(২:১০৪) হে ঈমানদারগণ!১০৭ ‘রাইনা’ বলো না বরং ‘উন্‌যুরনা’ বলো এবং মনোযোগ সহকারে কথা শোনো ৷১০৮ এই কাফেররা তো যন্ত্রণাদায়ক আযাব লাভের উপযুক্ত ৷
(২:১০৫) আহলি কিতাব বা মুশরিকদের মধ্য থেকে যারা সত্যের দাওয়াত গ্রহণে অস্বীকৃতি জানিয়েছে তারা কখনোই তোমাদের রবের পক্ষ থেকে তোমাদের ওপর কোন কল্যাণ নাযিল হওয়া পছন্দ করে না ৷ কিন্তু আল্লাহ যাকে চান নিজের রহমত দানের জন্য বাছাই করে নেন এবং তিনি বড়ই অনুগ্রহশীল ৷
(২:১০৬) আমি যে আয়াতকে ‘মানসুখ’ করি বা ভুলিয়ে দেই , তার জায়গায় আনি তার চাইতে ভলো অথবা কমপক্ষে ঠিক তেমনটিই ৷১০৯
(২:১০৭) তুমি কি জানো না, আল্লাহ সব জিনিসের ওপর ক্ষমতাশালী ?তুমি কি জানো না, পৃথিবী ও আকাশের শাসন কর্তৃত্ব একমাত্র আল্লাহর? আর তিনি ছাড়া তোমাদের আর কোন বন্ধু ও সাহায্যকারী নেই ৷
(২:১০৮) তাহলে তোমরা কি তোমাদের রসূলের কাছে সেই ধরনের প্রশ্ন ও দাবী করতে চাও যেমন এর আগে মূসার কাছে করা হয়েছিল ? ১১০ অথচ যে ব্যক্তি ঈমানী নীতিকে কুফরী নীতিতে পরিবর্তিত করেছে, সে-ই সত্য-সঠিক পথ থেকে বিচ্যুত হয়েছে ৷
(২:১০৯) আহ্‌লি কিতাবদের অধিকাংশই তোমাদেরকে কোনক্রমে ঈমান থেকে আবার কুফরীর দিকে ফিরিয়ে নিতে চায় ৷ যদিও হক তাদের কাছে প্রকাশ হয়ে গেছে তবুও নিজেদের হিংসাত্মক মনোবৃত্তির কারণে এটিই তাদের কামনা ৷ এর জবাবে তোমরা ক্ষমা ও উপেক্ষার নীতি অবলম্বন করো৷১১১ যতক্ষণ না আল্লাহ নিজেই এর কোন ফায়সালা করে দেন ৷ নিশ্চিত জেনো , আল্লাহ সব কিছুর ওপর ক্ষমতাশীল ৷
(২:১১০) নামায কায়েম কায়েম করো ও যাকাত দাও ৷ নিজেদের পরকালের জন্য তোমরা যা কিছু সৎকাজ করে আগে পাঠিয়ে দেবে , তা সবই আল্লাহর ওখানে মজুত পাবে ৷ তোমরা যা কিছু করো সবই আল্লাহর দৃষ্টিতে রয়েছে ৷
(২:১১১) তারা বলে , কোন ব্যক্তি জান্নাতে যাবে না , যে পর্যন্ত না সে ইহুদি হয় অথবা (খৃস্টানদের ধারণামতে)খৃস্টান হয় ৷ এগুলো হচ্ছে তাদের আকাংখা ৷১১২ তাদেরকে বলে দাও, তোমাদের প্রমাণ আনো , যদি নিজেদের দাবীর ব্যাপারে তোমরা সত্যবাদী হও ৷
(২:১১২) (আসলে তোমাদের বা অন্য কারোর কোন বিশেষত্ব নেই ৷ ) সত্য বলতে কি যে ব্যক্তিই নিজের সত্ত্বাকে আল্লাহর আনুগত্যে সোপর্দ করবে এবং কার্যত সৎপথে চলবে , তার জন্য তার রবের কাছে এর প্রতিদান ৷ আর এই ধরনের লোকদের জন্য কোন ভয় বা মর্মবেদনার অবকাশ নেই ৷
১০৭. এ রুকূ'তে এবং পরবর্তী রুকূ'গুলোতে ইহুদিদের পক্ষ থেকে ইসলাম ও ইসলামী দলের বিরুদ্ধে যেসব অনিষ্টকর কাজ করা হচ্ছিল সে সম্পর্কে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অনুসারীদেরকে সতর্ক করে দেয়া হয়েছে ৷ তারা মুসলমানদের মনে যে সমস্ত সন্দেহ ও সংশয় সৃষ্টি করার চেষ্টা করছিল এখানে সেগুলোর জবাব দেয়া হয়েছে ৷ মুসলমানদের সাথে ইহুদিদের আলাপ –আলোচনায় যেসব বিশেষ বিশেষ প্রসংগ উত্থাপিত হতো, সেগুলোও এখানে আলোচিত হয়েছে ৷ এ প্রসংগে এ বিষয়টিও সামনে থাকা উচিত যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মদীনায় আগমনের পর যখন শহরের আশপাশের এলাকায় ইসলামের দাওয়াত বিস্তার লাভ করতে থাকলো ৷ তখন ইহুদিরা বিভিন্ন স্থানে মুসলমানদেরকে ধর্মীয় বিতর্কে টেনে আনার চেষ্টা করতে থাকলো ৷ তাদের তিলকে তাল করার , অতি গুরুত্বহীন বিষয়কে বিরাট গুরুত্ব দেয়ার সূ্ক্ষ্মতিসূক্ষ্ম বিষয়ের অবতারণা করার , সন্দেহ-সংশয়ের বীজ বপন করার ও প্রশ্নের মধ্য থেকে প্রশ্ন বের করার মারাত্মক রোগটি এসব সরলমনা লোকদের মনেও তারা সঞ্চারিত করতে চাচ্ছিল ৷ এমন কি তারা নিজেরাও সশরীরে নবী করীম সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লামের মজলিসে এসে প্রতারণামূলক কথাবার্তা বলে নিজেদের নীচ মনোবৃত্তির প্রমাণ পেশ করতো ৷
১০৮. ইহুদিরা কখনো নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মজলিসে এলে অভিবাদন , সম্ভাষণ ও কথাবার্তার মধ্য দিয়ে সম্ভাব্য সকল পদ্ধতিতে নিজেদের মনের ঝাল মিটিয়ে নেয়ার চেষ্টা করতো ৷ দ্ব্যর্থবোধক শব্দ বলা , উচ্চস্বরে কিছু বলা এবং অনুচ্চস্বরে অন্য কিছু বলা , বাহ্যিক ভদ্রতা ও আদব-কায়দা মেনে চলে পর্দান্তরালে রসূলূল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে অবমাননা ও অপমান করার কোন কসরতই বাকি রাখতো না ৷ পরবর্তী পর্যায়ে কুরআনে এর বহু দৃষ্টান্ত উপস্থাপন করা হয়েছে ৷ এখানে মুসলমানদেরকে একটি বিশেষ শব্দ ব্যবহার করতে নিষেধ করা হয়েছে ৷ এ শব্দটি বহু অর্থবোধক ৷ নবী সাল্লাল্লাহুআলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথ আলোচনার সময় ইহুদিদের যখন একথা বলার প্রয়োজন হতো যে, থামুন বা 'কথাটি আমাদের একটু বুঝে নিতে দিন' বা তখন তারা 'রাইনা' বলতো ৷ এ শব্দটির বাহ্যিক অর্থ ছিল , 'আমাদের একটু সুযোগ দিন' বা 'আমাদের কথা শুনুন ৷'কিন্তু এর আরো কয়েকটি সম্ভাব্য অর্থও ছিল ৷ যেমন হিব্রু ভাষায় অনুরূপ যে শব্দটি ছিল তার অর্থ ছিলঃ'শোন, তুই বধির হয়ে যা৷ ' আরবী ভাষায়ও এর একটি অর্থ ছিল , 'মূর্খ ও নির্বোধ '৷আলোচনার মাঝখানে এমন সময় শব্দটি প্রয়োগ করা হতো যখন এর অর্থ দাড়াত , তোমরা আমাদের কথা শুনলে আমরাও তোমাদের কথা শুনবো ৷ আবার মুখটাকে একটু বড় করে 'রা-ঈয়ানা' ( ) ও বলার চেষ্টা করা হতো ৷ এর অর্থ দাঁড়াত 'ওহে, আমাদের রাখাল !'তাই মুসলমানদের হুকুম দেয়া হয়েছে, তোমরা এ শব্দটি ব্যবহার না করে বরং 'উন্‌যুরনা' বলো ৷ এর অর্থ হয়, 'আমাদের দিকে দেখুন ' 'আমাদের প্রতি দৃষ্টি দিন ' অথবা 'আমাদের একটু বুঝতে দিন৷ ' এরপর আবার বলা হয়েছে, 'মনোযোগ সহকারে কথা শোনো৷'অর্থাৎ ইহুদিদের একথা বার বার বলার প্রয়োজন হয় ৷ কারণ তারা নবীর কথার প্রতি আগ্রহী হয় না এবং তাঁর কথা বলার মাঝখানে তারা নিজেদের চিন্তাজালে বার বার জড়িয়ে পড়তে থাকে ৷ কিন্তু তোমাদের তো মনোযোগ সহকারে নবীর কথা শুনতে হবে ৷ কাজেই ও ধরনের ব্যবহার করার প্রয়োজনই তোমাদের দেখা দেবে না ৷
১০৯.

ইহুদিরা মুসলমানদের মনে যেসব সন্দেহ সৃষ্টি করার চেষ্টা চালাতো তার মধ্য থেকে একটি বিশেষ সন্দেহের জবাব এখানে দেয়া হয়েছে ৷ তাদের অভিযোগ ছিল , পূর্ববর্তী কিতাবগুলো যদি আল্লাহর পক্ষ থেকে এসে থাকে এবং এ কুরআনও আল্লাহর পক্ষ থেকে এসেছে , তাহলে ঐ কিতাবগুলোর কতিপয় বিধানের জায়গায় এখানে ভিন্নতর বিধান দেয়া হয়েছে কেন ?একই আল্লাহর পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন বিধান কেমন করে হতে পারে ? আবার তোমাদের কুরআন এ দাবী উত্থাপন করেছে যে, ইহুদিরা ও খৃস্টানরা তাদেরকে প্রদত্ত এ শিক্ষার একটি অংশ ভুলে গেছে ৷ আল্লাহ প্রদত্ত শিক্ষা হাফেজদের মন থেকে কেমন করে বিলুপ্ত হয়ে যেতে পারে ? সঠিক অনুসন্ধানের উদ্দেশ্যে তারা এসব কথা বলতো না ৷ বরং কুরআনের আল্লাহর পক্ষ থেকে অবতীর্ণ হবার ব্যাপারে মুসলমানদের মনে সন্দেহ সৃষ্টি করার উদ্দেশ্যে তারা এগুলো বলতো ৷ এর জবাবে আল্লাহ বলেছেনঃ আমি মালিক ৷ আমার ক্ষমতা সীমাহীন ৷ আমি নিজের ইচ্ছা মতো যে কোন বিধান 'মান্‌সুখ' বা রহিত করে দেই এবং যে কোন বিধানকে হাফেজদের মন থেকে মুছে ফেলি ৷ কিন্তু যে জিনিসটি আমি 'মান্‌সুখ' করি তার জায়গায় তার চেয়ে ভালো জিনিস আনি অথবা কমপক্ষে সেই জিনিসটি নিজের জায়গায় আগেরটির মতই উপযোগী ও উপকারী হয় ৷

১১০. ইহুদিরা তিলকে তাল করে এবং সূক্ষ্ম বিষয়ের অবতারণা করে মুসলমানদের সামনে নানা ধরনের প্রশ্ন উত্থাপন করতো ৷ তোমাদের নবীর কাছে এটা জিজ্ঞেস করো ওটা জিজ্ঞেস করো বলে তারা মুসলমানদের উস্কানী দিতো ৷ তাই এ ব্যাপারে আল্লাহ মুসলমানদেরকে ইহুদিদের নীতি অবলম্বন করা থেকে দূরে থাকার জন্য সতর্ক করে দিচ্ছেন ৷নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামও এ ব্যাপারে মুসলমানদেরকে বার বার সতর্ক করে দিয়েছেন ৷ তিনি বলতেন , অনর্থক প্রশ্ন করা এবং তিলকে তাল করার কারণে পূর্ববর্তী উম্মাতরা ধ্বংস হয়েছে , কাজেই তোমরা এ পথে পা দিয়ো না ৷ আল্লাহ ও তাঁর রসূল যে প্রশ্নগুলো উত্থাপন করেননি সেগুলোর পেছনে জোঁকের মতো লেগে থেকো না ৷ তোমাকে যে নির্দেশ দেয়া হয় তা মেনে চলো এবং যে বিষয়গুলো থেকে নিষেধ করা হয় সেগুলো করো না ৷ অপ্রয়োজনীয় কথা বাদ দিয়ে কাজের কথার প্রতি মনোযোগ দাও ৷
১১১. অর্থাৎ ওদের হিংসা ও বিদ্বেষ দেখে উত্তেজিত হয়ে পড়ো না ৷ নিজের ভারসাম্য হারিয়ে ফেলো না ৷ এদের সাথে তর্ক-বিতর্ক ও ঝগড়া করে নিজের মূল্যবান সময় ও মর্যাদা নষ্ট করো না ৷ ধৈর্য সহকারে দেখতে থাকো আল্লাহ কি করেন ৷ অনর্থক আজেবাজে কাজে নিজের শক্তি ক্ষয় না করে আল্লাহর যিকির ও সৎকাজে সময় ব্যয় করো ৷ এগুলোই আল্লাহর ওখানে কাজে লাগবে ৷ বিপরীত পক্ষে ঐ বাজে কাজগুলোর আল্লাহর ওখানে কোন মূল্য নেই ৷
১১২. আসলে এটা নিছক তাদের অন্তরের বাসনা এবং আকাংখা মাত্র ৷ কিন্তু তারা এটাকে এমনভাবে বর্ণনা করছে যেন সত্যি সত্যিই এমনটি ঘটবে ৷