(১৯:৫১) আর এ কিতাবে মূসার কথা স্মরণ করো৷ সে ছিল এক বাছাই করা ব্যক্তি২৯ এবং ছিল রসূল নবী৷৩০
(১৯:৫২) আমি তাকে তূরের ডান দিক থেকে ডাকলাম ৩১ এবং গোপন আলাপের মাধ্যমে তাকে নৈকট্য দান করলাম৷৩২
(১৯:৫৩) আর নিজ অনুগ্রহে তার ভাই হারুণকে নবী বানিয়ে তাকে সাহায্যকারী হিসেবে দিলাম৷
(১৯:৫৪) আর এ কিতাবে ইসমাঈলের কথা স্মরণ করো৷ সে ছিল ওয়াদা পালনে সত্যনিষ্ঠ এবং ছিল রসূল নবী৷
(১৯:৫৫) সে নিজের পরিবারবর্গকে নামায ও যাকাতের হুকুম দিতো এবং নিজের রবের কাছে ছিল একজন পছন্দনীয় ব্যক্তি৷
(১৯:৫৬) আর এ কিতাবে ইদরিসের কথা স্মরণ করো৷৩৪ সে একজন সত্যনিষ্ঠ মানুষ এবং একজন নবী৷
(১৯:৫৭) আর তাকে আমি উঠিয়েছিলাম উন্নত স্থানে৷৩৩
(১৯:৫৮) এরা হচ্ছে, এমন সব নবী, যাদের প্রতি আল্লাহ অনুগ্রহ করেছিলেন আদম সন্তানদের মধ্য থেকে এবং যাদেরকে আমি নূহের সাথে নৌকায় আরোহণ করিয়েছিলাম, তাদের বংশধরদের থেকে, আর ইবরাহীমের বংশধরদের থেকে ও ইসরাঈলের বংশধরদের থেকে, আর এরা ছিল তাদের মধ্য থেকে যাদেরকে আমি সঠিক পথের সন্ধান দিয়েছিলাম এবং বাছাই করে নিয়েছিলাম৷ এদের অবস্থা এই ছিল যে, যখন করুণাময়ের আয়াত এদেরকে শুনানো হতো তখন কান্নারত অবস্থায় সিজদায় লুটিয়ে পড়তো৷
(১৯:৫৯) তারপর এদের পর এমন নালায়েক লোকেরা এদের স্থলাভিষিক্ত হলো যারা নামায নষ্ট করলো ৩৫ এবং প্রবৃত্তির কামনার দাসত্ব করলো৷৩৬ তাই শীঘ্রই তারা গোমরাহীর পরিণামের মুখোমুখি হবে৷
(১৯:৬০) তবে যারা তাওবা করবে, ঈমান আনবে ও সৎকাজ করবে, তারা জান্নাতে প্রবেশ করবে এবং তাদের সমান্যতম অধিকারও ক্ষুন্ন হবে না৷
(১৯:৬১) তাদের জন্য রয়েছে চিরস্থায়ী জান্নাত, যার প্রতিশ্রুতি করুণাময় নিজের বান্দাদের কাছে অদৃশ্য পন্থায় দিয়ে রেখেছেন৷৩৭ আর অবশ্যই এ প্রতিশ্রুতি পালিত হবেই৷
(১৯:৬২) সেখানে তারা কোন বাজে কথা শুনবে না, যা কিছুই শুনবে ঠিকই শুনবে৷৩৮ আর সকাল সন্ধ্যায় তারা অনবরত নিজেদের রিযিক লাভ করতে থাকবে৷
(১৯:৬৩) এ হচ্ছে সেই জান্নাত, যার উত্তরাধিকারী করবো আমি আমার বান্দাদের মধ্য থেকে মুত্তাকীদেরকে৷
(১৯:৬৪) হে মুহাম্মাদ!৩৯ আমি আপনার রবের হুকুম ছাড়া অবতরণ করি না৷ যাকিছু আমাদের সামনে ও যাকিছু পেছনেএবং যাকিছু এর মাঝখানে আছে তার প্রত্যেকটি জিনিসের তিনিই মালিক এবং আপনার রব ভুলে যান না৷
(১৯:৬৫) তিনি আসমান ও যমীনের এবং এ দূয়ের মাঝখানে আছে সবকিছুর রব৷ কাজেই আপনি তার বন্দেগী করুন এবং তার বন্দেগীর ওপর অবিচল থাকুন৷৪০ আপনার জানা মতে তাঁর সমকক্ষ কোন সত্তা আছে কি?৪১
২৯. মূলে ()শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে৷ এর মানে হচ্ছে, একান্ত করে নেয়া"৷ অর্থাৎ হযরত মূসা এমন এক ব্যক্তি ছিলেন যাকে আল্লাহ একান্তভাবে নিজের করে নিয়েছিলেন৷
৩০. "রাসূল" মানে প্রেরিত৷ এই মানের দিক দিয়ে আরবী ভাষায় দূত, পয়গম্বর, বার্তাবাহক ও রাজদূতের জন্য এ শব্দটি ব্যবহার করা হয়৷ আর কুরআনের এ শব্দটি এমন সব ফেরেশতার জন্যও ব্যবহার করা হয়েছে যাদেরকে আল্লাহর পক্ষ থেকে বিশেষ কাজে নিযুক্ত করা হয় অথবা এমন সব মানুষকে এ নামে অখ্যায়িত করা হয়েছে যাদেরকে আল্লাহ সৃষ্টির কাছে নিজের বাণী পৌঁছাবার জন্য নিযুক্ত করেন৷

"নবী" শব্দটির অর্থের ব্যাপারে অভিধানবিদদের মধ্যে মতবিরোধ রয়েছে৷ কেউ কেউ একে ()শব্দ থেকে গঠিত বলেন৷ এ ক্ষেত্রে এর অর্থ হয় খবর৷ এই মূল অর্থের দিক দিয়ে নবী মানে হয় "খবর প্রদানকারী"৷ আবার কেউ কেউ বলেন, () ধাতু থেকে নবী শব্দের উৎপত্তি৷ এর অর্থ উন্নতি ও উচ্চতা৷ এ অর্থের দিক দিয়ে এর মানে হয় "উন্নত মর্যাদা" ও "সুউচ্চ অবস্থান"৷ আযহারী কিসায়ী থেকে তৃতীয় একটি উক্তি উদ্ধৃত করেছেন৷ সেটি হচ্ছে এই যে, এ শব্দটি মূলত () থেকে এসেছে৷ এর মানে হচ্ছে পথ৷ আর নবীদেরকে নবী এজন্য বলা হয়েছে যে, তাঁরা হচ্ছেন আল্লাহর দিকে যাবার পথ৷

কাজেই কোন ব্যক্তিকে "রাসূল নবী" বলার অর্থ হবে "উন্নত মর্যাদাশালী পয়গম্বর অথবা"আল্লাহর পক্ষ থেকে খবর দানকারী পয়গম্বর" কিংবা "এমন পয়গম্বর যিনি আল্লাহর পথ বাতলে দেন"৷

কুরআন মজীদে এ দুটি শব্দ সাধারণত একই অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে৷ তাই আমরা দেখি একই ব্যক্তিকে কোথাও শুধু নবী বলা হয়েছে এবং কোথাও শুধু রাসূল বলা হয়েছে আবার কোথাও রসূল ও নবী এক সাথে বলা হয়েছে৷ কিন্তু কোন কোন জায়গায় রসূল ও নবী শব্দ দুটি এমনভাবেও ব্যবহৃত হয়েছে যা থেকে প্রকাশ হয় যে, এ উভয়ের মধ্যে মর্যাদা বা কাজের ধরনের দিক দিয়ে কোন পারিভাষিক পার্থক্য রয়েছে৷ যেমন সূরা হজ্জের ৭ রুকূতে বলা হয়েছেঃ

… … … ()

"আমি তোমার আগে এমন কোন রসূলও পাঠাইনি এবং এমন কোন নবী পাঠাইনি, যে…………. " একথাগুলো পরিস্কার প্রকাশ করছে যে, রসূল ও নবী দু‍‍'টি আলাদা পরিভাষা এবং এদের মধ্যে নিশ্চয়ই কোন আভ্যন্তরীণ পার্থক্য আছে৷ এরি ভিত্তিতে এ পার্থক্যের ধরনটা কি এ নিয়ে তাফসীরকারদের মধ্যে বিতর্ক দেখা দিয়েছে৷ কিন্তু আসলে চূড়ান্ত ও অভ্রান্ত দলীল প্রমাণের সাহায্যে কেউই রসূল ও নবীর পৃথক মর্যাদা চিন্তিত করতে পারেননি৷ বড়জোর এখানে এতটুকু কথা নিশ্চয়তা সহকারে বলা যেতে পারে যে, রসূল শব্দটি নবীর তুলনায় বিশিষ্টতা সম্পন্ন৷ অর্থাৎ প্রত্যেক রসূল নবী হন কিন্তু প্রত্যেক নবী রসূল হন না৷ অন্যকথায়, নবীদের মধ্যে রসূল শব্দটি এমন সব নবীর জন্য ব্যবহার করা হয়েছে৷ একটি হাদীসও এ বক্তব্য সমর্থন করে৷ হাদীসটি উদ্ধৃত করেছেন ইমাম আহমদ হযরত আবু উমামাহ থেকে এবং হাকেম হযরত আবু যার (রা) থেকে৷ এতে বলা হয়েছে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে রসূলদের সংখ্যার ব্যাপারে প্রশ্ন করা হয়৷ তিনি বলেন, ৩১৩ বা ৩১৫ এবং নবীদের সংখ্যা জিজ্ঞেস করা হলে বলেন, এক লাখ চব্বিশ হাজার৷ যদিও হাদিসটির সনদ দুর্বল কিন্তু কয়েকটি সনদের মাধ্যমে একই কথার বর্ণনা কথাটির দুর্বলতা অনেকাংশে কমিয়ে দেয়৷
৩১. তূর পাহাড়ের ডান দিক থেকে বলতে পূর্ব পাদদেশ বুঝানো হয়েছে৷ যেহেতু হযরত মূসা (আ) মাদয়ান থেকে মিসর যাবার পথে এ তূর পাহাড়ের দক্ষিন পাশের পথ দিয়ে এগিয়ে চলছিলেন এবং দক্ষিণ দিক থেকে কোন ব্যক্তি দূরকে দেখলে তার ডান দিক হবে পূর্ব এবং বাম দিক হবে পশ্চিম, তাই হযরত মূসার সাথে সম্পর্কিত করে তূরের পূর্ব পাদদেশকে "ডান দিক" বলা হয়েছে৷ অন্যথায় একথা সুস্পষ্ট যে, পাহাড়ের কোন ডানদিক বা বামদিক হয় না৷
৩২. ব্যাখ্যার জন্য দেখুন তাফহীমুল কুরআন, আন দিসা ২০৬ টীকা৷
৩৪. এর সোজা অর্থ হচ্ছে আল্লাহ হযরত ইদরীসকে (আ) উন্নত মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করেছিলেন৷ ইসরাঈলী বর্ণনাসমূহ থেকে স্থানান্তরিত হয়ে একথা আমাদের এখানেও প্রসিদ্ধ হয়ে গেছে যে, আল্লাহ হযরত ইদরীসকে (আ) আকাশে তুলে নিয়েছিলেন, বাইবেলে তো শুধু এতটুকু বলা হয়েছে যে, তিনি অদৃশ্য হয়ে গেছেন কারণ "আল্লাহ তাঁকে উঠিয়ে নিয়েছেন"৷ কিন্তু তালমুদে তার সম্পর্কে একটি দীর্ঘ কাহিনী বর্ণনা করা হয়েছে৷ কাহিনীটি এভাবে শেষ করা হয়েছে যে, "হনোক একটি ঘূর্ণির মধ্যে অগ্নিরথ ও অশ্বসহ আকাশে আরোহণ করলেন"৷
৩৩. হযরত ইদরীসের (আ) ব্যাপারে মতবিরোধ আছে৷ কারোর মতে তিনি বনী ইসরাঈলের নবী ছিলেন৷ কিন্তু অধিকাংশের মতে তিনি নূহের (আ) ও পূর্বে অতিক্রান্ত হয়েছেন৷ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে এমন কোন সহী হাদীস আমরা পাইনি যা তাঁর সঠিক পরিচয় নির্ধারণ করার ক্ষেত্রে কোন প্রকার সাহায্য করতে পারে৷ তবে হাঁ, কুরআনের একটি ইংগিত এ ধারনণার প্রতি সমর্থন যোগায় যে, তিনি নূহের (আ) পূর্বগামী ছিলেন৷ কারণ পরবর্তী আয়াতে বলা হয়েছে, এ নবীগণ (উপরে যাদের কথা বালা হয়েছে) আদমের সন্তান, নূহের সন্তান, ইবরাহীমের সন্তান এবং ইসরাঈলের সন্তান৷ এখন একথা সুস্পষ্ট যে, হযরত ইয়াহইয়া, হযরত ঈসা ও হযরত মূসা আলাইহিমুস্ সালাম বনী ইসরাঈলের অন্তরভুক্ত, হযরত ইসমাঈল, হযরত ইসহাক ও হযরত ইয়াকুব আলাইহিমুস সালাম ইবরাহীমের সন্তানদের অন্তরভুক্ত এবং হযরত ইবরাহীম (আ ) নূহের সন্তানদের অন্তরভুক্ত এরপর থেকে যান কেবলমাত্র হযরত ইদ্রীস৷ তাঁর সম্পর্কে ধারণা করা যেতে পারে যে, তিনি আদমের (আ) সন্তানদের অন্তরভুক্ত৷

মুফাসসিরগণ সাধারণভাবে একথা মনে করেন যে, বাইবেলে যে মনীষীকে হনোক (Enoch ) বলা হয়েছে তিনিই হযরত ইদরীস আলাইহিস সালাম৷ তাঁ সম্পর্কে বাইবেলের বর্ণনা হচ্ছেঃ

"আর হনোক পঁয়ষট্টি বৎসর বয়সে মথুশেলহের জন্ম দিলেন৷ মথুশেলহের জন্ম দিলে পর হনোক তিন শত বৎসর ঈশ্বরের সহিত গমনাগমন করিলেন৷ …… পরে তিনি আর রহিলেন না, কেন না ঈশ্বর তাঁহাকে গ্রহণ করিলেন৷" (আদিপুস্তক ৫: ২১-২৪)

তালমূদের ইসরাঈলী বর্ণনায় তাঁর অবস্থা আরো বিস্তারিতভাবে বলা হয়েছে৷ এই বর্ণনার সংক্ষিপ্তসার হচ্ছেঃ হযরত নূহের পূর্বে যখন আদম সন্তানদের মধ্যে বিকৃতির সূচনা হলো তখন আল্লাহর ফেরেশতারা হনোককে, যিনি জনসমাজ ত্যাগ করে নির্জনে ইবাদাত বন্দেগী করে জীবন অতিবাহিত করছিলেন, ডেকে বললেন, "হে হনোক! ওঠো, নির্জনবাস থেকে বের হও এবং পৃথিবীর অধিবাসীদের মধ্যে চলাফেরা এবং তাদের সাথে ওঠাবসা করে যে পথে তাদের চলা উচিত এবং যেভাবে তাদের কাজ করতে হবে তা তাদেরকে জানিয়ে দাও৷ " এ হুকুম পেয়ে তিনি বের হলেন৷ তিনি বিভিন্ন জায়গায় লোকদেরকে একত্র করে নসীহত করলেন ও নির্দেশ দিলেন এবং মানব সন্তানরা তাঁর আনুগত্য করে আল্লাহর বন্দেগীর পথ অবলম্বন করলো৷ হনোক ৩৫৩ বছর পর্যন্ত মানব সম্প্রদায়ের ওপর শাসন কর্তৃত্ব চালান৷ তাঁর শাসন ছিল ইনসাফ ও সত্যপ্রীতির শাসন৷ তাঁর শাসনামলে পৃথিবীর এপর আল্লাহর অনুগ্রহ বর্ষিত হতে থাকে৷ " (The Talmud Salections, Pp 18-21)
৩৫. অর্থাৎ নামায পড়া ত্যাগ করলো অথবা নামায থেকে গাফেল ও বেপরোয়া হয়ে গেলো৷ এটি প্রত্যেক উম্মতের পতন ও ধ্বংসের প্রথম পদক্ষেপ৷ নামায আল্লাহর সাথে মু'মিনের প্রথম ও প্রধানতম জীবন্ত ও কার্যকর সম্পর্ক জুড়ে রাখে৷ এ সম্পর্ক তাকে আল্লাহর প্রতি আনুগত্যের কেন্দ্র বিন্দু থেকে বিচ্যুত হতে দেয় না৷ এ বাঁধন ছিন্ন হাবার সাথে সাথেই মানুষ আল্লাহ থেকে দূরে বহুদূরে চলে যায়৷ এমনকি কার্যকর সম্পর্ক খতম হয়েগিয়ে মানসিক সম্পর্কেও অবসান ঘটে৷ তাই আল্লাহ একটি সাধারণ নিয়ম হিসেবে এখানে একথাটি বর্ণনা করেছেন যে, পূর্ববর্তী সকল উম্মতের বিকৃতি শুরু হয়েছে নামায নষ্ট করার পর৷
৩৬. এটি আল্লাহর সাথে সম্পর্কের অভাব ও এর শূন্যতার অনিবার্য ফল৷ নামায ছেড়ে দেবার পর যখন আল্লাহর স্মরণ থেকে মন গাফেল হয়ে যেতে থাকে তখন যতই এ গাফলতি বাড়তে থাকে ততই প্রবৃত্তির কামনার পূজাও বেড়ে যেতে থাকে৷ শেষ পর্যন্ত নৈতিক চরিত্র ও ব্যবহারিক জীবনের সকল ক্ষেত্র আল্লাহর হুকুমের পরিবর্তে নিজের মনগড়া পদ্ধতির অনুসারী হয়ে যায়৷
৩৭. অর্থাৎ যার প্রতিশ্রুতি করুণাময় এমন অবস্থায় দিয়েছেন যখন ঐ জান্নাতসমূহ তাদের দৃষ্টির অগোচরে রয়েছে৷
৩৮. মূলে "সালাম" শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে৷ এর মানে হচ্ছে দোষ-ত্রুটিমুক্ত৷ জান্নাতে মানুষ যে সমস্ত নিয়ামত লাভ করবে তার মধ্যে একটি বড় নিয়ামত হবে এই যে, সেখানে কোন আজেবাজে অর্থহীন ও কটু কথা শোনা যাবে না৷ সেখানকার সমগ্র সমাজ হবে পাক-পবিত্র, পরিচ্ছন্ন ও ক্লেদমুক্ত৷ প্রত্যেক ব্যক্তির প্রকৃতিই হবে ভারসাম্যপূর্ণ৷ সেখানকার বাসিন্দারা পরনিন্দা, পরচর্চা, গালি-গালাজ, অশ্লীল গান ও অন্যান্য অশালীন ধ্বনি একেবারেই শুনবে না৷ সেখানে মানুষ শুধুমাত্র ভালো, ন্যায়সংগত ও যথার্থ কথাই শুনবে৷ এ দুনিয়ায় যে ব্যক্তি একটি যথার্থ পরিচ্ছন্ন ও শালীন, রুচির অধিকারী একমাত্র সে-ই এ নিয়ামতের কদর বুঝতে পারে৷ কারণ একমাত্র সে-ই অনুভব করতে পারে যে মানুষের জন্য এমন একটি পূতিগন্ধময় সমাজে বাস করা কত বড় বিপদ যেখানে কোন মুহূর্তেই তার কান মিথ্যা, পরনিন্দা, ফিতনা, ফাসাদ, অশ্লীল অশালীন ও যৌন উত্তেজক কথাবার্তা থেকে সংরক্ষিত থাকে না৷
৩৯. এ সম্পূর্ণ প্যারাগ্রাফটি একটি প্রাসংগিক বাক্য৷ একটি ধারাবাহিক বক্তব্য শেষ করে অন্য একটি ধারাবাহিক বক্তব্য শুরু করার আগে এটি বলা হয়েছে৷ বক্তব্য উপস্থাপনার ধরন পরিষ্কার জানিয়ে দিচ্ছে যে, এ সূরাটি দীর্ঘকাল পরে এমন এক সময় নাযিল হয় যখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও তাঁর সাহাবীগণ অত্যন্ত দুর্ভাবনা ও দুশ্চিন্তার সময় অতিবাহিত করেছিলেন৷ নবী (সা) ও তাঁর সাহাবীগণ সর্বক্ষণ অহীর অপেক্ষা করতেন৷ এর সাহায্যে তাঁরা নিজেদের পথের দিশা পেতেন এবং মানসিক প্রশান্তি ও সান্ত্বনাও লাভ করতেন৷ অহীর অগমনে যতই বিলম্ব হচ্ছিল ততই তাদের অস্থিরতা বেড়ে যাচ্ছিল৷ এ অবস্থায় জিব্রীল আলাইহিস সালাম ফেরেশতাদের সাহচর্যে আগমন করলেন৷ প্রথমে তিনি তাৎক্ষণিক প্রয়োজনীয় বিষয় সম্পর্কিত ফরমান শুনালেন তারপর সামনের দিকে অগ্রসর হবার আগে আল্লাহর ইংগিতে নিজের পক্ষ থেকে একথা ক'টি বললেন৷ একথা ক'টির মধ্যে রয়েছে এত দীর্ঘকাল নিজের গরহাজির থাকার ওজর, আল্লাহর পক্ষ থেকে সান্ত্বনাবাণী এবং এ সংগে সবর ও সংযম অবলম্বন করার উপদেশ ও পরামর্শ৷ বক্তব্যের অভ্যন্তর থেকেই শুধু এ সাক্ষের প্রকাশ হচ্ছে না বরং বিভিন্ন হাদীসও এর সমর্থন করেছে৷ ইবনে জারীর, ইবনে কাসীর ও রুহুল মা'আনী ইত্যাদির লেখকগণ এ আয়াতের ব্যাখ্যায় এ হাদীসগুলো উদ্ধৃত করেছেন৷
৪০. অর্থাৎ তাঁর বন্দেগীর পথে মজবুতভাবে এগিয়ে চলো এবং এ পথে যে সব সংকট, সমস্যা ও বিপদ আসে সবরের সাথে সেসবের মোকাবিলা করো৷ যদি তাঁর পক্ষ থেকে স্মরণ করা এবং সাহায্য ও সান্ত্বনা দেবার ব্যাপারে কখনো বিলম্ব হয় তাহলে তাতে ভীত হয়ো না৷ একজন অনুগত বান্দার মতো সব অবস্থায় তাঁর ইচ্ছার হয় তাহলে ওপর সন্তুষ্ট থাকো এবং একজন বান্দা ও রাসূল হিসেবে তোমার ওপর যে দায়িত্বভাব হয়েছে দৃঢ় সংকল্প সহকারে তা পালন করতে থাকো৷
৪১. মূলে () শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে৷ এর আভিধানিক অর্থ হচ্ছে "সমনাম" অর্থাৎ আল্লাহ তো হচ্ছেন ইলাহ, তোমাদের জানা মতে দ্বিতীয় কোন ইলাহ আছে কি? যদি না থেকে থাকে এবং তোমারা জানো যে নাই, তাহলে তোমাদের জন্য তারই বন্দেগী করা এবং তারই হুকুমের দাস হয়ে থাকা ছাড়া অন্য কোন পথ থাকে কি"