(২০:২৫) মূসা বললো, “হে আমার রব!
(২০:২৬) আমার বুক প্রশস্ত করে দাও৷১৪
(২০:২৭) আমার কাজ আমার জন্য সহজ করে দাও
(২০:২৮) এবং আমার জিভের জড়তা দূর করে দাও, যাতে লোকেরা আমার কথা বুঝতে পারে৷ ১৫
(২০:২৯) আর আমার জন্য নিজের পরিবার থেকে সাহায্যকারী হিসেবে নিযুক্ত করে দাও
(২০:৩০) আমার ভাই হরুনকে৷ ১৬
(২০:৩১) তার মাধ্যমে আমার হাত মজবুত করো
(২০:৩২) এবং তাকে আমার কাজে শরীক করে দাও,
(২০:৩৩) যাতে আমরা খুব বেশী করে তোমার পবিত্রতা বর্ণনা করতে পারি,
(২০:৩৪) এবং খুব বেশী করে তোমার চর্চা করি৷
(২০:৩৫) তুমি সব সময় আমাদের অবস্থার পর্যবেক্ষক”৷
(২০:৩৬) বলেলেন, “হে মূসা! তুমি যা চেয়েছো তা তোমাকে দেওয়া হলো৷
(২০:৩৭) আমি আর একবার তোমার প্রতি অনুগ্রহ করলাম৷১৭
(২০:৩৮) Recall the time when We inspired your mother with this idea by means of a Revelation:
(২০:৩৯) `Place this child in a box and put the box in the river; the river will cast it on to the bank and My enemy and his enemy will pick it up. I Myself made you an object of love and so arranged things that you should be brought up under My supervision.
(২০:৪০) স্মরণ করো, যখন তোমার বোন চলছিল, তারপর গিয়ে বললো, “আমি কি তোমাদের তার সন্ধান দেবো যে এ শিশুকে ভালোভাবে লালন করবে?”এভাবে আমি তোমাকে আবার তোমার মায়ের কাছে পৌছিয়ে দিয়েছি, যাতে তার চোখ শীতল থাকে এবং সে দুশ্চিন্তাগ্রস্থ না হয়৷ এবং (এটাও স্মরণ করো) তুমি একজনকে হত্যা করে ফেলেছিলে, আমি তোমাকে এ ফাঁদ থেকে বের করেছি এবং তোমাকে বিভিন্ন পরীক্ষার মধ্য দিয়ে এসেছি, আর তুমি মাদ্য়ানবাসীদের মধ্যে কয়েক বছর অবস্থান করেছিলে৷ তারপর এখন তুমি এখন তুমি ঠিক সময়েই এসে গেছো৷ হে মূসা!
(২০:৪১) আমি তোমার নিজের জন্য তৈরী করে নিয়েছি৷
(২০:৪২) যাও, তুমি ও তোমার ভাই আমার নিদর্শনগুলোসহ এবং দেখো আমার স্মরণে ভুল করো না৷
(২০:৪৩) যাও, তোমরা দু’জন ফেরাউনের কাছে, সে বিদ্রোহী হয়ে গেছে৷
(২০:৪৪) তার সাথে কোমলভাবে কথা বলো, হয়তো সে উপদেশ গ্রহণ করবে অথবা ভীত হবে”৷ ১৮
(২০:৪৫) উভয়েই ১৮(ক)(ক) বললো, "হে আমাদের রব! আমাদের ভয় হয়, সে আমাদের সাথে বাড়াবাড়ি করবে অথবা আমাদের ওপর চড়াও হবে”৷
(২০:৪৬) বললেন, “ভয় করো না, আমি তোমাদের সাথে আছি, সবকিছু শুনছি ও দেখছি৷
(২০:৪৭) যাও তার কাছে এবং বলো, আমরা তোমার রবের প্ররিত, বনী ইসরাঈলকে আমাদের সাথে যাওয়ার জন্য ছেড়ে দাও এবং তাদেরকে কষ্ট দিয়ো না৷ আমরা তোমার কাছে নিয়ে এসেছি তোমার রবের নিদর্শন এবং শান্তি ও তার জন্য যে সঠিক পথ অনুসরণ করে৷
(২০:৪৮) আমাদের অহীর সাহায্যে জানানো হয়েছে যে, শাস্তি তার জন্য যে মিথ্যা আরোপ করে, ও মুখ ফিরিয়ে নেয়”৷১৯
(২০:৪৯) ফেরাউন ২০ বললো, “আচ্ছা, তাহলে তোমাদের দু’জনের রব কে হে মূসা?” ২১
(২০:৫০) মূসা জবাব দিল, “আমাদের রব তিনি ২২ যিনি প্রত্যেক জিনিসকে তার আকৃতি দান করেছেন তারপর তাকে পথ নির্দেশ দিয়েছেন৷ ২৩
(২০:৫১) ফেরাউন বললো, “আর পূর্ববর্তী বংশধর যারা অতীত হয়ে গেছে তাদের তাহলে কি অবস্থা ছিল?” ২৪
(২০:৫২) মূসা বললো “সেজ্ঞান আমার রবের কাছে লিপিবদ্ধ অবস্থায় সংরক্ষিত আছে৷ আমার রব ভুলও করেন না, বিস্মৃতও হন না”৷ ২৫
(২০:৫৩) তিনিই ২৬ তোমাদের জন্য যমীনের বিছানা বিছিয়েছেন, তার মধ্যে তোমাদের চলার পথ তৈরী করেছেন এবং উপর থেকে পানি বর্ষণ করেছেন, তারপর তার মাধ্যমে আমি বিভিন্ন প্রকার উদ্ভিদ উৎপন্ন করি৷
(২০:৫৪) খাও এবং তোমাদের পশুও চরাও৷ অবশ্যি এর মধ্যে রয়েছে বুদ্ধিমানদের জন্য নিদর্শনাবলী৷ ২৭
১৪. অর্থাৎ আমার মনে এ মহান দায়িত্বভার বহন করার মতো হিম্মত সৃষ্টি করে দাও৷ আমার উৎসাহ-উদ্দীপনা বাড়িয়ে দাও৷ যেহেতু হযরত মূসাকে (আ) একটি অনেক বড় কাজের দায়িত্ব সোপর্দ করা হচ্ছিল যা করার জন্য দুরন্ত সাহসের প্রয়োজন তাই তিনি দোয়া করেন, আমাকে এমন ধৈর্য, দৃঢ়তা, সংযম, সহনশীলতা, নির্ভীকতা ও দুর্জয় সংকল্প দান করো যা এ কাজের জন্য প্রয়োজন৷
১৫. বাইবেলে এর যে ব্যাখ্যা দেয়া হয়েছে তা হচ্ছে এই যে, হযরত মূসা বললেনঃ "হায় সদাপ্রভু! আমি বাকপটু নহি, ইহার পূর্বও ছিলাম না, বা এই দাসের সহিত তোমার আলাপ করিবার পরেও নহি৷ কারণ আমি জড়মুখ ও জড় জিহ্বা৷ (যাত্রাপুস্তুক ৪:১০) কিন্তু তালমূদে এ সম্পর্কিত একটি দীর্ঘ কাহিনী বর্ণনা করা হয়েছে৷ তাতে একথা বলা হয়েছে যে, শৈশবে হযরত মূসা যখন ফেরাউনের গৃহে লালিত পালিত হচ্ছিলেন তখন একদিন তিনি ফেরাউনের মাথার মুকুট নামিয়ে নিজের মাথায় পরে নেন৷ এতে প্রশ্ন দেখা দেয় যে, এ শিশু এ কাজটি ইচ্চাকৃতভাবে করেছে, অথবা এটা তার নিছক বালকসূলভ চপলতা৷ শেষে ঠিক করা হয়, শিশুর সামনে সোনা ও আগুন একসাথে রাখা হবে৷ সে মোতাবেক দু'টি জিনিস এনে একসাথে সামনে রাখা হলো এবং হযরত মূসা আগুন উঠিয়ে মুখে পুরে দিলেন৷ এতে তিনি কোন রকমে প্রাণে বেঁচে গেলেও তার জিহ্বায় চিরদিনের জন্য জড়তা সৃষ্টি হয়৷

এ কাহিনী ইসরাঈলী বর্ণনা থেকে স্থানান্তরিত হয়ে আমাদের তাফসীর প্রন্থগুলোতেও লিখিত হয়েছে৷ কিন্তু বুদ্ধিবৃত্তি ও কথা মেনে নিতে অস্বীকার করে৷ কারণ শিশু যদি আগুনে হাত দিয়েও ফেলে তাহলে এটা কোনক্রমেই সম্ভব নয় যে, সে অংগার উঠিয়ে নিয়ে মুখের মধ্যে পুরে দেবে৷ শিশু তো আগুনের জ্বালা অনুভব করার সাথে সাথেই হাত গুটিয়ে নেবে৷ পোড়া হাতে অংগার নিয়ে সে অংগার মুখে দেবার অবকাশ পাবে কেমন করে? কুরআনের শব্দাবলী থেকে আমরা যে কথা বুঝতে পারি তা হচ্ছে এই যে, হযরত মূসা আলাইহিস সালাম নিজের মধ্যে বাগ্মীতার অভাব দেখছিলেন৷ ফলে তাঁর মনে আশংকা জেগেছিল যে, নবুওয়াতের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে যদি তাঁর কখনো বক্তৃতা দেবার প্রয়োজন দেখা দেয় (এ পর্যন্ত যার কোন প্রয়োজন তাঁর দেখা দেয়নি) তাহলে তাঁর স্বভাবসুলভ সংকোচ বাধা হয়ে দাঁড়াবে৷ তাই তিনি দোয়া করেন, হে আল্লাহ৷ আমার জিভের জড়তা দূর করে দাও যাতে আমি নিজের কথা লোকদেরকে ভালোভাবে বুঝাতে পারি৷ এ বিষয়েই ফেরাউন একবার তাঁকে খোঁটা দিয়ে বলেছিলঃ "এ ব্যক্তি তো নিজের কথাই সঠিকভাবে বলতে পারে না"৷ (………যুখরুফ ৫২ ) এ দুর্বলতা অনুভব করেই হযরত মূসা নিজের ভাই হারুনকে সাহায্যকারী হিসেবে চান৷ সূরা কাসাসে তার এ উক্তি উদ্ধৃত করা হয়েছে যে,

------------------------------

"আমার ভাই হারুন আমার চেয়ে বাকপটু তাকে সাহায্যকারী হিসেবে আমার সাথে পাঠিয়ে দাও"৷ আল কাসাসঃ আয়াত ৩৪৷) পরবর্তী আলোচনায় আরো জানা যায় যে, হযরত মূসার এ দুর্বলতা দূর হয়ে গিয়েছিল এবং তিনি বেশ জোরদার ভাষণ দিতে শুরু করেছিলেন৷ কুরআনে ও বাইবেলে তাঁর পরবর্তীকালের যেসব ভাষণ উদ্ধৃত হয়েছে তা উন্নত পর্যায়ের শাব্দিক অলংকার ও বাকপটুতার সাক্ষ দেয়৷

জিভে জড়াতা আছে এমন একজন তোতলা ব্যক্তিকে আল্লাহ নিজের রসূল নিযুক্ত করবেন, একথা স্বাভাবিক বিচার বুদ্ধি বিরোধী৷ রসূলরা সব সময় এমন ধরনের লোক হয়েছেন যারা চেহারা, সুরত ব্যক্তিত্ব ও যোগ্যতার দিক দিয়ে হয়েছেন সর্বোত্তম, যাদের ভেতর বাইরের প্রতিটি দিক অন্তর ও দৃস্টিকে প্রভাবিত করেছে৷ কোন রসূলকে এমন কোন দোষ সহকারে পাঠানো হয়নি এবং পাঠানো যেতে পারতো না যে কারণে তিনি লোকদের মধ্যে হাস্যাস্পদ হন অথবা লোকেরা তাকে হেয় প্রতিপন্ন করে৷
১৬. বাইবেলের বর্ণনা অনুসারে হযরত হারুন হযরত মূসার চাইতে তিন বছরের বড় ছিলেন৷ (যাত্রা পুস্তক ৭:৭)
১৭. এরপর আল্লাহ হযরত মূসাকে তাঁর জন্ম থেকে নিয়ে এ পর্যন্ত তার প্রতি যতগুলো অনুগ্রহ করা হয়েছিল, এক এক করে তার সবক'টি তাঁকে স্মরণ করিয়ে দেন৷ সূরা কাসাসে এ ঘটনাগুলো বিস্থারিতভাবে বর্ণনা করা হয়েছে৷ এখানে কেবলমাত্র ইংহিত করা হয়েছে৷ এর উদ্দেশ্য হচ্ছে হযরত মূসাকে এ অনুভূতি দান করা যে, এখন যে কাজে তোমাকে নিযুক্ত করা হচ্ছে এ কাজের জন্যই তোমাকে পয়দা করা হয়েছে এবং এ কাজের জন্যই আজ পর্যন্ত বিশেষ সরকারী তত্ত্বাবধানে তুমি প্রতিপালিত হয়ে এসেছো৷
১৮. মানুষ দু'ভাবে সঠিক পথে আসে৷ সে নিজে বিচার-বিশ্লেষণ করে বুঝে-শুনে ও উপদেশবাণীতে উদ্ধুদ্ধ হয়ে সঠিক পথ অবলম্বন করে অথবা অশুভ পরিণামের ভয়ে সোজা হয়ে যায়৷
১৮(ক). মনে হচ্ছে এটা এমন সময়ের কথা যখন হযরত মূসা (আ) মিসরে পৌঁছে গিয়েছিলেন এবং হযরত হারুন কার্যত তাঁর সাথে শরীক হয়ে গিয়েছিলেন৷ সে সময় ফেরাউনের কাছে যাওয়ার আগে উভয়েই আল্লাহর কাছে এ নিবেদন পেশ করে থাকবেন৷
১৯. এ ঘটনাটি বাইবেল ও তালমূদে যেভাবে পেশ করা হয়েছে তার ওপরও একবার নজর বুলানো দরকার৷ এর ফলে কুরআন মজীদ আম্বিয়া আলাইহিমুস সালামের কথা কেমন মর্যাদা সহকারে বর্ণনা করেছে এবং বনী ইসরাঈলের বর্ণনসমূহে এর কি চিত্র অংকন করা হয়েছে তা আন্দাজ করা যাবে৷ বাইবেলের বর্ণনা হচ্ছে, প্রথমবার আল্লাহ যখন মূসাকে বললেন, "এখন আমি তোমাকে ফেরাউনের কাছে পাঠাচ্ছি এ উদ্দেশ্যে যে, তুমি আমার জাতি বনী ইসরাঈলকে মিসর থেকে বের করে আনবে" তখন হযরত মূসা জবাব দিলেন, "ফেরাউনের কাছে যাবার এবং বনী ইসরাঈলকে মিসর থেকে বের করে আনার আমি কে"? তারপর আল্লাহ হযরত মূসাকে অনেক বুঝালেন, তাঁর মনে শক্তি সঞ্চার করলেন, মুজিযা দান করলেন কিন্তু মূসা আবার এ কথাই বললেন, "হে আমার প্রভূ বিনয় করি, অন্য যাহার হাতে পাঠাইতে চাও এ বার্তা পাঠাও"৷ (যাত্রাপুস্তক ৩-১৩) তালমূদের বর্ণনা আবার এর চাইতে কয়েক কদম এগিয়ে গেছে৷ সেখানে বলা হয়েছেঃ এ ব্যাপারটি নিয়ে আল্লাহ ও হযরত মূসার সাথে সাতদিন পর্যন্ত বাদানুবাদ হতে থাকে৷ আল্লাহ বলতে থাকেন, নবী হও৷ কিন্তু মূসা বলতে থাকেন, আমার কণ্ঠই খুলছে না, কাজেই আমি নবী হই কেমন করে৷ শেষে আল্লাহ বললেন, তুমি নবী হয়ে যাও এতেই আমি খুশী৷ একথায় হযরত মূসা বলেন, লূতকে বাঁচাবার জন্য আপনি ফেরেশতা পাঠিয়েছিলেন, হাজেরা যখন সারার গৃহ থেকে বের হলেন তখন তার জন্য পাঁচজন ফেরেশতা পাঠিয়েছিলেন, আর এখন নিজের বিশেষ সন্তান (বনী ইসরাঈল)-দেরকে মিসর থেকে বেরকরে আনার জন্য আপনি আমাকে পাঠাচ্ছেন? একথায় আল্লাহ অসন্তুষ্ট হলেন এবং তিনি রিসালাতের কাজে তাঁর সাথে হারুনকে শরীক করে দিলেন৷ আর মূসার সন্তানদের বঞ্চিত করে পৌরহিত্যের দায়িত্ব হারুনের সন্তানদের দিয়ে দিলেন-এগুলোই হচ্ছে প্রাচীন কিতাব এবং নির্লজ্জ লোকেরা এগুলো সম্পর্কে বলে থাকে যে, কুরআনের এ কাহিনীগুলো নাকি এসব কিতাব থেকে নকল করা হয়েছে৷
২০. হযরত সূসা কিভাবে ফেরাউনের কাছে পৌছলেন এবং কিভাবে তার সামনে নিজের দাওয়াত পেশ করলেন এসব বিস্তারিত বিবরণ এখানে পরিহার করা হয়েছে৷ সূরা আরাফের ১৩ রুকূতে এক আলোচনা এসেছে৷ আর সামনের দিকে সূরা শু'আরার ২-৩, সূরা কাসাসের ১৪ এবং সূরা নাযিআতের ১ রুকূতে এ আলোচনা করা হয়েছে৷ ফেরাউন সম্পর্কে প্রয়োজনীয় তথ্যাদির জন্য তাফহীমুল কুরআন, সূরা আ'রাফের ৮৫ টীকা দেখুন৷
২১. দুই ভাইয়ের মধ্যে যেহেতু মূল নবী ছিলেন হযরত মূসা (আ ) এবং দাওয়াতদানের তিনিই ছিলেন কেন্দ্রীয় ব্যক্তিত্ব তাই ফেরাউন তাঁকেই সম্বোধন করে৷ আর হতে পারে তাঁকে সম্বোধন করার তার আর একটি কারণও থাকতে পারে৷ অর্থাৎ তার উদ্দেশ্য এও হতে পারে যে, সে হযরত হারুনের বাকপটুতা ও উন্নত বাগ্মীতার মুখোমুখি হতে চাচ্ছিল না এবং বাগ্মীতার ক্ষেত্রে হযরত মূসার দুর্বলতার সুযোগ গ্রহণ করতে চাচ্ছিল৷ ইতিপূর্বে এ আলোচনা করা হয়েছে৷

ফেরাউনের এ প্রশ্নের উদ্দেশ্য ছিল, তোমরা দু'জন আবার কাকে রব বানিয়ে নিয়েছো, মিসর ও মিসরবাসীদের রব তো আমিই৷ সূরা নাযিআতে তার এ উক্তি উদ্ধৃত করা হয়েছে যে, (………) হে মিসর বাসীরা! আমি তোমাদের প্রধানতম রব৷ সূরা যুখরুফে সে দরবারের সমস্ত লোকদের সম্বোধন করে বলেঃ

------------

"হে আমার জাতি! মিসরের রাজত্বের মালিক কি আমি নই? আর এ নদীগুলো কি আমার নীচে প্রবাহিত হচ্ছে না?" (৫১ আয়াত) সূরা কসাসে সে নিজের সভাসদদের সামনে এভাবে হুংকার দিয়ে বলেঃ

-----------------

"হে জাতির সরদারগণ! আমি ছাড়া তোমাদের আর কোন ইলাহ আছে বলে আমি জানি না৷ হে হামান! কিছু ইট পোড়াও এবং আমার জন্য এটি উঁচু ইমারত নির্মাণ করো৷ আমি উপরে উঠে একবার দেখি তো এই মূসা কাকে আল্লাহ বানাচ্ছে"৷ (৩৮ আয়াত)

সূরা শূ'আরায় সে হযরত মূসাকে ধমক দিয়ে বলেঃ

------------------------

"যদি আমাকে ছাড়া আর কাউকে ইলাহ বানিয়েছো তাহলে মনে রেখো, তোমাকে জেলখানায় পাঠিয়ে দেবো"৷ (২৯ আয়াত)

এর অর্থ এ নয় যে, ফেরাউন তার জাতির একমাত্র মাবুদ ছিল এবং সেখানে তার ছাড়া আর করো পূজা হতো না৷ এ কথা আগেই বলা হয়েছে যে, ফেরাউন নিজেকে সূর্য দেবতার (র' বা রা') আতার হিসেবে বাদশাহের দাবীদার বলতো৷ তাছাড়া মিসরের ইতিহাস থেকে একথা প্রমাণিত যে, বহু দেবী ও দেবতার পূজা_উপাসনা করা ছিল এ জাতির ধর্ম৷ তাই "একমাত্র পূজনীয়" হবার দাবী ফেরাউনের ছিল না৷ বরং সে কার্যত মিসরের এবং আদর্শগতভাবে সমগ্র মানব জাতির রাজনৈতিক প্রভুত্ব ও সার্বভৌমত্বের দাবীদার ছিল৷ সে একথা মেনে নিতে প্রস্তুত ছিল না যে, অন্য কোন সত্তা তার ওপর কর্তৃত্ব করবে, তার প্রতিনিধি এসে তাকে হুকুম দেবে এবং তার কাছে এ হুকুমের আনুগত্য করার দাবী জানাবে৷ তার আত্নগর্ব ও ঔদ্ধত্যের কারণে কোন কোন লোকের ধারণা হয়েছে, সে আল্লাহর অস্তিত্ব অস্বীকার করতো এবং নিজে ইলাহ ও উপাস্য হবার দাবীদার ছিল৷ কিন্তু একথা কুরআন থেকে প্রমাণিত যে, সে উর্ধ জগতে অন্য কারো শাসন কর্তৃত্ব স্বীকার করতো৷ সূরা আল মু'মিন ২৮-৩৪ এবং সূরা যুখরুফ ৫৩ আয়াত গভীর মনোযোগ সহকারে পড়ুন৷ এ আয়াতগুলো একতা প্রমাণ করছে যে, আল্লাহ ও ফেরেশতাদের অস্তিত্ব সে অস্বীকার করতো না৷ তবে তার রাজনৈতিক প্রভুত্বে কেউ হস্তক্ষেপ করবে এবং আল্লাহর কোন বসূল এসে তার ওপর হুকুম চালাবে, এটা মেনে নিতে সে প্রস্তুত ছিল না৷ (অধিক ব্যাখ্যার জন্য দেখুন তাফহীমুল কুরআন, সূরা আল কাসাস, ৫৩ টীকা)
২২. অর্থাৎ আমরা সকল অর্থে একমাত্র তাঁকেই রব মানি৷ প্রতিপালক, প্রভূ, মালিক, শাসক ইত্যাকার সকল অর্থেই আমরা তাঁকে ছাড়া আর কাউকেও রব বলে স্বীকার করি না৷
২৩. অর্থাৎ দুনিয়ার প্রত্যেকটি জিনিস তাঁরই নির্মাণ কৌশলে নির্মিত হয়েছে৷ প্রত্যেকটি জিনিসকে তিনিই আকার-আকৃতি, পঠনশৈলী, শক্তি, যোগ্যতা, গোণ ও বিশষত্ব দান করেছেন৷ দুনিয়ায় কাজ করার জন্য হাতের যে গঠনাকৃতির প্রয়োজন ছিল তা তিনি তাকে দিয়েছেন৷ পায়ের জন্য যে সর্বাধিক উপযুক্ত গঠনাকৃতির দরকার তা তাকে দিয়েছেন৷ মানুষ, পশু, উদ্ভিদ, জড় পদার্থ, বাতাস, পানি, আলো, প্রত্যেককে তিনি এমন বিশেষ আকৃতি দান করেছেন যা এ বিশ্ব-জাহানে তার নিজের অংশের কাজ ঠিকভাবে সম্পন্ন করার জন্য প্রয়োজন ছিল৷

তারপর তিনি প্রত্যেক জিনিসকে কেবল তার বিশষ আকৃতি দান করেই এমনিভাবে ছেড়ে দেননি৷ বরং তিনিই সবাইকে পথও দেখিয়েছেন৷ দুনিয়ায় এমন কোন জিনিস নেই যাকে তিনি নিজের গঠনাকৃতিকে কাজে লাগাবার এবং নিজের সৃষ্টির উদ্দেশ্য পূর্ণ করার পদ্ধতি শেখাননি৷ কানকে শুনা ও চোখকে দেখা তিনিই শিখিয়েছেন৷ মাছকে সাঁতার কাটার ও পাখিকে উড়ার শিক্ষা তিনিই দিয়েছেন৷ গাছকে ফুল ও ফল দেবার ও মাটিকে উদ্ভিদ উৎপাদান করার নির্দেশ তিনিই দিয়েছেন৷ মোট কথা তিনি সারা বিশ্ব-জাহান এবং তার সমস্ত জিনিসের শুধুমাত্র স্রষ্টাই নন বরং তাদের শিক্ষক ও পথ প্রদর্শকও৷

এ অতুলনীয় ব্যাপক অর্থবহুল ও সংক্ষিপ্ত বাক্যে হযরত সূসা আলাইহিস সালাম শুধু একথাই বলেননি যে, তাঁর রব কে? বরং একথাও বলে দিয়েছেন যে, তিনি রব কেন এবং কেন তাঁকে ছাড়া আর কাউকে রব বলে মেনে নেয়া যেতে পারে না৷ দাবীর সাথে সাথে তার যুক্তি-প্রমাণও এই ছোট্ট বাক্যটির মধ্যে এসে গেছে৷ একথা সুস্পস্ট যে, যখন ফেরাউন ও তার প্রত্যেকটি প্রজা তার নিজের বিশষ অস্তিত্বের জন্য আল্লাহর অনুগৃহীত এবং যখন তাদের এক জনেরও শ্বাসযন্ত্র, পাস্থলী ও হৃদযন্ত্র আল্লাহ প্রদত্ত নির্দেশ অনুসারে নিজের কাজ করে না যাওয়া পর্যন্ত সে এক মুহুর্তের জন্যও জীবিত থাকতে পারে না তখন ফেরাউনের নিজেকে লোকদের রব বলে দাবী করা এবং লোকদের কার্যত তাকে নিজেদের রব বলে মেনে নেয়া একটা নির্বুদ্ধিতা ও বিদ্রূপ ছাড়া আর কিছুই হতে পারে না৷

আবার এ ছোট্ট বাক্যে হযরত মূসা (আ ) ইশারায় রিসালাতের যুক্তিও পেশ করে দিয়েছেন৷ ফেরাউন এই রিসালাত মেনে নিতে অস্বীকার করছিল৷ হযরত মূসার যুক্তির মধ্য এ ইংগিত পাওয়া যায় যে, আল্লাহ যিনি সমগ্র বিশ্ব-জাহানের পথনির্দেশক এবং যিনি প্রত্যেকটি বস্তুকে তার অবস্থা ও প্রয়োজন অনুসারে পথ নির্দেশনা দিচ্ছেন, তাঁর পথ নির্দেশনা দেবার বিশ্বজনীন দায়িত্বের অপরিহার্য দাবী হচ্ছে এই যে, তিনি মানুষের সচেতন জীবনের জন্যও পথনির্দেশনা দেবার ব্যবস্থা করবেন৷ আর মাছ ও মুরগীর জন্য যে ধরনের পথনির্দেশনা উপযোগী, মানুষের সচেতন জীবনের জন্য সে ধরনের পথনির্দেশনা উপযোগী হতে পারে না৷ এর সবচেয়ে মানানসই পদ্ধতি হচ্ছে এই যে, একজন সচেতন মানুষ তাঁর পক্ষ থেকে মানুষদের পথ দেখাবার জন্য নিযুক্ত হবেন এবং তিনি মানুষদের বুদ্ধি ও চেতনার প্রতি আবেদন জানিয়ে তাদেরকে সঠিক-সোজা পথ দেখাবেন৷
২৪. অর্থাৎ ব্যাপার যদি এটাই হয়ে থাকে যে, যিনি প্রত্যেকটি জিনিসকে আকৃতি দিয়েছেন এবং তাকে দুনিয়ায় কাজ করার পথ বাতলে দিয়েছেন তিনি ছাড়া আর দ্বিতীয় কোন রব নেই, তাহলে এ আমাদের সবার বাপ দাদারা, যারা বংশ পরস্পরায় ভিন্ন প্রভূ ও ইলাহর বন্দেগী করে চলে এসেছে তোমাদের দৃষ্টিতে তাদের অবস্থান কোথায় হবে? তারা সবাই কি গোমরাহ ছিল? তারা সবাই কি আযাবের হকদার ছিল? তাদের সবার কি বুদ্ধি ভ্রষ্ট হয়েছিল? এ ছিল ফেরাউনের কাছে হযরত মূসার এ যুক্তির জবাব৷ হতে পারে সে মুর্খতা ও অজ্ঞতার বশবর্তী হয়ে এ জবাব দিয়েছে৷ আবার দুষ্টামির কারণও এ জবাব দিতে পারে৷ তাছাড়া ও উভয় কারণই এ জবাবের পিছনে সক্রিয় থাকতে পারে৷ অর্থাৎ সে নিজেও এ কথায় রাগান্বিত হয়েছে যে এ ধর্মের কারণে আমাদের সকল বুযর্গ যে পথভ্রষ্ট ছিল তা মেনে নিতে হবে আবার সাথে সাথে নিজের সভাসদ ও সাধারণ মিসরবাসীদের মনে হযরত মূসার দাওয়াতের বিরুদ্ধে ঘৃণা ও বিদ্বেষ সঞ্চার করাও এ উদ্দশ্য হতে পারে৷ সত্যপন্থীদের সত্য প্রচারের বিরুদ্ধেএ অস্ত্রটি হামেশা ব্যবহার করা হয়ে থাকে৷ মুর্খদের কাজে ব্যস্ত রাখার জন্য এটা বড়ই প্রভাবশালী প্রমাণিত হয়েছে৷ বিশেষ করে যে সময় কুরআনের এ আয়াতগুলো নাযিল হয় সে সময় মক্কায় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দাওয়াতকে হেয় প্রতিপন্ন করার জন্য সবচাইতে বেশী ও অস্ত্রটিকেই কাজে লাগানো হয়েছিল৷ তাই হযরত মূসার মোকাবিলায় ফেরাউনের এ ছলনার উল্লেখ যথার্থই ছিল৷
২৫. এটি হযরত মূসার সে সময় প্রদত্ত একটি অত্যন্ত জ্ঞানগর্ভ জবাব৷ এ থেকে প্রচার কৌশল সম্পর্কে ভালো শিক্ষা লাভ করা যায়৷ উপরের বর্ণনা অনুসারে ফেরাউনের উদ্দেশ্য ছিল শ্রোতাদের এবং তাদের মাধ্যমে সমগ্র জাতির মনে বিদ্বেষের আগুন জ্বালানো৷ যদি হযরত মূসা বলতেন, হাঁ, তারা সবাই মুর্খ ও পথভ্রষ্ট ছিল এবং সবাই জাহান্নামের ইন্ধন হবে, তাহলে এটা সত্য কথনের বিরাট আদর্শ হলেও এ জবাব হযরত মূসার পরিবর্তে ফেরাউনের উদ্দেশ্য সাধনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতো৷ তাই তিনি পূর্ণ বুদ্ধিমত্তা ও বিচক্ষনতা সহকারে এমন জবাব দেন যা ছিল একদিকে যথার্থ সত্য এবং অন্যদিকে ফেরাউনের বিষ দাঁতও উঁপরে ফেলতে সক্ষম৷ তিনি বলেন, তারা যাই কিছু ছিল, নিজেদের কাজ করে আল্লাহর কাছে পৌছে গেছে৷ তাদের কার্যাবলী এবং কাজের পেছনে নিহিত অন্তরের ইচ্ছাসমূহ জানার কোন উপায় নেই৷ কাজেই তাদের ব্যাপারে আমি কোন সিদ্ধান্ত দিই কেমন করে? তাদের সমস্ত রেকর্ড আল্লাহর কাছে সংরক্ষিত আছে৷ তাদের প্রতিটি পদক্ষেপ ও তার কারণসমূহের খবর আল্লাহই জানেন৷ কোন জিনিস আল্লাহর দৃষ্টির বাইরে থাকেনি এবং তাঁর স্মৃতি থেকেও কোন জিনিস বিলুপ্ত হয়ে যায়নি৷ আল্লাহই জানেন তাদের সাথে কি ব্যবহার করতে হবে৷ তাদের ভূমিকা কি ছিল এবং তাদের পরিণাম কি হবে, তোমার ও আমার এ কথা চিন্তা করা উচিত নয়৷ আমাদের চিন্তা করা উচিত৷ আমাদের ভূমিকা কি এবং আমরা কোন ধরনের পরিণামের সম্মুখীন হবো৷
২৬. কথার ধরন থেকে বুঝা যাচ্ছে, হযরত মূসার জবাব "বিস্মৃতও হন না" এ এসে শেষ হয়ে গেছে এবং এখান থেকে শেষ প্যারা পর্যন্ত সমস্ত ভাষ্য আল্লাহর পক্ষ থেকে ব্যাখ্যা ও স্মারক হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে৷ কুরআনে এ ধরনের অসংখ্য দৃষ্টান্ত রয়েছে৷ অতীতে ঘটেছে বা আগামীতে ঘটবে এমন কোন ঘটনা বর্ণনা প্রসংগে যখন কোন ব্যক্তির কোন উক্তি উদ্ধৃত করা হয় তখন তার পরপরই উপদেশ, ব্যাখ্যা বা বিস্তারিত বিবরণ হিসেবে কয়েকটি অতিরিক্ত বাক্য বলা হয়ে থাকে৷ এ ক্ষেত্রে শুধুমাত্র কথার ধরন থেকেই জানা যায় যে, এগুলো ইতিপূর্বে যে ব্যক্তির কথার আলোচনা চলছিল তার উক্তি নয় বরং আল্লাহর নিজের উক্তি৷ উল্লেখ্য, এ ভাষ্যের সম্পর্কে কেবলমাত্র নিকটবর্তী বাক্য "আমার রব ভুলও করেন না, বিস্মৃত ও হন না" এর সাথে নেই বরং হযরত মূসা আলাইহিস সালামের সমগ্র বক্তব্যের সাথে রয়েছে এর সম্পর্ক, যা (………) থেকে শুরু হয়েছে৷
২৭. অর্থাৎ যারা ভারসাম্যপূর্ণ সুস্থ বিবেক বুদ্ধি ব্যবহার করে সত্য অনুসন্ধান করতে চান তারা এ নির্দেশনাবলীর সহায়তায় প্রকৃত সত্যের মনযিলে পৌছার পথ জানতে পারেন৷ এ নিদর্শনাবলী তাদেরকে একথা জানিয়ে দেবে যে, এ বিশ্ব-জাহানের একজন রব আছেন এবং সমগ্র রবুবিয়াত ও ইলাহী কর্তৃত্ব একমাত্র তাঁরই হাতে কেন্দ্রীভূত৷ অন্য কোন রবের জন্য এখানে কোন অবকাশ নেই৷