(১৬:৩৫) এ মুশরিকরা বলে, “আল্লাহ চাইলে তাঁর ছাড়া আর কারো ইবাদাত আমরাও করতাম না, আমাদের বাপ-দাদারাও করতো না এবং তাঁর হুকুম ছাড়া কোনো জিনিসকে হারামও গণ্য করতো না৷” ৩০ এদের আগের লোকেরাও এমনি ধরনের বাহানাবাজীই চালিয়ে গেছে৷ ৩১ তাহলে কি রসূলদের ওপর সুস্পষ্ট বাণী পৌঁছিয়ে দেয়া ছাড়া আর কোনো দায়িত্ব আছে ?
(১৬:৩৬) প্রত্যেক জাতির মধ্যে আমি একজন রসূল পাঠিয়েছি এবং তার মাধ্যমে সবাইকে জানিয়ে দিয়েছি যে, “আল্লাহর বন্দেগী করো এবং তাগূতের বন্দেগী পরিহার করো৷” ৩২ এরপর তাদের মধ্য থেকে কাউকে আল্লাহ সঠিক পথের সন্ধান দিয়েছেন এবং কারোর ওপর পথভ্রষ্টতা চেপে বসেছে৷ ৩৩ তারপর পৃথিবীর বুকে একটু ঘোরাফেরা করে দেখে নাও যারা সত্যকে মিথ্যা বলেছে তাদের পরিণাম কি হয়েছে৷৩৪
(১৬:৩৭) হে মুহাম্মাদ ! তুমি এদেরকে সঠিক পথের সন্ধান দেবার জন্য যতই আগ্রহী হও না কেন, আল্লাহ যাকে পথভ্রষ্ট করেন, তাকে আর সঠিক পথে পরিচালিত করেন না আর এ ধরনের লোকদের সাহায্য কেউ করতে পারে না৷
(১৬:৩৮) এরা আল্লাহর নামে শক্ত কসম খেয়ে বলে, “আল্লাহ কোনো মৃতকে পুনর্বার জীবিত করে উঠাবেন না৷”-কেন উঠাবেন না ? এতো একটি ওয়াদা, যেটি পুরা করা তিনি নিজের ওপর ওয়াজিব করে নিয়েছেন, কিন্তু অধিকাংশ লোক জানে না
(১৬:৩৯) আর এটি এজন্য প্রয়োজন যে, এরা যে সত্যটি সম্পর্কে মতবিরোধ করছে আল্লাহ সেটি এদের সামনে উন্মুক্ত করে দেবেন এবং সত্য অস্বীকারকারীরা জানতে পারবে যে, তারাই ছিল মিথ্যাবাদী৷৩৫
(১৬:৪০) (এর সম্ভাবনার ব্যাপারে বলা যায়) কোনো জিনিসকে অস্তিত্বশীল করার জন্য এর চেয়ে বেশী কিছু করতে হয় না যে, তাকে হুকুম দিই “হয়ে যাও” এবং তা হয়ে যায়৷৩৬
৩০. সূরা আন'আমের ১৪৮-১৪৯ আয়াতেও মুশরিকদের এ যুক্তি উত্থাপন করে এর জবাব দেয়া হয়েছে ৷ সেই আয়াতগুলো এবং সেখানে বর্ণিত টীকা সামনে থাকলে এ বিষয়টি অনুধাবন করা বেশী সহজ হবে ৷ ( দেখুন সূরা আন'আম ১২৪-১২৬ টীকা )
৩১. অর্থাৎ এটা কোন নতুন কথা নয় ৷ আজ তোমরা আল্লাহর ইচ্ছাকে নিজেদের ভ্রষ্টতা ও অসৎকর্মের কারণ হিসেবে পেশ করছো ৷ এটা অতি পুরাতন যুক্তি ৷ বিভ্রান্ত লোকেরা নিজেরেদ বিবেককে ধোঁকা দেবার এবং উপদেশদাতাদের মুখ বন্ধ করার জন্য এ যুক্তি আউড়ে আসছে ৷ এটা হচ্ছে মুশরিকদের যুক্তির প্রথম জবাব ৷ এ জবাবটির পরিপূর্ণ সৌন্দর্য উপলব্ধি করতে হলে একথা অবশ্যি মনে রাখতে হবে যে, মাত্র এখনই কয়েক লাইন আগেই " জ্বী ওগুলো তো পুরাতন যুগের বস্তাপচা কাহিনী " বলে কুরআনের বিরুদ্ধে মুশরিকদের প্রচারণার উল্লেখ এসে গেছে ৷ অর্থাৎ নবীর বিরুদ্ধে তাদের যেন এ আপত্তি ছিল যে, ইনি আবার নতুন কথাই বা কি বলছেন, সেই পুরানো কথাই তো বলে চলছেন ৷ নূহের প্লাবনের পর থেকে নিজে আজ পর্যন্ত হাজার বার এ কথা বলা হয়েছে ৷ এর জাবাবে তাদের যুক্তি ( যাকে তারা বড়ই শক্তিশালী হিসেবে পেশ করতো )উদ্ধৃত করার পর এ সূক্ষ্ম ইংগিত করা হয়েছে যে, মহোদয়গণ ! আপনারাই বা কোন অত্যাধুনিক ? আপনার এই যে চমৎকার যু‌ক্তির অবতারণা করেছেন এতেও আদতের কোন অভিনবত্ব নেই ৷ এটিও বহুকালের বাসি - বস্তাপচা খোঁড়া যুক্তি ৷ হাজার বছর থেকে বিভ্রান্ত ও পথভ্রষ্টতা এ একই গীত গেয়ে আসছে ৷ আপনারও সেই পচা গীতটিই গেয়ে উঠেছেন ৷
৩২. অর্থাৎ তোমরা নিজেদের শিরক এবং নিজেদের তৈরী হালাল- হারামের বিধানের পক্ষে আমার ইচ্ছাকে কেমন করে বৈধতার ছাড়পত্র দানকারী হিসেবে পেশ করতে পারো ? আমি তো প্রত্যেক জাতির মধ্যে নিজের রসূল পাঠিয়েছি এবং তাদের মাধ্যমে লোকদেরকে পরিস্কারভাবে জানিয়ে দিয়েছি যে, তোমাদের কাজ হচ্ছে শুধুমাত্র আমার বন্দেগী করা ৷ তাগুতের বন্দেগী করার জন্য তোমাদের পয়দা করা হয়নি ৷ এভাবে আমি যখন পূর্বাহ্নেই নায়সংগত পদ্ধতিতে তোমাদের জানিয়ে দিয়েছি যে, তোমাদের এসব বিভ্রান্ত কাজ কারবারের পক্ষে আমার সমর্থন নেই এরপর আমার ইচ্ছাকে ঢাল বানিয়ে তোমাদের নিজেদের ভ্রষ্টতাকে বৈধ গণ্য করা পরিস্কারভাবে এমন রসূল পাঠাতাম যিনি তোমাদের হাত ধরে ভুল পথ থেকে টেনে সারিয়ে নিতেন এবং জোর করে তোমাদেরকে সত্য সঠিক পথে পরিচালিত করতেন ৷ ( আল্লাহর অনুমতিদান ও পছন্দ করার মধ্যে পার্থক্য অনুধাবন করার জন্য সূরা আন 'আমের ৮০ এবং সূরা যুমারের ২০ টীকা দেখুন ) ৷
৩৩. অর্থাৎ প্রত্যেক নবীর আগমনের পর তাঁর জাতি দু'ভাগে বিভক্ত হয়েছে ৷ একদল তাঁর কথা মেনে নিয়েছে ৷ ( আল্লাহ তাদেরকে এ মেনে নেয়ার তাওফীক দিয়েছিলেন ) এবং অন্য দলটি নিজেদের গোমরাহীর ওপর অবিচল থেকেছে ৷ ( আরো বেশী ব্যাখ্যার জন্য দেখুন সূরা আন 'আম ২৮ টীকা ) ৷
৩৪. অর্থাৎ নিশ্চয়তা লাভ করার জন্য অভিজ্ঞতার চাইতে আর কোন বড় নির্ভরযোগ্য মানদণ্ড নেই ৷ এখন তুমি নিজেই দেখে নাও, মানব ইতিহাসের একের পর এক অভিজ্ঞতা কি প্রমাণ করছে ? আল্লাহর আযাব কার ওপর এসেছে - ফেরাউন ও তার দলবলের ওপর, না মূসা ও বনী ইসরাঈলের ওপর ? আল্লাহকে যারা অস্বীকার করেছিল তাদের ওপর, না তাঁকে যারা মেনে নিয়েছিল তাদের ওপর ? এই ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতাগুলোর ফল কি এই দাঁড়িয়েছে যে, আমার ইচ্ছার কারণে যারা শিরক করার ও শরীয়াত গঠনের সুযোগ লাভ করেছিল তদের প্রতি আমার সমর্থন ছিল? বরং বিপরীত পক্ষে এ ঘটনাবলী সুস্পষ্টভাবে একথা প্রমাণ করছে যে, উপদেশ ও অনুশাসন সত্বেও যারা এসব গোমরাহীর ওপর ক্রমাগত জোর দিয়ে চলেছে ৷ আমার ইচ্ছাশক্তি তাদেরকে অপরাধ করার অনেকটা সুযোগ দিয়েছে ৷ তারপর তাদের নৌকা পাপে ভরে যাবার পর ডুবিয়ে দেয়া হয়েছে ৷
৩৫. এ বক্তব্য থেকে মৃত্যুর পরের জীবন এবং শেষ বিচারের দিনের প্রতিষ্ঠার বুদ্ধিবৃত্তিক ও নৈতিক অপরিহার্যতা প্রমাণিত হচ্ছে ৷ দুনিয়ায় যখন থেকে মানুষ সৃষ্টি হয়েছে, সত্য সম্পর্কে অসংখ্য মতবিরোধ দেখা দিয়েছে ৷ এসব মতবিরোধের ভিত্তিতে বংশ গোত্র, জাতি ও পরিবারের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি হয়েছে ৷ এগুলোরই ভিত্তিতে বিভিন্ন মতাদর্শের ধারকরা নিজেদের জন্য আলাদা আলাদা ধর্ম, সামজ ও সভ্যতা তৈরী অথবা গ্রহণ করে নিয়েছে ৷ এক একটি মতাদর্শের ও পক্ষপাতিত্ব হাজার হাজার লাখো লাখো বিভিন্ন সময় ধন, প্রাণ ইজ্জত আবরু সব কিছু কুরবানী করে দিয়েছে ৷ আর এ মতাদর্শের সমর্থকদের মধ্যে বহু সময় এমন মারাত্মক সংঘর্ষণ হয়েছে যে, তারা একদল অন্যদলকে একেবারে নিশ্চিহ্ন করে দেবার চেষ্টা করেছে এবং যারা নিশ্চিহ্ন হয়ে যাচ্ছিল তারা এ অবস্থায়ও নিজেদের সৃষ্টিভংগী পরিহার করেনি ৷ এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ ও গভীর মননশীল মতবিরোধের ক্ষেত্রে বিবেকের দাবী এই যে, এক সময় না এক সময় সঠিক ও নিশ্চিতভাবে প্রতিভাত হোক যথার্থই তাদের মধ্যে হক কি ছিল এবং বাতিল কি ছিল, সে সত্যপন্থী ছিল এবং সে মিথ্যাপন্থী ৷ এ দুনিয়ায় এ যবনিকা সরে যাওয়ার কোন সম্ভবনাই দেখা যায় না ৷ এ দুনিয়ার ব্যবস্থাপনাই এমন যে এখানে সত্য কোনদিন পর্দার বাইরে আসতে পারে না ৷ কাজেই বিবেকের এ দাবী পূরণ করার জন্য ভিন্ন আরেকটি জগতের প্রয়োজন ৷ আর এটি শুধুমাত্র বিবেক- বুদ্ধির দাবীই নয় বরং নৈতিকতারও দাবী ৷ কেননা, এসব মতবিরোধ ও দ্বন্দ্ব সংঘাতে বহুদল অংশ নিয়েছে ৷ কেউ জুলুম করেছে এবং কেউ জুলুম সহ্য করেছে ৷ কেউ কুরবানী দিয়েছে এবং কেউ সেই কুরবানী আদায় করে নিয়েছে ৷ প্রত্যেকে নিজের মতাদর্শ অনুযায়ী একটি নৈতিক দর্শন ও একটি নৈতিক দৃষ্টিভংগী অবলম্বন করেছে এবং তা থেকে কোটি কোটি মানুষের জীবন ভালো বা মন্দ প্রভাব গ্রহণ করেছে ৷ শেষ পর্যন্ত এমন একটি সময় অবশ্যি হওয়া উচিত যখন এদের সবার নৈতিক ফলাফল ভালো বা মন্দের আকারে প্রকাশিত হবে ৷ এ দুনিয়ার ব্যবস্থা যদি সঠিক ও পূর্ণাংগ নৈতিক ফলাফলের প্রকাশকে ধারণ করতে অপারগ হয় তাহলে অবশ্যি অন্য একটি দুনিয়া সৃষ্টি হওয়া উচিত যেখানে এ ফলাফলের প্রকাশ সম্ভব হতে পারে ৷
৩৬. অর্থাৎ লোকেরা মনে করে, মরার পর মানুষকে পুনরাবার সৃষ্টি করা এবং সামনের পেছনের সমগ্র মানব - কূলকে একই সংগে পুনরুজ্জীবিত করা বড়ই কঠিন কাজ ৷ অথচ আল্লাহর ক্ষমতা অসীম ৷ নিজের কোন সংকল্প পূর্ণ করার জন্য তাঁর কোন সাজ- সরঞ্জাম, উপায় - উপকরণ ও পরিবেশের আনুকুল্যের প্রয়োজন হয় না ৷ তাঁর প্রত্যেকটি ইচ্ছা শুধুমাত্র তাঁর নির্দেশেই পূর্ণ হয় ৷ তাঁর নির্দেশই সাজ - সরঞ্জামের জন্ম দেয় ৷ তাঁর নির্দেশেই উপায় - উপকরণের উদ্ভব হয় ৷ তাঁর নির্দেশই তাঁর উদ্দেশ্য অনুযায়ী পরিবেশ তৈরী করে ৷ বর্তমানে যে দুনিয়ার অস্তিত্ব দেখা যাচ্ছে, এটিও নিছক হুকুম থেকেই অস্তিত্ব লাভ করেছে এবং অন্য দুনিয়াটিও মুহূর্তকালের মধ্যে শুধুমাত্র একটি হুকুমই জন্ম লাভ করতে পারে ৷