(১৮:৫০) স্মরণ করো যখন আমি ফেরেশতাদেরকে বলেছিলাম আদমকে সিজদা করো তখন তারা সিজদা করেছিল কিন্তু ইবলীস করেনি৷ ৪৭ সে ছিল জিনদের একজন, তাই তার রবের হুকুমের আনুগত্য থেকে বের হয়ে গেলো৷ ৪৮ এখন কি তোমরা আমাকে বাদ দিয়ে তাকে এবং তার বংশধরদেরকে নিজেদের অভিভাবক বানিয়ে নিচ্ছো অথচ তারা তোমাদের দুশমন ? বড়ই খারাপ বিনিময় জালেমরা গ্রহণ করছে !
(১৮:৫১) আকাশ ও পৃথিবী সৃষ্টি করার সময় আমি তাদেরকে ডাকিনি এবং তাদের নিজেদের সৃষ্টিতেও তাদেরকে শরীক করিনি৷ ৪৯ পথভ্রষ্টকারীদেরকে নিজের সাহায্যকারী করা আমার রীতি নয়৷
(১৮:৫২) তাহলে সেদিন এরা কি করবে যেদিন এদের রব এদেরকে বলবে, ডাকো সেই সব সত্তাকে যাদেরকে তোমরা আমার শরীক মনে করে বসেছিলে ? ৫০ এরা তাদেরকে ডাকবে কিন্তু তারা এদেরকে সাহায্য করতে আসবে না এবং আমি তাদের মাঝখানে একটি মাত্র ধ্বংস গহ্বর তাদের সবার জন্য বানিয়ে দেবো৷৫১
(১৮:৫৩) সমস্ত অপরাধীরা সেদিন আগুন দেখবে এবং বুঝতে পারবে যে, এখন তাদের এর মধ্যে পড়তে হবে এবং এর হাত থেকে বাঁচার জন্য তারা কোনো আশ্রয়স্থল পাবে না৷
৪৭. এ বক্তব্যের ধারাবাহিকতায় আদম ও ইবলীসের কাহিনীর প্রতি ইংগিত করার উদ্দেশ্য হচ্ছে পথভ্রষ্ট লোকদেরকে তাদের এ বোকামির ব্যাপারে সজাগ করে দেয়া যে, তারা নিজেদের স্নেহশীল ও দয়াময় আল্লাহ এবং শুভাকাংখী নবীদেরকে ত্যাগ করে এমন এক চিরন্তন শত্রুর ফাঁদে পা দিচ্ছে যে সৃষ্টির প্রথম দিন থেকেই তাদে বিরুদ্ধে হিংসাত্মক ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে ৷
৪৮. অর্থাৎ ইবলীস ফেরেশতাদের দলভুক্ত ছিল না ৷ বরং সে ছিল জিনদের একজন ৷ তাই তার পক্ষে আনুগত্য থেকে বের হয়ে যাওয়া সম্ভব হয় ৷ ফেরেশতাদের ব্যাপারে কুরআন সুস্পষ্ট ভাষায় বলে, তারা প্রকৃতিগতভাবে অনুগত ও হুকুম মেনে চলে:

আরবী --------------------------------------------------------------------------------

" আল্লাহ তাদেরকে যে হুকুমই দেন না কেন তারা তার নাফরমানী করে না এবং তাদেরকে যা হুকুম দেয়া হয় তাই করে ৷ " ( আত তাহরীম: ৬ )

আরবী --------------------------------------------------------------------------------

" তারা অবাধ্য হয় না, তাদের রবকে, যিনি তাদে ওপর আছেন, ভয় করে এবং তাদেরকে যা হুকুম দেয়া হয় তাই করে ৷ " ( আন নহল: ৫০ )

অন্য দিকে জিন হচ্ছে মানুষের মতো একটি স্বাধীন ক্ষমতা সম্পন্ন সৃষ্টি ৷ তাদেরকে জন্মগত আনুগত্যশীল হিসেবে সৃষ্টি করা হয়নি ৷ বরং তাদেরকে কুফর ও ঈমান এবং আনুগত্য ও অবাধ্যতা উভয়টি করার ক্ষমতা দান করা হয়েছে ৷ এ সত্যটিই এখানে তুলে ধরা হয়েছে ৷ বলা হয়েছে, ইবলীস ছিল জিনদের দলভুক্ত, তাই সে স্বেচ্ছায় নিজের স্বাধীন ক্ষমতা ব্যবহার করে ফাসেকীর পথ বাছাই করে নেয় ৷ এ সুস্পষ্ট বক্তব্যটি লোকদের মধ্যে ব্যাপকভাবে প্রচলিত এক ধরনের ভুল ধারণা দূর করে দেয় ৷ এ ধারণাটি হচ্ছে : ইবলীস ফেরেশতাদের দলভুক্ত ছিল এবং তাও আবার সাধারণ ও মামুলি ফেরেশতা নয়, ফেরেশতাদের সরদার ৷ ( আরো বেশী ব্যাখ্যার জন্য দেখুন আল হিজর ২৭ এবং আল জিন ১৩-১৫ আয়াত )

এখন প্রশ্ন থেকে যায়, যদি ইবলীস ফেশেতাদের দলভুক্ত না হয়ে থাকে তাহলে কুরআনের এ বর্ণনা পদ্ধতি কেমন করে সঠিক হতে পারে যে, "আমি ফেরেশতাদেরকে বললাম, আদমকে সিজাদ করো,তখন তারা সবাই সিজদা করলো কিন্তু ইবলীস করলো না ? " এর জবাব হচ্ছে, ফেরেশতাদেরকে সিজদা করার হুকুম দেবার অর্থ এ ছিল যে, ফেরেশতাদের কর্ম ব্যবস্থাপনায় পৃথিবী পৃষ্ঠে অস্তিত্বশীল সকল সৃষ্টিও মানুষের হুকুমের অনুগত হয়ে যাবে ৷ কাজেই ফেরেশতাদের সাথে সাথে এ সমস্ত সৃষ্টিও সিজদানত হলো কিন্তু ইবলীস তাদের সাথে সিজদা করতে অস্বীকতার করলো ৷ ( ইবলীস শব্দের অর্থ জানার জন্য দেখুন মু'মিনুনের ৭৩ টীকা দেখুন ) ৷
৪৯. এর অর্থ হচ্ছে এ শয়তানরা তোমাদের আনুগত্য ও বন্দেগী লাভের হকদার হয়ে গেলো কেমন করে ? বন্দেগী তো একমাত্র স্রষ্টারই অধিকার হতে পারে ৷ আর এ শয়তানদের অবস্থা হচ্ছে এই যে, এদের আকাশ ও পৃথিবীর সৃষ্টিকর্মে শরীক হওয়া তো দূরের কথা এরা নিজেরাই তো সৃষ্টি মাত্র ৷
৫০. এখানে আবার সেই একই বিষয়বস্তু বর্ণনা করা হয়েছে যা ইতিপূর্বে কুরআনের বিভিন্ন জায়গায় বর্ণিত হয়েছে ৷ অর্থাৎ আল্লাহর বিধান ও তাঁর নির্দেশবলী অমান্য করে অন্য কারো বিধান ও নেতৃত্ব মেনে চলা আসলে তাকে মুখে আল্লাহর শরীক বলে ঘোষণা না দিলেও আল্লাহ সার্বভৌম কর্তৃত্ব তাকে শরীক করারই শামিল ৷ বরং ঐ ভিন্ন সত্তাদের প্রতি অভিশাপ বর্ষণ করেও যদি আল্লাহর হুকুমের মোকাবিলায় তাদের হুকুম মেনে চলা হয় তাহলেও মানুষ শিরকের অপরাধে অভিযুক্ত হবে ৷ কাজেই এখানে শয়তানদের ব্যাপারে প্রকাশ্যে দেখা যাচ্ছে, দুনিয়ায় সবাই তাদের ওপর অভিশাপ বর্ষণ করছে কিন্তু এ অভিশাপের পরও যারা তাদের অনুসরণ করে কুরআন তাদের সবার বিরুদ্ধে এ অভিযোগ আনছে যে, তোমরা শয়তানদেরকে আল্লাহর শরীক করে রেখেছো ৷ এটি বিশ্বাসগত শিরক নয় রবং কর্মগত শিরক এবং কুরআন একেও শিরক বলে ৷ ( আরো বেশী ব্যাখ্যার জন্য দেখুন তাফহীমূল কুরআন, ১ খণ্ড, আন নিসা, টীকা ৯১-১৪৫ আল আন 'আম ৮৭-১০৭ ; ২ খণ্ড, আত তাওবাহ, টীকা ৩১ ; ইবরাহীম, টীকা ৩২ ; ৩ খণ্ড মারয়াম, ৩৭ টীকা ; আল মু'মিনুন, ৪১ টীকা ; আল ফুরকান ৫৬ টীকা, আল কাসাস, ৮৬ টীকা ' ৪ খণ্ড সাবা ৫৯, ৬০, ৬১, ৬২, ৬৩, ; ইয়াসীন ৫৩ টীকা ; আশ শূরা, ৩৮ টীকা, আল - জাসিয়াহ, ৩০ টীকা )
৫১. মুফাসসিরগণ এ আয়াতের দু'টি অর্থ গণনা করেছেন ৷ একটি অর্থ আমি অনুবাদে অবলম্বন করেছি এবং দ্বিতীয় অর্থটি হচ্ছে, "আমি তাদের মধ্যে শত্রুতা সৃষ্টি করবো ৷ " অর্থাৎ দুনিয়ায় তাদের মধ্যে যে বন্ধত্ব ছিল আখেরাতে তা ঘোরতর শত্রুতায় পরিবর্তিত হবে ৷