(২৪:২১) হে ঈমানদানগণ ! শয়তানের পদাংক অনুসরণ করে চলো না ৷ যে কেউ তার অনুসরণ করবে তাকে সে অশ্লীলতা ও খারাপ কাজ করার হুকুম দেবে৷ যদি তোমাদের প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহ ও করুণা না থাকতো তাহলে তোমাদের একজনও পবিত্র হতে পারতো না ৷১৮ কিন্তু আল্লাহই যাকে চান তাকে পবিত্র করে দেন এবং আল্লাহ শ্রবণকারী ও জ্ঞাত৷১৯
(২৪:২২) তোমাদের মধ্য থেকে যারা প্রাচুর্য ও সামর্থের অধিকারী তারা যেন এ মর্মে কসম খেয়ে না বসে যে, তারা নিজেদের আত্মীয়-স্বজন, গরীব-মিসকীন ও আল্লাহর পথে গৃহত্যাগকারীদেরকে সাহায্য করবে না ৷ তাদেরকে ক্ষমা করা ও তাদের দোষ-ক্রটি উপেক্ষা করা উচিত ৷ তোমরা কি চাও না আল্লাহ তোমাদের মাফ করেন? আর আল্লাহ ক্ষমাশীলতা ও দয়া গুণে গুণান্বিত ৷২০
(২৪:২৩) যারা সতী সাধ্বী, সরলমনা২১ মু’মিন মহিলাদের প্রতি অপবাদ দেয় তারা দুনিয়ায় ও আখেরাতে অভিশপ্ত এবং তাদের জন্য রয়েছে মহাশাস্তি ৷
(২৪:২৪) তারা যেন সেদিনের কথা ভুলে না যায় যেদিন তাদের নিজেদের কন্ঠ এবং তাদের নিজেদের হাত-পা তাদের কৃতকর্মের সাক্ষ দেবে৷২১(ক) (ক)
(২৪:২৫) সেদিন তারা যে প্রতিদানের যোগ্য হবে, তা আল্লাহ তাদেরকে পুরোপুরি দেবেন এবং তারা জানবে, আল্লাহই সত্য এবং সত্যকে সত্য হিসেবে প্রকাশকারী৷
(২৪:২৬) দুশ্চরিত্রা মহিলারা দুশ্চরিত্র পুরুষদের জন্য এবং দুশ্চরিত্র পুরুষরা দুশ্চরিত্রা মহিলাদের জন্য৷ সচ্চরিত্রা মহিলারা সচ্চরিত্র পুরুষদের জন্য এবং সচ্চরিত্র পুরুষরা সচ্চরিত্রা মহিলাদের জন্য ৷ লোকে যা বলে তা থেকে তারা পূত-পবিত্র ৷২২ তাদের জন্য রয়েছে মাগফিরাত ও মর্যাদাপূর্ণ জীবিকা৷
১৮. অর্থাৎ শয়তান তো তোমাদের গায়ে অসৎকাজের নাপাকী মাখিয়ে দেবার জন্য এমন্ উন্মুখ হয়ে বসে আছে যে, যদি আল্লাহ নিজেই অনুগ্রহ ও দয়া করে তোমাদের সততা ও অসততার পার্থক্য না শেখান এবং তোমাদের সংশোধনের শিক্ষা সুযোগ লাভের সৌভাগ্য দান না করেন, তাহলে তোমাদের একজনও নিজেদের শিক্ত-সামর্থের জোরে পবিত্র ও পাপ-পংকিলতা থেকে মুক্ত হতে পারো না৷
১৯. অর্থাৎ আল্লাহ চোখ বন্ধ করে, আন্দাজে যাকে তাকে পবিত্রতা দান করেন না বরং নিজের নিশ্চিত জ্ঞানের ভিত্তিতে দান করেন৷ আল্লাহ জানেন কে কল্যাণ চায় এবং কে অকল্যাণ আকাংখী৷ প্রত্যেক ব্যক্তি একান্তে যেসব কথা বলে আল্লাহ তা সবই শুনে থাকেন৷ প্রত্যেক ব্যক্তি মনে মনে যা চিন্তা করে আল্লাহ তা থেকে মোটেই বেখবর থাকেন না৷ এ সরাসরি ও প্রত্যক্ষ জ্ঞানের ভিত্তিতে আল্লাহ ফায়সালা করেন, কাকে পবিত্রতা দান করবেন ও কাকে পবিত্রতা দান করবেন না৷
২০. হযরত আয়েশা (রা) বলেন, ওপরে বর্ণিত আয়াতগুলোতে মহান আল্লাহ যখন আমার নির্দোষিতার কথা ঘোষণা করেন তখন হযরত আবু বকর (রা) কসম খেয়ে বসেন, তিনি আগামীতে মিস্‌তাহ ইবনে উসাসাকে সাহায্য করা বন্ধ করে দেবেন৷ কারণ মিস্‌তাহ আত্মীয়-সম্পর্কের কোন পরোয়া করেননি এবং তিনি সারা জীবন তার ও তার সমগ্র পরিবারের যে উপকার করে এসেছেন সে জন্য একটুও লজ্জা অনুভব করেননি৷ এ ঘটনায় এ আয়াত নাযিল হয় এবং এ আয়াত শুনেই হযরত আবু বকর (রা) সংগে সংগেই বলেন, ----- 'আল্লাহর কসম, অবশ্যই আমরা চাই, হে আমাদের রব! তুমি আমাদের ভুল-ভ্রান্তি মাফ করে দেবে৷' কাজেই তিনি আবার মিস্‌তাহকে সাহায্য করতে থাকেন এবং এবার আগের চেয়ে বেশী করে করতে থাকেন৷ হযরত আবদুল্লাহু ইবনে আব্বাসের (রা) বর্ণনা হচ্ছে, হযরত আবু বকর ছাড়া আর কয়েকজন সাহাবীও এ কসম খেয়েছিলেন যে, যারা মিথ্যা অপবাদ ছড়াতে অংশ নিয়েছিল তাদেরকে তাঁরা আর কোন সাহায্য সহায়তা দেবেন না৷ এ আয়াতটি নাযিল হবার পর তারা সবাই নিজেদের কসম ভেঙ্গে ফেলেন৷ এভাবে এ ফিত্‌নার ফলে মুসলিম সমাজে যে তিক্ততার সৃষ্টি হয়ে গিয়েছিল তা এক মুহূর্তেই দূর হয়ে যায়৷

এখান একটি প্রশ্ন দেখা দেয়, যদি কোন ব্যাক্তি কোন বিষয়ে কসম খেয়ে বসে তারপর সে জানতে পারতো এতে কোন কল্যাণ নেই এবং এর ফলে কসম ভেঙ্গে ফেলে যে বিষয়ে কল্যাণ আছে তা অবলম্বন করে,তাহল এ ক্ষেত্রে তাকে কসম ভাঙ্গার কাফ্‌ফারা আদায় করতে হবে কি না৷ এক দল ফকীহ বলেন, কল্যাণের পথ অবলম্বন করাই কাফ্‌ফারা, এ ছাড়া আর কোন কাফ্‌ফারার প্রয়োজন নেই৷ তারা এ আয়াত থেকে যুক্তি দিয়ে থাকেন যে, আল্লাহ হযরত আবু বকরকে কসম ভেঙ্গে ফেলার হুকুম দেন এবং কাফ্‌‌ফারা আদায় করার হুকুম দেননি৷ এ ছাড়া নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিম্নোক্ত উক্তিটিকেও তারা যুক্তি হিসেবে পেশ করেনঃ

-----

''যে ব্যক্তি কোন বিষয়ে কসম খেয়ে বসে তারপর সে জানতে পারে অন্য বিয়ষটি তার চেয়ে ভালো, এ অবস্থায় তার ভালো বিষয়টি গ্রহণ করা উচিত এবং এই ভালো বিষয়টি গ্রহণ করাই তার কাফ্‌ফারা৷''

অন্য দলটি বলেন, কসম ভাঙ্গার জন্য আল্লাহর কুরআন মজীদে একটি পরিষ্কার স্বতন্ত্র হুকুম নাযিল করেছেন (আল বাকারাহ ২২৫ ও আল মায়েদাহ ৮৯ আয়াত)৷ এ আয়াতটা ঐ হুকুম রহিত করেনি এবং পরিষ্কারভাব এর মধ্যে কোন সংশোধনও করেনি৷ কাজেই ঐ হুকুম স্বস্থানে অপরিবর্তিত রয়েছে৷ আল্লাহ এখানে হযরত আবু বকরকে অবশ্যি কসম ভেঙ্গে ফেলতে বলেছেন কিন্তু তাঁকে তো এ কথা বলেননি যে, তোমার ওপর কোন কাফ্‌ফারা ওয়াজিব নয়৷ আর নবী সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লামের উক্তিটির অর্থ হচ্ছে, শুধু এই যে, একটি ভুল ও অসংগত বিষয়ের কসম খেয়ে ফেললে যে গুনাহ হয় সঠিক ও সংগত পন্থা অবলম্বন তার অপনোদন হয়ে যায়৷ কসমের কাফ্‌ফারা রহিত করা এর উদ্দেশ্য নয়৷ বস্তুতঃ অন্য একটি হাদীস-এর ব্যাখ্যা করে দেয়৷ তাতে নবী করীম (সা) বলেনঃ

-----

''যে ব্যক্তি কোন বিষয়ে কসম খেয়ে বসে তারপর সে জানতে পারে অন্য বিষয় তার চেয়ে ভালো, তার যে বিষয়টি ভালো সেটিই করা উচিত এবং নিজের কসমের কাফ্‌ফারা আদায় করা উচিত৷''

এ থেকে জানা যায়, কসম ভাঙ্গার কাফ্‌ফারা আলাদা জিনিস এবং ভালো কাজ না করার গোনাহের কাফ্‌ফারা অন্য জিনিস৷ ভালো কাজ করা হচ্ছে একটি জিনিসের কাফ্‌ফারা এবং দ্বিতীয় জিনিসের কাফ্‌ফারা কুরআন নিজেই নির্ধারিত করে দিয়েছে৷ (আরো বেশী ব্যাখ্যার জন্য দেখুন তাফহীমুল কুরআন, সূরা সাদের ব্যাখ্যা, ৪৬ টীকা)৷
২১. মূলে ---------------(গাফেলাত) শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে ৷ এর অর্থ হচ্ছে , সরলমনা ও ভদ্র মহিলারা , যারা ছল-চাতুরী জানে না, যাদের মন নির্মল ,কলুষমুক্ত ও পাক -পবিএ , যারা অসভ্যতা ও অশ্লীল আচরন কি ও কিভাবে করতে হয় তা জানে না এবং কেউ তাদের বিরুদ্ধে অপবাদ দেবে একথা যারা কোনদিন কল্পনাও করতে পারে না৷ হাদীসে বলা হয়েছে,নবী সাল্লাল্লাহ আল্লাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, নিষ্কলুষ-সতী-সাধ্বী মহিলাদের বিরুদ্ধে অপবাদ দেয়া সাতটি ''সর্বনাশা'' কবীরাহ গোনাহের অন্তরভূক্ত৷ তাবারানীতে হযরত হুযাইফার বর্ণনায় বলা হয়েছে, নবী (সা) বলেছেনঃ

-----

''একজন নিরপরাধ সতী সাধ্বী নারীর বিরুদ্ধে অপবাদ দেয়া একশ বছরের সৎকাজ ধ্বংস করে দেবার জন্য যথেষ্ট৷''
২১(ক). ব্যাখ্যার জন্য দেখুন তাফহীমুল কুরআন, সূরা ইয়াসীন, ৫৫ এবং সূরা হা-মীম আস্‌ সাজ্‌দাহ, ২৫ টীকা৷
২২. এ আয়াতে একটি নীতিগত কথা বুঝানো হয়েছে৷ সেটি হচ্ছেঃ দুশ্চরিত্ররা দুশ্চরিত্রদের সাথেই জুটি বাঁধে এবং সচ্চরিত্র ও পাক-পবিত্র লোকেরা স্বাভাবিকভাবেই সচ্চরিত্র ও পাক-পবিত্র লোকদের সাথেই মানানসই৷ একজন দুষ্কৃতকারী শুধু একটিমাত্র দুষ্কৃতি করে না৷ সে আর সব দিক দিয়ে একদম ভালো এবং শুধুমাত্র একটি দুষ্কর্মে লিপ্ত-ব্যাপারটা মোটেই এ রকম নয়৷ তার চলাফেরা, আচার-আচরণ, স্বভাব-চরিত্র সবকিছুর মধ্যে নানান অসৎপ্রবণতা লুকিয়ে থাকে এগুলো তার একটি বড় অসৎপবণতা কোন অদৃশ্য গোলার মতো বিষ্ফোরিত হয়ে চারদিকে ছড়িয়ে পড়বে, অথচ এর কোন আলামত ইতিপূর্বে তার চালচলন ও আচার-আচরণে দেখা যায়নি, এটা কোনক্রমেই সম্ভব হতে পারে না৷ মানব জীবনে প্রতিনিয়ত এ মনস্তাত্বিক সত্যটির প্রদর্শনী হচ্ছে৷ একজন পাক-পবিত্র মানুষ, যার সমগ্র জীবন সবার সামনে সুষ্পষ্ট, সে একটি ব্যভিচারী নারীর সাথে ঘর সংসার করে এবং বছরের পর বছর তাদের মধ্যে গভীর প্রেম ও প্রীতি পূর্ণ সম্পর্ক থাকে, একথা কিভাবে বোধগম্য হয়? একথা কি চিন্তা করা যেতে পারে যে, কোন নারী এমনও হতে পারে যে ব্যভিচারিনী হবে এবং তারপর তার চলন-বলন, অংগভংগী, আচার-ব্যবহার কোন জিনিস থেকেও তার এসব অসৎবৃত্তির কোন লক্ষণই ফুটে উঠবে না? অথবা কোন ব্যক্তি পবিত্র হৃদয়বৃত্তর অধিকারী ও উন্নত চরিত্রবানও হবে আবার সে এমন নারীর প্রতি সন্তুষ্ট্ থাকবে যার মধ্যে এসব লক্ষণ দেখা যাবে? একথা এখানে বুঝাবার কারণ হচ্ছে এই যে, ভবিষ্যতে যদি কারোর প্রতি এ অপবাদ দেযা হয়, তাহলে লোকেরা যেন অন্ধের মতো তা শুনেই বিশ্বাস করে না নেয়, বরং তারা যেন চোখ খুলে দেখে নেয় কার বিরুদ্ধে অপবাদ দেয়া হচ্ছে, কি অপবাদ দেয়া হচ্ছে এবং তা কোনভাবে সেখানে খাপ খায় কি না? কথা যদি জুতসই হয়, তাহলে মানুষ এক পর্যায় পর্যন্ত তা বিশ্বাস করতে পারে অথবা কমপক্ষে সম্ভব মনে করতে পারে৷ কিন্তু উদ্ভট ও অপরিচিত কথা, যার সত্যতার স্বপক্ষে একটি চিহ্নও কোথাও খুঁজে পাওয়া যায় না, তা শুধুমাত্র কোন নির্বোধ বা দুর্জনের মুখ দিয়ে বেরিয়েছে বলেই তাকে কেমন করে মেনে নেয়া যায়? কোন কোন মুফাস্‌সির এ আয়াতের এ অর্থও করেছেন যে, খারাপ কথা খারাপ লোকদের জন্য (অর্থাৎ তারা এর হকদার) এবং ভালো কথা ভালো লোকদের জন্য, আর ভালো লোকদের সম্পর্কে দুর্মুখেরা যেসব কথা বলে তা তাদের প্রতি প্রযুক্ত হওয়া থেকে তারা মুক্ত ও পবিত্র৷ অন্য কিছু লোক এর অর্থ করেছেন এভাবে, খারাপ কাজ খারাপ লোকদের পক্ষেই সাজে এবং ভালো কাজ ভালো লোকদের জন্যই শোভনীয়, ভালো লোকেরা খারাপ কাজের অপবাদ বহন থেকে পবিত্র৷ ভিন্ন কিছু লোক এর অর্থ নিয়েছেন এভাবে, খারাপ কথা খারাপ লোকদেরই বলার মতো এবং ভালো লোকেরা ভালো কথা বলে থাকে, অপবাদদাতারা যে ধরনের কথা বলছে ভালো লোকেরা তেমনি ধরনের কথা বলা থেকে পবিত্র৷ এসবগুলো ব্যাখ্যার অবকাশ আয়াতের শব্দাবলী মধ্যে আছে৷ কিন্তু এ শব্দগুলো পড়ে প্রথমেই যে অর্থাৎ মনের মধ্যে বাসা বাঁধে তা হচ্ছে যা আমি প্রথমে বর্ণনা করে এসেছি এবং পরিবেশ পরিস্থিতির দিক দিয়েও তার মধ্যে যে তাৎপর্য রয়েছে, অন্য অর্থগুলোর মধ্যে তা নেই৷