(২:২৬৭) হে ঈমানদারগণ! যে অর্থ তোমরা উপার্জন করেছো এবং যা কিছু আমি জমি থেকে তোমাদের জন্য বের করে দিয়েছি, তা থেকে উৎকৃষ্ট অংশ আল্লাহর পথে ব্যয় করো৷ তাঁর পথে ব্যয় করার জন্য তোমরা যেন সবচেয়ে খারাপ জিনিস বাছাই করার চেষ্টা করো না অথচ ঐ জিনিসই যদি কেউ তোমাদের দেয়, তাহলে তোমরা কখনো তা নিতে রাযী হও না, যদি না তা নেবার ব্যাপারে তোমরা চোখ বন্ধ করে থাকো ৷ তোমাদের জেনে রাখা উচিত, আল্লাহ করো মুখাপেক্ষী নন এবং তিনি সর্বোত্তম গুণে গণান্বিত ৷৩০৮
(২:২৬৮) শয়তান তোমাদের দারিদ্রের ভয় দেখায় এবং লজ্জাকর কর্মনীতি অবলম্বন করতে প্রলুব্ধ করে কিন্তু আল্লাহ তোমাদেরকে তাঁর ক্ষমা ও অনুগ্রহের আশ্বাস দেন৷ আল্লাহ বড়ই উদারহস্ত ও মহাজ্ঞানী ৷
(২:২৬৯) তিনি যাকে চান, হিকমত দান করেন ৷ আর যে ব্যক্তি হিকমত লাভ করে সে আসলে বিরাট সম্পদ লাভ করেছে ৷৩০৯ এই কথা থেকে কেবলমাত্র তারাই শিক্ষা লাভ করে যারা বুদ্ধিমান ও জ্ঞানী৷
(২:২৭০) তোমরা যা কিছু ব্যয় করেছো এবং যা মানতও করেছো আল্লাহ তা সবই জানেন ৷ আর জালেমদের কোন সাহায্যকারী নেই ৷৩১০
(২:২৭১) যদি তোমাদের দান-সাদ্‌কাগুলো প্রকাশ্যে করো, তাহলে তাও ভালো , তবে যদি গোপনে অভাবীদের দাও, তাহলে তোমাদের জন্য এটিই বেশী ভালো ৷৩১১ এভাবে তোমাদের অনেক গোনাহ নির্মুল হয়ে যায়৷৩১২ আর তোমরা যা কিছু করে থাকো আল্লাহ অবশ্যি তা জানেন ৷
(২:২৭২) মানুষকে হিদায়াত দান করার দায়িত্ব তোমাদের ওপর অর্পিত হয়নি ৷ আল্লাহ যাকে চান তাকে হিদায়াত দান করেন ৷ তোমরা যে ধন-সম্পদ দান –খয়রাত করো, তা তোমাদের নিজেদের জন্য ভালো ৷ তোমরা আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ করার জন্যই তো অর্থ ব্যয় করে থাকো ৷ কাজেই দান-খয়রাত করে তোমরা যা কিছু অর্থ ব্যয় করবে , তার পুরোপুরি প্রতিদান দেয়া হবে এবং এ ক্ষেত্রে কোন ক্রমেই তোমাদের প্রাপ্য থেকে বঞ্চিত করা হবে না ৷৩১৩
(২:২৭৩) বিশেষ করে এমন সব গরীব লোক সাহায্য লাভের অধিকারী, যারা আল্লাহর কাজে এমনভাবে জড়িয়ে পড়েছে , যার ফলে তারা নিজেদের ব্যক্তিগত অর্থোপার্জনের জন্য প্রচেষ্টা চালাতে পারে না এবং তাদের আত্মমর্যাদাবোধ দেখে অজ্ঞ লোকেরা তাদেরকে সচ্ছল বলে মনে করে ৷ তাদের চেহারা দেখেই তুমি তাদের ভেতরের অবস্থা জানতে পারো ৷ মানুষের পেছনে লেগে থেকে কিছু চাইবে, এমন লোক তারা নয় ৷ তাদের সাহায্যার্থে তোমরা যা কিছু অর্থ ব্যয় করবে , তা আল্লাহর দৃষ্টির অগোচরে থাকবে না ৷৩১৪
৩০৮. যিনি নিজের উৎকৃষ্ট গুণাবলীর অধিকারী তিনি কখনো নিকৃষ্ট গুণের অধিকারীদের পছন্দ করতে পারেন না, একথা সবাই জানে৷ মহান আল্লাহ নিজেই পরম দাতা এবং সর্বক্ষন নিজের সৃষ্টির ওপর দান-দাক্ষিন্যের ধারা প্রবাহিত করেছেন৷ কাজেই তাঁর পক্ষে কেমন করে সংকীর্ণ দৃষ্টি, স্বল্প সাহস ও নিম্নমানের নৈতিক চারিত্রিক গুণাবলীর অধিকারী লোকদেরকে ভালোবাসা সম্ভব ?
৩০৯. হিকমত অর্থ হচ্ছে, গভীর অন্তর্দৃষ্টি ও সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করার শক্তি৷ এখানে একথা বলার উদ্দেশ্য হচ্ছে এই যে, হিকমতের সম্পদ যে ব্যক্তির কাছে থাকবে সে কখনো শয়তানের দেখানো পথে চলতে পারবে না৷ বরং সে আল্লাহর দেখানো প্রশস্ত পথ অবলম্বন করবে৷ শয়তানের সংকীর্ণমনা অনুসারীদের দৃষ্টিতে নিজের ধন-সম্পদ আঁকড়ে ধরে রাখা এবং সবসময় সম্পদ আহরণের নতুন নতুন ফন্দি-ফিকির করাই বুদ্ধিমত্তার পরিচায়ক৷ কিন্তু যারা আল্লাহর কাছ থেকে অন্তরদৃ্ষ্টি লাভ করেছে, তাদের মতে এটা নেহাত নির্বুদ্ধিতা ছাড়া আর কিছুই নয়৷ তাদের মতে, মানুষ যা কিছু উপার্জন করবে, নিজের মাঝারী পর্যায়ের প্রয়োজন পূর্ণ করার পর সেগুলো প্রাণ কুল সৎকাজে ব্যয় করাটাই বুদ্ধিমানের কাজ৷ দুনিয়ার এই হাতে গোণা কয়েকদিনের জীবনে প্রথম ব্যক্তি দ্বিতীয় জনে তুলনায় হয়তো অনেক বেশী প্রাচুর্যের অধিকারী হতে পারে৷ কিন্তু মানুষের জন্য এই দুনিয়ার জীবনটিই সম্পূর্ণ জীবন নয়৷ বরং এটি আসল জীবনের একটি সামান্যতম অংশ মাত্র৷ এই সামান্য ও ক্ষুদ্রতম অংশের সমৃদ্ধি ও সচ্ছলতার বিনিময়ে যে ব্যক্তি বৃহত্তম ও সীমাহীন জীবেনর অসচ্ছরতা, দারিদ্র ও দৈন্যদশা কিনে নেয় সে আসলে নিরেট বোকা ছাড়া আর কিছুই নয়৷ যে ব্যক্তি এই সংক্ষিপ্ত জীবনকালের সুযোগ গ্রহন করে মাত্র সামান্য পুঁজির সহায়তায় নিজের ঐ চিরন্তন জীবনের সমৃদ্ধির ব্যবস্থা করতে সক্ষম হয়েছে সে-ই আসলে বুদ্ধিমান৷
৩১০. আল্লাহর পথে ব্যয় করা হোক বা শয়তানের পথে, আল্লাহর জন্য মানত করা হোক বা গায়রুল্লাহর জন্য, উভয় অবস্থাযই মানুষের নিয়ত ও তার কাজ সম্পর্কে আল্লাহ ভালোভাবেই জানেন৷ যারা আল্লাহর জন্য ব্যয় করে থাকে এবং তাঁর জন্যই মানত করে তারা তাদের প্রতিদান পাবে৷ আর যেসব জালেম শয়তানের পথে ব্যয় করে থাকে এবং আল্লাহকে বাদ দিয়ে অন্যদের জন্য মানত করে, তাদের আল্লাহর শাস্তি থেকে রক্ষা করার সাধ্য কারো নেই৷ মানত বলা হয় নজরানাকে৷ কোন একটি মনোবাঞ্ছা পূর্ণ হলে মানুষ যখন নিজের ওপর এমন কোন ব্যয়ভার বা সেবাকে ফরয করে নেয়,যা তার ওপর ফরয নয় তখন তাকে মানত বলে৷ এই মনোবাঞ্ছা যদি কোন হালাল জিনিস সম্পর্কিত হয় এবং তা আল্লাহর কাছে চাওয়া হয়ে থাকে আর তা পূর্ণ হবার পর যে কাজ করার অংগীকার করা হয় তা আল্লাহর জন্যই হয়ে থাকে, তাহলে এই ধরণের নজরানা ও মানত হবে আল্লাহর আনুগত্যের অধীন৷ এই মানত পূর্ণ করলে সওয়াব ও প্রতিদান লাভ করা যাবে৷ যদি এই ধরনের মানত না হয়,তাহলে তা নিজেই নিজের ওপর আরোপিত গোনাহের কারণ হয়ে দাঁড়াবে এবং তা পূর্ণ করলে অবশ্যি আযাবের অংশীদার হতে হবে৷
৩১১. যে দান-খয়রাতটি করা ফরয সেটি প্রকাশ্যে করাই উত্তম৷ অন্যদিকে ফরয নয় এমন দান-খয়রাত গোপনে করাই ভালো৷ সমস্ত কাজের ক্ষেত্রেও এই নীতি প্রযোজ্য৷ ফরযগুলো প্রকাশ্যে এবং নফলগুলো গোপনে করাই উত্তম হিসেবে বিবেচিত৷
৩১২. অর্থাৎ লুকিয়ে সৎকাজ করলে মানুষের আত্মা ও নৈতিক বৃত্তির অনবরত সংশোধন হয়ে থাকে৷ তার সৎগুণাবলী বিকাশ লাভ করতে থাকে তার দোষ, ত্রুটি ও অসৎবৃত্তিগুলো ধীরে ধীরে নির্মুল হতে থাকে৷ এই জিনিসটি তাকে আল্লাহর এমন প্রিয়ভাজন করে তোলে,যার ফলে তার আমলনামায় যে সামান্য কিছু গোনাহ লেখা থাকে, তার এই সৎগুণাবলীর প্রতি দৃষ্টিপাত করে মহান আল্লাহ সেগুলো মাফ করে দেন৷
৩১৩. প্রথমদিকে মুসলমানরা নিজেদের অমুসলিম আত্মীয়-স্বজন ও সাধারণ অমুসলিম দরিদ্র ও অভাবীদের সাহায্য করার ব্যাপারে ইতস্তত করতো ৷ তারা মনে করছিল কেবলমাত্র মুসলিম অভাবী ও দরিদ্রদের সাহায্য করলেই তা আল্লাহর পথে সাহায্য হিসেবে গণ্য হবে৷ এই আয়াতে তাদের এই ভূল ধারণার অপনোদন করা হয়েছে৷ এখানে আল্লাহর বক্তব্যের অর্থ হচ্ছে, এসব লোকের মনে হিদায়াতের মর্মবানী সুদৃঢ়ভাবে বদ্ধমূল করে দেয়া তোমরা দায়িত্বের অন্তরভূক্ত নয়৷ তোমার দায়িত্ব হচ্ছে কেবল এদের কাছে হককথা পৌঁছিয়ে দেয়া৷ হককথা পৌঁছিয়ে দিয়েই তুমি দায়িত্বমুক্ত হয়ে গেছো৷ এখন তাদের অন্তরদৃষ্টি দান করা বা না করা আল্লাহর ইখতিয়ারভূক্ত৷ আর তোমরা নিছক তাদের হিদায়াত গ্রহণ না করার কারণে পার্থিব অর্থ-সম্পদ দিয়ে তাদের অভাব মোচনের ব্যাপারে ইতস্তত করো না কারণ আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে তোমরা যে কোন অভাবী লোকের সাহায্য করো না কেন, আল্লাহ তার প্রতিদান অবশ্যি তোমাদের দেবেন৷
৩১৪. এখানে যেসব লোকের কথা বলা হয়েছে, তারা হচ্ছে এমন একদল লোক যারা আল্লাহার দীনের খেদমতে নিজেদেরকে কায়মনোবাক্যে সাবর্ক্ষণিকভাবে উৎসর্গ করে দিয়েছিল৷ তাদের সমস্ত সময় এই দীনি খেদমতে ব্যয় করার কারণে নিজেদের পেট পালার জন্য কিছু কাজকাম করার সুযোগ তাদের ছিল না৷ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের যুগে এ‌ই ধরনের স্বেচ্ছাসেবীদের এটি স্বতন্ত্র দল ছিল৷ ইতিহাসে তাঁরা 'আসহাবে সুফ্‌ফা' নামে প্রসিদ্ধি লাভ করেছেন৷ এরা ছিলেন তিন চারশো লোকের একটি দল৷ নিজেদের বাড়ি ঘর ছেড়ে দিয়ে এরা মদীনায় চলে এসেছিলেন৷ সর্বক্ষন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের খেদমতে হাযির থাকতেন৷ তাঁর সাথে সাথে থাকতেন৷ তিনি যখন যাকে যেখানে কোন কাজে বা অভিযানে প্রয়োজন তাদের মধ্যে থেকে নিয়ে পাঠিয়ে দিতেন৷ মদীনার বাইরে কোন কাজ না থাকলে তারা মদীনায় অবস্থান করে দীনী ইল্‌ম হাসীল করতেন এবং অন্যদেরকে তার তালিম দিতেন৷ যেহেতু তাঁরা ছিলেন সার্বক্ষনিক কমী এবং নিজেদের প্রয়োজন পূর্ণ করার মতো ব্যক্তিগত উপকরণও তাঁদের ছিল না, তাই মহান আল্লাহ সাধারণ মুসলমানদের দৃষ্টি তাদের প্রতি আকৃষ্ট করে বিশেষ করে তাদেরকে সাহায্য করাকে আল্লাহ পথে ব্যয়ের সবোর্ত্তম খাত বলে উল্লেখ করেছেন৷