(১১১:১) ভেঙে গেছে আবু লাহাবের হাত এবং ব্যর্থ হয়েছে সে ৷
(১১১:২) তার ধন-সম্পদ এবং যা কিছু সে উপার্জন করেছে তা তার কোন কাজে লাগেনি৷
(১১১:৩) অবশ্যই সেই লেলিহান আগুনে নিক্ষিপ্ত হবে৷
(১১১:৪) এবং ( তার সাথে ) তার স্ত্রীও , লাগানো ভাঙানো চোগলখুরী করে বেড়ানো যার কাজ ,
(১১১:৫) তার গলায় থাকবে খেজুর ডালের আঁশের পাকানো শক্ত রশি৷
১. আবু লাহাবের আসল নাম ছিল আবদুল উযযা ৷ তাকে আবু লাহাব বলে ডাকার কারণ , তার গায়ের রং ছিল উজ্জ্বল সাদা লালে মেশানো৷ লাহাব বলা হয় আগুনের শিখাকে৷ কাজেই আবু লাহাবের মানে হচ্ছে আগুন বরণ মুখ৷ এখানে তার আসল নামের পরিবর্তে ডাক নামে উল্লেখ করার কয়েকটি কারণ রয়েছে৷ এর একটি কারণ হচ্ছে এই যে , মূল নামের পরিবর্তে ডাকনামেই সে বেশী পরিচিত ছিল৷ দ্বিতীয় কারণ , তার আবদুল উযযা ( অর্থাৎ উযযার দাস ) নামটি ছিল একটি মুশরিকী নাম৷ কুরআনে তাকে এ নামে উল্লেখ করা পছন্দ করা হয়নি৷ তৃতীয় কারণ , এ সূরায় তার যে পরিণতি বর্ণনা করা হয়েছে তার সাথে তার এ ডাকনামই বেশী সম্পর্কিত ৷ আরবী ---------------------------------- এর অর্থ কোন কোন তাফসীরকার করেছেন , "ভেঙে যাক আবু লাহাবের হাত " এবং ( আরবী -------) শব্দের মানে করেছেন , " সে ধবংস হয়ে যাক " অথবা " সে ধবংস হয়ে গেছে৷ " কিন্তু আসলে এটা তার প্রতি কোন ধিক্কার নয়৷ বরং এটা একটা ভবিষ্যদ্বাণী৷ এখানে ভবিষ্যতে যে ঘটনাটি ঘটবে তাকে অতীতে কালের অর্থ প্রকাশক শব্দের সাহায্যে বর্ণনা করা হয়েছে৷ এর মানে , তার হওয়াটা যেন এত বেশী নিশ্চিত যেমন তা হয়ে গেছে ৷ আর আসলে শেষ পর্যন্ত তাই হলো যা এ সূরায় কয়েক বছর আগে বর্ণনা করা হয়েছিল৷ হাত ভেঙে যাওয়ার মানে শরীরের একটি অংগ যে হাত সেটি ভেঙে যাওয়া নয়৷ বরং কোন ব্যক্তি যে উদ্দেশ্য সম্পন্ন করার জন্য তার সর্বশক্তি নিয়োগ করেছে তাতে পুরোপুরি ও চূড়ান্তভাবে ব্যর্থ হয়ে যাওয়াই এখানে বুঝানো হয়েছে ৷ আর আবু লাহাব রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দাওয়াতকে ক্ষতিগ্রস্ত করা জন্য যথার্থই নিজের সর্বশক্তি নিয়োগ করেছিল৷ কিন্তু এ সূরাটি নাযিল হবার মাত্র সাত আট বছর পরেই বদরের যুদ্ধ অনুষ্ঠিত হয়৷ এ যুদ্ধে কুরাইশদের অধিকাংশ বড় বড় সরদার নিহত হয়৷ তারা সবাই ইসলাম বিরোধিতা ও ইসলামের প্রতি শত্রুতার ক্ষেত্রে আবু লাহাবের সহযোগী ছিল৷ এ পরাজয়ের খবর মক্কায় পৌঁছার পর সে এত বেশী মর্মাহত হয় যে , এরপর সে সাত দিনের বেশী জীবিত থাকতে পারেনি৷ তার মৃত্যুর ছিল বড়ই ভয়াবহ ও শিক্ষাপ্রদ৷ তার শরীরে সাংঘাতিক ধরনের ফুসকুড়ি (Malignant pustule) দেখা দেয়৷ রোগ সংক্রমণের ভয়ে পরিবারের লোকেরা তাকে ছেড়ে পালিয়ে যায়৷ মরার পরও তিন দিন পর্যন্ত তার ধারে কাছে কেউ ঘেঁসেনি৷ ফলে তার লাশে পচন ধরে৷ চারদিকে র্দুগন্ধ ছড়াতে থাকে ৷ শেষে লোকেরা তার ছেলেদেরকে ধিক্কার দিতে থাকে৷ একটি বর্ণনা অনুসারে তখন তারা মজুরীর বিনিময়ে তার লাশ দাফন করার জন্য কয়েকজন হাবশীকে নিয়োগ করে এবং তারা তার লাশ দাফন করে৷ অন্য এক বর্ণনা অনুসারে , তারা গর্ত খুঁড়ে লম্বা লাঠি দিয়ে তার লাশ তার মধ্যে ফেলে দেয় এবং ওপর থেকে তার ওপর মাটি চাপা দেয়৷ যে দীনের অগ্রগতির পথ রোধ করার জন্য সে তার সর্বশক্তি নিয়োগ করেছিল তার সন্তানদের সেই দীন গ্রহণ করার মধ্য দিয়ে তার আরো বেশী ও পূর্ণ পরাজয় সম্পন্ন হয়৷ সর্বপ্রথম তার মেয়ে দাররা হিজরাত করে মক্কা থেকে মদীনায় চলে যান এবং ইসলাম গ্রহণ করেন৷ আর মক্কা বিজয়ের পর তার দুই ছেলে উতবা ও মু'আত্তাব হযরত আব্বাসের (রা) মধ্যস্থাতায় রসূলুল্লাহর (সা) সামনে হাযির হয়ে ইসলাম গ্রহণ করেন এবং তাঁর হাতে বাইআত করেন৷
২. আবু লাহাব ছিল হাড়কৃপণ ও অর্থলোলুপ৷ ইবনে আসীরর বর্ণনা মতে , জাহেলী যুগে একবার তার বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছিল যে , সে কা 'বা শরীফের কোষাগার থেকে দু'টি সোনার হরিণ চুরি করে নিয়েছে৷ যদিও পরবর্তী পর্যায়ে সেই হরিণ দু'টি অন্য একজনের কাছ থেকে উদ্ধার করা হয় তবুও তার বিরুদ্ধে এ অভিযোগ আনার ফলে তার সম্পর্কে মক্কার লোকদের মনোভাব উপলব্ধি করা যায়৷ তার ধনাঢ্যতা সম্পর্কে কাজী রশীদ ইবনে যুবাইর তাঁর " আযযাখায়ের ওয়াত'তুহাফ " ( আরবী------------------) গ্রন্থে লিখেছেন : কুরাইশদের মধ্যে যে চারজন লোক এক কিনতার ( এক কিনতার = দুশো আওকিয়া আর এক আওকিয়া = সোয়া তিন তোলা কাজেই এক কিনতার সমান ৮০ তোলার সেরের ওজনে ৮ সের ১০ তোলা ) সোনার মালিক ছিল আবু লাহাব তাদের একজন ৷ তার অর্থ লোলুপতা কি পরিমাণ ছিল বদর যুদ্ধের সময়ের ঘটনা থেকে তা আন্দাজ করা যেতে পারে৷ এ যুদ্ধে তার ধর্মের ভাগ্যের ফায়সালা হতে যাচ্ছিল ৷ কুরাইশদের সব সরদার এ যুদ্ধে অংশ নেবার জন্য রওয়ানা হয়৷ কিন্তু আবু লাহাব নিজে না গিয়ে নিজের পক্ষ থেকে আস ইবনে হিশামকে পাঠায়৷ তাকে বলে দেয় , তার কাছে সে যে চার হাজার দিরহাম পায় এ যুদ্ধে অংশগ্রহণ করার কারণে এর বদলে তার সেই ঋণ পরিশোধ হয়েছে বলে ধরে নেয়া হবে৷ এভাবে সে নিজের ঋণ আদায় করার একটা কৌশল বের করে নেয়৷ কারণ আস দেওলিয়া হয়ে গিয়েছিল৷ ঋণ পরিশোধের কোন ক্ষমতাই তার ছিল না৷ কোন কোন তাফসীরকার ( আরবী -------------------------------) শব্দটিকে উপার্জন অর্থে নিয়েছেন৷ অর্থাৎ নিজের অর্থ থেকে সে যে মুনাফা অর্জন করেছে তা তার উপার্জন ৷ আবার অন্য কয়েকজন তাফসীরকার এর অর্থ নিয়েছেন সন্তান- সন্ততি৷ কারণ রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন , সন্তানরা মানুষের উপার্জন ( আবু দাউদ ও ইবনে আবী হাতেম)৷ এ দু'টি অর্থই আবু লাহাবের পরিণতির সাথে সম্পর্কিত৷ কারণ সে মারাত্মক ফুসকুড়ি রোগে আক্রান্ত হলে তার সম্পদ তার কোন কাজে লাগেনি এবং তার সন্তানরা ও তাকে অসহায়ভাবে মৃত্যু বরন করার জন্য ফেলে রেখে দিয়েছিল৷ তার ছেলেরা তার লাশটি মর্যাদা সহকারে কাঁধে উঠাতেও চাইল না৷ এভাবে এ সূরায় আবু লাহাব সম্পর্কে যে ভবিষ্যদ্বাণী করা হয়েছিল মাত্র কয়েক বছরের মধ্যেই তা সত্য হতে দেখলো ৷
৩. আবু লাহাবের স্ত্রীর নাম ছিল " আরদা " ৷ " উম্মে জামীল " ছিল তার ডাক নাম৷ সে ছিল আবু সুফিয়ানের বোন৷ রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে শত্রুতার ব্যাপারে সে তার স্বামী আবু লাহাবের চাইতে কোন অংশে কম ছিল না৷ হযরত আবু বকরের (রা) মেয়ে হযরত আসমা (রা) বর্ণনা করেছেন : এ সূরাটি নাযিল হবার পর উম্মে জামীল যখন এটি শুনলো , সে ক্রোধে ক্ষিপ্ত হয়ে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের খোঁজে বের হলো৷ তার হাতের মুঠোয় পাথর ভরা ছিল রসূলুল্লাহকে (সা) গালাগালি করতে করতে নিজের রচিত কিছু কবিতা পড়ে চলছিল৷ এ অবস্থায় সে কা'বা ঘরে পৌঁছে গেলো৷ সেখানে রসূলুল্লাহ (সা) হযরত আবু বকরের (রা) সাথে বসেছিলেন৷ হযরত আবু বকর বললেন , হে আল্লাহর রসূল ! দেখুন সে আসছে৷ আমার আশংকা হচ্ছে , সে আপনাকে দেখে কিছু অভদ্র আচরণ করবে৷ তিনি বললেন , সে আমাকে দেখতে পাবে না৷ বাস্তবে হলোও তাই৷ তাঁর উপস্থিতি সত্ত্বেও সে তাঁকে দেখতে পেলো না৷ সে আবু বকরকে (রা) জিজ্ঞেস করলো , শুনলাম তোমার সাথী আমার নিন্দা করেছে৷ হযরত আবু বকর (রা) জবাব দিলেন : এ ঘরের রবের কসম , তিনি তো তোমার কোন নিন্দা করেননি৷ একথা শুনে সে ফিরে গেলো --- ( ইবনে আবু হাতেম , সীরাতে ইবন হিশাম ৷ বাযযারও প্রায় একই ধরনের একটি রেওয়ায়াত হযরত আবুদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা) থেকে উদ্ধৃত করেছেন )৷ হযরত আবু বকরের (রা) এ জবাবের অর্থ ছিল , নিন্দা তো আল্লাহ করেছেন রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম করেননি৷
৪. মূল শব্দ হচ্ছে ( আবরী ---------------) এর শাব্দিক অর্থ হচ্ছে , " কাঠ বহনকারিনী ৷" মুফাসসিরগণ এর বহু বর্ণনা করেছেন৷ হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা) ইবনে যায়েদ , যাহহাক ও রাবী ইবনে আনাস বলেন : সে রাতের বেলা কাঁটা গাছের ডালপালা এনে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দরজায় ফেলে রাখতো৷ তাই তাকে কাঠ বহনকারিনী বলা হয়েছে৷ কাতাদাহ , ইকরামা , হাসান বরসী , মুজাহিদ ও সুফিয়ান সওরী বলেন : সে লোকদের মধ্যে ফিতনা ফাসাদ সৃষ্টি করার জন্য চোগলখুরী করে বেড়াতো৷ তাই আরবী প্রবাদ অনুযায়ী তাকে কাঠ বহনকারিনী বলা হয়েছে৷ কারণ যারা এর কথা ওর কাছে বলে এবং লাগানো ভাঙানোর কাজ করে ফিতনা - ফাসাদের আগুন জ্বালাবার চেষ্টা করে আরবরা তাদেরকে কাঠ বহনকারিনী বলে থাকে৷ এ প্রবাদ অনুযায়ী " হাম্মালাতাল হাতাব " শব্দের সঠিক অনুবাদ হচ্ছে , " যে লাগানো ভাঙানোর কাজ করে ৷" সাঈদ ইবনে জুবাইর বলেন : যে ব্যক্তি নিজের পিঠে গোনাহের বোঝা বহন করে আরবী প্রবাদ অনুসারে তার সম্পর্কে বলা হয় , (আরবী ---------------------------------) ( অর্থাৎ অমুক ব্যক্তি নিজের পিঠে কাঠ বহন করছে)৷ কাজেই হাম্মালাতাল হাতাব ( আবরী -----) মানে হচ্ছে , " গোনাহের বোঝা বহনকারিনী ৷" মুফাসসিরগণ এর আরো একটি অর্থও বর্ণনা করেছেন৷ সেটি হচ্ছে , আখেরাতে তার এ অবস্থা হবে৷ অর্থাৎ সেখানে যে আগুনে আবু লাহাব পুড়তে থাকবে তাতে সে ( উম্মে জামীল) কাঠ বহন করে এনে ফেলতে থাকবে৷
৫. তার গলার জন্য জীদ ( আরবী -----) শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে৷ আরবী ভাষায় যে গলায় অলংকার পরানো হয়েছে তাকে জীদ বলা হয়৷ সাঈদ ইবনুল মুসাইয়েব , হাসান বসরী ও কাতাদা বলেন : এ হার বিক্রি করে আমি এর মূল্য বাবদ পাওয়া সমস্ত অর্থ মুহাম্মাদের ( সা) বিরুদ্ধে শত্রুতামূলক কাজ করার জন্য ব্যয় করবো৷ এ কারণে জীদ শব্দটি এখানে ব্যবহার করা হয়েছে ব্যঙ্গার্থে৷ অর্থাৎ এ অলংকার পরিহিত সুসজ্জিত গলায় , যেখানে পরিহিত হার নিয়ে সে গর্ব করে বেড়ায় , কিয়ামতের দিন সেখানে রশি বাঁধা হবে৷ এটা ঠিক সমপর্যায়েরই ব্যাঙ্গাত্মক বক্তব্য যেমন কুরআনের বিভিন্ন স্থানে বলা হযেছে : ( আরবী -----------) " তাদেরকে যন্ত্রনাদায়ক আযাবের সুসংবাদ দাও৷" তার গলায় বাঁধা রশিটির জন্য ( আরবী --------) শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে৷ অর্থাৎ সে রশিটি হবে ' মাসাদ ' ধরনের ৷ অভিধানবিদ ও মুফাসসিরগণ এ শব্দটির বহু অর্থ বর্ণনা করেছেন৷ এ সম্পর্কিত একটি বক্তব্য হচ্ছে , খুব মজবুত করে পাকানো রশিকে মাসাদ বলা হয়৷ দ্বিতীয় বক্তব্য হচ্ছে , খেজুর গাছের ( ডালের ) ছাল থেকে তৈরি রশি মাসাদ নামে পরিচিত৷ এ সম্পর্কে তৃতীয় বক্তব্য হচ্ছে , এর মানে খেজুরের ডালের গোড়ার দিকের মোটা অংশ থেঁতলে যে সরু আঁশ পাওয়া যায় তা দিয়ে পাকানো রশি অথবা উটের চামড়া বা পশম দিয়ে তৈরি রশি৷ আর একটি বক্তব্য হচ্ছে , এর অর্থ লোহার তারের পাকানো রশি৷