(১৫:৮০) হিজ্‌রবাসীরাও ৪৫ রসূলদের প্রতি মিথ্যা আরোপ করেছিল৷
(১৫:৮১) আমি তাদের কাছে আমার নিদর্শন পাঠাই, নিশানী দেখাই কিন্তু তারা সবকিছু উপেক্ষা করতে থাকে৷
(১৫:৮২) তারা পাহাড় কেটে কেটে গৃহ নির্মাণ করতো এবং নিজেদের বাসস্থানে একেবারেই নিরাপদ ও নিশ্চিন্ত ছিল৷
(১৫:৮৩) শেষ পর্যন্ত প্রভাত হতেই একটি প্রচণ্ড বিষ্ফোরণ তাদেরকে আঘাত হানলো
(১৫:৮৪) এবং তাদের উপার্জন তাদের কোনো কাজে লাগলো না৷ ৪৬
(১৫:৮৫) আমি পৃথিবী ও আকাশকে এবং তাদের মধ্যকার সকল জিনিসকে সত্য ছাড়া অন্য কিছুর ভিত্তিতে সৃষ্টি করিনি ৪৭ এবং ফায়সালার সময় নিশ্চিতভাবেই আসবে৷ কাজেই হে মুহাম্মাদ! (এ লোকদের আজেবাজে আচরণগুলোকে) ভদ্রভাবে উপেক্ষা করে যাও৷
(১৫:৮৬) নিশ্চিতভাবে তোমার রব সবার স্রষ্টা এবং সবকিছু জানেন৷ ৪৮
(১৫:৮৭) আমি তোমাকে এমন সাতটি আয়াত দিয়ে রেখেছি, যা বারবার আবৃত্তি করার মতো ৪৯ এবং তোমাকে দান করেছি মহান কুরআন৷ ৫০
(১৫:৮৮) আমি তাদের মধ্য থেকে বিভিন্ন শ্রেণীর লোকদের দুনিয়ার যে সম্পদ দিয়েছি সেদিকে তুমি চোখ উঠিয়ে দেখো না এবং তাদের অবস্থা দেখে মুনঃক্ষুন্নও হয়ো না৷ ৫১ তাদেরকে বাদ দিয়ে মুমিনদের প্রতি ঘনিষ্ঠ হও
(১৫:৮৯) এবং (অমান্যকারীদেরকে) বলে দাও-আমিতো প্রকাশ্য সতর্ককারী৷
(১৫:৯০) এটা ঠিক তেমনি ধরনের সতর্কীকরণ যেমন সেই বিভক্তকারীদের দিকে আমি পাঠিয়েছিলাম
(১৫:৯১) যারা নিজেদের কুরআনকে খণ্ডবিখণ্ড করে ফেলে৷ ৫২
(১৫:৯২) তোমার রবের কসম, আমি অবশ্যি তাদের সবাইকে জিজ্ঞেস করবো,
(১৫:৯৩) তোমরা কি কাজে নিয়োজিত ছিলে ?
(১৫:৯৪) কাজেই হে নবী ! তোমাকে যে বিষয়ের হুকুম দেয়া হচ্ছে তা সরবে প্রকাশ্যে ঘোষণা করো এবং শিরককারীদের মোটেই পরোয়া করো না৷
(১৫:৯৫) যেসব বিদ্রূপকারী আল্লাহর সাথে অন্য কাউকেও ইলাহ বলে গণ্য করে
(১৫:৯৬) তোমাদের পক্ষ থেকে তাদের ব্যবস্থা করার জন্য আমিই যথেষ্ট৷ শীঘ্রই তারা জানতে পারবে৷
(১৫:৯৭) আমি জানি, এরা তোমার সম্বন্ধে যেসব কথা বানিয়ে বলে তাতে তুমি মনে ভীষণ ব্যথা পাও৷
(১৫:৯৮) এর প্রতিকার এই যে, তুমি নিজের রবের প্রশংসা সহকারে তাঁর পবিত্রতা ও মহিমা বর্ণনা করতে থাকো, তাঁর সকাশে সিজ্‌দাবনত হও
(১৫:৯৯) এবং যে চূড়ান্ত সময়টি আসা অবধারিত সেই সময় পর্যন্ত নিজের রবের বন্দেগী করে যেতে থাকো৷ ৫৩
৪৫. এটি ছিল সামুদ জাতির কেন্দ্রীয় শহর ৷ মদীনার উত্তর পশ্চিমে বর্তমান আল'উলা শহরের কয়েক মাইল দূরে এ শহরটির ধবংসাবশেষ পাওয়া যায় ৷ মদীনা থেকে তাবুক যাবার সময় প্রধান সড়কের ওপরই এ জায়গাটি পড়ে ৷ এ উপত্যকাটির মধ্য দিয়ে কাফেলা এগিয়ে যায় ৷ কিন্তু নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নির্দেশ অনুযায়ী কেউ এখানে অবস্থান করে না ৷ হিজরী আট শতকে পর্যটক ইবনে বতুতা হজ্জে যাবার পথে এখানে এসে পৌঁছেন ৷ তিনি লেখেন : " এখানে লাল রংয়ের পাহাড়গুলোতে সামুদ জাতির ইরামতগুলো রয়েছে ৷ এগুলো তারা পাহাড় কেটে কেটে তার মধ্যে নির্মাণ করেছিল ৷ এ গৃহগুলোর কারুকাজ এখনো এমন উজ্জ্বল ও তরতাজা আছে যেন মনে হয় আজই এগুলো খোদাই করা হয়েছে ৷ পচাগলা মানুষের হাড় এখনো এখানকার ঘরগুলো মধ্যে পাওয়া যায় ৷ ( আরো বেশী ব্যাখ্যার জন্য সূরা আ'রাফের ৫৭ টীকা দেখুন ) ৷
৪৬. অর্থাৎ তারা পাহাড় কেটে কেটে তার মধ্যে যেসব আলীশান ইমারত নির্মাণ করেছিল সেগুলো তাদেরকে কোন প্রকারে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করতে পারেনি ৷
৪৭. নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে সান্তনা দেবার জন্য একথা বলা হচ্ছে ৷ এর অর্থ হচ্ছে , বর্তমানে বাতিলের যে আপাত পরাক্রম ও বিজয় তুমি দেখতে পাচ্ছো এবং হকের পথে যেসব সমস্যা ও সংকটের মুখোমুখি তোমাকে হতে হচ্ছে এতে ভয় পেলে চলবে না ৷ এটি একটি সাময়িক অবস্থা মাত্র ৷ এ অবস্থা সবসময় এবং চিরকাল থাকবে না ৷ কারণ পৃথিবী ও আকশের সমগ্র ব্যবস্থা হকের ওপর প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, বাতিলের ওপর নয় ৷ বিশ্ব জাহানের প্রকৃতি হকের সাথে সামঞ্জস্যশীল , বাতিলের সাথে নয় ৷ কাজেই এখানে যদি অবস্থান ও স্থায়িত্বের অবকাশ থাকে তাহলে তা আছে হকের জন্য , বাতিলের জন্য নয় ৷
৪৮. অর্থাৎ স্রষ্টা হিসেবে তিনি নিজের সৃষ্টির ওপর পূর্ণ প্রভাব ও প্রতিপত্তির অধিকারী ৷ তাঁর পাকড়াও থেকে আত্মরক্ষা করার ক্ষমতা কোন সৃষ্টির নেই ৷ আবার এর সংগে তিনি পুরোপুরি সজাগ ও সচেতনও ৷ তুমি এদের সংশোধনের জন্য যা কিছু করছো তাও তিনি জানেন এবং যেসব চক্রান্ত দিয়ে এরা তোমার সংস্কার কার্যাবলীকে ধবংস করতে চাচ্ছে সেগুলো সম্পর্কেও তিনি অবগত ৷ কাজেই তোমার ঘাবড়াবার এবং অধৈর্য হাবার প্রয়োজন নেই ৷ নিশ্চিন্ত থাকো ৷ সময় হলে ন্যায্য ফায়সালা চুকিয়ে দেয়া হবে ৷
৪৯. অর্থাৎ সূরা ফাতিহার সাতটি আয়াত ৷ যদিও কেউ কেউ এর অর্থ করেছেন দু' দু' শো আয়াত বিশিষ্ট সাতটি বড় বড় সূরা ৷ অর্থাৎ আল বাকারাহ , আলে ইমরান , আন নিসা , আল মায়েদাহ , আল আন'আম, আল আ'রাফ ও ইউনুস অথবা আল আনফাল ও আততাওবাহ ৷ কিন্তু পূর্ববর্তী আলেমগণের অধিকাংশই এ ব্যাপারে একমত যে , এখানে সূরা ফাতিহার কথাই বলা হয়েছে ৷ বরং খোদ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাতটি বারবার আবৃত্তি করার মত সূরা বলে যে সূরা ফাতিহার দিকে ইংগিত করেছেন এর প্রামণ স্বরূপ ইমাম বুখারী দু'টি " মরফূ" হাদীসও বর্ণনা করেছেন ৷
৫০. একথাটিও নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং তাঁর সাথীদেরকে সান্তনা দেবার জন্য বলা হয়েছে ৷ তখন এমন একটা সময় ছিল যখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং তাঁর সাথীরা সবাই চরম দুরবস্থার মধ্যে জীবন যাপন করছিলেন ৷ নবুওয়াতের গুরু দায়িত্বভার কাঁধে তুলে নিবার সাথে সাথেই নবী করীমের (সা) সব সম্পদও খরচ হয়ে গিয়েছিল ৷ মুসলমানদের মধ্যে কিছু উঠতি যুবক ছিলেন ৷ তাদেরকে অভিভাবকরা ঘর থেকে বের করে দিয়েছিল ৷ কতক ছিলেন ব্যবসায়ী ও কারিগর ৷ অনবরত অর্থনৈতিক বয়কটের আঘাতে তাদের কাজ কারবার একদম বন্ধ হয়ে গিয়েছিল ৷ আর কতক দুর্ভাগ্য পীড়িত আগেই ছিলেন দাস বা মুক্ত দাস শ্রেণীভুক্ত ৷ তাদের কোন অর্থনৈতিক মেরুদণ্ডই ছিল না ৷ এরপর দুর্ভাগ্যের ওপর দুর্ভাগ্য হচ্ছে এই যে , নবী (সা) সহ সমস্ত মুসলমান মক্কা ও তার চারপাশের পল্লীগুলোতে চরম নির্যাতিতের জীবন যাপন করছিলেন ৷ তারা ছিলেন সবদিক থেকে নিন্দিত ও ধিক্কৃত ৷ সব জায়গায় তাঁরা লাঞ্ছনা , গঞ্জনা ও হাসি - তামাশার খোরাক হয়েছিলেন ৷ এই সংগে মানসিক ও আত্মিক মর্মজ্বালার সাথে সাথে তারা দৈহিক নিপীড়নের হাত থেকে ও রেহাই পাননি ৷ অন্যদিকে কুরাইশ সরদাররা পার্থিব অর্থ - সম্পদের ক্ষেত্রে সবরকমের সমৃদ্ধি ও প্রাচুর্যের অধিকারী ছল ৷ এ অবস্থায় বলা হচ্ছে , তোমার মন হতাশাগ্রস্ত কেন ? তোমাকে আমি এমন সম্পদ দান করেছি যার তুলনায় দুনিয়ার সমস্ত সম্পদ তুচ্ছ ৷ তোমার এ জ্ঞানগত ও নৈতিক সম্পদ ঈর্ষার যোগ্য , ওদের বস্তুগত সম্পদ নয় ৷ ওরা তো নানা হারাম উপায়ে এ সম্পদ আহরণ করছে এবং নানাবিধ হারাম পথে এ উপার্জিত সম্পদ নষ্ট করছে ৷ শেষ পর্যন্ত ওরা একদম কপর্দক শূন্য ও কাংগাল হয়ে নিজেদের রবের সামনে হাজির হবে ৷
৫১. অর্থাৎ তারা যে নিজেদের কল্যাণকামীকে নিজেদের শত্রু মনে করছে , নিজেদের ভ্রষ্টতা ও নৈতিক ত্রুটিগুলোকে নিজেদের গুণাবলী মনে করছে , নিজেরা এমন পথে এগিয়ে চলছে এবং নিজেদের সমগ্র জাতিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে যার নিশ্চিত পরিণাম ধবংস এবং যে ব্যক্তি তাদেরকে শান্তি ও নিরাপত্তার পথ দেখাচ্ছে তার সংস্কার প্রচেষ্টাকে ব্যর্থ করার জন্য সর্বাত্মক সংগ্রাম চালাচ্ছে , তাদের এ অবস্থা দেখে মনঃক্ষুণ্ণ হয়ো না ৷
৫২. সেই বিভক্তকারী দল বলতে এখানে ইহুদীদেরকে বুঝানো হয়েছে ৷ তাদেরকে বিভক্তকারী এ অর্থে বলা হয়েছে যে , তারা আল্লাহর দীনকে বিভক্তকরে ফেলেছে ৷ তার কিছু কথা মেনে নিয়েছে এবং কিছু কথা মেনে নেয়নি ৷ এ ছাড়া তার মধ্যে বিভিন্ন প্রকার কাটছাঁট ও পরিবর্তন-পরিবর্ধন করে অসংখ্য ফেরকার জন্ম দিয়েছে ৷ তাদের " কুরআন" বলতে তাওরাতকে বুঝানো হয়েছে ৷ এ কিতাবটি তাদেরকে ঠিক তেমনিভাবে দেওয়া হয়েছিল যেমন উম্মতে মুহাম্মাদীয়াকে কুরআন দেয়া হয় ৷ আর এ কুরআনকে খণ্ড বিখণ্ড করে ফেলার কথা বলে ঠিক এমন ধরনের একটি কর্মের প্রতি ইংগিত করা হয়েছে যেমন সূরা আল বাকারার ৮৫ আয়াতে বলা হয়েছে :

আরবী ----------------------------------------------------------------------------

তোমরা কি আল্লাহর কিতাবের কিছু কথা মেনে নেবে এবং কিছু কথা অস্বীকার করবে ?

তারপর যে কথা বলা হয়েছে যে , তোমাদেরকে আজ এই যে সতর্ক করা হচ্ছে এটা ঠিক তেমনি ধরনের সতর্কীকরণ যেমন ইতিপূর্বে ইহুদীদেরকে করা হয়েছিল , ----- মূলত ইহুদীদের অবস্থা সংকেত থেকে গাফেল থাকার ফলে যে পরিণামের সম্মুখীন হয়েছে তা তোমাদের চোখের সামনে রয়েছে ৷ এখন ভেবে দেখো , তোমরাও কি এই একই পরিণাম দেখতে চাও ?
৫৩. অর্থাৎ সত্যের বাণী প্রচার এবং সংস্কার প্রচেষ্টা চালাবার ক্ষেত্রে তোমাকে অশেষ কষ্ট ও বিপদের সম্মুখীন হতে হয় ৷ এগুলোর মোকাবিলা করার শক্তি তুমি একমাত্র নামায ও আল্লাহর বন্দেগী করার ক্ষেত্রে অবিচল দৃঢ়তার পথ অবলম্বন করার মাধ্যমেই অর্জন করতে পারো ৷ এ জিনিসটি তোমার মনকে প্রশান্তিতে ভরে তুলবে , তোমার মধ্যে ধৈর্য ও সহিষ্ণুতার জন্ম দেবে , তোমার সাহস ও হিম্মত বাড়িয়ে দেবে এবং তোমাকে এমন যোগ্যতাসম্পন্ন করে গড়ে তুলবে যার ফলে সারা দুনিয়ার মানুষের গালিগালাজ নিন্দাবাদ ও প্রতিরোধের মুখে তুমি দৃঢ়ভাবে এমন দায়িত্ব পালন করে যেতে থাকবে যার মধ্যে তোমার রবের রেজামন্দি রয়েছে ৷