(২৪:১) এটি একটি সূরা, আমি এটি নাযিল করেছি এবং একে ফরয করে দিয়েছি আর এর মধ্যে সুস্পষ্ট নির্দেশসমূহ নাযিল করেছি, হয়তো তোমরা শিক্ষা গ্রহণ করবে৷
(২৪:২) ব্যভিচারিনী ও ব্যভিচারী উভয়ের প্রত্যেককে এক শত বেত্রাঘাত করো৷ আর আল্লাহর দীনের ব্যাপারে তাদের প্রতি কোন মমত্ববোধ ও করুণা যেন তোমাদের মধ্যে না জাগে যদি তোমরা আল্লাহ ও শেষ দিনের প্রতি ঈমান আনো ৷ আর তাদেরকে শাস্তি দেবার সময় মু’মিনদের একটি দল যেন উপস্থিত থাকে ৷
(২৪:৩) ব্যভিচারী যেন ব্যভিচারিনী বা মুশরিক নারী ছাড়া কাউকে বিয়ে না করে এবং ব্যভিচারিনীকে যেন ব্যভিচারী বা মুশরিক ছাড়া আর কেউ বিয়ে না করে ৷ আর এটা হারাম করে দেয়া হয়েছে মু’মিনদের জন্য৷
(২৪:৪) আর যারা সতী-সাধ্বী নারীর ওপর অপবাদ লাগায়, তারপর চারজন সাক্ষী আনে না , তাদেরকে আশিটি বেত্রাঘাত করো এবং তাদের সাক্ষ কখনো গ্রহণ করো না ৷ তারা নিজেরাই ফাসেক ৷
(২৪:৫) তবে যারা এরপর তাওবা করে এবং শুধরে যায়, অবশ্যই আল্লাহ (তাদের পক্ষে) ক্ষমাশীল ও মেহেরবান৷
(২৪:৬) আর যারা নিজেদের স্ত্রীদেরকে অভিযোগ দেয় এবং তাদের কাছে তারা নিজেরা ছাড়া আর দ্বিতীয় কোন সাক্ষী থাকে না , তাদের মধ্য থেকে এক ব্যক্তির সাক্ষ হচ্ছে (এই যে, সে) চার বার আল্লাহর নামে কসম খেয়ে সাক্ষ দেবে যে, সে (নিজের অভিযোগে) সত্যবাদী
(২৪:৭) এবং পঞ্চম বার বলবে, তার প্রতি আল্লাহর লা’নত হোক যদি সে (নিজের অভিযোগে) মিথ্যাবাদী হয়ে থাকে ৷
(২৪:৮) আর স্ত্রীর শাস্তি এভাবে রহিত হতে পারে যদি সে চার বার আল্লাহর নামে কসম খেয়ে সাক্ষ দেয় যে, এ ব্যক্তি(তার অভিযোগে) মিথ্যাবাদী
(২৪:৯) এবং পঞ্চমবার বলে, তার নিজের ওপর আল্লাহর গযব নেমে আসুক যদি এ ব্যক্তি (তার অভিযোগে) সত্যবাদী হয়৷
(২৪:১০) তোমাদের প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহ ও তাঁর দয়া না থাকলে এবং আল্লাহ বড়ই মনোযোগ দানকারী ও জ্ঞানী না হলে (স্ত্রীদের প্রতি অভিযোগের ব্যাপারে তোমাদেরকে বড়ই জটিলতার সম্মুখীন করতো)৷
১. এসব বাক্যাংশের মধ্যে '' আমি ''র ওপর জোর দেয়া হয়েছে৷ অর্থাৎ আর কেউ এটি নাযিল করেনি বরং ''আমিই'' নাযিল করেছি ৷ তাই কোন শক্তিহীন উপদেশকের বাণীর মতো একে হালকা জিনিস মনে করে বসো না ৷ ভালো করে জেনে রাখো , এমন এক সত্তা এটি নাযিল করেছেন যার মুঠোর মধ্যে রয়েছে তোমাদের প্রাণ ও কিসমত এবং তোমরা মরেও যার পাকড়াও থেকে বাঁচতে পারেবে না৷

দ্বিতীয় বাক্যাংশে বলা হয়েছে , এ সূরায় যেসব কথা বলা হয়েছে সেগুলো ''সুপারিশ'' পর্যায়ের জিনিস নয়৷ তোমার ইচ্ছা হলে মেনে নিলে অন্যথায় যা ইচ্ছা তাই করতে থাকলে, ব্যাপারটা তেমন নয়৷ বরং এটি হচ্ছে অকাট্য ও চূড়ান্ত বিধান৷ এ বিধান মেনে চলা অপরিহার্য৷ যদি তুমি মু'মিন ও মুসলিম হয়ে থাকো, তাহলে এ বিধান অনুযায়ী কাজ করা তোমার জন্য ফরয৷

তৃতীয় বাক্যাংশে বলা হয়েছে, এ সূরায় যেসব নির্দেশ দেয়া হচ্ছে তার মধ্যে কোন অস্পষ্টতা নেই৷ পরিষ্কার ও সুস্পষ্ট নির্দেশনামা৷ এগুলো সম্পর্কে তোমরা এ ওজর পেশ করতে পারবে না যে, অমুক কথাটি বুঝতে পারিনি কাজেই সেটিকে কেমন করে কার্যকর করতাম?

এ মহান ঘোষণার পরে আইনগত বিধান শুরু হয়ে যায় এই হচ্ছে তার ভূমিকা (Preamble) ৷ সূরা নূরের বিধানগুলো মহান আল্লাহ কত গুরুত্ব সহকরে পেশ করছেন এ ভূমিকার বর্ণনাভংগী নিজেই তা জানিয়ে দিচ্ছে৷ আইন-বিধান সম্বলিত অন্য কোন সূরার ভূমিকা এত বেশী জোরদার নয়৷
২. এ বিষয়টির অনেকগুলো আইনগত, নৈতিক ও ঐতিহাসিক দিক ব্যাখ্যা সাপেক্ষ রয়ে গেছে৷ সেগুলোর বিস্তারিত বর্ণনা ছাড়া বর্তমান যুগে এক ব্যক্তির জন্য আল্লাহর এ শরীয়াতী বিধান অনুধাবন করা কঠিন৷ তাই নিচে আমি এর বিভিন্ন দিকের ওপর ধারাবাহিকভাবে আলোকপাত করবোঃ

একঃ যিনা বা ব্যভিচারের যে সাধারণ অর্থটি প্রত্যেক ব্যক্তি জানে সেটি হচ্ছে এ যে, ''একটি পুরুষ একটি স্ত্রীলোক নিজেদের মধ্যে কোন বৈধ দাম্পত্য সম্পর্ক ছাড়াই পরস্পর যৌন মিলন করে৷' এ কাজটির নৈতিকভাবে খারাপ হওয়া অথবা ধর্মীয় দিক দিয়ে পাপ হওয়া কিংবা সামাজিক দিক দিয়ে দূষনীয় ও আপত্তিকর হওয়া এমন একটি জিনিস যে ব্যাপারে প্রাচীনতম যুগ থেকে নিয়ে আজ পর্যন্ত সকল মানব সমাজ ঐকমত্য পোষণ করে আসছে৷ কেবলমাত্র বিচ্ছিন্ন কয়েকজন লোক যারা নিজেদের বুদ্ধিবৃত্তিকে নিজেদের প্রবৃত্তি তোষণ নীতির অধীন করে দিয়েছে অথবা যারা নিজেদের উন্মত্ত মস্তিস্কের অভিনব খেয়ালকে দার্শনিক তত্ব মনে করে নিয়েছে তারা ছাড়া আর কেউই আজ পর্যন্ত এ ব্যাপারে মতবিরোধ প্রকাশ করেনি৷ এ বিশ্বজননী ঐকমত্যের কারণ হচ্ছে এই যে, মানুষের প্রকৃতি নিজেই যিনা হারাম হওয়ার দাবী জানায়৷ মানব জাতির অস্তিত্ব ও স্থায়িত্ব এবং মানবিক সভ্যতা-সংস্কৃতির প্রতিষ্ঠা উভয়ই এ বিষয়টির ওপর নির্ভর করে যে, নারী ও পুরুষ শধুমাত্র আনন্দ উপভোগের জন্য মিলিত হবার এবং তারপর আলাদা হয়ে যাবার ব্যাপারে স্বেচ্ছাচারী হবে না বরং প্রত্যেকটি জোড়ার পারস্পরিক সম্পর্ক এমন একটি স্থায়ী ও স্বতন্ত্র বিশ্বস্ততার অংগীকার ও চুক্তির ভিত্তিতে গড়ে উঠবে যা সমাজের সবাই জনাবে এবং সবার কাছে হবে পরিচিত এবং এ সংগে সমাজ তার নিশ্চয়তাও দেবে৷ এ অংগীর ও চুক্তি ছাড়া মানুষের বংশধারা এক দিনের জন্যও চলতে পারে না৷ কারণ মানব শিশু নিজের জীবন ও নিজের বিকাশের জন্য বছরের পর বছরের সহানুভূতিশীল রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিচর্যা-প্রশিক্ষণের মুখাপেক্ষী হয়৷ যে পুরুষটি এ শিশুর দুনিয়ায় অস্তিত্ব লাভের কারণ হয়েছে যতক্ষন না সে নারীর সাথে এ সহযোগিতা করবে ততক্ষণ কোন নারী একাকী এ বোঝা বহন করার জন্য কখনো তৈরী হতে পারে না৷ অনুরূপভাব এ চুক্তি ছাড়া মানুষের সভ্যতা-সংস্কৃতিও টিকে থাকতে পারে না৷ কারণ সভ্যতা-সংস্কৃতির জন্মই তো একটি পুরুষ ও একটি নারীর সহ অবস্থান করার, গৃহ ও পরিবারের অস্তিস্ত দান করার এবং তারপর পরিবারগুলোর মধ্যে সম্পর্ক সৃষ্টির মাধ্যমেই হয়ে থাকে৷ যদি নারী ও পুরুষ গৃহ ও পরিবার গঠন না করে নিছক আনন্দ উপভোগের জন্য স্বাধীনভাবে সহ অবস্থান করতে থাকে তাহলে সমস্ত মানুষ বিক্ষিপ্ত হয়ে পড়বে৷ সমাজ জীবনের ভিত্তি চূর্ণ ও বন্ধন ছিন্ন হয়ে যাবে এবং সভ্যতা ও সংস্কৃতির এ ইমারত যে ভিত্তির ওপর গড়ে উঠেছে তার অস্তিত্বই বিলুপ্ত হয়ে যাবে৷ এসব কারণে নারী ও পুরুষের যে স্বাধীন সম্পর্ক কোন সুপরিচিত ও সর্বসম্মত বিশ্বস্ততার চুক্তির ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত নয় তা মূলত মানবিক প্রকৃতির বিরোধী৷ এসব কারণেই প্রতি যুগে মানুষ একে মারাত্মক দোষ, বড় ধরনের অসদাচার ও ধর্মীয় পরিভাষায় একটি কঠিন গোনাহ মনে এসেছে এবং এসব কারণেই প্রতি যুগে মানব সমাজ বিয়ের প্রচলন ও প্রসারের সাথে সাথে যিনা ও ব্যভিচারের পথ বন্ধ করার জন্য কোন না কোনভাবে অবশ্যই প্রচেষ্টা চালিয়েছে৷ তবে এ প্রচেষ্টা বিভিন্ন ধরনের ক্ষেত্রে বিভিন্ন আইন-কানুন এবং নৈতিক, তামাদ্দুনিক ও ধর্মীয় ব্যবস্থার মধ্যে পার্থক্য ছিল৷ জাতি ও সমাজের জন্য যিনার ক্ষতিকর হবার চেতনা কোথাও কম এবং বেশী, কোথাও সুস্পষ্ট আবার কোথাও অন্যান্য সমস্যার সাথে জড়িয়ে অস্পষ্ট রয়ে গেছে৷

দুইঃ যিনার হারাম হবার ব্যাপারে একমত হবার পর যে বিষয়ে মতবিরোধ হয়েছে সেটি হচ্ছে, এর অপরাধ অর্থাৎ আইনগতভাবে শাস্তিযোগ্য হবার ব্যাপারটি৷ এখান থেকে ইসলাম এবং অন্যান্য ধর্ম ও আইনের বিরোধ শুরু হয়৷ যেসব সমাজ মানব প্রকৃতির কাছাকাছি থেকেছে তারা সবসময় যিনা অর্থাৎ নারী ও পুরুষের অবৈধ সম্পর্ককে একটি অপরাধ হিসেবে দেখে এসেছে এবং এ জন্য কঠিন শাস্তি নির্ধারণ করেছে৷ কিন্তু সাংস্কৃতিক ধারা যতই সমাজকে খারাপ করে চলেছে এ অপরাধ সম্পর্কে ততই মনোভাব কোমল হয়ে চলেছে৷

এ ব্যাপারে সর্বপ্রথম যে শৈথিল্য প্রদর্শন করা হয় এবং অত্যন্ত ব্যাপকভাবে প্রদর্শন করা হয় সেটি ছিলঃ ''নিছক যিনা'' (Fornication) এবং ''পর নারীর সাথে যিনা'' (Adultery) এর মধ্যে পার্থক্য করে প্রথমটিকে সামান্য ভুল এবং কেবলমাত্র শেষোক্তটিকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ গণ্য করা হয়৷

নিছক যিনার যে সংজ্ঞা বিভিন্ন আইনে পাওয়া যায় তা হচ্ছে এই যে, ''কোন অবিবাহিত বা বিবাহিত পুরুষ এমন কোন মেয়ের সাথে সংগম করে যে অন্য কোন পুরুষের স্ত্রী নয়৷'' এ সংজ্ঞায় মূলত পুরুষের নয় বরং নারীর অবস্থার ওপর নির্ভর করা হয়েছে৷ নারী যদি স্বামীহীন হয় তাহলে তার সাথে সংগম নিছক যিনা হবে৷ এক্ষেত্রে সংগমকারী পুরুষের স্ত্রী থাক বা না থাক৷ তাতে কিছু আসে যায় না৷ প্রাচীন মিসর, ব্যাবিলন, আসিরীয়া ও ভারতের আইনে এর শাস্তি ছিল খুবই হাল্‌কা পরিমাণের ৷ গ্রীস ও রোমও এ পদ্ধতিই অবলম্বন করে৷ পরবর্তী পর্যায়ে ইহুদীরাও এ থেকে প্রভাবিত হয়৷ বাইবেলে একে শুধুমাত্র এমন একটি অন্যায় বলা হয়েছে যার ফলে পুরুষকে কেবলমাত্র অর্থদণ্ডই দিতে হয়৷ যাত্রা পুস্তকে এ সম্পর্কে যে হুকুম দেয়া য়েছে তার শব্দাবলী নিম্নরূপঃ

''আর কেহ যদি অবাগদত্তা কুমারীকে ভুলাইয়া তাহার সহিত শয়ন করে, তবে সে অবশ্য কন্যাপণ দিয়া তাহাকে বিবাহ করিবে৷ যদি সেই ব্যক্তির সহিত আপন কন্যার বিবাহ দিতে পিতা নিতান্ত অসম্মত হয়, তবে কন্যাপণের ব্যবস্থানুসারে তাহাকে রৌপ্য দিতে হইবে৷'' (২২:১৬-১৭)

''দ্বিতীয় বিবরণে'' এ হুকুমটি কিছুটা অন্য শব্দাবলীর সাহায্যে বর্ণনা করা হয়েছে এবং তারপর বলা হয়েছে, পুরুষের কাছ থেকে পঞ্চাশ শেকল (প্রায় ২০ তোলা) পরিমাণ রৌপ্য কন্যার পিতাকে জরিমানা দেবে৷ (২২:২৮-২৯) তবে কোন ব্যক্তি যদি পুরোহিতের মেয়ের সাথে যিনা করে তাহলে তার জন্য ইহুদী আইনে রয়েছে ফাঁসি এবং মেয়েকে জীবিত অগ্নিদগ্ধ করার ব্যবস্থা৷ (Everyman's Talmud, p 319-20)

এ চিন্তাটি হিন্দু চিন্তার সাথে কত বেশী সামঞ্জস্যশীল তা অনুমান করার জন্য মনু সংহিতার সাথে একবার মিলিয়ে দেখুন৷ সেখানে বলা হয়েছেঃ

''যে ব্যক্তি নিজের জাতের কুমারী মেয়ের সাথে তার সম্মতিক্রমে যিনা করে সে কোন শাস্তি লাভের যোগ্য নয়৷ মেয়ের বাপ রাজী থাকলে সে বিনিময় দিয়ে তাকে বিয়ে করে নেবে৷ তবে মেয়ে যদি উচ্চ বর্ণের হয় এবং পুরুষ হয় নিম্নবর্ণের, তাহলে মেয়েকে গৃহ থেকে বের করে দেয়া উচিত এবং পুরুষের অংগচ্ছেদের শাস্তি দিতে হবে৷'' (৮:৩৬৫-৩৬৬) আর মেয়ে ব্রাহ্মণ হলে এ শাস্তি জীবন্ত অগ্নিদগ্ধ করার শাস্তিতে রপান্তরিত হতে পারে৷ (৩৭৭ শ্লোক)৷

আসলে এ সমস্ত আইন পরস্ত্রীর সাথে যিনা করাই ছিল বড় অপরাধ৷ অর্থাৎ যখন কোন (বিবাহিত বা অবিবাহিত) ব্যক্তি এমন কোন মেয়ের সাথে সংগম করে যে অন্য কোন ব্যক্তির স্ত্রী৷ এ কর্মটির অপরাধ হবার ভিত্তি এ ছিল না যে, একটি পুরুষ একটি নারী যিনা করেছে৷ বরং তারা দু'জন মিলে তৃতীয় এক ব্যক্তিক এমন একটি শিশু লালন পালন করার বিপদে ফেলে দিয়েছে যেটি তার নয়, এটিই ছিল এর ভিত্তি৷ অর্থাৎ যিনা নয় বরং বংশধারা মিশ্রণের আশংকা এবং একের সন্তানকে অন্যের অর্থে প্রতিপালন করা ও তার উত্তরাধিকার হওয়াই ছিল অপরাধের মূল ভিত্তি৷ এ কারণে পুরুষ ও নারী উভয়েই অপরাধী সাব্যস্ত হতো৷ মিসরীয়দের সামজে এর শাস্তি ছিল পুরুষটিকে লাঠি দিয়ে ভালোমতে পিটাতে হবে এবং মেয়েটির নাক কেটে দিতে হবে৷ প্রায় এ একই ধরণের শাস্তির প্রচলন ছিল ব্যাবিলন, আসিরীয়া ও প্রাচীন ইরানেও৷ হিন্দুদের মধ্যে নারীর শাস্তির ছিল, তার ওপর কুকুর লেলিয়ে দেয়া হতো এবং পুরুষের শাস্তি ছিল, তাকে উত্তপ্ত লোহার পালংকে শুইয়ে দিয়া চারদিকে আগুন লাগিয়ে দেয়া হতো৷ গ্রীস ও রোমে প্রথম দিকে একজন পুরুষের অধিকার ছিল যদি সে নিজের স্ত্রীর সাথে কাউকে যিনা করতে দেখে তাহলে তাকে হত্যা করতে পারতো অথবা ইচ্ছা করলে তার কাছ থেকে অর্থদণ্ড নিতে পারতো৷ তারপর প্রথম খৃষ্টপূর্বাব্দে সীজার আগষ্টিস এ আইন জারি করেন যে, পুরুষের সম্পত্তির অর্ধাংশ বাজেয়াপ্ত করে তাকে দেশান্তর করে দিতে হবে এবং নারীর অর্ধেক মোহরানা বাতিল এবং এক-তৃতীয়াংশ সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে তাকেও দেশের কোন দূরবর্তী এলাকায় পাঠিয়ে দিতে হবে৷ কনষ্টান্টিন এ আইনটি পরিবর্তিত করে নারী ও পুরুষ উভয়ের জন্য মৃত্যুদণ্ড নির্ধারণ করেন৷ লিও (Leo) ও মারসিয়ানের (Mercian) যুগে এ শাস্তিকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে রূপান্তরিত করা হয়৷ তারপর সীজার জাষ্টিনীন এ শাস্তিটি আরো হাল্‌কা করে এ নিয়ম জারি করেন যে, মেয়েটিকে বেত্রাঘাত করার পর কোন সন্যাসীর আশ্রমে দিতে আসতে হবে এবং তার স্বামীকে এ অধিকার দেয়া হয় যে, সে চাইলে দু'বছর পর তাকে সেখান থেকে বের করে আনতে পারে অন্যথায় সারা জীবন সেখানে ফেলে রাখতে পারে৷

ইহুদী আইনে পরস্ত্রীর সাথে যিনা সম্পর্কে যে বিধান পাওয়া যায় তা হচ্ছে নিম্নরূপঃ

''আর মূল্য দ্বারা কিম্বা অন্যরূপে মুক্তা হয় নাই, এমন যে বাগদত্তা দাসী, তাহার সহিত যদি কেহ সংগম করে, তবে তাহারা দণ্ডনীয় হইবে; তাহাদের প্রাণদণ্ড হইবে না, কেননা সে মুক্তা নহে৷''( লেবীয় পুস্তক ১৯:১৭)

''আর যে ব্যক্তি পরের ভার্যার সহিত ব্যভিচার করে, যে ব্যক্তি প্রতিবাসীর ভার্যার সহিত ব্যভিচার করে, সেই ব্যভিচারী ও ব্যভিচারিনী, উভয়ের প্রাণদণ্ড অবশ্যই হইবে৷'' (লেবীয় পুস্তক ২০:১০)

''কোন পুরুষ যদি পরস্ত্রীর সহিত শয়নকালে ধরা পড়ে, তবে পরস্ত্রীর সহিত শয়নকারী সেই পুরুষ ও সেই স্ত্রী উভয়ে হত হইবে৷''(দ্বিতীয় বিবরণ ২২:২২)

''যদি কেহ পুরুষের প্রতি বাগদত্তা কোন কুমারীকে নগর মধ্যে পাইয়াতহার সহিত শয়ন করে, তবে তোমরা সেই দুইজনকে বাহির করিয়া নগরদ্বারের নিকটে আনিয়া প্রস্তরাঘাতে বধ করিবে, সেই কন্যাকে বধ করিবে, কেননা, নগরের মধ্যে থাকিলেও সে চীৎকার করে নাই, এবং সেই পুরুষকে বধ করিবে, কেননা, সে আপন প্রতিবাসীর স্ত্রীকে মানভ্রষ্টা করিয়াছেঃ এইরূপে তুমি আপনার মধ্য হইতে দুষ্টাচার লোপ করিবে৷ কিন্তু যদি কোন পুরুষ বাগদত্তা কন্যাকে মাঠে পাইয়া বলপূর্বক তাহার সহিত শয়ন করে, তবে তাহার সহিত শয়নকারী সেই পুরুষ মাত্র হত হইবে, কিন্তু কন্যার প্রতি তুমি কিছুই করিবে না৷'' ( দ্বিতীয় বিবরণ ২২: ২৩-২৬)

কিন্তু হযরত ঈসা আলাইহিস সালামের যুগের বহু পূর্বে ইহুদী উলামা, ফকীহ,শাসক ও জনতা সবাই এ আইন কার্যত রহিত করে দিয়েছিল৷ যদিও এ আইন বাইবেলে লিখিত ছিল এবং একই আল্লাহর হুকুম মনে করা হোত৷ কিন্তু কেউ এর কার্যত প্রচলনের পক্ষপাতি ছিল না৷ এমনকি এ হুকুমটি কখনো জারি করা হয়েছিল এমন কোন নজিরও ইহুদীদের ইতহাসে পাওয়া এ যেতো না৷ হযরত ঈসা আলাইহিস সালাম যখন সত্যের দাওয়াত নিয়ে আবির্ভূত হন এবং ইহুদী আলেমগণ দেখেন এ বন্যা প্রতিরোধের কোন ব্যবস্থাই কার্যকর হচ্ছে না তখন তারা একটি কৌশল অবলম্বন করেন৷ তারা এক ব্যভিচারীনীকে তাঁর কাছে ধরে আনেন এবং বলেন, এর ফায়সালা করে দিন৷ (যোহন ৮:১-১১) এ থেকে তাদের উদ্দেশ্য ছিল হযরত ঈসাকে কুয়া বা খাদ দু'টোর মধ্য থেকে কোন একটিতে লাফিয়ে পড়তে বাধ্য করা৷ যদি তিনি পাথর মেরে হত্যা (রজম) ছাড়া অন্য কোন শাস্তি নির্ধারণ করেন, তাহলে একথা বলে তাঁর দুর্নাম রটানো হবে যে, দেখো ইনি একজন অভিনব পয়গম্বর এসেছেন, দুনিয়ার ভয়ে আল্লাহর আইন পরিবর্তন করে ফেলেছেন৷ আর যদি 'রজম' করার হুকুম দেন, তাহলে একদিকে রোমীয় আইনের সাথে তাঁর সংঘর্ষ বাধিয়ে দেয়া হবে আর অন্যদিকে জাতিকে বলা হবে, এ পয়গম্বর সাহেবকে মেনে নাও, দেখে নাও একবার তাওরাতের পুরো শরীয়াত তোমাদের পিঠে ও জীবনের ওপর নিক্ষিপ্ত হবে৷ কিন্ত হযরত ঈসা আল্লাহিস সালাম একটি মাত্র বাক্যের মাধ্যমে তাদের কৌশল তাদের মাথার ওপর ছুঁড়ে মারেন৷ তিনি বলেন, তোমাদের মধ্য থেকে নিজে পাক-পবিত্র-ব্যভিচারমুক্ত সে এগিয়ে এসে এর ওপর পাথর নিক্ষেপ করো৷ এ কথা শুনতেই ফকীহদের পুরো জমায়েত ফাঁকা হয়ে যায়৷ প্রত্যেকে মুখ লুকিয়ে কেটে পড়েন এবং আল্লাহর শরীয়াতের বাহকদের নৈতিক অবস্থা একেবারেই নগ্ন হয়ে ধরা পড়ে৷ তারপর যখন মেয়েটি একাকী দাঁড়িয়ে থাকে তখন তিনি তাকে নসীহত করেন এবং তাওবা পড়িয়ে বিদায় করে দেন৷ কারণ তিনি বিচারক ছিলেন না৷ কাজেই তার মামলার ফায়সালা তিনি করতে পারতেন না৷ তাছাড়া তার বিরুদ্ধে কোন সাক্ষীও উপস্থাপিত হয়নি৷ সর্বোপরি আল্লাহর আইন জারি করার জন্য কোন ইসলামী রাষ্ট্রও প্রতিষ্ঠিত ছিল না৷

হযরত ঈসার এ ঘটনা এবং বিভিন্ন সময়ে প্রদত্ত তাঁর আরো কতিপয় বিক্ষিপ্ত বাণী থেকে ভুল যুক্তি সংগ্রহ করে ঈসায়ীরা যিনার অপরাধ সম্পর্কে অন্য একটি ধারণা তৈরী করে নিয়েছে৷ তাদের মতে অবিবাহিত পুরুষ যদি অবিবাহিত মেয়ের সাথে যিনা করে তাহলে এটা যিনা তো হবে ঠিকই কিন্তু শাস্তিযোগ্য অপরাধ হবে না৷ আর যদি এ কর্মের পুরুষ বা নারী যে কোন এক পক্ষ বিবাহিত হয় অথবা উভয় পক্ষই হয় বিবাহিত, তাহলে এটা অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হবে ৷ কিন্তু একে অপরাধে পরিণত করে ''চুক্তি ভংগ'', নিছক যিনা নয় ৷ তাদের মতে যে ব্যক্তিই বিবাহিত হবার পরও যিনা করে সে গীর্জায় পাদরীর সামনে নিজের স্ত্রী বা স্বামীর সাথে যে বিশ্বস্ততার অংগীকার ও চুক্তি করেছিল তা ভংগ করে ফেলেছে তাই সে অপরাধী ৷ কিন্তু এ অপরাধের এ ছাড়া আর কোন শাস্তি নেই যে, যিনাকারী পুরুষের স্ত্রী তার স্বামীর বিরুদ্ধে অবিশ্বস্ততার দাবী করে বিবাহ বিচ্ছেদের ডিক্রি লাভ করতে পারবে এবং যিনাকারী স্ত্রীর স্বামী একদিকে নিজের স্ত্রীর বিরুদ্ধে অবিশ্বস্ততার দাবী করে বিবাহ বিচ্ছেদের ডিক্রি লাভ করতে পারবে এবং অন্য দিকে যে ব্যাক্তি তার স্ত্রীকে খারাপ করেছে তার কাছ থেকে অর্থদন্ড লাভ করার অধিকার রাখে৷ খৃস্টীয় আইন বিবাহিত ব্যভিচারী ও ব্যভিচারীনিকে এ শাস্তিই দিয়ে থাকে ৷ আর সর্বনাশের ব্যাপার হচ্ছে, এ শাস্তি দুধারী তলোয়ারের মতো৷ যদি কোন স্ত্রী তার বিশ্বাসঘাতক স্বামীর বিরুদ্ধে ''অবিশ্বস্ততার'' দাবী করে বিবাহ বিচ্ছেদের ডিক্রি হাসিল করে নেয়, তাহলে তো সে সেই বিশ্বাসঘাতক স্বামীর হাত থেকে মুক্তি পেয়ে যাবে কিন্তু খৃস্টীয় আইন অনুযায়ী এরপর আর সে জীবনভর দ্বিতীয় বিয়ে করতে পারবে না ৷ আর যে পুরুষটি তার স্ত্রীর বিরুদ্ধে অবিশ্বস্ততার দাবী এনে বিবাহ বিচ্ছেদ করেছিল তার অবস্থাও তাই হবে ৷ কারণ খৃস্টীয় আইন তাকেও দ্বিতীয় বিয়ে করার অনুমতি দেয় না ৷ এ যেন স্বামী-স্ত্রীর মধ্য থেকে যে সারা জীবন যোগী হিসেবে থাকতে চাইবে নিজের জীবন সংগী বা সংগিনীর বিরুদ্ধে খৃস্টীয় আদালত তার অবিশ্বস্ততার মামলা ঠুকে দিলেই চলেবে ৷

বর্তমান যুগের পাশ্চাত্য আইন-কানুন এসব বিচিত্র চিন্তাধারার ওপর প্রতিষ্ঠিত ৷ অধিকাংশ মুসলিম দেশও আজ এসব আইনের ধারা অনুসরণ করে চলছে ৷ এ পাশ্চাত্য আইনের দৃষ্টিতে যিনা করা একটি দোষ, নৈতিক চরিত্রহীনতা বা পাপ যাই কিছু হোক না কেন , মোটকথা এটা কোন অপরাধ নয় ৷ একে যদি কোন জিনিস অপরাধে পরিণত করতে পারে তাহলে তা হচ্ছে এমন ধরনের বল প্রয়োগ যার সাহায্যে দ্বিতীয় পক্ষের ইচ্ছার বিরুদ্ধে তার সাথে যৌন ক্রিয়া করা হয়৷ আর কোন বিবাহিত পুরুষের যিনা করার ব্যাপারটা হচ্ছে, তা যদি অভিযোগের কারণ হয়ে থাকে তাহলে তার স্ত্রীর জন্য৷ সে চাইলে তার প্রমাণ দিয়ে তালাক হাসিল করতে পারে৷ আর যিনার অপরাধী যদি হয় বিবাহিত নারী, তাহলে তার স্বামীর কেবল তার বিরুদ্ধে নয় বরং যিনাকারী পুরুষের বিরুদ্ধেও অভিযোগ দেখা দেয় এবং উভয়ের বিরুদ্ধে মামলা করে সে স্ত্রী থেকে তালাক এবং যিনাকারী পুরুষ থেকে অর্থদন্ড নিতে পারে৷

তিন: এসব চিন্তার বিপরীতে ইসলামী আইন স্বয়ং যিনাকেই একটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ গণ্য করে এবং বিবাহিত হবার পরও যিনা করলে তার দৃষ্টিতে তা অপরাধের মাত্রা আরো বেশী বাড়িয়ে দেয় ৷ এটা এ জন্য নয় যে, অপরাধী কারোর সাথে ''চুক্তিভংগ'' অথবা অন্য কারো বিছানায় হস্তক্ষেপ করেছে৷ বরং এ জন্য যে, তার নিজের প্রবৃত্তির কামণা পূরণ করার জন্য একটি বৈধ মাধ্যম ছিল এবং এরপরও সে অবৈধ মাধ্যম অবলম্বন করেছে৷ ইসলামী আইন যিনাকে যে দৃষ্টিতে দেখে তা হচ্ছে এই যে, এটি এমন একটি কর্ম যাকে স্বাধীনভাবে করার সুযোগ দেয়া হলে একদিকে মানব বংশধারা এবং অন্যদিকে তার সভ্যতা-সংস্কৃতির মূলোচ্ছেদ হয়ে যাবে ৷ বংশধারার স্থায়িত্ব ও সভ্যতা-সংস্কৃতির প্রতিষ্ঠা উভয়ের জন্য নারী ও পুরুষের সম্পর্ক শুধুমাত্র আইন অনুযায়ী নির্ভরযোগ্য সম্পর্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা অপরিহার্য ৷ আর তার সাথে সাথে যদি অবাধ যৌন সম্পর্কেরও খোলাখুলি অবকাশ থাকে তাহলে তাকে সীমাবদ্ধ রাখা সম্ভব নয়৷ কারণ গৃহ ও পরিবারের দায়িত্বের বোঝা বহন করা ছাড়া যেখানে লোকদের প্রবৃত্তির কামনা পূর্ণ করার সুযোগ থাকে সেখানে তাদের থেকে আশা করা যেতে পারে না যে, সেসব প্রবৃত্তির কামনা পূর্ণ করার জন্য তারা আবার এত বড় দায়িত্বের বোঝা বহন করতে উদ্যত হবে৷ এটা ঠিক বিনা টিকিটে রেল ভ্রমনের স্বাধীনতা থাকার পর রেল গাড়িতে বসার জন্য টিকিটের শর্ত অর্থ হীন হয়ে যাওয়ার মতো৷ টিকিটের শর্ত যদি অপরিহার্য হয়ে থাকে তাহলে তাকে কার্যকর করার জন্য বিনা টিকিটে রেল ভ্রমণ অপরাধ হিসেবে গণ্য হওয়া উচিত৷ তারপর যদি কোন ব্যক্তি পয়সা না থাকার কারণে বিনা টিকিটে সফর করে তাহলে সে অপেক্ষাকৃত কম পর্যায়ের অপরাধী হবে এবং ধনাঢ্য হবার পরও এ অপরাধ করলে তার অপরাধ আরো কঠিন হয়ে যায়৷

চারঃ ইসলাম মানব সমাজকে যিনার আশংকা থেকে বাঁচাবার জন্য শুধুমাত্র দণ্ডবিধি আইনের অস্ত্রের ওপর নির্ভর করে না বরং তার জন্য ব্যাপক আকারে সংস্কার ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা অবলম্বন করে৷ আর এ দণ্ডবিধি আইনকে নির্ধারণ করেছে নিছক একটি শেষ উপায় হিসেবে৷ এর উদ্দেশ্য এ নয় যে, লোকেরা এ অপরাধ করে যেতেই থাকুক এবং তাদেরকে বেত্রাঘাত করার জন্য দিনরাত তাদের ওপর নজর রাখা হোক৷ বরং এর উদ্দেশ্য হচ্ছে, লোকেরা যেন এ অপরাধ না করে এবং কাউকে শাস্তি দেবার সুযোগই না পাওয়া যায়৷ সে সবার আগে মানুষের প্রবৃত্তির সংশোধন করে৷ তার মনের মধ্যে বসিয়ে দেয় অদৃশ্য জ্ঞানের অধিকারী এবং সার্বভৌম ক্ষমতার মালিক আল্লাহর ভয়৷ তার মধ্যে আখেরাতে জিজ্ঞাসাবাদের অনুভূতি জাগিয়ে তোলে৷ মরেও মানুষ এ হাত থেকে বাঁচতে পারে না৷ তার মধ্যে আল্লাহর আইনের আনুগত্য করার প্রেরণা সৃষ্টি করে৷ এটি হচ্ছে ঈমানের অপরিহার্য দাবী৷ আর তারপর বারবার তাকে এ মর্মে সতর্ক করে যে, যিনা ও সতীত্বহীনতা এমন বড় বড় গোনাহর অন্তরভূক্ত যেগুলো সম্পর্কে কঠোরভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে৷ সমগ্র কুরআনে বারবার এ বিষয়বস্তু সামনে আসতে থাকে৷ তারপর ইসলাম মানুষের জন্য বিয়ের যাবতীয় সম্ভাব্য সহজ সুযোগ সৃষ্টি করে দেয়৷ এক স্ত্রীতে তৃপ্ত না হলে চারটি পর্যন্ত বৈধ স্ত্রী রাখার সুযোগ করে দেয়৷ স্বামী-স্ত্রীর মনের মিল না হলে স্বামীর জন্য তালাক ও স্ত্রীর ''খুলা'র সুযোগ করে দেয়৷ আর অমিলের সময় পারিবারিক সালিশ থেকে শুরু করে সরকারী আদালতে পর্যন্ত আপীল করার পথ খুলে দেয়, এ ফলে দু'জনের মধ্যে সমঝোতা হয়ে যেতে পারে আর নয়তো স্বামী-স্ত্রী পরস্পরেরর বন্ধন মুক্ত হয়ে নিজেদের ইচ্ছা মতো অন্য কোথাও বিয়ে করতে পারে৷ এসব বিষয় সূরা বাকারাহ, সূরা নিসা ও সূরা তালাকে দেখা যেতে পারে৷ আর এ সূরা নূরেও দেখা যাবে পুরুষ ও নারীকে বিয়ে না করে বসে থাকাকে অপছন্দ করা হয়েছে এবং এ ধরনের লোকদের বিয়ে করিয়ে দেবার এমনকি গোলাম ও বাঁদীদেরকেও অবিবাহিত করে না রাখার জন্য পরিষ্কার হুকুম দেয়া হয়েছে৷

তারপর ইসলাম সমাজ থেকে এমন সব কার্যকারণ নির্মূল করে দেয় যেগুলো যিনার আগ্রহ ও তার উদ্যোগ সৃষ্টি করে এবং তার জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরী করতে পারে৷ যিনার শাস্তি বর্ণনা করার এক বছর আগে সূরা আহযাবে মেয়েদেরকে গৃহ থেকে বের হতে হলে চাদর মুড়ি দিয়ে এবং ঘোমটা টেনে বের হবার হুকুম দেয়া হয়েছিল৷ মুসলমান মেয়েদের জন্য যে নবীর গৃহ ছিল আদর্শ গৃহ সেখানে বসবাসকারী মহিলাদেরকে নির্দেশ দেয়া হয়েছিল, নিজেদের গৃহ মধ্যে মর্যাদা ও প্রশান্তি সহকারে বসে থাকো, নিজেদের সৌন্দর্য, ও সাজসজ্জার প্রদর্শনী করে বেড়িও না এবং বাইরের পুরুষরা তোমাদের থেকে কোন জিনিস নিলে যেন পরদার আড়াল থেকে নেয়৷ দেখতে দেখতে এ আর্দশ সমস্ত মু'মিন মহিলাদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে৷ তাদের কাছে জাহেলী যুগের নির্লজ্জ মহিলারা নয় বরং নবীর (সা) স্ত্রী ও কণ্যাগণই ছিলেন অনুসরণযোগ্য৷ অনুরূপভাবে ফৌজদারী আইনের শাস্তি নির্ধারণ করার আগে নারী ও পুরুষের অবাধ মিশ্রিত সামাজিকতা বন্ধ করা হয়, নারীদের সাজসজ্জা করে বাইরে বের হওয়া বন্ধ করা হয় এবং যে সমস্ত কার্যকারণ ও উপায়-উপকরণ যিনার সুযোগ-সুবিধা তৈরী করে দেয় সেগুলোর দরজা বন্ধ করে দেয়া হয়৷ এসবের পরে যখন যিনার ফৌজদারী তথা অপরাধমূলক শাস্তি নির্ধারণ করা হয় তখন দেখা যায় এর সাথে সাথে এ সূরা নূরেই অশ্লীলতার সম্প্রসারণেও বাধা দেয়া হচ্ছে৷ পতিতাবৃত্তিকে (Prostitution) আইনগতভাবে বন্ধ করা হচ্ছে৷ নারী ও পুরুষদের বিরুদ্ধে বিনা প্রমাণে ব্যভিচারের অপবাদ দেয়া এবং তার আলোচনা করার জন্যও কঠোর শাস্তির বিধান দেয়া হচ্ছে৷ দৃষ্টি নিয়ন্ত্রিত করার হুকুম দিয়ে চোখকে প্রহরাধীন রাখা হচ্ছে, যাতে দৃষ্টি বিনিময় সৌন্দর্যের প্রতি আকর্ষণ সৃষ্টি এবং সৌন্দর্যের প্রতি আকর্ষণ কামচর্চায় পৌছুতে না পারে ৷ এ সংগে নারীদেরকে নিজেদের ঘরে মাহ্‌রাম ও গায়ের মাহ্‌রাম আত্মীয়দের মধ্যে পার্থক্য করার এবং গায়ের মাহ্‌রামদের সামনে সেজেগুজে না আসার হুকুম দেয়া হচ্ছে৷ এ থেকে যে সংস্কার পরিকল্পনার একটি অংশ হিসেবে যিনার আইনগত শাস্তি নির্ধারণ করা হয়েছে তার সমগ্র অবয়বটি অনুধাবন করা যেতে পারে৷ ভিতর-বাইরের যাবতীয় সংশোধন ব্যবস্থা অবলম্বন করা সত্ত্বেও যেসব দুষ্ট প্রকৃতির লোক প্রকাশ্য বৈধ সুযোগ বাদ দিয়ে অবৈধ পথ অবলম্বন করে নিজেদের প্রবৃত্তির কামনা পূর্ণ করার ওপর জোর দেয় তাদেরকে চরম শাস্তি দেবার এবং একজন ব্যভিচারীকে শাস্তি দিয়ে সমাজের এ ধরনের প্রবৃত্তির অধিকারী বহু সংখ্যক লোকের মানসিক অপারেশন করার জন্য এ শাস্তি৷ এ শাস্তি নিছক একজন অপরাধীর শাস্তির নয় বরং এটি একটি কার্যকর ঘোষনা যে, মুসলিম সমাজ ব্যভিচারীদের অবাধ বিচরণস্থল নয় এবং এটি স্বাদ আস্বাদনকারী পুরুষ ও নারীদের নৈতিক বাঁধন মুক্ত হয়ে যথেচ্ছা আমোদ ফূর্তি করার জায়াগাও নয়৷ এ দৃষ্টিতে কোন ব্যক্তি ইসলামের এ সংস্কার পরিকল্পনা অনুধাবন করতে চাইলে সহজে অনুভব করেন যে, এ সমগ্র পরিকল্পনার একটি অংশকেও তার নিজের জায়গা থেকে সরানো যেতে পারে না এবং এর মধ্যে কোন কমবেশীও করা যেতে পারে না৷ এর মধ্যে রদবদল করার চিন্তা করতে পারে এমন একজন অজ্ঞ-নাদান, যে একে অনুধাবন করার যোগ্যতা ছাড়াই এর সংশোধনকারী ও সংস্কারক হয়ে বসেছে অথবা মহাজ্ঞানী আল্লাহ যে উদ্দেশে এ পরিকল্পনাটি দিয়েছেন তা পরিবর্তন করাই যার আসল নিয়ত এমন একজন বিপর্যয় সৃষ্টিকারীই এ চিন্তা করতে পারে৷

পাঁচঃ তৃতীয় হিজরীতেই তো যিনাকে একটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ গন্য করা হয়েছিল৷ কিন্ত তখনো পর্যন্ত এটি একটি আইনগত অপরাধ ছিল না৷ রাষ্ট্রীয় পুলিশ ও বিচার বিভাগ এর বিরুদ্ধে কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করতো না৷ বরং তখন এটি ছিল একটি ''সামাজিক'' বা ''পারিবারিক'' অপরাধ৷ পরিবারের লোকদেরই এর বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করার ইখতিয়ার ছিল৷ হুকুম ছিল, যদি চার জন সাক্ষী এই মর্মে সাক্ষ দেয় যে, তারা একটি পুরুষ ও একটি মেয়েকে যিনা করতে দেখেছে তাহলে তাদের দু'জনকে মারধর করতে হবে এবং মেয়েটিকে গৃহবন্দী করতে হবে৷ এ সংগে এ ইশারাও করে দেয়া হয়েছিল এ, ''পরবর্তী হুকুম'' না দেয়া পর্যন্ত হকুমটি জারি থাকবে৷ আসল আইন পরে আসছে৷ (দেখুন তাফহীমুল কুরআন, সূরা আন নিসা, ১৫ ও ১৬ আয়াত এবং এ সংগে টীকাও) এর আড়াই তিন বছর পর সূরা নূরের এ আয়াত নাযিল হয়৷ কাজেই এটি আগের হুকুম রহিত করে যিনাকে একটি রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ যোগ্য (Cognizable Offence) আইনগত অপরাধ গণ্য করে৷

ছয়ঃ এ আয়াতে যিনার যে শাস্তি নির্ধারণ করা হয় তা আসলে ''নিছক যিনা'র শাস্তি, বিবাহিতের যিনার শাস্তি নয়৷ ইসলামী আইনের দৃষ্টিতে এ বিবাহিতের যিনা কঠিনতর অপরাধ৷ একথা কুরআনের একটি ইশারা থেকে জানা যায় যে, সে এখানে এমন একটি যিনার শাস্তি বর্ণনা করছে যার উভয় পক্ষ অবিবাহিত৷ সূরা নিসায় ইতিপূর্বে বলা হয়:

-----

''তোমাদের নারীদের মধ্য থেকে যারা ব্যভিচারের অপরাধ করবে তাদের ওপর তোমাদের নিজেদের মধ্য থেকে চার জনের সাক্ষ নাও৷ আর যদি তারা সাক্ষ দিয়ে দেয় তাহলে এরপর তাদেরকে (অপরাধী নারীদেরকে) ঘরের মধ্যে বন্ধ করে রেখে দাও, যে পর্যন্ত না তাদের মৃত্যু এসে যায় অথবা আল্লাহ তাদের জন্য বের করে দেন কোন পথ৷''

(১৫ আয়াত)

এরপর কিছুদূর এগিয়ে গিয়ে বলা হয়ঃ

-----

''আর তোমাদের মধ্যে যারা মু'মিনদের মধ্য থেকে স্বাধীন নারীদেরকে বিয়ে করার ক্ষমতা রাখে না,তারা তোমাদের মু'মিন বাঁদীদেরকে বিয়ে করবে৷ .......... তারপর যদি (ঐ বাঁদীরা) বিবাহিত হয়ে যাবার পর ব্যভিচার করে, তাহলে তাদের শাস্তি (এ ধরনের অপরাধে) স্বাধীন নারীদের তুলনায় অর্ধেক দিতে হবে৷ (২৫ আয়াত)

এর মধ্যে প্রথম আয়াতে আশা দেয়া হয়েছে যে, ব্যভিচারিনীদের জন্য, যাদেরকে আপাতত বন্দী করার হুকুম দেয়া হচ্ছে , আল্লাহ পরে কোন পথ বের করে দেবেন ৷ এ থেকে জানা যায় , সূরা নিসার ওপরে উল্লেখিত আয়াতে যে ওয়াদা করা হয়েছিল এ দ্বিতীয় হুকুমটির মধ্যমে সে ওয়াদা পূরণ করা হয়েছে ৷ দ্বিতীয় আয়াতে বিবাহিতা বাঁদীর যিনার শাস্তি বর্ণনা করা হয়েছে ৷ এখানে একই আয়াতে এবং একই বর্ণনা ধারায় দু'বার ''মুহসানাতদের'' বিয়ে করার ক্ষমতা রাখে না ৷ অবশ্যই এখানে ''মুহসানাত''মানে বিবাহিতা নারী হতে পারে না বরং এর মানে হতে পারে , একটি স্বাধীন পরিবারের অবিবাহিতা নারী ৷ তারপর শেষের বাক্যাংশে বলা হচ্ছে, বাঁদী বিবাহিতা হবার পর যদি যিনা করে, তাহলে এ অপরাধে মুহসানাতের যে শাস্তি হওয়া উচিত তার শাস্তি হবে তার অর্ধেক ৷ পরবর্তী আলোচনা পরিষ্কার জানিয়ে দিচ্ছে যে , প্রথম বাক্যাংশে ''মহসানাত''অর্থ যা ছিল এ বাক্যাংশেও তার অর্থ সে একই অর্থাৎ বিবাহিতা নয় বরং স্বাধীন পরিবারে লালিতা পালিতা অবিবাহিতা নারী ৷ এভাবে সূরা নিসার এ দু'টি আয়াতে একত্র হয়ে এ বিষয়ের প্রতি ইংগিত করে যে, সেখানে অবিবাহিতাদের যিনার শাস্তির কথা বর্ণনার যে ওয়াদা করা হয়েছিল সূরা নূরের এ হুকুমটি সে কথাই বর্ণনা করছে ৷ (আরো বেশী ব্যাখ্যার জন্য দেখুন , তাফহীমুল কুরআন ,সূরা নিসা, ৪৬ টীকা)

সাতঃ বিবাহিতের যিনার শাস্তি কি , একথা কুরআন মজীদ থেকে নয় বরং হাদীস থেকে আমরা জানতে পারি ৷ অসংখ্য নির্ভরযোগ্য হাদীস থেকে প্রমানিত , নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কেবল মুখেই এর শাস্তি রজম (প্রস্তরঘাতে মৃত্যু ) বর্ণনা করেননি বরং কার্যত বহু সংখ্যক মোকদ্দমায় তিনি এ শাস্তি জারিও করেন ৷ তাঁর পরে চার খোলাফায়ে রাশেদীনও নিজ নিজ যুগে এ শাস্তি জারি করেন এবং আইনগত শাস্তি হিসেবে বারবার এরি ঘোষনা দেন৷ সাহাবায়ে কেরাম ও তাবেঈগণ ছিলেন এ বিষয়ে সম্পূর্ণ একমত ৷ কোন এক ব্যাক্তিও এমন একটি উক্তি পাওয়া যায় না যা থেকে একথা প্রমাণ হতে পারে যে, প্রথম যুগে এর প্রমাণিত শরয়ী' হুকুম হবার ব্যাপারে কোন সন্দেহ ছিল ৷ তাঁদের পরে সকল যুগের ও দেশের ইসলামী ফকীহগণ এর একটি প্রমাণিত ও প্রতিষ্ঠিত সুন্নাত হবার ব্যাপারে একমত ছিলেন ৷ কারণ এর নির্ভুলতার সপক্ষে এত বিপুল সংখ্যক ও শক্তিশালী প্রমাণ রয়েছে যার উপস্থিতিতে কোন তত্বজ্ঞানী একথা অস্বীকার করতে পারেনা ৷ উম্মতে মুসলিমরা সমগ্র ইতিহাসে খারেজী ও কোন কোন মুতাজিলী ছাড়া কেউই একথা অস্বীকার করেননি ৷ খারেজী ও মুতাজিলাদের অস্বীকৃতির কারণ এটা নয় যে, তারা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে এর প্রমাণের ক্ষেত্রে কোন প্রকার দুর্বলতা চিহ্নিত করতে পেরেছিলেন৷ বরং তারা একে কুরআন বিরোধী গণ্য করতেন ৷ অথচ এটি ছিল তাঁদের নিজেদের কুরআন অনুধাবনের ত্রুটি ৷ তাঁরা বলতেন, কুরআন ---------- এর একচ্ছত্র শর্তহীন শব্দ ব্যবহার করে এর শাস্তি বর্ণনা করে একশ' বেত্রাঘাত ৷ কাজেই কুরআনের দৃষ্টিতে সকল প্রকার ব্যভিচারী ও ব্যভিচারিনীর শাস্তি এটিই এবং এ থেকে বিবাহিত ব্যভিচারীকে পৃথক করে তার জন্য কোন ভিন্ন শাস্তির ব্যবস্থা করা আল্লাহর আইনের বিরুদ্ধাচরণ ছাড়া আর কিছুই নয় ৷ কিন্তু তাঁরা এ কথা চিন্তা করেননি যে, কুরআনের শব্দাবলীর যে আইনগত গুরুত্ব রয়েছে সে একই গুরুত্বের অধিকারী হচ্ছে তাদের উদ্ধৃত নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ব্যাখ্যাও ৷ তবে এখানে শর্ত শুধু হচ্ছে এই যে, এ ব্যাখ্যা যে তাঁরই একথা প্রামাণিত হতে হবে ৷ কুরআন এ ধরনের ব্যাপক ও একচ্ছত্র অর্থবোধক শব্দের মাধ্যমে ------------ তথা পুরুষ চোর ও মেয়ে চোরের শাস্তি হিসেবে হাত কাটার বিধান দিয়েছেন ৷ এ বিধানকেও যদি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রমাণিত ব্যাখ্যাসমূহের নিয়ন্ত্রণাধীন না করা হয় তাহলে এর শব্দাবলীর ব্যাপকতার দাবী হচ্ছে এই যে, কোন ব্যক্তি সামান্য একটু সুঁই বা কুল চুরি করলেও তাকে চোর আখ্যা দিয়ে তার হাতটি একেবারে কাঁধের কাছ থেকে কেটে দেয়া হবে ৷ অন্যদিকে লাখ লাখ টাকা চুরি করার পরও যদি এক ব্যক্তি পাকড়াও হয়ে বলে , আমি নিজেকে সংশোধন করে নিয়েছি এবং ভবিষ্যতে আমি আর চুরি করবো না , চুরি থেকে আমি তাওবা করে নিলাম তাহলে এ ক্ষেত্রে তাকে অবশ্যি ছেড়ে দিতে হবে ৷ কারণ কুরআন বলছেঃ

---------------

''যে ব্যক্তি জুলুম করার পরে তাওবা করে এবং নিজেকে সংশোধন করে নেয় , আল্লাহ তার তাওবা কবুল করে নেন ৷'' (মায়েদাহ, ৩৯)

এভাবে কুরআন শুধুমাত্র দুধ-মা ও বোনকে বিয়ে করা হারাম ঘোষণা করেছে, দুধ-কন্যাকে বিয়ে এ যুক্তির প্রেক্ষিতে কুরআন বিরোধী হওয়া উচিত৷ কুরআন কেবলমাত্র দুই বোনকে এক সংগে বিয়ে করা নিষেধ করেছে ৷ খালা-ভাগনী এবং ফুফী –ভাইঝিকে একত্রে বিয়ে করাকে যে ব্যক্তি হারাম বলে তার বিরুদ্ধে কুরআন বিরোধী হুকুম দিচ্ছে বলে অভিযোগ আনতে হবে ৷ কুরআন সৎ-মেয়েকে বিয়ে করা শুধুমাত্র তখনই হারাম করে যখন সে তার সৎ-পিতার ঘরে প্রতিপালিত হয় ৷ শর্তহীন ও এচ্ছত্রভাবে এর হারাম হওয়ার বিষয়টি কুরআন বিরোধী গণ্য হওয়া উচিত ৷ কুরআন শুধুমাত্র এমন অবস্থায় ‍‍রেহেন' রাখার অনুমতি দেয় যখন মানুষ বিদেশে সফররত থাকে এবং ঋণ সংক্রান্ত দলিলপত্র লেখার লোক পাওয়া না যায় ৷ দেশে অবস্থানকালে এবং দলিলপত্র লেখার লোক পাওয়া গেলে এ অবস্থায় রেহেন রাখার বৈধতা কুরআন বিরোধী হওয়া উচিত ৷ কুরআন সাধারণ ও ব্যাপক অর্থবোধক শব্দের মাধ্যমে হুকুম দেয়ঃ --------------- (অর্থাৎ পরস্পরের মধ্যে কেনাবেচা করার সময় সাক্ষী রাখো )

এ প্রেক্ষিতে আমাদের হাটে-বাজারে-দোকানে দিনরাত বিনা সাক্ষী প্রামাণে যেসব কেনাবেচা হচ্ছে সেসবই অবৈধ হওয়া উচিত ৷ এখানে গুটিকয় মাত্র দৃষ্টান্ত পেশ করলাম ৷ এগুলোর ওপর চোখ বুলালে রজম তথা প্রস্তরঘাতে মৃত্যুদণ্ডকে যারা কুরআন বিরোধী বলেন, তাদের যুক্তির গলদ চোখের সামনে ভেসে উঠবে ৷ শরীয়াতী ব্যবস্থায় নবীর দায়িত্ব হচ্ছে, তিনি আমাদের কাছে আল্লাহর হুকুম পৌঁছিয়ে দেবার পর আমাদের জ
৩. এ আয়াতে প্রথম উল্লেখযোগ্য জিনিসটি হচ্ছে, এখানে ফৌজদারী আইনকে ''আল্লাহর দীন'' বলা হচ্ছে৷ এ থেকে জানা যায়, শুধুমাত্র নামায, রোযা, হজ্জ ও যাকাতই দীন নয় বরং দেশের আইনও দীন৷ দীন প্রতিষ্ঠার অর্থ শুধু নামায প্রতিষ্ঠা নয় বরং আল্লাহর আইন ও শরীয়াত ব্যব্স্থা প্রতিষ্ঠাও৷ যেখানে এসব প্রতিষ্ঠিত হয় না সেখানে নামায প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেলেও যেন অসম্পূর্ণ দীন প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে বলে মনে করা হবে৷ যেখানে একে বাদ দিয়ে অন্য কোন আইন অবলম্বন করা হয় সেখানে অন্য কিছু নয় বরং আল্লাহর দীনকেই প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে৷

এখানে দ্বিতীয় যে জিনিসটি উল্লেখযোগ্য সেটি হচ্ছে, আল্লাহর এ সতর্কবাণীঃ যিনাকারী ও যিনাকারিনীর ওপর আমার নির্ধারিত শাস্তি প্রয়োগকালে অপরাধীর জন্য দয়া ও মমতার প্রেরণা যেন তোমাদের হাত টেনে না ধরে৷ নবী সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম একথাটি আরো স্পষ্টভাবে নিম্নোক্ত হাদীসটিতে বলেনঃ

-----

''কিয়ামতের দিন একজন শাসককে আনা হবে৷ সে হদের মধ্যে বেত্রাঘাতের সংখ্যা এক ঘা কমিয়ে দিয়েছিল৷ জিজ্ঞেস করা হবে, এ কাজ তুমি কেন করেছিলে? জবাব দেবে, আপনার বান্দাদের প্রতি অনুগ্রহশীল হয়ে৷ আল্লাহ বলবেনঃ আচ্ছা, তাহলে তাদের ব্যাপারে তুমি আমার চেয়ে বেশী অনুগ্রহশীল ছিলে? তারপর হুকুম হবে, নিয়ে যাও একে দোজখে৷৷ আর একজন শাসককে আনা হবে৷ সে বেত্রাঘাতের সংখ্যা ১টি বাড়িয়ে দিয়েছিল৷ জিজ্ঞেস করা হবে, তুমি এ কাজ করেছিলে কেন? সে জবাব দেবে, যাতে লোকেরা আপনার নাফরমানি করা থেকে বিরত থাকে৷ আল্লাহ বলবেনঃ আচ্ছা, তাদের ব্যাপারে তুমি তাহলে আমার চেয়ে বেশী বিজ্ঞ ও বুদ্ধিমান ছিলে? তারপর হুকুম হবে, নিয়ে যাও একে দোজখে৷ (তাফসীরে কবীর, ৬ষ্ঠ খন্ড, ২২৫ পৃষ্ঠা)

দয়া বা প্রয়োজনের প্রেক্ষিতে হদের মধ্যে কম-বেশী করার কাজ চললে এ অবস্থা হবে৷ কিন্ত কোথাও যদি অপরাধীদের মর্যদার ভিত্তিতে বিধানের মধ্যে বৈষম্য করা হতে থাকে তাহলে সেটা হবে জঘন্য ধরনের অপরাধ৷ বুখারী ও মুসলিমে হযরত আয়েশার (রা) একটি রেওয়ায়াত উদ্ধৃত হয়েছে৷ তাতে বলা হয়েছে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এক ভাষণে বলেনঃ ''হে লোকেরা! তোমাদের পূর্বে যেসব উম্মত অতিক্রান্ত হয়েছে তারা এ জন্য ধ্বংস হয়ে গেছে যে, তাদের কোন মর্যাদাশালী ব্যক্তি চুরি করলে তারা তাকে ছেড়ে দিতো এবং কোন দুর্বল ব্যক্তি চুরি করলে তাকে শাস্তি দিতো৷'' অন্য একটি হাদীসে রসূলুল্লাহ (সা) বলেনঃ ''একটি হদ্‌ জারি করা দুনিয়াবাসীর জন্য চল্লিশ দিন বৃষ্টি হবার চাইতেও বেশী কল্যাণকর৷'' (নাসাঈ ও ইবনে মাজাহ)

কোন কোন তাফসীরকার এ আয়াতের এ অর্থ গ্রহণ করেছেন যে, অপরাধ প্রমান হবার পর অপরাধীকে ছেড়ে দেয়া যাবে না এবং তার শাস্তিও কম করা যাবে না বরং তাকে পুরো একশ কোড়া মারতে হবে৷ আবার কেউ কেউ এ অর্থ নিয়েছেন যে, অপরাধী যে মারের কোন কষ্ট অনুভব করতে না পারে এমন ধরনের কোন হাল্‌কা মার মারা যাবে না৷ আয়াতের শব্দাবলী উভয় ধরনের অর্থ সম্বলিত৷ বরং উভয় অর্থই প্রযোজ্য মনে হয়৷ বরঞ্চ সে সাথে এ অর্থও হয় যে, যিনাকারীকে সে শাস্তি দিতে হবে যা আল্লাহ নির্ধারিত করে দিয়েছেন, তাকে অন্যকোন শাস্তিতে পরিবর্তিত করা যাবে না ৷ কোড়া মারার পরিবর্তে যদি অন্য কোন শাস্তি দয়া ও মমতার ভিত্তিতে দেয়া হয়, তাহলে তা হবে গোনাহ৷ আর যদি কোড়া মারাকে একটি বর্বরোচিত শাস্তি মনে করে অন্য শাস্তি দেয়া হয়,তাহলে তা হবে নির্জলা কুফরী, যা এক মহূর্তকালের জন্যও ঈমানের সাথে একই বক্ষে একত্র হতে পারে না৷ আল্লাহকে আল্লাহ বলে মেনে নেয়া আবার (নাউযুবিল্লাহ) তাকে বর্বরও বলা কেবলমাত্র এমন ধরনের লোকের পক্ষে সম্ভব যে জঘন্য পর্যায়ের মুনাফিক৷
৪. অর্থাৎ ঘোষণা দিয়ে সাধারণ লোকের সামনে শাস্তি দিতে হবে ৷ এর ফলে একদিকে অপরাধী অপদস্ত হবে এবং অন্যদিকে সাধারণ মানুষ শিক্ষা লাভ করবে ৷ এ থেকে ইসলামের শাস্তি তত্বের ওপর সুস্পষ্ট আলোকপাত হয়৷ সূরা আল মা-য়েদায় চুরির শাস্তি বর্ণনা প্রসংগে বলা হয়েছেঃ --------------- ''তাদের কৃতকর্মের প্রতিদান এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে অপরাধ প্রতিরোধক শাস্তি ৷'' (৩৮ আয়াত ) আর এখানে নির্দেশ দেয়া হচ্ছে, যিনাকারীকে প্রকাশ্য লোকদের সামনে শাস্তি দিতে হবে ৷ এ থেকে জানা যায়, ইসলামী আইনে শাস্তির তিনটি উদ্দেশ্যা ৷ এক, অপরাধী থেকে তার জুলুম ও বাড়াবাড়ির প্রতিশোধ নিতে হবে এবং সে অন্য ব্যক্তি বা সমাজের প্রতি যে অন্যায় করেছিল তার কিছুটা স্বাদ তাকে আস্বাদন করিয়ে দিতে হবে ৷ দুই, তাকে পুনর্বার অপরাধ করা থেকে বিরত রাখতে হবে ৷ তিন, তার শাস্তিকে শিক্ষণীয় করতে হবে , যাতে সমাজের খারাপ প্রবণতার অধীকারী অন্য লোকদের মগজ ধোলাই হয়ে যায় এবং তারা যেন এ ধরনের কোন অপরাধ করার সাহসই না করতে পারে৷ ৷ এ ছাড়াও প্রকাশ্যে শাস্তি দেবার আর একটি লাভ হচ্ছে এই যে, এ অবস্থায় শাসকরা শাস্তি দেবার ক্ষেত্রে অহেতুক সুবিধা দান বা অহেতুক কঠোরতা প্রদর্শন করার সাহস না দেখাতে পারে৷
৫. অর্থাৎ অ-তাওবাকরী ব্যভিচারীর জন্য ব্যভিচারিনীই উপযোগী অথবা মুশরিক নারী ৷ কোন সৎ মু'মিন নারীর জন্য সে মোটেই উপযোগী পুরুষ নয় ৷ আর মু'মিনদের জন্য জেনে বুঝে নিজেদের মেয়েদেরকে এ ধরনের অসচ্চরিত্র লোকদের হাতে সোপর্দ করা হারাম ৷ এভাবে যিনাকারিনী (অ-তাওবাকারী ) মেয়েদের জন্য তাদেরই মতো যিনাকারীরা অথবা মুশরিকরাই উপযোগী ৷ সৎ মু'মিনদের জন্য তারা মোটেই উপযোগী নয় ৷ যেসব নারীর চরিত্রহীনতার কথা মু'মিনরা জানে তাদেরকে বিয়ে করা তাদের জন্য হারাম ৷ যে সমস্ত পুরুষ ও নারী তাদের চরিত্রহীনতার পথে গা ভাসিয়ে দিয়েছে একমাত্র তাদের জন্য এ নিয়ম প্রযোজ্য ৷ তবে যারা তাওবা করে নিজেদের সংশোধন করে নিয়েছে তাদের জন্য এটা প্রযোজ্য নয় ৷ কারণ তাওবা ও সংশোধনের পর ''যিনাকারী'' হবার দোষ আর তাদের জন্য প্রযুক্ত হয় না ৷

যিনাকারীর সাথে বিয়ে হারাম হবার অর্থ ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল এ নিয়েছেন যে, আদতে তার সাথে বিয়ে অনুষ্ঠিতই হয়না ৷ কিন্তু এ ক্ষেত্রে সঠিক কথা হচ্ছে, এর অর্থ নিছক নিষেধাজ্ঞা ছাড়া আর কিছুই নয় ৷ এ নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধাচরণ করে যদি কেউ বিয়ে করে তাহলে আইনগতভাবে তা বিয়েই হবে না এবং এ বিয়ে সত্ত্বেও উভয় পক্ষকে যিনাকারী গণ্য করতে হবে একথা ঠিক নয়৷ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একটি সার্বজনীন নিয়ম হিসেবে বলেনঃ ------------ ''হারাম হালালকে হারাম করে দেয় না৷'' (তাবারানী ও দারুকুতনী) অর্থাৎ একটি বেআইনি কাজ অন্য একটি আইনসংগত কাজকে বেআইনী করে দেয় না ৷ কাজেই কোন ব্যক্তির যিনা করার কারণে সে যদি বিয়েও করে তাহলে তা তাকে যিনায় পরিণত করে দিতে পারেনা এবং বিবাহ চুক্তির দ্বিতীয় পক্ষ যে ব্যভিচারী নয় সেও ব্যভিচারী গণ্য হবে না ৷ নীতিগতভাবে বিদ্রোহ ছাড়া কোন অপরাধ এমন নেই, যা অপরাধ সম্পাদনকারীকে নিষিদ্ধ ব্যক্তিতে পরিণত করে৷ যার পরে তার কোন কাজই আইনসংগত হতে পারেনা ৷ এ বিষয়টি সামনে রেখে যদি আয়াত সম্পর্কে চিন্তা-ভাবনা করা যায়, তাহলে আসল উদ্দেশ্য পরিষ্কারভাবে এই মনে হয় যে, যাদের ব্যভিচারী চরিত্র জনসমক্ষে পরিচিত তাদেরকে বিয়ে করার জন্য নির্বাচিত করা একটি গোনাহর কাজ ৷ মু'মিনদের এ গোনাহ থেকে দূরে থাকা উচিত ৷ কারণ এর মাধ্যমে ব্যভিচারীদের হিম্মত বাড়িয়ে দেয়া হয় ৷ অথচ শরীয়াত তাদেরকে সমাজের অবাঞ্জিত ও ঘৃণ্য জীব গণ্য করতে চায় ৷

অনুরূপভাবে এ আয়াত থেকে এ সিদ্ধান্তও টানা যায় না যে, যিনাকারী মুসলিম পুরুষের বিয়ে মুশরিক নারীর সাথে এবং যিনাকারিনী মুসলিম নারীর বিয়ে মুশরিক পুরুষের সাথে সঠিক হবে ৷ আয়াতের উদ্দেশ্য হচ্ছে একথা বলা যে, যিনা একটি চরম নিকৃষ্ট কুকর্ম৷ যে ব্যক্তি মুসলমান হয়েও এ কাজ করে সে মুসলিম সমাজের সৎ ও পাক-পবিত্র লোকদের সাথে আত্মীয় সম্পর্ক গড়ে তোলার যোগ্যতা হারিয়ে ফেলে ৷ তান নিজের মতো যিনাকারীদের সাথে আত্মীয় সম্পর্ক গড়ে তোলার উচিত অথবা মুশরিকদের সাথে সম্পর্ক গড়ে তোলা উচিত , যারা আদৌ আল্লাহর বিধানের প্রতি বিশ্বাসই রাখেনা ৷

এ প্রসংগে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে যেসব হাদীস উদ্ধৃত হয়েছে সেগুলোই আসলে আয়াতের সঠিক অর্থ প্রকাশ করে৷ মুসনাদে আহমাদ ও নাসাঈতে আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনে আসের (রা) রেওয়ায়াত উদ্ধৃত হয়েছে ৷ তাতে বলা হয়েছে, উম্মে মাহযাওল নামে একটি মেয়ে পতিতাবৃত্তি অবলম্বন করেছিল ৷ এক মুসলমান তাকে বিয়ে করতে চায় এবং এ জন্য নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে অনুমতি চায় ৷ তিনি নিষেধ করে এ আয়াতটি পড়েন ৷ তিরমিযী ও আবু দাউদে বলা হয়েছে, মারসাদ ইবনে আবি মারসাদ একজন সাহাবী ছিলেন ৷ জাহেলী যুগে মক্কার ঈনাক নামক এক ব্যভিচারিনীর সাথে তার অবৈধ সম্পর্ক ছিল ৷ পরে তিনি তাকে বিয়ে করার ইচ্ছা করেন এবং রসূলুল্লাহর (সা) কাছে অনুমতি চান ৷ দু'বার জিজ্ঞেস করার পরও তিনি নীরব থাকেন ৷ আবার তৃতীয়বার জিজ্ঞেস করেন, এবার তিনি জবাব দেনঃ

-----''হে মারসাদ! ব্যভিচারী এক ব্যভিচারিনী বা মুশরিক নারী ছাড়া আর কাউকে বিয়ে করবে না, কাজেই তাকে বিয়ে করো না ৷ ''

এ ছাড়াও হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা) ও হযরত আম্মার ইবনে ইয়াসির (রা) থেকেও বিভিন্ন হাদীস উদ্ধৃত হয়েছে ৷ সেগুলোতে বলা হয়েছে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ ''কোন দাইয়ুস (অর্থাৎ যে ব্যক্তি জানে তার স্ত্রী ব্যভীচারিনী এবং এরপরও সে তার স্বামী থাকে) জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবেনা ৷'' (আহমাদ, নাসাঈ, আবু দাউদ) প্রথম দুই খলীফা হযরত আবু বকর (রা) ও হযরত উমর (রা) উভয়ই এ ব্যাপারে যে পদ্ধতি অবলম্বন করেন তা ছিল এই যে, তাঁদের আমলে যে অবিবাহিত পুরুষ ও নারী যিনা অভিযোগে গ্রেফতার হতো তাদেরকে তাঁরা প্রথমে বেত্রাঘাতের শাস্তি দিতেন তারপর তাদেরকেই পরস্পরের সাথে বিয়ে দিয়ে দিতেন ৷ ইবনে উমর (রা) বর্ণনা করেন, একদিন এক ব্যক্তি বড়ই পেরেশান অবস্থায় হযরত আবু বকরের (রা) কাছে আসে৷ সে এমনভাবে কথা বলতে থাকে যেন তার মুখে কথা ভালভাবে ফুটছিল না ৷ হযরত আবু বকর (রা) হযরত উমরকে (রা) বলেন, ওকে অন্য জায়গায় নিয়ে গিয়ে একান্তে জিজ্ঞেস করুন ব্যাপারখানা কি? হযরত উমর (রা) জিজ্ঞেস করতে সে বলে, তাদের বাড়িতে মেহমান হিসেবে এক ব্যক্তি এসেছিল ৷ সে তার মেয়ের সাথে দৈহিক সম্পর্ক স্থাপন করে বসেছে ৷ হযরত উমর (রা) বলেনঃ-----''তোমার মন্দ হোক, তুমি নিজের মেয়ের আবরণ ঢেকে দিলে না?'' শেষ পর্যন্ত পুরুষটি ও মেয়েটির বিরুদ্ধে মামলা চলে৷ উভয়কে বেত্রাঘাতের শাস্তি দেয়া হয় ৷ তারপর উভয়কে পরস্পরের সাথে বিয়ে দিয়ে হযরত আবু বকর (রা) এক বছরের জন্য তাদেরকে দেশান্তর করেন ৷ এ ধরনেরই আরো কয়েকটি ঘটনা কাযী আবু বকর ইবনুল আরাবী তাঁর আহকামুল কুরআন গ্রন্থে উদ্ধৃত করেছেন (পৃষ্ঠা ৮৬, ২য় খন্ড )৷
৬. এ হুকুমটির উদ্দেশ্য হচ্ছে, সমাজে লোকদের গোপন প্রণয় ও অবৈধ সম্পর্কের আলোচনা সম্পূর্ণরুপে বন্ধ করে দেয়া ৷ কারণ এর মাধ্যমে অসংখ্য অসৎকাজ, অসৎবৃত্তি ও অসৎ প্রবণতার প্রসার ঘটে ৷ এর মধ্যে সবচেয়ে বড় অসৎবৃত্তিটি হলা, এভাবে সবার অলক্ষে একটি ব্যভিচারমূলক পরিবেশ তৈরী হয়ে যেতে থাকে ৷ একজন নিছক কৌতুকের বশে কারোর সত্য বা মিথ্যা কুৎসিত ঘটনাবলী অন্যের সামনে বর্ণনা করে বেড়ায়৷ অন্যেরা তাতে লবণ মরিচ মাখিয়ে লোকদের সামনে পরিবেশন করতে থাকে এবং এ সংগে আরো কিছু লোকের ব্যাপারেও নিজেদের বক্তব্য বা কুধারণা বর্ণনা করে৷ এভাবে কেবলমাত্র যৌন কামনা-বাসনার একটি ব্যাপক ধারাই প্রবাহিত হয় না বরং খারাপ প্রবণতার অধিকারী নারী-পুরুষরা জানতে পারে যে, সমাজের কোথায় কোথায় অবৈধ সুযোগ সুবিধা লাভ করতে পারবে ৷ শরীয়াত প্রথম পদক্ষেপেই এ জিনিসটির পথ রোধ করতে চায়৷ একদিকে সে হুকুম দেয়, যদি কেউ যিনা করে এবং সাক্ষী-সাবুদের মাধ্যমে তার যিনা প্রমাণিত হয় তাহলে তাকে এমন চরম শাস্তি দাও যা কোন অপরাধে দেয়া হয় না ৷ আবার অন্যদিকে সে ফায়সালা করে , যে ব্যক্তি অন্যের বিরুদ্ধে যিনার অভিযোগ আনে সে সাক্ষ-প্রমাণের মাধ্যমে নিজের অভিযোগ প্রমাণ করবে আর যদি প্রমাণ করতে না পারে তাহলে তাকে আশি ঘা বেত্রাঘাত করো, যাতে ভবিষ্যতে আর সে কখনো এ ধরনের কোন কথা বিনা প্রমাণে নিজের মুখ থেকে বের করার সাহস না করে৷ ধরে নেয়া যাক যদি অভিযোগকারী কাউকে নিজের চোখে ব্যভিচার করতে দেখে তাহলেও তার নীরব থাকা উচিত এবং অন্যদের কাছে একথা না বলা উচিত ফলে ময়লা যেখানে আছে সেখানেই পড়ে থাকবে এবং আশেপাশে ছড়িয়ে যেতে পারবেনা ৷তবে তার কাছে সাক্ষী থাকে তাহলে সমাজে আজেবাজে কথা ছড়াবার পরিবর্তে বিষয়টি শাসকদের কাছে নিয়ে যেতে হবে এবং আদালতে অভিযুক্তের অপরাধ প্রমাণ করে তাকে শাস্তি দেবার ব্যবস্থা করতে হবে ৷

এ আইনটি পুরোপুরি অনুধাবন করার জন্য এর বিস্তারিত বিষয়াবলী দৃষ্টি সমক্ষে থাকা উচিত ৷ তাই আমি নীচে এর বিস্তারিত বর্ণনা দিচ্ছিঃ

একঃ আয়াতে ---------- শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে৷ এর অর্থ হয় '' যেসব লোক অপবাদ দেয়৷'' কিন্তু পূর্বাপর আলোচনা বলে, এখানে অপবাদ মানে সব ধরনের অপবাদ নয় বরং বিশেষভাবে যিনার অপবাদ ৷ প্রথমে যিনার বিধান বর্ণনা করা হয়েছে এবং সামনের দিকে আসছে ''লি'আন''-এর বিধান ৷ এ দু'য়ের মাঝখানে এ বিধানটির আসা পরিষ্কার ইংগিত দিচ্ছি এখানে অপবাদ বলতে কোন ধরনের অপবাদ বুঝানো হয়েছে৷ তারপর----------(অপবাদ দেয় সতী মেয়েদেরকে ) থেকেও এ মর্মে ইংগিত পাওয়া যায় যে, এখানে এমন অপবাদের কথা বলা হয়েছে যা সতীত্ব বিরোধী৷ তাছাড়া অপবাদদাতাদের কাছে তাদের অপবাদের প্রমানস্বরূপ চারজন সাক্ষী আনার দাবী করা হয়েছে ৷ সমগ্র ইসলামী আইন ব্যবস্থায় একমাত্র যিনার সাক্ষদাতাদের জন্য চারজনের সংখ্যা রাখা হয়েছে৷ এসব প্রমাণের ভিত্তিতে সমগ্র উম্মতের আলেম সমাজের মতৈক্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে যে, এ আয়াতে শুধুমাত্র যিনার অপবাদের বিধান বর্ণনা করা হয়েছে ৷ এ জন্য উলামায়ে কেরাম স্বতন্ত্র পারিভাষিক শব্দ ''কাযাফ'' নির্ধারণ করে দিয়েছেন, যাতে অন্যান্য অপবাদসমূহ (যেমন কাউকে চোর , শরাবী, সূদখোর বা কাফের বলা) এ বিধানের আওতায় এসে না পড়ে৷ ''কাযাফ'' ছাড়া অন্য অপবাদসমূহের শাস্তি কাযী নিজেই নির্ধারণ করতে পারেন অথবা দেশের মজলিসে শূরা প্রয়োজন অনুযায়ী তাদের জন্য অপমান বা মানহানির কোন সাধারণ আইন তৈরী করতে পারেন ৷

দুইঃ আয়াতে -----(সতী নারীদেরকে অপবাদ দেয়) শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে৷ কিন্তু ফকীহগণ এ ব্যাপারে একমত যে, শুধুমাত্র নারীদেরকে অপবাদ দেয়া পর্যন্ত এ বিধানটি সীমাবদ্ধ নয় বরং নিষ্কলুষ চরিত্রের অধিকরী পুরুদেরকে অপবাদ দিলেও এ একই বিধান কার্যকর হবে ৷ এভাবে যদিও অপবাদদাতাদের জন্য -----(যারা অপবাদ দেয়) পুরুষ নির্দেশক শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে তবুও এ মাধ্যমে শুধুমাত্র পুরুষদেরকেই নির্দেশ করা হয়নি বরং মেয়েরাও যদি ''কাযাফ''-এর অপরাধ করে তাহলে তারাও এ একই বিধানের আওতায় শাস্তি পাবে ৷ কারণ অপরাধের ব্যাপারে অপবাদদাতা ও যাকে অপবাদ দেয়া হয় তাদের পুরুষ বা নারী হলে কোন পার্থক্য দেখা দেয় না৷ কাজেই আইনের আকৃতি হবে এ রকম- যে কোন পুরুষ ও নারী কোন নিষ্কলুষ চরিত্রের অধিকারী পুরুষ ও নারীর ওপর যিনার অপবাদ চাপিয়ে দেবে তার জন্য হবে এ আইন (উল্লখ্য, এখানে ''মুহসিন''ও ''মুহসিনা'' মানে বিবাহিত পুরুষ ও নারী নয় বরং নিষ্কুলুষ চরিত্র সম্পন্ন পুরুষ ও নারী৷

তিনঃ অপবাদদাতা যখন কোন নিষ্কলুষ চরিত্রের অধিকরী পুরুষ ও নারীর বিরুদ্ধে এ অপবাদ দেবে একমাত্র তখনই এ আইন প্রযোজ্য হবে ৷ কোন কলংকযুক্ত ও দাগী চরিত্র সম্পন্ন পুরুষ ও নারীর বিরুদ্ধে অপবাদ দিলে এটি প্রযুক্ত হতে পারে না ৷ দুশ্চরিত্র বলে পরিচিত ব্যক্তি যদি ব্যভিচারী হয়, তাহলে তার বিরুদ্ধে ''অপবাদ '' দেবার প্রশ্নই ওঠে না কিন্তু যদি সে এমন না হয় , তাহলে তার ওপর প্রমাণ ছাড়াই অপবাদদাতার জন্য কাযী নিজেই শাস্তি নির্ধারণ করতে পারেন অথবা এধরনের অবস্থার জন্য মজলিসে শূরা প্রয়োজন অনুযায়ী আইন প্রনয়ন করতে পারে৷

চারঃ কোন মিথ্যা অপবাদ (কাযাফ) দেয়ার কাজটি শাস্তিযোগ্য হবার জন্য শুধুমাত্র এতটুকুই যথেষ্ট নয় যে, একজন অন্য জনের ওপর কোন প্রমাণ ছাড়াই ব্যভিচার করার অপবাদ দিয়েছে৷ বরং এ জন্য কিছু শর্ত অপবাদদাতার মধ্যে, কিছু শর্ত যাকে অপবাদ দেয়া হচ্ছে তার মধ্যে এবং কিছু শর্ত স্বয়ং অপবাদ কর্মের মধ্যে থাকা অপরিহার্য৷

অপবাদদাতার মধ্যে যে শর্তগুলো থাকতে হবে সেগুলো হচ্ছেঃ প্রথমত তাকে প্রাপ্ত বয়স্ক হতে হবে৷ শিশু যদি অপবাদ দেবার অপরাধ করে তাহলে তাকে আইন –শৃংখলা বিধানমূলক (তা'যীর) শাস্তি দেয়া যেতে পারে৷ কিন্তু তার ওপর শরিয়াতী শাস্তি (হদ) জারি হতে পারে না ৷ দ্বিতীয়ত তাকে মানসিকভাবে সুস্থ হতে হবে ৷ পাগলের ওপর ''কাযাফের'' শাস্তি জারি হতে পারে না ৷ অনুরূপভাবে হারাম নেশা ছাড়া অন্য কোন ধরনের নেশাগ্রস্ত অবস্থায় যেমন ক্লোরোফরমের প্রভাবাধীন অপবাদদাতাকেও অপরাধী গণ্য করা যেতে পারে না৷ তৃতীয়ত সে নিজের স্বাধীন ইচ্ছায় (ফকীহগণের পরিভাষায় 'তায়েআন') এ কাজ করবে ৷ কারোর বল প্রয়োগে অপবাদদানকারীকে অপরাধী গণ্য করা যেতে পারে না ৷ চতুর্থত সে যাকে অপবাদ দেয়া হচ্ছে তার নিজের বাপ বা দাদা নয়৷ কারণ তাদের ওপর অপবাদের হদ জারি হতে পারে না ৷ এগুলো ছাড়া হানাফীদের মতে পঞ্চম আর একটি শর্তও আছে ৷ সেটি হচ্ছে, সে বাকশক্তি সম্পন্ন হবে, বোবা হবে না ৷ বোবা যদি ইশারা ইংগিতে অপবাদ দেয় তাহলে তার ফলে অপবাদের শাস্তি ওয়াজিব হয়ে যাবে না ৷ ইমাম শাফেঈ এ দ্ব্যর্থহীন হয় এবং তা দেখে সে কি বলতে চায় তা লোকেরা বুঝতে পারে, তাহলে তো সে অপবাদদাতা ৷ কারণ তার ইশারা এক ব্যক্তিকে লাঞ্চিত ও বদনাম করে দেবার ক্ষেত্রে কথার মাধ্যমে প্রকাশ করার তুলনায় কোন অংশে কম নয় ৷ পক্ষান্তরে হানাফীদের মতে এক ব্যক্তিকে ৮০ ঘা বেত্রাঘাতের শাস্তি দেয়া যেতে পারে ৷ তারা তাকে শুধুমাত্র দমনমূলক (তা'যীর) শাস্তি দেবার পক্ষপাতি ৷

যাকে ব্যভিচারের অপবাদ দেয়া হয় তার মধ্যেও নিম্নোক্ত শর্তগুলো পাওয়া যেতে হবে৷ প্রথমত তাকে বুদ্ধি সেচতেন হতে হবে৷ অর্থাৎ তার ওপর এমন অবস্থায় যিনা করার অপরাদ দেয়া হয় যখন সে বুদ্ধি সচেতন ছিল৷ পাগলে প্রতি (পরে সে বুদ্ধি সচেতন হয়ে গিয়ে থাক বা না থাক) যিনা করার অপবাদ দানকারী 'কাযাফ'-এর শাস্তিলাভের উপযুক্ত নয়৷ কারণ পাগল তার নিজের চারিত্রিক নিষ্কলুষতা সংরক্ষন করার ব্যবস্থা করতে পারে না৷ আর তার বিরুদ্ধে যিনা করার সাক্ষ প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেলেও সে যিনার শাস্তির উপযুক্ত হয় না এবং তার মর্যাদাও ক্ষুন্ন হয় না৷ কাজেই তার প্রতি অপবাদ দানকারীরো কাযাফের শাস্তিলাভের যোগ্য হওয়া উচিত নয়৷ কিন্তু ইমাম মালেক ও ইমাম লাইস ইবনে সা'দ বলেন, পাগলের পরিচিত ব্যভিচারের অপবাদদানকারী কাযাফের শাস্তিলাভের যোগ্য৷ কারণ সে একটি প্রমাণ বিহীন অপবাদ দিচ্ছে, এতে সন্দেহ নেই৷ দ্বিতীয় শর্ত হচ্ছে, তাকে প্রাপ্ত বয়স্ক হতে হবে৷ অর্থাৎ প্রাপ্ত বয়স্ক অবস্থায় তার ওপর যিনা করার অপবাদ দেয়া হয়৷ শিশুর বিরুদ্ধে অপবাদ দেয়া অথবা যুবকের বিরুদ্ধে এ মর্মে অপবাদ দেয়া যে, সে শৈশবে এ কাজ করেছিল, এ ধরনের অপবাদের ফলে 'কাযাফ'-এর শাস্তি ওয়াজিব হয় না৷ কারণ পাগলের মত শিশুও নিজের চারিত্রিক নিষ্কলুষতা সংরক্ষনের ব্যবস্থা করতে পারে না৷ ফলে কাযাফ-এর শাস্তি তার ওপর ওয়াজিব হয় না এবং তার মান-সম্মানও নষ্ট হয় না৷ কিন্ত ইমাম মালেক বলেন, যে ছেলে প্রাপ্ত বয়স্কের কাছাকাছি পৌছে গেছে তার বিরুদ্ধে যদি যিনা করার অপবাদ দেয়া হয় তাহলে তো অপবাদদানকারীর ওপর কাযাফ-এর শাস্তি ওয়াজিব হবে না কিন্ত যদি একই বয়সের মেয়ের ওপর যিনা করাবার অভিযোগ আনা হয় যার সাথে সহবাস করা সম্ভব, তাহলে তার প্রতি অবাদদানকারী কাযাফ-এর শাস্তিলাভের যোগ্য৷ কারণ এর ফলে কেবলমাত্র মেয়েরই নয় বরং তার পরিরবারেরও মর্যাদা ভুলুণ্ঠিত হয় এবং মেয়ের ভবিষ্যত অন্ধকার হয়ে যায়৷ তৃতীয় শর্ত হচ্ছে, তাকে মুসলাম হতে হবে৷ অর্থাৎ মুসলিম থাকা অবস্থায় তার বিরুদ্ধে যিনা করার অপবাদ দেয়া হয়৷ কাফেরের বিরুদ্ধে এ অপবাদ অথবা মুসলিমের বিরুদ্ধে এ অপবাদ যে, সে কাফের থাকা অবস্থায় এ কাজ করেছিল, তার জন্য কাযাফ-এর শাস্তি ওযাজিব করে দেয় না৷ চতুর্থ শর্ত হচ্ছে, তাকে স্বাধীন হতে হবে৷ বাঁদি বা গোলামের বিরুদ্ধে এ অপবাদ অথবা স্বাধীনের বিরুদ্ধে এ অপবাদ যে, সে গোলাম থাকা অবস্থায় এ কাজ করেছিল, তার জন্য কাযাফ-এর শাস্তি ওয়াজিব করে দেয় না৷ কারণ গোলামীর অসহায় ও দূর্বলতার দরুন তার পক্ষে নিজের চারিত্রিক নিষ্কলুষতার ব্যবস্থা করা সম্ভব নাও হতে পারে৷ স্বয়ং কুরআনই গলামীর অবস্থাকে 'ইহ্‌সান' তথা পূর্ণ বিবাহিত অবস্থা গণ্য করেনি৷ তার সূরা নিসায় শব্দটি বাঁদির প্রতিশব্দ হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে৷ কিন্তু দাউদ যাহেরী এ যুক্তি মানেন না৷ তিন বলেন, বাঁদি ও গোলামের বিরুদ্ধে মিথ্যা অপবাদদানকারীও কাযাফ-এর শাস্তিলাভের যোগ্য৷ পঞ্চম শর্ত হচ্ছে, তাকে নিষ্কলুষ চরিত্রের অধিকারী হতে হবে৷ অর্থাৎ তার জীবন যিনা ও যিনাসদৃশ চালচলন থেকে মুক্ত হবে৷ যিনা মুক্ত হবার অর্থ হচ্ছে, সে বাতিল বিবাহ, গোপন বিবাহ, সন্দেহযুক্ত মালিকানা বা বিবাহ সদৃশ যৌন সংগম করেনি৷ তার জীবন যাপন এমন ধরনের নয় যেখানে তার বিরুদ্ধে চিরত্রহীনতা ও নির্লজ্জ বেহায়াপনার অভিযোগ আনা যেতে পারে এবং যিনার চেয়ে কম পর্যায়ে চরিত্রহীনতার অভিযোগ তার প্রতি ইতিপর্বে কখনো প্রমাণিত হয়নি৷ কারণ এসব ক্ষেত্রেই তার চারিত্রিক নিষ্কলুষতা ক্ষুন্ন হয়ে যায় এবং ধরনের অনিশ্চিত নিষ্কলুষতার বিরুদ্ধে অভিযোগ উত্থাপনকারী ৮০ ঘা বেত্রাঘাতের শাস্তিলাভের যোগ্য হতে পারে না৷ এমন কি যদি ব্যভিচারের মিথ্যা অপবাদের (কাযাফ) শাস্তি জারি হবার আগে যার প্রতি অপবাদ দেয়া হয় তার বিরুদ্ধে কখনো কোন যিনার অপরাধের সাক্ষ প্রতিষ্ঠিত হয়ে গিয়ে থাকে তাহলেও মিথ্যা অপবাদ দানকারীকে ছেড়ে দেয়া হবে৷ কারণ যার প্রতি সে অপবাদ আরোপ করেছিল সে নিষ্কলুষ থাকেনি৷

কিন্তু এ পাঁচটি ক্ষেত্রে শরীয়াত নির্ধারিত শাস্তি (হদ্‌) জারি না হবার অর্থ এ নয় যে, পাগল, শিশু, কাফের, গোলাম বা অনিষ্কলুষ ব্যক্তির প্রতি প্রমাণ ছাড়াই যিনার অপবাদ আরোপকারী দমনমূলক (তা'যীর) শাস্তিলাভের যোগ্য হবে না৷

এবার স্বয়ং মিথ্যা অপবাদ কর্মের মধ্যে যেসব শর্ত পাওয়া যেতে হবে সেগুলোর আলোচনায় আসা যাক৷ একটি অভিযোগকে দু'টি জিনিসের মধ্য থেকে কোন একটি জিনিস মিথ্যা অপবাদে পরিণত করতে পারে৷ এক, অভিযোগকারী অভিযুক্তের ওপর এমন ধরনের নারী সংগমের অপবাদ দিয়েছে যা সাক্ষের মাধ্যমে প্রমাণিত হয়ে গেল অভিযুক্ত ব্যক্তির ওপর যিনার শাস্তি ওয়াজিব হবে যাবে৷ দুই অথবা সে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে জারজ সন্তান গণ্য করেছে৷ কিন্তু উভয় অবস্থায়ই এ অপবাদটি পরিষ্কার ও সুস্পষ্ট হতে হবে৷ ইশালা-ইংগিত গ্রহণযোগ্য নয়৷ এর সাহায্যে যিনা বা বংশের নিন্দার অর্থ গ্রহণ করা মিথ্যা অপবাদদাতার নিয়তের ওপর নির্ভরশীল হয়৷ যেমন কাউকে ফাসেক, পাপী, ব্যভিচারী বা দুশ্চরিত্র ইত্যাদি বলে দেয়া অথবা কোন মেয়েকে বেশ্যা, কস্‌বী বা ছিনাল বলা কিংবা কোন সৈয়দকে পাঠান বলে দেয়া – এসব ইশারা হয়৷ এগুলোর মাধ্যমে দ্ব্যর্থহীন মিথ্যা অপবাদ প্রমাণ হয় না৷ অনুরূপভাবে যেসব শব্দ নিছক গালাগালি হিসেবে ব্যবহার হয়, যেমন হারামি বা হারামজাদা ইত্যাদিকেও সুষ্ট মিথ্যা অপবাদ গণ্য করা যেতে পারে না৷ তবে 'তা'রীয' (নিজের প্রতি আপত্তিকর বক্তব্য অস্বীকৃতির মাধ্যমে অন্যকে খোঁটা দেয়া) এর ব্যাপারে ফকীহগণের মধ্যে এটাও অপবাদ কিনা এ ব্যাপারে মতবিরোধ আছে৷ যেমন কেউ অন্যকে সম্বোধন করে বলে, ''হাঁ, কিন্তু আমি তো আর যিনাকারী নই'' অথবা ''আমার মা তো আর যিনা করে আমাকে জন্ম দেয়নি৷'' ইমাম মালেক বলেন, এমন কোন ''তা'রীয'' ''কাযাফ'' বা যিনার মিথ্যা অপবাদ হিসেবে গণ হবে যা থেকে পরিষ্কার বুঝা যায়, প্রতিপক্ষকে যিনাকারী বা জারজ সন্তান গণ্য করাই বক্তার উদ্দেশ্য৷ এ অবস্থা ''হদ'' বা কাযাফ-এর শাস্তি ওয়াজিব হয়ে যায়৷ কিন্তু ইমাম আবু হানীফা, তাঁর সাথীগণ এবং ইমাম শাফেঈ, সুফিয়ান সওরী, ইবনে শুব্‌রুমাহ ও হাসান ইবনে সালেহ বলেন, ''তা'রীযে''র ক্ষেত্রে অবশ্যই সন্দেহের অবকাশ থাকে এবং সন্দেহ সহকারে কাযাফের শাস্তি জারি হতে পারে না৷ ইমাম আহমাদ ও ইসহাক ইবনে রাহ্‌ওয়াইহ্‌ বলেন, যদি ঝগড়া-বিবাদের মধ্যে ''তা'রীয়'' করা হয়, তাহলে তা হবে ব্যভিচারের মিথ্যা অপবাদ আর হাসি-ঠাট্টার মধ্যে করা হলে তা ব্যভিচারের মিথ্যা অপবাদ হবে না৷ খলীফাগণের মধ্যে হযরত উমর (রা) ,হযরত আলী (রা) তা'রীযের জন্য কাযাফ-এর শাস্তি দেন৷ হযর উমরের আমলে দু'জন লোকের মধ্য গালিগালাজ হয়৷ একজন অন্য জনকে বলে, ''আমার বাপও যিনাকারী ছিল না, আমার মাও যিনাকারিনী ছিল না৷'' মামলাটি হযরত উমরেরর দরবারে পেশ হয়৷ তিনি উপস্থিত লোকদেরকে জিজ্ঞেস করেন, আপনারা এ থেকে কি মনে করেন? কয়েকজন বলে, ''সে নিজের বাপ-মার প্রশংসা করেছে৷ দ্বিতীয় ব্যক্তির বাপ-মার প্রশংসা ওপর আক্রমণ করেনি৷'' ''আবার অন্য কয়েকজন বলে,'' তার নিজের বাপ-মা'র প্রশংসা করার জন্য কি শুধু এ শব্দগুলোই রয়ে গিয়েছিল এ বিশেষ শব্দগুলোকে এ সময় ব্যবহার করার পরিষ্কার অর্থ হচ্ছে, দ্বিতীয় ব্যক্তির বাপ-মা ব্যভিচারী ছিল৷'' হযরত উমর (রা) দ্বিতীয় দলটির সাথে একমত হন এবং 'হদ'´জারি করেন৷ (জাস্‌সাস, ৩য় খণ্ড, ৩৩০ পৃষ্ঠা) কারোর প্রতি সমকামিতার অপবাদ দেয়া ব্যভিচারের অপবাদ কিনা এ ব্যাপারেও মতবিরোধ রয়েছে ইমাম আবু ইউসু, ইমাম মুহাম্মাদ, ইমাম মালেক ও ইমাম শাফেঈ একে ব্যভিচারের অপবাদ গণ্য করেন এবং 'হদ' জারি করার হুকুম দেন৷

পাঁচঃ ব্যভিচারের মিথ্যা অপবাদ সরাসরি সরকারী হস্তক্ষেপযোগ্য অপরাধ (Cognizable Offence) কিনা এ ব্যাপারে ফকীহগণের মধ্যে মতবিরোধ রয়েছে৷ ইবনে আবী লাইলা বলেন, এটি হচ্ছে আল্লাহর হক৷ কাজেই যার বিরুদ্ধে মিথ্যা অপবাদ দেয়া হয়েছে সে দাবী করুক বা নাই করুক মিথ্যা অপবাদদাতার বিরুদ্ধে কাযাফ-এর শাস্তি জারি করা ওয়াজিব৷ কিন্তু তার বিরুদ্ধে মামলা চালানো, যার বিরুদ্ধে মিথ্যা অপবাদ দেয়া হয়েছে, তার দাবীর ওপর নির্ভর করে এবং এদিক দিয়ে এটি ব্যক্তির হক৷ ইমাম শাফেঈ ও ইমাম আওযাঈও এ একই মত পোষণ করেছেন৷ ইমাম মালেকের মতে যদি শাসকের সামনে মিথ্যা অপবাদ দেয়া হয় তাহলে তা হবে সরকারী হস্তক্ষেপযোগ্য অপরাধ অন্যথায় এর বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে যার বিরুদ্ধে অপবাদ দেয়া হয়েছে তার দাবীর ওপর নির্ভরশীল৷

ছয়ঃ ব্যভিচারের মিথ্যা অপবাদদেবার অপরাধ আপোসে মিটিয়ে ফেলার মতো অপরাধ (Compoundable Offence) নয়৷ অপবাদ আরোপিত ব্যাক্তির আদালতে মামলা দায়ের না করাটা ভিন্ন ব্যাপার কিন্তু আদালতে বিষয়টি উত্থাপিত হবার পর অপবাদ দানকারীকে তার অপবাদ প্রমাণ করতে বাধ্য করা হবে৷ আর প্রমাণ করতে না পারলে তার ওপর 'হদ' জারি করা হবে৷ আদলাত তাকে মাফ করতে পারে না, অপবাদ আরোপিত ব্যক্তিও পারে না এবং কোন প্রকার অর্থদণ্ড দিয়েও ব্যাপারটির নিষ্পত্তি করা যেতে পারে না৷ তাওবা করে মাফ চেয়েও সে শাস্তি থেকে রেহাই পেতে পারে না৷ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের এ উক্তি আগেই আলোচিত হয়েছেঃ

-----

''অপরাধকে আপোসে মিটিয়ে দাও কিন্তু যে অপরাধের নালিশ আমার কাছে চলে এসেছে, সেটা ওয়াজিব হয়ে গেছে৷

সাতঃ হানাফীদের মতে মিথ্যা অপবাদের শাস্তি দাবী করতে পারে অপবাদ আরোপিত ব্যক্তি নিজেই অথবা যখন দাবী করার জন্য অপবাদ আরোপিত ব্যক্তি নিজে উপস্থিত নেই এমন অবস্থায় আর বংশের মর্যাদাহানি হয় সেও দাবী করতে পারে৷ যেমন বাপ, মা ছেলেমেয়ে এবং ছেলেমেয়ের এ দাবী করতে পারে৷ কিন্তু ইমাম মালেক ও ইমাম শাফেঈর মতে এ অধিকার সূত্রে লাভযোগ্য৷ অপবাদ আরোপিত ব্যক্তি মারা গেলে তার প্রত্যেক শরয়ী উত্তরাধিকার হদ্‌ জারি করার দাবী জানাতে পারে৷ তবে আশ্চার্য ব্যাপার হচ্ছে, ইমাম শাফেঈ স্ত্রী ও স্বামীকে এর বাইরে গণ্য করছেন৷ এ ব্যাপারে তাঁর যুক্তি হচ্ছে, মৃত্যর সাথে সাথেই দাম্পত্য সম্পর্ক খতম হয়ে যায় এবং এ অবস্থায় স্বামী বা স্ত্রী কোন এক জনের বিরুদ্ধে অপবাদ দিলে অন্যের বংশের কোন মর্যাদাহানি হয় না৷ অথচ এ দু'টি যুক্তিই দুর্বল৷ কারণ শাস্তি দাবী করাকে উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত অধিকার বলে মেনে নেবার পর মৃত্যু স্বামী-স্ত্রীর মধ্যকার দাম্পত্য সম্পর্ক খতম করে দিয়েছে বলে স্বামী ও স্ত্রী এ অধিকারটি লাভ করবে না একথা বলা স্বয়ং কুরআনের বক্তব্য বিরোধী৷ কারণ কুরআন এক জনের মরে যাওযার পর অন্যজনকে উত্তাধিকারী গণ্য করেছে৷ আর স্বামী-স্ত্রীর মধ্য থেকে কোন একজনের বিরুদ্ধে অপবাদ দেয়া হলে অন্য জনের বংশের কোন মর্যাদাহানি হয় না একথাটি স্বামীর ব্যাপারে সঠিক হলেও হতে পারে কিন্তু স্ত্রীর ব্যাপারে একদম সঠিক নয়৷ কারণ যার স্ত্রীর বিরুদ্ধে অপবাদ দেয়া হয় তার সমস্ত সন্তান সন্তুতির বংশধারাও সন্দেহযুক্ত হয়ে যা৷ তাছাড়া শুধামাত্র বংশের মর্যাদাহানির কারণে ব্যভিচারের মিথ্যা অপবাদের শাস্তি ওয়াজিব গণ্য করা হয়েছে, এ চিন্তাও সঠিক নয়৷ বংশের সাথে সাথে মান-সম্মান-ইজ্জত-আবরুর বিরুদ্ধে প্রশ্ন উত্থাপিত হওয়াও এর একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ৷ সম্ভ্রান্ত পরিবারের একজন পুরুষ ও নারীর জন্য তার স্বামী বা স্ত্রীকে ব্যভিচারী বা ব্যভিচারিনী গণ্য করা কম মর্যাদাহানিকর নয়৷ কাজেই ব্যভিচারের মিথ্যা সাক্ষ দেবার দাবী যদি উত্তরাধিকারিত্বের সাথে সংশ্লিষ্ট হয়ে থাকে তাহলে স্বামী-স্ত্রীকে তা থেকে আলাদা করার কোন যুক্তিসংগত কারণ নেই৷

আটঃ কোন ব্যক্তি ব্যভিচারের মিথ্যা অপবাদ দিয়েছে একথা প্রমান হয়ে যাবার পর কেবলমাত্র নিম্নলিখিত জিনিসটিই তাকে শাস্তি থেকে বাঁচাতে পারে৷ তাকে এমন চারজন সাক্ষী আনতে হবে যারা আদালতে এ মর্মে সাক্ষ দেবে যে, তারা অপবাদ আরোপিত জনকে ওমুক পুরুষ বা মেয়ের সাথে কার্যত যিনা করতে দেখেছে৷ হানাফীয়াদের মতে এ চারজন সাক্ষীকে একই সংগে আদালতে আসতে হবে এবং একই সংগে তাদের সাক্ষ দিতে হবে৷ কারণ যদি তারা একের পর এক আসে তাহলে তাদের প্রত্যেক মিথ্যা অপবাদদাতা হয়ে যেতে থাকবে এবং তার জন্য আবার চারজন সাক্ষীর প্রয়োজন হয়ে পড়বে৷ কিন্তু এটি একটি দূর্বল কথা৷ ইমাম শাফেঈ ও উসমানুল বাত্তি এ ব্যাপারে যে কথা বলেছেন সেটিই সঠিক৷ তারা বলেছেন, সাক্ষীদের একসংগে বা একের পর এক আসার মধ্যে কোন পার্থক্য দেখা যায় না৷ বরং বেশী ভাল হয় যদি অন্যান্য মামালার মতো এ মামলায়্ সাক্ষিরা একের পর এক আসে এবং সাক্ষ দেয়৷ হানাফীয়াদের মতে এ সাক্ষীদের ''আদেল'' তথ্য ন্যায়নিষ্ঠ হওয়া জরুরী নয়৷ যদি অপবাদদাতা চারজন ফাসেক সাক্ষীও আনে তাহলে সে মিথ্যা অপবাদের শাইত থেকে রেহাই পাবে এবং অপবাদ আরোপিত ব্যক্তিও যিনার শাস্তি থেকে রেহাই পেয়ে যাবে৷ কারণ সাক্ষী ''আদেল'' নয়৷ তবে কাফের, অন্ধ্, গোলাম বা মিথ্যা অপবাদের অপরাধে পূর্বাহ্নে শাস্তিপ্রাপ্ত সাক্ষী পেশ করে অপবাদদাতা শাস্তি থেকে নিষ্কৃতি পেতে পারে না৷ কিন্তু ইমাম শাফেঈ বলেন, অপবাদদাতা যদি ফাসেক সাক্ষী পেশ করে, তাহলে সে এবং তার সাক্ষী সবাই শরীয়াতারে শাস্তির যোগ্য হবে৷ ইমাম মালেকও একই রায় পেশ করেন৷ এ ব্যাপারে হানাফীয়াদের অভিমতই নির্ভুলতার বেশী নিকটবর্তী বলে মনে হয়৷ সাক্ষী যদি ''আদেল'' (ন্যায়নিষ্ঠ) হয় অপবাদদাতা অপবাদের অপরাধ মুক্ত হয়ে যাবে এবং অপবাদ আরোপিত ব্যক্তির বিরুদ্ধে যিনার অপরাধ প্রমাণিত হবে৷ কিন্তু সাক্ষী যদি ''আদেল'' না হয়, তাহলে অপবাদদাতার অপবাদ, অপবাদ আরোপিত ব্যক্তির যিনা ও সাক্ষীদের সত্যবাদিতা ও মিথ্যাচার সবাই সন্দেহযুক্ত হয়ে যাবে এবং সন্দেহের ভিত্তিতে কাউকেও শরীয়াতের শাস্তির উপযুক্ত গণ্য করা যেতে পারবে না৷

নয়ঃ যে ব্যক্তি এমন সাক্ষ পেশ করতে সক্ষম হবে না, যা তাকে অপবাদের অপরাধ থেকে মুক্ত করতে পারে তার ব্যাপারে কুরআন তিনটি নির্দেশ দেয়ঃ এক, তাকে ৮০ ঘা বেত্রাঘাত করতে হবে৷ দুই, তার সাক্ষ কখনো গৃহীত হবে না৷ তিন, সে ফাসেক হিসেবে চিহ্নিত হবে৷ অতপর কুরআন বলছেঃ

-----

''তারা ছাড়া যারা এরপর তাওবা করে ও সংশোধন করে নেয়, কেননা, আল্লাহ ক্ষমাশীল ও করুণাময়৷'' (আন নূর-৫)

এখানে প্রশ্ন দেখা দেয়, এখানে তাওবা ও সংশোধরনের মাধ্যমে যে ক্ষমতার কথা বলা হয়েছে তার সম্পর্ক ঐ তিনটি নির্দেশের মধ্য থেকে কোন্‌টির সাথে আছে? প্রথম হুকুমটির সাথে এর সম্পর্ক নেই, এ ব্যাপারে ফকীহগণ একমত৷ অর্থাৎ তাওবার মাধ্যেম ''হদ'' তথা শরীয়াতের শাস্তি বাতিল হয়ে যাবে না এবং যে কোন অবস্থায়ই অপরাধীকে বেত্রাঘাতের শাস্তি দেয়া হবে৷ শেষ হুকুমটির সাথে ক্ষমার সম্পর্ক আছে, এ ব্যাপারেও সকল ফকীহ একমত৷ অর্থাৎ তাওবা করার ও সংশোধিত হবার পর অপরাধী ফাসেক থাকবে না৷ আল্লাহ তাকে মাফ করে দেবেন৷ (এ ব্যপারে অপরাধী শুধুমাত্র মিথ্যা অপবাদ দেবার কারণেই ফাসেক হয়, না আদালতের ফায়সালা ঘোষিত হবার পর ফাসেক হিসেবে গণ্য হয়, সে ব্যাপার মতবিরোধ ফাসেক হয়৷ এ কারণে তাঁরা সে সময় থেকেই তাকে প্রত্যাখ্যাত সাক্ষী গণ্য করেন৷ বিপরীতপক্ষে ইমাম আবু হানীফা, তাঁর সহযোগীগণ ইমাম মালেক বলেন, আদালতের ফায়সালা জারি হবার পর সে ফাসেক হয়৷ তাই তাঁরা হুকুম জারি হবার পূব পর্যন্ত তাকে গ্রহণযোগ্য সাক্ষী মনে করেন৷ কিন্তু প্রকৃত সত্য হচ্ছে, অপরাধীর আল্লাহর কাছে ফাসেক হওয়ার ব্যাপারটি মিথ্যা অপবাদ দেবার ফল এবং তার মানুষের কাছে ফাসেক হওয়ার বিষয়টি আদালতে তার অপরাধ প্রমাণিত হওয়া এবং তার শাস্তি পাওয়ার ওপর নির্ভর করে৷) এখন থেকে যায় মাঝখানের হুকমটি অর্থা ''মিথ্যা অপবাদদাতার সাক্ষ কখনো গ্রহণ করা হবে না৷'' ----- বাক্যাংশটির সম্পর্ক এ হুকুমটির সাথে আছে কিনা এ ব্যাপারে ফকীহগণের অভিমত ব্যাপকভাবে বিভক্ত হয়ে গেছে৷ একদল বলেন, কেবলমাত্র শেষ হুকুমটির সাথে এ বাক্যাংশটির সম্পর্ক আছে৷ অর্থাৎ যে ব্যক্তি তাওবা ও সংশোধন করে নেবে সে আল্লাহর সমীপে এবং মানুষের কাছেও ফাসেক থাকবে না৷ কিন্তু এ সত্ত্বে প্রথম দু'টি হকুম অপরিবর্তিত থাকবে৷ অর্থাৎ অপরাধীর বিরুদ্ধে শরীয়াতের শাস্তি জারি করা হবে এবং তার সাক্ষও চিরকাল প্রত্যাখ্যাত থাকবে৷ এ দলের রয়েছেন কাযী শুরাইহ, সাঈদ ইবনে মুসাইয়েব, সাঈদ ইবনে জুবাইর, হাসাব বসরী, ইবরাহীম নাখঈ', ইবনে সিরীন, মাকহুল, আবদুর রহমান ইবনে যায়েদ, আবু হানীফা, আবু ইউসুফ, যুফার, মুহাম্মাদ, সুফ্‌ইয়ান সওরী ও হাসান ইবনে সালেহর মতো শীর্ষ স্থানীয় ফকীহগণ৷ দ্বিতীয় দলটি বলেন, ---------- এর সম্পর্ক প্রথম হুকমটির সাথে তো নেই-ই তবে শেষের দু'টো হকুমের সাথে আছে অর্থাৎ তাওবার পর মিথ্যা অপবাদে শাস্তিপ্রাপ্ত অপরাধীর সাক্ষও গ্রহণ করার হবে এবং সে ফাসেক হিসেবেও গণ্য হবে না৷ এ দলে রয়েছেন আতা, তাউস, মুজাহিদ, শা'বী, কাসেম ইবনে মুহাম্মাদ,সালেম, যুহরী, ইকরামাহ, উমর ইবনুল আযীয, ইবনে আবী নুজাইহ, সুলাইমান ইবনে ইয়াসার, মাসরূক, দ্বাহ্‌হাক, মালেক ইবনে আনাস, উসমান আলবাত্তী, লাইস ইবনে সা'দ, শাফেঈ, আহমাদ ইবনে হাম্বল ও ইবনে জারীর তাবারীর মতো শ্রেষ্ঠ ফকীহবৃন্দ৷ এরা নিজেদের মতের সমর্থনে অন্যান্য যুক্তি-প্রমানের সাথে সাথে হযরত উমর রাদিয়াল্লাহ আনহু মুগীরাহ ইবনে শু'বার মামলায় যে ফায়সালা দিয়েছিলেন সেটিও পেশ করে থাকেন৷ কারণ তার কোন কোন বর্ণনায় একথা বলা হয়েছে যে, 'হদ' জারি করার পর হরত উমর (রা) আবু বাক্‌রাহ নিজের কথায় অনঢ় থাকেন৷ বাহ্যত এটি একটি বড় শক্তিশালী সমর্থন মনে হয়৷ কিন্তু মুগীরাহ ইবনে শু'বার মামলার যে বিস্তারিত বিবরণী আমি পূবেই পেশ করেছি সে সম্পর্কে চিন্তা করলে পরিষ্কার প্রকাশ হয়ে যাবে যে, এ নজিরের ভিত্তিতে এ বিষয়ে যুক্তি প্রদশর্ন করা সঠিক নয়৷ সেখানে মূল কাজটি ছিল সর্ববাদী সম্মত এবং স্বয়ং মুগীরাহ ইবনে শু'বাও এই অস্বীকার করেননি৷ মেয়েটি কে ছিল, এ নিয়ে ছিল বিরোধ৷ মুগীরাহ (রা) বলছিলেন, তিনি ছিলেন তাঁর স্ত্রী, যাকে এরা উম্মে জামীল মনে করেছিলেন ৷ এ সংগে একথাও প্রমাণিত হয়ে গিয়েছিল যে, হযরত মুগীরার স্ত্রীও উম্মে জামীলের চেহারায় এতটা সাদৃশ্য ছিল যে, ঘটনাটি যে পরিমাণ আলোয় যতটা দূর থেকে দেখা গেছে তাতে মেয়েটিকে উম্মে জামীল মনে করার মতো ভুল ধারণা হওয়ার সম্ভানা ছিল৷ কিন্তু আন্দাজ-অনুমান সবকিছু ছিল মুগীরাহ পক্ষে এবং বাদীপক্ষের একজন সাক্ষী একথা স্বীকার করেছিলেন যে, মেয়েটিকে পরিষ্কার দেখা যাচ্ছিল না৷ এ কারণে হযরত উমর (রা) মুহগীরাহ ইবনে শু'বার পক্ষে রায় দেন এবং ওপরে উল্লেখিত হাদীসে যে কথাগুলো উদ্ধৃত হয়েছে আবু বাক্‌রাহকে শাস্তি দেবার পর সেগুলো বলেন৷ এসব অবস্থা পর্যালোচনা করলে পরিষ্কার বোঝা যায়, হযরত ওমরের উদ্দেশ্য ছিল আসলে একথা বুঝানো যে, তোমরা অযথা একটি কুধারণা পোষণ করেছিলে, একথা মেনে নাও এবং ভবিষ্যতে আর কখনো এ ধরনের কুধারণার ভিত্তিতে লোকদের বিরুদ্ধে অপবাদ না দেবার ওয়াদা কর৷ অন্যথায় ভবিষ্যতে তোমাদের সাক্ষ কখনো গৃহীত হবে না৷ এ থেকে এ সিদ্ধান্ত টানা যেতে পারে না যে, সুস্পষ্ট মিথ্যাবাদী প্রমাণিত ব্যক্তিগন যদি তাওবা করে তাহলে এরপর হযরত উমরের মতে তার সাক্ষ গ্রহণযোগ্য হতে পারতো৷ আসলে এ বিষয়ে প্রথম দলটির মতই বেশী শক্তিশালি মনে হয়৷ মানুষের তাওবার অবস্থা আল্লাহ ছাড়া আর কারো পক্ষে জানা সম্ভব নয় ৷ আমাদের সামনে যে ব্যক্তি তাওবা করবে আমরা তাকেব বড় জোর ফাসেক বলবো না৷ এতটুকু সুবিধা তাকে আমরা দিতে পারি৷ কিন্তু যার মুখের কথা ওপর আস্থা একবার খতম হয়ে গেছে সে কেবলমাত্র আমাদের সামনে তাওবা করছে বলে তার মুখের কথাকে আবার দাম দিতে থাকবো, এত বেশী সুবিধা তাকে দেয়া যেতে পারে না৷ এ ছাড়া কুরআনের আয়াতের বর্ণনাভংগীও একথাই বলছে------ (তবে যারা তাওবা করেছে) এর সম্পর্ক শুধুমাত্র (তারাই ফাসেক এর সাথেই রয়েছে৷ তাই এ বাক্যের মধ্যে প্রথম দু'টি কথা বলা হয়েছে কেবলমাত্র নির্দেশমূলক শব্দের মাধ্যমে৷ অর্থাৎ ''তাদেরকে আশি ঘা বেত্রাঘাত করো৷'', '' এবং তাদের সাক্ষ কখনো গ্রহণ করো না৷'' আর তৃতীয় কথাটি বলা হয়েছ খবর পরিবেশন করার ভংগীতে ছাড়া যারা তাওবা করে নিয়েছে'' একথা বলা প্রকাশ করে দেয় যে এ ব্যতিক্রমের ব্যাপারটি শেষের খবর পরিবেশন সংক্রান্ত বাক্যাংশটির সাথে সম্পর্কিত৷ পূর্বের দু'টি নির্দেশমূলক বাক্যাংশের সাথে এর সম্পর্ক নেই৷ তবুও যদি একথা মেনে নেয়া হয় যে, এ ব্যতিক্রমের ব্যাপারটি শেষ বাক্যাংশ পর্যন্ত সীমাবদ্ধ নয়, তাহলে এরপর বুঝে আসে না তা ''সাক্ষ গ্রহণ করো না'' বাক্যাংশ পর্যন্ত এসে থেমে গেল কেন, ''আশি ঘা বেত্রাঘাত করো'' বাক্যাংশ পর্যন্ত পৌছে গেল না কেন ?

দশঃ প্রশ্ন করা যেতে পারে, ----- এর মাধ্যমে ব্যতিক্রম করাটাকে প্রথম হুকুমটির সাথে সম্পর্কত বলে মেনে নেয়া যায় না কেন? মিথ্যা অপবাদ তো আসলে এক ধরনের মানহানিই৷ এরপর এর ব্যক্তি নিজের দোষ মেনে নিয়েছে, অপবাদ আরোপিত ব্যক্তির কাছ থেকে ক্ষমা চেয়ে নিয়েছে এবং ভবিষ্যতের এ ধরনের কাজ করবে না বলে তাওবা করেছে৷ তাহলে তাকে ছেড়ে দেয়া হবে না কেন? অথচ আল্লাহ নিজেই হুকুম বর্ণনা করার পর বলছেন, ----- আল্লাহ মাফ করে দেবেন কিন্তু বান্দা মাফ করবে না, এটাতো সত্যই বড় অদ্ভুত ব্যাপার হবে৷ এর জবার হচ্ছেঃ তাওবা আসলে ----- সমন্বিত চার অক্ষরের একটি শব্দ মাত্র নয়৷ বরং হৃদয়ের লজ্জানুভূতি, সংশোধনের দৃঢ়সংকল্প ও সততার দিকে ফিরে যাওয়ার নাম৷ এর এ জিনিসটির অবস্থা আর কারোর পক্ষে জানা সম্ভব নয়৷ তাই তাওবার কারণে পার্থিব শাস্তি মাফ হয় না৷ বরং শুধুমাত্র পরকালীন শাস্তি মাফ হয়৷ এ কারণে আল্লাহ বলেননি, যদি তারা তাওবা করে নেয় তাহলে তোমরা তাদেরকে ছেড়ে দাও বরং বলেছেন, যারা তাওবা করে নেবে আমি তাদের জন্য ক্ষমাশীল ও করুনাময়৷ যদি তাওবার সাহায্যে পার্থিব শাস্তি মাফ হয়ে যেতে থাকে, তাহলে শাস্তি থেকে বাঁচার জন্য তাওবা কবরে কিনা এমন অপরাধী কে আছে?

এগারঃ এ প্রশ্নও করা যেতে পারে, এক ব্যক্তির নিজের অভিযোগের স্বপক্ষে সাক্ষী পেশ করতে না পারার মানতে এ নয় যে, সে মিথ্যুক৷ এটা কি সম্ভব নয় যে, তার অভিযোগ যথার্থই সঠিক কিন্তু সে এর স্বপক্ষে প্রমাণ সংগ্রহ করতে পারেনি? তাহলে শুধুমাত্র প্রমাণ পেশ করতে না পারার কারণে তাকে কেবল মানুষের সামনেই নয়, আল্লাহর সামনেও ফাসেক গণ্য করা হবে, এর কারণ কি? এর জবাব হচ্ছে, এক ব্যক্তি নিজের চোখেও যদি কাউকে ব্যভিচার করতে দেখে তাহলেও সে তা নিয়ে আলোচনা করলে এবং সাক্ষী ছাড়া তার বিরুদ্ধে অপবাদ আরোপ করতে থাকলে গোনাহগার হবে৷ এক ব্যক্তি যদি কোন ময়লা আবর্জনা নিয়ে এক কোণে বসে থাকলে তাহলে অন্য ব্যক্তি উঠে সমগ্রসমাজ দেহে তা ছড়িয়ে বেড়াক আল্লাহর শরীয়াত এটা চায় না৷ সে যদি এ ময়লা –আবর্জনার খবর জেনে থাকে তাহলে তার জন্য দু'টি পথ থাকে ৷ যেখানে তা পড়ে আছে সেখানে তাকে পড়ে থাকতে দেবে অথবা তার উপস্থিতির প্রমাণ পেশ করবে, যাতে ইসলামী রাষ্ট্রের শাসগণতা পরিষ্কার করে ফেলতে পারেন৷ এ দু'টি পথ ছাড়া তৃতীয় কোন পথ তার জন্য নেই৷ যদি সে জনগণের মধ্যে এর আলোচনা শুরু করে দেয় তাহলে এক জায়গায় আটকে থাকা আবর্জনাকে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে দেবার অপরাধে অভিযুক্ত হবে৷ আর যদি সে যথেষ্ট পরিমাণ সাক্ষ ছাড়াই বিষয়টি প্রশাসনিক কর্মকর্তাদদের কাছে নিয়ে যায় তাহলে শাসকগণ তা পরিষ্কার করতে পারবেন না৷ ফলে এ মামলায় ব্যর্থতা আবর্জনা ছড়িয়ে পড়ার কারণও হবে এবং ব্যভিচারীদের বাস্তবে যতই সত্যবাদী হোক না কেন সে একজন ফাসেকই ৷

বারঃ মিথ্যা অপবাদের 'হদে'র ব্যাপারে হানাফী ফকীহগনের অভিমত হচ্ছে অপবাদদাতাকে যিনাকারীর তুলনায় হাল্‌কা মার মারতে হবে৷ অর্থাৎ ৮০ ঘা বেতই মারা হবে কিন্ত যিনাকারীকে যেমন কঠোরভাবে প্রহার করা হয় তাকে ঠিক ততটা কঠোরভাবে প্রহার করা হবে না৷ কারণ যে অভিযোগের দরুন তাকে শাস্তি দেয়া হচ্ছে সে ব্যাপারে তার মিথ্যাবাদী হওয়াটা পুরোপুরি নিশ্চিত নয়৷

তেরঃ মিথ্যা অপবাদের পুনরাবৃত্তির ব্যাপারে হানাফী ও অধিকাংশ ফকীহের অভিমত হচ্ছে এ যে, অপবাদদাতা শাস্তির পাবার আগে বা মাঝখানে যতবারই এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে অপবাদ আরোপ করুক না কেন 'হদ' তার ওপর একবারই জরি হবে৷ আর যদি হদ জারি করার পর সে নিজের পূর্ববর্তী অপরাধেরই পুনরাবৃত্তি করতে থাকে তাহলে যে 'হদ' তার বিরুদ্ধে জ
৭. এ আয়াত পেছনের আয়াতের কিছুকাল পরে নাযিল হয়৷ মিথ্যা অপবাদের বিধান যখন নাযিল হয় তখন লোকদের মধ্যে প্রশ্ন দেখা দেয়, ভিন পুরুষ ও নারীর চরিত্রহীনতা দেখে তো মানুষ সবর করতে পারে, সাক্ষী না থাকলে ঠোঁটে তালা লাগাতে পারে এবং ঘটনাটি উপেক্ষা করতে পারে৷ কিন্তু নিজের স্ত্রীর চরিত্রহীনতা দেখলে কি করবে? হত্যা করলে তো উল্টো শাস্তিলাভের যোগ্য হয়ে যাবে৷ সাক্ষী খুঁজতে গেলে তাদের আসা পর্যন্ত অপরাধী সেখানে অপেক্ষা করতে যাবে কেন আর সবর করলে তা করবেই বা কেমন করে৷ তালাক দিয়ে স্ত্রীকে বিদায় করে দিতে পারে৷ কিন্তু এর ফলে না মেয়েটির কোন বস্তুগত বা নৈতিক শাস্তি হলো , না তার প্রেমিকের৷ আর যদি তার অবৈধ গর্ভসঞ্চার হয়, তাহলে অন্যের সন্তান নিজের গলায় ঝুলালো৷ এ প্রশ্নটি প্রথমে হযরত সা'দ ইবনে উবাদাহ একটি কাল্পনিক প্রশ্নের আকারে পেশ করেন৷ তিন এতদূর বলে দেন, আমি যদি আল্লাহ না করুন নিজের ঘরে এ অবস্থা দেখি,তাহলে সাক্ষীর সন্ধানে যাবো না বরং তলোয়ারের মাধ্যমে তখনই এর হেস্তনেস্ত করে ফেলবো ৷(বুখারী ও মুসলিম) কিন্তু মাত্র কিছুদিন পরেই এমন কিছু মামলা দায়ের হলো যেখানে স্বামীরা স্বচক্ষেই এ ব্যাপার দেখলো এবং নবী সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে এর অভিযোগ নিয়ে গেলো৷ আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ ও ইবনে উমরের রেওয়ায়াত অনুযায়ী আনসারদের এক ব্যক্তি (সম্ভবত উওয়াইমির আজ্‌লানী) রসূলের সামনে হাযির হয়ে বলেন, হে আল্লাহর রসূল! যদি এক ব্যক্তি নিজের স্ত্রীর সাথে পরপুরুষকে পায় এবং সে মুখ থেকে সে কথা বের করে ফেলে, তাহলে আপনি তার বিরুদ্ধে মিথ্যা অপবাদের ''হদ'' জারি করবেন, হত্যা করলে আপনি তাকে হত্যা করবেন, নীরব থাকলে সে চাপা ক্রোধে ফুঁসতো থাকবে৷ শেষমেশ সে করবে কি? একথায় রসূলুল্লাহ (সা) দোয়া করেনঃ হে আল্লাহ! এ বিষয়টির ফায়সালা করে দাও৷ (মুসলিম, বুখারী, আবু দাউদ, আহমাদ ও নাসাঈ) ইবনে আব্বাস বর্ণনা করেন, হেলাল ইবনে উমাইয়াহ এসে নিজের স্ত্রীর ব্যাপারটি পেশ করেন৷ তিনি তাকে নিজের চোখে ব্যভিচারে লিপ্ত থাকতে দেখেছিলেন৷ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, ''প্রমাণ আনো, অন্যথায় তোমার বিরুদ্ধে মিথ্যা অপবাদের শাস্তি জারি হবে৷' এতে সাহাবীদের মধ্যে সাধারণভাবে পেরেশানী সৃষ্টি হয়ে যায় এবং হেলাল বলেন, সেই আল্লাহর কসম যিনি আপনাকে নবী বানিয়ে পাঠিয়েছেন, আমি একদম সঠিক ঘটনাই তুলো ধরছি, আমার চোখ এ ঘটনা প্রত্যক্ষ করেছে এবং কান শুনেছে৷ আমি বিশ্বাস করি আল্লাহ আমার ব্যাপারে এমন হুকুম নাযিল করবেন যা আমার পিঠ বাঁচাবে৷ এ ঘটনায় এ আয়াত নাযিল হয়৷ (বুখারী, আহমাদ ও আবুদ দাউদ) এখানে মীমাংসার যে পদ্ধতি দেয়া হয়েছে তাকে ইসলাম আইনের পরিভাষায় ''লি'আন'' বলা হয়৷

এ হুকুম এসে যাবার পর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যেসব মামলার ফায়সালা দেন সেগুলোর বিস্তারিত বিবরণ হাদীসের কিতাবগুলোতে লিখিত আকারে সংরক্ষিত রয়েছে এবং সেগুলোই লি'আন সংক্রান্ত বিস্তারিত আইনগত কার্যধারার উৎস৷

হেলাল ইবনে উমাইয়ার মামলার যে বিস্তারিত বিবরণ সিহাহে সিত্তা ও মুসনাদে আহমাদ এবং তাফসীরে ইবনে জারিরে ইবনে আব্বাস ও আনাস ইবনে মালেক রাদিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে বর্ণিত হয়েছে তাতে বলা হয়েছেঃ এ আয়াত নাযিল হবার পর হেলাল ও তার স্ত্রী দু'জনকে নবীর আদালতে হাযির করা হয়৷ রসূলুল্লাহ (সা) প্রথমে আল্লাহর হুকুম শুনান ৷ তারপর বলেন, ''খুব ভালভাবে বুঝে নাও, আখেরাতের শাস্তি দুনিয়ার শাস্তির চাইতে কঠিন৷'' হেলাল বলেন, ''আমি এ বিরুদ্ধে একদম সত্য অভিযোগ দিয়েছি৷'' স্ত্রী বলে, ''এ সম্পূর্ণ মিথ্যা৷'' রসূলুল্লাহ (সা) বলেন, ''বেশ, তাহলে এদের দু'জনের মধ্যে লি'আন করানো হোক ৷'' তদনুসারে প্রথমে হেলাল উঠে দাঁড়ায় ৷ তিনি কুরআনী নির্দেশ অনুযায়ী কসম খাওয়া শুরু করেন ৷ এ সময় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বারবার বলতে থাকেন, ''আল্লাহ জানেন তোমাদের মধ্যে অবশ্যই একজন মিথ্যেবাদী ৷ তারপর কি তোমাদের মধ্য থেকে কেউ তাওবা করবে ? '' পঞ্চম কসমের পূর্বে উপস্থিত লোকেরা হেলালকে বললো, ''আল্লাহকে ভয় করো৷ দুনিয়ার শাস্তি পরকালের শাস্তির চেয়ে হালকা ৷ এ পঞ্চম কসম তোমার ওপর শাস্তি ওয়াজিব করে দেবে ৷'' কিন্তু হেলাল বলেন, যে আল্লাহ এখানে আমার পিঠ বাঁচিয়েছেন তিনি পরকালেও আমাকে শাস্তি দেবেন না ৷ একথা বলে তিনি পঞ্চম কসমও খান৷ তারপর তার স্ত্রী ওঠে ৷ সেও কসম খেতে শুরু করে৷ পঞ্চম কসমের পূর্বে তাকেও থামিয়ে বলা হয়, ''আল্লাহকে ভয় করো, আখেরাতের আযাবের তুলনায় দুনিয়ার আযাব বরদাশত করে নেয়া সহজ ৷ এ শেষ কসমটি তোমার ওপর আল্লাহর আযাব ওয়াজিব করে দেবে ৷'' একথা শুনে সে কিছুক্ষণ থেমে যায় এবং ইতস্তত করতে থাকে ৷ লোকেরা মনে করে নিজের অপরাধ স্বীকার করতে চাচ্ছে ৷ কিন্তু তারপর সে বলতে থাকে৷ '' আমি চিরকালের জন্য নিজের গোত্রকে লাঞ্জিত করবো না ৷'' তারপর সে পঞ্চম কসমটি ও খায়৷ অতপর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদের উভয়ের মধ্যে ছাড়াছাড়ি করে দেন এবং ফায়সালা দেন, এর সন্তান ( যে তখন মাতৃগর্ভে ছিল) মায়ের সাথে সম্পর্কিত হবে ৷ বাপের সাথে সম্পর্কিত করে তার নাম ডাকা হবে না ৷তার বা তার সন্তানের প্রতি অপবাদ দেবার অধিকার করোর থাকবে না ৷ যে ব্যক্তি তার বা তার সন্তানের প্রতি অপবাদ দেবে সে মিথ্যা অপবাদের (কাযাফ) শাস্তির অধিকারী হবে ৷ ইদ্দতকালে তার খোরপোশ ও বাসস্থানলাভের কোন অধিকার হেলালের ওপর বর্তায় না৷ কারণ তাকে তালাক বা মৃত্যু ছাড়াই স্বামী থেকে আলাদা করা হচ্ছে ৷ তারপর তিনি লোকদের বলেন, তার সন্তান ভূমিষ্ঠ হবার পর দেখো সে কার মতো হয়েছে ৷ যদি এ আকৃতির হয় তাহলে হেলালের হবে ৷ আর যদি ঐ আকৃতির হয়, তাহলে যে ব্যক্তির সাথে মিলিয়ে একে অপবাদ দেয়া হয়েছে এ তার হবে ৷ শিশু ভূমিষ্ঠ হবার পর দেখা গেলো সে শেষোক্ত ব্যক্তির আকৃতি পেয়েছে ৷ এ অবস্থায় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,------------ অর্থাৎ যদি কসমসমূহ না হতো (অথবা আল্লাহর কিতাব প্রথমেই ফায়সালা না করে দিতো ) তাহলে আমি এ মেয়েটির সাথে কঠোর ব্যবহার করতাম ৷

'উওয়াইমির আজলানীর মামলার বিবরণ পাওয়া যায় বুখারী, মুসলিম, আবু দাউদ, নাসাঈ, ইবনে মাজাহ ও মুসনাদে আহমাদ ৷ সাহল ইবনে সা'দ সা'ঈদী ও ইবনে উমর রাদিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে এগুলো বর্ণিত হয়েছে ৷ এতে বলা হয়েছেঃ উওয়াইমির ও তার স্ত্রী উভয়কে মসজিদে নববীতে ডাকা হয়৷ তারা নিজেদের ওপর 'লি'আন' করার আগে রসূলুল্লাহ (সা) তাদেরকেও সতর্ক করে দিয়ে তিনবার বলেন, ‍‍‍‍''আল্লাহ খুব ভালভাবেই জানেন তোমাদের একজন অবশ্যই মিথ্যাবাদী ৷ তাহলে কি তোমাদের কেউ তাওবা করবে ?'' দু'জনের কেউ যখন তাওবা করলো না তখন তাদের 'লি'আন' করানো হয়৷ এরপর ‍‍‍'উওয়াইমির বলেন, ''হে আল্লাহর রসূল! যদি আমি এ স্ত্রীকে রেখে দেই তাহলে মিথ্যুক হবো ৷'' একথা বলেই রসূলুল্লাহ (সা) তাকে হুকুম দেয়া ছাড়াই তিনি তিন তালাক দিয়ে দেন ৷ সাহল ইবনে সা'দ বলেন, '' রসূলুল্লাহ (সা) এ তালাক জারি করেন, তাদের মধ্যে ছাড়াছাড়ি করে দেন এবং বলেন, ''যে দম্পতি লি'আন করবে তাদের জন্য এ ছাড়াছাড়ি ৷'' লি'আনকারী স্বামী-স্ত্রীকে আলাদা করে দেবার এ সুন্নত কায়েম হয়ে যায় ৷ এরপর তারা আর কখনো একত্র হতে পারবে না ৷ সাহল ইবনে সা'দ একথাও বর্ণনা করেন যে, স্ত্রী গর্ভবতী ছিল এবং 'উওয়াইমির বলেন, এ গর্ভ আমার ঔরসজা নয় ৷ এ জন্য শিশুকে মায়ের সাথে সম্পর্কিত করা হয় এবং এ সুন্নত জারি হয় যে, এ ধরনের সন্তান মায়ের উত্তরাধিকারী হবে এবং মা তার উত্তরাধিকারী হবে ৷

এ দু'টি মামলা ছাড়া হাদীসের কিতাবগুলোতে আমরা এমন বহু রেওয়ায়াত পাই যেগুলো থেকে এ মামলাগুলো কাদের সাথে জড়িত ছিল তা সুস্পষ্টভাবে জানা যায় না৷ হতে পারে সেগুলোর কোন কোনটি এ দু'টি মামলার সাথে সম্পর্কিত৷ কিন্তু কয়েকটিতে অন্য কিছু মামলার কথা বলা হয়েছে এবং সেগুলো থেকে লি'আন আইনের অতিপয় গুরুত্বূর্ণ বিষয়ের ওপর আলোকপাত হয়৷

ইবনে উমর একটি মামলার বিবরণ দিয়েছেন৷ তিনি বলেন, স্বামী-স্ত্রী লি'আন শেষ করার পর নবী সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদের মধ্যে ছাড়াছাড়ি করে দেন৷ (বুখারী, মুসলিম, নাসাঈ, আহমদা ও ইবনে জারীর) ইবনে উমরের অন্য এক বর্ণনায় বলা হয়েছে, এক ব্যক্তি ও তার স্ত্রীর মধ্যে লি'আন করানো হয়৷ তারপর স্বামীটি গর্ভের সন্তান অস্বীকার করে৷ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামতাদের মধ্যে ছাড়াছাড়ি করে দেন এবং ফায়সালা শুনিয়ে দেন, সন্তান হবে শুধুমাত্র মায়ের৷ (সিহাসে সিত্তা ও আহমাদ) ইবনে উমরেরই আর একটি রেওয়ায়াতে বলা হয়েছ, উভয়ের লি'আন করার পরে রসূলুল্লাহ (সা) বলেন, ''তোমাদের হিসাব এখন আল্লাহর জিম্মায়৷ তোমাদের একজন অবশ্যই মিথ্যুক ৷'' তারপর তিনি পুরুষটিকে বলেন, ----- (অর্থ এখন এ আর তোমার নয়৷ তুমি এর ওপর নিজের কোন অধিকার দেখাতে পারো না৷ এর ওপর কোনরকম হস্তক্ষেপও করতে পারো না৷ অথবা এর বিরুদ্ধে অন্য কোন প্রকার প্রতিশোধমলূক পদক্ষেপ গ্রহণ করার অধিকারও আর তোমার নেই)৷ পুরুষটি বলে হে, আল্লাহর রসূল! আর আমার সম্পদ? (অর্থাৎ যে মোহরানা আমি তাকে দিয়েছিলাম তা আমাকে ফেরত দেবার ব্যবস্থা করুন)৷ রসূলুল্লাহ (সা) বলেনঃ

-----

''সম্পদ ফেরত নেবার কোন অধিকার তোমার নেই৷ যদি তুমি তার ওপর সত্য অপবাদ দিয়ে থাকো তাহলে ঐ সম্পদ সে আনন্দ উপভোগের প্রতিদান যা তুমি হালাল করে তার থেকে লাভ করেছো৷ আর যদি তুমি তার ওপর মিথ্যা অপবাদ দিয়ে থাকো৷ তাহলে সম্পদ তোমার কাছ থেকে আরো অনেক দূরে চলে গেছে৷ তার তুলনা তোমার কাছ থেকে তা বেশী দূরে রয়েছে৷'' (বুখারী, মুসলিম ও আবু দাউদ)

দারুকুত্‌নী আলী ইবনে আবু তালেব ও ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহুমার উক্তি উদ্ধৃতি করেছে৷ তাতে বলা হয়েছেঃ ''সুন্নাত এটিই নির্ধারিত হয়েছে যে, লি'আনকারী স্বামী-স্ত্রী পরবর্তী পর্যায়ে আর কখনো একত্র হতে পারে না৷'' (অর্থাৎ দ্বিতীয়বার আর কোনদিন তাদের মধ্যে বিয়ে হতে পারে না)৷ আবার এ দারুকত্‌নী হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস থেকে হাদীস বর্ণনা করেছেন যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, এরা দু'জন আর কখনো একত্র হতে পারে না৷

কাবীসাহ ইবনে যুওয়াইব বর্ণনা করেছেন, হযরত উমরের আমলে এক ব্যক্তি নিজের স্ত্রীর গর্ভের সন্তানকে অবৈধ গণ্য করে তারপর আবার তা নিজের বলে স্বীকার করে নেয়৷ তারপর সন্তান ভূমিষ্ঠ হবার পর বলতে থাকে, এ শিশু আমার নয়৷ ব্যাপারটি হরত উমরেরর আদালতে পেশ হয়৷ তিনি তার ওপর কাযাফের শাস্তি জারি করেন এবং ফায়সালা দেন, শিশু তার সাথেই সম্পর্কিত হবে৷ (দারুকুত্‌নী বাইহাকী)৷

ইবনে আব্বাস বর্ণনা করেছেন, এক ব্যাক্তি হাযির হয়ে বলে, আমার একটি স্ত্রী আছে, আমি তাকে ভীষণ ভালবাসি৷ কিন্তু তার অবস্থা হচ্ছে এই যে, সে কোন স্পর্শকারীর হাত ঠেলে দেয় না৷ (উল্লেখ্য, এটি একটি রূপক ছিল৷ এর অর্থ যিনাও হতে পারে আবার যিনার কম পর্যায়ের নৈতিক দুর্বলতাও হতে পারে৷) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, তালাক দিয়ে দাও৷ সে বলে, আমি তাকে ছাড়া থাকতে পারি না৷ জবাব দেন, তুমি তাকে রেখে দাও৷ (অর্থাৎ তিনি তার কাছ থেকে তার ইংগিতের ব্যাখ্যা নেননি এবং তার উক্তিকে যিনার অপবাদ হিসেবে গণ্য করে লি'আন করার হুকুম দেননি৷) নাসাঈ৷

আবু হুরাইরা (রা) বলেছেন, এক ব্যাক্তি হাযির হয়ে বলে, আমার স্ত্রী কালো ছেলে জন্ম দিয়েছে৷ আমি তাকে আমার সন্তান বলে মনে করি না৷ (অর্থাৎ নিছক শিশু সন্তানের গায়ের রং তাকে সন্দেহের মধ্যে নিক্ষেপ করেছিল৷ নয়তো তার দৃষ্টিতে স্ত্রীর ওপর যিনার অপবাদ লাগাবার অন্য কোন কারণ ছিল না৷) রসূলুল্লাহ (সা) জিজ্ঞেস করেন, তোমার তো কিছু উট আছে? সে বলে, হাঁ, আছে৷ জিজ্ঞেস করেন, সেগুলোর রং কি? জবাব দেয় লাল৷ জিজ্ঞেস করেন,তাদের মধ্যে কোনটা কি খাকি রংয়ের আছে? জবাব দেয়, জি হাঁ, কোন কোনটা এমনও আছে৷ জিজ্ঞেস করেন, এ রংটি কোথায় থেকে এলো? জবাব দেয়, হয়তো কোন শিরা টেনে নিয়ে গেছে৷ (অর্থাৎ তাদের বাপ-দাদাদের কেউ এ রংয়ের থেকে থাকবে এবং তার প্রভাব এর মধ্যে এসে গেছে৷) তিনি বলেন, ''সম্ভবত এ শিশুটিকেও কোন শিরা টেনে নিয়ে গেছে৷'' তারপর তিনি তাকে সন্তানের বংশধারা অস্বীকার করার অনুমতি দেননি৷ (বুখারী,মুসলিম, আহমাদ ও আবুদ দাউদ৷)

আবু হুরাইরার (রা) অন্য একটি রেওয়ায়াতে বলা হয়েছে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লা লি'আন সম্পর্কিত আয়াত আলোচনা প্রসংগে বলেন, ''যে স্ত্রী কোন বংশে এমন সন্তান প্রবেশ করায় যে ঐ বংশের নয় (অর্থাৎ হারামের শিশু গর্ভে ধারণ করে স্বামীর ঘাড়ে চাপিয়ে দেয়) তার আল্লাহর সাথে কোন সম্পর্ক নেই৷ আল্লাহ তাকে কখ্‌খনো জান্নাতে প্রবেশ করাবেন না৷ আর যে পুরুষ নিজের সন্তানের বংশধারা অস্বীকার করে অথচ সন্তান তাকে দেখছে, আল্লাহ কিয়ামতের দিন তাকে পরদা করবেন এব পূর্বের ও পরের সমস্ত সৃষ্টির সামনে তাকে লাঞ্ছিত করবেন৷ (আবু দাউদ, নাসাঈ ও দারেমী৷)

লি'আনের আয়াত এবং এ হাদীসগুলো, নজিরসমূহ ও শরীয়াতের সাধারণ মূলনীতিগুলই হচ্ছে ইসলামের লি'আনের আইনের উৎস৷ এগুলোর আলোকে ফকীহগণ লি'আনের বিস্তারিত আইন-কানুন তৈরী করেছে৷ এ আইনের গুরুত্বপূর্ণ ধারাগুলো হচ্ছেঃ

একঃ যে ব্যক্তি স্ত্রীর ব্যভিচার স্বচক্ষে দেখে লি'আনের পথ অবলম্বন না করে হত্যা করে বসে তার ব্যাপারে মতভেদ রয়েছে৷ একটি দল বলে,তাকে হত্যা করা হবে৷ কারণ নিজের উদ্যোগে 'হদ' জারি করার তথা আইন হাতে তুলে নেয়ার অধিকার তার ছিল না৷ দ্বিতীয় দল বলে,তাকে হত্যা করা হবে না এবং তার কর্মের জন্য তাকে জবাবদিহিও করতে হবে না, তবে এ ক্ষেত্র শর্ত হচ্ছে তার দাবীর সত্যতা প্রমাণিত হতে হবে (অর্থাৎ যথর্থাই সে তার যিনার কারণে এ কাজ করেছে)৷ ইমাম আহমাদ ও ইসহাক্ইবনে রাহ্‌ওয়াইহ্‌ বলেন, এটিই হত্যার কারণ এ মর্মে তাকে দু'জন সাক্ষী আনতে হবে৷ মালেকীদের মধ্যে ইবনুল কাসেম ও ইবনে হাবীব এ মর্মে অতিরিক্ত শর্ত আরোপ করেন যে, যাকে হত্যা করা হয়েছে সেই যিনাকারীর বিবাহিত হতে হবে৷ অন্যথায় কুমার যিনাকারীকে হত্যা করলে তার কাছ থেকে কিসাস নেয়া হবে৷ কিন্তু অধিকাংশ ফকীহের মতে তাকে কিসাস থেকে শুধুমাত্র তখনই মাফ করা হবে যখন সে যিনার চারজন সাক্ষী পেশ করবে অথবা নিহত ব্যক্তি মরার আগে নিজ মুখে একথা স্বীকার করে যাবে যে, সে তার স্ত্রীর সাথে যিনা করছিল এবং এ সংগে নিহত ব্যক্তিকে বিবাহিতও হতে হবে৷ (নাইলুল আওতার, ৬ষ্ঠ খণ্ড, ২২৮ পৃষ্ঠা)৷

দুইঃ ঘরে বসে লি'আন হতে পারে না৷ এ জন্য আদালতে যাওয়া জরুরী৷

তিনঃ লি'আন দাবী করার অধিকার শুধু স্বামীর নয়, স্ত্রীরও৷ স্বামী যখন তার ওপর যিনার অপবাদ দেয় অথবা তার শিশুর বংশধারা মেনে নিতে অস্বীকার করে তখন স্ত্রী আদালতে গিয়ে লি'আন দাবী করতে পারে৷

চারঃ সব স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে কি লি'আন হতে পারে অথবা এ জন্য তাদের দু'জনের মধ্যে কিছু শর্ত পাওয়া যেতে হবে? এ বিষযে ফকীহদের মধ্যে মতভেদ দেখা যায়৷ ইমাম শাফেঈ বলেন, যার কসম আইনের দিক দিয়ে নির্ভরোগ্য এবং যার তালাক দেবার ক্ষমতা আছে সে লি'আনের যোগ্যতা সম্পন্ন হবার জন্য যথেষ্ট৷ এ ক্ষেত্রে স্বামী-স্ত্রী মুসলিম বা কাফের, গোলাম বা স্বাধীন, গ্রহণযোগ্য সাক্ষের অধিকারী হোক বা না হোক এবং মুসলিম স্বামীর স্ত্রী মুসলমান বা যিম্মী যেই হোক না কেন তাতে কিছু আসে যায় না৷ প্রায় একই ধরণের অভিমত ইমাম মালেক ও ইমাম আহমাদেরও৷ কিন্তু হানাফীগণ বলেন, লি'আন শুধুমাত্র এমন স্বাধীন মুসলমান স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে হতে পারে যারা কাযাফের অপরাধে শাস্তি পায়নি৷ যদি স্বামী ও স্ত্রী দু'জনই কাফের, গোলাম বা কাযাফের অপরাধে পূর্বেই শাস্তি প্রাপ্ত হয়ে থাকে, তাহলে তাদের মধ্যে লি'আন হতে পারে না৷ এ ছাড়াও যদি স্ত্রীর এর আগেও কখনো হারাম বা সন্দেহযুক্ত পদ্ধতিতে কোন পুরুষের সাথে মাখামাখি করে থাকে, তাহলে এ ক্ষেত্রেও লি'আন ঠিক হবে না৷ হানাফীগনের এর শর্তগুলো আরোপ করার কারণ হচ্ছে এই যে,তাদের মতে লি'আন ও কাযাফের আইনের মধ্যে এ ছাড়া আর কোন পার্থক্য নেই যে, অন্য ব্যক্তি যদি ব্যভিচারের মিথ্যা অপবাদ দেয়া তাহলে তার জন্য রয়েছে 'হদ' আর স্বামী এ অপবাদ দিলে সে লি'আন করে অব্যাহতি লাভ করতে পারে৷ বাকি অন্যান্য সবদিক দিয়ে লি'আন ও কাযাফ একই জিনিস৷ এ দেবার যোগ্যতা নেই এমন কোন ব্যক্তিকে তারা এর অনুমতি দেয় না৷ কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এ ব্যাপারে হানাফীদের অভিমত দুর্বল এবং ইমাম শাফেঈ যে কথাটি বলেছেন সেটিই সঠিক৷ এর প্রথম কারণ হচ্ছে, কুরআন স্ত্রীর বিরুদ্ধে কাযাফের ব্যাপারটিকে কাযাফের আয়াতের একটি অংশে পরিণত করেনি বরং সে জন্য একটি স্বতন্ত্র আইন বর্ণনা করেছেন তাই তাকে কাযাফের আয়াতের শব্দাবলী থেকে আলাদা এবং উভয় হুকুমও ভিন্ন৷ তাই লি'আনের আয়াত থেকেই লি'আনের বিধান গ্রহণ করা উচিত৷ কাযাফের আয়াত থেকে নয়৷ যেমন কাযাফের আয়াতের শাস্তি লাভের যোগ্য হচ্ছে এমন লোক যে সতী সাধ্বী স্ত্রীর শর্ত আরোপ করা হয়নি৷ একটি মেয়ে কোন সময় হয়তো পাপ কাজ করেছিল, যদি পরবর্তীকালে সে তাওবা করে কোন পুরুষকে বিয়ে করে এবং তারপর তার স্বামী তার বিরুদ্দে মিথ্যা অপবাদ দেয়, তাহলে লি'আনের আয়াত একথা বলে না যে, এ মেয়ের স্বামীকে এর বিরুদ্ধে অপবাদ দেবার বা এর সন্তানের বংশধারা অস্বীকার করার ব্যাপক অনুমতি দিয়ে দাও, কারণ এর জীবন এক সময় কলুষিত ছিল৷ দ্বিতীয় এবং ঠিক একই পরিমাণ গুরুত্বপূর্ণ কারণ হচ্ছে এই যে, স্ত্রীর বিরুদ্ধে কাযাফ ও অপরিচিতার বিরুদ্ধে কাযাফের মধ্যে আসমান যমীনফারাক৷ এদের উভয়ের ব্যাপারে আইনের প্রকৃতি এক হতে পারে না৷ পরনারীর সাথে অন্য পুরুষের আবেগ-অনুভূত, ইজ্জত-আবরু, সমাজ-সংস্কৃতি ও বংশ গোত্রগত কোন সম্পর্ক হতে পারে না৷ তার চালচলনের ব্যাপারে যদি কোন ব্যক্তির খুব বেশী আগ্রহ সৃষ্টি হতে পারে তাহলে তা হবে তার সমাজকে চরিত্রহীনতা মুক্ত দেখার আবেগ থেকে৷ পক্ষান্তরে নিজের স্ত্রীর সাথে মানুষের সম্পর্ক এক ধরনের নয়, কয়েক ধরনের এবং অত্যন্ত গভীর৷ সে একাধারে তার বংশধারা, ধন-সম্পদ ও গৃহের আমানতদার৷ তার জীবন সঙ্গিনী৷ তার গোপনীয়তার সংরক্ষক৷ তার অত্যন্ত গভীর ও সংবেদনশীল আবেগ-অনুভূতি তার সাথে জড়িত৷ তার খারাপ চালচলনে মানুষের আত্মমর্যাদা, ইজ্জত, স্বার্থ ও ভবিষ্যত বংশধরদের পর সুগভীর আঘাত আসে৷ এ দু'টি ব্যাপার কোন্‌ দিক দিয়ে এক, যার ফলে উভয়ের জন্য আইনের একই প্রকৃতি হতে হবে? একজন যিম্মী, অথবা গোলাম কিংবা সাজাপ্রাপ্ত ব্যক্তির জন্য তার স্ত্রীর ব্যাপার কি কোন স্বাধীন সাক্ষদানের যোগ্য মুসলমানের ব্যাপার থেকে সামান্যতম ভিন্ন অথবা গুরুত্ব ও ফলাফলের দিক দিয়ে একটুখানিও কম? সে যদি নিজের চোখের নিজের স্ত্রীকে কারোর সাথে ডলাডলি করতে দেখতো অথবা সে যদি নিশ্চিতভাবে বিশ্বাস করতো যে, তার স্ত্রী অন্য কারোর সংস্পর্শে গর্ভবতী হয়ে গেছে,তাহলে তাকে লি'আন করার অধিকার না দেবার কোন যুক্তিসংগত কারণ আছে কি? আর এ অধিকার তার থেকে ছিনিয়ে নেবার পর আমাদের আইনে তার জন্য আর কি পথ আছে? কুরআন মজীদের উদ্দেশ্য তো পরিষ্কার জানা যায়৷ বিবাহিত দম্পতিদের মধ্যে স্ত্রীর যথার্থ ব্যভিচার বা অবৈধ গর্ভধারনের ফলে একজন স্বামী এবং স্বামীর মিথ্যা অপবাদ বা সন্তানের বংশ অযথা অস্বীকারের ফলে একজন স্বামী এবং স্বামীর মিথ্যা অপবাদ বা সন্তানের বংশ অযথা অস্বীকারের ফলে একজন স্ত্রী যে জটিল সমস্যায় ভুগতে থাকে কুরআন তাদেরকে তা থেকে উদ্ধার করার জন্য একটি উপায় বের করতে চায়৷ এ প্রয়োজন শুধুমাত্র সাক্ষদানের যোগ্য স্বাধীন মুসলমানদের জন্য নির্দিষ্ট নয় এবং কুরআনের শব্দাবলীর মধ্যেও এমন কোন জিনিস নেই যা এ প্রয়োজনটি শুধুমাত্র তাদের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখে৷ তবে কুরআন লি'আনের কসমকে সাক্ষদান হিসেবে গণ্য করেছে তাই সাক্ষদানের শর্তাবলী এখানে আরোপিত হবে, এ যুক্তি পেশ করলে এর দাবী হবে, ন্যায়নিষ্ঠ গ্রহণযোগ্য সাক্ষের অধিকারী স্বামী যদি কসম খায় এবং স্ত্রী কসম খেতে ইতস্তত করে তাহলে স্ত্রীকে রজম করা হবে৷ কারণ ব্যভিচারেরর ওপর সাক্ষ প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে৷ কিন্তু বিস্ময়কর হচ্ছে, এ অবস্থায় হানাফীগণ রজম করার হুকুম দেন না৷ তারা নিজেরাই যে এ কসমগুলোকে হবহু সাক্ষের মর্যাদা দান করেন না এটা তারই সুস্পষ্ট প্রমাণ৷ বরং সত্য বলতে কি স্বয়ং কুরআনও এ কসমগুলোকে সাক্ষ শব্দের মাধ্যমে ব্যক্ত করল এগুলোকে সাক্ষ গণ্য করে না৷ নয়তো স্ত্রীকে চারটি কসমের পরিবর্তে আটটি কসম খাবার হুকুম দিতো৷

পাঁচঃ নিছক ইশারা-ইংগিত, রূপক, উপমা বা সন্দেহ-সংশয় প্রকাশের ফলে লি'আন অনবার্য হয়ে পড়ে না৷ বরং কেবলমাত্র এমন অবস্থায় তা অনিবার্য হয় যখন স্বামী দ্ব্যর্থহীন ভাষায় যিনার অপবাদ দেয় অথবা সুস্পষ্ট ভাষায় সন্তানকে নিজের বলে মেনে নিতে অস্বীকার করে৷ ইমাম মালেক ও লাইস ইবনে সা'দ এর ওপর আরো এ শর্তটি বাড়ান যে,কসম খাবার সময় স্বামীকে বলতে হবে, সে নিজের চোখে স্ত্রীকে ব্যভিচারে রত থাকতে দেখেছে৷ কিন্তু এটি একটি ভিত্তিহীন শর্ত৷ কুরআনে এর কোন ভিত্তি নেই, হাদীসেও নেই৷

ছয়ঃ যদি অপবাদ দেবার পর স্বামী কসম খেতে ইতস্তত কে বা ছলনার আশ্রয় নেয় তাহলে ইমাম আবু হানীফা ও তাঁর সহযোগীগণ বলেন,তাকে বন্দী করতে হবে এবং যতক্ষন সে লি'আন না করে অথবা নিজের অপবাদকে মিথ্যা বলে না মেনে নেয় ততক্ষণ তাকে মুক্তি দেয়া হবে না৷ আর মিথ্যা বলে মেনেন নিলে তার বিরুদ্ধে কাযাফের দণ্ড জারি হয়ে যাবে৷ এর বিপরীতপক্ষে ইমাম মালেক, শাফেঈ, হাসান ইবনে, সালেহ ও লাইস ইবনে সা'দের মতে, লি'আন করতে ইতস্তত করার ব্যাপারটি নিজেই মিথ্যার স্বীকারোক্তি৷ তাই কাযাফের হদ্‌ ওয়াজিব হয়ে যায়৷

সাতঃ স্বামীর কসম খাওয়ার পর স্ত্রী যদি লি'আন করতে ইতস্তত করে, তাহলে হানাফীদে মতে তাকে বন্দী করতে হবে এবং ততক্ষণ পর্যন্ত তাকে মুক্তি দেয়া যাবে না যতক্ষণ না সে লি'আন করবে অথবা তারপর যিনার স্বীকারোক্তি না করে নেবে৷ অন্যদিকে উপরোতক্ত ইমামগণ বলেন, এ অবস্থায় তাকে রজম করে দেয়া হবে৷ তারা কুরআনের ঐ উক্তু থেকে পেশ করেন যে, একমাত্র কসম খাওয়ার পরই স্ত্রী শাস্তি মুক্ত হবে৷ এখন যেহেতু সে কসম খাচ্ছে না, তাই নিশ্চতভাবেই সে শাস্তি যোগ্য হবে৷ কিন্তু এ যুক্তির দুর্বলতা হচ্ছে, কুরআন এখানে ''শাস্তির' ধরণ বলে দেয়নি বরং সাধারণভাবে শাস্তির কথা বলছে৷ যদি বলা হয়, শাস্তি মানে এখানে যিনার শাস্তিই হতে পারে, তাহলে এর জবাব হচ্ছে, যিনার শাস্তির জন্য কুরআন সুস্পষ্ট ভাষায় চার জন সাক্ষীর শর্ত আরোপ করেছে৷ নিছক এক জনের চারটি কসম এ শর্ত পূরা করতে পারে না ৷ স্বামীর কসম তো তার নিজের কাযাফের শাস্তি থেকে বেঁচে যাওয়া এবং স্ত্রীর ওপর লি'আনের বিধান প্রবর্তিত হওয়ার জন্য যথেষ্ট কিন্তু তার মাধ্যমে স্ত্রীর বিরুদ্ধে যিনার অপবাদ প্রমাণিত হবার জন্য যথেষ্ট নয়৷ স্ত্রীর জবাবী কসম খেতে অস্বীকার করার ফলে অবশ্যই সন্দেহ সৃষ্টি করে দেয় এবং বড়ই গভীর সন্দেহ সৃষ্টি করে সত্য কিন্তু সন্দেহের ভিত্তিতে হদ্ জারি করা যেতে পারে না৷ এ বিষয়টিকে পুরুষের কাযাফের হদের সাথে তুলনা করা উচিত নয়৷ কারণ তার কাযাফ তো প্রমাণিত, এ কারণেই তাকে লি'আন করতে বাধ্য করা হয়৷ কিন্তু এর বিপরীতে স্ত্রীর ওপর যিনার অপবাদ প্রমাণিত হয়৷ কারণ তার নিজের স্বীকারোক্তি অথবা চারজন স্বচক্ষে প্রত্যক্ষকারী সাক্ষীর সাক্ষ ছাড়া তা প্রমাণিত হতে পারে না৷

আটঃ যদি লি'আনের সময় স্ত্রী গর্ভবর্তী থাকে তাহলে ইমাম আহমাদের মতে স্বামী গর্ভস্থিত সন্তানকে গ্রহণ করতে অস্বীকার করুক বা না করুক স্বামীর গর্ভস্থিত সন্তানের দায়মুক্ত হবার এবং সন্তান তার ঔরসজাত গণ্য না হবার জন্য লি'আন নিজের যথেষ্ট৷ ইমাম শাফেঈ বলেনত,স্বামীর যিনার অপবাদ ও গর্ভস্থিত সন্তানের দায়িত্ব অস্বীকার করা এক জিনিস নয়৷ এ জন্য স্বামী যতক্ষন গর্ভস্থিত সন্তানের দায়িত্ব গ্রহণ করতে সুস্পষ্টভাবে অস্বীকার না করেব ততক্ষন তা যিনার অপবাদ সত্ত্বেও তার ঔরসজাত গণ্য হবে৷ কারণ স্ত্রী যিনাকারিনী হয়ার ফলেই বর্তমান গর্ভজাত সন্তানটি যে, যিনার কারণে জন্ম নিয়েছে, এটা অপরির্য নয়৷

নয়ঃ ইমাম মালেক, ইমাম শাফেঈ, ইমাম আহমাদ স্ত্রীর গর্ভধারণকালে স্বামীকে গর্ভস্থিত সন্তান অস্বীকার করার অনুমতি দিয়েছেন এবং এরি ভিত্তিতে লি'আনকে বৈধ বলেন৷ কিন্তু ইমাম আবু হানীফা বলেন, যদি স্বামীর অপবাদের ভিত্তি যিনা না হয়ে থাকে বরং শুধু এটাই হয়ে থাকে যে,সে স্ত্রীকে এমন অবস্থায় গর্ভবতী পেয়েছ যখন তার মতে এ গর্ভস্থিত সন্তান তার হতে পারে না তখন এ অবস্থায় লি'আনের বিয়সিকে সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়া পর্যন্ত মূলতবী করে দেয়া উচিত৷ কারণ অনেক সময় কোন কোন রোগের ফলে গর্ভ সঞ্চার হয়েছে বলে সন্দেহ দেখা দেয় কিন্তু প্রকৃতপক্ষে গর্ভসঞ্চার হয় না৷

দশঃ যদি পিতা সন্তানের বংশধারা অস্বীকার করে তাহলে লি'আন অনিবার্য হয় পড়ে, এ ব্যাপারে সবাই একমত৷ আবার এ ব্যাপারো সবাই একমত যে, একবার সন্তানকে গ্রহণ করে নেবার পর (সে গ্রহন করাটা যে কোন পর্যায়েরই হোক না কে, সুস্পষ্ট শব্দাবলী ও বাক্যের মাধ্যমে গ্রহণ করা হোক অথবা এমন কাজ করা হোক যাতে মনে হয় শিশুকে গ্রহণ করে নেয়া হয়েছে যেমন, জন্মের পর মোবারকবাদ গ্রহন করা অথবা শিশুর সাথে পিতৃসুলভ স্নেহপূর্ণ ব্যবহার করা কিংবা তার প্রতিপালেনর ব্যাপারে আগ্রহ প্রকাশ করা) পিতার পক্ষে আর তার বংশধারা অস্বীকারকরার অধিকার থাকে না৷ এ অবস্থায় পিতা বংশাধারা অস্বীকার করলে কাযাফের শাস্তির অধিকারী হবে৷ তবে পিতা কতক্ষণ পর্যন্ত বংশদারা অস্বীকার করার অধিকার রাখে, এ ব্যাপারে মতভেদ আছে৷ ইমাম মালেকের মতে, স্ত্রী যে সময় গর্ভবতী ছিল সে সময় যদি স্বামী গৃহে উপস্থিত থেকে থাকে তাহলে গর্ভসঞ্চারের সময় থেকে নিজে সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়া পর্যন্ত সময়-তালের মধ্যে স্বামীর জন্য সন্তানের বংশধারা অস্বীকার করার সুযোগ আছে৷ এরপর তার অস্বীকার করার অধিকার নেই৷ তবে এ সময় যদি সে অনুপস্থিত থেকে থাকে এবং তার অসাক্ষাতে সন্তান জন্ম নিয়ে থাকে তাহলে যখনই সে জানবে তখন তাকে অস্বীকার করে তাহলে লি'আন করে সন্তানের দায়িত্বমুক্ত হয়ে যাবে৷ কিন্তু যদি এক-দু'বছর পরে অস্বীকার করে তাহলে লি'আন হবে ঠিকই কিন্তু সন্তানের দায়িত্ব থেকে মুক্ত হতে পারেব না৷ ইমাম আবু ইউসুফের মতে, শিশু ভূমিষ্ঠ হবার পরে বা জন্ম সম্পর্ক জানার পরে চল্লিশ দিনের মধ্যে পিতার বংশধারা অস্বীকার করার অধিকার আছে৷ এরপর এ অধিকার বাতিল হয়ে যাবে৷ কিন্তু এ চল্লিশ দিনের শর্ত অর্থহীন৷ সঠিক কথা সেটিই যেটি ইমাম আবু হানীফা বলেছেন৷ অর্থাৎ জন্মের পর বা জন্মের কথা জানার পর এক-দু'দিনের মধ্যেই বংশাধারা অস্বীকার করা যেতে পারে৷ তবে যদি এ ক্ষেত্রে কোন বাধা থাকে, যাকে যথার্থ বাধা বলে স্বীকার করে নেয়া যেত পারে, তাহলে অবশ্য ভিন্ন কথা৷

এগারঃ যদি স্বামী তালাক দেবার পর সাধারণভাবে তালাকপ্রাপ্ত স্ত্রী বিরুদ্ধে যিনার অপবাদ দেয় তাহলে ইমাম আবু হানীফার মতে লি'আন হবে না ৷ বরং তার বিরুদ্ধে কাযাফের মামলা দায়ের করা হবে ৷ কারণ লি'আন হচ্ছে স্বামী-স্ত্রীর জন্য৷ আর তালাকপ্রাপ্তা নারীটি তার স্ত্রী নয় ৷ তবে যদি রজ'ঈ তালাক হয় এবং রুজু (স্ত্রীকে ফিরিয়ে নেবার) করার সময়-কালের মধ্যে সে অপবাদ দেয়, তাহলে ভিন্ন কথা ৷ কিন্তু ইমাম মালেকের মতে, এটি শুধুমাত্র এমন অবস্থায় কাযাফ হবে যখন কোন গর্ভস্থিত বা ভূমিষ্ঠ সন্তানের বংশধারা গ্রহণ করা বা না করার সমস্যা মাঝখানে থাকবে না ৷ অন্যথায় বায়েন তালাক দেবার পরও পুরুষের লি'আন করার অধিকার থাকে ৷ কারণ সে স্ত্রী লোককে বদনাম করার জন্য নয় বরং নিজেই এমন এক শিশুর দায়িত্ব থেকে নিষ্কৃতি লাভের উদ্দেশ্যে লি'আন করছে যাকে সে নিজের বলে মনে করে না ৷ ইমাম শাফেঈ প্রায় এই একই মত দিয়েছেন ৷

বারঃ লি'আনের আইনগত ফলাফলের মধ্য থেকে কোনটার ব্যাপারে সবাই একমত আবার কোনটার ব্যাপারে ফকীহগণের মধ্যে মতনৈক্য সৃষ্টি হয়েছে৷

যেসব ফলাফলের ব্যাপারে মতৈক্য হয়েছে সেগুলো হচ্ছেঃ স্বামী ও স্ত্রী উভয়েই কোন শাস্তি লাভের উপযুক্ত হয় না ৷ স্বামী যদি সন্তানের বংশধারা অস্বীকার করে তাহলে সন্তান হবে একমাত্র মায়ের ৷ সন্তান বাপের সাথে সম্পর্কিত হবে না এবং তার উত্তরাধিকারীও হবে না ৷ মা তার উত্তরাধিকারি হবে এবং সে মায়ের উত্তরাধিকারী হবে ৷ নারীকে ব্যভিচারিনী এবং তার সন্তানকে জারজ সন্তান বলার অধিকার কারোর থাকবে না ৷ যদিও লি'আনের সময় তার অবস্থা এমন পর্যায়ে পৌচ্ছে যায় যার ফলে তার ব্যভিচারিনী হবার ব্যাপারে কারোর মনে সন্দেহ না থাকে তবুও তার সন্তানের বিরুদ্ধে আগের অপবাদের পুনরাবৃত্তি করবে সে 'হদে'র যোগ্য হবে৷ নারীর মোহরানা বাতিল হয়ে যাবে না৷ ইদ্দত পালকালে নারী পুরুষের থেকে খোশপোর ও বাসস্থানের সুবিধা লাভের হকদার হবে না ৷ নারী ঐ পুরুষের জন্য হারাম হয়ে যাবে ৷

দু'টি বিষয়ে মতভেদ রয়েছে ৷ এক, লি'আনের পরে পুরুষ ও নারী কিতাবে আলাদা হবে ? দুই, লি'আনের ভিত্তিতে আলাদা হয়ে যাবার পর কি তাদের উভয়ের আবার মিলিত হওয়া সম্ভব ? প্রথম বিষয়ে ইমাম শাফেঈ বলেন, যখনই পুরুষ লি'আন শেষ করবে, নারী জবাবী লিআন করুক বা না করুক তখনই সংগে সংগেই ছাড়াছাড়ি হয়ে যাবে ৷ ইমাম মালেক, লাইস ইবনে সা'দ ও যুফার বলেন, পুরুষ ও নারী উভয়েই যখন লি'আন শেষ করে তখন ছাড়াছাড়ি হয়ে যায় ৷ অন্যদিকে ইমাম আবু হানিফা, আবু ইউসুফ ও মুহাম্মাদ বলেন, লি'আনের ফলে ছাড়াছাড়ি আপনা আপনি হয়ে যায় না বরং আদালত ছাড়াছাড়ি করে দেবার ফলেই ছাড়াছাড়ি হয়৷ যদি স্বামী নিজেই তালাক দিয়ে দেয় তাহলে ভালো, অন্যথায় আদালতের বিচারপতি তাদের মধ্যে ছাড়াছাড়ি করার কথা ঘোষণা করবেন ৷ দ্বিতীয় বিষয়টিতে ইমাম মালেক, আবু ইউসুফ, যুফার, সুফিয়ান সওরী, ইসহাক ইবনে রাহওয়াইহ, শাফেঈ, আহমেদ ইবনে হাম্বল ও হাসান ইবনে যিয়াদ বলেন, লি'আনের মাধ্যমে যে স্বামী-স্ত্রী আলাদা হয়ে গেয়ে তারা এরপর থেকে চিরকালের জন্য পরস্পরের ওপর হারাম হয়ে যাবে ৷ তারা পুনর্বার পরস্পর বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতে চাইলেও কোন অবস্থাতেই পারবে না ৷ হযরত উমর (রা), হযরত আলী (রা) ও হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদও (রা) একই মত পোষণ করেন ৷ বিপরীত পক্ষে সা'ঈদ ইবনে মুসাইয়েব, ইবরাহীম নাখঈ, শা'বী, সাঈদ ইবনে জুবাইর, আবু হানীফা ও মুহাম্মাদ রাহেমাহুমুল্লাহর মতে,যদি স্বামী নিজের মিথ্যা স্বীকার করে নেয় এবং তার ওপর কাযাফের হদ জারি হয়ে যায় তাহলে তাদের দু'জনের মধ্যে পুনরবার বিয়ে হতে পারে৷ তারা বলেন, তাদের উভয়কে পরস্পরের জন্য হারামকারী জিনিস হচ্ছে লি'আন৷ যতক্ষণ তারা এর ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকবে ততক্ষণ হারামও প্রতিষ্ঠিত থাকবে কিন্তু যখনই স্বামী নিজের মিথ্যা স্বীকার করে নিয়ে শাস্তি লাভ করবে তখনই লি'আন খতম হয়ে যাবে এবং হারামও নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে ৷