(২১:৫১) এরও আগে আমি ইবরাহীমকে শুভ বুদ্ধি ও সত্যের জ্ঞান দান করেছিলাম এবং আমি তাকে খুব ভালোভাবেই জানতাম৷৫৩
(২১:৫২) সে সময়ের কথা স্মরণ করো ৫৪ যখন সে তার নিজের বাপকে ও জাতিকে বলেছিল, “এ মূর্তিগুলো কেমন, যেগুলোর প্রতি তোমরা ভক্তিতে গদগদ হচ্ছো ?”
(২১:৫৩) তারা জবাব দিলঃ “আমাদের বাপ-দাদাদেরকে আমরা এদের ইবাদাতরত অবস্থায় পেয়েছি৷”
(২১:৫৪) সে বললো, তোমরাও পথভ্রষ্ট এবং তোমাদের বাপ-দাদারাও সুস্পষ্ট ভ্রষ্টতার মধ্যেই অবস্থান করছিল৷”
(২১:৫৫) তারা বললো, তুমি কি আমাদের সামনে তোমার প্রকৃত মনের কথা বলছো, না নিছক কৌতুক করছো ?৫৫
(২১:৫৬) সে জবাব দিল, “না, বরং আসলে তোমাদের রব তিনিই যিনি পৃথিবী ও আকাশের রব এবং এদের স্রষ্টা৷ এর স্বপক্ষে আমি তোমাদের সামনে সাক্ষ দিচ্ছি৷
(২১:৫৭) আর আল্লাহর কসম, তোমাদের অনুপস্থিতিতে আমি তোমাদের মূর্তিগুলোর ব্যাপারে অবশ্যি ব্যবস্থা গ্রহণ করবো৷”৫৬
(২১:৫৮) সে অনুসারে সে সেগুলোকে ভেঙে টুকরো টুকরো করে ফেললো ৫৭ এবং শুধুমাত্র বড়টিকে ছেড়ে দিল, যাতে তারা হয়তো তার দিকে ফিরে আসতে পারে৷৫৮
(২১:৫৯) (তারা এসে মূর্তিগুলোর এ অবস্থা দেখে) বলতে লাগলো, “আমাদের ইলাহদের এ অবস্থা করলো কে, বড়ই জালেম সে৷”
(২১:৬০) (কেউ কেউ) বললো, “আমরা এক যুবককে এদের কথা বলতে শুনেছিলাম, তার নাম ইবরাহীম৷”
(২১:৬১) তারা বললো, “তাহলে তাকে ধরে নিয়ে এসো সবার সামনে, যাতে লোকেরা দেখে নেয়” (কিভাবে তাকে শাস্তি দেয়া হয়)৷৫৯
(২১:৬২) (ইবরাহীমকে নিয়ে আসার পর) তারা জিজ্ঞেস করলো, “ওহে ইবরাহীম! তুমি কি আমাদের ইলাহদের সাথে এ কাণ্ড করেছো ?”
(২১:৬৩) সে জবাব দিল, “বরং এসব কিছু এদের এ সরদারটি করেছে, এদেরকেই জিজ্ঞেস করো, যদি এরা কথা বলতে পারে৷”৬০
(২১:৬৪) একথা শুনে তারা নিজেদের বিবেকের দিকে ফিরলো এবং (মনে মনে) বলতে লাগলো, “সত্যিই তোমরা নিজেরাই জালেম৷”
(২১:৬৫) কিন্তু আবার তাদের মত পাল্টে গেলো ৬১ এবং বলতে থাকলো, “তুমি জানো, এরা কথা বলে না৷”
(২১:৬৬) ইবরাহীম বললো, “তাহলে তোমরা কি আল্লাহকে বাদ দিয়ে এমনসব জিনিসের পূজা করছো যারা তোমাদের না উপকার করতে পারে, না ক্ষতি ?
(২১:৬৭) ধিক তোমাদেরকে এবং আল্লাহকে বাদ দিয়ে যেসব উপাস্যের তোমরা পূজা করছো তাদেরকে৷ তোমাদের কি একটুও বুদ্ধি নেই ?”
(২১:৬৮) তারা বললো, “পুড়িয়ে ফেলো একে এবং সাহায্য করো তোমাদের উপাস্যদেরকে, যদি তোমরা কিছু করতে চাও৷”
(২১:৬৯) আমি বললামঃ “হে আগুন! ঠাণ্ডা হয়ে যাও এবং নিরাপদ হয়ে যাও ইবরাহীমের জন্য৷” ৬২
(২১:৭০) তারা চাচ্ছিল ইবরাহীমের ক্ষতি করতে কিন্তু আমি তাদেরকে ভীষণভাবে ব্যর্থ করে দিলাম৷
(২১:৭১) আর আমি তাকে ও লূতকে ৬৩ বাঁচিয়ে এমন দেশের দিকে নিয়ে গেলাম যেখানে আমি দুনিয়াবাসীদের জন্য বরকত রেখেছিলাম৷৬৪
(২১:৭২) আর তাকে আমি ইসহাক দান করলাম এবং এর ওপর অতিরিক্ত ইয়াকুব ৬৫ এবং প্রত্যেককে করলাম সৎকর্মশীল৷
(২১:৭৩) আর আমি তাদেরকে নেতা বানিয়ে দিলাম, তারা আমার নির্দেশ অনুসারে পথনির্দেশা দিতো এবং আমি তাদেরকে অহীর মাধ্যমে সৎকাজের, নামায কায়েম করার ও যাকাত দেবার নির্দেশ দিয়েছিলাম এবং তারা আমার ইবাদাত করতো৷৬৬
(২১:৭৪) আর লূতকে আমি প্রজ্ঞা ও জ্ঞান দান করেছিলাম ৬৭ এবং তাকে এমন জনপদ থেকে উদ্ধার করেছিলাম যার অধিবাসীরা বদ কাজে লিপ্ত ছিল-আসলে তারা ছিল বড়ই দুরাচারী পাপিষ্ঠ জাতি
(২১:৭৫) আর লূতকে আমি নিজের রহমতের আওতায় নিয়ে নিয়েছিলাম, সে ছিল সৎকর্মশীলদের অন্তরভুক্ত৷
৫৩. আমি এখানে () শব্দের অনুবাদ করেছি "শুভবুদ্ধি ও সত্যের জ্ঞান" রুশদ এর অর্থ হচ্ছে সঠিক ও বেঠিকের মধ্যে পার্থক্য করে সঠিক কথা বা পথ অবলম্বন করা এবং বেঠিক কথা ও পথ থেকে দূরে সরে যাওয়া৷ এ অর্থের প্রেক্ষিতে "রুশদ" এর অনুবাদ "সত্যানিষ্ঠা"ও হতে পারে৷ কিন্তু যেহেতু রুশদ শব্দটি কেবলমাত্র সত্যনিষ্ঠ নয় বরং এমন সত্যজ্ঞানের ভাব প্রকাশ করে যা হয় সঠিক চিন্তা ও ভারসাম্যপূর্ণ সুষ্ঠু বুদ্ধি ব্যবহারের ফলশ্রুতি তাই আমি "শুভবুদ্ধি ও সত্যের জ্ঞান" এই দু'টি শব্দকে একত্র এর অর্থের কাছাকাছি পেয়েছি৷

"ইবরাহীমকে তার সত্যজ্ঞান ও শুভবুদ্ধি দান করেছিলাম"৷ অর্থাৎ সে যে সত্যের জ্ঞান ও শুভবুদ্ধির অধিকারী ছিল তা আমিই তাকে দান করেছিলাম৷

"আমি তাকে খুব ভালোভাবে জানতাম"৷ অর্থাৎ আমি চোখ বন্ধ করে তাকে এ দান করিনি৷ আমি জানতাম সে কেমন লোক৷ সব জেনেশুনেই তাকে দান করেছিলাম৷ ()"আল্লাহ ভালো জানেন নিজের রিসালাত কাকে সোপর্দ করবেন"৷ (আন'আমঃ ১২৪) এর মধ্যে কুরাইশ সরদাররা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বিরুদ্ধে যে আপত্তি করতো তার প্রতি সুক্ষ্ম ইংগিত রয়েছে৷ তারা বলতো, এ ব্যক্তির মধ্যে এমন কি অসাধারণ বৈশিষ্ট আছে যে, আল্লাহ আমাদের বাদ দিয়ে তাকেই রিসালাতের মর্যাদায় অভিসিক্ত করেছেন? এর জবাব কুরআনের বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন পদ্ধতিতে দেয়া হয়েছে৷ এখানে কেবলমাত্র এতটুকু সূক্ষ্ম ইংগিত করেই ছেড়ে দেয়া হয়েছে যে, এ প্রশ্ন ইবরাহীম সম্পর্কেও হতে পারতো৷ বলা যেতে পারতো যে, সারা ইরাক দেশে একমাত্র ইবরাহীমকেই কেন এ অনুগ্রহে অভিসিক্ত করা হলো? কিন্তু আমি জানতাম ইবরাহীমের মধ্যে কি যোগ্যতা আছে৷ তাই তার সমগ্র জাতির মধ্য থেকে একমাত্র তাকেই এ অনুগ্রহ দান করার জন্য বাছাই করা হয়৷

ইতিপূর্বে হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালামের পবিত্র সীরাতের বিভিন্ন দিক সূরা বাকারার ১২৪ ও ১৪১ ও ২৫৮ থেকে ২৬০, আন'আমের ৭৪ থেকে ৮১, তাওবার, ১১৪, হূদের, ৬৯ থেকে ৭৪, ইবরাহীমের ৩৫ থেকে ৪১, আল হিজরের ৫১ থেকে ৬০ এবং আন নাহলের ১২০ থেকে ১২৩ আয়তে আলোচিত হয়েছে৷ এর ওপর একবার চোখ বুলিয়ে নিলে ভালো হবে৷
৫৪. সামনের দিকে যে ঘটনার কথা বলা হচ্ছে, তা পড়ার আগে একথাগুলো মনের মধ্যে তাজা করে নিতে হবে যে, কুরাইশরা হযরত ইবরাহীমের সন্তান ছিল৷ কাবাঘর তিনিই নির্মাণ করেছিলেন৷ আর ইবরাহীমের আওলাদও ইবরাহীমী কাবার খাদেম হবার কারণেই কুরাইশরা যাবতীয় সম্মান ও প্রতিপত্তি লাভ করেছিল৷ আজ এ যুগে এবং আরবের বহু দুরবর্তী এলাকার পরিবেশে হযরত ইবরাহীমের এ কাহিনী শুধুমাত্র একটি শিক্ষণীয় ঐতিহাসিক ঘটনা হিসেবেই দেখা যায় কিন্তু যে যুগে ও পরিবেশে প্রথম প্রথম একথা বলা হয়েছিল, তা দৃষ্টি সমক্ষে রাখলে অনুভূত হবে যে, কুরাইশদের ধর্ম ও তাদের পৌরহিত্যের ওপর এটা এমন একটা তীক্ষ্ণ কশাঘাত ছিল, যা একেবারে তার মর্মমূলে আঘাত হানতো৷
৫৫. এ বাক্যটির শাব্দিক অনুবাদ হবে, "তুমি কি আমাদের সামনে সত্য পেশ করছো, না খেলা, করছো?" কিন্তু এর আসল অর্থ ওটাই যা উপরে অনুবাদে বলা হয়েছে৷ নিজেদের ধর্মের সত্যতার প্রতি তাদের বিশ্বাস এত বেশী ছিল যে, তারা গুরুত্ব সহকারে কেউ এ কথা বলতে পারে বলে কল্পনাও করতে প্রস্তুত ছিল না৷ তাই তারা বললো, তুমি নিছক ঠাট্টা-বিদ্রূপ ও খেলা-তামাশা করছো, না কি প্রকৃতপক্ষে এটাই তোমার চিন্তাধারা?
৫৬. অর্থাৎ যদি তোমরা যুক্তির সাহায্যে কথা বুঝতে অপারগ হয়ে থাকো তাহলে আমি তোমাদেরকে কার্যত দেখিয়ে দেবো যে, এরা অসহায়, সামান্যতম ক্ষমতাও এদের নেই এবং এদেরকে ইলাহ হিসেবে গ্রহণ করা ঠিক নয়৷ তবে বাস্তব, অভিজ্ঞতাও প্রত্যক্ষ দর্শনের মধ্যে একথা তাদের সামনে কেমন করে প্রমাণ করবেন, এর কোন বিস্তারিত বিবরণ হযরত ইবরাহীম (আ) এ সময় দেননি৷
৫৭. অর্থাৎ যে সময় পূজারী ও রক্ষণাবেক্ষণকারীরা উপস্থিত ছিল না সে সময় সুযোগ পেয়েই হযরত ইবরাহীম (আ) তাদের কেন্দ্রীয় ঠাকুরঘরে প্রবেশ করলেন এবং মূর্তিগুলো ভেঙ্গে ফেললেন৷
৫৮. "তার দিকে"কথাটির মধ্যে যে ইংগিত রয়েছ তা বড় মূর্তির দিকেও হতে পারে আবার হযরত ইবরাহীমের দিকেও৷ যদি প্রথমটি হয় তাহলে এটি হবে হযরত ইবরাহীমের পক্ষ থেকে তাদের আকীদা বিশ্বাসের প্রতি একটি বিদ্রূপাত্মক কটাক্ষের সমার্থক৷ অর্থাৎ যদি তারা মনে করে থাকে সত্যিই এরা ইলাহ, তাহলে তাদের এ বড় ইলাহটির ব্যাপারে সন্দেহ হওয়া উচিত যে, সম্ভবত বড় ইলাহ কোন কারণে ছোট ইলাহদের প্রতি বিরূপ হয়ে গিয়ে তাদের সবাইকে কচুকাটা করে ফেলেছেন৷ অথবা বড় ইলাহটিকে জিজ্ঞেস করো যে, হুযুর! আপনার উপস্থিতিতে একি ঘটে গেলো? কে এ কাজ করলো? আপনি তাকে বাধা দিলেন না কে? আর যদি দ্বিতীয় অর্থটি গ্রহণ করা হয় তাহলে বুঝা যাবে যে, এ কাজের মাধ্যমে হযরত ইবরাহীমের উদ্দেশ্য এই ছিল যে, নিজেদের মূর্তিগুলোর এ দুরবস্থা দেখে হয়তো তাদের দৃষ্টি আমার দিকে ফিরে আসবে এবং তারা আমাকে জিজ্ঞাসাবাদ করবে, তখন তাদের সাথে স্পষ্ট ভাষায় কথা বলার সুযোগ আমি পেয়ে যাবো৷
৫৯. এভাবে হযরত ইবরাহীমের মনের আশাই যেন পূরণ হলো৷ কারণ তিনি এটিই চাচ্ছিলেন৷ ব্যাপরটিকে তিনি শুধু পুরোহিত ও পূজারীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে চাচ্ছিলেন না৷ বরং তিনি চাচ্ছিলেন, ব্যাপারটি সাধারণ মানুষের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়ুক৷ তারাও আসুক, দেখে নিক এই যে মূর্তিগুলোকে তাদের অভাব পূরণকারী হিসেবে রাখা হয়েছে এরা কতটা অসহায় এবং স্বয়ং পুরোহিতরাই এদের সম্পর্কে কি ধারণা পোষণ করে৷ এভাবে এ পুরোহিতরাও ফেরাউনের মতো একই ভুল করলো৷ ফেরাউন যাদুকরদের সাথে হযরত মূসাকে (আ) প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ করার জন্য সারা দেশের মানুষকে একত্র করেছিলো, এরাও হযরত ইবরাহীমের মামলা শোনার জন্য সারা দেশের মানুষকে একত্র করলো৷ সেখানে হযরত মূসা সবার সামনে একথা প্রমাণ করার সুযোগ পেয়ে গিয়েছিলেন যে, তিনি যা কিছু এনেছেন তা যাদু নয় বরং মু'জিযা৷ এখানে হযরত ইবরাহীমকেও তার শত্রুরাই সুযোগ দিয়ে দিল যেন জনগণের সামনে তাদের ধোকাবাজীর তেলেসমাতি ছিন্নভিন্ন করতে পারেন৷
৬০. এ শেষ বাক্যটি স্বতই একথা প্রকাশ করছে যে, প্রথম বাক্যে হযরত ইবরাহীম মূর্তি ভাঙ্গার দায় যে বড় মূর্তিটির ঘাড়ে চাপিয়েছেন, তার দ্বারা মিথ্যা বলা তার উদ্দেশ্য ছিল না৷ বরং তিনি নিজের বিরোধীদেরকে প্রমাণ দর্শাতে চাচ্ছিলেন৷ তারা যাতে জবাবে নিজেরাই একথা স্বীকার করে নেয় যে, এ উপাস্যরা একেবারেই অসহায় এবং এদের দ্বারা কোন উপকারের আশাই করা যায় না, তাই তিনি একথা বলেছিলেন৷ এ ধরনের পরিস্থিতিতে কোন ব্যক্তি পমাণ উপস্থাপনের জন্য যে বস্তব ঘটনা বিরোধী কথা বলে তাকে মিথ্যা গণ্য করা যেতে পারে না৷ বক্তা প্রমাণ নির্দেশ করার জন্য একথা বলে এবং স্রোতাও একে সেই অর্থেই গ্রহণ করে৷

দুর্ভাগ্যক্রমে হাদীসের এক বর্ণনায় একথা এসেছে যে, হযরত ইরাহীম (আ) তাঁর জীবনে তিনবার মিথ্যা কথা বলেছিলেন৷ তার মধ্যে এটি একটি "মিথ্যা"৷ দ্বিতীয় "মিথ্যা" হচ্ছে, সূরা সাফ্ফাতে হযরত ইবরাহীমের () কথাটি৷ আর তৃতীয় "মিথ্যাটি" হচ্ছে তাঁর নিজের স্ত্রীকে বোন বলে পরিচিত করানো৷ একথাটি কুরআনে নয় বরং বাইবেলের আদি পুস্তকে বলা হয়েছে৷ এক শ্রেনীর বিদ্বানদের "রেওয়াত" প্রীতির ব্যাপারে সীমাতিরিক্ত বাড়াবাড়ি এমন পর্যায়ে পৌছে গিয়েছে যে, তাদের কাছে বুখারী ও মুসলিমের কতিপয় বর্ণনাকারীর সত্যবাদিতাই বেশী প্রিয় এবং এর ফলে যে একজন নবীর ওপর মিথ্যা বলা অভিযোগ আরোপিত হচ্ছে, তার কোন পরোয়াই তাদের নেই৷ অপর একটি শ্রেনী এই একটিমাত্র হাদীসকে ভিত্তি করে সমগ্র হাদীস শাস্ত্রের বিরুদ্ধে আক্রমণ পরিচালনা শুরু করে দেয় এবং বলতে থাকে, সমস্ত হাদীসের স্তুপ উঠিয়ে দূরে ছূঁড়ে দাও৷ কারণ এর মধ্যে যতো আজেবাজে ধরনের রেওয়ায়াত পাওয়া যায়৷ অথচ কোন একটি বা কতিপয় হাদীসের মধ্যে কোন ত্রুটি পাওয়া যাবার কারণে সমস্ত হাদীস অনির্ভরযোগ্য হয়ে যাবে- এমন কোন কথা হতে পারে না৷ আর হাদীস শাস্ত্রের দৃষ্টিতে কোন হাদীসের বর্ণনা পরম্পরা মজবুত হওয়ার ফলে এটা অপরিহার্য হয়ে ওঠে না যে, তার "মতন" (মুল হাদীস) যতই আপত্তিকর হোক না কেন তাকে চোখ বন্ধ করে "সহী" বলে মেনে নিতে হবে৷ বর্ণনা পরম্পরা সহীহ ও নির্ভরযোগ্য হবার পরও এমন অনেক কারণ থাকতে পারে, যার ফলে এমন "মতন" ত্রুটিপূর্ণ আকারে উদ্ধৃত হয়ে যায় এবং এমন সব বিষয়বস্তু সম্বলিত হয় যে, তা থেকে স্পষ্টতই বুঝা যায় যে, একথাগুলো নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মুখ নিসৃত হতে পারে না৷ তাই সনদ তথা বর্ণনা পরস্পরার সাথে সাথে "মতন"ও দেখা অপরিহার্য৷ যদি মতনের মধ্যে সত্যিই কোন দোষ থেকে থাকে তাহলে এরপরও অযথা তার নির্ভূলতার ওপর জোর দেয়া মোটেই ঠিক নয়৷

যে হাদীসটিতে হযরত ইবরাহীমের তিনটি "মিথ্যা কথা" বর্ণনা করা হয়েছে সেটি কেবলমাত্র এ কারণে আপত্তিকর নয় যে, এটি একজন নবীকে মিথ্যাবাদী গণ্য করেছে বরং এ কারণেও এটি ত্রুটিপূর্ণ যে, এখানে যে তিনটি ঘটনার কথার বলা হয়েছে সেগুলো সবই বিতর্কিত৷ এর মধ্যে "মিথ্যা"র অবস্থা তো পাঠক এইমাত্র দেখলেন৷ সামান্য বুদ্ধি জ্ঞানও যার আছে তিনি কখনো এই প্রেক্ষাপটে হযরত ইবরাহীমের এই বক্তব্যকে "মিথ্যা" বলে আখ্যায়িত করতে পারেন না৷ এ ক্ষেত্রে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সম্পর্কে নাউযুবিল্লাহ আমরা এমন ধারণা তো করতেই পারি না যে, তিনি এই বক্তব্যের তাৎপর্য বুঝাবেন না৷ এবং খামাখাই একে মিথ্যা ভাষণ বলে আখ্যায়িত করবেন৷ আর () সংক্রান্ত ঘটনাটির ব্যাপারে বলা যায়, এটিকে মিথ্যা প্রমাণ করা যেতে পারে না যতক্ষণ না একথা প্রমাণিত হয় যে, হযরত ইবরাহীম সে সময় সম্পূর্ণ সুস্থ, সবল, রোগমুক্ত ছিলেন এবং তিনি সামান্যতম অসুস্থতায়ও ভুগছিলেন না৷ একথা কুরআনে কোথাও বলা হয়নি এবং আলোচ্য হাদীসটি ছাড়া আর কোন নির্ভরযোগ্য হাদীসও এ আলোচনা আসেনি৷ এখন বাকী থাকে স্ত্রীকে বোন বলার ঘটনাটি৷ এ ব্যাপারটি এত বেশী উদ্ভট যে, কাহিনীটি শোনার পর কোন ব্যক্তি প্রথমেই বলে বসবে এটা কোন ঘটনাই হতে পারে না৷ এটি বলা হচ্ছে তখনকার কাহিনী যখন হযরত ইবরাহীম নিজের স্ত্রী সারাকে নিয়ে মিসরে যান৷ বাইবেলের বর্ণনামতে তখন হযরত ইবরাহীমের বয়স ৭৫ বছর ও হযরত সারার বয়স ৬৫ বছরের কিছু বেশী ছিল৷ এ বয়সে হযরত ইবরাহীম ভীত হলেন মিসরের বাদশাহ এ সুন্দরীকে লাভ করার জন্য তাকে হত্যা করবেন৷ কাজেই তিনি স্ত্রীকে বললেন, যখন মিসরীয়রা তোমাকে ধরে বাদশাহর কাছে নিয়ে যেতে থাকবে তখন তুমি আমাকে নিজের ভাই বলবে এবং আমিও তোমাকে বোন বলবো, এর ফলে আমি প্রাণে বেঁচে যাবো৷ (আদি পুস্তকঃ১২ অধ্যায়) হাদীসে বর্ণিত তৃতীয় মিথ্যাটির ভিত্তি এই সুস্পষ্ট বাজে ও উদ্ভট ইসরাঈলী বর্ণনার ওপর প্রতিষ্ঠিত৷ যে হাদীসের 'মতন' এ ধরনের উদ্ভট বক্তব্য সম্বলিত তাকেও আমরা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের উক্তি বলে মেনে নেবো কেমন করে-তা তার 'সনদ' যতই ক্রুটিমুক্ত হোক না কেন? এ ধরনের একপেশে চিন্তা বিষয়টিকে বিকৃত করে অন্য এক বিভ্রান্তির উদ্ভব ঘটায় যার প্রকাশ ঘটাচ্ছে হাদীস অস্বীকারকারী গোষ্ঠী৷ (আরো বেশী জানার জন্য দেখুন, আমার লিখিত বই রাসায়েল ও মাসায়েল ২ খন্ড, কতিপয় হাদীসের বিরুদ্ধে অভিযোগ ও তার জবাব নিবন্ধের ১২নং জবাব)৷
৬১. মূলে () (মাথা নিচের দিকে উলটিয়ে দেয়া হলো) বলা হয়েছে৷ কেউ কেউ এর অর্থ করেছেন, তারা লজ্জায় মাথা নত করলো৷ কিন্তু পরিবেশ পরিস্থিতি ও বর্ণনা ভংগী এ অর্থ গ্রহণ করতে অস্বীকার করে৷ বক্তব্য পরম্পরা ও বক্তব্যের ধরনের প্রতি নজর দিলে যে সঠিক অর্থটি পরিস্কার বুঝা যায় সেটি হচ্ছে এই যে, হযরত ইবরাহীমের জবাব শুনে প্রথমেই তারা মনে মনে ভাবলো, প্রকৃতপক্ষে তোমরা নিজেরাই তো জালেম৷ কেমন অসহায় ও অক্ষম দেবতাদেরকে তোমরা ইলাহ বানিয়ে নিয়েছো, যারা নিজমুখে তাদের ওপর কি ঘটে গেছে এবং কে তাদেরকে ভেঙ্গে চুরে রেখে দিয়েছে একথা বলতে পারে না৷ যারা নিজেরা নিজেদেরকে বাঁচাতে পারে না তারা তোমাদেরকে কিভাবে বাঁচাবে৷ কিন্তু এর পরপরই আবার তাদের ওপর জিদ ও মুর্খতা চড়াও হয়ে গেলো৷ এবং জিদের বৈশিষ্ট অনুযায়ী তা চড়াও হবার সাথে সাথেই তাদের বুদ্ধি উল্টোমুখী হয়ে গেলো৷ মস্তিষ্ক সোজা ও সঠিক চিন্তা করতে করতে হঠাৎ উল্টো চিন্তা করতে আরম্ভ করলো৷
৬২. শব্দাবলী পরিষ্কার জানিয়ে দিচ্ছে এবং পূর্বাপর বক্তব্যও এ অর্থ সমর্থন করছে যে, তারা সত্যিই তাদের সিদ্ধান্ত কার্যকর করে৷ অন্যদিকে আগুনের কুণ্ড তৈরী হয়ে যাবার পর তারা যখন হযরত ইবরাহীমকে তার মধ্য ফেলে দেয় তখন মহান আল্লাহ আগুনকে হুকুম দেন সে যেন ইবরাহীমের জন্য ঠাণ্ডা হয়ে যায় এবং তার কোন ক্ষতি না করে৷ বস্তুত কুরআনের সুস্পষ্টভাবে যেসব মু'জিযার বর্ণনা দেয়া হয়েছে এটিও তার অন্তরভুক্ত৷ এখন কোন ব্যক্তি যদি এ মুজিযাগুলোকে সাধারণ ঘটনা প্রমাণ করার জন্য জোড়াতালি দিয়ে কৃত্রিম ব্যাখ্যার আশ্রয় নেয়, তবে বুঝতে হবে যে, তার মধ্যে আল্লাহর জন্যও বিশ্ব-জাহানের প্রচলিত নিয়মের বাইরে অস্বাভাবিক কোন কিছু করা সম্ভবপর নয়৷ যে ব্যক্তি এরূপ মনে করে, আমি জানতে চাই যে, সে আল্লাহকে মেনে নেয়ার কষ্টই বা করতে যাচ্ছে কেন? আর যদি সে এ ধরনের জোড়াতালির ব্যাখ্যা এ জন্য করে থাকে যে, আধুনিক যুগের তথাকথিত যুক্তিবাদীরা এ ধরনের কথা মেনে নিতে প্রস্তুত নয়, তাহলে আমরা তাকে জিজ্ঞেস করি, জনাব! তথাকথিত সেসব চুক্তিবাদীকে যে কোনভাবেই হোক স্বীকার করাতেই হবে, এ দায়িত্ব আপনার ঘাড়ে কে চাপিয়ে দিয়েছিল? কুরআন যেমনটি আছে ঠিক তেমনিভাবে যে তাকে মেনে নিতে প্রস্তুত নয়, তাকে তার অবস্থার ওপর ছেড়ে দিন৷ তার স্বীকৃতি আদায় করার জন্য কুরআনকে তার চিন্তাধারা অনুযায়ী ঢেলে সাজাবার চেষ্টা করা, যখন কুরআনের মূল বক্তব্য প্রতিটি শব্দ এ ঢালাইয়ের বিরোধিতা করছে, তখন এটা কোনধরনের প্রচার এবং কোন বিবেকবান ব্যক্তি একে বৈধ মনে করতে পারে? (বেশী বিস্তারিত জানার জন্য দেখুন সূরা আনকাবুত ৩৯ টীকা)
৬৩. বাইবেলের বর্ণনা অনুযায়ী নাহূরা ও হারান নামে হযরত ইবরাহীমের দুই ভাই ছিল৷ হযরত লূত ছিল হারানের ছেলে৷ (আদি পুস্তক ১১:২৬) সূরা আনকাবুতে হযরত ইবরাহীমের যে ঘটনা বর্ণিত হয়েছে তা থেকে বাহ্যত একথাই জানা যায় যে, তাদের সম্প্রদায়ের মধ্য থেকে একমাত্র হযরত লূতই তাঁর প্রতি ঈমান এনেছিলেন৷ (দেখুন ২৬ আয়াত )
৬৪. অর্থাৎ সিরিয়া ও ফিলিস্তিনে৷ তার বরকত তথা সমৃদ্ধি বস্তুগতও আধ্যাত্মিক উভয় ধরনেরই৷ বস্তুগত দিক দিয়ে তা দুনিয়ার উর্বরতম এলাকাসমূহের অন্তরভুক্ত৷ আর আধ্যাত্মিক দিক দিয়ে দু'হাজার বছর থেকে তা থেকেছে আল্লাহর নবীগণের কর্মক্ষেত্র৷ দুনিয়ার কোন এলাকায় এতো বিপুল সংখ্য নবী আবির্ভুত হয়নি৷
৬৫. অর্থাৎ ছেলের পরে পৌত্রকেও নবুওয়াতের মর্যাদায় অভিসিক্ত করেছি৷
৬৬. বাইবেলে হযরত ইবরাহীমের জীবনের এই গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাটির কোন উল্লেখ নেই৷ বরং তাঁর জীবনের ইরাকী যুগের কোন ঘটনাই এ গ্রন্থে স্থান পেতে পারেনি৷ নমরূদের সাথে তাঁর মুখোমুখি সংঘাত, পিতা ও সম্প্রদায়ের সাথে সংঘর্ষ, মূর্তিপূজার বিরুদ্ধে সংগ্রাম, অগ্নিতে নিক্ষেপের ঘটনা এবং সবশেষে দেশ ত্যাগে বাধ্য হওয়া-এসবের কোনটিই বাইবেলের আদিপুস্তক লেখকের দৃষ্টিগ্রাহ্য হবার যোগ্যতা লাভ করেনি৷ তিনি কেবলমাত্র তাঁর দেশ ত্যাগের ঘটনা বর্ণনা করেছেন৷ কিন্তু তাও এমন ভংগীতে যেমন একটি পরিবার পেটের ধান্দায় এক দেশ ছেড়ে অন্য দেশে গিয়ে বসতি গড়ে তোলে৷ কুরআর ও বাইবেলের বর্ণনায় এর চাইতেও মজার যে পার্থক্য, তা হচ্ছে এই যে, কুরআনের বর্ণনা মতে হযরত ইবরাহীমের মুশরিক পিতা তাঁর প্রতি জুলুম করার ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে৷ অন্যদিকে বাইবেল বলে, তাঁর পিতা নিজেই পুত্র, পৌত্র ও পুত্রবধূদেরকে নিয়ে হারানে গিয়ে বসতি গড়ে তোলে৷ (আদি পুস্তক ১১:৭-৩২) তারপর অকস্মাত একদিন আল্লাহ হযরত ইবরাহীমকে বলেন, তুমি হারান ত্যাগ করে কেনানে গিয়ে বসবাস করো এবং "আমি তোমা হইতে এক মহাজাতি উৎপন্ন করিব এবং তোমাকে আশীর্বাদ করিয়া তোমার নাম মহৎ করিব, তাহাতে তুমি আশির্বাদের আকর হইবে৷ যাহারা তোমাকে আশীর্বাদ করিবে, তাহাদিগকে আমি আশীর্বাদ করবি, যে কেহ তোমাকে অভিশাপ দিবে তাহাকে আমি অভিশাপ দিব, এবং তোমাতে ভূমমণ্ডলের যাবতীয় গোষ্ঠী আশীর্বাদ প্রাপ্ত হইবে৷ (১২:১-৩) বুঝতে পারলাম না, হঠাৎ হযরত ইবরাহীমের প্রতি বাইবেল প্রণেতার এমন অনুগ্রহ দৃষ্টি কেমন করে হলো?

অবশ্য কুরআনের বিভিন্ন স্থানে হযরত ইবরাহীমের জীবনের ইরাকী যুগের যে বিস্তারিত ঘটনাবলী বিকৃত হয়েছে তালমূদে তার বেশীর ভাগ আলোচনা পাওয়া যায়৷ কিন্তু উভয় বর্ণনা একত্র করলে শুধুমাত্র কাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ অংশেই পার্থক্য দেখা যাবে না বরং একথা পরিষ্কার অনুভব করা যাবে যে, তালমূদের বর্ণনা বহু স্থানে বেখাপ্পা এবং বাস্তবতা ও যুক্তি বিরোধী৷ অন্যদিকে কুরআন একদম পরিস্কার ও দ্ব্যর্থহীনভাবে হযরত ইবরাহীমের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাবলী পেশ করে৷ সেখানে কোন অর্থহীন ও আজেবাজে কথা নেই৷ বক্তব্য সুস্পষ্ট করার জন্য আমি এখানে তালমূদের কাহিনীর সংক্ষিপ্তসার পেশ করছি৷ এর ফলে যারা কুরআনকে বাইবেল ও ইহুদীবাদী সাহিত্যের চর্বিত চর্বন গণ্য করে থাকেন তাদের বিভ্রান্তির ধুম্রজাল বিদীর্ণ হয়ে যাবে৷

তালমূদের বর্ণনা মতে হযরত ইবরাহীমের জন্ম দিনে জ্যোতিষীরা আকাশে একটি আলামত দেখে তারেহ-এর গৃহে যে শিশুর জন্ম হয়েছে তাকে হত্যা করার পরামর্শ দিয়েছিল৷ তদনুসারে সে তাকে হত্যা করার প্রচেষ্টা চালায়৷ কিন্তু তারেহ নিজের ক্রীতদাসের পুত্রকে তার বিনিময়ে প্রদান করে তাকে বাঁচায়৷ এরপর তারেহ নিজের স্ত্রী ও শিশু পুত্রকে একটি পর্বত গুহায় লুকিয়ে রাখে৷ সেখানে তারা দশ বছর অবস্থান করে৷ এগার বছর বয়সে হযরত ইবরাহীমকে সে হযরত নূহের কাছে পাঠিয়ে দেয়৷ সেখানে উনচল্লিশ বছর পর্যন্ত তিনি হযরত নূহ ও তাঁর পুত্র সামের তত্বাবধানে বাস করতে থাকেন৷ এ সময়ে হযরত ইবরাহীম তাঁর আপন ভাইয়ের মেয়ে সারাহকে বিয়ে করেন৷ সারাহ তাঁর চেয়ে ৪২ বছরের ছোট ছিল৷ (বাইবেল একথা সুষ্পষ্ট করে বলেনি যে, সারাহ হযরত ইবরাহীমের ভ্রাতুষ্পুত্রী ছিলেন৷ তাছাড়া বাইবেলের বর্ণনা মতে তাদের উভয়ের মধ্যে বয়সের পার্থক্য ছিল দশ বছরের৷ আদিপুস্তক ১১: ২৯ এবং ১৭:১৭)

তারপর তালমূদ বলছে, হযরত ইবরাহীম পঞ্চাশ বছর বয়সে হযরত নূহের গৃহ ত্যাগ করে নিজের পিতার গৃহে চলে আসেন৷ এখানে তিনি দেখেন পিতা মূর্তিপূজারী এবং গৃহে বারো মাসের হিসেবে বারোটি মূর্তি প্রতিষ্ঠিত আছে৷ তিনি প্রথমে পিতাকে বুঝাবার চেষ্টা করেন৷ তাকে বুঝাতে অক্ষম হয়ে একদিন ঘরোয়া মূর্তি মন্দিরের মূর্তিগুলো ভেঙ্গে ফেলেন৷ তারেহ গৃহে এসে নিজের দেবতাদের এ অবস্থা দেখে সোজা নমরূদের কাছে চলে যায়৷ সেখানে অভিযোগ করে, পঞ্চাশ বছর আগে আমার গৃহে যে সন্তান জন্মেছিল আজ সে আমার ঘরে এ কাজ করেছে, আপনি এর বিহিত ব্যবস্থা করুন৷ নমরূদ হযরত ইবরাহীমকে ডেকে জিজ্ঞাসাবাদ করে৷ তিনি কঠোর জবাব দেন৷ নমরূদ তখনই তাকে কারাগারে পাঠিয়ে দেয় তারপর শলা-পরামর্শ করে ব্যাপারটির নিষ্পত্তির জন্য নিজের পরিষদের সামনে পেশ করে৷ পরিষদের সদস্যরা পরামর্শ দেয় এ ব্যক্তিকে আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করা হোক৷ তাই একটি বিরাট আগুনের কুণ্ড তৈরী করা হয় এবং হযরত ইবরাহীমকে তার মধ্যে নিক্ষেপ করা হয়৷ হযরত ইবরাহীমের সাথে তাঁর ভাই ও শ্বশুর হারানকেও নিক্ষেপ করা হয়৷ কারণ নমরূদ যখন তারেহকে জিজ্ঞেস করে, তোমার এ ছেলেকে তো আমি এর জন্মের দিনেই হত্যা করতে চেয়েছিলাম, তুমি তখন একে বাঁচিয়ে এর বিনিময়ে অন্য শিশু হত্যা করিয়েছিলে কেন? এর জবাবে তারেহ বলে, আমি হারানের কথায় একাজ করেছিলাম৷ তাই একাজ যে করেছিল তাকে ছেড়ে দিয়ে পরামর্শদাতাকে হযরত ইবরাহীমের সাথে আগুনে নিক্ষেপ করা হয়৷ আগুনে নিক্ষিপ্ত হবার সাথে সাথেই হারান জ্বলে পুড়ে কয়লা হয়ে যায় কিন্তু হযরত ইবরাহীমকে লোকেরা দেখে তিনি তার মধ্যে নিশ্চিন্তে আরামে ঘুরে বেড়াচ্ছেন৷ নমরূদকে এ ব্যাপারে জানানো হয়৷ সে এসে স্বচক্ষে এ দৃশ্য দেখে চিৎকার করে বলে, "ওহে আসমানের ইলাহর বান্দা! আগুন থেকে বের হয়ে এসো এবং আমার সামনে দাড়াও"৷ হযরত ইবরাহীম বাইরে আসেন৷ নমরূদ তাঁর ভক্ত হয়ে পড়ে৷ তাঁকে বহু মূল্যবান নজরানা দিয়ে বিদায় করে৷

এরপর তালমূদের বর্ণনা মতে হযরত ইবরাহীম দু'বছর পর্যন্ত সেখানে থাকেন৷ তারপর নমরূদ একটি ভয়ংকর স্বপ্ন দেখে৷ তার জ্যোতিষীরা এর তাবীর বর্ণনা করে বলে, ইবরাহীম আপনার সম্রাজ্য ধ্বংসের কারণ হবে কাজেই তাকে হত্যা করুন৷ সে তাঁকে হত্যা করার জন্য লোক পাঠায়৷ কিন্তু স্বয়ং নমরূদের প্রদত্ত একজন গোলাম আল ইয়াযার পূর্বাহ্নেই তাকে এ পরিকল্পনার খবর দেয়৷ ফলে হযরত ইবরাহীম পালিয়ে হযরত নূহের কাছে আশ্রয় নেন৷ সেখানে তারেহ এসে তাঁর সাথে গোপনে দেখা করতে থাকে৷ শেষে পিতাপুত্র পরামর্শ করে দেশ ত্যাগের সিদ্ধান্ত করা হয়৷ হযরত নূহ ও সামও এ পরিকল্পনা সমর্থন করেন এভাবে তারেহ স্বীয় পুত্র ইবরাহীম, পৌত্র, লূত এবং পৌত্রী ও পুত্রবধু সারাহকে নিয়ে উর থেকে হারান চলে আসে৷ (তালমূদ নির্বাচিত অংশ, এইচ, পোলানো লন্ডন, পৃষ্ঠা ৩০-৪২)

এ বর্ণনা দেখে কোন বিবেকবান ব্যক্তি কি একথা বলতে পারে যে, এটি কুরআনের উৎস হতে পারে?
৬৭. মূলে "হুকম ও ইলম" শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে৷ কুরআনে সাধারণত হুকম ও ইলম দান নবুওয়াদ দান করার সমার্থক হয়৷ "হুকম"অর্থ প্রজ্ঞাও হয়, সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করার ক্ষমতাও হয় আবার আল্লাহর পক্ষ থেকে কর্তৃত্ব করার বিধিসংগত অনুমতি () লাভও হয়৷ আর "ইলম"এর অর্থ হচ্ছে এমন সত্য ও যথার্থ ইলম যা অহীর মাধ্যমে দান করা হয়েছে৷ হযরত লূতের সম্পর্কে আরো বিস্তারিত জানার জন্য দেখুন সূরা আ'রাফ ৮০-৮৪, সূরা হূদ, ৬৯-৮৪ এবং সূরা আল হিজর, ৫৭-৭৬ আয়াত৷