(২০:১০৫) এ লোকেরা ৮২ তোমাকে জিজ্ঞেস করছে, সেদিন এ পাহাড়গুলো কোথায় চলে যাবে? বলো, আমার রব তাদেরকে ধূলি বানিয়ে উড়িয়ে দেবেন
(২০:১০৬) এবং যমীনকে এমন সমতল প্রান্তরে পরিণত করে দেবেন যে,
(২০:১০৭) তার মধ্যে তোমরা কোন উঁচু নিচু ও ভাঁজ দেখতে পাবে না৷ ৮৩
(২০:১০৮) সেদিন সবাই নকীবের আহবানে সোজা চলে আসবে, কেউ সামান্য দর্পিত ভংগীর প্রকাশ ঘটাতে পারবে না এবং করুণাময়ের সামনে সমস্ত আওয়াজ স্তব্ধ হয়ে যাবে, মৃদু খসখস শব্দ ৮৪ ছাড়া তুমি কিছুই শুনবে না৷
(২০:১০৯) সেদিন সুপারিশ কার্যকর হবে না, তবে যদি করুণাময় কাউকে অনুমতি দেন এবং তার কথা শুনতে পছন্দ করেন৷ ৮৫
(২০:১১০) তিনি লোকদের সামনের পেছনের সব অবস্থা জানেন এবং অন্যেরা এর পুরো জ্ঞান রাখে না৷ ৮৬
(২০:১১১) লোকদের মাথা চিরঞ্জীব ও চির প্রতিষ্ঠিত সত্তার সামনে ঝুঁকে পড়বে, সে সময় যে জুলুমের গোনাহের ভার বহন করবে সে ব্যর্থ হবে৷
(২০:১১২) আর যে ব্যক্তি সৎকাজ করবে এবং সেই সংগে সংগে সে মুমিনও হবে তার প্রতি কোন জুলুম বা অধিকার হরণের আশংকা নেই৷ ৮৭
(২০:১১৩) আর হে মুহাম্মাদ! এভাবে আমি একে আরবী কুরআন বানিয়ে নাযিল করেছি ৮৮ এবং এর মধ্যে বিভিন্ন ধরনের সতর্কবাণী করেছি হয়তো এরা বক্রতা থেকে বাঁচবে বা এদের মধ্যে এর বদৌলতে কিছু সচেতনতার নিদর্শন ফুটে উঠবে৷ ৮৯
(২০:১১৪) কাজেই প্রকৃত বাদশাহ আল্লাহ হচ্ছেন উন্নত ও মহান৷ ৯০ আর দেখো, কুরআন পড়ার ব্যাপারে দ্রুততা অবলম্বন করো না যতক্ষণ না তোমার প্রতি তার অহী পূর্ণ হয়ে যায় এবং দোয়া করো, হে আমার পরওয়ারদিগার! আমাকে আরো জ্ঞান দাও৷ ৯১ আমি ৯২
(২০:১১৫) এর আগে আদমকে একটি হুকুম দিয়েছিলাম ৯৩ কিন্তু সে ভুলে গিয়েছে এবং আমি তার মধ্যে দৃঢ় সংকল্প পাইনি৷ ৯৪
৮২. এটিও একটি প্রাসংগিক বাক্য৷ ভাষণের মাঝখানে কোন শ্রোতার প্রশ্নের জবাবে এ বাক্যটি বলা হয়েছে৷ মনে হয় যখন এ সূরাটি একটি ঐশী ভাষণ হিসেবে শুনানো হচ্ছিল তখন কেই বিদ্রুপ করার জন্য এ প্রশ্নটি উঠিয়েছিল যে, কিয়ামাতের যে চিত্র আপনি আঁকছেন তাতে তো মনে হচ্ছে সারা দুনিয়ার লোকেরা কোন সমতল প্রান্তরের ওপর দিয়ে ছুটে চলতে থাকবে৷ তাহলে এ বিশালাকৃতির পাহাড়গুলো তখন কোথায় চলে যাবে? এ প্রশ্নের সুযোগটি বুঝার জন্য যে পরিবেশে এ ভাষণ দেয়া হচ্ছিল সেটি সামনে রাখতে হবে৷ মক্কা যে স্থানে অবস্থিত তার অবস্থা একটি জলাধারের মতো, যার চারদিকে উঁচু উঁচু পাহাড়ের সারি৷ প্রশ্নকারী এ পাহাড়গুলোর প্রতি ইংগিত করে একথা বলে থাকবে৷ অহীর ইশারায় উপস্থিত ক্ষেত্রে তখনই এর এ জবাব দেয়া হয়েছে যে, এ পাহাড়গুলো ভেঙ্গে বালুকারাশির মতো গুঁড়ো গুঁড়ো করে দেয়া হবে এবং সেগুলো ধূলোমাটির মতো সারা দুনিয়ার বুকে ছড়িয়ে সমগ্র দুনিয়াকে এমন একটি সমতল প্রান্তরে পরিণত করে দেয়া হবে যেখানে কোন উঁচু নীচু, ঢালু বা অসমতল জায়গা থাকবে না৷ তার অবস্থা এমন একটি পরিস্কার বিছানার মতো হবে যাতে সামান্যতমও খাঁজ বা ভাঁজ থাকবে না৷
৮৩. পরকালীন জগতে পৃথিবী যে নতুন রূপ নেবে কুরআন মজীদের বিভিন্ন জায়গায় তা বর্ণনা করা হয়েছে৷ সূরা ইনশিকাকে বলা হয়েছে ()"যখন পৃথিবী বিস্তৃত করে দেয়া হবে"৷ সূরা ইনফিতারের বলা হয়েছে () "যখন সাগর চিরে ফেলা হবে"৷ এর অর্থ সম্ভবত এই যে, সমুদ্রের তলদেশ ফেটি যাবে এবং সমস্ত পানি পৃথিবীর অভ্যন্তর ভাগে চলে যাবে৷ সূরা তাকবীররে বলা হয়েছেঃ ()"যখন সমুদ্র ভরে দেয়া হবে বা সমান করে দেয়া হবে"৷ এখানে বলা হচ্ছে যে, পাহাড়গুলো ভেংগে গুঁড়ো গুঁড়ো করে সারা পৃথিবীকে একটি সমতল প্রান্তরে পরিণত করা হবে৷ মনের পাতায় এর যে আকৃতি গড়ে উঠে তা হচ্ছে এই যে, পরকালীন দুনিয়ায় সমস্ত সমুদ্র ভরাট করে, পাহাড়গুলো ভেংগে উঁচু নীচু সমান করে, বন-জংগল সাফ করে পুরোপুরি একটি বলের গাত্রাবরণের মতো সমান ও মসৃন করে দেয়া হবে৷ এ আকৃতি সম্পর্কে সূরা ইবরাহীমের ৪৮আয়াতে বলা হয়েছে () "এমন দিন যখন পৃথিবীকে পরিবর্তিত করে ভিন্ন কিছু করে দেয়া হবে"৷ এ আকৃতির পৃথিবীর ওপর হাশর প্রতিষ্ঠিত হবে এবং আল্লাহ সেখানে আদালত তথা ন্যায়বিচার কায়েম করবেন৷ তারপর সবশেষে তাকে যে আকৃতি দান করা হবে সূরা যুমারের ৭৪ আয়াতে তা এভাবে বলা হয়েছেঃ

---------------------

অর্থাৎ মুত্তাকীরা "বলবে, সেই আল্লাহর শোকর যিনি আমাদের দ্বারা তাঁর প্রতিশ্রুতি পূর্ণ করেছেন এবং আমাদের পৃথিবীর উত্তরাধিকারী বানিয়ে দিয়েছেন৷ আমরা এ জান্নাতে যেখানে ইচ্ছা নিজেদের জায়গা বানিয়ে নিতে পারি৷ কাজেই সৎকর্মশীলদের জন্য রয়েছে সর্বোত্তম প্রতিদান"৷

এ থেকে জানা যায়, সবশেষে এ সমগ্র পৃথিবীটিকেই জান্নাতে পরিণত করা হবে এবং আল্লাহর মুত্তাকী ও সৎকর্মশীল বান্দারা হবে এর উত্তরাধিকারী৷ সে সময় সারা পৃথিবী একটি দেশে পরিণত হবে৷ পাহাড়-পর্বত, সাগর, নদী, মরুভূমি আজ পৃথিবীকে অসংখ্য দেশে বিভক্ত করে রেখেছে এবং এ সাথে বিশ্বমানবতাকেও বিভক্ত করে দিয়েছে৷ এগুলোর সেদিন কোন অস্তিত্বই থাকবে না৷ (উল্লেখ্য, সাহাবা ও তাবেঈদের মধ্যে ইবনে আব্বাস (রা) ও কাতাদাহও এ মত পোষন করতেন যে জান্নাত এ পৃথিবীতেই প্রতিষ্ঠিত হবে৷ সূরা নাজম এর () আয়াতের ব্যাখ্যা তারা এভাবে করেন যে, এখানে এমন জান্নাতের কথা বলা হয়েছে যেখানে এখন শহীদদের রূহ রাখা হয়৷ )
৮৪. মূলে 'হাম্স' শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে৷ এ শব্দটি পায়ের আওয়াজ, চুপিচুপি কথা বলার আওয়াজ, উটের চলার আওয়াজ এবং আরো এ ধরনের হালকা আওয়াজের জন্য বলা হয়৷ এর অর্থ এ দাঁড়ায় যে, সেখানে চলাচলকারীদের পায়ের আওয়াজ ছাড়া চুপিচুপি গুনগুন করে কথা বলার কোন আওয়াজ শোনা যাবে না৷ চতুর্দিকে একটি ভয়ংকর ভীতিপ্রদ পরিবেশ বিরাজ করবে৷
৮৫. এ আয়াতের দুটি অনুবাদ হতে পারে৷ একটি অনুবাদ আমরা অবলম্বন করেছি৷ দ্বিতীয়টি হচ্ছে, "সেদিন সুপারিশ কার্যকর হবে না, তবে যদি কারো পক্ষে করুণাময় এর অনুমতি দেন এবং তার জন্য কথা শুনতে রাজি হয়ে যান"৷ এখানে এমন ব্যাপক অর্থবোধক শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে যা উভয় ক্ষেত্রে প্রযোজ্য আর প্রকৃত ব্যাপারও এই যে, কিয়াতমের দিন কারো সুপারিশ করার জন্য স্বতপ্রণোদিত হয়ে মুখ খোলা তো দূরের কথা, টুঁশব্দটি করারও কারোর সাহস হবে না৷ আল্লাহ যাকে বলার অনুমতি দেবেন একমাত্র সেই-ই সুপারিশ করতে পারবে৷ এ দুটি কথা কুরআনের বিভিন্ন জায়গায় সুস্পষ্টভাবে বলে দেয়া হয়েছে৷ একদিকে বলা হয়েছেঃ

---------------------------

"কে আছে তাঁর অনুমতি ছাড়া তাঁর সামনে সুপারিশ করতে পারে"? (আল বাকারাহ, ২৫৫ আয়াত)

আরো বলা হয়েছেঃ

---------------------------

"সেদিন যখন রূহ ও ফেরেশতারা সবাই কাতারবন্দী হয়ে দাঁড়াবে, একটুও কথা বলবে না, শুধুমাত্র সে-ই বলতে পারবে যাকে করুণাময় অনুমতি দেবেন এবং যে ন্যায়সংগত কথা বলবে"৷ (আন নাবা, ৩৮ আয়াত)

অন্যদিকে বলা হয়েছেঃ

-------------------------------

"আর তারা কারোর সুপারিশ করে না সেই ব্যক্তির ছাড়া যার পক্ষে সুপরিশ শোনার জন্য (রহমান) রাজী হবেন এবং তারা তাঁর ভয়ে ভীত হয়ে থাকে"৷ (আল আম্বিয়া, ২৮ আয়াত)

আরো বলা হয়েছেঃ

-----------------------

"কত ফেরেশতা আকাশে আছে, তাদের সুপারিশ কোনই কাজে লাগবে না, তবে একমাত্র তখন যখন আল্লাহর কাছ থেকে অনুমতি নেবার পর সুপারিশ করা হবে এবং এমন ব্যক্তির পক্ষে করা হবে যার জন্য তিনি সুপরিশ শুনতে চান এবং পছন্দ করেন৷ (আন নাজম, ২৬ আয়াত)
৮৬. সুপারিশের প্রতি এ বিধি-নিষেধ আরোপিত কেন, এর কারণ এখানে বর্ণনা করা হয়েছে৷ ফেরেশতা, আম্বিয়া বা আউলিয়া যে-ই হোন না কেন কারো রেকর্ড সম্পর্কে এদের কারো কিছুই জানা নেই এবং জানার কোন ক্ষমতাও এদের নেই৷ দুনিয়ায় কে কি করতো এবং আল্লাহর আদালতে কে কোন ধরনের ভূমিকা ও কার্যাবলী এবং কেমন দায়িত্বের বোঝা নিয়ে এসেছে তাও কেউ জানে না৷ অপরদিকে আল্লাহ প্রত্যেকের অতীতের ভূমিকা ও কর্মকাণ্ড জানেন৷ তার বর্তমান ভূমিকাও তিনি জানেন৷ সে সৎ হলে কেমন ধরনের সৎ৷ অপরাধী হলে কোন পর্যায়ের অপরাধী৷ তার অপরাধ ক্ষমাযোগ্য কি না৷ সে কি পূর্ণ শাস্তিলাভের অধিকারী অথবা কম শাস্তির৷ এহেন অবস্থায় কেমন করে ফেরেশতা, নবী ও সৎলোকদেরকে তাদের ইচ্ছামতো যার পক্ষে যে কোন ধরনের সুপারিশ তারা চায় তা করার জন্য তাদেরকে অবাধ অনুমতি দেয়া যেতে পারে? একজন সাধারণ অফিসার তার নিজের ক্ষুদ্রতম বিভাগে যদি নিজের প্রত্যেকটি বন্ধু ও আত্মীয়ের সুপারিশ শুনতে শুরু করে দেন তাহলে মাত্র চারদিনেই সমগ্র বিভাগটিকে ধ্বংস করে ছাড়বেন৷ তাহলে আকাশ ও পৃথিবীর শাসনকর্তার কাছ থেকে কেমন করে আশা করা যেতে পারে যে, তার দরবারে ব্যাপকভাবে সুপারিশ চলতে থাকবে এবং প্রত্যেক বুযর্গ সেখানে গিয়ে যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করিয়ে আনবেন৷ অথচ তাদের কেউই যাদের সুপারিশ তারা করছেন তাদের কার্যকলাপ কেমন তা জানেন না৷ দুনিয়ায় যে কর্মকর্তা দায়িত্বের সামান্যতম অনুভূতিও রাখেন তার কর্মনীতি এ পর্যায়েরই হয়ে থাকে যে, যদি তার কোন বন্ধু তার কোন অধস্তন কর্মচারীর সুপারিশ নিয়ে আসে তাহলে সে তাকে বলে, আপনি জানেন না এ ব্যক্তি কত বড় ফাঁকিবাজ, দায়িত্বহীন, ঘুষখোর ও অত্যাচারী৷ আমি এর যাবতীয় কীর্তিকলাপের খরব রাখি৷ কাজেই আপনি মেহেরবানী করে অন্তত আমার কাছে তার সুপারিশ করেবন না৷ এ ছোট্র উদাহরণটির ভিত্তিতে অনুমান করা যেতে পারে যে, এ আয়াতে সুপারিশ সম্পর্কে যে নিয়ম বর্ণনা করা হয়েছে তা কতদূর সঠিক, যুক্তিসংগত ও ন্যায়ভিত্তিক৷ আল্লাহর দরবারে সুপারিশ করার দরজা বন্ধ হবে না৷ আল্লাহর সৎ বান্দারা, যারা দুনিয়ায় মানুষের সাথে সহানুভূতিশীল ব্যবহার করতে অভ্যস্ত ছিলেন তাদেরকে আখেরাতেও সহানভূতির অধিকার আদায় করার সুযোগ দেয়া হবে৷ কিন্তু তারা সুপারিশ করা আগে অনুমতি চেয়ে নেবেন৷ যার পক্ষে আল্লাহ তাদেরকে বলার অনুমতি দেবেন একমাত্র তার পক্ষেই তারা সুপারিশ করতে পারবেন৷ আবার সুপারিশ করার জন্যও শর্ত হবে যে, তা সংগত এবং ন্যায়ভিত্তিক হতে হবে যেমন () এবং ঠিক কথা বলবে) আল্লাহর এ উক্তিটি পরিস্কার জানিয়ে দিচ্ছে যে, সেখানে আজেবাজে সুপারিশ করার কোন সুযোগ থাকবে না৷ যেমন একজন দুনিয়ায় শত শত হাজার হাজার লোকের অধিকার গ্রাস করে এসেছে কিন্তু কোন এক বুযুর্গ হঠাৎ উঠে তার পক্ষে সুপারিশ করে দিলেন যে, হে আল্লাহ! তাকে পুরস্কৃত করুন কারণ সে আমার বিশেষ অনুগ্রহ ভাজন৷
৮৭. কারণ সেখানে প্রত্যেক ব্যক্তির ব্যক্তিগত গুণাবলীর () ভিত্তিতে ফায়সালা হবে৷ যে ব্যক্তি কোন জুলুমের গোনাহের বোঝা বহন করে নিয়ে আসবে, সে আল্লাহর অধিকারের বিরুদ্ধে জুলুম করুক বা আল্লাহর বান্দাদের অধিকারের বিরুদ্ধে অথবা নিজের নফসের বিরুদ্ধে জুলুম করুন না কেন যে কোন অবস্থায়ই এগুলো তাকে সাফল্যের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যাবে না৷ অন্যদিকে যারা ঈমান ও সৎকাজ (নিছক সৎকাজ নয় বরং ঈমান সহকারে সৎকাজ এবং নিছক ঈমানও নয় বরং সৎকাজ সহকারে ঈমান) নিয়ে আসবে তাদের ওপর সেখানে জুলুম হবার কোন আশংকা নেই অর্থাৎ নিরর্থক তাদেরকে শাস্তি দেয়া হবে না এবং তাদের যাবতীয় কার্যাবলী একেবারে ধ্বংস করে দেয়া হবে এবং সমস্ত অধিকার গ্রাস করে নেয়া হবে এমন কোন আশংকাও সেখানে থাকবে না৷
৮৮. অর্থাৎ তা এমনিতর বিষয়বস্তু, শিক্ষাবলী ও উপদেশমালায় পরিপূর্ণ৷ এখানে শুধুমাত্র ওপরের আয়াতগুলোতে বর্ণিত নিকটবর্তী বিষয়বস্তুর প্রতি ইংগিত করা হয়নি৷ বরং কুরআনের যেসব বিষয় বর্ণনা করা হয়েছে সেসব দিকেই ইংগিত করা হয়েছে৷ আবার কুরআন সম্পর্কে সূরার সূচনায় এবং তারপর মূসার কাহিনীর শেষ পর্যায়ের আয়াতগুলোতে যা বলা হয়েছে এর বর্ণনা পরম্পরা সেগুলোর সাথে সম্পর্কিত হয়৷ এর অর্থ হচ্ছে, তোমার প্রতি যে "স্মারক" পাঠানো হয়েছে এবং আমার কাছ থেকে বিশেষভাবে আমি যে "স্মরণ" তোমাকে দিয়েছি তা এ ধরনের মর্যাদাসম্পন্ন স্মারক ও স্মরণ৷
৮৯. অর্থাৎ এরা নিজেদের গাফলতি থেকে সজাগ হবে, ভুলে যাওয়া শিক্ষাকে কিছুটা স্মরণ করবে এবং পথ ভুলে কোন পথে যাচ্ছে আর এই পথ ভুলে চলার পরিণাম কি হবে সে সম্পর্কে এদের মনে বেশ কিছুটা অনুভূতি জাগবে৷
৯০. কুরআনে সাধারণত একটি ভাষণ শেষ করতে গিয়ে এ ধরনের বাক্য বলা হয়ে থাকে এবং আল্লাহর কালামের সমাপ্তি তাঁর প্রশংসা বাণীর মাধ্যমে করাই হয় এর উদ্দেশ্য৷ বর্ণনাভংগী ও পূর্বাপর বিষয়বস্তু সম্পর্কে চিন্তা করলে পরিস্কার বুঝা যায় যে এখানে একটি ভাষণ শেষ হয়ে গেছে এবং () থেকে দ্বিতীয় ভাষণ শুরু হচ্ছে৷ বেশীর ভাগ সম্ভাবনা এটাই যে, এ দুটি ভাষণ বিভিন্ন সময় নাযিল হয়ে থাকবে এবং পরে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহর হুকুম অনুযায়ী দুটিকে এক জায়গায় একত্র করে দিয়ে থাকবেন৷ একত্র করার কারণ উভয় ভাষণের বিষয়গত সাদৃশ্য৷ এ বিষয়টি আমি পরবর্তী আলোচনায় সুস্পষ্ট করে দেবো৷
৯১. () বাক্যেই ভাষণ খতম হয়ে গেছে৷ এরপর বিদায় নেবার সময় ফেরেশতারা আল্লাহর হুকুমে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে একটি ব্যাপারে সতর্ক করে দিচ্ছেন৷ অহী নাযিল করার সময় এটা দেখা গিয়েছিল৷ কিন্তু মাঝখানে সংশোধন করে দেয়া সংগত মনে করা হয়নি৷ তাই বাণী পাঠানোর কাজ শেষ হবার পর এখন তার এ সংশোধনী দিচ্ছেন৷ সতর্কবাণীর শব্দাবলী থেকে একথা প্রকাশ হচ্ছে যে, কি ব্যাপারে সতর্ক করা হয়েছিল৷ অহীর বাণী গ্রহণ করার সময় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তা স্মরণ রাখার এবং মুখে পুনরাবৃত্তি করার চেষ্টা করে থাকবেন৷ এ প্রচেষ্টার কারণে তাঁর মনোযোগ বারবার সরে গিয়ে থাকবে৷ ফলে অহী গ্রহণের ধারাবাহিকতার মধ্যে বাধার সৃষ্টি হয়ে থাকবে৷ বাণী শোনার প্রতি মনোযোগ পুরোপুরি আকৃষ্ট হয়ে থাকবে৷ এ অবস্থা দেখে এ প্রয়োজন অনুভব করা হয়েছে যে, তাঁকে অহীর বাণী গ্রহণ করার সঠিক পদ্ধতি বুঝাতে হবে এবং মাঝখানে মাঝখানে স্মরণ রাখার জন্য যে চেষ্টা তিনি করেন তা থেকে তাঁকে বিরত রাখতে হবে৷

এ থেকে জানা যায়, সূরা "ত্ব-হা"র এ অংশটি প্রথম যুগের অহীর অন্তরভুক্ত৷ প্রথম যুগে তখনো নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মধ্যে অহী গ্রহণ করার অভ্যাস ভালোভাবে গড়ে ওঠেনি৷ এ অবস্থায় কয়েকবার তিনি এ কাজ করেছেন৷ প্রত্যেকবার এ ব্যাপারে তাকে সতর্ক করে দেবার জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে কোন না কোন বাক্য উচ্চারণ করা হয়েছে৷ সূরা "কিয়ামাহ" নাযিলের সময়ও এমনটিই হয়েছিল৷ তাই তখন বাণীর ধারাবাহিকতা ছিন্ন করে তাঁকে এই বলে সতর্ক করা হয়েছিলঃ

-------------------------------

"কুরআনকে দ্রুত স্মরণ করার জন্য তোমার জিহবা বার বার সঞ্চালন করো না৷ তা স্মরণ করিয়ে ও পড়িয়ে দেবার দায়িত্ব আমার৷ কাজেই যখন আমি তা শুনাচ্ছি তখন তুমি গভীর মনোযোগ সহকারে তা শুনতে থাকো, তারপর তার অর্থ বুঝিয়ে দেবার দায়িত্বও আমার"৷

সূরা আ'লায়েও তাঁকে এ নিশ্চিন্ততা দেয়া হয়েছে যে, "আমি তা পড়িয়ে দেবো এবং তুমি তা ভুলেযাবে না"৷ ()-পরে যখন তিনি অহীর বাণী গ্রহণ করার ব্যাপারে ভালোমতো পারদর্শিতা লাভ করেন তখন তিনি আর এ ধরনের অবস্থার সম্মুখীন হননি৷ এ কারণে পরবর্তী সূরাগুলোয় এ ধরনের কোন সতর্কবাণী আমরা দেখি না৷
৯২. যেমন এর আগে বলা হয়েছে, এখান থেকে আর একটা আলাদা ভাষণ শুরু হয়েছে৷ সম্ভবত ওপরের ভাষণের পর কোন এক সময় এটি নাযিল হয়েছিল এবং বিষয়বস্তুর সামঞ্জস্যের কারণে এর সাথে মিলিয়ে একই সূরার মধ্যে উভয়কে একত্র করা হয়েছে৷ বিষয়বস্তুর সাদৃশ্য একাধিক৷ যেমনঃ

একঃ কুরআন যে ভুলে যাওয়া শিক্ষার কথা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে তা সেই একই শিক্ষা যা মানব জাতিকে তার সৃষ্টির সূচনায় দেয়া হয়েছিল, আল্লাহ যা মাঝে মাঝে স্মরণ করিয়ে দেয়ার ওয়াদা করেছিলেন এবং যা স্মরণ করিয়ে দেয়ার জন্য কুরআনের পূর্বে বারবার "স্মারক" আসতে থেকেছে৷

দুইঃ শয়তানের প্ররোচনায় মানুষ বারবার এ শিক্ষা ভুলে যায় এবং সৃষ্টির প্রথম দিন থেকেই বারবার সে এ দুর্বলতা দেখিয়ে আসছে৷ তাই মানুষ বারবার স্মরণ করিয়ে দিতে থাকার মুখাপেক্ষী৷

তিনঃ মানুষের সৌভাগ্য ও দুর্ভাগ্য পুরোপুরি নির্ভর করে তার এমন আচরণের ওপর যা আল্লাহ প্রেরিত এই "স্মারকের" সাথে সে করবে৷ সৃষ্টির সূচনালগ্নে একথা পরিস্কার বলে দেয়া হয়েছিল৷ আজ এটা কোন নতুন কথা বলা হচ্ছে না যে, এর অনুসরণ করলে গোমরাহী ও দুর্ভাগ্য থেকে সংরক্ষিত থাকবে অন্যথায় দুনিয়া ও আখেরাত উভয় স্থানে বিপদে পড়বে৷

চারঃ একটি জিনিস হচ্ছে, ভুল, সংকল্পের অভাব ও ইচ্ছাশক্তির দুর্বলতা৷ এরি কারণে মানুষ তার চিরন্তন শত্রু শয়তানের পরোচনায় পড়ে এবং ভুল করে বসে৷ মানুষের মনে ভুলের অনুভূতি জাগার সাথে সাথেই সে যদি নিজের দৃষ্টিভংগী ও কর্মনীতি সংশোধন করে নেয় এবং অবাধ্যতা পরিহার করে আনুগত্যের সাথে ফিরে আসে তাহলেই সে ক্ষমা লাভ করতে পারে৷ দ্বিতীয় জিনিসটি হচ্ছে, বিদ্রোহ ও সীমালংঘন এবং ভালোভাবে ভেবে চিন্তে আল্লাহর মোকাবিলায় শয়তানের দাসত্ব করা৷ ফেরাউন ও সামেরী এ কাজ করেছিল৷ এর ক্ষমার কোন সম্ভাবনা নেই৷ ফেরাউন ও সামেরী নিজেদের যে পরিণতি ভোগ করেছে এর পরিণতিও তাই হবে৷ যে ব্যক্তি এ কর্মনীতি অবলম্বন করবে সে-ই এ পরিণতির শিকার হবে৷
৯৩. আদম আলাইহিস সালামের ঘটনা এর আগে সূরা বাকারাহ, সূরা আ'রাফে (দুজায়গায়), সূরা হিজর, সূরা বনী ইসরাঈল ও সূরা কাহফে আলোচিত হয়েছে৷ এখানে সপ্তমবার এর পুনরাবৃত্তি করা হচ্ছে৷ প্রত্যেক জায়গায় বর্ণনা পরম্পরার সাথে এর সম্পর্কে ভিন্নতর এবং প্রত্যেক জায়গায় এ সম্পর্কের ভিত্তিতেই এ ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ বিভিন্ন পদ্ধতিতে বর্ণনা করা হয়েছে৷ যে জায়গায় আলোচ্য বিষয়ের সাথে ঘটনার যে অংশের সম্পর্ক রয়েছে সে জায়গায় সেটুকুই বর্ণনা করা হয়েছে, অন্য জায়গায় তা পাওয়া যাবে না অথবা বর্ণনাভংগী সামান্য আলাদা হবে৷ পুরো ঘটনাটি বা এর পূর্ণ তত্ত্ব অনুধাবন করার জন্য সংশ্লিষ্ট সব জায়গাগুলোই পড়ে নেয়া উচিত৷ আমি সব জায়গায়ই এর সম্পর্ক ও সম্বন্ধ এবং এর ফলাফল টীকায় বর্ণনা করে দিয়েছি৷
৯৪. অর্থাৎ তিনি পরবর্তী পর্যায়ে এ নির্দেশের সাথে যে আচরণ করেন তা অহংকার ও ইচ্ছাকৃত বিদ্রোহের ভিত্তিতে ছিল না বরং গাফলতি ও ভুলের শিকার হবার এবং সংকল্প ও ইচ্ছার দুর্বলতার কারণে ছিল৷ তিনি এ ধরনের কোন চিন্তা ও সংকল্পের ভিত্তিতে আল্লাহর হুকুম অমান্য করেননি যে, আমি আল্লাহর পরোয়া করতে যাবো কেন, তাঁর হুকুম হয়েছে তাতে কি হয়েছে, আমার মন যা চাইবে আমি তা করবো, আল্লাহ আমার ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করবেন কেন? এর পরিবর্তে বরং তাঁর আল্লাহর হুকুম অমান্য করার কারণ এই ছিল যে, তিনি আল্লাহর হুকুম মনে রাখার চেষ্টা করেননি, তিনি তাঁকে কি বুঝিয়েছিলেন তা তিনি ভুলে গিয়েছিলেন এবং তাঁর ইচ্ছাশক্তি খুব বেশী মজবুত ছিল না যার ফলে যখন শয়তান তাঁকে পরোচিত করতে এলো তখন তিনি পূর্বাহ্নে প্রদত্ত আল্লাহর সতর্কবাণী ও উপদেশ (যার আলোচনা এখনই সামনে আসছে) স্মরণ করতে পারলেন না এবং শয়তান প্রদত্ত লোভ ও লালসার কঠোরভাবে মোকাবিলা করতে সক্ষম হলেন না৷

"আমি তার মধ্যে সংকল্প পাইনি" এ বাক্যের অর্থ কেউ কেউ এরূপ নিয়েছেন যে, "আমি তার মধ্যে নাফরমানীর সংকল্প পাইনি" অর্থাৎ তিনি যা কিছু করেছেন ভুল করে করেছেন, নাফরমানী করার সংকল্প নিয়ে করেননি৷ কিন্তু খামাখা এ ধরনের সংকোচ করার কোন প্রয়োজন নেই৷ একথা বলতে হলে () বলা হতো, শুধুমাত্র () বলা হতো না৷ আয়াতের শব্দাবলী পরিস্কার বলে দিচ্ছে, সংকল্পের অভাব মানে হুকুম মেনে চলার সংকল্পের অভাব, নাফরমানী করার সংকল্পের অভাব নয়৷ তাছাড়া পরিবেশ পরিস্থিতি ও পূর্বাপর বক্তব্যের প্রতি নজর দিলে পরিস্কার অনুভূত হয় যে, এখানে আল্লাহ আদম আলাইহিস সালামের ভূমিকা ও মর্যাদা কালিমামুক্ত করার উদ্দেশ্যে এ ঘটনা বর্ণনা করেছেন না বরং তিনি একথা বলতে চান যে, তিনি যে মানবিক দুর্বলতা প্রকাশ ঘটিয়েছিলেন এবং যে কারণে শুধু তিনি একাই নন বরং তাঁর সন্তানরাও আল্লাহর আগাম সতর্কবাণী সত্ত্বেও নিজের শত্রুর ফাঁদে পা দিয়েছিল এবং পরবর্তীকালে দিয়েই চলেছে সেটি কি ছিল৷ উপরন্তু যে ব্যক্তিই খোলা মনে এ আয়াতটি পড়বে তার মনে প্রথমে অর্থটিই ভেসে উঠবে যে, "আমি তার মধ্যে হুকুমের আনুগত্য করার সংকল্প বা মজবুত ইচ্ছাশক্তি পাইনি"৷ দ্বিতীয় অর্থটি তার মনে ততক্ষণ আসবে না যতক্ষণ না সে আদম আলাইহিস সালামের সাথে গোনাহের সম্পর্কে স্থাপন করা অসংগত মনে করে আয়াতের অন্য কোন অর্থ খোঁজা শুরু করে দেবে৷ এ অবস্থায় এ অভিমত আল্লামা আলুসীও তাঁর তাফসীরে প্রকাশ করেছেন৷ তিনি বলেছেনঃ

--------------------------------

"একথা তোমার কাছে গোপন থাকা উচিত নয় যে, আয়াতের শব্দাবলী শুনে এ ব্যাখ্যা সংগে সংগেই মনে উদয় হয় না এবং পরিবেশ-পরিস্থিতির সাথেও এটা তেমন কোন সম্পর্ক রাখে না"৷ (দেখুন রুহুল মা'আনী, ১৬ খন্ড, ২৪৩ পৃষ্ঠা)