (রা) থেকে নির্ভরযোগ্য বর্ণনা পরম্পরায় উদ্ধৃত হয়েছে৷

আল্লাহ ও রসূলের এসব পরিষ্কার নির্দেশ দেখার পর একজন মু'মিনের জন্য দু'টোই পথ খোলা থাকে৷ এক, সে এর অনুসরণ করবে এবং নিজের ও নিজের পারিবারিক ও সামাজিক জীবনকে এমনসব নৈতিক অনাচার থেকে পবিত্র করবে, যেগুলোর পথে রোধ করার জন্য আল্লাহ কুরআনে এবং তাঁর রসূল সুন্নাতে এমন বিস্তারিত বিধান দিয়েছেন৷ দুই, যদি সে নিজের মানসিক দুর্বলতার কারণে এগুলোর মধ্য থেকে কোনটির বিরুদ্ধাচরণ করে, তাহলে কমপক্ষে গোনাহ মনে করে করবে তাকে গোনাহ বলে স্বীকার করে নেবে এবং অনর্থক অপব্যাখ্যার আশ্রয় নিয়ে গোনাহকে সওয়াবে পরিনত করার চেষ্টা করবে না ৷ এ দু'টি পথ পরিহার করে যারা কুরআন ও সুন্নাতের সুস্পষ্ট বিধানের বিরুদ্ধাচরণ করে কেবল পাশ্চাত্য সমাজের পদ্ধিত অবলম্বন করেই ক্ষান্ত থাকে না বরং এরপর সেগুলোকেই যথার্থ ইসলাম প্রমাণ করার জন্য প্রচেষ্টা শুরু করে দেয় এবং ইসলামে আদৌ পরদার কোন বিধান নেই বলে প্রকাশ্যে দাবী করতে থাকে তারা গোনাহ ও নাফরমানীর সাথে সাথে মূর্খতা ও মুনাফিকসুলভ ধৃষ্টতা দেখিয়ে থাকে৷ দুনিয়ায় কোন ভদ্র ও মার্জিত রুচি সম্পন্ন ব্যক্তি এর প্রশংসা করতে পারে না এবং আখেরাতে আল্লাহর কাছ থেকেও এর আশা করা যেতে পারে না৷ কিন্তু মুসলমানদের মধ্যে মুনাফিকদের চাইতেও দু'কদম এগিয়ে আছে এমন সব লোক যারা আল্লাহ ও রসূলের এসব বিধানকে ভুল প্রতিপন্ন করে এবং এমন সব পদ্ধতিকে সঠিক ও সত্য মনে করে যা তারা অমুসলিম জাতিসমূহের কাছ থেকে শিখেছে৷ এরা আসলে মুসলমান নয়৷ কারণ এরপরও যদি তারা মুসলামন থাকে তাহলে ইসলাম ও কুফর শব্দ দু'টি একেবারেই অর্থহীন হয়ে যায়৷ যদি তারা নিজেদের নাম বদলে নিতো এবং প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়ে ইসলাম থেকে বের হয়ে যেতো, তাহলে আমরা কমপক্ষে তাদের নৈতিক সাহসের স্বীকৃতি দিতাম৷ কিন্তু তাদের অবস্থা হচ্ছে, এ ধরনের চিন্তা পোষণা করেও তারা মুসলমান সেজে ঘুরে বেড়াচ্ছে৷ এদের চেয়ে নিকৃষ্ট ধরনের মানুষ সম্ভবত দুনিয়ায় আর কোথাও পাওয়া যায় না৷ এ ধরনের চরিত্র ও নৈতিকতার অধিকারী লোকদের থেকে যে কোন প্রকার জালিয়াতী, প্রতারণা, দাগাবাজী, আত্মসাত ও বিশ্বাসঘাতকতা মোটেই অপ্রত্যাশিত নয়৷
৫০. মূলে ----- শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে৷ একে সাধারণত লোকেরা নিছক বিধবা শব্দের অর্থে গ্রহণ করে থাকে৷ অথচ আসলে এ শব্দটি এমন সকল পুরুষ ও নারীর জন্য ব্যবহৃত হয় যারা স্ত্রী বা স্বামীহীন৷ ------ শব্দটি----- এর বহুবচন৷ আর ----- এমন প্রত্যেক পুরুষকে বলা হয় যার কোন স্ত্রী নেই এবং এমন প্রত্যেক নারীকে বলা হয় যার কোন স্বামী নেই৷ তাই আমি এর অনুবাদ করেছি ''একা' ও নিসংগ৷''
৫১. অর্থাৎ তোমাদের প্রতি যাদের মনোভাব ও আচরণ ভালো এবং যাদের মধ্যে তোমরা দাম্পত্য জীবন যাপনের যোগ্যতাও দেখতে পাও৷ যে গোলাম ও বাঁদীর আচরণ মালিকের সাথে সঠিক নয় এবং যার মেজায দেখে বিয়ের পরে জীবন সংগীর সাথে তার বনিবনা হবে বলে আশাও করা যায় না তাকে বিবাহ দেবার দায়িত্ব মালিকের ওপর চাপিয়ে দেয়া হয়নি৷ কারণ এ অবস্থায় সে অন্য এক ব্যক্তির জীবন নষ্ট করে দেবার জন্য দায়ী হবে৷ এ শর্তটি স্বাধীন লোকদের ব্যাপারে আরোপ করা হয়নি৷ কারণ স্বাধীন ব্যক্তির বিয়েতে অংশগ্রহণকারীর দায়িত্ব আসলে একজন পরামর্শদাতা, সহযোগী ও পরিচিত করাবার মাধ্যমের বেশী কিছু হয় না৷ বিবাহকারী ও বিবাহকারিনীর সম্মতির মাধ্যমে আসল দাম্পত্য সম্পর্ক গড়ে ওঠে৷ কিন্তু গোলাম ও বাঁদীর মধ্যে দাম্পত্য সম্পর্ক গড়ে তোলার পূর্ণ দায়িত্ব হয় মালিকের৷ সে যদি জেনে বুঝে কোন হতভাগিনীকে একজন বদস্বভাব ও বদচরিত্রসম্পন্ন লোকের হাতে তুলে দেয় তাহলে এর সমস্ত দায়ভার তাকেই বহন করতে হবে৷
৫২. বাহ্যত এখানে আদেশমূলক ক্রিয়াপদ দেখে একদল আলেম মনে করেছেন, এ কাজটি করা ওয়াজিব ৷ অথচ বিষয়টির ধরণ নিজেই বলছে, এ আদেশটি ওয়াজিব অর্থে হতে পারে না৷ একথা সুস্পষ্ট, কোন ব্যক্তির বিয়ে করানো অন্যদের ওপর ওয়াজিব হতে পারে না৷ কার সাথে কার বিয়ে করানো ওয়াজিব? ধরা যাক, যদি ওয়াজিব হয়ও তাহলে যার বিয়ে হতে হবে তার অবস্থা কি? অন্য লোকেরা যার সাথেই তার বিয়ে দিতে চায় তার সাথে বিয়ে কি তার মেনে নেয়া উচিত? এটি যদি তার ওপর ফরয হতে থাকে তাহলে বুঝতে হবে তার বিয়ে তার নিজের আয়ত্ব নেই৷ আর যদি তার অস্বীকার করার অধিকার থাকে তাহলে যাদের ওপর এ আজ ওয়াজিব তারা কিভাবে নিজেদের দায়িত্ব পালন করবে? এসব দিক ভালোভাবে বিবেচনা করে অধিকাংশ ফকীহ এ রায় দিয়েছেন যে, আল্লাহর এ উক্তি এ কাজটিকে ওয়াজিব নয় বরং ''মান্‌দুব'' বা পছন্দনীয় গণ্য করে৷ অর্থাৎ এর মানে হবে, মুসলমানদের সাধারণভাবে চিন্তা হ্ওয়া উচিত তাদের সামাজে যেন লোকেরা অবিবাহিত অবস্থায় না থাকে৷ পরিবারে সাথে জড়িত লোকেরা, বন্ধু-বান্ধব, প্রতিবেশী সবাই এ ব্যাপারে আগ্রহ নেবে এবং যার কেউ নেই তার এ কাজে সাহায্য করবে রাষ্ট্র্৷
৫৩. এর অর্থ এ নয় যে, যারই বিয়ে হবে আল্লাহ তাকেই ধনাঢ্য করে দেবেন৷ বরং এখানে বক্তব্য হচ্ছে, লোকেরা যেন এ ব্যাপারে খুব বেশী হিসেবী না বনে যায়৷ এর মধ্যে মেয়ে পক্ষের জন্যও নির্দেশ রয়েছে৷ বলা হয়েছে, সৎ ও ভদ্র রুচিশীল ব্যক্তি যদি তাদের কাছে পয়গাম পাঠায়, তাহলে নিছক তার দারিদ্র দেখেই যেন তা প্রত্যাখ্যান না করা হয়৷ ছেলে পক্ষকেও নির্দেশ দেয়া হয়েছে, কোন যুবককে নিছক এখনো খুব বেশী আয়-রোজগার করছে না বলে যেন আইবুড়ো করে না রাখা হয়৷ আর যুবকদেরকেও উপদেশ দেয়া হচ্ছে, বেশী সচ্ছলতার অপেক্ষায় বসে থেকে নিজেদের বিয়ের ব্যাপারকে অযথা পিছিয়ে দিয়ো না৷ সামান্য আয় রোজগার হলেও আল্লাহর ওপর ভরসা করে বিয়ে করে নেয়া উচিত৷ অনেক সময় বিয়ে নিজেই মানুষের আর্থিক সচ্ছলতার কারণ হয়ে দাঁড়ায়৷ স্ত্রীর সহায়তায় খরচপাতির ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়৷ দায়িত্ব মাথার ওপর এসে পড়ার পর মানুষ নিজেও আগের চাইতেও বেশী পরিশ্রম ও প্রচেষ্টা চালাতে থাকে৷ অর্থকরী কাজে স্ত্রী সাহায্য করতে পারে৷ আর সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে, ভবিষ্যতে কার জন্য কি লেখা আছে তা কেউ জানতে পারে না৷ ভালো অবস্থা খারাপ অবস্থায়ও পরিবর্তিত হয়ে যেতে পারে এবং খারাপ অবস্থা পরিবর্তিত হয়ে যেতে পারে ভালো অবস্থায়৷ কাজেই মানুষের প্রয়োজনের অতিরিক্ত হিসেবী হওয়া উচিত নয়৷
৫৪. এ প্রংসগে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে যে হাদীসগুলো বর্ণিত হয়েছে সেগুলোই এ আয়াতগুলোর সবচেয়ে ভালো ব্যাখ্য করতে পারে৷ হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা) বর্ণনা করেছেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেনঃ

-----

''হে যুবকগণ! তোমাদের মধ্য থেকে যে বিয়ে করতে পারে তার বিয়ে করে নেয়া উচিত৷ কারণ এটি হচ্ছে চোখকে কুদৃষ্টি থেকে বাঁচাবার এবং মানুষের সততা ও সতীত্ব রক্ষার উৎকৃষ্ট উপায়৷ আর যার বিয়ে করার ক্ষমতা নেই তার রোযা রাখা উচিত৷ কারণ রোযা মানুষের দেহের উত্তাপ ঠাণ্ডা করে দেয়৷'' (বুখারী ও মুসলিম)

হযরত আবু হুরাইরা (রা) বর্ণনা করেছেন, রসূলুল্লাহ (সা) বলেনঃ

-----

''তিন ব্যক্তিকে সাহায্য করা আল্লাহর দায়িত্ব৷ এক বক্তি হচ্ছে, যে চারিত্রিক বিশুদ্ধতা বজায় রাখার জন্য বিয়ে করে৷ দ্বিতীয় ব্যক্তি হচ্ছে, মুক্তিলাভের জন্য যে গোলাম লিখিতভাবে চুক্তিবদ্ধ হয় এবং তার মুক্তিপণ দেয়ার নিয়ত রাখে৷ আর তৃতীয় ব্যাক্তি, যে আল্লাহর পথে জিহাদ করার জন্য বের হয়৷'' (তিরমিযী, নাসাঈ, ইবনে মাজাহ, আহমাদ৷ এছাড়া আরো বেশী ব্যাখ্যার জন্য দেখুন তাফহীমুল কুরআন, আন নিসা, ২৫ আয়াত)৷
৫৫. মূল শব্দ হচ্ছে ----- এর শাব্দিক অর্থ লিপিবদ্ধ৷ কিন্তু পারিভাষিক দিক দিয়ে এ শব্দটি তখন বলা হয় যখন কোন গোলাম বা বাঁদী নিজের মুক্তির জন্য নিজের প্রভুকে একটি মূল্য দেবার প্রস্তার দেয় এবং প্রভু সে প্রস্তাব গ্রহণ করে নেয় তখন উভয়ের মধ্যে এর শর্তাবলি লিপিবদ্ধ হয়ে যায়৷ ইসলামে গোলামদের মুক্ত করার জন্য যেসব পথ তৈরী করা হয়েছে এটি তার অন্যতম ৷ এ মূল্য অর্থ বা সম্পদের আকারে দেয়া অপরিহার্য নয়৷ উভয় পক্ষের সম্মতিক্রমে প্রভুর জন্য কোন বিশেষ কাজ করে দেয়াও মূল্য হিসেবে বিবেচিত হতে পারে৷ চুক্তি হয়ে যাবার পর কর্মচারীর স্বাধীনতায় অনর্থক প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করার অধিকার প্রভুর থাকে না৷ মূল্য বাবদ দেয় অর্থ সংগ্রহের জন্য সে তাকে কাজ করার সুযোগ দেবে৷ নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে গোলাম যখনই তার দেয় অর্থ বা তার ওপর আরোপিত কাজ সম্পন্ন করে দেবে তখনই সে তাকে মুক্ত করে দেবে৷ হযরত উমরের আমলের ঘটনার৷ একটি গোলাম তার কর্ত্রীর সাথে নিজের মুক্তির জন্য লিখিত চুক্তি করে এবং নির্দিষ্ট সময়ের পূর্বে চুক্তিতে উল্লেখিত পরিমাণ অর্থ সংগ্রহ করে তার কাছে নিয়ে যায়৷ কর্ত্রী বলে, আমিতো সমুদয় অর্থ এক সাথে নেবো না৷ বরং বছরে বছরে মাসে মাসে বিভিন্ন কিস্তিতে নেবো৷ গোলাম হযরত উমরের (রা) কাছে অভিযোগ করে৷ তিনি বলেন, এ অর্থ বায়তুল মালে দাখিল করে দাও এবং চলে যাও তুমি স্বাধীন৷ তারপর কর্ত্রীকে বলে পাঠান,তোমার অর্থ এখানে জমা হয়ে গেছে, এখন তুমি চাইলে এক সাথেই নিয়ে নিতে পারো অথবা আমরা বছরে বছরে মাসে মাসে তোমাকে দিতে থাকবো৷ (দারুকুত্‌নী, আবু সাঈদ মুকবেরীর রেওয়ায়াতের মাধ্যমে)৷
৫৬. একদল ফকীহ এ আয়াতের এ অর্থ নিয়েছেন যে, যখন কোন বাঁদী বা গোলাম মুল্য দানের বিনিময়ে মুক্তিলাভের লিখিত চুক্তি করার আবেদন জানায় তখন তা গ্রহণ করা প্রভুর জন্য ওয়াজিব হয়ে যায়৷ এটি আতা, আমর ইবনে দীনার, ইবনে সীরান, মাসরূক, দ্বাহ্‌হাক, 'ইক্‌রামাহ, যাহেরীয়্যা ও ইবনে জারীর তাবারীর অভিমত৷ ইমাম শাফে'ঈও প্রথমে এরই প্রবক্তা ছিলেন৷ দ্বিতীয় দলটি বলেন, এটি ওয়াজিব নয় বরং মুস্তাহাব ও মান্‌দুব তথা পছন্দনীয়৷ এ দলে শা'বী, মুকাতিল ইবনে হাইয়ান, হাসান বাস্‌রী, আবদুর রহমান ইবনে যায়েদ, সুফিয়ান সওরী, আবু হানীফা, মালেক ইবনে আনাসের মতো মনীষীগণ আছনে৷ শেষের দিকে ইমাম শাফে'ঈও এ মতের প্রবক্তা হয়ে উঠেছিলেন৷ প্রথম দলটির মতে সমর্থন করতো দু'টো জিনিস৷ এক, আয়াতের শব্দ ----- 'তাদের সাথে লিখিত চুক্তি করো৷'' এ শব্দাবলী পরিষ্কার প্রকাশ করে যে, এটি আল্লাহর হুকুম৷ দুই, নির্ভরযোগ্য রেওয়ায়াত থেকে প্রমাণ হয়, প্রখ্যাত ফকীহ ও মুহাদ্দিস হযরত মুহাম্মাদ ইবনে সীরীনের পিতা সীরীন যখন তাঁর প্রভু হযরত আনাসের (রা) কাছে মূল্যের বিনিময়ে গোলামী মুক্ত হবার লিখিত চুক্তি করার আবেদন জানায় এবং তিনি তা গ্রহণ করতে অস্বীকার করেন তখন সীরীন হযরত ওমরের (রা) কাছে নালিশ করে৷ তিনি ঘটনা শুনে দোর্‌রা নিয়ে আনাসের (রা) ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েন এবং বলেন, আল্লাহর হুকুম হচ্ছে, ''গোলামী মুক্তির লিখিত চুক্তি করো৷'' (বুখারী) এ ঘটনা থেকে যুক্তি পেশ করা হয়ঃ এটি হযরত উমরের ব্যক্তিগত কাজ নয় বরং সাহাবায়ে কেরামের উপস্থিতিতে তিনি এ কাজ করেছিলেন এবং কেউ এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাননি, কাজেই এটি এ আয়াতের নির্ভরযোগ্য ব্যাখ্যা৷ দ্বিতীয় দলটির যুক্তি হচ্ছে, আল্লাহ শুধুমাত্র ----- বলেননি, বলেন ----- ''তাদের সাথে লিখিত চুক্তি করো যদি তাদের মধ্যে কল্যাণের সন্ধান পাও৷'' এ কল্যাণের সন্ধান পাওয়াটা এমন একটি শর্ত যা নির্ভর করে একমাত্র মালিকের রায়ের ওপর৷ এর এমন কোন নির্দিষ্ট মানদণ্ড নেই যার ভিত্তিতে কোন এক মাত্র আদালত এটা যাচাই-পর্যালোচনা করতে পারে ৷ আইনগত বিধানের রীতি এ নয়৷ তাই হুকুমটিকে উপদেশের অর্থেই গ্রহণ করা হবে আইনগত হুকুমের অর্থে নয়৷ আর সীরীনের যে নজির পেশ করা হয়েছে তার জবার তারা এভাবে দেনঃ সেকালে তো আর লিখিত চুক্তির আবেদনকারী গোলাম একজন ছিল না৷ নবীর যুগে ও খেলাফতে রাশেদার আমলে হাজার হাজার গোলাম ছিল এবং তাদের বিপুল সংখ্যক মুক্তির জন্য লিখিত চুক্তি করেছিল৷ কিন্তু কেবলমাত্র সীরীনের ঘটনাটি ছাড়া কোন প্রভুকে আদালতের হুকুমের মাধ্যমে গোলামী মুক্তির লিখিত চুক্তি করতে বাধ্য করার আর একটিও দৃষ্টান্ত পাওয়া যায় না৷ কাজেই হযরত উমরের এ কাজটিকে আদালতের ফায়সালা মনে করার পরিবর্তে আমরা একে এ অর্থে গ্রহণ করতে পারি যে, তিনি মুসলমানদের মাঝখানে কেবল কাযীর ভূমিকায় অধিষ্ঠিত ছিলেন না বরং ব্যক্তি ও সমাজের সাথে তাঁর সম্পর্ক ছিল পিতা ও সন্তানের মতো৷ অনেক সময় তিনি এমন অনেক বিষয়েও হস্তক্ষেপ করতেন যাতে একজন পিতা হস্তক্ষেপ করতে পারেন কিন্তু একজন বিচারক পারেন না৷
৫৭. কল্যাণ বলতে তিনটি জিনিস বুঝানো হয়েছেঃ

একঃ চুক্তিবদ্ধ অর্থ আদায় করার ক্ষমতা গোলামের আছে ৷ অর্থাৎ সে উপার্জন বা পরিশ্রম করে নিজের মুক্তি লাভের জন্য নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ আদায় করতে পারে৷ যেমন একটি মুরসাল হাদীসে বলা হয়েছে, রসূলুল্লাহ (সা) বলেনঃ ----- ''যদি তোমার জানো তারা উপার্জন করতে পারে তাহলে লিখিত চুক্তি করে নাও ৷ তাদেরকে যেন লোকদের কাছে ভিক্ষা করতে ছেড়ে দিয়ো না ৷'' (ইবনে কাসীর, আবু দাউদের বরাত দিয়ে)

দুইঃ তার কথায় বিশ্বাস করে তার সাথে চুক্তি করা যায়, এতটুকু সততা ও বিশ্বস্ততা তার মধ্যে আছে ৷ এমন না হয় যে, লিখিত চুক্তি করার পর সে মালিকের খিদমত করা থেকে ছুটিও পেয়ে গেলো ৷ আবার এ সময়ের মধ্যে যা কিছু আয়-রোজগার করে তাও খেয়ে পরে শেষ করে ফেললো৷

তিনঃ মালিক তার মধ্যে এমন কোন খারাপ নৈতিক প্রবণতা অথবা ইসলাম ও মুসলামনদের বিরুদ্ধে শক্রতার এমন তিক্ত আবেগ-অনুভূতি পাবে না যার ভিত্তিতে এ আশংকা হয় যে, তার স্বাধীনতা মুসলিম সমাজের জন্য ক্ষতিকর ও বিপজ্জনক হবে ৷ অন্য কথায় তার ব্যাপারে আশা করা যেতে পারে যে, সে মুসলিম দেশের ও সমাজের একজন ভালো ও স্বাধীন নাগরীক হতে পারবে, কোন বিশ্বাসঘাতক ও ঘরের শক্র আস্তিনের সাঁপে পরিণত হবে না ৷ এ প্রসংগে একথা সামনে রাখতে হবে যে, বিষয়টি ছিল যুদ্ধবন্দী সংক্রান্তও এবং তাদের সম্পর্কে অবশ্যি এ ধরনের সতর্কতা অবলম্বন করার প্রয়োজন ছিল ৷
৫৮. এটি একটি সাধারণ হুকুম ৷ প্রভু, সাধারণ মুসলমান এবং ইসলামী হুকুমাত সবাইকে এখানে সম্বোধন করা হয়েছে ৷

প্রভুদেরকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে মুক্তির জন্য লিখিত চুক্তির আবেদনকারীদের দেয় অর্থ থেকে কিছু না কিছু মাফ করে দাও৷ কাজেই বিভিন্ন রেওয়ায়াত থেকে প্রমাণ হয় সাহাবায়ে কেরাম নিজেদের চুক্তিবদ্ধ গোলামদের দেয় অর্থ থেকে বেশ একটা বড় পরিমাণ অর্থ মাফ করে দিতেন৷ এমন কি হযরত আলী (রা) হামেশা এক চতুর্থাংশ মাফ করেছেন এবং এরি উপদেশ দিয়েছেন৷ (ইবনে জারীর)

সাধারণ মুসলামনদেরকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে, যে কোন লিখিত চুক্তিবদ্ধ গোলাম তার দেয় অর্থ আদায় করার জন্য তাদের কাছে আবেদন জানাবে, তাদেরকে যেন প্রাণ খুলে সাহায্য করে৷ কুরআন মজীদে যাকাতের যে ব্যয় ক্ষেত্র বর্ণনা করা হয়েছে ------ তার মধ্যে একটি অর্থাৎ ''দাসত্বের জোয়াল থেকে গর্দানমুক্ত করা৷''(সূরা তওবা, ৬০ আয়াত) আর আল্লাহর নিকট -----''গর্দানের বাঁধন খোলা'' একটি বড় নেকীর কাজ৷ (সূরা বালাদ, ১৩ আয়াত) হাদীসে বলা হয়েছে এক গ্রামীন ব্যক্তি এসে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বললো, আমাকে এমন কাজ বলুন যা করলে আমি জান্নাতে প্রবেশ করবো৷ রসূলুল্লাহ (সা) বললেন, ''তুমি অতি সংক্ষেপে অনেক বড় কথা জিজ্ঞেস করেছো৷ গোলামকে মুক্ত করে দাও, গোলামদের স্বাধীনতা লাভে সাহায্য করো, কাউকে পশু দান করলে অত্যধিক দূধেল পশু দান করো এবং তোমাদের যে আত্মীয় তোমাদের প্রতি জুলুম করে তুমি তার সাথে সৎ ব্যবহার করো৷ আর যদি তা না করতে পারো, তাহলে অভুক্তকে আহার করাও, পিপাসার্তকে পানি পান করাও, মানুষকে ভালো কাজ করার উপদেশ দাও এবং খারাপ কাজ থেকে নিষেধ করো৷ আর যদি এও না করতো পারো, তাহলে নিজের মুখ বন্ধ করে রাখো৷ মুখ খুললে ভালোর জন্য খুলবে আর নয়তো বন্ধ করে রাখবে৷''(বায়হাকী ফী শু'আবিল ঈমান, আনিল বারাআ ইবনে আযিব)৷

ইসলামী রাষ্ট্রকেও নির্দেশ দেয়া হয়েছে, বাতুল মালে যে যাকাত জমা হয় তা থেকে লিখিত চুক্তিবদ্ধ গোলামদের মুক্তির জন্য একটি অংশ ব্যয় করো৷

এ প্রসংগে উল্লেখ, প্রাচীন যুগে তিন ধরনের গোলাম হতো৷ এক, যুদ্ধবন্দী৷ দুই, স্বাধীন ব্যক্তিকে ধরে গোলাম বানানো হতো এবং তারপর তাকে বিক্রির করা হতো৷ তিন, যারা বংশানুক্রমিকভাবে গোলাম হয়ে আসছিল, তাদের বাপ-দাদাকে কবে গোলাম বানানো হয়েছিল এবং ওপরে উল্লেখিত দু'ধরনের গোলামের মধ্যে তারা ছিল কোন্ ধরনের তা জানার কোন উপায় ছিল না৷ ইসলামের আগমেনর সময় আরব ও আরবের বাইরের জগতের মানব সমাজ এ ধরনের গোলামে পরিপূর্ণ ছিল৷ অর্থৈনিতক ও সামাজিক ব্যবস্থা শ্রমিক ও চাকর বাকরদের চাইতে এ ধরনের গোলামদের ওপর বেশী নির্ভরশীল ছিল৷ ইসলামের সামনে প্রথম প্রশ্ন ছিল, পর্ব থেকে এই যে গোলামদের ধারা চলে আসছে এদের ব্যাপারে কি ব্যবস্থা নেয়া যায়৷ দ্বিতীয় প্রশ্ন ছিল আগামীর জন্য গোলামী সমস্যার কি সমাধান দেয়া যায়? প্রথম প্রশ্নের জবাবে ইসলাম কোন আকস্মিক পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি৷ প্রাচীনকাল থেকে গোলামেদের যে বংশানুক্রমিক ধারা চলে আসছিল হঠাৎ তাদের সবার ওপর থেকে মালিকানা অধিকার খতম করে দেয়নি৷ কারণ এর ফলে শুধু যে, সামাজিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থা বিপর্যস্ত হয়ে পড়তো তাই নয় বরং আরবকে আমেরিকার গৃহযুদ্ধের চাইতেও অনেক বেশী কঠিন ও ধ্বংসকর গৃহযুদ্ধের সম্মুখীন হতে হতো৷ এরপরও মূল সমস্যার কোন সমাধান হতো না, যেমন আমেরিকায় হয়নি এবং কালোদের (Negroes) লাঞ্ছনার সমস্যা সেখানে রয়েই গেছে৷ এ নির্বোধ সুলভ ও অবিবেচনা প্রসূত সংস্কারের পথ পরিহার করে ইসলাম ----- তথা দাসমুক্তির একটি শক্তিশালী নৈতিক আন্দোলন শুরু করে এবং উপদেশ, উৎসাহ-উদ্দীপনা, ধর্মীয় বিধি-বিধান ও দেশজ আইন-কানুনের মাধ্যমে লোকদেরকে গোলাম আজাদ করতে উদ্বুদ্ধ করে৷ তাদেরকে আখেরাতে নাজাত লাভ করার জন্য স্বেচ্ছায় গোলাম আজাদ করার অথবা নিজের গোনাহের কাফ্‌ফারা দেবার জন্য গোলামদেরকে মুক্তি দানের কিংবা অর্থের বিনিময়ে তাদেরকে ছেড়ে দেবার ব্যপারে উৎসাহিত করে৷ এ আন্দোলনের আওতাধীন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজে ৬৩ জন গোলামকে মুক্ত করে দেন৷ তার স্ত্রীগণের মধ্য থেকে একমাত্র হযরত আয়েশারই (রা) আজাদকৃত গোলামদের সংখ্যা ছিল ৬৭৷ রসূলুল্লাহর (সা) চাচা হযরত আব্বাস (রা) নিজের জীবনে ৭০ জন গোলামকে স্বাধীন করে দেন৷ হাকিম ইবনে হিযাম ১০০, আবদুল্লাহ ইবনে উমর ১০০০, যুল কিলাহ হিম্‌ইয়ারী ৮ হাজার এবং আবদুর রহমান ইবনে আউফ ৩০ হাজার গোলামকে আজাদ করে দেন৷ এমনি ধরনের ঘটনা অন্যান্য সাহাবীদের জীবনেও ঘটেছে৷ এদের মধ্যে হযরত আবু বকর (রা) ও হযরত উমরের (রা) নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য৷ এটি ছিল আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের একটি সাধারণ প্রেরণা৷ এ প্রেরণায় উদ্বুদ্ধ হয়ে লোকেরা ব্যাপকভাবে নিজেদের গোলামদেরকেও মুক্ত করে দিতেন এবং অন্যদের গোলাম কিনে নিয়ে এসে তাদেরকে আজাদ করে দিতে থাকতেন৷ এভাবে খোলাফায়ে রাশেদীনের যুগ শেষ হবার আগেই পূর্ব যুগের প্রায় সমস্ত গোলামই মুক্তিলাভ করেছিল৷

এখন প্রশ্ন হলো ভবিষ্যতে কি হবে৷ এ ব্যাপারে ইসলাম কোন স্বাধীন ব্যক্তিকে ধরে নিয়ে গোলাম বানানো এবং তার কেনা বেচা করার ধারাকে পুরোপুরি হারাম ও আইনগতভাবে বন্ধ করে দিয়েছে৷ তবে যুদ্ধবন্দীদেরকে শুধুমাত্র এমন অবস্থায় গোলাম বানিয়ে রাখার অনুমতি (আদেশ নয় বরং অনুমতি) দেয় যখন তাদের সরকার আমাদের যুদ্ধবন্দীদের সাথে তাদের যুদ্ধবন্দীদের বিনিময় করতে রাজী হয় না এবং তারা নিজেরাও নিজেদের মুক্তিপণ আদায় করে না৷ তারপর এ গোলামদের জন্য একদিকে তাদের মালিকদের সাথে লিখিত চুক্তির মাধ্যমে মুক্তি লাভ করার পথ খোলা রাখা হয় এবং অন্যদিকে প্রাচীন গোলামদের ব্যাপারে যেসব নির্দেশ ছিল তা সবই তাদের পক্ষে বহাল থাকে, যেমন নেকীর কাজ মনে করে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের লক্ষ্য তাদেরকে মুক্ত করে দেয়া অথবা গোনাহর কাফ্‌ফারা আদায় করার জন্য তাদেরকে আজাদ করা কিংবা কোন ব্যক্তির নিজের জীবদ্দশায় গোলামকে গোলাম হিসেবে রাখা এবং পরবর্তীকালের জন্য অসিয়ত করে যাওয়া যে, তার মৃত্যুর পরই সে আজাদ হয়ে যাবে (ইসলামী ফিকাহর পরিবভাষায় একে বলা হয় তাদবীর এবং এ ধরনের গোলমকে ''মুদাব্বার'' বলা হয়)৷ অথবা কোন ব্যক্তি নিজের বাঁদীর সাথে সংগম করা এবং তার গর্ভে সন্তান জন্ম লাভ করা, এ অবস্থায় মালিক অসিয়ত করুক বা না করুক মালিকের মৃত্যুর সাথে সাথেই সে নিজে নিজেই স্বাধীন হয়ে যাবে৷ ইসলাম গোলামী সমস্যার এ সমাধান দিয়েছে৷ অজ্ঞ আপত্তিকারীরা এগুলো না বুঝে আপত্তি করে বসেন৷ পক্ষান্তের ওজর পেশকারীগণ ওজর পেশ করতে করতে শেষ পর্যন্ত এ বাস্তব সত্যটাকেই অস্বীকার করে বসেন যে, ইসলাম গোলামীকে কোন না কোন আকারে টিকিয়ে রেখেছিল৷ (তা যে কারণেই হোক না কেন)৷
৫৯. এর অর্থ এ নয় যে, বাঁদীরা নিজেরা যদি সতীসাধ্বী না থাকতে চায়,তাহলে তাদেরকে বেশ্যাবৃত্তি গ্রহণে বাধ্য করা যেতে পারে৷ বরং এর অর্থ হচ্ছে, বাঁদী যদি স্বেচ্ছায় ব্যভিচারের লিপ্ত হয়, তাহলে নিজের অপরাধের জন্য সে নিজেই দায়ী, তার অপরাধের জন্য আইন তাকেই পাকড়াও করবে৷ কিন্তু যদি তার মালিক জোর করে তাকে এ পেশায় নিয়োগ করে, তাহলে এ জন্য মালিক দায়ী হবে এবং সে পাকড়াও হবে৷ আর একথা সুস্পষ্ট যে, জোর করার প্রশ্ন তখনই দেখা দেয় যখন কাউকে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে কোন কাজ করতে বাধ্য করা হয়৷ আর ''দুনিয়াবী স্বার্থ উদ্ধারের উদ্দেশ্য'' বাক্যাংশটি দ্বারা এ কথা বুঝানো হয়নি যে, যদি মালিক তার উপার্জন না খায় তাহলে বাঁদীকে দেহ বিক্রয়ে ব্যধ্য করার কারণে সে অপরাধী হবে না বরং বুঝানো হয়েছে যে, এ অবৈধ বল প্রয়োগের মাধ্যমে অর্জিত উপার্জনও হারামের শামিল৷

কিন্তু এ নিষেধাজ্ঞাটির পূর্ণ উদ্দেশ্য নিছক এর শব্দাবলী ও পূর্বাপর আলোচনা থেকে বুঝা যেতে পারে না ৷ একে ভালোভাবে বুঝতে হলে যে পরিস্থিতিতে এ হুকুমটি নাযিল হয় সেগুলোও সামনে রাখা জরুরী ৷ সেকালে আরব দেশে দু'ধরনের পতিতাবৃত্তির প্রচলন ছিল ৷ এক, ঘরোয়া পরিবেশে গোপন বেশ্যাবৃত্তি এবং দুই, যথারীতি বেশ্যাপাড়ায় বসে বেশ্যাবৃত্তি৷

ঘরোয়া বেশ্যাবৃত্তিতে লিপ্ত থাকতো বেশীর ভাগ ক্ষেত্রে স্বাধীনতাপ্রাপ্ত বাঁদীরা, যাদের কোন পৃষ্ঠপোষক ছিল না৷ অথবা এমন ধরনের স্বাধীন মেয়েরা, কোন পরিবার বা গোত্র যাদের পৃষ্ঠপোষক ছিল না ৷ তারা কোন গৃহে অবস্থান করতো এবং একই সংগে কয়েকজন পুরুষের সাথে তাদের এ মর্মে চুক্তি হয়ে যেতো যে, তারা তাকে সাহায্য করবে ও তার ব্যয়ভার বহন করবে এবং এর বিনিময়ে পুরুষরা নিজেদের প্রয়োজন পূরণ করতে থাকবে ৷ সন্তান জন্ম নিলে মেয়েরা যে পুরুষ সম্পর্কে বলে দিত যে, এ সন্তান অমুকের৷ সে-ই সন্তানের পিতা হিসেবে স্বীকৃত হতো ৷ এটি যেন ছিল জাহেলী সমাজের একটি স্বীকৃত প্রথা৷ জাহেলিয়াতের যুগে লোকেরা একে এক ধরনের 'বিয়ে' মনে করতো ৷ ইসলাম এসে বিয়ের জন্য 'এক মেয়ের এক স্বামী' এ একমাত্র পদ্ধতিকেই চালু করলো ৷ এ ছাড়া বাদবাদী সমস্ত পদ্ধতি আপনা আপনিই যিনা হিসেবে গণ্য হয়ে অপরাধে পরিণত হয়ে গেলো৷ (আবু দাউদ, বাবুন ফী অজুহিন নিকাহ আল্লাতী কানা ইয়াতানাকিহু আহলুল জাহেলিয়াহ)৷

দ্বিতীয় অবস্থাটি অর্থাৎ প্রকাশ্য বেশ্যাবৃত্তিতে নিয়োগ করা হতো বাঁদীদেরকেই ৷ এর দু'টি পদ্ধতি ছিল৷ প্রথমত লোকেরা নিজেদের যুবতী বাঁদীদের ওপর একটি নির্দিষ্ট অংক চাপিয়ে দিতো৷ অর্থাৎ প্রতি মাসে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ উপার্জন করে তাদেরকে দিতে হবে ৷ ফলে তারা দেহ বিক্রয় করে তাদের এ দাবী পূর্ণ করতো ৷ এ ছাড়া অন্য কোন পথে তারা এ পরিমাণ অর্থ উপার্জন করতেও পারতো না৷ আর তারা কোন পবিত্র উপায়ে এ পরিমাণ অর্থ উপর্জন করে এনেছে বলে তাদের মালিকরাও মনে করতো না৷ যুবতী বাঁদীদের ওপর সাধারণ মজুরদের তুলনায় কয়েকগুন বেশী রোজগার করার বোঝা চাপিয়ে দেবার এ ছাড়া আর কোন যুক্তিসংগত কারণ ছিল না৷ দ্বিতীয় পদ্ধতি ছিল, লোকেরা নিজেদের সুন্দরী যুবতী বাঁদীদেরকে আলাদা ঘরে বসিয়ে রাখতো এবং তাদের দরজায় ঝান্ডা গেড়ে দিতো ৷ এ চিহ্ন দেখে দূর থেকেই "ক্ষুধার্তরা" বুঝতে পারতো কোথায় তাদের ক্ষুধা নিবৃত্ত করতে হবে৷ এ মেয়েদেরকে বলা হতো ''কালীকীয়াত''এবং এদের গৃহগুলো ''মাওয়াখীর'' নামে পরিচিত ছিল৷ বড় বড় গণ্যমান্য সমাজপতিরা এ ধরনের বেশ্যালয় পরিচালনা করতো ৷ স্বয়ং আবদুল্লাহ ইবনে উবাই ( মুনাফিক প্রধান, যাকে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আগমনের পূর্বে মদীনাবাসীরা নিজেদের বাদশাহ করার সিদ্ধান্ত করে ফেলছিল এবং যে হযরত আয়েশার বিরুদ্ধে অপবাদ রটানোর কাজে সবার আগে ছিল) মদীনায় এ ধরনের একটি বেশ্যালয়ের মালিক ছিল৷ সেখানে ছিল ছয়জন সুন্দরী বাঁদী ৷ তাদের মাধ্যমে সে কেবলমাত্র অর্থই উপার্জন করতো না বরং আরবের বিভিন্ন এলাকা থেকে আগত নামী দামী মেহমানদের আদর আপ্যায়নও তাদের দিয়েই করাতো৷ তাদের অবৈধ সন্তানদের সাহায্য সে নিজের পাইক, বরকন্দাজ ও লাঠিয়ালের সংখ্যা বাড়াতো৷ এ বাঁদীদেরই একজনের নাম ছিল মু'আযাহ ৷ সে মুসলমান হয়ে গিয়েছিল এবং এ পেশা থেকে তাওবা করতে চাচ্ছিল৷ ইবনে উবাই তার ওপর জোর জবরদস্তি করলো সে গিয়ে হযরত আবু বকরের (রা) কাছে নালিশ করলো৷ তিনি ব্যাপারটি রসূলের (সা) কাছে পৌঁছে দিলেন ৷(ইবনে জারীর, ১৮ খন্ড, ৫৫-৫৮ এবং ১০৩-১০৪ পৃষ্ঠা, আল ইসতি'আব লি ইবনি আবদিল বার, ২ খন্ড, ৭৬২ পৃষ্ঠা, ইবনে কাসীর, ৩ খন্ড, ২৮৮-২৮৯ পৃষ্ঠা)৷ এ সময়েই আল্লাহর পক্ষ থেকে এ আয়াত নাযিল হয়৷ এ পটভূমি দৃষ্টি সমক্ষে রাখলে পরিষ্কার জানা যাবে, শুধুমাত্র বাঁদীদেরকে যিনার অপরাধে জড়িত হতে বাধ্য করার পথে বাধা সৃষ্টি করাই নয় বরং ইসলামী রাষ্ট্রের সীমানার মধ্যে বেশ্যাবৃত্তির (Prostitution) ব্যবসায়ে সম্পূর্ণরুপে আইন বিরোধী গণ্য করা এবং একই সংগে যেসব মেয়েকে জোর জবরদস্তি এ ব্যবসায়ে নিয়োগ করা হয় তাদের জন্য ক্ষমা ঘোষণাও এখানে এর মূল উদ্দেশ্য৷

আল্লাহর পক্ষ থেকে এ ফরমান এসে যাবার পর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ঘোষণা করেন ----- ''ইসলামে বেশ্যাবৃত্তির কোন অবকাশই নেই৷'' (আবু দাউদ, ইবনে আব্বাসের রেওয়ায়াতের মাধ্যমে, বাবুন ফী ইদ্দিআয়ে ওয়ালাদিয যিনা) দ্বিতীয় যে হুকুমটি তিনি দেন সেটি ছিল এই যে, যিনার মাধ্যমে অর্জিত অর্থ হারাম, নাপাক ও পুরোপুরি নিষিদ্ধ৷ রাফে' ইবন খাদীজের রেওয়ায়াত হচ্ছে, নবী করীম (সা) -----অর্থাৎ যিনার বিনিময়ে অর্জিত অর্থকে নষ্ট, সর্বাধিক অকল্যাণমূলক উপার্জন, অপবিত্র ও নিকৃষ্টতম আয় গণ্য করেন ৷ (আবু দাউদ, তিরমিযি ও নাসাঈ) আবু হুজাইফা (রা) বলেন, রসূলুল্লাহ (সা) -----অর্থাৎ দেহ বিক্রয়লব্ধ অর্থকে হারাম গণ্য করেছেন৷ (বুখারী, মুসলিম, আহমাদ ) আবু মাস'উদ উকবাহ ইবনে আমরের রেওয়ায়াত হচ্ছে,রসূলুল্লাহ (সা) ----- তথা যিনার মাধ্যমে উপার্জিত অর্থের লেনদেনকে নিষিদ্ধ গণ্য করেছেন ৷ (সিহাহে সিত্তা ও আহমদ) তৃতীয় যে হুকুমটি তিনি দিয়েছিলেন তা ছিল এই যে, বাঁদীর কাছে থেকে বৈধ পন্থায় কেবলমাত্র হাত ও পায়ের শ্রম গ্রহণ করা যেতে পারে এবং মনিব তার ওপর এমন পরিমাণ কোন অর্থ চাপিয়ে দিতে বা তার কাছ থেকে আদায় করতে পারে না যে সম্পর্কে সে জানে না অর্থ সে কোথা থেকে ও কিভাবে উপার্জন করে৷ রাফে' ইবনে খাদীজ বলেনঃ

------------

''রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম বাঁদীর মাধ্যমে কোন উপার্জন নিষিদ্ধ গণ্য করেন যতক্ষণ না একথা জানা যায় যে, এ অর্থ কোথা থেকে অর্জিত হয়৷'' (আবু দাউদ, কিতাবুল ইজারাহ)

রাফে' ইবনে রিফা'আহ আনসারীর বর্ণনায় এর চাইতেও সুস্পষ্ট হুকুম পাওয়া যায় ৷ সেখানে বলা হয়েছেঃ

---------------

''আল্লাহর নবী সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম বাঁদীর সাহায্যে অর্থোপর্জন করতে আমাদের নিষেধ করেছেন, তবে হাতের সাহায্যে পরিশ্রম করে সে যা কিছু কামাই করে তা ছাড়া৷ এবং তিনি হাতের ইশারা করে দেখান যেমন এভাবে রুটি তৈরী করা, সূতা কাটা বা উল ও তুলা ধোনা৷ ''(মুসনাদে আহমাদ, আবু দাউদ,কিতাবুল ইজারাহ)

একই বক্তব্য সম্বলিত একটি হাদীস আবু দাউদ ও মুসনাদে আহমাদে হযরত আবু হুরাইরা (রা) থেকে বর্ণিত হয়েছে৷ তাতে----- (বাঁদীর কামাই) ও ----- (ব্যভিচারের উপার্জন) গ্রহণ করতে নিষেধ করা হয়েছে ৷ এভাবে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কুরআনের এ আয়াতের উদ্দেশ্য অনুযায়ী সেকালে আরবে প্রচলিত বেশ্যাবৃত্তির সকল পদ্ধতিকে ধর্মীয় দিক দিয়ে অবৈধ ও আইনগত দিক দিয়ে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন ৷ বরং আরো অগ্রসর হয়ে আবদুল্লাহ ইবনে উবাই-এর বাঁদী মু'আযার ব্যাপারে যা কিছু সিদ্ধান্ত তিনি দেন তা থেকে জানা যায়, যে বাঁদীকে তার মালিক জোর করে এ পেশায় নিয়োগ করে তার ওপর থেকে তার মালিকের মালিকানা সত্বও খতম হয়ে যায় ৷ এটি ইমাম যুহরীর রেওয়ায়াত ৷ ইবনে কাসীর মুসনাদে আবদুর রাযযাকের বরাত দিয়ে তাঁর গ্রন্থে এটি উদ্ধৃত করেছেন৷
৬০. এ আয়াতটির সম্পর্কে কেবলমাত্র ওপরের শেষ আয়াতটির সাথে নয় ৷ বরং সূরার শুরু থেকে এখান পর্যন্ত যে বর্ণনা ধারা চলে এসেছে তার সবের সাথে এর সম্পর্ক রয়েছে৷ দ্ব্যর্থহীন পথ নির্দেশক আয়াত বলতে এমনসব আয়াত বুঝানো হয়েছে যেগুলোতে যিনা, কাযাফ ও লি'আনের আইন বর্ণনা করা হয়েছে, ব্যভিচারী পুরুষ ও মহিলার সাথে মু'মিনদের বিয়েশাদী না করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে, সৎ চরিত্রবান ও সম্ভ্রান্ত লোকদের ওপর ভিত্তিহীন অপবাদ দেয়া এবং সমাজে দুষ্কৃতি ও অশ্লীলতার প্রচার ও প্রসারের পথ বন্ধ করা হয়েছে, পুরুষ ও নারীকে দৃষ্টিসংযত ও যৌনাংগ হেফাজত করার তাগিদ দেয়া হয়েছে, নারীদের জন্য পরদার সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে, বিবাহযোগ্য লোকদের বিবাহ না করে একাকী জীবন যাপনকে অপছন্দ করা হয়েছে, গোলামদের আজাদীর জন্য লিখিত চুক্তি করার নিয়ম প্রবর্তন করতে বলা হয়েছে এবং সমাজকে বেশ্যাবৃত্তির অভিশাপ মুক্ত করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে৷ এসব কথা বলার পর বলা হচ্ছে, আল্লাহকে ভয় করে সহজ সরল পথ অবলম্বনকারীদেরকে যেভাবে শিক্ষা দেয়া দরকার তাতো আমি দিয়েছি, এখন যদি তোমরা এ শিক্ষার বিপরীত পথে চলো, তাহলে এর পরিষ্কার অর্থ দাঁড়াবে এই যে, তোমরা এমন সব জাতির মতো নিজেদের পরিণাম দেখতে চাও যাদের ভয়াবহ ও শিক্ষণীয় দৃষ্টান্ত আমি এ কুরআনে তোমাদের সামনে পেশ করেছি৷ সম্ভবত একটি নির্দেশ নামার উপসংহারে এর চেয়ে কড়া সতর্কবাণী আর হতে পারে না৷ কিন্তু অবাক হতে হয় এমন জাতির কার্যকলাপ দেখে যারা এ নির্দেশনামা তেলাওয়াতও করে আবার এ ধরনের কড়া সাবধান বাণীর পরও এর বিপরীত আচরণও করতে থাকে!