(১১২:১) বলো, তিনি আল্লাহ, একক৷
(১১২:২) আল্লাহ কারোর ওপর নির্ভরশীল নন এবং সবাই তাঁর ওপর নির্ভরশীল ৷
(১১২:৩) তাঁর কোন সন্তান নেই এবং তিনি কারোর সন্তান নন৷
(১১২:৪) এবং তাঁর সমতুল্য কেউ নেই৷
১. এখানে 'বলো' শব্দে মাধ্যমে প্রথমত রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে সম্বোধন করা হয়েছে৷ কারণ তাঁকেই প্রশ্ন করা হয়েছিল রব কে ? তিনি কেমন ? আবার তাঁকে হুকুম দেয়া হয়েছিল , প্রশ্নের জবাবে আপনি একথা বলুন ৷ কিন্তু রসূলের (সা) তিরোধানের পর এ সম্বোধনটি প্রত্যেক মু'মিনের সাথে সংশ্লিষ্ট হয়ে যায়৷ রসূলুল্লাহকে (সা) যে কথা বলার হুকুম দেয়া হয়েছিল এখন সে কথা তাকেই বলতে হবে৷
২. অর্থাৎ আমার যে রবের সাথে তোমরা পরিচিত হতে চাও তিনি আর কেউ নন , তিনি হচ্ছেন আল্লাহ ৷ এটি প্রশ্নোকারীদের প্রশ্নের প্রথম জবাব ৷ এর অর্থ হচ্ছে , তোমাদের সামনে আমি কোন নতুন রব নিয়ে অসিনি৷ অন্যসব মাবুদদের ইবাদাত ত্যাগ করে কোন নতুন মাবুদের ইবাদাত করতে আমি তোমাদের বলিনি৷ বরং আল্লাহ নামে যে সত্তার সাথে তোমরা পরিচিত তিনি সেই সত্তা৷ আরবদের জন্য ' আল্লাহ ' শব্দটি কোন নতুন ও অপরিচিত শব্দ ছিল না৷ প্রাচীনতম কাল থেকে বিশ্ব - জাহানের সষ্টার প্রতিশব্দ হিসেবে তারা আল্লাহ শব্দটি ব্যবহার করে আসছিল৷ নিজেদের অন্য কোন মাবুদ ও উপাস্য দেবতার সাথে এ শব্দটি সংশ্লিষ্ট করতো না৷ অন্য মাবুদদের জন্য তারা " ইলাহ" শব্দ ব্যবহার করতো৷ তারপর আল্লাহ সম্পর্কে তাদের যে আকীদা ছিল তার চমৎকার প্রকাশ ঘটেছিল আবরাহার মক্কা আক্রমণের সময়৷ সে সময় কা'বাঘরে ৩৬০ টি উপাস্যের মূর্তি ছিল৷ কিন্তু এ বিপদ থেকে রক্ষা করার জন্য মুশরিকরা তাদের সবাইকে বাদ দিয়ে শুধুমাত্র আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করেছিল৷ অর্থাৎ তারা নিজেরা ভালোভাবে জানতো , এ সংকটকালে আল্লাহ ছাড়া আর কোন সত্তাই তাদেরকে সাহায্য করতে পারবে না৷ কা'বা ঘরকেও তারা এসব ইলাহের সাথে সম্পর্কিত করে বায়তুল আ- লিহাহ ( ইলাহ -- এর বহুবচন ) বলতো না বরং আল্লাহর সম্পর্কিত করে একে বলতো বায়তুল্লাহ৷ আল্লাহ সম্পর্কে আরবের মুশরিকদের আকীদা কি ছিল কুরআনের বিভিন্ন স্থানে তা বলা হয়েছে ৷ যেমন : সূরা যুখরুফে বলা হয়েছে : "যদি তুমি তাদেরকে জিজ্ঞেস করো , কে তাদের পয়দা করেছে , তাহলে তারা নিশ্চয়ই বলবে আল্লাহ৷" (৮৭ আয়াত )

শূরা আনকাবুতে বলা হয়েছে : " যদি এদেরকে জিজ্ঞেস করো , আকাশসমূহ ও যমীনকে কে পয়দা করেছে এবং চাঁদ ও সূর্যকে কে নিয়ন্ত্রিত করে রেখেছে , তাহলে নিশ্চয়ই তারা বলবে আল্লাহ ৷-------------আর যদি তুমি তাদেরকে জিজ্ঞেস করো , কে আকাশ থেকে পানি বর্ষণ করলেন এবং কার সাহায্যে মৃত পতিত জমিকে সজীবতা দান করলেন , তহালে তারা নিশ্চয়ই বলবে আল্লাহ ৷ " (৬১-৬৩ আয়াত)

সূরা মু'মিনূনে বলা হয়েছে : " এদেরকে জিজ্ঞেস করো , বলো যদি তোমরা জানো , এ যমীন এবং এর সমস্ত জনবসতি কার ? এরা অবশ্যি বলবে আল্লাহর ৷ --------- এদেরকে জিজ্ঞেস করো , সাত আকাশ ও মহাআরশের মালিক কে ? এরা অবশ্যি বলবে , আল্লাহ ৷ ----------------- এদেরকে জিজ্ঞেস করো , বলো যদি তোমরা জেনে থাকো প্রত্যেকটি জিনিসের ওপর কার কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত ? আর কে আশ্রয় দান করেন এবং কার মোকাবিলায় কেউ আশ্রয় দিতে পারেন না ? এরা নিশ্চয়ই বলবে , এ ব্যাপারটি তো একমাত্র আল্লাহরই জন্য৷ " (৮৪-৮৯ আয়াত )

সূরা ইউনুসে বলা হয়েছে : "এদেরকে জিজ্ঞেস করো কে তোমাদের আকাশ ও যমীন থেকে রিযিক দেন ? তোমরা যে শ্রবণ ও দৃষ্টিক্ষমতার অধিকারী হয়েছো৷ এগুলো কার ইখতিয়ারভুক্ত ? আর কে জীবিতকে মৃত থেকে এবং মৃতকে জীবিত থেকে বের করেন এবং কে এ বিশ্বব্যবস্থাপনা চালাচ্ছেন ? এরা নিশ্চয়ই বলবে , আল্লাহ৷ " ( ৩১ আয়াত )

অনুরূপভাবে সূরা‌ ইউনুসের আর এক জায়গায় বলা হয়েছে : " যখন তোমরা জাহাজে আরোহণ করে অনুকূলে বাতাসে আনন্দ চিত্তে সফর করতে থাকো আর তারপর হঠাৎ প্রতিকূল বাতাসের বেগ বেড়ে যায় , চারদিকে থেকে তরংগ আঘাত করতে থাকে এবং মুসাফিররা মনে করতে থাকে , তা চারদিকে থেকে ঝনঝা পরিবৃত হয়ে পড়েছে , তখন সবাই নিজের দীনকে একমাত্র আল্লাহর জন্য নির্ধারিত করে নিয়ে তাঁরই কাছে দোয়া করতে থাকো এই বলে : " হে আল্লাহ যদি তুমি আমাদের এ বিপদ থেকে উদ্ধার করো তাহলে আমরা কৃতজ্ঞ বান্দার পরিণত হবো৷ কিন্তু যখন তিনি তাদেরকে বাঁচিয়ে দেন তখন এই লোকেরাই সত্যচ্যূত হয়ে পৃথিবীতে বিদ্রোহ সৃষ্টির কাজে লিপ্ত হয়ে পড়ে৷ "

সূরা বনী ইসরাঈলে একথাটিরই পুনরাবৃত্তি এভাবে করা হয়েছে : " যখন সমুদ্রে তোমাদের ওপর বিপদ আসে তখন সেই একজন ছাড়া আর যাদেরকে তোমারা ডাকতে তারা সবাই হারিয়ে যায়৷ কিন্তু যখন তিনি তোমাদের বাঁচিয়ে স্থলভাগে পৌঁছিয়ে দেন তখন তোমরা তাঁর দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নাও৷ " (৬৭ আয়াত )

এ আয়াতগুলো সামনে রেখে চিন্তা করুন , লোকেরা তাঁকে জিজ্ঞেস করলো , আপনার সেই রব কে এবং কেমন , যার ইবাদাত বন্দেগী করার জন্য আপনি আমাদের প্রতি আহাবান জানাচ্ছেন ? তিনি এর জবাবে বরলেন : ( আরবী ----------) তিনি আল্লাহ ! এ জবাব থেকে আপনা আপনি এ অর্থ বের হয় , যাকে তোমরা নিজেরাই নিজেদের ও সারা বিশ্ব- জাহানের স্রষ্টা , প্রভু , আহারদাতা , পরিচালাক ও ব্যবস্থাপক বলে মানো এবং কঠিন সংকটময় মুহূর্তে অন্য সব মাবুদদের পরিত্যাগ করে একমাত্র তাঁর কাছেই সাহায্য করার আবেদন জানাও , তিনিই আমার রব এবং তাঁরই ইবাদাত করার দিকে আমি তোমাদের আহবান জানাচ্ছি৷ এ জবাবের মধ্যে আল্লাহর সমস্ত পূর্ণাংগ গুণাবলী আপনা আপনি এসে পড়ে৷ কারণ যিনি এ বিশ্ব- জাহানের সৃষ্টিকর্তা , যিনি এর বিভিন্ন বিষয়ের পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনা করেন , যিনি এর মধ্যে বসবাসকারী সমস্ত প্রাণীর আহার যোগান এবং বিপদের সময় নিজের বান্দাদের সাহায্য করেন তিনি জীবিত নন , শুনতে ও দেখতে পান না , স্বাধীন ও সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী নন , সর্বজ্ঞ ও সর্বজ্ঞানী নন , করুণাময় ও স্নেহশীল নন এবং সবার ওপর প্রাধান্য বিস্তারকারী নন , একথা আদাতে কল্পনাই করা যায় না৷
৩. ব্যাকরণের সূত্র অনুসারে উলামায়ে কেরাম ( আরবী -------) বাক্যটির বিভিন্ন বিশ্লেষণ দিয়েছেন৷ কিন্তু আমাদের মতে যে বিশ্লেষণটি এখানকার সাথে পুরোপুরি খাপ খায় সেটি হচ্ছে : (আরবী -----) উদ্দেশ্য (Subject) আল্লাহ তার বিধেয় (predicate) এবং ( আরবী --------) তার দ্বিতীয় বিধেয়৷ এ বিশ্লেষণের দৃষ্টিতে এ বাক্যটিতে অর্থ হচ্ছে , তিনি (যাঁর সম্পর্কে তোমরা প্রশ্ন করছো ) আল্লাহ একক ৷ অন্য অর্থে এও হতে পারে এবং ভাষারীতির দিকে দিয়ে এটা ভুলও নয় যে , তিনি আল্লাহ এক ৷

সর্বপ্রথম একথাটি বুঝে নিতে হবে যে , এ বাক্যটিতে মহান আল্লাহর জন্য " আহাদ " শব্দটি যেভাবে ব্যবহার করা হয়েছে তা আরবী ভাষায় এ শব্দটির একটি অস্বাভাবিক ব্যবহার৷ সাধারণত অন্য একটি শব্দের সাথে সম্বন্ধের ভিত্তিতে এ শব্দটি ব্যবহৃত হয় , যেমন : ( আরবী ----------) " সপ্তাহের প্রথম দিন৷ " অনুরূপভাবে ( আরবী -------) "তোমাদের কোন একজনকে পাঠাও ৷" অথবা সাধারণ নেতিবাচক অর্থে এর ব্যবহার হয়৷ যেমন : (আরবী ----------) " আমার কাছে কেউ আসেনি৷ " কিংবা ব্যাপকতার ধারণাসহ প্রশ্ন সূচক বাক্যে বলা হয়৷ যেমন : ( আরবী -----------) " তোমার কাছে কি কেউ আছে ? " অথবা এ ব্যাপকতার ধারণাসহ শর্ত প্রকাশক বাক্যে এর ব্যবহার হয় যেমন : (আরবী -------) " যদি তোমার কাছে কেউ এসে থাকে ৷" অথবা গণনায় বলা হয়৷ যেমন : ( আরবী --------) " এক , দুই , এগার৷" এ সীমিত ব্যবহারগুলো ছাড়া কুরআন নাযিলের পূর্বে আরবী ভাষায় ( আরবী--) আহাদ শব্দটির গুণবাচক অর্থে ব্যবহার অর্থাৎ কোন ব্যক্তি বা জিনিসের গুণ প্রকাশ অর্থে " আহাদ" শব্দের ব্যবহারের কোন নজির নেই৷ আর কুরআন নাযিলের পর এ শব্দটি শুধুমাত্র আল্লাহর সত্তার জন্য ব্যবহৃত হয়েছে৷ এ অস্বাভাবিক বর্ণনা পদ্ধতি স্বতষ্ফূর্তভাবে একথা প্রকাশ করে যে , একক ও অদ্বিতীয় হওয়া আল্লাহর বিশেষ গুণ৷ বিশ্ব - জাহানের কোন কিছুই এ গুণে গুণান্বিত নয়৷ তিনি এক ও একক , তাঁর কোন দ্বিতীয় নেই৷

তারপর মুশরিক ও কুরাইশরা রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে তাঁর রব সম্পর্কে যেসব প্রশ্ন করেছিল সেগুলো সামনে রেখে দেখুন , ( আরবী --------) বলার পর ( আরবী -) বলে কিভাবে তার জবাব দেয়া হয়েছে :

প্রথমত , এর মানে হচেছ , তিনি একাই রব৷ তাঁর 'রবুবিয়াতে ' কারো কোন অংশ নেই৷ আর যেহেতু ইলাহ ( মাবুদ) একমাত্র তিনিই হতে পারেন যিনি রব ( মালিক ও প্রতিপালক ) হন , তাই ' উলুহীয়াতে'ও ( মাবুদ হবার গুণাবলী ) কেউ তাঁর সাথে শরীক নেই৷

দ্বিতীয়ত , এর মানে এও হয় যে , তিনি একাই এ বিশ্ব জাহানের স্রষ্টা৷ এ সৃষ্টিকর্মে কেউ তাঁর সাথে শরীক নয়৷ তিনি একাই সমগ্র বিশ্ব- রাজ্যের মালিক ও একচ্ছত্র অধিপতি৷ তিনি একাই বিশ্ব - ব্যবস্থার পরিচালক ও ব্যবস্থাপক ৷ নিজের সমগ্র সৃষ্টিজগতের রিযিক তিনি একাই দান করেন ৷ সংকটকালে তিনি একাই তাদের সাহায্য করেন ও ফরিয়াদ শোনেন ৷ আল্লাহর সর্বভৌম কর্তৃত্বের এসব কাজকে তোমরা নিজেরাও আল্লাহর কাজ বলে মনে করো , এসব কাজে আর কারো সামন্যতম কোন অংশ নেই৷

তৃতীয়ত , তারা একথাও জিজ্ঞেস করেছিল , তিনি কিসের তৈরি ? তাঁর বংশধারা কি ? তিনি কোন প্রজাতির অন্তরভুক্ত ? দুনিয়ার উত্তারাধিকার তিনি কার কাছ থেকে পেয়েছেন ? এবং তার পর কে এর উত্তরাধিকারী হবে ? আল্লাহ তাদের এ সমস্ত প্রশ্নের জবাব একটিমাত্র " আহাদ " শব্দের মাধ্যমে দিয়েছেন ৷ এর অর্থ হচ্ছে : (১) তিনি এক আল্লাহ চিরকাল আছেন এবং চিরকাল থাকবেন৷ তাঁর আগে কেউ আল্লাহ ছিল না এবং তাঁর পরেও কেউ আল্লাহ হবে না৷ (২) আল্লাহর এমন কোন প্রজাতি নেই , যার সদস্য তিনি হতে পারেন৷ বরং তিনি একাই আল্লাহ এবং তাঁর সমগোত্রীয় ও সমজাতীয় কেউ নেই৷(৩) তাঁর সত্তা নিছক ( আরবী -------) এক নয় বরং ( আরবী ---) একক , যেখানে কোন দিক দিয়ে একাধিক্যের সামান্যতম স্পর্শও নেই৷ তিনি বিভিন্ন উপাদানে গঠিত কোন সত্তা নন৷ তাঁর সত্তাকে দ্বিখণ্ডিত করা যেতে পারে না৷ তার কোন আকার ও রূপ নেই৷ তা কোন স্থানের গণ্ডীতে আবদ্ধ নয় এবং তার মধ্যে জিনিস আবদ্ধ হতে পারে না৷ তাঁর কোন বর্ণ নেই৷ কোন অংগ - প্রত্যংগ নেই৷ কোন দিক নেই ৷ তাঁর মধ্যে কোন প্রকার পরিবর্তন - বিবর্তন ঘটে না৷ সকল প্রকার ধরন ও প্রকরণ মুক্ত ও বিবর্জিত তিনি একমাত্র সত্তা , যা সবদিক দিয়েই আহাদ বা একক ৷ ( এপর্যায়ে একথাটি ভালোভাবে ব্যবহার করা হয় যেমনভাবে আমাদের ভাষায় আমরা " এক " শব্দটিকে ব্যবহার করে থাকি৷ বিপুল সংখ্যা সম্বলিত কোন সমষ্টিকেও তার সামগ্রিক সত্তাকে সামনে রেখে " ওয়াহেদ" বা " এক" বলা হয়৷ যেমন এক ব্যক্তি ,এক জাতি , এক দেশ , এক পৃথিবী , এমন কি এক বিশ্ব - জাহানও ৷ আবার কোন সমষ্টির প্রত্যেক অংশকেও আলাদা আলাদাভাবেও " এক" - ই বলা হয়৷ কিন্তু " আহাদ " বা একক শব্দটি আল্লাহ ছাড়া আর কারো জন্য ব্যবহার করা হয় না৷ এ জন্য কুরআন মজীদে যেখানেই আল্লাহর জন্য ওয়াহেদ ( এক) শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে সেখানেই বলা হয়েছে : " ইলাহুন ওয়াহেদ " এক মাবুদ বা " আল্লাহুল ওয়াহেদুল কাহহার " এক আল্লাহই সবাইকে বিজিত ও পদানত করে রাখেন ৷ কোথাও নিছক " ওয়াহেদ " বলা হয়নি৷ কারণ যেসব জিনিসের মধ্যে বিপুল ও বিশাল সমষ্টি রয়েছে তাদের জন্যও এ শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে৷ বিপরীত পক্ষে আহাদ শব্দিট একমাত্র আল্লাহর জন্য ব্যবহৃত হয়েছে৷ কারণ আল্লাহই একমাত্র সত্তা ও অস্তিত্ব যার মধ্যে কোন প্রকার একাধিক্য নেই৷ তাঁর একক সত্তা সবদিক দিয়েই পূর্ণাংগ ৷
৪. মূলে " সামাদ " শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে৷ এ শব্দটির উৎপত্তি হয়েছে ( আরবী -------) ধাতু থেকে ৷ আরবী ভাষায় এ ধাতুটি থেকে যতগুলো শব্দের উৎপত্তি হয়েছে সেগুলের ওপর নজর বুলালে এ শব্দটির অর্থের ব্যাপকতা জানা যায়৷ যেমন : (আরবী---------------) মনস্থ করা , ইচ্ছা করা ৷ বিপুলায়তন বিশিষ্ট উন্নত স্থান এবং বিপুল ঘনত্ব বিশিষ্ট উন্নত মর্যাদা ৷ উচ্চ সমতল ছাদ৷ যুদ্ধে যে ব্যক্তি ক্ষুধার্থ ও পিপাসার্থ হয় না৷ প্রয়োজনের সময যে সরদারের শরাণাপন্ন হতে হয়৷

আরবী : প্রত্যেক জিনিসের উঁচু অংশ ৷ যে ব্যক্তির ওপরে আর কেউ নেই ৷ যে নেতার আনুগত্য করা হয় এবং তার সাহায্য ছাড়া কোন বিষয়ের ফায়সালা করা হয় না৷ অভাবীরা যে নেতার শরণাপন্ন হয়৷ চিরন্তন উন্নত মর্যাদা ৷এমন নিবিড় ও নিচ্ছিদ্র যার মধ্যে কোন ছিদ্র ,শূন্যতা ও ফাঁকা অংশ নেই, যেখান থেকে কোন জিনিস বের হতে পারে না এবং কোন জিনিস যার মধ্যে প্রবেশ করতে পারে না৷ যুদ্ধে যে ব্যক্তি ক্ষুধা - তৃষ্ণার শিকার হয় না৷

আরবী : জমাট জিনিস ,যার পেট নেই৷

আরবী : যে লক্ষের দিকে যেতে মনস্থ করা হয় ; যে কঠিন জিনিসের মধ্যে কোন দুর্বলতা নেই৷

আরবী : এমন গৃহ , প্রয়োজন ও অভাব পূরণের জন্য যার আশ্রয় নিতে হয়৷

আরবী : উঁচু ইমারত ৷

আরবী : ঐ লোকটির দিকে যাওয়ার সংকল্প করলো৷

আরবী : ব্যাপারটি তার হাতে সোপর্দ করলো; তার সামনে ব্যাপারটি পেশ করলো ;বিষয়টি তার ওপর আস্থা স্থাপন করলো৷ (সিহাহ ,কামূস ও লিসানুল আরব )

এসব শাব্দিক ও আভিধানিক অর্থের ভিত্তিতে " আল্লাহর সামাদ "আয়াতটিতে উল্লেখিত হয়েছে নিচে আমরা তা উল্লেখ করছি :

হযরত আলী (রা ) ইকরামা ও কা'ব আহবার বলেছেন : সামাদ হচ্ছেন এমন এক সত্তা যাঁর ওপরে আর কেউ নেই ৷

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা ), হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা ) ও আবু ওয়ায়েল শাকীক ইবনে সালামাহ বলেছেন : তিনি এমন সরদার , নেতা ও সমাজপতি ,যাঁর নেতৃত্ব পূর্ণতা লাভ করেছে এবং চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছে গেছে৷

এ প্রসংগে ইবনে আব্বাসের দ্বিতীয় উক্তি হচ্ছে : লোকেরা কোন বিপদে - আপদে যার দিকে সাহায্য লাভের জন্য এগিয়ে যায় ,তিনি সামাদ৷ তাঁর আর একটি উক্তি হচ্ছে : যে সরদার তা নেতৃত্ব , মর্যাদা , শ্রেষ্ঠত্ব ,ধৈর্য ,সংযম ,জ্ঞান,বুদ্ধিমত্তা ও বিচক্ষণাতায় পূর্ণতার অধিকারী তিনি সামাদ৷

হযরত আবু হুরাইরা (রা ) বলেছেন : যিনি কারো ওপর নির্ভরশীল নন ,সবাই তাঁর ওপর নির্ভরশীল ,তিনিই সামাদ ৷

ইকরামার আর একটি বক্তব্য হচ্ছে : যার মধ্য থেকে কোন জিনিস কোনদিন বের হয়নি এবং বের হয়ও না আর যে পানাহার করে না , সে -ই সামাদ৷ এরই সমার্থবোধক উক্তি সা'বী ও মুহাম্মাদ ইবনে কা'ব আল কুরাযী থেকেও উদ্ধৃত হয়েছে৷

সুদ্দী বলেছেন : আকাংখিত বস্তু লাভ করার জন্য লোকেরা যার কাছে যায় এবং বিপদে সাহায্য লাভের আশায় যার দিকে হাত বাড়ায়, তাকেই সামাদ বলে৷

সাঈদ আবনে জুবাইর বলেছেন : যে নিজের সকল গুণ ও কাজে পূর্ণতার অধিকারী হয়৷

রাবী ইবনে আনাস বলেছেন : যার ওপর কখনো বিপদ - আপদ আসে না ৷মুকাতেল ইবনে হাইয়ান বলেছেন :যিনি সকল প্রকার দোষ ত্রুটি মুক্ত ৷

ইবনে কাইসান বলেছেন : অন্য কেউ যার গুণাবলীর ধারক হয় না৷

হাসান বসরী ও কাতাদাহ বলেছেন : যে বিদ্যমান থাকে এবং যার বিনাশ নেই ৷ প্রায় এই একই ধরনের উক্তি করেছেন মুজাহিদ , মা'মার ও মুররাতুল হামদানী৷

মুররাতুল হামদানীয় আর একটি উক্ত হচ্ছে : যে নিজের অনুযায়ী ফায়সালা করে এবং যা ইচ্ছা তাই করে ; যার হুকুম ও ফায়সালা পূনর্বিবেচনা করার ক্ষমতা কারো থাকে না৷

ইবরাহীম নাখয়ী বলেছেন : যার দিকে লোকেরা নিজেদের প্রয়োজন পূরণের জন্য এগিয়ে যায়৷

আবু বকর আমবায়ী বলেছেন : সামাদ এমন এক সরদারকে বলা হয়, যার ওপরে আর কোন সরদার নেই এবং লোকেরা নিজেদের বিভিন্ন বিষয়ে ও নিজেদের প্রয়োজন পূরণের জন্য যার শরণাপন্ন হয় ,অভিধানবিদদের মধ্যে এ ব্যাপারে কোন মতবিরোধ নেই ৷আয যুজাজের বক্তব্য প্রায় এর কাছাকাছি৷ তিনি বলেছেন : যার ওপর এসে নেতৃত্ব খতম হয়ে গেছে এবং নিজের প্রয়োজন পূর্ণ করার জন্য প্রত্যেকে যার শরণাপন্ন হয়, তাকেই বলা হয় সামাদ৷

এখন চিন্তা করুন , প্রথম বাক্যে "আল্লাহু আহাদ " কেন বলা হয়েছে এভং এ বাক্যে "আল্লাহুস সামাদ "বলা হয়েছে কেন ? "আহাদ "সম্পর্কে ইতিপূর্বে বলেছি,তা শুধুমাত্র আল্লাহর জন্য নির্দিষ্ট আর কারো জন্য এ শব্দটি আদৌ ব্যবহৃত হয় না৷তাই এখানে "আহাদুন " শব্দটি অনির্দিষ্ট অর্থে ব্যবহার করা হয়েছে৷ অন্যদিকে "সামাদ "শব্দটি অন্যান্য সৃষ্টির জন্যও ব্যবহার করা হয়ে থাকে৷ তাই "আল্লাহু সামাদুন "না বলে "আল্লাহুস সামাদ "বলা হয়েছে৷এর মানে হচ্ছে আসল ও প্রকৃত সামাদ হচ্ছেন একমাত্র আল্লাহ ৷সৃষ্টি যদি কোন দিক দিয়ে সামাদ হয়ে থাকে তাহলে অন্য দিক দিয়ে তা সামাদ নয়৷কারণ তা অবিনশ্বর নয় - একদিন তার বিনাশ হবে৷ তাকে বিশ্লেষণ ও বিভক্ত করা যায়৷তা বিভিন্ন উপাদান সহযোগে গঠিত৷ যে কোন সময় তার উপাদারগুলো আলাদা হয়ে ছড়িয়ে পড়তে পারে৷ কোন কোন সৃষ্টি তার মুখাপেক্ষী হলেও সে নিজেও আবার কারো মুখাপেক্ষী ৷তার নেতৃত্ব ও কর্তৃত্ব আপেক্ষিক, নিরংকৃশ নয়৷কারো তুলনায় সে শ্রেষ্ঠতম হলেও তার তুলনায় আবার অন্য কেউ আছে শ্রেষ্ঠতম ৷ কিছু সৃষ্টির কিছু প্রয়োজন সে পূর্ণ করতে পারে ,কিন্তু সবার সমস্ত প্রয়োজন পূর্ণ করার ক্ষমতা কোন সৃষ্টির নেই৷বিপরীত পক্ষে আল্লাহর সামাদ হবার গুণ অর্থাৎ তাঁর মুখাপেক্ষীহীনতার গুণ সবদিক দিয়েই পরিপূর্ণ৷ সারা দুনিয়া তাঁর মুখাপেক্ষী তিনি কারো মুখাপেক্ষী নন৷ দুনিয়ার প্রত্যেকটি জিনিস নিজের অস্তিত্ব স্থায়ীত্ব এবং প্রয়োজন ও অভাব পূরণের জন্য সচেতন ও অবচেতনভাবে তাঁরই শরণাপন্ন হয়৷ তিনিই তাদের সবার প্রয়োজন পূর্ণ করেন ৷ তিনি অমর , অজয়,অক্ষম , তিনি রিযিক দেন - নেন না৷ তিনি একক - যৌগিক ও মিশ্র নন৷ কাজেই বিভক্তি ও বিশ্লেষণযোগ্য নন৷ সমগ্র বিশ্ব - জাহানের ওপর তাঁর নেতৃত্ব ও কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত৷ তিনি সর্বশ্রেষ্ঠ৷ তাই তিনি "সামাদ" নন, এবং "আসসামাদ ৷" অর্থাৎ তিনিই একমাত্র সত্তা যিনি মূলত সামাদ তথা অমুখাপেক্ষিতার গুণাবলীর সাথে পুরোপুরি সংযুক্ত ৷

আবার যেহেতু তিনি " আসসামাদ "তাই তাঁর একাকী ও স্বজনবিহীন হওয়া অপরির্হায৷ কারণ এ ধরনের সত্তা একজনই হতে পারেন ,যিনি কারো কাছে নিজের অভাব পূরণের জন্য হাত পাতেন না ,বরং সবাই নিজেদের অভাব পূরণের জন্য তাঁর মুখাপেক্ষী হয়৷দুই বা তার চেয়ে বেশী সত্তা সবার প্রতি অমুখাপেক্ষী ও অনির্ভরশীল এবং সবার প্রয়োজন পূরণকারী হতে পারে না৷ তাছাড়া তাঁর "আসসামাদ " হবার কারণে তাঁর একক মাবুদ হবার ব্যাপারটিও অপরিহার্য হয়ে পড়ে৷কারণ মানুষ যার মুখাপেক্ষী হয় তারই ইবাদাত করে৷ আবার তিনি ছাড়া আর কোন মাবুদ নেই , " আসসামাদ " হবার কারণে এটাও অপরিহার্য হয়ে পড়ে৷ কারণ , যে প্রয়োজন পূরণ করার ক্ষমতা ও সামর্থই রাখে না , কোন সচেতন ব্যক্তি তার ইবাদাত করতে পারে না৷
৫. মুশরিকরা প্রতি যুগে খোদায়ীর এ ধারণা পোষণ করে এসেছে যে , মানুষের মতো খোদাদের ও একটি জাতি বা শ্রেণী আছে৷ তার সদস্য সংখ্যাও অনেক৷ তাদের মধ্যে বিয়ে - শাদী এবং বংশ বিস্তারের কাজও চলে৷ তারা আল্লাহর রাব্বুল আলামীনকেও এ জাহেলী ধরণা মুক্ত রাখেনি৷ তাঁর জন্য সন্তান- সন্ততিও ঠিক করে নিয়েছে৷ তাই কুরআন মজীদে আরববাসীদের আকীদা বর্ণনা প্রসংগে বলা হয়েছে , তারা ফেরেশতাদেরকে মহান আল্লাহর কন্যা গণ্য করতো৷ তাদের জাহেলী চিন্তা নবীগণের উম্মাতদেরকেও সংরক্ষিত রাখেনি৷ তাদের মধ্যে নিজেদের সৎ ও শ্রেষ্ট ব্যক্তিকে আল্লাহর পুত্র গণ্য করার আকীদা জন্ম নেয়৷ এ বিভিন্ন ধরনের আল্পনিক চিন্তা - বিশ্বাসের মধ্যে দুই ধরনের চিন্তা সবসময় মিশ্রিত হতে থেকেছে৷ কিছু লোক মনে করেছে , যাদেরকে তারা আল্লাহর সন্তান গণ্য করছে তারা সেই মহান পবিত্র সত্তার ঔরসজাত সন্তান৷ আবার কেউ কেউ দাবী করেছে , যাকে তারা আল্লাহর সন্তান বলছে , আল্লাহ তাকে নিজের পালকপুত্র বানিয়েছেন৷ যদিও তাদের কেউ কাউকে ( মাআ'যাল্লাহ ) আল্লাহর পিতা গণ্য করার সাহস করেনি৷ কিন্তু যখন কোন সত্তা সম্পর্কে ধারণা করা হয় যে , তিনি সন্তান উৎপাদন ও বংশ বিস্তারের দায়িত্বমুক্ত নন এবং তাঁর সম্পর্কে ধারণা করা হয় , তিনি মানুষ জাতীয় এক ধরনের অস্তিত্ব , তাঁর ঔরসে সন্তান জন্মলাভ করে এবং অপুত্রক হলে তার কাউকে পালক পুত্র হিসেবে গ্রহণ করার প্রয়োজন দেখা দেয় , তখন মানুষের মন তাঁকেও কারো সন্তান মনে করার ধারণা মুক্ত থাকতে পারে না৷ এ কারণে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে যেসব প্রশ্ন করা হয়েছিল তার মধ্যে একটি প্রশ্ন ছিল , আল্লাহর বংশধারা কি ? দ্বিতীয় প্রশ্নটি ছিল , কার কাছ থেকে তিনি দুনিয়ার উত্তারাধিকার লাভ করেছেন এবং তাঁর পরে এর উত্তরাধিকারী হবে কে ?

এসব জাহেলী মূর্খতা প্রসূত ধারণা কল্পনা বিশ্লেষণ কররে দেখা যায় , এগুলোকে যদি নীতিগতভাবে মেনে নিতে হয় , তাহলে আরো কিছু জিনিসকেও মেনে নেয়া অপরিহার্য হয়ে পড়ে৷ যেমন :

এক : আল্লাহ এক নয় , বরং আল্লাহর কোন একটি জাতি ও গোষ্ঠী আছে ৷ তাদের সদস্যরা আল্লাহর গুণাবলী , কার্যকলাপ ও কর্তৃত্ব - ক্ষমতায় তাঁর সাথে শরীক৷ আল্লাহর কেবলমাত্র ঔরসজাত সন্তান ধারণা করে নিলে এ বিষয়টি অপরিহার্য হয় না , বরং কাউকে পালকপুত্র হিসেবে ধারণা করে নিলেও এটি অপরিহার্য হয়৷ কেননা কারো পালকপুত্র অবশ্যি তারই সমজাতীয় ও সমগোত্রীয়ই হতে পারে৷ আর ( মা' আযাল্লাহ ) যখন সে আল্লাহর সমজাতীয় ও সমগোত্রীয় হয় , তখনই সে আল্লাহর গুণাবরী সম্পন্নও হবে , একথা অস্বীকার করা যেতে পারে না৷

দুই : পুরুষ ও নারীর মিলন ছাড়া কোন সন্তারে ধরণা ও কল্পনাপ করা যেতে পারে না৷ বাপ ও মায়ের শরীর থেকে কোন জিনিস বের হয়ে সন্তানের রূপ লাভ করে ---- সন্তান বলতে একথাই বুঝায়৷ কাজেই এ ক্ষেত্রে আল্লাহর সন্তান ধারণা করার ফলে ( নাউযুবিল্লাহ ) তাঁর একটি বস্তুগত ও শারীরিক অস্তিত্ব , তাঁর সমজাতীয় কোন স্ত্রীর অস্তিত্ব এবং তার শরীর থেকে কোন বস্তু বের হওয়াও অপরিহার্য হয়ে পড়ে৷

তিন : সন্তান উৎপাদন ও বংশধারা চালাবার কথা যেখানে আসে সেখানে এর মূল কারণ হয় এই যে , ব্যক্তিরা হয় মরণশীল এবং তাদের জাতির ও গোষ্ঠীর অস্তিত্ব রক্ষার জন্য তাদের সন্তান উৎপাদন অপরিহার্য হয়ে পড়ে৷ কারণ , এ সন্তানদের সাহায্যেই তাদের বংশধারা অব্যাহত থাকবে এবং সামনের দিকে এগিয়ে যাবে৷ কাজেই আল্লাহর সন্তান আছে বলে মনে করলে ( নাউযুবিল্লাহ ) তিনি নিজে যে মরণশীল এবং তাঁর বংশ ও তাঁর নিজের সত্তা কোনটিই চিরন্তন নয় একথা মেনে নেয়া অপরিহার্য হয়ে পড়ে৷ তাছাড়া সমস্ত মরণশীল ব্যক্তির মতো ( নাউযুবিল্লাহ ) আল্লাহরও কোন শুরু ও শেষ আছে , একথাও মেনে নেয়া অপরিহার্য হয়ে যায়৷ কারণ , সন্তান উৎপাদন ও বংশ বিস্তারের ওপর যেসব জাতি ও গোত্র নির্ভরশীল হয়ে পড়ে , তাদের ব্যক্তিবর্গ অনাদি - অনন্তকালীন জীবনের অধিকারী হয় না৷

চার : কারো পালকপুত্র বলবার উদ্দেশ্য এ হয় যে , একজন সন্তানহীন ব্যক্তি তার নিজের জীবনে কারো সাহায্যের এবং নিজের মৃত্যুর পরা কোন উত্তারাধিকারের প্রয়োজন বোধ করে৷ কাজেই আল্লাহ কাউকে নিজের পুত্র বানিয়েছেন একথা মনে করা হলে সেই পবিত্র সত্তার সাথে এমন সব দুর্বলতা সংশ্লিষ্ট করা অপরিহার্য হয়ে পড়ে , যেগুলো মরণশীল মানুষের মধ্যে পাওয়া যায়৷

যদিও মহান আল্লাহকে " আহাদ" ও "আসসামাদ " বললে এসব উদ্ভট ধারণা - কল্পণার মূলে কুঠারঘাত করা হয় , তবুও এরপর " না তাঁর কোন সন্তান আছে , না তিনি কারো সন্তান " --- একথা বলায় এ ব্যাপারে আর কোন প্রকার সংশয় - সন্দেহের অবকাশই থাকে না৷ তারপর যেহেতু আল্লাহর মহান সত্তা সম্পর্কে এ ধরনের ধারণা- কল্পনা শিরকের সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ কারণগুলোর অন্তরভুক্ত , তাই মহান আল্লাহ শুধুমাত্র সূরা ইখলাসের এগুলোর দ্ব্যর্থহীন ও চূড়ান্ত প্রতিবাদ করেই ক্ষান্ত হননি , বরং বিভিন্ন জায়গায় এ বিষয়টিকে বিভিন্নভাবে বর্ণনা করেছেন ৷ এভাবে লোকেরা সত্যকে পুরোপুরি বুঝতে সক্ষম হবে৷ দৃষ্টান্ত স্বরূপ নীচের আয়াতগুলো পর্যালোচনা করা যেতে পারে :

আরবী-------------------------------------------------------------------------------------------------------------

"আল্লাহ -ই হচ্ছেন একমাত্র ইলাহ৷ কেউ তাঁর পুত্র হবে ,এ অবস্থা থেকে তিনি মুক্ত পাক - পবিত্র ৷ যা কিছু আকাশসমূহের মধ্যে এবং যা কিছু যমীনের মধ্যে আছে, সবই তার মালিকানাধীন ৷" ( আন নিসা ,১৭১ )

আরবী -----------------------------------------------------------------------------

"জেনে রাখো , এরা যে বলছে আল্লাহর সন্তান আছে , এটা এদের নিজেদের মনগড়া কথা ৷ আসলে এটি একটি ডাহা মিথ্যা কথা৷" (আস সাফফাত ,১৫১ - ১৫২ )

আরবী --------------------------------------------------------------------------------------

"তারা আল্লাহ ও ফেরেশতাদের মধ্যে বংশীয় সম্পর্ক তৈরি করে নিয়েছে অথচ ফেরেশতারা ভালো করেই জানে এরা ( অপরাধী হিসেবে ) উপস্থাপিত হবে৷" (আস সাফফাত,১৫৮ )

আরবী --------------------------------------------------------------------------------------

"লোকেরা তাঁর বান্দাদের মধ্য থেকে কাউকে তাঁর অংশ বানিয়ে ফেলেছে৷ আসলে মানুষ স্পষ্ট অকৃতজ্ঞ৷" (আয্‌ যুখরুফ ,১৫ )

আরবী -------------------------------------------------------------------------------------

"আর লোকেরা জিনদেরকে আল্লাহর শরীক বানিয়েছে৷ অথচ তিনি তাদের স্রষ্টা ৷আর তারা না জেনে বুঝে তাঁর জন্য পুত্র- কন্যা বানিয়ে নিয়েছে৷ অথচ তারা যে সমস্ত কথা বলে তা থেকে তিনি মুক্ত ও পবিত্র এবং তার উর্ধে তিনি অবস্থান করছেন৷ তিনি তো আকাশসমূহ ও পৃথিবীর নির্মাতা৷ তাঁর পুত্র কেমন করে হতে পারে যখন তাঁর কোন সঙ্গিনী নেই ? তিনি প্রত্যেকটি জিনিস সৃষ্টি করেছেন ৷" ( আল আনআম , ১০০ - ১০১)

আরবী -----------------------------------------------------------------------

" আর তারা বললো , দয়াময় আল্লাহ কাউকে পুত্র বানিয়েছেন ৷ তিনি পাক - পবিত্র ৷ বরং ( যাদেরকে এরা তাঁর সন্তান বলছে) তারা এমন সব বান্দা যাদেরকে মর্যাদা দান করা হয়েছে৷ " ( আল আম্বিয়া , ২৬ )

আরবী -----------------------------------------------------------------------

" লোকেরা বলে দিয়েছে , আল্লাহ কাউকে পুত্র বানিয়েছেন আল্লাহ পাক - পবিত্র ! তিনি তো অমুখাপেক্ষী ৷ আকাশসমূহে ও পৃথিবীতে যা কিছু আছে সবই তাঁর মালিকানাধীন ৷ এ বক্তব্যের সপক্ষে তোমাদের প্রমাণ কি ? তোমরা কি আল্লাহর সম্পর্কে এমন সব কথা বলছো , যা তোমরা জানো না ? ( ইউনুস , ৬৮ )

আরবী ------------------------------------------------------------------------

" আর হে নবী ! বলে দাও , সেই আল্লাহর জন্য সব প্রশংসা যিনি না কাউকে পুত্র বানিয়েছেন , না বাদশাহীতে কেউ তাঁর শরীক আর না তিনি অক্ষম , যার ফলে কেউ হবে তাঁর পৃষ্টপোষক ৷ (বনী ইসরাঈল, ১১১ )

আরবী -----------------------------------------------------------------------

" আল্লাহ কাউকে পুত্র হিসেবে গ্রহণ করেননি এবং তাঁর সাথে দ্বিতীয় কোন ইলাহও নেই৷ " ( আল মু'মিনূন, ৯১)

যারা আল্লাহর জন্য ঔরসজাত সন্তান অথবা পালকপুত্র গ্রহণ করার কথা বলে , এ আয়াতগুলোতে সর্বতোভাবে তাদের এহেন আকীদা - বিশ্বাসের প্রতিবাদ করা হয়েছে৷ এ আয়াতগুলো এবং এ বিষয়বস্তু সম্বলিত অন্য যে সমস্ত আয়াত কুরআনের বিভিন্ন স্থানে পাওয়া যায় , সেগুলো সূরা ইখলাসের অতি চমৎকার ব্যাখ্যা ৷
৬. মূলে বলা হয়েছে কুফূ ( আরবী --------) এর মানে হচ্ছে , নজীর , সদৃশ , সমান , সমমর্যাদা সম্পন্ন ও সমতুল্য৷ বিয়ের ব্যাপারে আমাদের দেশে কুফূ শব্দের ব্যবহার আছে৷ এ ক্ষেত্রে এর অর্থ হয় , সামাজিক মর্যাদার দিক দিয়ে ছেলের ও মেয়ের সমান পর্যায়ে অবস্থান করা ৷ কাজেই এখানে এ আয়াতের মানে হচ্ছে : সারা বিশ্ব - জাহানের আল্লাহর সমক্ষ অথবা তাঁর সমমর্যাদ সম্পন্ন কিংবা নিজের , কর্ম ও ক্ষমতার ব্যাপারে তাঁর সমান পর্যায়ে উন্নীত হতে পারে এমন কেউ কোন দিন ছিল না এবং কোন দিন হতে ও পারবে না৷