(১৭:৮৫) এরা তোমাকে রূহ সম্পর্কে প্রশ্ন করছে৷ বলে দাও, “এ রূহ আমার রবের হুকুমে আসে কিন্তু তোমরা সামান্য জ্ঞানই লাভ করেছো৷” ১০৩
(১৭:৮৬) আর হে মুহাম্মদ! আমি চাইলে তোমার কাছ থেকে সবকিছুই ছিনিয়ে নিতে পারতাম, যা আমি অহীর মাধ্যমে তোমাকে দিয়েছি, তারপর তুমি আমার মুকাবিলায় কোনো সহায়ক পাবে না, সে তা ফিরিয়ে আনতে পারে৷
(১৭:৮৭) এই যে যাকিছু তুমি লাভ করেছো, এসব তোমার রবের হুকুম, আসলে তাঁর অনুগ্রহ তোমার প্রতি অনেক বড়৷১০৪
(১৭:৮৮) বলে দাও, যদি মানুষ ও জিন সবাই মিলে কুরআনের মতো কোনো একটি জিনিস আনার চেষ্টা করে তাহলে তারা আনতে পারবে না, তারা পরস্পরের সাহায্যকারী হয়ে গেলেও৷ ১০৫
(১৭:৮৯) আমি এ কুরআনে লোকদেরকে নানাভাবে বুঝিয়েছি কিন্তু অধিকাংশ লোক অস্বীকার করার ওপরই অবিচল থাকে৷
(১৭:৯০) তারা বলে, “আমরা তোমার কথা মানবো না যতক্ষণ না তুমি ভূমি বিদীর্ণ করে আমাদের জন্য একটি ঝরণাধারা উৎসারিত করে দেবে৷
(১৭:৯১) অথবা তোমার খেজুর ও আংগুরের একটি বাগান হবে এবং তুমি তার মধ্যে প্রবাহিত করে দেবে নদী-নালা৷
(১৭:৯২) অথবা তুমি আকাশ ভেংগে টুকরো টুকরো করে তোমার হুমকি অনুযায়ী আমাদের ওপর ফেলে দেবে৷ অথবা আল্লাহ ও ফেরেশতাদেরকে আমাদের সামনে নিয়ে আসবে৷
(১৭:৯৩) অথবা তোমার জন্য সোনার একটি ঘর তৈরি হবে৷ অথবা তুমি আকাশে আরোহণ করবে এবং তোমার আরোহণ করার কথাও আমরা বিশ্বাস করবো না যতক্ষণ না তুমি আমাদের প্রতি একটি লিখিত পত্র আনবে, যা আমরা পড়বো৷” হে মুহাম্মাদ ! এদেরকে বলো, পাক-পবিত্র আমার পরওয়ারদিগার, আমি কি একজন বাণীবাহক মানুষ ছাড়া অন্য কিছু ?১০৬
১০৩. সাধারণভাবে মনে করা হয়ে থাকে যে এখানে রূহ মানে প্রাণ ৷ অর্থাৎ লোকেরা জীবনীশক্তির সম্পর্কে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জিজ্ঞেস করেছিল যে, এর প্রকৃত স্বরূপ কি এবং এর জবাবে বলা হয়েছে এটি আল্লাহর হুকুমে আসে ৷ কিন্তু এ অর্থ গ্রহণে করতে আমি কোনক্রমেই সম্মত নই৷ কারণ এ অর্থ একমাত্র তখনই গ্রহণ সম্পূর্ণ আলাদা করে এ আয়াতকে একটি একক বাক্য হিসেবে নেয়া হবে ৷ নয়তো বক্তব্যের ধারাবহিকতায় রেখে বিচার করলে রূহকে প্রাণ অর্থে গ্রহণ করার ফলে আয়াতে মারাত্মক ধরনের সম্পর্কহীনতা সৃষ্টি হয়ে যায় এবং এ বিষয়টির কোন যুক্তিসংগত কারণ বুঝা যায় না যে, যেখানে তিনটি আয়াতে কুরআনের নিরাময়ের ব্যবস্থাপত্র হবার এবং কুরআন অমান্যকারীদের জালেম ও নিয়ামত অস্বীকারকারী হবার কথা বলা হয়েছে এবং যেখানে পরবর্তী আয়াতগুলো আবার কুরআনের আল্লাহর কালাম হবার ওপর প্রমাণ পেশ করা হয়েছে সেখানে কোন সম্পর্কের ভিত্তিতে এ বিষয়বস্তু এসে গেছে যে, প্রাণীদের মধ্যে প্রাণ আসে আল্লাহর হুকুমে?

আলোচনার যোগসূত্রের প্রতি দৃষ্টি রেখে বিচার করলে পরিস্কার অনুভূত হয়ে, এখানে রূহ মানে "অহী "বা অহী বাহকারী ফেরেশতাই হতে পারে ৷ মুশরিকদের প্রশ্ন আসলে এ ছিল যে, কুরআন তুমি কোথায় থেকে আনো? একথাই আল্লাহ বলেন হে মুহাম্মাদ ! তোমাকে লোকেরা রূহ অর্থাৎ কুরআনের উৎস অথবা কুরআন লাভ করার মাধ্যমে নাযিলকৃত বাণীর মধ্যে ফারাক করতে পারো না এবং এ বাণীর ব্যাপারে সন্দেহ পোষণ করছো যে, কোন মানুষ এটি তৈরী করছে ৷ শুধু যে, পূর্ববর্তী ও পরবর্তী ভাষণের সাথে আয়াতের যোগসূত্র রক্ষা করার প্রয়োজনেই এ ব্যাখ্যা প্রাধান্য লাভের যোগ্য তা নয় বরং কুরআন মজীদের অন্যান্য স্থানেও এ বিষয়বস্তুটি প্রায় এসব শব্দ সহকারেই বর্ণনা করা হয়েছে ৷ যেমন সূরা মুমিন বলা হয়েছে:

আরবী --------------------------------------------------------------------------------

"তিনিই নিজের হুকুমে নিজের যে বান্দার ওপর চান রূহ নাযিল করেন, যাতে লোকদের একত্র হবার দিন সম্পর্কে সে সতর্ক করে দিতে পারে ৷ "(১৫ আয়াত)

সূরা শূরায় বলা হয়েছে:

আরবী --------------------------------------------------------------------------------

"আর এভাবেই আমি নিজের হুকুমে তোমার প্রতি একটি রূহ পাঠিয়েছি, তুমি জানতে না কিতাব কি এবং ঈমান কি ৷ "(৫২ আয়াত)

পূর্ববর্তীদের মধ্যে ইবনে আব্বাস (রা) কাতাদা (রা) ও হাসান বাসরী ও (রা) এ ব্যাখ্যা অবলম্বন করেছেন ৷ ইবনে জারীর এ ব্যাখ্যাকে কাতাদার বরাত দিয়ে ইবনে আব্বাসের উক্তি বলে বর্ণনা করেছেন ৷ কিন্তু তিনি একটি অদ্ভুত কথা লিখেছেন যে, ইবনে আব্বাস গোপনে এ মত ব্যক্ত করতেন ৷ অন্যদিকে তাফসীরে রূহুল মা'আনী এর লেখক হাসান ও কাতাদার এ উক্তি উদ্ধৃত করেছেন: "রূহ বলতে জিব্রীলকে বুঝানো হয়েছে এবং প্রশ্ন আসলে এ ছিল যে, তা কিভাবে নাযিল হয় এবং কিভাবে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অন্তরে অহী প্রক্ষিপ্ত হয় ৷
১০৪. বাহ্যত নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে সম্বোধন করা হয়েছে কিন্তু উদ্দেশ্য হচ্ছে আসলে কাফেরদেরকে কষ্ট দেয়া ৷ কারণ তারা বলতো, কুরআন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিজের তৈরী বা গোপনে অন্য কোন লোকের কাছ থেকে শেখানো বাণী ৷ তাদেরকে বলা হচ্ছে: এ বাণী পয়গম্বর রচনা করেননি বরং আমি প্রদান করেছি এবং যদি আমি এ বাণী ছিনিয়ে নিই তাহলে এ ধরনের বাণী রচনা করে নিয়ে আসার ক্ষমতা পয়গম্বরের নেই ৷ তাছাড়া দ্বিতীয় কোন শক্তিও নেই যে এ ব্যক্তিকে এ ধরনের মহাশক্তিধর কিতাব পেশ করার যোগ্য করে তুলতে পারে ৷
১০৫. ইতিপূর্বে কুরআন মজীদের আরো তিন জায়গায় এ চ্যালেঞ্জ দেয়া হয়েছে ৷ সূরা বাকারার ৩ রুকূ', সূরা ইউনসের ৪ রুকূ' এবং সূরা হূদের ২ রুকূ ' তে এ চ্যালেঞ্জ এসেছে ৷ সামনে সূরা তূরের ২ রুকূতেও এ বিষয়বস্তু আসছে ৷ এসব জায়গায় কাফেরদের যে অপবাদের জবাবে একথা বলা হয়েছে সেটি হচ্ছে এই যে, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজেই কুরআন রচনা করেছেন এবং অযথা এটাকে আল্লাহর কালাম বলে পেশ করছেন ৷ এ ছাড়াও সূরা ইউনুসের ১৬ আয়াতে এ অপবাদ খণ্ডন করতে গিয়ে বলা হয়েছে :

আরবী -----------------------------------------------------------------------

"হে মুহাম্মাদ ! ওদেরকে বলো, আমি তোমাদের এ কুরআন শুনাবো এটা যদি আল্লাহ না চাইতেন, তাহলে আমি কখনোই শুনাতে পারতাম না বরং তোমাদের এর খবরও দিতে পারতাম না ৷ আমি তা তোমাদের মধ্যেই জীবনের সুদীর্ঘকাল কাটিয়ে আসছি ৷ তোমরা কি এতটুকুও বোঝ না?

এ আয়াতগুলোতে কুরআন মজীদ আল্লাহর কালাম হবার সপক্ষে যে যুক্তি পেশ করা হয়েছে তা আসলে তিন ধরনের:

এক: এ কুরআন স্বীয় ভাষা, বর্ণনা পদ্ধতি, বিষয়স্তু, আলোচনা, শিক্ষা ও গায়েবের খরব পরিবেশনের দিক দিয়ে একটি মু'জিযা ৷ এর নজির উপস্থাপনা করার ক্ষমতা মানুষের নেই ৷ তোমরা বলছো একজন মানুষ এটা রচনা করেছে ৷ কিন্তু আমি বলছি, সারা দুনিয়ার সমস্ত মানুষ মিলেও এ ধরনের একটি কিতাব রচনা করতে পারবে না ৷ বরং মুশরিকরা যে জিনদেরকে নিজেদের মাবুদ বানিয়ে রেখেছে এবং এ কিতাব যাদের মাবুদ হবার বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে আঘাত হানছে তারাও যদি কুরআন অস্বীকারকারীদেরকে সাহায্য করার জন্য একাট্টা হয়ে যায় তাহলে তারাও এদেরকে এ কুরআনের সমমানের একটি কিতাব রচনা করে দিয়ে এ চ্যালেঞ্জের মোকাবিলা করার যোগ্য করতে পারবে না ৷

দুই: মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লম হঠাৎ তোমাদের মধ্যে বাইর থেকে উড়ে এসে জুড়ে বসেননি ৷ বরং এ কুরআন নাযিলের পূর্বেও ৪০ বছর তোমাদের মধ্যেই বসবাস করেছেন ৷ নবুওয়াত দাবী করার একদিন আগেও কি কখনো তোমরা তাঁর মুখে এই ধরনের কালাম এবং এই ধরনের বিষয়বস্তু ও বক্তব্য সম্বলিত বাণী শুনেছিলে? যদি না শুনে থাকো এবং নিশ্চিতভাবেই শুনোনি তাহলে কোন ব্যক্তির ভাষা, চিন্তাধারা, তথ্যজ্ঞান এবং চিন্তা ও বর্ণনা ভংগীতে হঠাৎ রাতারাতি এ ধরনের পরিবর্তন সাধিত হতে পারে না, একথা কি তোমরা বুঝতে পারছো?

তিন: মুহা‌ম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তোমাদেরকে কুরআন শুনিয়ে দিয়ে কোথাও অদৃশ্য হয়ে যান না বরং তোমাদের মধ্যেই থাকেন ৷ তোমরা তাঁর মুখে কুরআন শুনে থাকো এবং অন্যান্য আলোচনা ও বক্তৃতাও শুনে থাকো ৷ কুরআনের ভাষা ও বর্ণনা ভংগীর মধ্যে পার্থক্য এত বেশী যে কোন এক ব্যক্তির এ ধরনের দু'টি সম্পূর্ণ ভিন্ন স্টাইল কোনক্রমে হতেই পারে না ৷ এ পার্থক্যটা শুধুমাত্র নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন নিজের দেশের লোকদের মধ্যে বাস করতেন তখনই ছিল না বরং আজো হাদীসের কিতাবগুলোর মধ্যে তাঁর শত শত উক্তি ও ভাষণ অবিকৃত রয়েছে এগুলো পর্যালোচনা করে দেখা যেতে পারে ৷ এগুলোর ভাষা ও বর্ণনাভংগীর সাথে কুরআনের ভাষা ও বর্ণনা ভংগীর এত বেশী পার্থক্য লক্ষণীয় যে, ভাষা ও সাহিত্যের কোন উচ্চ পর্যায়ের বিশেষজ্ঞ ও সমালোচক এ দু'টিকে এক ব্যক্তির কালাম বলে দাবী করতে পারেন না ৷
১০৬. মু'জিযা দাবী করার একটি জবাব এর আগে ৬ রুকূ 'র (আরবী ----------------) আয়াতের মধ্যে এসে গেছে ৷ এখানে এ দাবীর দ্বিতীয় জবাব দেয়া হয়েছে ৷ এ সংক্ষিপ্ত জবাবটি মধ্যে রয়েছে সাহিত্যের অতুলনীয় অলংকার ৷ বিরোধীদের দাবী ছিল, যদি তুমি আল্লাহর নবী হয়ে থাকো তাহলে যমীনের দিকে ইশারা করো এবং তার ফলে অবস্মাৎ একটি ঝরণাধারা প্রবাহিত হোক, অথবা এখনই একটি সবুজ শ্যামল বাগান তৈরী হয়ে যাক এবং তার মধ্যে নদীনালা বয়ে চলুক ৷ আকাশের দিকে ইশারা করো এবং সংগে সংগেই আকাশ ভেংগে চৌচির হয়ে তোমরা বিরোধিতাকারীতের ওপর পড়-ক ৷ একটা ফুঁক দাও এবং চোখের পলকে একটি সোনার প্রাসাদ গড়ে উঠুক ৷ একটা আওয়াজ দাও এবং দেখতে না দেখতেই আল্লাহ ও তাঁর ফেরেশতারা সমানে এসে দাঁড়াক এবং তাঁরা সাক্ষ দিক যে, আমরা মুহাম্মাদকে পয়গম্বর করে পাঠিয়েছি ৷ আমাদের চোখের সামনে আকাশে উঠে যাও এবং আল্লাহর কাছ থেকে একটি পত্র আমাদের নামে লিখিয়ে আনো ৷ এ পত্রটি আমরা হাত স্পর্শ করবো এবং নিজেদের চোখে দেখে পড়বো ৷ এসব লম্বা চওড়া দাবী দাওয়ার জবাবে একথা বলেই শেষ করে দেয়া হয়েছে যে, "এদেরকে বলে দাও, আমার পরওয়ারদিগার পাক - পবিত্র ! আমি একজন বাণীবাহক ছাড়া কি অন্য কিছু? "অর্থাৎ নির্বোধের দল ! আমি কি আল্লাহ হবার দাবী করেছিলাম? তাহলে তোমরা কেন আমার কাছে এ দাবী করছো? আমি কবে তোমাদের বলেছিলাম, আমি সর্বশক্তিমান? আমি কবে বলেছিলাম, এ পৃথিবী ও আকাশে আমার শাসন চলছে? আমার দাবী তো প্রথম দিন থেকে এটিই ছিল যে, আমি আল্লাহর পক্ষ থেকে তাঁর বাণী বহনকারী একজন মানুষ ৷ তোমাদের যদি যাচাই করতে হয় তাহলে আমার বাণী যাচাই করো ৷ আর অস্বীকার করতে হলে এবং বাণীর মধ্যে কোন ত্রুটি বের করে দেখাও ৷ আমার সত্যতা সম্পর্কে নিশ্চিন্ত হতে হলে একজন মানুষ হিসেবে আমার জীবন, চরিত্র ও কার্যকলাপ দেখো ৷ এ সবকিছু বাদ দিয়ে তোমরা আমার কাছে এ যমীন চিরে ফেলা এবং আকাশ ভেংগে ফেলার কি সব উদ্ভট দাবী নিয়ে এসেছো? নবওয়াতী কাজের সাথে এগুলোর কি সম্পর্ক?