(১১০:১) যখন আল্লাহর সাহায্য এসে যায় এবং বিজয় লাভ হয়
(১১০:২) আর ( হে নবী ! ) তুমি (যদি দেখ যে লোকেরা দলে দলে আল্লাহর দীন গ্রহণ করছে
(১১০:৩) তখন তুমি তোমার রবের হামদ সহকারে তাঁর তাসবীহ পড়ো এবং তাঁর কাছে মাগফিরাত চাও৷ অবশ্যি তিনি বড়ই তাওবা কবুলকারী৷
১. বিজয় মানে কোন একটি যুদ্ধ বিজয় নয়৷ বরং এর মানে হচ্ছে এমন একটি চূড়ান্ত বিজয় যার পরে ইসলামের সাথে সংঘর্ষ করার মতো আর কোন শক্তির অস্তিত্ব দেশের বুকে থাকবে না এবং একথাও সুস্পষ্ট হয়ে যাবে যে , বর্তমানে আরবে এ দীনটিই প্রাধান্য বিস্তার করবে৷ কোন কোন মুফাসসির এখানে বিজয় মানে করেছেন মক্কা বিজয় ৷ কিন্তু মক্কা বিজয় হয়েছে ৮ হিজরীতে এবং এ সূরাটি নাযিল হয়েছে ১০ হিজরীর শেষের দিকে৷ ভূমিকায় আমি হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা) ও হযরত সারাআ বিনতে নাবহানের (রা) যে হদীস বর্ণনা করেছি তা থেকে একথাই জানা যায়৷ এ ছাড়াও হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা) যে একে কুরআন মজীদের সর্বশেষ সূরা বলেছেন , তাঁর এ বক্তব্যেও এ তাফসীরের (রা) বিরুদ্ধে চলে যায়৷ কারণ বিজয়ের মানে যদি মক্কা বিজয় হয় তাহলে সমগ্র সূরা তাওবা মক্কা বিজয়ের পর নাযিল হয়৷ তাহলে আন নসর কেমন করে শেষ সূরা হতে পারে ? নিসন্দেহে মক্কা বিজয় এ দিক দিয়ে চূড়ান্ত বিজয় ছিল যে , তারপর আরবের মুশরিকদের সাহস ও হিম্মত নিস্তেজ হয়ে পড়েছিল ৷ কিন্তু এরপরও তাদের মধ্যে যথেষ্ট শক্তি - সামর্থ ছিল৷ এরপরই অনুষ্ঠিত হয়েছিল তায়েফ ও হুনায়েনের যুদ্ধ ৷ আরবে ইসলামের পূর্ণাংগ প্রাধান্য প্রতিষ্ঠিত হতে আরো প্রায় দু'বছর সময় লেগেছিল৷
২. অর্থাৎ লোকদের একজন দু'জন করে ইসলাম গ্রহণ করার যুগ শেষ হয় যাবে ৷ তখন এমন এক যুগের সূচনা হবে যখন একটি গোত্রের সবাই এবং এক একটি বড় বড় এলাকার সমস্ত অধিবাসী কোন প্রকার যুদ্ধ - বিগ্রহ ও চাপ প্রয়োগ ছাড়াই স্বতষ্ফূর্তভাবে মুসলমান হয়ে যেতে থাকবে৷ নবম হিজরীর শুরু থেকে এ অবস্থার সূচনা হয়৷ এ কারণে এ বছরটিকে বলা হয় প্রতিনিধিদলের বছর ৷ এ বছর আরবের বিভিন্ন এলাকা থেকে একের পর এক প্রতিনিধি দল রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামে কাছে আসতে থাকে৷ তারা ইসলাম কবুল করে তাঁর মুবারক হাতে বাই'আত গ্রহণ করতে থাকে৷ এমনকি দশম হিজরীতে যখন তিনি বিদায় হজ্জ করার জন্য মক্কায় যান তখান সমগ্র আরব ভূমি ইসলামের ছাড়াতলে আশ্রয় নিয়েছিল এবং সারাদেশে কোথাও একজন মুশরিক ছিল না৷
৩. হামদ মানে মহান আল্লাহর প্রশংসা ও গুণগান করা এবং তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করাও ৷ আর তাসবীহ মানে আল্লাহকে পাক - পবিত্র ও পরিচ্ছন্ন এবং দোষ- ত্রুটিমুক্ত গণ্য করা৷ এ প্রসংগে বলা হয়েছে , যখন তুমি তোমার রবের কুদরতের এ অভিব্যক্তি দেখবে তখন তাঁর হামদ সহকারে তাঁর তাসবীহ পাঠ করবে৷ এখানে হামদ বলে একথা বুঝানো হয়েছে যে , এ মহান ও বিরাট সাফল্য সম্পর্কে তোমার মনে যেন কোন সময় নিন্দুমাত্রও ধারণা না জন্মায় যে , এসব তোমার নিজের কৃতিত্বের ফল৷ বরং একে পুরোপুরি ও সরাসরি মহান আল্লাহর অনুগ্রহ ও মেহেরবানী মনে করবে ৷ এ জন্যে তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করবে৷ মনে ও মুখে একথা স্বীকার করবে যে , এ সাফল্যের জন্য সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর প্রাপ্য৷ আর তাসবীহ মানে হচ্ছে , আল্লাহর কালেমা বুলন্দ হওয়ার বিষয়টি তোমার প্রচেষ্টা ও সাধনার ওপর নির্ভরশীল ছিল ---- এ ধরনের ধারণা থেকে তাঁকে পাক ও মুক্ত গণ্য করবে৷ বিপরীত পক্ষে তোমার মন এ দৃঢ় বিশ্বাসে পরিপূর্ণ থাকবে যে , তোমার প্রচেষ্টা ও সাধনার সাফল্য আল্লাহর সাহায্য ও সমর্থনের ওপর নির্ভরশীল ছিল৷ তিনি তাঁর যে বান্দার থেকে চান কাজ নিতে পারতেন৷ তবে তিনি তোমার খিদমত নিয়েছেন এবং তোমার সাহায্যে তাঁর দীনের ঝাণ্ডা বুলন্দ করেছেন , এটা তাঁর অনুগ্রহ ৷ এছাড়া তাসবীহ অর্থাৎ সুবহানাল্লাহ পড়ার মধ্যে বিস্ময়ের ও একটি দিক রয়েছে ৷ কোন বিস্ময়কর ঘটনা ঘটলে মানুষ সুবহানাল্লাহ বলে৷ এর অর্থ হয় , আল্লাহর অসীম কুদরতে এহেন বিস্ময়কর ঘটনা ঘটেছে৷ নয়তো এমন বিস্ময়কর ঘটনা ঘটাবার ক্ষমতা দুনিয়ার কোন শক্তির ছিল না৷
৪. অর্থাৎ তোমার রবের কাছে দোয়া করো৷ তিনি তোমাকে যে কাজ করার দায়িত্ব দিয়েছিলেন তা করতে গিয়ে তোমার যে ভুল - ত্রুটি হয়েছে তা যেন তিনি মাফ করে দেন৷ ইসলাম বান্দাকে এ আদব শিষ্টাচার শিখিয়েছে৷ কোন মানুষের দ্বারা আল্লাহর দীনের যতবড় খিদমতই সম্পন্ন হোক না কেন , তাঁর পথে সে যতই ত্যাগ স্বীকার করুক না এবং তাঁর ইবাদাত ও বন্দেগী করার ব্যাপারে যতই প্রচেষ্টা ও সাধনা চালাক না কেন , তার মনে কখনো এ ধরনের চিন্তার উদয় হওয়া উচিত নয় যে , তার ওপর তার রবের যে হক ছিল তা সে পুরোপুরি আদায় করে দিয়েছে৷ বরং সবসময় তার মনে করা উচিত যে তার হক আদায় করার ব্যাপারে যেসব দোষ - ত্রুটি সে করেছে তা মাফ করে দিয়ে যেন তিনি তার এ নগণ্য খেদমত কবুল করে নেন৷ এ আদব ও শিষ্টাচার শেখানো হয়েছে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে ৷ অথচ তাঁর চেয়ে বেশী আল্লাহর পথে প্রচেষ্টা ও সাধনাকারী আর কোন মানুষের কথা কল্পনাই করা যেতে পারে না৷ তাহলে এ ক্ষেত্রে অন্য কোন মানুষের পক্ষে তার নিজের আমলকে বড় মনে করার অবকাশ কোথায় ? আল্লাহর যে অধিকার তার ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল তা সে আদায় করে দিয়েছে এ অহংকার মত্ত হওয়ার কোন সুযোগই কি তার থাকে ? কোন সৃষ্টি আল্লাহর হক আদায় করতে সক্ষম হবে , এ ক্ষমতাই তার নেই৷ মহান আল্লাহর এ ফরমান মুসলমানদের এ শিক্ষা দিয়ে আসছে যে , নিজের কোন ইবাদাত , আধ্যাত্মিক সাধনা ও দীনি খেদমতকে বড় জিনিস মনে না করে নিজের সমগ্র প্রাণশক্তি আল্লাহর পথে নিয়োজিত ও ব্যয় করার পরও আল্লাহর হক আদায় হয়নি বলে মনে করা উচিত ৷ এভাবে যখনই তারা কোন বিজয় লাভে সমর্থ হবে তখনই এ বিজয়কে নিজেদের কোন কৃতিত্বের নয় বরং মহান আল্লাহর অনুগ্রহের ফল মনে করবে৷ এ জন্য গর্ব ও অহংকারে মত্ত না হয়ে নিজেদের রবের সামনে দীনতার সাথে মাথা নত করে হামদ , সানা ও তাসবীহ পড়তে এবং তাওবা ও ইসতিগফার করতে থাকবে৷