(২:৮৭) আমরা মূসাকে কিতাব দিয়েছি ৷ তারপর ক্রমাগতভাবে রসূল পাঠিয়েছি ৷ অবশেষে ঈসা ইবনে মারয়ামকে পাঠিয়েছি উজ্জ্বল নিশানী দিয়ে এবং পবিত্র রূহের মাধ্যমে তাকে সাহায্য করেছি ৷৯৩ এরপর তোমরা এ কেমনতর আচরণ করে চলছো,যখনই কোন রসূল তোমাদের প্রবৃত্তির কামনা বিরোধী কোন জিনিস নিয়ে তোমাদের কাছে এসেছে তখনই তোমরা তার বিরুদ্ধাচরণ করেছো, কাউকে মিথ্যা বলেছো এবং কাউকে হত্যা করেছো ৷
(২:৮৮) তারা বলে, আমাদের হৃদয় সুরক্ষিত ৷৯৪ না, আসলে তাদের কুফরীর কারণে তাদের ওপর আল্লাহর অভিশাপ বর্ষিত হয়েছে , তাই তারা খুব কমই ঈমান এনে থাকে ৷
(২:৮৯) আর এখন আল্লাহর পক্ষ থেকে তাদের কাছে যে একটি কিতাব এসেছে তার সাথে তারা কেমন ব্যবহার করছে? তাদের কাছে আগে থেকেই কিতাবটি ছিল যদিও এটি তার সত্যতা স্বীকার করতো এবং যদিও এর আগমনের পূর্বে তারা নিজেরাই কাফেরদের মোকাবিলায় বিজয় ও সাহায্যের দোয়া চাইতো , তবুও যখন সেই জিনিসটি এসে গেছে এবং তাকে তারা চিনতেও পেরেছে তখন তাকে মেনে নিতে তারা অস্বীকার করেছে ৷95 আল্লাহর লানত এই অস্বীকারকারীদের ওপর ৷
(২:৯০) যে জিনিসের সাহায্যে তারা মনের সান্ত্বনা লাভ করে, তা কতই না নিকৃষ্ট!৯৬ সেটি হচ্ছে, আল্লাহ যে হিদায়াত নাযিল করেছেন তারা কেবল এই জিদের বশবর্তী হয়ে তাকে মেনে নিতে অস্বীকার করছে যে, আল্লাহ তাঁর যে বান্দাকে চেয়েছেন নিজের অনুগ্রহ (অহী ও রিসালাত ) দান করেছেন৷৯৭ কাজেই এখন তারা উপর্যুপরি গযবের অধিকারী হয়েছে ৷ আর এই ধরনের কাফেরদের জন্য চরম লাঞ্ছনার শাস্তি নির্ধারিত রয়েছে ৷
(২:৯১) যখন তাদেরকে বলা হয় , আল্লাহ যা কিছু নাযিল করেছেন তার ওপর ঈমান আনো, তারা বলে, “আমরা কেবল আমাদের এখানে (অর্থাৎ বনী ইসরাঈলদের মধ্যে)যা কিছু নাযিল হয়েছে তার ওপর ঈমান আনি ৷ ”এর বাইরে যা কিছু এসেছে তার প্রতি ঈমান আনতে তারা অস্বীকৃতি জানাচ্ছে ৷ অথচ তা সত্য এবং তাদের কাছে পূর্ব থেকে যে শিক্ষা ছিল তার সত্যতার স্বীকৃতিও দিচ্ছে৷ তাদেরকে বলে দাওঃ যদি তোমরা তোমাদের ওখানে যে শিক্ষা নাযিল হয়েছিল তার ওপর ঈমান এনে থাকো, তাহলে ইতিপূর্বে আল্লাহর নবীদেরকে (যারা বনী ইসরাঈলদের মধ্যে জন্ম নিয়েছিলেন ) হত্যা করেছিলে কেন?
(২:৯২) তোমাদের কাছে মূসা এসেছিল কেমন সুস্পষ্ট নিদর্শনগুলো নিয়ে ৷ তারপরও তোমরা এমনি যালেম হয়ে গিয়েছিলে যে, সে একটু আড়াল হতেই তোমরা বাছুরকে উপাস্য বানিয়ে বসেছিলে ৷
(২:৯৩) তারপর সেই অংগীকারের কথাটাও একবার স্মরণ করো, যা আমি তোমাদের থেকে নিয়েছিলাম তূর পাহাড়কে তোমাদের ওপর উঠিয়ে রেখে ৷ আমি জোর দিয়েছিলাম, যে পথনির্দেশ আমি তোমাদেরকে দিচ্ছি, দৃঢ়ভাবে তা মেনে চলো এবং মন দিয়ে শুনো৷ তোমাদের পূর্বসূরীরা বলেছিল, আমরা শুনেছি কিন্তু মানবো না ৷ তাদের বাতিলপ্রিয়তা ও অন্যায় প্রবণতার কারণে তাদের হৃদয় প্রদেশে বাছুরই অবস্থান গেড়ে বসেছি৷ ৷ যদি তোমরা মু’মিন হয়ে থাকো, তাহলে এ কেমন ঈমান , যা তোমাদেরকে এহেন খারাপ কাজের নির্দেশ দেয়?
(২:৯৪) তাদেরকে বলো, যদি সত্যিসত্যিই আল্লাহ সমগ্র মানবতাকে বাদ দিয়ে একমাত্র তোমাদের জন্য আখেরাতের ঘর নিদিষ্ট করে থাকেন, তাহলে তো তোমাদের মৃত্যু কামনা করা উচিত ৯৮ —যদি তোমাদের এই ধারণায় তোমরা সত্যবাদী হয়ে থাকো ৷
(২:৯৫) নিশ্চিতভাবে জেনে রাখো, তারা কখনো এটা কামনা করবে না ৷ কারণ তারা স্বহস্তে যা কিছু উপার্জন করে সেখানে পাঠিয়েছে তার স্বাভাবিক দাবী এটিই (অর্থাৎ তারা সেখানে যাওয়ার ইচ্ছা পোষণ করবে না)৷ আল্লাহ ঐ সব যালেমদের অবস্থা ভালোভাবেই জানেন ৷
(২:৯৬) বেঁচে থাকার ব্যাপারে তোমরা তাদেরকে পাবে মানুষের মধ্যে সবচেয়ে লোভী ৷৯৯ এমনকি এ ব্যাপারে তারা মুশরিকদের চাইতেও এগিয়ে রয়েছে ৷ এদের প্রত্যেকে চায় কোনক্রমে সে যেন হাজার বছর বাঁচতে পারে ৷ অথচ দীর্ঘ জীবন কোন অবস্থায়ই তাকে আযাব থেকে দূরে সরিয়ে রাখতে পারবে না ৷ যে ধরনের কাজ এরা করছে আল্লাহ তার সবই দেখছেন ৷
৯৩. 'পবিত্র রূহ' বলতে অহী-জ্ঞান বুঝানো হয়েছে ৷ অহী নিয়ে দুনিয়ায় আগমনকারী জিব্রীলকেও বুঝানো হয়েছে ৷ আবার হযরত ঈসা আলাইহিস সালামের পাক রূহকেও বুঝানো হয়েছে ৷ আল্লাহ নিজেই তাঁকে পবিত্র গুণাবলীতে ভূষিত করেছিলেন ৷ 'উজ্জ্বল নিশানী' অর্থ সুস্পষ্ট আলামত ও চিহ্ন , যা দেখে প্রত্যেকটি সত্যপ্রিয় ও সত্যানুসন্ধিৎসু ব্যক্তি হযরত ঈসা আলাইহিস সালামকে আল্লাহর নবী বলে চিনতে পারে ৷
৯৪. অর্থাৎ আমাদের আকীদা-বিশ্বাস ও চিন্তা এতই পাকাপোক্ত যে, তোমরা যাই কিছু বল না কেন আমাদের মনে তোমাদের কথা কোন রকম প্রভাব বিস্তার করতে পারবে না ৷ যেসব হঠধর্মী লোকের মন-মস্তিষ্ক অজ্ঞতা ও মূর্খতার বিদ্বেষে আচ্ছন্ন থাকে তারাই এ ধরনের কথা বলে ৷ তারা একে মজবুত বিশ্বাস নাম দিয়ে নিজেদের একটি গুণ বলে গণ্য করে ৷ অথচ এটা মানুষের গুণ নয় দোষ্ ৷ নিজের উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া আকীদা-বিশ্বাস ও চিন্তার গলদ ও মিথ্যা বলিষ্ঠ যুক্তির মাধ্যমে প্রমাণিত হবার পরও তার ওপর অবিচল থাকার চাইতে বড় দোষ মানুষের আর কি হতে পারে ?
95. নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আগমনের পূর্বে ইহুদিরা তাদের পূর্ববর্তী নবীগণ যে নবীর আগমন বার্তা শুনিয়ে গিয়েছিলেন তাঁর জন্য প্রতীক্ষারত ছিল ৷ তারা দোয়া করতো, তিনি যেন অবিলম্বে এসে কাফেরদের প্রাধান্য খতম করে ইহুদি জাতির উন্নতি ও পুনরুত্থানের সূচনা করেন৷ মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নবুওয়াত লাভের পূর্বে মদীনাবাসীদের প্রতিবেশী ইহুদি সম্প্রদায় নবীর আগমনের আশায় জীবন ধারণ করতো, মদীনাবাসীরা নিজেরাই একথার সাক্ষ্য দেবে ৷ যত্রতত্র যখন তখন তারা বলে বেড়াতোঃ"ঠিক আছে, এখন প্রাণ ভরে আমাদের ওপর যুলুম করে নাও ৷ কিন্তু যখন সেই নবী আসবেন, আমরা তখন এই যালেমদের সবাইকে দেখে নেবো ৷ " মদীনাবাসীরা এসব কথা আগে থেকেই শুনে আসছিল ৷ তাই নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কথা এবং তাঁর অবস্থা শুনে তারা পরস্পর বলাবলি করতে লাগলোঃ দেখো , ইহুদিরা যেন তোমাদের পিছিয়ে দিয়ে এই নবীর ধর্ম গ্রহণ করে বাজী জিতে না নেয় ৷ চলো, তাদের আগে আমরাই এ নবীর ওপর ঈমান আনবো ৷ কিন্তু তারা অবাক হয়ে দেখলো,যে ইহুদিরা নবীর আগমন প্রতীক্ষায় দিন গুণছিল , নবীর আগমনের পর তারাই তাঁর সবচেয়ে বড় বিরোধী পক্ষে পরিণত হলো৷

'এবং তারা তাকে চিনতেও পেরেছে 'বলে যে কথা মূল আয়াতে বলা হয়েছে , তার স্বপক্ষে তথ্য- প্রমাণ সেই যুগেই পাওয়া গিয়েছিল ৷ এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে শক্তিশালী সাক্ষ্য পেশ করেছেন উম্মুল মু'মিনীন হযরত সাফিয়া রাদিয়াল্লাহু আনহা ৷ তিনি নিজে ছিলেন একজন বড় ইহুদি আলেমের মেয়ে এবং আর একজন বড় আলেমের ভাইঝি ৷ তিনি বলেন , নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মদীনায় আগমনের পর আমার বাপ ও চাচা দু'জনই তাঁর সাথে সাক্ষাত করতে গিয়েছিলেন ৷ দীর্ঘক্ষন তাঁর সাথে কথাবার্তা বলার তারা ঘরে ফিরে আসেন ৷ এ সময় নিজের কানে তাদেরকে এভাবে আলাপ করতে শুনিঃ

চাচাঃ আমাদের কিতাবে যে নবীর খবর দেয়া হয়েছে ইনি কি সত্যিই সেই নবী ?
পিতাঃ আল্লাহর কসম , ইনিই সেই নবী ৷
চাচাঃ এ ব্যাপারে তুমি কি একেবারে নিশ্চিত?
পিতাঃ হাঁ
চাচাঃ তাহলে এখন কি করতে চাও ?
পিতাঃ যতক্ষন দেহে প্রাণ আছে এর বিরোধিতা করে যাবো ৷ একে সফলকাম হতে দেবো না ৷ (ইবনে হিশাম , ২য় খন্ড, ১৬৫ পৃঃ আধুনিক সংস্করণ )
৯৬. এই আয়াতটির দ্বিতীয় একটি অনুবাদও হতে পারে ৷ সেটি হচ্ছেঃ "যতই নিকৃষ্ট সেটি, যার জন্য তারা জীবন বিক্রি করে দিয়েছে ৷ অর্থাৎ নিজেদের কল্যাণ, শুভ পরিণতি ও পরকালীন নাজাতকে কুরবানী করে দিয়েছে ৷ "
৯৭. তারা চাচ্ছিল, ঐ নবী তাদের ইসরাঈল বংশের মধ্যে জন্ম নেবে ৷ কিন্তু যখন তিনি বনী ইসরাঈলের বাইরে এমন এক বংশে জন্মগ্রহণ করলেন , যাদেরকে তারা নিজেদের মোকাবিলায় তুচ্ছ-জ্ঞান করতো, তখন তারা তাঁকে অস্বীকার করতে উদ্যত হলো ৷ অর্থাৎ তারা যেন বলতে চাচ্ছিল,আল্লাহ তাদেরকে জিজ্ঞেস করে নবী পাঠালেন না কেন ?যখন তিনি তাদেরকে জিজ্ঞেস না করে যাকে ইচ্ছা তাকে নবী বানিয়ে পাঠালেন তখন তারা বেঁকে বসলো ৷
৯৮. ইহুদিদের দুনিয়া প্রীতির প্রতি এটি সূক্ষ্ম বিদ্রূপ বিশেষ ৷ আখেরাতের জীবন সম্পর্কে যারা সচেতন এবং আখেরাতের জীবনের সাথে যাদের সত্যিই কোন মানসিক সংযোগ থাকে তারা কখনো পার্থিব স্বার্থ লাভের জন্য মরিয়া হয়ে উঠতে পারে না ৷ কিন্তু ইহুদিদের অবস্থা এর সম্পূর্ণ বিপরীত ছিল এবং এখনো আছে ৷
৯৯. কুরআনের মূল শব্দে এখানে 'আলা হায়াতিন' বলা হয়েছে ৷ এর মানে হচ্ছে, কোন না কোনভাবে বেঁচে থাকা , তা যে ধরনের বেঁচে থাকা হোক না কেন, সম্মানের ও মর্যাদার বা হীনতার, দীনতার, লাঞ্ছনা-অবমাননার জীবনই হোক না কেন তার প্রতিই তাদের লোভ ৷