(১৮:৮৩) আর হে মুহাম্মাদ! এরা তোমার কাছে যুলকারনাইন সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে৷৬১ এদেরকে বলে দাও, আমি তার সম্বন্ধে কিছু কথা তোমাদের শুনাচ্ছি৷৬২
(১৮:৮৪) আমি তাকে পৃথিবীতে কর্তৃত্ব দিয়ে রেখেছিলাম এবং তাকে সবরকমের সাজ-সরঞ্জাম ও উপকরণ দিয়েছিলাম৷
(১৮:৮৫) সে (প্রথমে পশ্চিমে এক অভিযানের) সাজ-সরঞ্জাম করলো৷
(১৮:৮৬) এমন কি যখন সে সূর্যাস্তের সীমানায় পৌঁছে গেলো ৬৩ তখন সূর্যকে ডুবতে দেখলো একটি কালো জলাশয়ে ৬৪ এবং সেখানে সে একটি জাতির দেখা পেলো৷ আমি বললাম, “হে যুলকারনাইন! তোমার এ শক্তি আছে, তুমি এদেরকে কষ্ট দিতে পারো অথবা এদের সাথে সদাচার করতে পারো৷”৬৫
(১৮:৮৭) সে বললো, “তাদের মধ্য থেকে যে জুলুম করবে আমরা তাকে শাস্তি দেবো তারপর তাকে তার রবের দিকে ফিরিয়ে নেয়া হবে এবং তিনি তাকে অধিক কঠিন শাস্তি দেবেন৷
(১৮:৮৮) আর তাদের মধ্য থেকে যে ঈমান আনবে ও সৎকাজ করবে তার জন্য আছে ভালো প্রতিদান এবং আমরা তাকে সহজ বিধান দেবো৷”
(১৮:৮৯) তারপর সে (আর একটি অভিযানের) প্রস্তুতি নিল৷
(১৮:৯০) এমন কি সে সূর্যোদয়ের সীমানায় গিয়ে পৌঁছুলো৷ সেখানে সে দেখলো, সূর্য এমন এক জাতির ওপর উদিত হচ্ছে যার জন্য রোদ থেকে বাঁচার কোনো ব্যবস্থা আমি করিনি৷৬৬
(১৮:৯১) এ ছিল তাদের অবস্থা এবং যুলকারনাইনের কাছে যা ছিল তা আমি জানতাম৷
(১৮:৯২) আবার সে (আর একটি অভিযানের) আয়োজন করলো৷
(১৮:৯৩) এমনকি যখন দু পাহাড়ের মধ্যখানে পৌঁছুলো ৬৭ তখন সেখানে এক জাতির সাক্ষাত পেলো৷ যারা খুব কমই কোনো কথা বুঝতে পারতো৷৬৮
(১৮:৯৪) তারা বললো, “হে যুলকারনাইন! ইয়াজুজ ও মাজুজ ৬৯ এ দেশে বিপর্যয় সৃষ্টি করছে৷ আমরা কি তোমাকে এ কাজের জন্য কোনো কর দেবো, তুমি আমাদের ও তাদের মাঝখানে একটি প্রাচীর নির্মাণ করে দেবে ?
(১৮:৯৫) সে বললো, “আমার রব আমাকে যাকিছু দিয়ে রেখেছেন তাই যথেষ্ট৷ তোমরা শুধু শ্রম দিয়ে আমাকে সাহায্য করো, আমি তোমাদের ও তাদের মাঝখানে প্রাচীর নির্মাণ করে দিচ্ছি৷৭০
(১৮:৯৬) আমাকে লোহার পাত এনে দাও৷” তারপর যখন দু পাহাড়ের মধ্যবর্তী ফাঁকা জায়গা সে পূর্ণ করে দিল তখন লোকদের বললো, এবার আগুন জ্বালাও৷ এমনকি যখন এ (অগ্নি প্রাচীর) পুরোপুরি আগুনের মতো লাল হয়ে গেলো তখন সে বললো, “আনো, এবার আমি গলিত তামা এর উপর ঢেলে দেবো৷”
(১৮:৯৭) (এ প্রাচীর এমন ছিল যে) ইয়াজুজ ও মাজুজ এটা অতিক্রম করেও আসতে পারতো না এবং এর গায়ে সুড়ংগ কাটাও তাদের জন্য আরো কঠিন ছিল৷
(১৮:৯৮) যুলকারনাইন বললো, “এ আমার রবের অনুগ্রহ৷ কিন্তু যখন আমার রবের প্রতিশ্রুতির নির্দিষ্ট সময় আসবে তখন তিনি একে ধূলিস্মাত করে দেবেন ৭১ আর আমার রবের প্রতিশ্রুতি সত্য৷”৭২
(১৮:৯৯) আর সে দিন ৭৩ আমি লোকদেরকে ছেড়ে দেবো, তারা (সাগর তরংগের মতো) পরস্পরের সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত হবে আর শিংগায় ফুঁক দেয়া হবে এবং আমি সব মানুষকে একত্র করবো৷
(১৮:১০০) আর সেদিন আমি জাহান্নামকে সেই কাফেরদের সামনে আনবো,
(১৮:১০১) যারা আমার উপদেশের ব্যাপারে অন্ধ হয়েছিল এবং কিছু শুনতে প্রস্তুতই ছিল না৷
৬১. ( আরবী ------------------------) এ বাক্যটির শুরুতে যে " আর " শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে তার সম্পর্কে অবশ্যই পূর্ববর্তী কাহিনীগুলোর সাথে রয়েছে ৷ এ থেকে স্বতঃফূর্তভাবে এ ইংগিত পাওয়া যায় যে, মূসা ও খিযিরের কাহিনীও লোকদের প্রশ্নের জবাব শোনানো হয়েছে ৷ একথা আমাদের এ অনুমানকে সমর্থন করে যে, এ সূরার এ তিনটি গুরুত্বপূর্ণ কাহিনী আসলে মক্কার কাফেররা আহলি কিতাবদের পরামর্শক্রমে রসূলূল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে পরীক্ষা করার জন্য জিজ্ঞেস করেছিল ৷
৬২. এখানে যে যুলকারনাইনের কথা বলা হচ্ছে তিনি কে ছিলেন, এ বিষয়ে প্রাচীন যুগ থেকে নিয়ে আজো পর্যন্ত মতবিরোধ চলে আসছে ৷ প্রাচীন যুগের মুফাসসিরগণ সাধারণত যুলকারণাইন বলতে আলেকজাণ্ডারকেই বুঝিয়েছেন ৷ কিন্তু কুরআনে তাঁর যে গুণাবলী ও বৈশিষ্ট বর্ণনা করা হয়েছে, আলেকজাণ্ডারের সাথে তার মিল খুবই কম ৷ আধুনিক যুগে ঐতিহাসিক তথ্যাবলীর ভিত্তিতে মুফাসসিরগণের অধিকাংশ এ মত পোষণ করেন যে, তিনি ছিলেন ইরানের শাসনকর্তা খুরস তথা খসরু বা সাইরাস ৷ এ মত তুলনামূলকভাবে বেশী যুক্তিগ্রাহ্য ৷ তবুও এখনো পর্যন্ত সঠিক ও নিশ্চিতভাবে কোন ব্যক্তিকে যুলকারনাইন হিসেবে চিহ্নিত করা যেতে পারেনি ৷

কুরআন মজীতে যেভাবে তার কথা আলোচনা করেছে তা থেকে আমরা সু‌স্পষ্ট ভাবে চারটি কথা জানতে পারি ৷

এক, তার যুলকারনাইন ( শাব্দিক অর্থ " দু' শিংওয়ালা ") উপাধিটি কমপক্ষে ইহুদীদের মধ্যে, যাতে ইংগিত মক্কার কাফেররা তার সম্পর্কে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে প্রশ্ন করেছিল, নিশ্চয়ই পরিচিত হওয়ার কথা তাই একথা জানার জন্য আমাদের ইসরাঈলী সাহিত্যের শরণাপন্ন না হয়ে উপায় থাকে না যে, তারা " দু' শিংওয়ালা " হিসেবে কোন ব্যক্তি বা রাষ্ট্রকে জানতো ?

জুলকারণাইন কিসসা সংক্রান্ত মানচিত্র ( সূরা আল কাহফ ৬২ নং টীকা )

দুই, এ ব্যক্তির অবশ্যই কোন বড় শাসক ও এমন পর্যায়ের বিজেতা হওয়ার কথা যার বিজয় অভিযান পূর্ব থেকে পশ্চিমে পরিচালিত হয়েছিল এবং অন্যদিকে উত্তর দক্ষিণ দিকেও বিস্তৃত হয়েছিল ৷ কুরআন নাযিলের পূর্বে এ ধরনের কৃতিত্বের অধিকারী মাত্র কয়েকজন ব্যক্তির কথাই জানা যায় ৷ তাই অনিবার্যভাবে তাদেরই কারোর মধ্যে আমাদের তার সাথে সম্পর্কিত অন্যান্য তথ্য ও বৈশিষ্ট্য ও খুঁজে দেখতে হবে ৷

তিন, তাকে অবশ্যই এমন একজন শাসনকর্তা হতে হবে যিনি নিজের রাজ্যকে ইয়াজুজ মা'জুজের হাত থেকে বাঁচাবার জন্য কোন পার্বত্য গিরিপথে একটি মজবুত প্রাচীর নির্মাণ করেন ৷ এ বৈশিষ্টটির অনুসন্ধান করার জন্য আমাদের একথাও জানতে হবে যে, ইয়াজুজ মা'জুজ বলতে কোন জাতিকে বুঝানো হয়েছে এবং তারপর এও দেখতে হবে যে, তাদের এলাকার সাথে সংশ্লিষ্ট এ ধরনের কোন প্রাচীর দুনিয়ায় নির্মাণ করা হয়েছে এবং সেটি কে নির্মাণ করেছে?

চার, তার মধ্যে উপরোক্ত বৈশিষ্টগুলোসহ এ বৈশিষ্টটিও উপস্থিত থাকা চাই যে তিনি আল্লাহর প্রতি আনুগত্যশীল ও ন্যায়পরায়ণ শাসনকর্তা হবেন ৷ কারণ কুরআন এখানে তার এ বৈশিষ্টটিকেই সবচেয়ে সুস্পষ্ট করেছে ৷

এর মধ্যে থেকে প্রথম বৈশিষ্টটি সহজেই খরসের ( বা সাইরাস ) বেলায় প্রযোজ্য ৷ কারণ বাইবেলের দানিয়েল পুস্তকে দানিয়েল নবীর যে স্বপ্নের কথা বর্ণনা করা হয়েছে তাতে তিনি ইরানীদের উত্থানের পূর্বে মিডিয়া ও পাস্যের যুক্ত সাম্রাজ্যকে একটি দু' শিংওয়ালা মেষের আকারে দেখেন ৷ ইহুদীদের মধ্যে এ " দু' শিংধারী"র বেশ চর্চা ছিল ৷ কারণ তার সাথে সংঘাতের ফলেই শেষ পর্যন্ত বেবিলনের সাম্রাজ্য খণ্ড বিখণ্ড হয়ে যায় এবং বনী ইসরাঈল দাসত্ব শৃংখল থেকে মুক্তিলাভ করে ৷ ( দেখুন তাফহীমূল কুরআন, সূরা বনী ইসরাঈল ৮ টীকা )

দ্বিতীয়চিহ্নটিরও বেশীর ভাগ তার সাথে খাপ খেয়ে যায় কিন্তু পুরোপুরি নয় ৷ তার বিজয় অভিযান নিসন্দেহে পশ্চিম এশিয়া মাইনর ও সিরিয়ার সমদ্রসীমা এবং পূর্বে বখতর ( বলখ) পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল ৷ কিন্তু উত্তরে বা দক্ষিণে তার কোন বড় আকারের অভিযানের সন্ধান এখনো পর্যন্ত ইতিহাসের পাতায় পাওয়া যায়নি ৷ অথচ কুরআন সুস্পষ্টভাবে তার তৃতীয় একটি অভিযানের কথা বর্ণনা করছে ৷ তবুও এ ধরনের একটি অভিযান পরিচালিত হওয়া অসম্ভব নয় ৷ কারণ ইতিহাস থেকে দেখা যায়, খুরসের রাজ্য উত্তরে ককেশিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল ৷

তৃতীয় চিহ্নটির ব্যাপারে বলা যায়, একথা প্রায় সুপ্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে যে, ইয়াজুজ মা'জুজ বলতে রাশিয়া ও উত্তর চীনের এমনসব উপজাতিদের বুঝানো হয়েছে যারা তাতারী, মংগল, হূন ও সেথিন নামে পরিচিত এবং প্রাচীন যুগ থেকে সভ্য দেশগুলোর বিরুদ্ধে আক্রমণ পরিচালনা করে আসছিল্‌৷ তাছাড়া একথাও জানা গেছে যে, তাদের আক্রমণ থেকে আত্মরক্ষার জন্য ককেশাসের দক্ষিণাঞ্চলে দরবন্দ ও দারিয়ালের মাঝখানে প্রাচীর নির্মাণ করা হয়েছিল ৷ কিন্তু খুরসই যে, এ প্রাচীর নির্মাণ করেছিলেন তা এখনো প্রমাণিত হয়নি ৷

শেষ চিহ্নটি প্রাচীর যুগের একমাত্র খুরসের সাথেই সম্পৃক্ত করা যেতে পারে ৷ কারণ তার শত্রুরা ও তার ন্যায় বিচারের প্রশংসা করেছে ৷ বাইবেলের ইষ্রা পুস্তক একথার সাক্ষ বহন করে যে, তিনি নিশ্চয়ই একজন আল্লাহভীরু ও আল্লাহর অনুগত বাদশাহ ছিলেন ৷ তিনি বনী ইসরাঈলকে তাদের আল্লাহর প্রতি আনুগত্য প্রিয়তার কারণেই বেবিলনের দাসত্বমুক্ত করছিলেন এবং এক ও লা -শরীক আল্লাহর ইবাদাতের জন্য বাইতুল মাকদিসে পুনরবার হাইকেলে সুলাইমানী নির্মাণ করার হুকুম দিয়েছিলেন ৷

এ কারণে আমি একথা অবশ্যি স্বীকার করি যে, কুরআন নাযিলের পূর্বে যতজন বিশ্ববিজেতা অতিক্রান্ত হয়েছেন তাদে মধ্য থেকে একমাত্র খুরসের মধ্যেই যুলকারণাইনের আলামতগুলো বেশী পরিমাণে পাওয়া যায় কিন্তু একেবারে নিশ্চয়তা সহাকরে তাকেই যুলকারনাইন বলে নির্দিষ্ট করার জন্য এখনো আরো অনেক সাক্ষ প্রমাণের প্রয়োজন রয়েছে ৷ তবুও কুরআনে উপস্থাপিত আলামতগুলো যত বেশী পরিমাণে খুরসের মধ্যে বিধ্যমান, ততটা আর কোন বিজেতার মধ্যে নয় ৷

ঐতিহাসিক বর্ণনার জন্য এতটুকু বলাই যথেষ্ট যে, খুরস ছিলেন একজন ইরানী শাসনকর্তা ৷ খুষ্টপূর্ব ৫৪৯ অব্দের কাছাকাছি যুগ থেকে তাঁর উত্থান শুরু হয় ৷ কয়েক বছরের মধ্যেই তিনি মিডিয়া ( আল জিবাল ) এবং লিডিয়া ( এশিয়া মাইনর ) রাজ্য জয় করার পর ৫৩৯ খৃষ্টপূর্বাদ্বে বেবিলন জয় করেন ৷ এরপর তার পথে আর কোন রাজশক্তির বাধা ছিল না ৷ তার বিজয় অভিযান সিন্ধু ও সুগদ ( বর্তমান তুর্কিস্তান ) থেকে শুরু করে একদিকে মিসর ও লিবিয়া এবং অন্যদিকে থ্রেস ও ম্যাকডোনিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত হয় ৷ আবার উত্তর দিকে তাঁর সাম্রাজ্য বিস্তার লাভ করে ককেশিয়া ও খাওয়ারিযাম পর্যন্ত ৷ বলতে গেলে সেকালের সমগ্র সভ্যজগত তাঁর শাসনাধীন ছিল ৷
৬৩. ইবনে কাসীরের মতে সূর্যাস্তের সীমানা বলতে বুঝাচ্ছে ( আরবী ------------------------------------) অর্থাৎ তিনি পশ্চিম দিকে দেশের পর দেশ জয় করতে করতে স্থলভাগের শেষ সীমানায় পৌঁছে যান, এরপর ছিল সমুদ্র ৷ এটিই হচ্ছে সর্যাস্তের সীমানার অর্থ ৷ সূর্য যেখানে অস্ত যায় সেই জায়গায় কথা এখানে বলা হয়নি ৷
৬৪. অর্থাৎ সেখানে সূর্যাস্তের সময় মনে হতো যেন সূর্য সমুদ্রের কালো বর্ণের পংকিল পানির মধ্যে ডুবে যাচ্ছে ৷ যুলকারণাইন বলতে যদি সত্যিই খুরসকেই বুঝানো হয়ে থাকে তাহলে এটি হবে এশিয়া মাইনরের পশ্চিমক সমুদ্রতট, যেখানে ঈজিয়ান সাগর বিভিন্ন ছোট ছোট উপসাগরের রূপ নিয়েছে ৷ কুরআন এখানে ' বাহর " ( সমুদ্র) শব্দের পরিবর্তে " আয়েন " শব্দ ব্যবহার করেছেন,যা সমুদ্রের পরিবর্তে হ্রদ বা উপসারগ অর্থে অধিক নির্ভুলতার সাথে বলা যেতে পারে একথাটি আমাদের উপরোক্ত অনুমানকে সঠিক প্রমাণ করে ৷
৬৫. আল্লাহ যে একথাটি সরাসরি অহী বা ইলহামের মাধ্যমে যুলকারণাইনকে সম্বোধন করে বলে থাকবেন এমন হওয়া জরুরী নয় ৷ তেমনটি হলে তাঁর নবী বা এমন ব্যক্তি হওয়া অপরিহার্য হয়ে পড়ে, যার সাথে সরাসরি কথা বলেছেন ৷ এটি এভাবে হয়ে থাকতে পারে যে, আল্লাহ সমগ্র পরিবেশ ও পরিস্থিতিকে তার নিয়ন্ত্রণে দিয়ে দিয়েছেন ৷ ৷ এটিই অধিকতর যুক্তিসংগত বলে মনে হয় ৷ যুলকারনাইন সে সময় বিজয় লাভ করে এ এলাকাটি দখল করে নিয়েছিলেন ৷ বিজিত জাতি তার নিয়ন্ত্রণাধীন ছিল ৷এহেন অবস্থায় আল্লাহার বিবেকের সামনে এ প্রশ্ন রেখে দেন যে, এটা তোমার পরীক্ষার সময়, এ জাতিটি তোমার সামনে ক্ষমতাহীন ও অসহায় ৷ তুমি জুলুম করতে চাইলে তার প্রতি জুলুম করতে পারো এবং সদাচার করতে চাইলে তাও তোমার আয়ত্বাধীন রয়েছে ৷
৬৬. অর্থাৎ তিনি দেশ জয় করতে করতে পূর্ব দিকে এমন এলাকায় পৌঁছে গেলেন যেখানে সভ্য জগতের সীমানা শেষ হয়ে গিয়েছিল এবং সামনের দিকে এমন একটি অসভ্য জাতির এলাকা ছিল, যারা ইমরাত নির্মাণ তো দূরের কথা তাঁবু তৈরী করতে ও পারতো না ৷
৬৭. যেহেতু সামনের দিকে বলা হচ্ছে যে, এ দু' পাহাড়ের বিপরীতে পাশে ইয়াজুজক মাজুজের এলাকা ছিল তাই ধরে নিতে হয় যে, এ পাহাড় বলতে কাস্পিয়ান সাগর ও কৃষ্ণ সাগরের মধ্যবর্তী সুবিস্তীর্ণ ককেসীয় পবর্তমালাকে বুঝানো হয়েছে ৷
৬৮. অর্থাৎ যুলকারনাইন ও তার সাথীদের জন্য তাদের ভাষা ছিল প্রায়ই অপরিচিত ও দুর্বোধ্য ৷ ভীষণভাবে সভ্যতার আলো বিবর্জিত ও বন্য হওয়ার কারণে তাদের ভাষা কেউ জানতো না এবং তারা ও কারোর ভাষা জানতো না ৷
৬৯. ইয়াজুজ মা'জুজ বুঝায়, যেমন ওপরে ৬২ টীকায় ইশারা করা হয়েছে যে, এশিয়ার উত্তর পূর্ব এলাকার এমন সব জাতি যারা প্রাচীন যুগে সুসভ্য দেশগুলোর ওপর ধবংসাত্মক হামলা চালাতে অভ্যস্ত ছিল এবং মাঝে মধ্যে এশিয়া ও ইউরোপ উভয় দিকে সয়লাবের আকারে ধ্বংসের থাবা বিস্তার করতো ৷ বাইবেলের আদি পুস্তুক ( ১০ অধ্যায়) তাদেরকে হযরত নূহের ( আ) পুত্র ইয়াফেসের বংশধর বলা হয়েছে ৷ মুসলিম ঐতিহাসিকগণও এ একই কথা বলেছেন ৷ হিযকিয়েল ( যিহিষ্কেল) পুস্তিকায় ( ৩৮ ও ৩৯ অধ্যায় ) তাদের এলাকা বলা হয়েছে রোশ (রুশ ) তূবল ( বর্তমান তোবলস্ক ও মিসক ( বর্তমান মস্কো ) কে ৷ ইসরাঈলী ঐতিহাসিক ইউসীফুস তাদেরকে সিথীন জাতি মনে করেন এবং তার ধারণা তাদের এলাকা কৃষ্ণসাগরের উত্তর ও পূর্ব দিকে অবস্থিত ছিল ৷ জিরোম এর বর্ণনা মতে মাজুজ জাতির বসতি ছিল ককেশিয়ার উত্তরে কাস্পিয়ান সাগরের সন্নিকটে ৷
৭০. অর্থাৎ শাসককর্তা হিসেবে আমার প্রজাদেরকে লুটেরাদের হাত থেকে রক্ষা করা আমার কর্তব্য ৷ এ কাজের জন্য তোমাদের ওপর আলাদা করে কোন কর বসানো আমার জন্য বৈধ নয় ৷ আল্লাহ দেশের যে অর্থ ভাণ্ডার আমার হাতে তুলে দিয়েছেন এ কাজ সম্পাদনের জন্য তা যথেষ্ট ৷ তবে শারিরীক শ্রম দিয়ে তোমাদের আমাকে সাহায্য করতে হবে ৷
৭১. অর্থাৎ যদিও নিজের সামর্থ মোতাবেক আমি অত্যন্ত মজুবতও সৃদৃঢ় প্রাচীর নির্মাণ করেছি তবুও এটি কোন অক্ষর জিনিস নয় ৷ যতদিন আল্লাহ ইচ্ছা করবেন এটি প্রতিষ্ঠিত থাকবে ৷ তারপর এর ধ্বংসের জন্য আল্লাহ যে সময় নির্ধারিত করে রেখেছেন তা যখন এসে যাবে তখন কোন জিনিসই একে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করতে পারবে না ৷ " প্রতিশ্রুতির সময় " এর দু' অর্থ হয় ৷ এর অর্থ প্রাচীরটি ধবংস হবার সময়ও হয় আবার প্রত্যেকটি জিনিসের মৃত্যু ও ধ্বংসের জন্য আল্লাহ যে সময়টি নির্ধারিত কর রেখেছেন সে সময়টিও হয় অর্থাৎ কিয়ামত ৷

যুলকারনাইন নির্মীত প্রাচীর সম্পর্কে কিছু লোকের মধ্যে ভুল ধারণা রয়েছে ৷ তারা সুপরিচিত চীনের প্রাচীরকে যুলকারনাইনের প্রাচীর মনে করে ৷ অথচ এ প্রাচীরটি ককেশাসের দাগিস্তান অঞ্চলের দরবন্দ ও দারিয়ালের ( Darial) মাঝখানে নির্মীত হয় ৷ ককেশীয় অঞ্চল বলতে বুছায় কৃষ্ণ সাগর (Black sea ) ও কাস্পিয়ান সাগরের ( Caspian sea ) মধ্যবর্তী এলাকা ৷ এ এলাকায় কৃষ্ণসাগর থেকে দারিয়োল পর্যন্ত রয়েছে সুউচ্চ পাহাড় ৷ এর মাঝখানে যে সংকীর্ণ গিরিপথ রয়েছে কোন দুর্ধর্ষ হানাদার সেনাবাহিনীর পক্ষেও তা অতিক্রম করা নয় ৷ তবে দরবন্দ ও দারিয়োলের মধ্যবর্তী এলাকায় পর্বত শ্রেণীও বেশী উঁচু নয় এবং সেখানকার পার্বত্য পথগুলোও যথেষ্ট চওড়া ৷ প্রাচীন যুগে উত্তরের বর্বর জাতিরা এ দিক দিয়ে দক্ষিণাঞ্চলে ব্যাপাক আক্রমণ চালিয়ে হত্যা ও লুটতরাজ চালাতো ৷ ইরানী শাসকগণ এ পথেই নিজেদের রাজ্যের ওপর উত্তরের হামলার আশংকা করতেন ৷ এ হামলাগুলো রুখবার জন্য একটি অত্যন্ত মজবুত প্রাচীর নির্মাণ করা হয়েছিল ৷ এ প্রাচীর ছিল ৫০ মাইল লম্বা, ২৯০ ফুট উঁচু এবং ১০ ফুট চওড়া ৷ এখনো পর্যন্ত ঐতিহাসিক গবেষণষার মাধ্যমে নিশ্চিতভাবে প্রমাণ করা সম্ভব হয়নি যে, এ প্রাচীর শুরুতে কে এবং কবে নির্মাণ করেছিল ৷ কিন্তু মুসলমান ঐতিহাসিক ও ভূগোলবিদগণ এটিকেই যুলকারনাইনের প্রাচীর বলে অভিহিত করেছেন ৷ কুরআন মজীদে এ প্রাচীর নির্মাণের যে প্রক্রিয়া বর্ণনা করা হয়েছে তা চিহ্নসমূহ এখনো এখানে পাওয়া যায় ৷

ইবনে জারীর তাবারী ও ইবনে কাসীর তাদের ইতিহাস গ্রন্থে এ ঘটনাটি লিখেছেন ৷ ইয়াকুতী তাঁর মু'জামূল বুলদান গ্রন্থে এরি বরাত দিয়ে লিখেছেন, হযরত উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু যখন আজারবাইজান বিজয়ের পর ২২ হিজরীতে সুরাকাই ইবনে আমরকে বাবুল আবওয়াব ৯ দরবন্দ ) অভিযানে রওয়ানা করেন ৷ সূরাকাহ আবদুর রহমান ইবন রবী ' আহকে নিজের অগ্রবর্তী বাহিনীর প্রধানের দায়িত্ব দিয়ে সামনের দিকে পাঠিয়ে দেন ৷ আবদুর রহমান যখন আর্মেনীয়া এলাকায় প্রবেশ করেন তখন সেখানকার শাসক শারবরায যুদ্ধ ছাড়াই আনুগত্য স্বীকার করেন ৷ এরপর তিনি বাবুল আবওয়াবের দিকে অগ্রসর হবার সংকল্প করেন ৷ এ সময় শারবরায তাঁকে বলেন, আমি এক ব্যক্তিকে যুলকারনাইনের প্রাচীর পরিদর্শন এবং সংশ্লিষ্ট এলাকার অবস্থা পর্যবেক্ষণ করার জন্য পাঠিয়েছিলাম ৷ সে আপনাকে এর বিস্তারিত বিবরণ শুনাতে পারে ৷ তদানুসারে তিনি আবদুর রহমানের সামনে সেই ব্যক্তিকে হাযির করেন ৷ ( তাবারী, ৩ খণ্ড, ২৩৫ -৩৩৯ পৃঃ আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৭ খণ্ড ; ১২২ -১২৫ পৃঃ এবং মু'জামূল বুলদান, বাবুল আবওয়াব প্রসংগ ) ৷

এ ঘটনার দুশো' বছর পর আব্বাসী খলীফা ওয়াসিক বিল্লাহ ( ২২৭-২৩৩ হিঃ) যুলকারনাইনের প্রাচীর পরিদর্শন করার জন্য সাল্লামুত তারজুমানের নেতৃত্বে ৫০ জনের একটি অভিযাত্রী দল পাঠান ৷ ইয়াকুত তাঁর মু'জামূল বুলদান এবং ইবনে কাসীর তার আল বিদায়া ওয়ান নিহারা গ্রন্থে এর বিস্তারিত বিবরণ লিপিবদ্ধ করেছেন ৷ তাদের বর্ণনা মতে, এ অভিযাত্রী দলটি সামররাহ থেকে টিফলিস, সেখান থেকে আসসারীর, ওখান থেকে আল্লান হয়ে দীলান শাহ এলাকায় পৌঁছে যায় ৷ তারার তারা খাযার ( কাস্পিয়ান ) দেশে প্রবেশ করেন ৷ এরপর সেখান থেকে দরবন্দে পৌঁছে যুলকারনাইনের প্রাচীর পরিদর্শন করে ৷ ( আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ২ খণ্ড, ১১১ পৃঃ ; ৭ খণ্ড, ১২২ - ১২৫ পৃঃ, মু'জামূল বুলদান, বাবুল আবওয়াব ) এ থেকে পরিস্কার জানা যায়, হিজরী তৃতীয় শতকেও মুসলমানরা ককেশাসের এ প্রাচীরকেই যুলকারনাইনের প্রাচীর মনে করতো ৷

ইয়াকুত মু'জামূল বুলদানের বিভিন্ন স্থানে এ বিষয়টিকেই সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরেছেন ৷ খাযার শিরোনামে তিনি লিখেছেন:

আরবী ------------------------------------------------------------------------

" এটি তুরস্কের এলাকা ৷ যুলকারনাইন প্রাচীর সন্নিকটে দরবন্দ নামে খ্যাত বাবুল আবওয়াবের পেছনে এটি অবস্থিত ৷ " এ প্রসংগে তিনি খলীফা মুকতাদির বিল্লাহর দূত আহমদ ইবন ফুদলানের একটি রিপোর্ট উদ্ধৃত করেছেন ৷ তাতে খাযার রাজ্যের বিস্তারিত বিবরণ দেয়া হয়েছে ৷ সেখানে বলা হয়েছে, খাযার একটি রাজ্যের নাম এর রাজধানী ইতল ৷ ইতল নদী এ শহরের মাঝখান দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে ৷ এ নদীটি রাশিয়া ও বুলগার থেকে এসে খাযার কথা কাম্পিয়ান সাগরে পড়েছে ৷

বাবুল আবওয়াব শিরোনামে তিনি লিখছেন, তাকে আলবাব এবং দরবন্দও বলা হয় ৷ এটি খাযার ( কাস্পিয়ান ) সাগর তীরে অবস্থিত ৷ কুফরীর রাজ্যে থেকে মুসলিম রাজ্যের দিকে আগমনকারীদের জন্য এ পথটি বড়ই দুর্গম ও বিপদ সংকুল ৷ এক সময় এটি নওশেরেওঁয়ার রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল এবং ইরানের বাদশাহগণ এ সীমান্ত সংরক্ষেণের প্রতি অত্যাধিক গুরুত্ব দিতেন ৷
৭২. যুলকারনাইনের কাহিনী এখানে শেষ হয়ে যাচ্ছে ৷ এ কাহিনীটি যদিও মক্কার কাফেরদের পরীক্ষামূলক প্রশ্নের জবাবে শুনানো হয় তবুও আসহাবে কাহফ এবং মূসা ও খিযিরের কাহিনীর মতো এ কাহিনীটিকেও কুরআন নিজের রীতি অনুযায়ী নিজের উদ্দেশ্য সাধনে পুরোপুরি ব্যবহার করেছে ৷ এতে বলা হয়েছে, যে যুলকারনাইনের শ্রেষ্ঠত্বের কথা তোমরা আহলি কিতাবদের মুখে শুনেছো সে নিছক একজন বিজেতা ছিল না রবং সে ছিল তাওহীদও আখেরাত বিশ্বাসী মুমিন ৷ সে তার রাজ্যে আদল, ইনসাফ ও দানশীলতার নীতি কার্যকর করেছিল ৷ সে তোমাদের মতো সংকীর্ণচেতা ছিল না ৷ সামান্য সরদারী লাভ করে তোমরা যেমন মনে করো, আমি অদ্বিতীয়, আমার মতো আর কেউ নেই, সে তেমন মনে করতো না ৷
৭৩. অর্থাৎ কিয়ামতের দিন ৷ কিয়ামতের সত্য প্রতিশ্রুতির প্রতি যুলকারনাইন যে ইংগিত করেছিলেন তার সাথে সামঞ্জস্য রেখে তার কথাটি বাড়িয়ে এখানে এ বাক্যাংশটি বলা হচ্ছে ৷