(২১:৭৬) আর এ একই নিয়ামত আমি নূহকে দান করেছিলাম৷ স্মরণ করো যখন এদের সবার আগে সে আমাকে ডেকেছিল, ৬৮ আমি তার দোয়া কবুল করেছিলাম এবং তাকে ও তার পরিবারবর্গকে মহাবিপদ ৬৯ থেকে বাঁচিয়েছিলাম৷
(২১:৭৭) আর এমন সম্প্রদায়ের মুকাবিলায় তাকে সাহায্য করেছিলাম যারা আমার আয়াতসমূহকে মিথ্যা বলেছিল৷ তারা খুবই খারাপ লোক ছিল, কাজেই আমি তাদের সবাইকে ডুবিয়ে দিয়েছিলাম৷
(২১:৭৮) আর এ নিয়ামতই আমি দাউদ ও সুলাইমানকে দান করেছিলাম৷ স্মরণ করো সে সময়ের কথা যখন তারা উভয়ই একটি শস্য ক্ষেতের মোকদ্দমার ফায়সালা করছিল, যেখানে রাতের বেলা ছড়িয়ে পড়েছিল অন্য লোকদের ছাগল এবং আমি নিজেই দেখছিলাম তাদের বিচার৷
(২১:৭৯) সে সময় আমি সুলাইমানকে সঠিক ফায়সালা বুঝিয়ে দিয়েছিলাম, অথচ প্রজ্ঞা ও জ্ঞান আমি উভয়কেই দান করেছিলাম৷৭০ দাউদের সাথে আমি পর্বতরাজী ও পক্ষীকূলকে অনুগত করে দিয়েছিলাম, যারা পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করতো, ৭১ এ কাজের কর্তা আমিই ছিলাম৷
(২১:৮০) আর আমি তাকে তোমাদের উপকারার্থে বর্ম নির্মাণ শিল্প শিখিয়েছিলাম, যাতে তোমাদেরকে পরস্পরের আঘাত থেকে রক্ষা করে, ৭২ তাহলে কি তোমরা কৃতজ্ঞ হবে ? ৭৩
(২১:৮১) আর সুলায়মানের জন্য আমি প্রবল বায়ু প্রবাহকে বশীভূত করে দিয়েছিলাম, যা তার হুকুম এমন দেশের দিকে প্রবাহিত হতো যার মধ্যে আমি বরকত রেখেছিলাম ৭৪ আমি সব জিনিসের জ্ঞান রাখি৷
(২১:৮২) আর শয়তানের মধ্য থেকে এমন অনেককে আমি তার অনুগত করে দিয়েছিলাম যারা তার জন্য ডুবুরীর কাজ করতো এবং এছাড়া অন্য কাজও করতো, আমিই ছিলাম এদের সবার তত্ত্বাবধায়ক৷৭৫
(২১:৮৩) আর (এ একই বুদ্ধিমত্তা, প্রজ্ঞা ও জ্ঞান) আমি আইয়ুবকে দিয়েছিলাম৷ ৭৬ স্মরণ করো, যখন সে তার রবকে ডাকলো, “আমি রোগগ্রস্ত হয়ে গেছি এবং তুমি করুণাকারীদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ করুণাকারী৷”৭৭
(২১:৮৪) আমি তার দোয়া কবুল করেছিলাম, তার যে কষ্ট ছিল তার দূর করে দিয়েছিলাম ৭৮ এবং শুধুমাত্র তার পরিবার পরিজনই তাকে দেইনি বরং এই সাথে এ পরিমাণ আরো দিয়েছিলাম, নিজের বিশেষ করুণা হিসেবে এবং এজন্য যে, এটা একটা শিক্ষা হবে ইবাদাতকারীদের জন্য৷৭৯
(২১:৮৫) আর এ নিয়ামতই ইসমাঈল, ইদরিস ৮০ ও যুলকিফ্‌লকে ৮১ দিয়েছিলাম, এরা সবাই সবরকারী ছিল
(২১:৮৬) এবং এদেরকে আমি নিজের অনুগ্রহের মধ্যে প্রবেশ করিয়েছিলাম, তারা ছিল সৎকর্মশীল৷
(২১:৮৭) আর মাছওয়ালাকেও আমি অনুগ্রহ ভাজন করেছিলাম৷৮২ স্মরণ করো যখন সে রাগান্বিত হয়ে চলে গিয়েছিল ৮৩ এবং মনে করেছিল আমি তাকে পাকড়াও করবো না৷ ৮৪ শেষে সে অন্ধকারের মধ্য থেকে ডেকে উঠলো :৮৫ “তুমি ছাড়া আর কোনো ইলাহ নেই, পবিত্র তোমার সত্তা, অবশ্যই আমি অপরাধ করেছি৷”
(২১:৮৮) তখন আমি তার দোয়া কবুল করেছিলাম এবং দুঃখ থেকে তাকে মুক্তি দিয়েছিলাম, আর এভাবেই আমি মুমিনদেরকে উদ্ধার করে থাকি৷
(২১:৮৯) আর যাকারিয়ার কথা (স্মরণ করো), যখন সে তার রবকে ডেকে বলেছিল : “হে আমার প্রতিপালক! আমাকে একাকী ছেড়ে দিয়ো না এবং সবচেয়ে ভালো উত্তরাধিকারী তো তুমিই৷”
(২১:৯০) কাজেই আমি তার দোয়া কবুল করেছিলাম এবং তাকে ইয়াহ্‌ইয়া দান করেছিলাম, আর তার স্ত্রীকে তার জন্য যোগ্য করে দিয়েছিলাম৷ ৮৬ তারা সৎকাজে আপ্রাণ চেষ্টা করতো, আমাকে ডাকতো আশা ও ভীতি সহকারে এবং আমার সামনে ছিল অবনত হয়ে৷৮৭
(২১:৯১) আর সেই মহিলা যে নিজের সতীত্ব রক্ষা করেছিল, ৮৮ আমি তার মধ্যে ফুঁকে দিয়েছিলাম নিজের রূহ থেকে ৮৯ এবং তাকে ও তার পুত্রকে সারা দুনিয়ার জন্য নিদর্শনে পরিণত করেছিলাম৷৯০
(২১:৯২) তোমাদের এ উম্মত আসলে একই উম্মত৷ আর আমি তোমাদের রব৷ কাজেই তোমরা আমার ইবাদাত করো৷
(২১:৯৩) কিন্তু (নিজেদের কার্যকলাপের মাধ্যমে) লোকেরা পরস্পরের মধ্যে নিজেদের দীনকে টুকরো টুকরো করে ফেলেছে৷ ৯১ সবাইকে আমার দিকে ফিরে আসতে হবে৷
৬৮. হযরত নূহের দোয়ার প্রতি ইংগিত করা হয়েছে৷ সুদীর্ঘকাল নিজের জাতির সংশোধনের অবিরাম প্রচেষ্টা চালাবার পর শেষ ক্লান্ত পরিশ্রান্ত হয়ে তিনি দোয়া করেছিলেন () "পরওয়ারদিগার৷ আমি হেরে গেছি আমাকে সাহায্য করো"৷ (আল কামারঃ ১০) এবং () "হে আমার রব! পৃথিবী পৃষ্ঠে একজন কাফেরকেও ছেড়ে দিয়ো না"৷ (সূরা নূহঃ ২৬)
৬৯. "মহাবিপদ" অর্থ একটি অসৎ কর্মশীল জাতির মধ্যে জীবন যাপন করার বিপদ অথবা মহাপ্লাবন৷ হযরত নূহের কাহিনী বিস্তারিত জানার জন্য দেখুন সূরা আল আরাফ ৫৯ থেকে ৬৪, সূরা ইউনুস, ৭১ থেকে ৭৩, সূরা হূদ ২৫ থেকে ৪৮ এবং বনী ইসরাঈল ৩ আয়াতসমূহ৷
৭০. বাইবেলে এ ঘটনাটি উল্লেখ করা হয়নি৷ ইহুদী সাহিত্যেও আমরা এর কোন চিহ্ন দেখি না৷ মুসলমান তাফসীরকারগণ এর যে ব্যাখ্যা করেছেন তা হচ্ছে এই যে, এক ব্যক্তির শস্যক্ষেতে অন্য এক ব্যক্তির ছাগলগুলো রাতের বেলা ঢুকে পড়ে৷ সে হযরত দাউদের কাছে অভিযোগ করে৷ তিনি দ্বিতীয় ব্যক্তির ছাগলগুলো ছিনিয়ে নিয়ে প্রথম ব্যক্তিকে নিয়ে দেবার ফায়সালা শুনিয়ে দেন৷ হযরত সুলায়মান এ ব্যাপারে ভিন্ন মত প্রকাশ করেন৷ তিনি রায় দেন, ছাগলগুলো ততদিন পর্যন্ত ক্ষেতের মালিকের কাছে থাকবে যতদিন না সে আবার নিজের ক্ষেত শস্যে পূর্ণ করে নিতে পারে৷ এ সম্পর্কেই আল্লাহ বলছেন, সুলায়মানকে এ ফায়সালাটি আমিই বুঝিয়ে দিয়েছিলাম৷ কিন্তু যেহেতু মোকাদ্দামার এ বিস্তারিত বিবরণ কুরআনে বর্ণিত হয়নি এবং নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কোন হাদীসেও এ বিবরণ আসেনি তাই একথা বলা যেতে পারে না যে, এ ধরনের মামলায় এটিই ইসলামী শরীয়াতের প্রমাণ্য আইন৷ একারণেই হানাফী, শাফেয়ী, মালিকী ও অন্যান্য ইসলামী ফকীহগণের মধ্যে এ ব্যাপারে মতবিরোধ হয়েছে যে, যদি কারো ক্ষেত অন্যের পশু দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত হয় তাহলে তাকে কোন ক্ষতিপূরণ দিতে হবে কিনা এবং দিতে হলে কোন অবস্থায় হবে এবং কোন অবস্থায় হবে না তাছাড়া কিভাবে এ ক্ষতিপূরণ করা হবে?

এ প্রেক্ষাপটে হযরত দাউদ (আ) ও হযরত সুলায়মানের (আ) এ বিশেষ ঘটনাটি বর্ণনা করার উদ্দেশ্য হচ্ছে একথা বুঝিয়ে দেয়া যে, নবীগণ নবী হবার এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে অসাধারণ শক্তি ও যোগ্যতার অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও মানুষই হতেন৷ আল্লাহর সার্বভৌম কর্তৃত্ব ও ক্ষমতার সামান্যতম গন্ধও তাদের মধ্যে থাকতো না৷ এ মোকাদ্দামার ব্যাপারে অহীর মাধ্যমে হযরত দাউদকে সাহায্য করা হয়নি৷ ফলে তিনি ফায়সালা করার ব্যাপারে ভুলের শিকার হয়েছেন৷ অন্যদিকে হযরত সুলায়মানকে অহীর মাধ্যমে সাহায্য করা হয়েছে ফলে তিনি সঠিক ফায়সালা দিয়েছেন৷ অথচ দুজনই নবী ছিলেন৷ সামনের দিকে এ উভয় নবীর যেসব দক্ষতার বর্ণনা দেয়া হয়েছে তাও একথা বুঝাবার জন্য যে, এসব আল্লাহ প্রদত্ত দক্ষতা এবং এ ধরনের দক্ষতার কারণে কেউ আল্লাহর সমকক্ষ হয়ে যায় না৷

এ আয়াত থেকে পরোক্ষভাবে ন্যায়বিচারের এ মূলনীতিও জানা যায় যে, দুজন বিচারপতি যদি একটি মোকাদ্দামার ফায়সালা করে এবং দু'জনের ফায়সালা বিভিন্ন হয়, তাহলে যদিও একজনের ফায়সালাই সঠিক হবে তবুও দুজনেই ন্যায়বিচারক বিবেচিত হবেন৷ তবে এখানে শর্ত হচ্ছে বিচার করার প্রয়োজনীয় যোগ্যতা উভয়ের মধ্যে থাকতে হবে৷ তাদের কেউ যেন অজ্ঞতা ও অনভিজ্ঞতা সহকারে বিচারকের আসনে বসে না যান৷ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হাদীসে একথা আরো বেশী সুস্পষ্ট করে বর্ণনা করে দিয়েছেন৷ বুখারীতে আমর ইবনুল আস (রা) বর্ণনা করেছেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ

-------------------------

"যদি বিচারক নিজের সামর্থ অনুযায়ী ফায়সালা করার পূর্ণ প্রচেষ্টা চালান, তাহলে সঠিক ফায়সালা করার ক্ষেত্রে তিনি দু'টি প্রতিদান পাবেন এবং ভুল ফায়সালা করলে পাবেন একটি প্রতিদান"৷

আবু দাউদ ও ইবনে মাজায় বুরাইদার (রা) রেওয়াতে বর্ণিত হয়েছে৷ সেখানে নবী (সা) বলেছেনঃ "বিচারক তিন প্রকরের৷ এদের একজন জান্নাতী এবং দু'জন জাহান্নামী৷ জান্নাতের অধিকারী হচ্ছেন এমন বিচারক যিনি সত্য চিহ্নিত করতে পারলে সে অনুযায়ী ফায়সালা দেন৷ কিন্তু যে ব্যক্তি সত্য চিহ্নিত করার পরও সত্য বিরোধী ফায়সালা দেয় সে জাহান্নামী৷ আর অনুরূপভাবে যে, ব্যক্তি জ্ঞান ছাড়াই লোকদের মোকদ্দামার ফায়সালা করতে বসে যায় সেও জাহান্নামী৷
৭১. মূলে () শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে, () বলা হয়নি৷ অর্থাৎ দাউদ আলাইহিস সালামের জন্য নয় বরং "তার সাথে" পাহাড় ও পাখীদেরকে অনুগত করা হয়েছিল এবং সে কারণে তারাও হযরত দাউদের (আ) সাথে আল্লাহর মহিমা ঘোষণা করতো৷ একথাটিই সূরা সাদ-এ বলা হয়েছেঃ

-------------------------

"আমি তার সাথে পাহাড়গুলোকে অনুগত করে দিয়েছিলাম৷ সকাল-সাঁজে তারা আল্লাহর পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করতো৷ আর পাখিদেরকেও অনুগত করা হয়েছিল৷ তারা একত্র হতো, সবাই তাঁর পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণার পুনরাবৃত্তি করতো"৷

সূরা সাবায় এর ওপর অতিরিক্ত বলা হয়েছেঃ ()"পাহাড়গুলোকে আমি হুকুম দিয়েছিলাম যে, তার সাথে সাথে পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণার পুনরাবৃত্তি করো এবং এই একই হুকুম পাখিদেরকেও দিয়েছিলাম৷ এ বক্তব্যগুলো থেকে যেকথা বুঝা যায় তা হচ্ছে এই যে, হযরত দাউদ যখন আল্লাহর প্রশংসা ও মহিমা গীতি গাইতেন তখন তাঁর উচ্চতর ও সুরেলা আওয়াজ পাহাড় গুঞ্জরিত হতো, পাখিরা থেমে যেতো এবং একটা অপূর্ব মূর্ছনার সৃষ্টি হতো৷ এ অর্থের সমর্থন একটি হাদীস থেকে পাওয়া যায়৷ সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে যে, একবার হযরত আবু মূসা আশ'আরী (রা) কুরআন তেলাওয়াত করেছিলেন৷ তাঁর কণ্ঠ ছিল অসাধারণ সুরেলা৷ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সেদিক দিয়ে যাচ্ছিলেন৷ তার আওয়াজ শুনে তিনি দাঁড়িয়ে গেলেন এবং অনেকক্ষণ শুনতে থাকলেন৷ তার পড়া শেষ হলে তিনি বললেনঃ () অর্থাৎ এ ব্যক্তি দাউদের সুরেলা কণ্ঠের একটা অংশ পেয়েছে৷
৭২. সূরা সাবায় এর ওপর আরো বিস্তারিতভাবে বলা হয়েছেঃ

-------------------------

"আর আমি তার জন্য লোহা নরম করে দিয়েছি (এবং তাকে নির্দেশ দিয়েছি) যে পূর্ণমাপের বর্ম তৈরী করো এবং বুনন করার ক্ষেত্রে যথাযথ পরিমাণ রক্ষা করো"৷

এ থেকে জানা যায়, আল্লাহ হযরত দাউদকে লোহা ব্যবহার করার ক্ষমতা দান করেছিলেন৷ বিশেষ করে, যুদ্ধে ব্যবহারের জন্য বর্ম নির্মাণের কায়দা কৌশল শিখিয়ে দিয়েছিলেন৷ বর্তমান যুগের ঐতিহাসিক ও প্রত্মতাত্বিক গবেষণা ও অনুসন্ধান থেকে এ আয়াতের অর্থের ওপর যে আলোকপাত হয় তা হচ্ছে এই যে, পৃথিবীতে লৌহ যুগ() শুরু হয় খৃস্টপূর্ব ১২০০ ও ১০০০অব্দের মাঝামাঝি সময়ে৷ আর এটিই ছিল হযরত দাউদ আলাহিস সালামের যুগ৷ প্রথম দিকে সিরিয়া ও এশিয়া মাইনরের হিত্তী (Hittites)জাতি লোহা ব্যবহার করে৷ ২০০০ থেকে ১২০০খৃস্ট পূবাব্দ পর্যন্ত এ জাতির উত্থান দেখা যায়৷ তারা লোহা গলাবার ও নির্মাণের একটা জটিল পদ্ধতি জানতো৷ সারা দুনিয়ার দৃষ্টি থেকে তারা একে কঠোরভাবে গোপন রাখে৷ কিন্তু এ পদ্ধতিতে যে লোহা তৈরী করা হতো তা সোনা রূপার মতো এত বেশী মূল্যবান হতো যে, তা সাধারণ কাজে ব্যবহার করা যেতো না৷ পরে ফিলিস্তিনীরা বনী ইসরাঈলকে যেভাবে গোপন রাখে৷ তালূতের রাজত্বের পূর্বে হিত্তী ও ফিলিস্তিনীরা বনী ইসরাঈলকে যেভাবে উপর্যুপরি পরাজিত করে ফিলিস্তীন থেকে প্রায় বেদখল করে দিয়েছিল বাইবেলের বর্ণনা মতে এর একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ ছিল এই যে, তারা লোহার রথ ব্যবহার করতো এবং তাদের কাছে লোহার তৈরী অন্যান্য অস্ত্রও থাকতো৷ (যিহোশূয়১৭:১৬ বিচারকর্তৃগণ ১:১৯, ৪:২-৩)খৃস্ট পূর্ব ১০২০অব্দে তালুত যখন আল্লাহর হুকুমে বনী ইসরাঈলদের শাসক পদে অধিষ্ঠিত হন তখন তিনি তাদেরকে পরপর কয়েকবার পরাজিত করে ফিলিস্তীনের বেশীর ভাগ অংশ তাদের কাছ থেকে ফিরিয়ে নেন৷ তারপর হযরত দাউদ(১০০৪-৯৬৫খৃঃ পূঃ) শুধুমাত্র ফিলিস্তিনীন ও ট্রান্স জর্দানই নয় বরং সিরিয়াও বড় অংশে ইসরাঈলী রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন৷ এ সময়ে লৌহ নির্মাণ শিল্পের যে গোপন কলাকৌশল হিত্তী ও ফিলিস্তীদের নিয়ন্ত্রণে ছিল তা উন্মোচিত হয়ে যায় এবং কেবলমাত্র উন্মোচিত হয়েই থেমে যায়নি বরং লৌহ নির্মাণের এমন পদ্ধতিও উদ্ভাবিত হয় যার ফলে সাধারণ ব্যবহারের জন্য লোহার কম দামের জিনিসপত্রও তৈরী হতে থাকে৷ ফিলিস্তীনের দক্ষিণে আদূম এলাকা আকরিক লোহায়(Iron Ore) সমৃদ্ধ ছিল৷ সম্প্রতি এ এলাকায় যে প্রত্মতাত্বিক খননকার্য চালানো হয় তার ফলে এমন অনেক জায়গার প্রত্মতাত্বিক নিদর্শনসমূহ পাওয়া গেছে যেখানে লোহা গলাবার চুল্লী বসানো ছিল৷ আকাবা ও আইলার সাথে সংযুক্ত হযরত সুলায়মান আলাইহিস সালামের জামানার বন্দর ইসয়ুন জাবেরের প্রাচীন নিদর্শনগুলোর মধ্যে যে চুল্লী পাওয়া গেছে তা পর্যবেক্ষণের পরে অনুমান করা হয়েছে যে, তার মধ্যে এমনসব পদ্ধতি প্রয়োগ করা হতো যা আজকের অত্যাধুনিক যুগের () এ প্রয়োগ করা হয়৷ এখন স্বাভাবিকভাবেই হযরত দাউদ আলাইহিস সালাম সবার আগে ও সবচেয়ে বেশী করে এ নতুন আবিস্কারকে যুদ্ধের প্রয়োজনে ব্যবহার করে থাকবেন৷ কারণ কিছুকাল আগেই আশপাশের শত্রু জাতিরা এ লোহার অস্ত্র ব্যবহার করে তাঁর জাতির জীবন ধারণ কঠিন করে দিয়েছিল৷
৭৩. হযরত দাউদ সম্পর্কে আরো বেশী জানার জন্য দেখুন, সূরা আল-বাকারাহ ২৫১ আয়াত ও বনী ইসরাঈল৭, ৬৩ টীকা)
৭৪. এ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা এসেছে সূরা সাবায় এভাবেঃ

------------------------

"আর সুলায়মানের জন্য আমি বায়ূকে বশীভূত করে দিয়েছিলাম, সকালে তার চলা এক মাসের পথ পর্যন্ত এবং সন্ধায় তার চলা এক মাসের পথ পর্যন্ত"৷

এর আরো বিস্তারিত বর্ণনা এসেছে সূরা সাদ-এ সেখানে বলা হয়েছেঃ

----------------------------

"কাজেই আমি তার জন্য বায়ূকে বশীভূত করে দিয়েছিলাম, যা তার হুকুমে সহজে চলাচল করতো যেদিকে সে যেতে চাইতো"৷

এ থেকে জানা যায়, বাতাসকে হযরত সুলায়মানের হুকুমের এভাবে অনুগত করে দেয়া হয়েছিল যে, তাঁর রাজ্যের এক মাস দূরত্বের পথ পর্যন্ত যে কোন স্থানে তিনি সহজে সফর করতে পারতেন৷ যাওয়ার সময়ও সব সময় তাঁর ইচ্ছা অনুযায়ী অনুকূল বাতাস পেতেন আবার ফেরার সময়ও৷ বাইবেল ও আধুনিক ঐতিহাসিক গবেষণা ও অনুসন্ধান থেকে এ বিষয় বস্তুর ওপর যে আলোকপাত হয় তা হচ্ছে এই যে, হযরত সুলায়মান তাঁর রাজত্বকালে নৌবাণিজ্যের ব্যাপক বিস্তার ঘটান৷ এদিকে ইস্য়ূন জাবের বন্দর থেকে তাঁর বাণিজ্যবহর লোহিত সাগরে ইয়ামেন এবং অন্যান্য পূর্ব ও দক্ষিণ দেশসমূহে যাতায়াত করতো এবং অন্যদিকে ভূমধ্যসাগরের বন্দরসমূহ থেকে তাঁর নৌবহর (যাকে বাইবেলে তর্শীশী নৌবহর বলা হয়েছে)পশ্চিম দেশসমূহে যেতো৷ ইস্য়ূন জাবেরে তাঁর সময়ের যে বিশাল চুল্লী পাওয়া গেছে তার সাথে তুলনীয় কোন চুল্লী আজ পর্যন্ত পশ্চিম এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যে পাওয়া যায়নি৷ প্রত্মতত্ব বিশেষজ্ঞগণের মতে এখানে আদুমের আরাবাহ এলাকার খনি থেকে আশোধিত লোহা ও তামা আনা হতো এবং এই চুল্লিতে গালাবার পর সেগুলো অন্যান্য কাজ ছাড়া জাহাজ নির্মাণ কাজেও ব্যবহার করা হতো৷ এ থেকে কুরআন মজীদে হযরত সুলায়মান আলাইহিস সালাম সম্পর্কে সূরা সাবায় যে কথা বলা হয়েছে()আর আমি তার জন্য গলিত ধাতুর ঝরণা প্রবাহিত করে দিয়েছিলাম) তার ওপর আলোকপাত হয়৷ তাছাড়া এ ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট সামনে রাখলে হযরত সুলায়মানের জন্য এক মাসের পথ পর্যন্ত বায়ূ প্রবাহকে "বশীভূত" করার অর্থ অনুধাবন করা যায়৷ সেকালে সামুদ্রিক সফর পুরোপুরি অনুকূল বাতাসের ওপর নির্ভর করতো৷ মহান আল্লাহ হযরত সুলায়মানের প্রতি বিশেষ অনুগ্রহ করেছিলেন, যার ফলে তাঁর দুটি সামুদ্রিক বহর সব সময় তার ইচ্ছা অনুযায়ী এই অনুকুল বাতাস পেতো৷ তবুও যদি বাতাসের ওপর হযতর সুলায়মানকে হুকুম চালাবার কোন কতৃত্ব ক্ষমতা দেয়া হয়ে থাকে যেমন () তার হুকুমে চলতো) এর শব্দাবলীর বাহ্যিক অর্থ থেকে মনে হয়, তাহলে আল্লাহর কুদরাতের জন্য এটা কোন অস্বাভাবিক ব্যাপার নয়৷ তিনি নিজের রাজ্যের মালিক৷ নিজের যেকোন বান্দাকে যে কোন ক্ষমতা তিনি চাইলে দিতে পারেন৷ তিনি কাউকে কোন ইখতিয়ার ও ক্ষমতাও দান করলে আমাদের মনকষ্টের কোন কারণ নেই৷
৭৫. সূরা সাবা-য় এর বিস্তারিত বর্ণনা এভাবে দেয়া হয়েছেঃ

-------------------------------

"আর জিনদের মধ্য থেকে এমন জিনকে আমি তার জন্য অনুগত করে দিয়েছিলাম যারা তার রবের হুকুমে তার সামনে কাজ করতো৷ আর তাদের মধ্য থেকে যে কেউ আমার হুকুম অমান্য করতো আমি তাকে জ্বলন্ত আগুনের স্বাদ আস্বাদন করাতাম৷ তারা তার জন্য যেমন সে চাইতো প্রাসাদ, মূর্তি, হাউজের মতো বড় আকারের পাত্র এবং দৃঢ়ভাবে স্থাপিত ডেগ নির্মাণ করতো৷ …………তারপর যখন আমি সুলায়মানকে মৃত্যুদান করলাম, এই জিনদেরকে তার মৃত্যুর কথা জানালো কেবল মাটির পোকা (অর্থাৎ ঘূণ, )যারা তার লাঠি খাচ্ছিল৷ তাই যখন সে পড়ে গেলো তখন জিনেরা বুঝতে পারলো যে, তারা যদি সত্যিই অদৃশ্য বিষয় অবগত থাকতো তাহলে এ লাঞ্ছনাকর শাস্তিতে এত দীর্ঘ সময় আবদ্ধ থাকতো না৷ এ আয়াত থেকে এ কথা সুস্পষ্ট হয়ে যায় যে, হযরত সুলায়মানকে যেসব জিনের ওপর কতৃত্ব দেয়া হয়েছিল এবং যারা তাঁর বিভিন্ন কাজ করে দিতো তারা এমন পর্যায়ের জিন ছিল যাদের সম্পর্কে আরব মুশরিকদের বিশ্বাস ছিল এবং তারা নিজেরাও এ ভুল ধারণা পোষণ করতো যে, তারা অদৃশ্য বিষয়ের জ্ঞান রাখে৷ এখন যে ব্যক্তি সতর্ক দৃষ্টিতে কুরআন মজীদ পড়বে এবং নিজের পূর্বাহ্নে বদ্ধমুল ধ্যান-ধারণার অনুসারী না হয়ে পড়বে, সে নিজেই দেখে নিতে পারে যেখানে কুরআন নির্বিশেষে "শয়তান"ও "জিন" শব্দ ব্যবহার করে সেখানে তার অর্থ হয় কোন ধরনের সৃষ্টি এবং আরবের মুশরিকরা যাদেরকে অদৃশ্য জ্ঞানের অধিকারী বলে মনে করতো কুরআনের দৃষ্টিতে তারা কোন ধরনের জিন৷

আধুনিক যুগের মুফাস্সিরগণ একথা প্রমাণ করার জন্য কোমর বেঁধে নেমেছেন যে, হযরত সুলায়মানের জন্য যেসব জিন ও শয়তানকে আনুগত করে দেয়া হয়েছিল তারা মানুষ ছিল এবং আশেপাশের বিভিন্ন সম্প্রদায় থেকে তাদেরকে সংগ্রহ করা হয়েছিল৷ কিন্তু কুরআনের শব্দাবলীর মধ্যে তাদের এ ধরনের জটিল অর্থ করার শুধু যে, কোন অবকাশই নেই তাই নয় বরং কুরআনের যেখানেই এ ঘটনাটি এসেছে সেখানে আগে পিছের আলোচনা ও বর্ণনাভংগীই এ অর্থের পথে পরিস্কার অন্তরায় সৃষ্টি করেছে৷ হযরত সুলায়মানের জন্য ইমরাত নির্মাণকারীরা যদি মানুষই হয়ে থাকবে তাহলে তাদের এমন কি বিশেষত্ব ছিল যে, তাদের কথা কুরআন মজীদে এমন বিশেষভাবে বর্ণনা করা হয়েছে? মিসরের পিরমিড থেকে শুরু করে নিউইয়র্কের গগনচুম্বী ইমারতগুলো পর্যন্ত কোনটি মানুষ তৈরী করেনি? অথচ কোন বাদশাহ, ধনকুবের ও বিশ্বখ্যাত ব্যবসায়ীরা জন্য এমন ধরনের "জিন" ও "শয়তান" সরবরাহ করা হয়নি যা হযরত সুলায়মানের জন্য করা হয়েছিল৷
৭৬. হযরত আইয়ুবের (আ) ব্যক্তিত্ব, সময়, জাতীয়তা সব বিষয়েই মতবিরোধ আছে৷ আধুনিক যুগের মুফাস্সিরগণের মধ্য থেকে কেউ তাঁকে ইসরাঈলী গণ্য করেন৷ কেউ বলেন, তিনি মিসরীয় আবার কেউ বলেন আরব ছিলেন৷ কারো মতে, তিনি ছিলেন হযরত মূসার পূর্ববর্তীকালের লোক৷ কেউ বলেন তিনি হযরত দাউদ (আ) ও সুলায়মানের (আ) আমলের লোক৷ আবার কেউ তাঁকে তাদেরও পরবর্তীকালের পুরাতন নিয়মে সংযোজিত ইয়োব তথা আইয়ুবের সিফ্র বা আইয়ূবের সহীফা৷ তার ভাষা, বর্ণনা ভংগী ও বক্তব্য দেখে এসব বিভিন্ন মত প্রতিষ্ঠিত হয়েছে৷ এ ক্ষেত্রে অন্য কোন ঐতিহাসিক প্রমাণ সাক্ষ প্রমাণ নেই৷ এ ইয়োব বা আইয়ুবের সহীফার অবস্থা হচ্ছে এই যে, এর বিষয়বস্তুর মধ্যে রয়েছে বৈপরীত্য এবং এর বর্ণনা কুরআন মজীদের বর্ণনা থেকে এত বেশী ভিন্নতর যে, উভয়কে একসাথে মেনে নেয়া যেতে পারে না৷ কাজেই আমরা এর ওপর একটুও নির্ভর করতে পারি না৷ বড় জোর নির্ভরযোগ্য সাক্ষ যদি কিছু হয় তাহলে তা হচ্ছে এই যে, ইয়াসইয়াহ (যিশাইয়) নবী ও হিয্কীইল (যিহিস্কেল)নবীর সহীফায় তার উল্লেখ করা হয়েছে এবং সহীফা দুটি ঐতিহাসিক দিক দিয়ে বেশী নির্ভরযোগ্য৷ ইয়াসইয়াহ নবী খৃস্টপূর্ব অষ্টম এবং হিযকীইল নবী খৃষ্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকে অতিক্রান্ত হয়েছেন৷ তাই নিশ্চয়তা সহকারে বলা যেতে পারে যে, হযরত আইয়ুব আলাইহিস সালাম খৃষ্টপূর্ব নবমশতক বা এরও পূর্বের নবী ছিলেন৷ তাঁর জাতীয়তা সম্পর্কে বলা যেতে পারে, সূরা নিসার ১৩৬ ও সূরা আনআমের ৮৪ আয়াতে যেভাবে তাঁর আলোচনা এসেছে তা থেকে অনুমান করা যেতে পারে যে, তিনি বনী ইসরাঈলের অন্তরভুক্ত ছিলেন৷ কিন্তু ওহাব ইবনে মুনাববিহের এ বর্ণনাও একেবারে অযৌক্তিক নয় যে, তিনি হযরত ইসহাকের (আ) পুত্র ঈসূর বংশধর ছিলেন৷
৭৭. দোয়ার ধরন অত্যন্ত পবিত্র, সূক্ষ্ম ও নমনীয়! সংক্ষিপ্ত বাক্যের সাধ্যমে নিজের কষ্টের কথা বলে যাচ্ছেন এবং এরপর একথা বলেই থেমে যাচ্ছেন- "তুমি করুণাকারীদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ৷" পরে কেন অভিযোগ ও নালিশ নেই, কোন জিনিসের দাবী নেই৷ দোয়ার এই ভংগিমা যে উন্নত মর্যাদা সম্পন্ন চিত্রটি তুলে ধরে তা হচ্ছে এই যে, কোন পরম ধৈর্যশীল, অল্পে তুষ্ট, ভদ্র ও আত্মমর্যাদা সম্পন্ন ব্যক্তি দিনের পর দিন অনাহার ক্লিষ্টতার দুঃসহ জ্বালায় ব্যাকুল হয়ে কোন পরমদাতা ও দয়ালু ব্যক্তির সামনে কেবলমাত্র এতটুকু বলেই ক্ষান্ত হয়ে যায়, "আমি অনাহারে আছি এবং আপনি বড়ই দানশীল৷" এরপর সে আর মুখে কিছুই উচ্চারণ করতে পারে না৷
৭৮. সূরা সাদের চতুর্থ রুকূ'তে এর যে বিস্তারিত বিবরণ দেয়া হয়েছে তা হচ্ছে এই যে, আল্লাহ তাঁকে বলেনঃ

-----------------------

"নিজের পা দিয়ে আঘাত করো, এ ঠাণ্ডা পানি মজুদ আছে গোসল ও পান করার জন্য৷"

এ থেকে জানা যায়, মাটিতে পা ঠুকবার সাথে সাথেই আল্লাহ তাঁর জন্য একটি প্রাকৃতিক ঝরণা-ধারা প্রবাহিত করেন৷ এ ঝরণার পানির বৈশিষ্ট ছিল এই যে, এ পানি পান ও এতে গোসল করার সাথে সাথেই তিনি রোগমুক্ত হয়ে যান৷ এ রোগ নিরাময়ে এদিকে ইংগিত করে যে, তাঁর কোন মারাত্মক চর্মরোগ হয়েছিল৷ বাইবেলের বর্ণনাও এর সমর্থক৷ বাইবেল বলছে, তাঁর সমস্ত শরীর পা থেকে মাথা পর্যন্ত ফোঁড়ায় ভরে গিয়েছিল৷ (ইয়োব ২:৭)
৭৯. এ কাহিনীর মধ্য দিয়ে কোরআন মজীদ হযরত আইয়ুবকে এমনভাবে পেশ করেছে যার ফলে তাঁকে সবরের প্রতিমূর্তি মনে হয়৷ এরপর কুরআন বলছে, তাঁর জীবন ইবাদাতকারীদের জন্য একটি আদর্শ৷ অন্যদিকে বাইবেলের আইয়ুবের সহীফা (ইয়োব) পড়লে সেখানে এমন এক ব্যক্তির ছবি ফুটে উঠবে যিনি আল্লাহর বিরুদ্ধে অভিযোগে সোচ্চার এবং নিজের বিপদের জন্য আপাদমস্তক ফরিয়াদী হয়ে আছেন৷ বারবার তাঁর মুখ থেকে এ বাক্যটি নিঃসৃত হচ্ছেঃ "বিলুপ্ত হোক সেদিন যেদিন আমার জন্ম হয়েছিল৷" "আমি কেন গর্ভে মনে যাইনি?" "মায়ের পেট থেকে বের হওয়া মাত্র আমি কেন প্রাণত্যাগ করিনি?" বারবার তিনি আল্লাহর বিরুদ্ধে অভিযোগ করছেনঃ "সর্বশক্তিমানের বান আমার ভিতরে প্রবিষ্ট, আমার আত্মা তাঁরই বিষপান করছে, ঈশ্বরীয় ত্রাসদল আমার বিরুদ্ধে শ্রেণীবদ্ধ৷" "হে মানুষ্য দর্শক, আমি যদি পাপ করে থাকি, তবে আমার কর্মে তোমার কি হয়? তুমি কেন আমাকে তোমার শর লক্ষ করেছো? আমিতো আপনার ভার আপনি হয়েছি৷ তুমি আমার অধর্ম ক্ষমা করনা কেন? আমার অপরাধ দূর কর না কেন?" "আমি ঈশ্বরকে বলবো আমাকে দোষী করো না; আমাকে বল আমার সাথে কি কারণে বিবাদ করছো৷ এটা কি ভাল যে, তুমি উপদ্রব করবে? তোমার হস্তনির্মিত বস্তু তুমি তুচ্ছ করবে? দুষ্টগণের মন্ত্রণায় প্রসন্ন হবে?" তাঁর তিন বন্ধু এসে তাঁকে সান্ত্বনা দেন এবং ধৈর্য, আত্মসমর্পণ ও সন্তুষ্টিলাভ করার পরামর্শ দেন৷ কিন্তু তিনি কোন কথা শুনেন না৷ তিনি তাদের পরামর্শের জবাবে আল্লাহর বিরুদ্ধে একের পর এক অভিযোগ আনতে থাকেন এবং তাদের শত বুঝাবার পরও জোর দিয়ে বলতে থাকেন যে, আল্লাহর এ কাজের মধ্যে কোন প্রজ্ঞা ও কল্যাণ নেই, আছে শুধু একটা জুলুম, যা আমার মতো মুত্তাকী ও ইবাদাতকারী ব্যক্তির প্রতি করা হচ্ছে৷ তিনি আল্লাহর ব্যবস্থাপনার কঠোর সমালোচনা করেন এই বলে যে, একদিকে দুষ্কৃতকারীদেরকে অনুগৃতীত করা হয় এবং অন্যদিকে সুকৃতিকারীদেরকে জুলুম নির্যাতনে অতিষ্ঠ করা হয়৷ নিজের সৎকর্মগুলোকে তিনি এক এক করে গণনা করেন তারপর এর প্রতিদানে আল্লাহ তাঁকে যেসব কষ্ট দিয়েছেন সেগুলো বর্ণনা করতে থাকেন এবং এরপর বলেন, আল্লাহর কাছে যদি কোন জবাব থাকে তাহলে তিনি বলুন কোন অপরাধের শাস্তি হিসেবে আমার সাথে এর ব্যবহার করা হয়েছে? নিজের স্রষ্টা ও প্রভুর বিরুদ্ধে তাঁর এ অভিযোগ ধীরে ধীরে এত বেশী বেড়ে যেতে থাকে যে, শেষে তাঁর বন্ধুরা তাঁর কথার জবাব দেয়া বন্ধু করে দেন৷ তারা চুপ করে যান৷ তখন চতুর্থ এক ব্যক্তি, যিনি তাঁদের কথা নিরবে শুনছিলেন, মাঝখান থেকে হস্তক্ষেপ করেন এবং আইয়ুবকে এ ব্যাপারে ভীষণভাবে তিরস্কার করতে থাকেন যে, "তিনি তো আল্লাহকে নয় বরং নিজেকে সঠিক গণ্য করছেন৷" এ ভাষণ শেষ হবার আগেই মাঝখান থেকে আল্লাহ নিজেই বলে ওঠেন এবং তারপর তাঁর ও আইয়ুবের মধ্যে খুব মুখোমুখি বিতর্ক হতে থাকে৷ এ পুরো কাহিনীটি পড়তে পড়তে আমরা একবারও অনুভব করি না যে, আমরা এমন এক অতুলনীয় ধৈর্যশীল নবীর অবস্থা ও কথা পড়ছি যা চিত্র কোনআন ইবাদাতকারীদের জন্য শিক্ষণীয় ও আদর্শ হিসেবে পেশ করেছে৷

বিষ্ময়ের ব্যাপার হচ্ছে, এ পুস্তকের প্রথম অংশ এক ধরনের কথা বলে, মাঝখানের অংশ বলে ভিন্ন কথা এবং শেষে ফলাফল দেখা যায় সম্পূর্ণ অন্য কিছু৷ এ তিন অংশের মধ্যে কোন সামঞ্জস্য ও সাদৃশ্য নেই৷ প্রথম অংশ বলে, আইয়ুব একজন বড়ই সত্যনিষ্ঠ, খোদাভীরু ও কুকর্ম ত্যাগকারী সিদ্ধ পুরুষ ছিলেন৷ এই সংগে তিনি এতই ধনাঢ্য ছিলেন যে, "পূর্ব দেশের লোকদের মধ্যে তিনি ই ছিলেন সর্বাপেক্ষা বড়লোক৷" একদিন আল্লাহর কাছে তাঁর (অর্থাৎ আল্লাহর নিজের পুত্রগণ হাজির হন৷ তাদের সাথে শয়তানও আসে৷ আল্লাহ সেই মজলিসে তাঁর বান্দা আইয়ুবের জন্য গর্ব করেন৷ শয়তান বলে, আপনি তাকে যা কিছু দিয়ে রেখেছেন তারপর সে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ না করলে আ কি করবে? তার প্রতি যেসব অনুগ্রহ করেছেন সেগুলো একবার ছিনিয়ে নেন তারপর দেখুন সে যদি ‌আপনার মুখের ওপর আপনাকে অস্বীকার না করে থাকে তাহলে আমার নাম শয়তান নয়৷ আল্লাহ বলেন, ঠিক আছে তার সব কিছু তোমার হস্তগত করে দেয়া হচ্ছে, শুধুমাত্র তার শারীরিক কোন ক্ষতি করো না৷ শয়তান গিয়ে আইয়ুবের সমস্ত ধন-দওলত ও পরিবার পরিজন ধবংশ করে দেয়৷আইয়ুব সবকিছু থেকে বঞ্চিত হয়ে শুধুমাত্র একাই থেকে যান৷ কিন্তু এতে আইয়ুবের মনে কোন দুঃখ ও ক্ষোভ জাগেনি৷ তিনি আল্লাহকে সিজদা করেন এবং বলেন, "আমি মায়ের গর্ভ থেকে উলংগ এসেছি এবং উলংগই ফিরে যাবো; খোদাই দিয়েছেন আবার খোদাই নিয়েছেন, খোদার নাম ধন্য হোক৷" আবার এক দিন আল্লাহর দরবারে একই ধরনের একটি মজলিস বসে৷ তাঁর ছেলেরা আসে, শয়তানও আসে৷ আল্লাহ শয়তানকে বলেন, আইয়ুব কেমন সত্যনিষ্ঠ প্রমাণিত হয়েছে দেখে নাও৷ শয়তান বলে, আচ্ছা, জবাব, তার শরীরকে একবার বিপদগ্রস্ত করে দেখুন সে আপনার মুখের ওপর আপনার কুফরী করবে৷ আল্লাহ বলুন, ঠিক আছে যাও, তাকে তোমার হাতে দেয়া হচ্ছে, তবে তার প্রাণটি যেন সংরক্ষিত থাকে৷ অতপর শষয়তান ফিরে যায়৷ সে " আইয়ুবকে মাথার চাঁদি থেকে পায়ের তালু পর্যন্ত ভয়ংকর যন্ত্রণাদায়ক ফোড়ায় ভরে দেয়৷" তার স্ত্রী তাকে বলে, "এখনো কি তুমি তোমার সত্যনিষ্ঠার ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকবে? আল্লাহকে অমান্য করো এবং প্রাণত্যাগ করো৷" তিনি জবাব দেন, " তুমি মুঢ়া স্ত্রীর মতো কথা বলছো৷ আমরা কি আল্লাহর কাছ থেকে শুধু সুখ পাবো, দুঃখ পাবো না৷"

এ হচ্ছে আইয়ুবের সহীফার (ইয়োব পুস্তক) প্রথম ও দ্বিতীয় অধ্যায়ের সংক্ষিপ্ত সার৷ কিন্তু এরপর তৃতীয় অধ্যায়ে একটি ভিন্নতর বিষয়বস্তু শুরু হয়েছে৷ এটি বিয়াল্লিশতম অধ্যায় পর্যন্ত ছড়িয়ে রয়েছে৷ এসব অধ্যায়ে হযরত আইয়ুবের ধৈর্যহীনতা এবং আল্লাহর বিরুদ্ধে অভিযোগ ও দোষারোপের একটি ধারাবাহিক কাহিনী বর্ণনা করা হয়েছে৷ তা থেকে একথা পুরোপুরি প্রমাণিত হয়ে যায় যে, হযরত আইয়ুবের সম্পর্কে আল্লাহর অনুমান ভুল ও শয়তানের অনুমান সঠিক ছিল৷ তারপর বিয়াল্লিশতম অধ্যায়ের শেষের দিকে আল্লাহর সাথে একচোট তর্ক বিতর্ক করার পর ধৈর্য, কৃতজ্ঞতা ও তাওয়াক্কুলের ভিত্তিতে নয় বরং আল্লাহর তিরস্কার ও ধমক খেয়ে আইয়ুব তাঁর কাছ থেকে ক্ষমা চেয়ে নেন এবং তিনি তা গ্রহণ করে তার সমস্ত কষ্ট দূর করে দেন৷ এরপর তাকে পূর্বের চেয়ে কয়েকগুণ বেশী সম্পদ তাকে দান করেন৷ এ শেষ অংশটি পড়তে গিয়ে মনে হবে আইয়ুব ও আল্লাহ উভয়েই শয়তানের চ্যালেঞ্জের মোকাবিলায় ব্যর্থ প্রমাণিত হয়েছেন৷ তারপর নেহাত নিজের কথা রাখার জন্যই আল্লাহ ধমক দিয়ে তাকে মাফ চাইতে বাধ্য করেন এবং মাফ চাওয়ার সাথে সাথেই তা গ্রহণ করে নেন, যাতে শয়তানের সামনে তাঁকে লজ্জিত হতে না হয়৷

এ পুস্তকটি নিজ মুখেই একথা ঘোষণা করছে যে, এটি আল্লাহর বা হযরত আইয়ুবের বাণী নয়৷ বরং হযরত আইয়ুবের জামানার বইও নয় এটি৷ তাঁর ইন্তেকালের শত শত বছর পরে কোন একট ব্যক্তি আইয়ুবের ঘটনাকে ভিত্তি করে "ইউসুফ যোলায়কা" ধরনের একটি চমকপ্রদ কাহিনী কাব্য রচনা করেন৷ তাতে আইয়ুব (ইয়োব), তৈমনীয় ইলীফস, শূহীয় বিলদদ, নামাথীয় সোফর, বুষীয় বারখেলের পুত্র ইলীহূ প্রমুখ কয়েকটি চরিত্র উপস্থাপন করে তাদের মুখ দিয়ে বিশ্ব-জাহানের ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে আসলে তিনি নিজের মনগড়া দর্শন বর্ণনা করেছেন৷ তার কাব্য প্রতিভা ও চমৎকার বর্ণনা ভংগীর যতই প্রশংসা করতে পারেন করুন কিন্তু তাকে পবিত্র কিতাব ও আসমানী সহীফার অন্তরভুক্ত করার কোন অর্থ নেই৷ আইয়ুব আলাইহিস সালামের জীবনী ও সীরাতের সাথে তার সম্পর্ক ঠিক ততটুকু যতটুকু সম্পর্ক আছে "ইউসুফ যোলায়খা"র সাথে ইউসুফ আলাইহিস সালামের৷ বরং সম্ভবত অতটুকুও নেই৷ বড়জোর আমরা এতটুকু বলতে পারি যে, এ পুস্তকের প্রথম ও শেষ অংশে যেসব ঘটনা বলা হয়েছে তার মধ্যে সঠিক ইতিহাসের একটি উপাদান পাওয়া যায়৷ কবি তা শ্রুতি থেকে গ্রহণ করে থাকবেন, যা তাঁর যুগে মুখে মুখে প্রচলিত ছিল অথবা বর্তমানে দুষ্প্রাপ্য এমন কোন সহীফাহ থেকে নিয়ে থাকবেন৷
৮০. ব্যাখ্যার জন্য দেখুন তাফহীমুল কুরআন সূরা রূমের ৩৩ টীকা৷
৮১. "যুল কিফ্‌ল"- এর শাব্দিক অনুবাদ হচ্ছে "ভাগ্যবান" এবং অর্থ হচ্ছে নৈতিক মাহাত্ম ও পরকালীন সওয়াবের দৃষ্টিতে ভাগ্যবান, পার্থিব স্বার্থ ও লাভের দৃষ্টিতে নয়৷ এটি সংশ্লিষ্ট মনীষীর নাম নয় বরং তাঁর উপাধি৷ কুরআন মজীদে দু'জায়গায় তাঁর কথা বলা হয়েছে৷ দু'জায়গায়ই তাঁকে এ উপাধির মাধ্যমে স্মরণ করা হয়েছে, নামের সাহায্যে নয়৷

কে এই যুল কিফ্‌ল? কি তাঁর পরিচয়? কেন দেশ ও জাতির সাথে তাঁর সম্পর্ক ছিল? তিনি কোন যুগের লোক ছিলেন? এ সম্পর্কে মুফাসসিরগণের উক্তিগুলো বড় বেশী বিক্ষিপ্ত৷ কেউ বলেন, এটি হযরত যাকারিয়ার (আ) দ্বিতীয় নাম (অথচ এটি একটি সুষ্পষ্ট ভুল কথা৷ কারণ, তাঁর আলোচনা এর পরই সামনের দিকে আসছে)৷ কেউ বলেন, তিনি হচ্ছেন হযরত ইলিয়াস (আ)৷ কেউ ইউশা'ইবনে নূনের নাম নেন৷ কেউ বলেন, তিনি আল ইয়াস' (অথচ এটিও ভুল৷ কারণ, সূরা সা'দ-এ তাঁর কাথাও "যুল কিফল"-এর কথা আলাদা আলাদা করে বলা হয়েছে৷) কেউ তাঁকে হযরত আল ইয়াসার (আ) খলীফা বলেন৷ আবার কারো বক্তব্য হচ্ছে, তিনি ছিলেন হযরত আইয়ুবের ছেলে৷ হযরত আইয়ুবের (আ) পরে তিনি নবী হন এবং তাঁর আসল নাম ছিল বিশ্‌র৷ আল্লাম আলূসী তাঁর রূহুল মা'আনী গ্রন্থে লিখেছেনঃ "ইহুদীদের দাবী হচ্ছে, তিনি হিয্‌কিইল (যিহিস্কেল) নবী৷ বনী ইসরাঈলদের পরাধীনতার (৫৯৭ খৃঃ পূঃ) যুগে তিনি নবুওয়াতের মর্যাদায় অভিসিক্ত হন এবং খাবুর (কবার) নদীর তীরে একটি জনপদে নবুওয়াতের দায়িত্ব পালন করতে থাকেন৷"

এ বিভিন্ন উক্তি ও মতামতের ভিত্তিতে তিনি যথার্থই কোন নবী ছিলেন নিশ্চিত নির্ভরতার সাথে বলা যেতে পারে না৷ বর্তমান যুগের মুফাসসিরগণ হিয্‌কিইল নবীর দিকে ঝুঁকে পড়েছেন৷ কিন্তু এ মত গ্রহণের পক্ষে আমি কোন ন্যায় সংগত যুক্তি-প্রমাণ পেলাম না৷ তবুও এর সপক্ষে কোন যথাযথ প্রমাণ পেলে এ মতটিকে অগ্রাধিকার দেয়া যেতে পারে৷ কারণ, বাইবেলের হিযকিইল সহীফাটি দেখলে মনে হয় যথাযথই এ আয়াতে তাঁর যে প্রশংসা করা হয়েছে তিনি তার হকদার অর্থাৎ ধৈর্যশীল ও সৎকর্মপরায়ণ৷ জেরুসালেম শেষ বার ধবংস হবার আগে বখতে নসরের হাতে যারা গ্রেফতার হয়েছিল তিনি ছিলেন তাদের একজন৷ বখতে নসর ইরাকে ইসরাঈলী কয়েদীদের একটি উপনিবেশ গড়ে তুলেছিল খাবুর (কবার) নদীর তীরে৷ এর নাম ছিল তেলআবীব৷ এর স্থানেই ৫৯৪ খৃষ্টপূর্বাব্দে হযরত হিযকিইল নবুওয়াতের মর্যাদায় অভিসিক্ত হন৷ তখন তাঁর বয়স ছিল ৩০ বছর৷ অবিশ্রান্তভাবে ২২ বছর ধরে তিনি একদিকে বিপদগ্রস্থ ইসরাঈলীদেরকে এবং অন্যদিকে জেরুসালেমের গাফেল ও অস্থির-বিহবল অধিবাসী ও শাসকদেরকে সজাগ করা দায়িত্ব পালন করতে থাকেন৷ এ মহান দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে তাঁর নিষ্ঠা ও আত্মনিমগ্নতা অবশ্যি প্রণিধানযোগ্য৷ একটি ঘটনা থেকে এ বিষয়টি অনুমান করা যেতে পারে৷ নবুওয়াতের নবম বছরে তাঁর স্ত্রী, যাতে তিনি নিজেই বলেন, "নয়নের প্রীতি পাত্র" ইন্তিকাল করেন৷ লোকেরা শোক প্রকাশের জন্য তাঁর বাড়িতে জমায়েত হয়৷ এদিকে তিনি নিজের মানসিক যন্ত্রণা ও শোকের কথা বাদ দিয়ে নিজের সম্প্রদায়কে আল্লাহর আযাবের ভয় দেখাতে থাকেন৷ এ আযাব সে সময় তাদের মাথার ওপর ঝুলছিল৷ (২৪ : ১৫-২৭) বাইবেলের যিহিস্কেল পুস্তক এমন একটি পুস্তক যা পড়ে মনে হয় সত্যি একটি আল্লাহর কালাম৷
৮২. অর্থাৎ হযরত ইউনুস (আ)৷ কোথাও সরাসরি তাঁর নাম নেয়া হয়েছে আবার কোথাও "যুন্নুন" ও " সাহেবুল হূত" বা মাছওয়ালা উপাধির মাধ্যমে তাঁকে স্মরণ করা হয়েছে৷ তিনি মাছ ধরতেন বা বেচতেন বলে তাঁকে মাছওয়ালা বলা হতো না বরং আল্লাহর হুকুমে একটি মাছ তাঁকে গিলে ফেলেছিল, তাই তাঁকে বলা হয়েছে মাছওয়ালা৷ সূরা সাফফাতের ১৪২ আয়াতে একথা বর্ণনা করা হয়েছে৷ আরো বেশী জানার জন্য দেখুন তাফহীমুল কুরআন, সূরা ইউনস ৯৮-১০০ এবং আস্‌ সাফ্‌ফাত ৭৭-৮৫ টীকা৷
৮৩. অর্থাৎ তিনি নিজের সম্প্রদায়ের প্রতি অসন্তুষ্ট হয়ে চলে যান৷ আল্লাহর পক্ষ থেকে তখনো হিজরত করার হুকুম আসেনি, যার ফলে তাঁর পক্ষ থেকে নিজের কর্তব্য ত্যাগ করা জায়েয হতে পারতো৷
৮৪. তিনি মনে করেছিলেন, আমার সম্প্রদায়ের ওপর আল্লাহর আযাব এসে যাচ্ছে৷ এখন আমাকে কোথাও গিয়ে আশ্রয় নেয়া উচিত৷ নাহলে আমি নিজেও আযাবের মধ্যে ঘেরাও হয়ে যাবো৷ নীতিগতভাবে এ বিষয়টি তো পাকড়াওযোগ্য ছিল না৷ কিন্তু নবীর পক্ষে আল্লাহর হুকুম ছাড়া দায়িত্ব ছেড়ে চলে যাওয়া ছিল পাকড়াওযোগ্য৷
৮৫. অর্থাৎ মাছের পেটের মধ্যে থেকে সেখানে তো অন্ধকার ছিলই, তার ওপর ছিল সাগরের অন্ধকার৷
৮৬. ব্যাখ্যার জন্য দেখুন তাফহীমুল কুরআন, সূরা আলে ইমরান ৩৭ থেকে ৪১ আয়াত টীকা সহ, সূরা মার্‌য়াম ২ থেকে ১৫ আয়াত টীকাসহ৷ স্ত্রীকে যোগ্য করে দেয়ার অর্থ হচ্ছে, তার বন্ধ্যাত্ব দূর করে দেয়া এবং বার্ধক্য সত্ত্বেও তাকে গর্ভধারণের উপযোগী করা৷ "সবচেয়ে ভালো উত্তরাধিকারী তুমিই" মানে হচ্ছে, তুমি সন্তান না দিলে কোন দুঃখ নেই৷ তোমার পবিত্র সত্তা-উত্তরাধিকারী হবার জন্য যথেষ্ট৷
৮৭. এই প্রেক্ষাপটে যে উদ্দেশ্যে নবীদের উল্লেখ করা হয়েছে তা আবার স্মৃতিপটে জাগিয়ে তুলুন৷ হযরত যাকারিয়ার (আ) ঘটনা উল্লেখ করার উদ্দেশ্য হচ্ছে একথা হৃদয়ংগম করানো যে, এসকল নবীই ছিলেন নিছক বান্দা ও মানুষ ইলাহী সার্বভৌমত্বের সামান্যতম গন্ধও তাদের মধ্যে ছিল না৷ তারা অন্যদেরকে সন্তান দান করতেন না বরং নিজেরাই আল্লাহর সামনে সন্তানের জন্য হাত পাততেন৷ হযরত ইউনুসের কথা এ জন্য বলা হয়েছে যে, একজন মহিমান্বিত নবী হওয়া সত্ত্বেও যখন তিনি ভুল করে বসলেন তখন তাকে পাকড়াও করা হলো এবং যখন তিনি নিজের রবের সামনে অবনত হলেন তখন তাঁর প্রতি অনুগ্রহও এমনভাবে করা হয়েছে যে, মাছের পেট থেকে তাঁকে জীবিত বের করে আনা হয়েছে৷ হযরত আইয়ুবের উল্লেখ এ জন্য করা হয়েছে যে, নবীর বিপদে পড়া কোন অভিনব ব্যাপার নয় এবং নবীও যখন বিপদে পড়েন তখন একমাত্র আল্লাহরই সামনে ত্রাণের জন্য হাত বাড়িয়ে দেন৷ তিনি অন্যের ত্রাণকারী নন বরং আল্লাহর কাছে ত্রাণ ভিক্ষাকারী৷ তারপর এসব কথার সাথে সাথে একদিকে এ সত্যটি মনে বদ্ধমূল করতে চাওয়া হয়েছে যে, এ সকল নবীই ছিলেন তাওহীদের প্রবক্তা এবং নিজেদের প্রয়োজন তাঁরা এক আল্লাহ ছাড়া আর কারো সামনে পেশ করতেন না আবার অন্যদিকে একথাও বুঝিয়ে দেয়া কাম্য যে, আল্লাহ হামেশা অস্বাভাবিকভাবে নিজের নবীদেরকে সাহায্য করতে থেকেছেন৷ শুরুতে তাঁর যতই পরীক্ষার সম্মুখীন হোন না কেন শেষ পর্যন্ত অলৌকিক পদ্ধতিতে তাঁদের প্রার্থনা পূর্ণ হয়েছে৷
৮৮. এখানে হযরত মার্‌য়াম আলাইহিস সালামের কথা বলা হয়েছে৷
৮৯. হযরত আদম আলাইহিস সালাম সম্পর্কেও বলা হয়েছেঃ

-------------------------

"আমি মাটি থেকে একটি মানুষ তৈরি করছি৷ কাজেই (হে ফেরেশতারা!) যখন আমি তাকে পূর্ণরূপে তৈরি করে নেবো এবং তার মধ্যে নিজের রূহ ফুঁকে দেবো তখন তোমরা তার সামনে সিজদায় অবনত হয়ে যাবে৷"(সাদঃ ৭১-৭২)

একথাই হযরত ঈসা সম্পর্কে বিভিন্ন স্থানে বলা হয়েছে৷ সূরা নিসার বলা হয়েছেঃ

---------------------------------

"আল্লাহর রসূল এবং তাঁর ফরমান, যা মার্‌য়ামের কাছে পাঠিয়েছিলেন এবং তার পক্ষ থেকে একটি রূহ৷" (১৭১ আয়াত)

সূরা তাহরীমে বলা হয়েছেঃ

-----------------------------

"আর ইমরানের মেয়ে মার্‌য়াম, যে নিজের লজ্জাস্থানের হেফাজত করেছিল, কাজেই ফুঁকে দিলাম আমি তার মধ্যে নিজের রূহ৷" (১২ আয়াত)

এ সংগে এ বিষয়টিও সামনে থাকা দরকার যে, মহান আল্লাহর হযরত ঈসা (আ) ও হযরত আদমের (আ) জন্মকে পরস্পরের সদৃশ গণ্য করেন৷ তাই সূরা আলে ইমরানে বলেনঃ

------------------------

"ঈসার দৃষ্টান্ত আল্লাহর কাছে আদমের মতো, যাকে আল্লাহ মাটি থেকে তৈরি করেন তারপর বলেন, "হয়ে যাও" এবং সে হয়ে যায়৷ (৫৯ আয়াত)

এসব আয়াত নিয়ে চিন্তা-গবেষণা করলে একথা বুঝা যায় যে, স্বাভাবিক সৃস্টি পদ্ধতির পরিবর্তে যখন আল্লাহ কাউকে নিজের হুকুমের সাহায্যে অস্তিত্বশীল করে জীবন দান করেন তখন একে "নিজের রূহ থেকে ফুঁকে দিয়েছি" শব্দাবলীর সাহায্যে বিবৃত করেন৷ এ রূহের সম্পর্ক আল্লাহর সাথে সম্ভবত এ জন্য করা হয়েছে যে, এর ফুঁকে দেওয়াটা অলৌকিক ধরনের৷ আরো বেশী ব্যাখ্যার জন্য দেখুন তাফহীমুল কুরআন, সূরা নিসা, ২১২-২১৩ টীকা৷
৯০. অর্থাৎ তারা মা ও ছেলে দু'জনের কেউই আল্লাহ বা আল্লাহর সার্বভৌম কর্তৃত্বে শরীক ছিলেন না বরং আল্লাহর নিদর্শনাবলীর মধ্যে একটি নিদর্শন ছিলেন৷ তারা কোন অর্থে নিদর্শন ছিলেন? এর ব্যাখ্যা জানার জন্য দেখুন তাফহীমুল কুরআন সূরা মার্‌য়াম ২১ এবং সূরা আল মু'মিনূন ৪৩ টীকা৷
৯১. এখানে "তোমরা" শব্দের মাধ্যমে সম্বোধন করা হয়েছে সমগ্র মানবতাকে৷ এর অর্থ হচ্ছে, হে মানব জাতি! তোমরা সবাই আসলে একই দল ও একই মিল্লাতের অন্তরভুক্ত৷ দুনিয়ায় যত নবী এসেছেন তাঁর সবাই একই দীন ও জীবন বিধান নিয়ে এসেছেন৷ আর তাঁদের সেই আসল দীন এই ছিলঃ কেবলমাত্র এক ও একক আল্লাহই মানুষের রব এবং এক আল্লাহরই বন্দেগী ও পূজা করা উচিত৷ পরবর্তীকালে যতগুলো ধর্ম তৈরি হয়েছে সবগুলোই এ দীনেরই বিকৃত রূপ৷ কেউ এর কোন একটি জিনিস নিয়েছে, কেউ অন্যটি, আবার কেউ তৃতীয়টি৷ এদের প্রত্যেকে আবার এই দীনের একটি অংশ নিয়ে তার সাথে নিজের পক্ষ থেকে অনেক কিছু মিশিয়ে দিয়েছে৷ এভাবে এই অসংশ দীন ও মিল্লাতের সৃষ্টি হয়েছে৷ এখন অমুক নবী অমুক ধর্মের প্রবর্তক, অমুক নবী অমুক ধর্মের ভিত গড়েছেন, এ ধরনের কথা নিছক বিভ্রান্ত চিন্তার ফসল ছাড়া আর কিছুই নয়৷ এই সব দীন ও মিল্লাত নিজেদেরকে বিভিন্ন ভাষা ও বিভিন্ন দেশের নবীদের সাথে সম্পৃক্ত করছে বলেই এ কথা প্রমাণিত হয় না যে, বিশ্বব্যাপী ধর্মীয় বিভিন্নতা নবীদের সৃষ্টি৷ আল্লাহর প্রেরিত নবীগণ দশটি বিভিন্ন ধর্ম সৃষ্টি করতে পারেন না৷ তাঁরা এক আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো বন্দেগী করার শিক্ষা দিতে পারেন না৷