(২৪:১১) যারা এ মিথ্যা অপবাদ তৈরী করে এনেছে তারা তোমাদেরই ভিতরের একটি অংশ ৷ এ ঘটনাকে নিজেদের পক্ষে খারাপ মনে করো না বরং এও তোমাদের জন্য ভালই৷১০ যে এর মধ্যে যতটা অংশ নিয়েছে সে ততটাই গোনাহ কামাই করেছে আর যে ব্যক্তি এর দায়দায়িত্বের বড় অংশ নিজের মাথায় নিয়েছে১১ তার জন্য তো রয়েছে মহাশাস্তি ৷
(২৪:১২) যখন তোমরা এটা শুনেছিলে তখনই কেন মু’মিন পুরুষ ও মু’মিন নারীরা নিজেদের সম্পর্কে সুধারণা করেনি ১২ এবং কেন বলে দাওনি এটা সুস্পষ্ট মিথ্যা দোষারোপ?১৩
(২৪:১৩) তারা (নিজেদের অপবাদের প্রমাণ স্বরূপ) চারজন সাক্ষী আনেনি কেন? এখন যখন তারা সাক্ষী আনেনি তখন আল্লাহর কাছে তারাই মিথ্যুক৷১৪
(২৪:১৪) যদি তোমাদের প্রতি দুনিয়ায় ও আখেরাতে আল্লাহর অনুগ্রহ ও করুণা না হতো তাহলে যেসব কথায় তোমরা লিপ্ত হয়ে গিয়েছিলে সেগুলোর কারণে তোমাদের ওপরে মহাশাস্তি নেমে আসতো৷
(২৪:১৫) (একটু ভেবে দেখো তো¸ সে সময় তোমরা কেমন মারাত্মক ভুল করেছিলে) যখন তোমরা এক মুখ থেকে আর এক মুখে এ মিথ্যা ছড়িয়ে বেড়াচ্ছিলে এবং তোমরা নিজেদের মুখে এমন সব কথা বলে যাচ্ছিলে যা সম্পর্কে তোমাদের কিছুই জানা ছিল না ৷ তোমরা একে একটা মামুলি কথা মনে করেছিলে অথচ আল্লাহর কাছে এটা ছিল্ গুরুতর বিষয়৷
(২৪:১৬) একথা শোনার সাথে সাথেই তোমরা বলে দিলে না কেন, ‘‘এমন কথা মুখ দিয়ে বের করা আমাদের শোভা পায় না , সুব্‌হানাল্লাহ! এ তো একটি জঘন্য অপবাদ৷’’
(২৪:১৭) আল্লাহ তোমাদের উপদেশ দেন, যদি তোমরা মু’মিন হয়ে থাকো,
(২৪:১৮) তাহলে ভবিষ্যতে কখনো এ ধরনের কাজ করো না ৷ আল্লাহ তোমাদের পরিষ্কার নির্দেশ দেন এবং তিনি সবজ্ঞ ও বিজ্ঞানময়৷১৫
(২৪:১৯) যারা চায় মু’মিনদের সমাজে অশ্লীলতার প্রসার ঘটুক তারা দুনিয়ায় ও আখেরাতে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি ভোগ করবে৷১৬ আল্লাহ জানেন এবং তোমরা জানো না ৷১৭
(২৪:২০) যদি আল্লাহর অনুগ্রহ ও তাঁর করুণা তোমাদের প্রতি না হতো এবং আল্লাহ যদি স্নেহশীল ও দয়ার্দ্র না হতেন (তাহলে যে জিনিস এখনই তোমাদের মধ্যে ছড়ানো হয়েছিলো তার পরিণাম হতো অতি ভয়াবহ ৷)
৮. হযরত আয়েশার (রা) বিরুদ্ধে যে অপবাদ রটানো হয়েছিল সেদিকে ইংগিত করা হয়েছে৷ এ অপবাদকে ''ইফক'' শব্দের মাধ্যমে উল্লেখ করে স্বয়ং আল্লাহর পক্ষ থেকেই এ অপরাধকে পুরোপুরি খন্ডন করা হয়েছে ৷ 'ইফক' শব্দের অর্থ হচ্ছে, কথা উলটে দেয়া, বাস্তব ঘটনাকে বিকৃতি করে দেয়া৷ এ অর্থের দিক দিয়ে এ শব্দটিকে ডাহা মিথ্যা ও অপবাদ দেয়া অর্থে ব্যবহার করা হয়৷ আর কোন দোষারোপ অর্থে শব্দটি ব্যবহার করলে তখন এর অর্থ হয় সুস্পষ্ট মিথ্যা অপবাদ ৷

এ সূরাটি নাযিলের মূলে যে ঘটনাটি আসল কারণ হিসেবে কাজ করেছিল এখান থেকে তার ওপর আলোচনা শুরু হয়েছে ৷ ভূমিকায় এ সম্পর্কিত প্রারম্ভিক ঘটনা আমি হযরত আয়েশার বর্ণনার মাধ্যমে উদ্ধৃত করেছি ৷ পরবর্তী ঘটনাও তাঁরই মুখে শুনুন ৷ তিনি বলেনঃ " এ মিথ্যা অপবাদের গুজব কমবেশি এক মাস ধরে সারা শহরে ছড়াতে থাকে ৷ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মারাত্মক ধরনের মানসিক কষ্টে ভুগতে থাকেন ৷ আমি কাঁদতে থাকি ৷ আমার বাপ-মা চরম পেরেশানী ও দুঃখে- শোকে ভুগতে থাকেন ৷ শেষে একদিন রাসূল্লাহ (সা) আসেন এবং আমার কাছে বসেন৷ এ সমগ্র সময়- কালে তিনি‌ কখনো আমার কাছে বসেননি ৷ হযরত আবু বকর (রা) ও উম্মে রুমান (হযরত আয়েশার মা ) অনুভব করেন আজ কোন চূড়ান্ত সিদ্ধান্তকর কথা হবে ৷ ‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌তাই তাঁরা দু'জনেও কাছে এসে বসেন ৷ রসূলুল্লাহ (সা) বলেন, আয়েশা! তোমার সম্পর্কে আমার কাছে এই খবর পৌছেছে ৷ যদি তুমি নিরপরাধ হয়ে থাকো তাহলে আশা করা যায় আল্লাহ তোমার অপরাধ মুক্তির কথা প্রকাশ করে দেবেন৷ আর যদি তুমি সত্যিই গোনাহে লিপ্ত হয়ে থাকো তাহলে আল্লাহর কাছে তাওবা করো এবং ক্ষমা চাও ৷ বান্দা যখন তার গোনাহ স্বীকার করে নিয়ে তাওবা করে তখন আল্লাহ তা মাফ করে দেন ৷ একথা শুনে আমার চোখের পানি শুকিয়ে যায়৷ আমি আমার পিতাকে বলি, আপনি রাসূলুল্লাহর কথার জবাব দিন ৷ তিনি বলেন : ''মা, আমি কিছু বুঝতে পারছিনা , কি বলবো ৷"আমি আমার মাকে ব‍‍‌‌‌‌‌‌‌‌‌‍‍‍‌‌‌‍‌‌‌‍‍‍‍‍‍ললাম, ''তুমিই কিছু বলো'' তিনিও একই কথা বলেন, ''আমি কি বলবো বুঝতে পারছি না ৷'' একথায় আমি বলি, আপনাদের কানে একটা কথা এসেছে এবং তা মনের মধ্যে জমে বসে গেছে ৷ এখন আমি যদি বলি, আমি নিরপরাধ-এবং আল্লাহ সাক্ষী আছেন আমি নিরপরাধ-তাহলে আপনারা তা মেনে নেবেন না ৷ আর যদি এমন একটি কথা আমি স্বীকার করে নিই যা আমি করিনি-আর আল্লাহ জানেন আমি করিনি-তাহলে আপনারা তা মেনে নেবেন ৷ আমি সে সময় হযরত ইয়াকুবের (আ) নাম স্মরণ করার চেষ্টা করি কিন্তু নামটি মনে করতে পারিনি ৷ শেষে আমি বলি, এ অবস্থায় আমার জন্য এ ছাড়া আর কি উপায় থাকে যে, আমি সেই একই কথা বলি যা হযরত ইউসুফের বাপ বলছিলেন ----- (এখানে সে ঘটনার প্রতি ইংগিত করা হয়েছে যখন হযরত ইয়াকুবের সামনে তার ছেলে বিন ইয়াইমিনের বিরুদ্ধে চুরির অপবাদের কথা বর্ণনা করা হয়েছিলঃ সূরা ইউসুফ ১০ রুকূ'তে একথা আলোচিত হয়েছে) ৷ একথা বলে আমি শুয়ে পড়ি এবং অন্যদিকে পাশ ফিরি ৷ সে সময় আমি মনে মনে বলছিলাম, আল্লাহ জানেন আমি গোনাহ করিনি, তিনি নিশ্চয়ই সত্য প্রকাশ করে দেবেন৷ যদিও একথা আমি কল্পনাও করিনি যে, আমার স্বপক্ষে অহী নাযিল হবে এবং তা কিয়ামত পর্যন্ত পঠিত হতে থাকবে৷ আল্লাহ নিজেই আমার পক্ষ সমর্থন করবেন ৷ এ থেকে নিজেকে আমি অনেক নিম্নতর মনে করতাম ৷ কিন্তু আমার ধারণা ছিল, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কোন স্বপ্ন দেখবেন, যার মাধ্যমে আল্লাহ আমার নির্দোষিতার কথা জানিয়ে দেবেন ৷ এরি মধ্যে রসূলুল্লাহর (সা) ওপর এমন অবস্থার সৃষ্টি হয়ে গেলো যা অহী নাযিল হবার সময় হতো, এমন কি ভীষণ শীতের দিনেও তাঁর মুবারক চেহারা থেকে মুক্তোর মতো স্বেদবিন্দু টপকে পড়তে থাকতো৷ আমরা সবাই চুপ করে গেলাম ৷ আমি তো ছিলাম একদম নির্ভীক ৷ কিন্তু আমার বাপ-মার অবস্থা ছিল যেন কাটলে শরীর থেকে একফোঁটা রক্তও পড়বে না৷ তারা ভয় পাচ্ছিল, না জানি আল্লাহ কি সত্য প্রকাশ করেন৷ যখন সে অবস্থা খতম হয়ে গেলো তখন রসূলুল্লাহ (সা) ছিলেন অত্যন্ত আনন্দিত৷ তিনি হেসে প্রথমে যে কথাটাই বলেন, সেটি ছিলঃ মুবারক হোক আয়েশা! আল্লাহ তোমার নির্দোষযতার কথা নাযিল করেছেন এবং এরপর নবী (সা) দশটি আয়াত শুনান (অর্থাৎ ১১ নম্বর আয়াত থেকে ২০ নম্বর পর্যন্ত)৷ আমার মা বলেন, ওঠো এবং রসূলুল্লাহর (সা) প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করো৷ আমি বললাম, ''আমি তাঁর প্রতিও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করবো না, তোমাদের দু'জনের প্রতিও না৷ বরং আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি, যিনি আমার নির্দোষিতার কথা নাযিল করেছেন৷ তোমরা তো এ মিথ্যা অপবাদ অস্বীকারও করনি৷'' (উল্লেখ্য, এটি কোন একটি বিশেষ হাদীসের অনুবাদ নয় বরং হাদীস ও সীরাতের কিতাবগুলোতে এ সম্পর্কিত যতগুল বর্ণনা হযরত আয়েশার (রা) উদ্ধৃত হয়েছে সবগুলোর সার নির্যাস আমি এখানে পরিবেশণ করেছি)৷

এ প্রসংগে ও আর একটি সূক্ষ্ম কথা অনুধাবন করতে হবে৷ হযরত আয়েশার (রা) নিরপরাধ হবার কথা বর্ণনা করার আগে পুরো একটি রুকূ'তে যিনা, কাযাফ ও লি'আনের বিধান বর্ণনা করে মহান আল্লাহ প্রকৃতপক্ষে এ সত্যটির ব্যাপারে সবাইকে সচেতন করে দিয়েছেন যে, যিনার অপবাদ দেবার ব্যাপারটি কোন ছেলেখেলা নয়, নিছক কোন মাহফিলে হাস্যরস সৃষ্টি করার জন্য একে ব্যবহার করা যাবে না ৷ এটি একটি মারাত্মক ব্যাপার৷ অপবাদদাতার অপবাদ যদি সত্য হয় তাহলে তাকে সাক্ষী আনতে হবে৷ যিনাকারী ও যিনাকারিনীকে ভয়াবহ শাস্তি দেয়া হবে৷ আর অপবাদ যদি মিথ্যা হয় তাহলে অপবাদদাতা ৮০ ঘা বেত্রাঘাত লাভের যোগ্য, যাতে ভবিষ্যতে সে আর এ ধরনের কোন কাজ করার দুঃসাহস না করে৷ এ অভিযোগ যদি স্বামী দিয়ে থাকে তাহলে আদালেত লি'আন করে তাকে ব্যাপারটি পরিষ্কার করে নিতে হবে৷ একথাটি একবার মুখে উচ্চারণ করে কোন ব্যক্তি ঘরে নিশ্চিন্তে বসে থাকতে পারে না৷ কারণ এটা হচ্ছে একটা মুসলিম সমাজ৷ সারা দুনিয়ায় কল্যাণ ব্যবস্থা কায়েম করার জন্য এ সমাজ প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে৷ এখানে যিনা কোন আনন্দদায়ক বিষয়ে পরিণত হতে পারে না এবং এর আলোচনাও হাস্য রসালোপের বিষয়বস্তুতে পরিণত হতে পারে না৷
৯. হাদীসে মাত্র কয়েকজন লোকের নাম পাওয়া যায়৷ তারা এ গুজবটি ছড়াচ্ছিল৷ তারা হচ্ছে আবদল্লাহ ইবনে উবাই, যায়েদ ইবনে রিফা'আহ ( এ ব্যক্তি সম্ভবত রিফা'আ ইবনে যায়েদ ইহুদী মুনাফিকের ছেলে), মিস্‌তাহ ইবনে উসাসাই, হাস্‌সান ইবনে সাবেত ও হামনা বিনতে জাহশ৷ এর মধ্যে প্রথম দু'জন ছিল মুনাফিক এবং বাকি তিনজন মু'মিন৷ মু'মিন তিন জন বিভ্রান্তি ও দুর্বলতার কারণে এ চক্রান্তের ফাঁদে জড়িয়ে পড়েছিলেন৷ এরা ছাড়া আর যারা কমবেশী এ গোনাহে জড়িয়ে পড়েছিলেন তাদের নাম হাদীস ও সীরাতের কিতাবগুলোতে আমার নজরে পড়েনি৷
১০. এর অর্থ হচ্ছে, ভয় পেয়ো না৷ মুনাফিকরা মনে করছে তারা তোমাদের ওপর একটা বিরাট আঘাত হেনেছে৷ কিন্তু ইনশাআল্লাহ এটি উল্‌টো তাদের ওপরই পড়বে এবং তোমাদের জন্য ভালো প্রমাণিত হবে৷ যেমন আমি ইতিপূর্বে ভূমিকায় বর্ণনা করে এসেছি, মুসলমানদের শ্রেষ্ঠত্বের যে আসল ময়দান ছিল মুনাফিকরা সেখানেই তাদেরকে পরাস্ত করার জন্য এ প্রপাগাণ্ডা শুরু করে৷ অর্থাৎ নৈতিকতার ময়দান৷ এখানে শ্রেষ্ঠত্ব লাভ করার কারণে তারা প্রত্যেকটি ময়দানে নিজেদের প্রতিপক্ষের ওপর বিজয় লাভ করে চলছিল ৷ আল্লাহ তাকেও মুসলমানদের কল্যানের উপকরণে পরিণত করে দিলেন ৷ এ সময় একদিকে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, অন্যদিকে হযরত আবু বকর ও তাঁর পরিবারবর্গ এবং তৃতীয় দিকে সাধারণ মু'মিনগন যে কর্মপদ্ধতি অবলম্বন করেন তা থেকে একথা দিবালোকের মতো সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়ে গেছে যে, তাঁরা অসৎকর্ম থেকে কত দূরে অবস্থান করেন,কতটা সংযম ও সহিষ্ণুতার অধিকারী, কেমন ন্যায়নিষ্ঠ ও কি পরিমাণ ভদ্র ও রুচিশীল মানসিকতার ধারক৷ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ইজ্জতের ওপর যারা আক্রমণ চালিয়েছিল তাঁর একটি মাত্র ইংগিতই তাদের শিরশ্চেদের জন্য যথেষ্ট ছিল, কিন্তু এক মাস ধরে তিনি সবরের সাথে সবকিছু বরদাশ্‌ত করতে থাকেন এবং আল্লাহর হুকুম এসে যাবার পর কেবলমাত্র যে তিনজন মুসলমানের বিরুদ্ধে কাযাফ তথা যিনার মিথ্যা অপবাদের অপরাধ প্রমানিত ছিল তাদের ওপর 'হদ' জারি করেন ৷ এরপরও তিনি মুনাফিকদেরকে কিছুই বলেননি৷ হযরত আবু বকরের নিজের আত্মীয়, যার নিজের ও পরিবারের ভরণপোষন তিনি করতেন, সেও তাঁদের কলিজায় তীর বিঁধিয়ে দিতে থাকে কিন্তু এর জবাবে আল্লাহর এ নেক বান্দাটি না তার সাথে আত্মীয় সম্পর্ক ছিন্ন করেন, না তার পরিবার-পরিজনকে সাহায্য-সহায়তা দেয়া বন্ধ করেন৷ নবীর পবিত্র স্ত্রীগণের একজনও সতীনের দূর্নাম ছড়াবার কাজে একটুও অংশ নেননি৷ বরং কেউ এ অপবাদের প্রতি নিজের সামান্যতমও সন্তোষ, পছন্দ অথবা মেনে নেয়ার মনোভাবও প্রকাশ করেননি৷ এমনিক হযরত যয়নবের সহোদর বোন হাম্‌না বিনতে জাহ্‌শ নিছক নিজের বোনের জন্য তার সতীনের দুর্নাম রটাচ্ছিলেন কিন্তু তিনি স্বয়ং সতীনের পক্ষে ভালো কথাই বলেন৷ হযরত আয়েশার নিজের বর্ণনা, রসূলের স্ত্রীগণের মধ্যে সবচেয়ে বেশী আড়ি চলতো আমার যয়নবের সাথে ৷ কিন্তু "ইফক"-এর ঘটনা প্রসংগে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখণ তাকে জিজ্ঞেস করেন, আয়েশা সম্পর্কে তুমি কি জানো? তখন এর জবাবে তিনি বলেন, হে আল্লাহর রসূল! আল্লাহর কসম, আমি তার মধ্যে ভালো ছাড়া আর কিছুই জানি না৷ হযরত আয়েশার নিজের ভদ্রতা ও রুচিশীলতার অবস্থা এই ছিল যে, হযরত হাস্‌সান ইবনে সাবেত তাঁর দূর্নাম রটাবার ব্যাপারে উল্লেখযোগ্য অংশগ্রহণ করেন কিন্তু এতদসত্ত্বেও তিনি সবসময় তাঁর প্রতি সম্মান ও বিনয়পূর্ণ ব্যবহার করেছেন৷ লোকেরা স্মরণ করিয়ে দেয়, ইনি তো সেই ব্যক্তি যিনি আপনার বিরুদ্ধে দুর্নাম রটিয়েছিলেন৷ কিন্তু এ জবাব দিয়ে তিনি তাদের মুখ বন্ধ করে দেন যে, এ ব্যক্তি ইসলামের শত্রু কবি গোষ্ঠীকে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও ইসলামের পক্ষ থেকে দাঁতভাঙ্গা জবাব দিতেন৷ এ ঘটনার সাথে যাদের সরাসির সম্পর্ক ছিল এ ছিল তাদের অবস্থা৷ আর সাধারণ মুসলমানদের মানসিকতা কতদূর পরিচ্ছন্ন ছিল তা এ ঘটনা থেকে অনুমান করা যেতে পারে যে,হযরত আবু আইয়ুব আনসারীর স্ত্রী যখন তাঁর কাছে এ গুজবগুলোর কথা বললেন তখন তিনি বলেন, ''আইযুবের মা !যদি সে সময় আয়েশার জায়গায় তুমি হতে, তাহলে তুমি কি এমন কাজ করতে?'' তিনি বলেন, ''আল্লাহর কসম, আমি কখনো এমন কাজ করতাম না৷'' হযরত আবু আইয়ুব বলেন, ''তাহলে আয়েশা তোমার চেয়ে অনেক বেশী ভাল৷ আর আমি বলে কি, যদি সাফওয়ানের জায়গায় আমি হতাম, তাহলে এ ধরনের কথা কল্পনাই করতে পারতাম না৷ সফওয়ান তো আমার চেয়ে ভালো মুসলমান৷'' এভাবে মুনাফিকরা যা কিছু চেয়েছিল ফল হলো তার একেবারে উল্‌টো এবং মুসলমানদের নৈতিক শ্রেষ্ঠত্ব আগের তুলনায় আরো বেশী সুস্পষ্ট হয়ে গেল৷

এ ছাড়া এ ঘটনার মধ্যে কল্যাণের আর একটি দিকও ছিল৷ সেটি ছিল এই যে, এ ঘটনাটি ইসলামের আইন-কানুন, বিধি-বিধান ও তামাদ্দুনিক নীতি-নিয়মের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ সংযোজনের উপলক্ষে পরিণত হয়৷ এর বদৌলতে মুসলমানরা আল্লাহর পক্ষ থেকে এমন সব নির্দেশ লাভ করে যেগুলো কার্যকর করে মুসলিম সমাজকে চিরকালের জন্য অসৎকর্মের উৎপাদন ও সেগুলোর সম্প্রসারণ থেকে সংরক্ষিত রাখা যেতে পারে আর অসৎকর্ম উৎপাদিত হয়ে গেলেও যথাসময়ে তার পথ রোধ করা যেতে পারে৷

এ ছাড়াও এর মধ্যে কল্যাণের আর একটি দিকও ছিল৷ মুসলমানরা সকলেই একথা ভালোভাবে জেনে যায় যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওযা সাল্লাম অদৃশ জ্ঞানের অধিকারী নন৷ যা কিছু আল্লাহর জানান তাই তিনি জানেন৷ এর বাইরে তাঁর জ্ঞান ততটুকুই যতটুকু জ্ঞান একজন মানুষের থাকতে পারে৷ একমাস পর্যন্ত হযরত আয়েশার (রা) ব্যাপারে তিনি ভীষন পেরেশান থাকেন৷ কখনো চাকরানীকে জিজ্ঞেস করতেন, কখনো পবিত্র স্ত্রীগনকে, কখনো হযরত আলীকে (রা), কখনো হযরত উসামাকে (রা)৷শেষ পর্যন্ত হযরত আয়েশাকে (রা) জিজ্ঞেস করলেও এভাবে জিজ্ঞেস করেন যে, যদি তুমি এ গোনাহটি করে থাকো, তাহলে তাওবা করো আর না করে থাকলে আশা করা যায় আল্লাহ তোমার নিরপরাধ হওয়া প্রমাণ করেন দেবেন৷ যদি তিনি অদৃশ্য জ্ঞানের অধিকারী হতেন তাহলে এ পেরেশানী, এ জিজ্ঞাসাবাদ এবং এ তাওবার উপদেশ কেন? তবে আল্লাহর অহী যখন সত্য কথা জানিয়ে দেয় তখন সারা মাসে তিনি যা জানতেন না তা জানতে পারেন৷ এভাবে আকীদার অন্ধ আবেগের বশবর্তী হয়ে সাধারণত লোকেরা নিজেদের নেতৃবর্গের ব্যাপারে যে বাড়াবাড়ি ও আতিশয্যে শিকার হয়ে থাকে তা থেকে আল্লাহ সরাসরি অভিজ্ঞতা পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে মুসলমানদেরকে বাঁচার ব্যবস্থা করেন৷ বিচিত্র নয়, এক মাস পর্যন্ত অহী না পাঠাবার পেছনে আল্লাহর এ উদ্দেশ্যটাও থেকে থাকবে৷ প্রথম দিনেই অহী এসে গেলে এ ফায়দা লাভ করা যেতে পারতো না৷ (আরো বেশী বিস্তারিত জানার জন্য দেখুন তাফহীমুল কুরআন, আন্‌ নাম্‌ল, ৮৩ টীকা)৷
১১. অর্থাৎ আবদুল্লাহু ইবনে উবাই৷ সে ছিল এ অপবাদটির মূল রচয়িতা এবং এ কদর্য প্রচারাভিযানের আসল নায়ক৷ কোন কোন হাদীসে ভুলক্রমে হযরত হাস্‌সান ইবনে সাবেতকে (রা) এ আয়াতের লক্ষ বর্ণনা করা হয়েছে৷ কিন্তু এটা মূলত বর্ণনাকারীদের নিজেদেরই বিভ্রান্তির ফল৷ নয়তো হযরত হাস্‌সানের (রা) দুর্বলতা এর চেয়ে বেশী কিছু ছিল না যে, তিনি মানুফিকদের ছড়ানো এ ফিত্‌নায় জড়িয়ে পড়েন৷ হাফেয ইবনে কাসীর যথার্থ বলেছেন, এ হাদীসটি যদি বুখারী শরীফে উদ্ধৃত না হতো, তাহলে এ প্রসংগটি আলোচনাযোগ্যই হতো না৷ এ প্রসংগে সবচেয়ে বড় মিথ্যা অপবাদ হচ্ছে এ যে, বনী উমাইয়াহ হযরত আলী রাদিয়াল্লাহু আনহুকে এ আয়াতের লক্ষ্য মনে করে৷ বুখারী, তাবারানী ও বাইহাকীতে হিশাম ইবনে আদু মালিক উমুবীর উক্তি উদ্ধৃত হয়েছে৷ তাতে বলা হয়েছে ----- অর্থ হচ্ছে আলী ইবনে আবু তালেব৷ অথচ এ ফিত্‌নায় হযরত আলীর (রা) গোড়া থেকেই কোন অংশ ছিল না৷ ব্যাপার শুধু এতটুকু ছিল, যখন তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে খুব বেশী পেরেশান দেখেন তখন নবী (সা) তাঁর কাছে পরামর্শ চাওয়ায় তিনি বলেন, আল্লাহ এ ব্যাপারে আপনাকে কোন সংকীর্ণ পরিসরে আবদ্ধ রাখেননি, বহু মেয়ে আছে, আপনি চাইলে আয়েশাকে তালাক দিয়ে আর একটি বিয়ে করতে পারেন৷ এর অর্থ কখনোই এটা ছিল না যে, হযরত আয়েশার বিরুদ্ধে যে মিথ্যা অপবাদ দেয়া হচ্ছিল হযরত আলী তাকে সত্য বলেছিলেন৷ বরং শুধুমাত্র নবী সাল্লাল্লাহু আল্লাইহি ওয়া সাল্লামা এর পেরেশানী দূর করাই ছিল এর উদ্দেশ্য৷
১২. অন্য একটি অনুবাদ এও হতে পারে, নিজেদের লোকদের অথবা নিজেদের সমাজের লোকদের ব্যাপারে ভালো ধারণা করোনি কেন? আয়াতের শব্দাবলী দু'ধরনের অর্থের অবকাশ রাখে৷ আর এ দ্ব্যর্থবোধক বাক্য ব্যবহারের মধ্যে রয়েছে একটি গভীর তত্ব৷ এটি ভালোভাবে অনুধাবন করতে হবে৷ হযরত আয়েশা (রা) ও সাফ্‌ওয়ান ইবনে মু'আত্তালের (রা) মধ্যে যে ব্যাপারটি ঘটে গিয়েছিল তা তো এই ছিল যে, কাফেলার এক ভদ্র মহিলা (তিনি নবী পত্নী ছিলেন একথা বাদ দিলেও) ঘটনাক্রমে পেছনে থেকে গিয়েছিলেন৷ আর কাফেলারই এক ব্যক্তি যিনি ঘটনাক্রমে পেছনে থেকে গিয়েছিলেন, তিনি তাঁকে নিজের উটের পিঠে বসিয়ে নিয়ে এসেছিলেন৷ এখন যদি কেউ বলে, নাউযুবিল্লাহ এরা দুজন নিজেদেরকে একান্তে পেয়ে গোনাহে লিপ্ত হয়ে গেছেন, তাহলে তার একথার বাহ্যিক শব্দাবলীর আড়ালে আরো দু'টো কাল্পনিক কথাও রয়ে গেছে৷ এর মধ্যে একটি হচ্ছে, বক্তা (পুরুষ হোক বা নারী) যদি নিজেই জায়গায় হতেন, তাহলে কখনোই গোনাহ না করে থাকতেন না৷ কারণ তিনি যদি গোনাহ থেকে বিরত থেকে থাকেন তাহলে এটা শুধু এ জন্য যে, বিপরীত লিংগের কেউ এ পর্যন্ত এভাবে একান্তে তার নাগালে আসেনি নয়তো এমন সুবর্ণ সুযোগ হেলায় হারাবার লোক তিনি নন৷ দ্বিতীয়টি হচ্ছে, যে সমাজের তিনি একজন সদস্য, তার নৈতিক অবস্থা সম্পর্কে তার ধারণা হচ্ছে, এখানে এমন একজন নারী ও পুরুষ নেই যিনি এ ধরনের সুযোগ পেয়ে গোনাহে লিপ্ত হননি৷ এতো শুধুমাত্র তখনকার ব্যাপার যখন বিষয়টি নিছক একজন পুরুষ ও একজন নারীর সাথে জড়িত থাকে৷ আর ধরুন যদি সে পুরুষ ও নারী উভয়ই এক জায়গার বাসিন্দা হন এবং যে মহিলাটি ঘটনাক্রমে কাফেলা থেকে আলাদা হয়ে গিয়েছিলেন তিনি ঐ পুরুষটির কোন বন্ধু, আত্মীয় বা প্রতিবেশীর স্ত্রী, বোন বা মেয়ে হয়ে থাকেন তাহলে ব্যাপারটি আরো গুরুতর হয়ে যায়৷ এ ক্ষেত্রে এর অর্থ এ দাঁড়ায় যে, বক্তা নিজেই নিজের ব্যক্তি সত্তা সম্পর্কেও এমন জঘন্য ধারণা পোষন করেন যার সাথে ভদ্রতা ও সৌজন্যবোধের দূরতম সম্পর্কেও নেই৷ কেন এমন সজ্জন আছেন যিনি একথা চিন্তা করতে পারেন যে, তার কোন বন্ধু, প্রতিবেশী বা পরিচিত ব্যক্তির গৃহের কোন মহিলার সাথে বিপদগ্রস্থ তার পথে দেখা হয়ে যাবে এবং প্রথম অবস্থায়ই তিনি তার ইজ্জত লুটে নেবার কাজ করবেন তারপর তাকে গৃহে পৌছিয়ে দেবার কথা চিন্তা করবেন৷ কিন্তু এখানে তো ব্যাপার ছিল এর চেয়ে হাজার গুণ গুরুতর মহিলা অন্য কেউ ছিলেন না, তিনি ছিলেন স্বয়ং রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের স্ত্রী, যাঁদেরকে প্রত্যেকটি মুসলমান নিজের মায়ের চেয়েও বেশী সম্মানের যোগ্য মনে করতো এবং যাঁদেরকে আল্লাহ নিজেই প্রত্যেক মুসলমানের ওপর নিজের মায়ের মতই হারাম গণ্য করেছিলেন৷ পুরুষটি কেবলমাত্র ঐ কাফেলার একজন সদস্য, ঐ সেনাদলের একজন সৈন্য এবং ঐ শহরের একজন অধিবাসীই ছিলেন না বরং তিনি মুসলমানও ছিলেন৷ ঐ মহিলার স্বামীকে তিনি আল্লাহর রসূল এবং নিজের নেতা ও পথপ্রদর্শক বলে মনে নিয়েছিলেন আর তাঁর হুকুমে প্রাণ উৎসর্গ করে দেয়ার জন্য বদরের যুদ্ধের মতো ভয়াবহ জিহাদে অংশ নিয়েছিলেন৷ এ অবস্থায় তো এ উক্তির মানসিক প্রেক্ষাপট জঘন্যতার এমন চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌছে যায় যার চেয়ে নোংরা ও ঘৃণা কোন প্রেক্ষাপটের কথা চিন্তাই করা যায় না৷ তাই মহান আল্লাহ বলছেন, মুসলিম সমাজের যেসব ব্যক্তি একথা তাদের কণ্ঠ উচ্চারণ করেছে অথবা কমপক্ষে একে সন্দেহযোগ্য মনে করেছে তারা নিজেদের মন-মানসিকতারও খুবই খারাপ ধারণা দিয়েছে এবং নিজেদের সমাজের লোকদেরকেও অত্যন্ত হীন চরিত্র ও নিকৃষ্ট নৈতিকবৃত্তির অধিকারী মনে করেছে৷
১৩. অর্থাৎ একথাতো বিবেচনার যোগ্যই ছিল না৷ একথা শোনার সাথে সাথেই প্রত্যেক মুসলমানের একে সুস্পষ্ট মিথ্যাচার, মিথ্যা ও বানোয়াট কথা ও অপবাদ আখ্যা দেয়া উচিত ছিল৷ সম্ভবত কেউ এখানে প্রশ্ন করতে পারে, একথাই যদি ঠিক হয়ে থাকে, তাহলে স্বয়ং রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও আবু বকর সিদ্দীক রাদিয়াল্লাহু আনহুই বা প্রতম দিনই একে মিথ্যা বলে দিলেন না কেন? কেন তারা একে এতটা গুরুত্ব দিলেন? এর জবাব হচ্ছে, স্বামী ও পিতার অবস্থা সাধারণ লোকদের তুলনায় ভিন্ন ধরনের হয়৷ যদিও স্ত্রীকে স্বামীকে স্বামীর চেয়ে বেশী কেউ চিনতে বা জানতে পারে না এবং একজন সৎ, ভদ্র ও সম্ভ্রান্ত স্ত্রী সম্পর্কে কোন সুস্থ বুদ্ধি সম্পন্ন স্বামী লোকদের অপবাদের কারণে খারাপ ধারণা করতে পারে না, তবুও যদি তার স্ত্রীর বিরুদ্ধে অপবাদ দেয়া হয় তাহলে তখন সে এমন এক ধরনের সংকটের মুখোমুখি হয় যার ফলে সে একে মিথ্যা অপবাদ বলে প্রত্যাখ্যান করলে প্রচারণাকারীদের মুখ বন্ধ হবে না বরং তারা নিজেদের কণ্ঠ আরো এক ডিগ্রী উঁচুতে চড়িয়ে বলতে থাকবে, দেখো, বউ কেমন স্বামীর বুদ্ধিকে আচ্ছন্ন করে রেখেছে, সবকিছু করে যাচ্ছে আর স্বামী মনে করছে আমার স্ত্রী বড়ই সতী সাধ্বী৷ এ ধরনের সংকট মা-বাপের ক্ষেত্রেও দেখা দেয়৷ সে বেচারারা নিজেদের মেয়ের সতীত্বের বিরুদ্ধে মিথ্যা অপবাদের প্রতিবাদে যদি মুখ খোলেও তাহলে মেয়ের অবস্থান পরিষ্কার হয় না৷ প্রচারণাকারীরা একথাই বলবে, মা-বাপ তো কাজেই নিজের মেয়ের পক্ষ সমর্থন করবে না তো আর কি করবে৷ এ জিনিসটিই রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং হযরত আবু বকর ও উম্মে রুমানকে ভিতরে ভিতরে শোকে-দুঃখে জর্জরতি ও বিহবল করে চলছিল৷ নয়তো আসলে তাদের মনে কোন সন্দেহ ছিল না৷ রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামতো তাঁর ভাষনে পরিষ্কার বলে দিয়েছিলেন, আমি আমার স্ত্রীর মধ্যে কোন খারাপ জিনস দেখিনি এবং যে ব্যক্তির সম্পর্কে এ অপবাদ দেয়া হচ্ছে তার মধ্যেও না৷
১৪. ''আল্লাহর কাছে'' অর্থাৎ আল্লাহর আইনে অথবা আল্লাহর আইন অনুযায়ী৷ নয়তো আল্লাহ তো জানতেন ঐ অপবাদ ছিল মিথ্যা ৷ তারা সাক্ষী আনেনি বলেই তা মিথ্যা, আল্লাহার কাছে তার মিথ্যা হবার জন্য এর প্রয়োজন নেই৷ এখানে যেন কেউ এ ভুল ধারনার শিকার না হন যে, এ ক্ষেত্রে নিছক সাক্ষীদের উপস্থিতি ও অনুপস্থিতিকে অপবাদের মিথ্যা হবার যুক্তি ও ভিত্তি গণ্য করা হচ্ছে এবং মুসলমানদের বলা হচ্ছে যেহেতু, অপবাদদাতা চার জন্য সাক্ষী আনেনি তাই তোমরাও শুধুমাত্র এ কারণেই তাকে সুস্পষ্ট মিথ্যা অপবাদ গন্য করো৷ বাস্তবে সেখানে যা ঘটেছিল, তার প্রতি দৃষ্টি না দিলে এ ভুল ধারণা সৃষ্টি হয়৷ অপবাদদাতারা এ কারণে অপবাদ দেয়নি যে, তারা তাদের মুখ দিয়ে যা কিছু বলে যাচ্ছিল তারা সবাই বা তাদের কোন একজন স্বচক্ষে তা দেখেছিল৷ বরং হযরত আয়েশে (রা) কাফেলার পিছনে রয়ে গিয়েছিলেন এবং হযরত সাফ্‌ওয়ান পরে তাঁকে নিজের উটের পিঠে সওয়ার করে কাফেলার মধ্যে নিয়ে এসেছিলেন শুধুমাত্র এরি ভিত্তিতে তারা এতবড় অপবাদ তৈরী করে ফেলেছিল৷ কোন বুদ্ধি-বিবেকবান ব্যাক্তি এ অবস্থায় হযরত আয়েশার এভাবে পিছনে থেকে যাওয়াকে নাউযুবিল্লাহ কোন ষড়ষন্ত্রের ফল ছিল বলে ভাবতে পারতেন না৷ সেনা প্রধানের স্ত্রী চুপিচুপি কাফেলার পিছনে এ ব্যক্তির সাথে থেকে যাবে তারপর ঐ ব্যক্তিই তাকে নিজের উটের পিঠে বসিয়ে প্রকাশ্য দিবালোকে ঠিক দুপুরে সময় সবার চোখের সামনে দিয়ে সেনা ছাউনিতে পৌঁছে যাবে, কোন ষড়যন্ত্রকারী এভাবে ষড়যন্ত্র করে না৷ স্বয়ং এ অবস্থাটাই তাদের উভয়ের নিরপরাধ নিষ্পাপ হওয়ার প্রমাণ পেশ করছে৷ এ অবস্থা যদি অপবাদদাতারা নিজেদের চোখে কোন ঘটনা দেখতো তাহলে কেবলমাত্র তারি ভিত্তিতে অপবাদ দিতে পারতো৷ অন্যথায় যেসব লক্ষণের ওপর কুচক্রীরা অপবাদের ভিত্তি রেখেছিল সেগুলোর ব্যাপারে কোন প্রকার সন্দেহের অবকাশ ছিল না৷
১৫. এ আয়াতগুলো এবং বিশেষ করে আল্লাহর এ বানী ''মু'মিন পুরুষ ও নারীরা নিজেদের লোকদের সম্পর্কে সুধারণা পোষণ করে না কেন'' থেকে এ মূলনীতির উৎপত্তি হয় যে, মুসলিম সমাজে সকল ব্যবহারিক বিষয়ের ভিত্তি সুধারণার ওপর প্রতিষ্ঠিত হওয়া উচিত৷ কুধারণা কেবলমাত্র এমন অবস্থায় পোষন করা উচিত যখন তার জন্য কোন ইতিচাক ও প্রমাণসূচক ভিত্তি থাকবে৷ এ ব্যাপারে নীতি হচ্ছেঃ প্রত্যেক ব্যক্তি নির্দোষ, যতক্ষন তার আপরাধী হবার বা তার প্রতি অপরাধের সন্দেহ করার কোন যুক্তিসংগত কারণ না থাকে আর প্রত্যেক ব্যক্তিই সত্যবাদী, যতক্ষন তার অনির্ভরযোগ্য হবার কোন প্রমাণ না থাকে৷
১৬. পরিবেশ ও পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে আয়াতের প্রত্যক্ষ অর্থ হচ্ছে, যারা এ ধরনের অপবাদ তৈরী করে ও তা প্রচার করে মুসলিম সমাজে চরিত্রহীনতার প্রসার ঘটাবার এবং উম্মত মুসলিমার চরিত্র হননের চেষ্টা করছে তারা শাস্তিলাভের যোগ্য৷ কিন্তু আয়াতের শব্দাবলী অশ্লীলতা ছড়াবার যাবতীয় অবস্থার অর্থবোধক৷ কার্যত ব্যভিচারে আড্ডা কায়েম করার ওপরও এগুলো প্রযুক্ত হয়৷ আবার চরিত্রহীনতাকে উৎসাহিত করা এবং সে জন্য আবেগ-অনুভূতিকে উদ্দীপিত ও উত্তেজিতকারী কিস্‌সা-কাহিনী, কবিতা, গান, ছবি ও খেলাধূলার ওপরও প্রযুক্ত হয়৷ তাছাড়া এমন ধরনের ক্লাব, হোটেল ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানও এর আওতায় এসে যায় যেখানে নারী-পুরুষের মিলিত নৃত্য ও মিলিত আমোদ ফূর্তির ব্যবস্থা করা হয়৷ কুরআন পরিষ্কার বলছে, এরা সবাই অপরাধী৷ কেবল আখেরাতেই নয়, দুনিয়ায়ও এদের শাস্তি পাওয়া উচিত৷ কাজেই অশ্লীলতার এসব উপায় উপকরণের পথ রোধ করা একটি ইসলামী রাষ্ট্রের অপরিহার্য কর্তব্যের অন্তরভূক্ত৷ কুরআন এখানে যে সমস্ত কাজকে জনগণের বিরুদ্ধে অপরাধ গণ্য করছে এবং যেগুলো সম্পাদনকারীকে শাস্তিলাভের যোগ্য বলে ফায়সালা দিচ্ছে ইসলামী রাষ্ট্রের দণ্ডবিধি আইনে সে সমস্ত কাজ শাস্তিযোগ্য ও পুলিশের হস্তক্ষেপ লাভের উপযোগী হতে হবে৷
১৭. অর্থাৎ তোমরা জানো না এ ধরনের এক একটি কাজের প্রভাব সমাজে কোথায় কোথায় পৌছে যায়, কতলোক এগুলোতে প্রভাবিত হয় এবং সামষ্টিকভাবে এর কি পরিমান ক্ষতি সমাজ জীবনকে বরদাশত করতে হয়৷ এ বিষয়টি আল্লাহই খুব ভালোভাবে জানেন৷ কাজেই আল্লাহর ওপর নির্ভর করো ও দাবিয়ে দেবার চেষ্টা কর৷ এগুলো ছোট ছোট বিষয় নয় যে, এগুলোর প্রতি উদারতা প্রদর্শন করতে হবে৷ আসলে এগুলো অনেক বড় বিষয় ৷ কাজেই যারা এসব কাজ করবে তাদের কঠোর শাস্তি হওয়া উচিত ৷