(২১:৪২) হে মুহাম্মাদ! ওদেরকে বলে দাও, কে তোমাদের রাতে ও দিনে রহমানের হাত থেকে বাঁচাতে পারে ? ৪৩ কিন্তু তারা নিজেদের রবের উপদেশ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে৷
(২১:৪৩) তাদের কাছে কি এমন কিছু ইলাহ আছে যারা আমার মুকাবিলায় তাদেরকে রক্ষা করবে ? তারা না নিজেদেরকে সাহায্য করতে পারে, না আমার সমর্থন লাভ করে৷
(২১:৪৪) আসল কথা হচ্ছে, তাদেরকে ও তাদের পূর্বপুরুষদেরকে আমি জীবনের উপায়-উপকরণ দিয়েই এসেছি৷ এমনকি তারা দিন পেয়ে গেছে৷ ৪৪ কিন্তু তারা কি দেখে না, আমি বিভিন্ন দিক থেকে পৃথিবীকে সংকুচিত করে আনছি ? ৪৫ তবুও কি তারা বিজয়ী হবে ?৪৬
(২১:৪৫) তাদেরকে বলে দাও, “আমি তো অহীর ভিত্তিতে তোমাদেরকে জানাচ্ছি”-কিন্তু বধিররা ডাক শুনতে পায় না, যখন তাদেরকে সতর্ক করা হয়৷
(২১:৪৬) আর যদি তোমার রবের আযাব তাদেরকে সামান্য স্পর্শ করে যায়, ৪৭ তাহলে তারা তৎক্ষণাত চিৎকার দিয়ে উঠবে, হায়! আমাদের দুর্ভাগ্য, অবশ্যই আমরা অপরাধী ছিলাম৷
(২১:৪৭) কিয়ামতের দিন আমি যথাযথ ওজন করার দাঁড়িপাল্লা স্থাপন করবো৷ ফলে কোনো ব্যক্তির প্রতি সামান্যতম জুলুম হবে না৷ যার তিল পরিমাণও কোনো কর্ম থাকবে তাও আমি সামনে আনবো এবং হিসেব করার জন্য আমি যথেষ্ট৷৪৮
(২১:৪৮) পূর্বে ৪৯ আমি মূসা ও হারুনকে দিয়েছিলাম ফুরকান, জ্যোতি ও ‘যিকির’ ৫০ এমনসব মুত্তাকীদের কল্যাণার্থে ৫১
(২১:৪৯) যারা না দেখে তাদের রবকে ভয় করে এবং যারা (হিসেবে নিকেশের) সে সময়ের ৫২ ভয়ে ভীত-সন্ত্রস্ত৷
(২১:৫০) আর এখন এ বরকত সম্পন্ন “যিকির” আমি (তোমাদের জন্য) নাযিল করেছি৷ তবুও কি তোমরা একে মেনে নিতে অস্বীকার করো ?
৪৩. অর্থাৎ যদি রাতের বা দিনের কোন সময় অকস্মাত আল্লাহর মহাপরাক্রমশালী হাত তোমাদের বিরুদ্ধে সক্রিয় হয়ে ওঠে তাহলে তখন তাঁর পাকড়াও থেকে রক্ষা করতে পারে এমন শক্তিশালী সহায়ক ও সাহায্যকারী তোমাদের কে আছে?
৪৪. অর্থাৎ আমার এ মেহেরবানী ও প্রতিপালন থেকে তারা এ বিভ্রান্তির শিকার হয়েছে যে, এসব কিছু তাদের ব্যক্তিগত অধিকার এবং এগুলো ছিনিয়ে নেবার কেউ নেই৷ নিজেদের সমৃদ্ধি ও নেতৃত্ব-কর্তৃত্বকে তারা অক্ষয় ও চিরস্থায়ী মনে করতে অভ্যস্ত হয়ে গেছে এবং এর মধ্যে এমনই মত্ত হয়ে গেছে যে, তাদের মনে কখনো একথা একবারও জাগেনি যে, উপরে আল্লাহ বলে একজন আছেন, যিনি তাদের ভাঙা-গড়ার ক্ষমতা রাখেন৷
৪৫. এ বিষয়বস্তুটি ইতিপূর্বে সূরা রা'আদের ৪১ আয়তে উল্লেখিত হয়েছে এবং সেখানে আমি এর ব্যাখ্যা করেছি (দেখুন তাফহীমুল কুরআন সূরা রা'আদ ৬০ টীকা)৷ এখানে এ প্রেক্ষাপটে এটি অন্য একটি অর্থ প্রকাশ করছে৷ সেটি হচ্ছে এই যে, পৃথিবীর চারদিকে একটি বিজয়ী ও পরাক্রান্ত শক্তির কর্মতৎপরতার নিদর্শনাবলী দেখতে পাওয়া যায়৷ অকস্মাত কখনো দুর্ভিক্ষ, কখনো বন্যা, ভূমিকম্প, মহামারী, আবার কখনো প্রচণ্ড শীত বা প্রচণ্ড গরম এবং কখনো অন্য কিছু দেখা দেয়৷ এভাবে আকস্মিক বিপদ-আপদ মানুষের সমস্ত কীর্তি ও কর্মকাণ্ড ধ্বংস করে দিয়ে যায়৷ হাজার হাজার লাখো লাখো লোক মারা যায়৷ জনবসতি ধ্বংস হয়ে যায়৷ সবুজ শ্যামল শস্য ক্ষেতগুলো বিধ্বস্ত হয়৷ উৎপদান কমে যায়৷ ব্যবসায় বাণিজ্যে মন্দাভাব দেখা দেয়৷ মোট কথা মানুষের জীবন ধারণের উপায় উকরণের কখনো এদিক থেকে আবার কখনো ওদিক থেকে ঘাটতি দেখা দেয়৷ নিজের সমুদয় শক্তি নিয়োজিত করেও মানুষ এ ক্ষতির পথ রোধ করতে পারে না৷ (আরো বেশী ব্যাখ্যার জন্য দেখুন, তাফহীমুল কুরআন, সূরা আস সাজদাহ, ৩৩ টীকা)৷
৪৬. অর্থাৎ যখন তাদের সমস্ত জীবনোপকরণ আমার হাতে রয়েছে, আমি যে জিনিসটি চাই কমিয়ে দিতে পানি, যেটি চাই বন্ধ করে দিতে পানি, সে ক্ষেত্রে তারা কি আমার মোকাবিলায় বিজয়ী হবার এবং আমার পাকড়াও থেকে নিষ্কৃতি লাভ করার ক্ষমতা রাখে? এ নিদর্শনাবলী কি তাদেরকে এ মর্মে নিশ্চিন্ততা দান করে যে, তাদের শক্তি চিরস্থায়ী, তাদের আয়েশ-আরাম কোনদিন নিশেষিত হবে না এবং তাদেরকে পাকড়াও করার কেউ নেই?
৪৭. সে আযাব যা দ্রুত নিয়ে আসার জন্য তারা জোরেশোরে দাবী জানাচ্ছে, এবং বিদ্রুপের স্বরে বলছে, নিয়ে এসো সেই আযাব, কেন তা আমাদের ওপর নেমে আসছে না?
৪৮. ব্যাখ্যার জন্য দেখুন তাফহীমুল কুরআন সূরা আ'রাফ ৮-৯ টীকা৷ এই দাঁড়িপাল্লা কোন ধরনের হবে তা অনুধাবন করা আমাদের জন্য কঠিন৷ মোটকথা সেটি এমন কোন জিনিস হবে যা বস্তু ওজন করার পরিবর্তে মানুষের নৈতিক গুণাবলী, কর্মকাণ্ড ও তার পাপ-পূন্য ওজন করবে এবং যথাযথ ওজন করার পর নৈতিক দিক দিয়ে কোন ব্যক্তি কোন ধরনের মর্যাদার অধিকারী তা জানিয়ে দেবে৷ পূণ্যবান হলে কি পরিমাণ পূণ্যবান এবং পাপী হলে কি পরিমাণ পাপী৷ মহান আল্লাহর এর জন্য আমাদের ভাষার অন্যান্য শব্দ বাদ দিয়ে "দাঁড়িপাল্লা" শব্দ এ জন্য নির্বাচিত করেছেন যে, এর ধরনটি হবে দাঁড়িপাল্লার সাথে সামঞ্জস্যশীল অথবা এ নির্বাচনের উদ্দেশ্য হচ্ছে একথা বুঝিয়ে দেয়া যে, একটি দাঁড়িপাল্লার পাল্লা যেমন দুটি জিনিসের ওজনের পার্থক্য সঠিকভাবে জানিয়ে দেয়, ঠিক তেমনি আমার ন্যায় বিচারের দাঁড়িপাল্লাও প্রত্যেক ব্যক্তির জীবনের কাজকর্ম যাচাই করে কোন প্রকার কমবেশী না করে তার মধ্যে পূণ্যের না পাপের কোন দিকটি প্রবল তা একদম হুবহু বলে দেয়৷
৪৯. এখান থেকে নবীদের আলোচনা শুরু হয়েছে৷ একের পর এক বেশ কয়েক জন নবীর জীবনের সংক্ষিপ্ত বা বিস্তারিত ঘটনাবলীর প্রতি ইংগিত করা হয়েছে৷ যে প্রেক্ষাপটে এ আলোচনা এসেছে সে সম্পর্কে চিন্তা-ভাবনা করলে নিম্নোক্ত কথাগুলো অনুধাবন করানোই যে এর উদ্দেশ্য তা পরিস্কার বুঝা যায়৷

একঃ পূর্বের সকল নবীই মানুষ ছিলেন, তাঁরা কোন অভিনব সৃষ্টি ছিলেন না৷ একজন মানুষকে নবী বানিয়ে পাঠানো হয়েছে, ইতিহাসে আজ এটা কোন নতুন ঘটনা নয়৷

দুইঃ আজ মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যে কাজ করেছেন পূর্বের নবীগণও সেই একই কাজ করতে এসেছিলেন৷ এটিই ছিল তাদের জীবনের উদ্দেশ্য ও শিক্ষা৷

তিনঃ নবীদের সংগে আল্লাহ বিশেষ ব্যবহার করেন ও বিশেষ সম্পর্ক রাখেন৷ তারা বড় বড় বিপদের মধ্য দিয়ে এগিয়ে চলেন৷ বছরের পর বছর বিপদের মুখোমুখি হতে থাকেন৷ একক ও ব্যক্তিগত বিপদে এবং বিরোধীদের সৃষ্ট বিপদেও৷ কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাঁরা আল্লাহর সাহায্য ও সহায়তা লাভ করেন৷ তিনি তাঁদের প্রতি নিজের রহমত ও অনুগ্রহ বর্ষণ করেন৷ তাদের দোয়া কবুল করেনও কষ্ট দূর করেন৷ তাদের বিরোধীদেরকে পরাজিত করেন এবং অলৌকিক পদ্ধতিতে তাদেরকে সাহায্য করেন৷

চারঃ মহান আল্লাহর প্রিয়তম ও তাঁর দরবারে সবচেয়ে বেশী পছন্দনীয় হওয়া সত্ত্বেও এবং তাঁর পক্ষ থেকে বড় বড় বিস্ময়কর ক্ষমতা লাভ করার পরও তাঁরা ছিলেন বান্দা ও মানুষই৷ তাঁদের কেউই খোদায়ী কর্তৃত্বের অধিকারী হননি৷ মত প্রকাশ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ব্যাপারে তাঁরা ভূলও করতেন৷ রোগগ্রস্তও হয়ে পড়তেন৷ পরীক্ষায়ও তাদের ফেলা হতো৷ এমনকি ভুলচুকও তাঁদের দ্বারা হয়ে যেতো৷ ফলে আল্লাহর পক্ষ থেকে তাদেরকে শুধরে দেয়া হতো৷
৫০. এ তিনটি শব্দের মাধ্যমে তাওরাতের পরিচয় দান করা হয়েছে৷ অর্থাৎ তাওরাত ছিল হক ও বাতিলের মধ্যে পার্থক্য সৃষ্টিকারী, মানদণ্ড, মানুষকে সত্য-সরল পথ দেখাবার আলোক বর্তিকা এবং মানব জাতিকে তার বিস্মৃত পাঠ স্মরণ করিয়ে দেবার উপদেশ৷
৫১. অর্থাৎ যদিও তা পাঠানো হয়েছিল সমগ্র মানব জাতির জন্য কিন্তু তা থেকে কার্যত লাভবান তারাই হতে পারতো যারা ছিল এসব গুণ গুণান্বিত৷
৫২. যার আলোচনা এই মাত্র উপরে করা হলো, অর্থাৎ কিয়ামত৷