(১০৮:১) ( হে নবী ! ) আমি তোমাকে কাউসার দান করেছি৷
(১০৮:২) কাজেই তুমি নিজের রবেরই জন্য নামায পড়ো ও কুরবানী করো৷
(১০৮:৩) তোমার দুশমনই শিকড় কাটা৷
১. কাউসার শব্দটি এখানে যেভাবে ব্যবহৃত হয়েছে তাতে আমাদের ভাষায় তো দূরের কথা দুনিয়ার কোন ভাষায়ও এক শব্দে এর পূর্ণ অর্থ প্রকাশ করা সম্ভব নয়৷ এ শব্দটি মূলে কাসরাত ( আরবী ) থেকে বিপুল ও অত্যধিক পরিমাণ বুঝবার অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে৷ এর আভিধানিক অর্থ হচ্ছে , সীমাহীন আধিক্য৷ কিন্তু যে অবস্থায় ও পরিবেশে শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে ৷ তাতে শুধুমাত্র আধিক্য নয় বরং কল্যাণ ও নিয়মতের আধিক্য এবং এমন ধরনের আধিক্যের ধারণা পাওয়া যায় যা বাহুল্য ও প্রাচুর্যের সীমান্তে পৌঁছে গেছে? আর এর অর্থ কোন একটি কল্যাণ বা নিয়ামত নয় বরং অসংখ্য কল্যাণ ও নিয়ামতের আধিক্য৷ ভূমিকায় আমি এ সূরার যে প্রেক্ষাপট বর্ণনা করেছি তার ওপর আর একবার দৃষ্টি বুলানো প্রয়োজন৷ তখন এক ভয়াবহ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছিল৷ শত্রুরা মনে করছিল , মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সবদিক দিয়ে ধ্বংস হয়ে গেছেন৷ জাতি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে বন্ধু - বান্ধব ও সহায় - সম্বলহীন হয়ে পড়েছেন৷ ব্যবসা ধ্বংস হয়ে গেছে৷ বংশে বাতি জ্বালাবার জন্য যে ছেলে সন্তান ছিল , সেও মারা গেছে৷ আবার তিনি এমন দাওয়াত নিয়ে ময়দানে নেমেছেন যার ফলে হাতে গোনা কয়েকজন ছাড়া মক্কা তো দূরের কথা সারা আরব দেশের কোন একটি লোকও তাঁর কথায় কান দিতে প্রস্তুত নয়৷ কাজেই তাঁর ভাগ্যের লিখন হচ্ছে জীবিত অবস্থায় ব্যর্থতা এবং মারা যাবার পরে দুনিয়ায় তাঁর নাম উচ্চারণ করার মতো একজন লোকও থাকবে না৷ এ অবস্থায় আল্লাহর পক্ষ থেকে যখন বলা হলো , তোমাকে কাওসার দান করেছি তখন স্বাভাবিকভাবে এর মানে দাঁড়ালো : তোমার শত্রুপক্ষীর নির্বোধরা মনে করছে তুমি ধ্বংস হয়ে গেছো এবং নবুওয়াত লাভের পূর্বে তুমি যে নিয়ামত অর্জন করেছিলে তা তোমার কাছ থেকে ছিনিয়ে নেয়া হয়েছে৷ কিন্তু প্রকৃত পক্ষে আমি তোমাকে সীমাহীন কল্যাণ ও অসংখ্য নিয়ামত দান করেছি৷ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে যে নজিরবিহীন উন্নত নৈতিক গুণাবলী দান করা হয়েছিল সেগুলো ও এর অন্তরভুক্ত৷ তাঁকে যে নবুওয়াত , কুরআন এবং জ্ঞান ও তা প্রয়োগ করার মতো বুদ্ধিবৃত্তির নিয়মত দান করা হয়েছিল তাও এর মধ্যে শামিল৷ তাওহীদ ও এমন ধরনের একটি জীবন ব্যবস্থার নিয়ামত এর অন্তরভুক্ত যার সহজ , সরল , সহজবোধ্য বুদ্ধি ও প্রকৃতির অনুসারী এবং পূর্ণাঙ্গ ও সার্বজনীন মূলনীতি সমগ্র বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ার এবং হামেশা ছড়িয়ে পড়তে থাকার ক্ষমতা রাখে৷ রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আলোচনা ব্যাপকতর করার নিয়ামতও এর অন্তরভুক্ত যার বদৌলতে তাঁর নাম চৌদ্দশো বছর থেকে দুনিয়ার সর্বত্র বুলন্দ হচ্ছে এবং কিয়ামত পর্যন্ত বুলন্দ হতে হতে থাকবে৷ তাঁর আহবানে অবশেষে এমন একটি বিশ্বব্যাপী উম্মাতের উম্ভব হয়েছে , যারা দুনিয়ায় চিরকালের জন্য আল্লাহর সত্য দীনের ধারক হয়েছে , যাদের চাইতে বেশী সৎ নিষ্কলুশ ও উন্নত চরিত্রের মানুষ দুনিয়ার কোন উম্মাতের মধ্যে কখনো জন্ম লাভ করেনি এবং বিকৃতির অবস্থায় পৌঁছে ও যারা নিজেদের মধ্যে দুনিয়ার সব জাতির চাইতেও বেশী কল্যাণ ও নেকীর গুণাবলী বহন করে চলছে৷ এ নিয়ামতটিও এর অন্তরভুক্ত ৷

রসূল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর নিজের চোখে নিজের জীবদ্দশায় নিজের দাওয়াতকে সাফল্যের স্বর্ণশিখরে উঠতে দেখেছেন এবং তাঁর হাতে এমন জামায়াত তৈরি হয়েছে যারা সারা দুনিয়ার ওপর ছেড়ে যাবার ক্ষতা রাখতো , এ নিয়ামতটিও এর অন্তরভুক্ত৷ ছেলে সন্তান থেকে বঞ্চিত হবার পর শত্রুরা মনে করতো তাঁর নাম - নিশানা দুনিয়া থেকে মিটে যাবে৷ কিন্তু আল্লাহ শুধু মুসলমানদের আকারে তাঁকে এমন ধরনের আধ্যাত্মিক সন্তান দিয়েই ক্ষান্ত হননি যারা কিয়ামত পর্যন্ত সারা দুনিয়ায় তাঁর নাম বুলন্দ করতে থাকবে বরং তাঁকে শুধুমাত্র একটি কন্যা হযরত ফাতেমার মাধ্যমে এত বিপুল পরিমাণ রক্তমাংসের সন্তান দান করেছেন যারা সারা দুনিয়ায় ছড়িয়ে পড়েছে এবং মহান নবীর সাথে সম্পর্কই যাদের সবচেয়ে বড় অহংকার৷ এটিও এ নিয়মাতের অন্তরভুক্ত৷

নিয়ামতগুলো আল্লাহ তাঁর নবীকে এ মরজগতেই দান করেছেন৷ কত বিপুল পরিমাণে দান করেছেন তা লোকেরা দেখেছে৷ এগুলো ছাড়াও কাউসার বলতে আরো দু'টো মহান ও বিশাল নিয়ামত বুঝানো হয়েছে , যা আল্লাহ তাঁকে আখেরাতে দান করবেন৷ সেগুলো সম্পর্কে জানার কোন মাধ্যম আমাদের কাছে ছিল না৷ তাই রসূলল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদের সেগুলো সম্পর্কে জানিয়েছেন৷ তিনি বলেছেন : কাউসার বলতে দু'টি জিনিস বুঝানো হয়েছে৷ একটি হচ্ছে " হাউজে কাউসার " এটি কিয়ামতের ময়দানে তাঁকে দান করা হবে৷ আর দ্বিতীয়টি " কাউসার ঝরণাধারা৷ " এটি জান্নাতে তাঁকে দান করা হবে৷ এ দু'টির ব্যাপারে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে এত বেশী হাদীস বর্ণিত হয়েছে এবং এত বিপুল সংখ্যক রাবী এ হাদীসগুলো বর্ণনা করেছেন যার ফলে এগুলোর নির্ভুল হবার ব্যাপারে সামান্যতম সন্দেহের ও অবকাশ নেই৷

হাউজে কাউসার সম্পর্কে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিম্নরূপ তথ্য পরিবেশন করেছেন :

এক : এ হাউজটি কিয়ামতের দিন তাঁকে দেয়া হবে৷ এমন এক কঠিন সময়ে এটি তাঁকে দেয়া হবে যখন সবাই " আল আতশ " ' আল আতশ ' অর্থাৎ পিপাসা , পিপাসা বলে চিৎকার করতে থাকবে সে সময় তাঁর উম্মত তাঁর কাছে এ হাউজের চারদিকে সমবেত হবে এবং এর পানি পান করবে৷ তিনি সবার আগে সেখানে পৌঁছবেন এবং তার মাঝ বরাবর জায়গায় বসে থাকবেন৷ তাঁর উক্তি :

আরবী ----------------------------------------------------------------------

"সেটি একটি হাউজ ৷ আমার উম্মাত কিয়ামতের দিন তার কাছে থাকবে ৷ " ( মুসলিম , কিতাবুস সারাত এবং আবু দাউদ , কিতাবুস সুন্নাহ )

(আবরী ------------------------------------------) " আমি তোমাদের সবার আগে সেখানে পৌঁছে যাবো৷ " ( বুখারী , কিতাবুর রিকাক ও কিতাবুল ফিতান , মুসলিম , কিতাবুল ফাযায়েল ও কিতাবুল তাহারাত , ইবনে মাজাহ , কিতাবুল মানাসিক ও কিতাবুয যুহদ এবং মুসনাদে আহমাদ , আবুদুল্লাহ ইবনে মাসউদ(রা), আবুদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা) ও আবু হুরাইরা (রা) বর্ণিত রেওয়ায়াতসমূহ)৷

আরবী ----------------------------------------------------------------------------

" আমি তোমাদের আগে পৌঁছে যাবো , তোমাদের জন্য সাক্ষ দেবো এবং আল্লাহর কসম , আমি এ মুহূর্তে আমার হাউজ দেখতে পাচ্ছি৷ ( বুখারী , কিতাবুল জানায়েয , কিতাবুল মাগাযী ও কিতাবুর রিকাক)৷

আনসারদেরকে সম্বোধন করে একবার তিনি বলেন :

আরবী ----------------------------------------------------------------------------

" আমার পরে তোমরা স্বার্থবাদিতা ও স্বজনপ্রীতির পাল্লায় পড়বে৷ তখন তার ওপর সবর কর‌বে , আমার সাথে হাউজে কাউসারে এসে মিলিত হওয়া পর্যন্ত ৷ " ( বুখারী , কিতাবু মানাকিবিল আনসার ও কিতাবুল মাগাযী , মুসলিম , কিতাবুল আমারাহ এবং তিরমিযী কিতাবুল ফিতান৷)

আরবী -----------------------------------------------------------------------

" কিয়ামতের দিন হাউজের মাঝ বরাবর থাকবো৷ " ( মুসলিম কিতাবুল ফাজায়েল ) হযরত আবু বারযাহ আসলামীকে (রা) জিজ্ঞেস করা হলো , আপনি কি হাউজ সম্পর্কে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে কিছু শুনেছেন৷ তিনি বলেন , " একবার নয় , দু'বার নয় , তিনবার নয় , চারবার নয় , পাঁচবার নয় , বারবার শুনেছি ৷ যে ব্যক্তি একে মিথ্যা বলবে আল্লাহ তাকে যেন তার পানি পান না করান ৷ " (আবু দাউদ , কিতাবুস সুন্নাহ )৷ উবাইদুল্লাহ ইবনে যিয়াদ হাউজ সম্পর্কিত রেওয়ায়াত মিথ্যা মনে করতো৷ এমন কি সে হযরত আবু বারযাহ আসলামী (রা), বারাআ ইবনে আযেব (রা) ও আয়েদ ইবনে আমর (রা) বর্ণিত রেওয়ায়াতগুলো অস্বীকার করলো৷ শেষে আবু সাবরাহ একটি লিপি বের করে আনলেন৷ এ লিপিটি তিনি হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনুল আসের (রা) মুখে শুনে লিখে রেখেছিলেন ৷ তাতে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের এ বাণী লেখা ছিল : আরবী ------------------------------------- " জেনে রাখো , আমার ও তোমাদের সাক্ষাতের স্থান হচ্ছে আমার হাউজ৷ " ( মুসনাদে আহমাদ , আবদুল্লাহ ইবনে আমার ইবনুল আসের রেওয়ায়াতসমূহ )৷

দুই : এ হাউজের আয়তন সম্পর্কে বিভিন্ন হাদীসে বিভিন্ন প্রকার বর্ণনা এসেছে৷ তবে অধিকাংশ রেওয়ায়াতে বলা হয়েছে : এটি আইলা ( ইসরাঈলের বর্তমান বন্দর আইলাত ) থেকে ইয়ামনের সান 'আ পর্যন্ত অথবা আইল থেকে এডন পর্যন্ত কিংবা আম্মান থেকে এডেন পর্যন্ত দীর্ঘ হবে৷ আর এটি চওড়া হবে আইলা থেকে হুজকাহ ( জেদ্দা ও রাবেগের মাঝখানে একটি স্থান ) পর্যন্ত জায়গায় সমপরিমাণ ৷ বুখারী , কিতাবুর রিকাক , আবু দাউদ তায়ালাসী ৯৯৫ হাদীস , মুসনাদে আহমাদ , আবু বকর সিদ্দীক ও আবুদল্লাহ ইবনে ওপর বর্ণিত রেওয়ায়াতসমূহ , মুসলিম - কিতাবুত তাহারাত ও কিতাবুল ফাজায়েল , তিরমিযি ---- আবওয়াবু সিফাতিল কিয়ামহ এবং ইবনে মাজাহ - কিতাবুয যুহুদ ৷) এ থেকে অনুমান করা যায় , বর্তমান লোহিত সাগরটিকেই কিয়ামতের দিন হাউজে কাউসারে পরিবর্তিত করে দেয়া হবে৷ তবে আসল ব্যাপার একমাত্র আল্লাহই ভালো জানে৷

তিন : এ হাউজটি সম্পর্কে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন , জান্নাতের কাউসার ঝরণাধারা (সামনে এ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে৷ ) থেকে পানি এনে এতে ঢালা হবে৷ একটি হাদীসে বলা হয়েছে : আরবী ---------------------------------------------------------এবং অন্য একটি হাদীসে বলা হয়েছে : আরবী ------------------------------------------------অর্থাৎ জান্নাতে থেকে দু'টি খাল কেটে এনে তাতে ফেলা হবে এবং এর সাহায্যে থেকে তাতে পানি সরবরাহ হবে৷ (মুসলিম কিতাবুল ফাজায়েল ) অন্য একটি হাদীসে বলা হয়েছে : আরবী -------------- অর্থাৎ জান্নাতের কাওসার ঝরণাধারা থেকে একটি নহর এ হাউজের দিকে খুলে দেয়া হবে এবং তার সাহায্যে এতে পানি সরবরাহ জারী থাকবে ( মুসনাদে আহমাদ , আবুদুল্লাহ ইবনে মাসউদ বর্ণিত রেওয়ায়াতসমূহ )

চার : হাউজে কাউসারের অবস্থা সম্পর্কে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বরেছেন যে , তার পানি হবে দুধের চাইতে ( কোন কোন রেওয়ায়াত অনুযায়ী রূপার চাইতে আবার কোন কোন রেয়ায়াত অনুযায়ী বরফের চাইতে ) বেশী সাদা ,বরফের চাইতে বেশী ঠাণ্ডা এবং মধুর চাইতে বেশী মিষ্টি৷ তার তলদেশের মাটি হবে মিশকের চাইতে বেশী সুগন্ধিযুক্ত৷ আকাশে যত তারা আছে ততটি সোরাহী তার পাশে রাখা থাকবে৷ তার পানি একবার পান করার পর দ্বিতীয়বার কারো পিপাসা লাগবে না৷ আর তার পানি যে একবার পান করেনি তার পিপাসা কোনদিন মিটবে না৷ সামান্য শাব্দিক হেরফেরসহ একথাগুলোই অসংখ্য হাদীসে উদ্ধৃত হয়েছে৷ (বুখারী কিতাবুর রিকাক , মুসলিম - কিতাবুত তাহারাত ও কিতাবুল ফাজায়েল , মুসনাদে আহমাদ - ইবনে মাসউদ ইবনে উমর ও আবদুল্লাহ উবনে আমর ইবনুল ' আস বর্ণিত রেওয়ায়াত সমূহ , তিরমিযী আবওয়াবু সিফাতিল কিয়ামহ , ইবনে মাজাহ কিতাবুয যুহোদ এবং আবু দাউদ আত তায়ালাসী , ৯৯৫ ও ২১৩৫ হাদীস৷

পাঁচ : রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বরবার তাঁর সময়ের লোকদের সতর্ক করে দিয়ে বরেছেন , আমার পরে তোমাদের মধ্য থেকে যারাই আমার তরিকা পদ্ধতি পরিবর্তন করবে তাদেরকে এ হাউজের কাছ থেকে হটিয়ে দেয়া হবে এবং এর পানির কাছে তাদের আসতে দেয়া হবে না৷ আমি বলবো , এরা আমার লোক ৷ জবাবে আমাকে বলা হবে , আপনি জানেন না আপনার পরে এরা কি করেছে৷ ৷ তখন আমি ও তাদেরকে তাড়িয়ে দেবো৷ আমি বলবো , দূর হয়ে যাও৷ এ বক্তব্যটি অসংখ্য হাদীসে উল্লেখিত হয়েছে৷ ( বুখারী - কিতাবুল ফিতান ও কিতাবুর রিকাক , মুসলিম কিতাবুত তাহারাত ও কিতাবুল ফাজায়েল , মুসনাদে আহমাদ - ইবনে মাসউদ ও আবু হুরাইরা বর্ণিত হাদীসমূহ , ইবনে মাজাহ -- কিতাবুল মানাসিক৷) ইবনে মাজাহ এ ব্যাপারে যে হাদীস উদ্ধৃত করেছেন তার শব্দগুলো বড়ই হৃদয়স্পর্শী ৷ তাতে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন :

আরবী -------------------------------------------------------------------------------------

" সাবধান হয়ে যাও ! আমি তোমাদের আগে হাউজে উপস্থিত থাকবো ৷ তোমাদের মাধ্যমে অন্য উম্মাতদের মোকাবিলায় আমি নিজের উম্মাতের বিপুল সংখ্যাক জন্য গর্ব করতে থাকবো৷ সে সময় আমার মুখে কালিমা লেপন করো না৷ সাবধান হয়ে যাও ! কিছু লোককে আমি ছাড়িয়ে নেবো আর কিছু লোককে আমার কাছ থেকে ছাড়িয়ে নেয়া হবে৷

আমি বলব হে আমার রব ! এরা তো আমার সাহাবী৷ তিনি বলবেন , তুমি জানো না তোমার পরে এরা কী অভিনব কাজ কারবার করেছে ৷ " ইবনে মাজার বক্তব্য হচ্ছে , এ শব্দগুলো রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর আরাফাত ময়দানের ভাষণে বলেছিলেন ৷

ছয় : এভাবে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর পর থেকে নিয়ে কিয়ামত পর্যন্ত সময় কালের সমগ্র মুসলিম মিল্লাতকে সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন : তোমাদের মধ্য থেকে যারাই আমার পথ থেকে সরে গিয়ে অন্য পথে চলবে এবং তার মধ্যে রদবদল করবে তাদেরকে এ হাউজের কাছ থেকে সরিয়ে দেয়া হবে৷ আমি বলবো : হে আমার রব ! এরা তো আমার উম্মাতের লোক৷ জবাবে বলা হবে : আপনি জানেন না , আপনার পরে এরা কি কি পরিবর্তন করেছিল এবং আপনার পথের উল্টোদিকে চলে গিয়েছিল৷ তখন আমি ও তাদেরকে দূর করে দেবো৷ এবং তাদেরকে হাউজের ধারে কাছে ঘেঁসতে দেবো না৷ হাদীস গ্রন্থগুলোতে এ বিষয়বস্তু সম্বলিত অসংখ্য হাদীস উল্লেখিত হয়েছে৷ ( বুখারী -- কিতাবুল মুসাকাত , কিতাবুর রিকাক ও কিতাবুল ফিতান , মুসলিম - কিতাবুত তাহারাত , কিতাবুস সালাত ও কিতাবুল ফাজায়েল , ইবনে মাজাহ - কিতাবুয যুহুদ , মুসনাদে আহামদ-আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস বর্ণিত হাদীসসমূহ)৷

পঞ্চাশ জনের ও বেশী সাহাবী এ হাউজ সংক্রান্ত হাদীসগুলো বর্ণনা করেছেন৷ প্রথম যুগের আলেমগণ সাধারণভাবে এটিকে হাউজে কাউসার বলেছেন ৷ ইমাম বুখারী কিতাবুর রিকাকের শেষ অনুচ্ছেদের শিরোনাম রাখেন নিম্নোক্তভাবে : ( আবরী ---------------------------) ( হাউজ অনুচ্ছেদ , আর আল্লাহ বলেছেন : আমি তোমাকে কাউসার দিয়েছি )৷ অন্য দিকে হযরত আনাসের রেওয়ায়াতে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে , রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কাউসার সম্পর্কে বলেছেন :

আরবী ---------------------------- " সেটি একটি হাউজ ৷ আমার উম্মাত সেখানে উপস্থিত হবে৷ "

জান্নাতে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে কাউসার নামে যে নহরটি দেয়া হবে সেটির উল্লেখ ও অসংখ্য হাদীসে পাওয়া যায়৷ হযরত আনাস (রা) থেকে এ সংক্রান্ত বহু হাদীস উদ্ধৃত হয়েছে৷ সেগুলোতে তিনি বলেন ( আবার কোন কোনটিতে তিনি স্পষ্টভাবে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের উক্তি হিসেবেই বর্ণনা করেন ) : মি'রাজে রসূলুল্লাহকে ( সা) জান্নাতে সফর করানো হয়৷ এ সময় তিনি একটি নহর দেখেন৷ এ নহরের তীরদেশে ভিতর থেকে হীরা বা মুক্তার কারুকার্য করা গোলাকৃতির মেহরাবসমূহ ছিল্ ,‌তার তলদেশের মাটি ছিল খাঁটি মিশকের সুগন্ধিযুক্ত৷ রসূলুল্লাহ (সা) জিরীলকে বা যে ফেরেশতা তাঁকে ভ্রমণ করিয়েছিলেন তাঁকে জিজ্ঞেস করেন , এটা কি ? ফেরেশতা জাবাব দেন , এটা কাউসার নহর৷ আল্লাহ আপনাকে এ নহরটি দিয়েছেন৷ ( মুসনাদে আহামদ , বুখারী , তিরমিযী , আবু দাউদ তায়ালাসী ও ইবেন জারীর )৷ হযরত আনাস এক রেওয়ায়াতে বলেন , রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জিজ্ঞেস করা হল , অথবা এক ব্যক্তি জিজ্ঞেস করেন : কাউসার কি ? তিনি জবাব দিলেন : একটি নহর যা আল্লাহ আমাকে জান্নাতে দান করেছেন৷ এর মাটি মিশকের ৷ এর পানি দুধের চাইতেও সাদা এবং মধুর চাইতে মিষ্টি৷ ( মুসনাদে আহমাদ , তিরমিযী , ইবনে জারীর )৷ মুসনাদে আহমাদের অন্য একটি রেওয়ায়াতে বলা হয়েছে , রসূলুল্লাহ (সা) নহরে কাউসারের বৈশিষ্ট বর্ণনা প্রসঙ্গে বলেন : তার তলদেশে কাঁকরের পরিবর্তে মণিমুক্তা পড়ে আছে৷ ইবনে ওমর (রা) বলেন , রসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন : কাউসার জান্নাতের একটি নহর৷ এর তীরদেশ সোনার পরিবর্তে মূল্যবান পাথর বিছানো আছে৷ ) এর মাটি মিশকের চাইতে বেশী সুগন্ধিযুক্ত৷ পানি দুধের চাইতে বেশী সাদা৷ বরফের চেয়ে বেশী ঠাণ্ডা ও মধুর চেয়ে বেশী মিষ্টি৷ ( মুসনাদে আহামদ ,তিরমিযী , ইবনে মাজাহ , ইবনে আবী হাতেম , দারেমী , আবু দাউদ , ইবনুল মুনযির , ইবনে মারদুইয়া ও ইবনে আবী শাইবা )৷ উসামা ইবনে যায়েদ (রা) রেওয়ায়াত করেছেন , রসূলুল্লাহ (সা) একবার হযরত হামাযার (রা) বাড়িতে যান৷ তিনি বাড়িতে ছিলেন না ৷ তাঁর স্ত্রী নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মেহেমানদারী করেন৷ আলাপ আলোচনা করতে করতে এক সময় তিনি বলেন , আমার স্বামী আমাকে বলেছেন , আপনাকে জান্নাতে একটি নহর দেয়া হবে৷ তার নাম কাউসার৷ তিনি বলেন : " হ্যাঁ , তার যমীন ইয়াকুত , মারজান , যবরযদ ও মতির সমন্বেয় গঠিত৷ ( ইবনে জারীর ও ইবন মারদুইয়া ৷ এ হাদীসটির সূত্র দুর্বল হলেও এ বিষয়বস্তু সম্বলিত বিপুল সংখ্যক হাদীস পাওয়া যাওয়ার কারণ এর শক্তি বেড়ে গেছে )৷ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের এ উক্তি এবং সাহাবা ও তাবেঈগণের অসংখ্য বক্তব্য হাদীসে উল্লেখিত হয়েছে৷ এ সবগুলোতে কাউসার বলতে জান্নাতের এ নহরই বুঝানো হযেছে৷ ওপরে এ নহরের যে সব বৈশিষ্ট বর্ণিত হয়েছে এ হাদীসগুলোতেই তাই বলা হয়েছে৷ উদাহরণ স্বরূপ হযরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা) , হযরত আবুদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা) , হযরত আনাস ইবনে মালিক (রা) , হযরত আয়েশা (রা) , মুজাহিদ ও আবুল আলীয়ার উক্তিসমূহ মুসনাদে আহমাদ , বুখারী , তিরমিযী , নাসাঈ , ইবনে মারদুইয়া , ইবনে জারীর ও ইবনে আবী শাইবা ইত্যাদি মুহাদ্দিসগনের কিতাবে উল্লেখিত হয়েছে৷
২. বিভিন্ন মনীষী এর বিভিন্ন ব্যাখ্যা করেছেন৷ কেউ কেউ নামায বলতে পাঁচ ওয়াক্ত ফরজ নামায ধরেছেন৷ কেউ ঈদুল আযহার নামায মনে করেছেন৷ আবার কেউ বলেছেন , এখানে নিছক নামাযের কথা বলা হয়েছে৷ অনুরূপভাবে " ওয়ানহার " অর্থাৎ " নহর কর " শব্দেরও কোন কোন বিপুল মর্যাদার অধিকারী মনীষী অর্থ করেছেন , নামাযে বাম হাতের ওপর ডান হাত রেখে তা বুকে বাঁদা ৷ কেউ কেউ বলেছেন , এর অর্থ হচ্ছে , নামায শুরু করার সময় দুই হাত ওপরে উঠিয়ে তাকবীর বলা কেউ কেউ বলেছেন , এর মাধ্যমে নামায শুরু করার সময় রুকূতে যাবার সময় এবং রুকূ' থেকে উঠে রাফে ইয়াদায়েন করা বুঝানো হয়েছে৷ আবার কেউ কেউ বলেছেন , এর অর্থ হচ্ছে , ঈদুল আযহার নামায পড়া এবং কুরবানী করা৷ কিন্তু যে পরিবেশ ও পরিস্থিতিতে এ হুকুম দেয়া হয়েছে সে সম্পর্কে চিন্তা করলে এর সুস্পষ্ট অর্থ এই মনে হয় : " হে নবী ! তোমার রব যখন তোমাকে এত বিপুল কল্যাণ দান করেছেন তখন তুমি তাঁরই জন্য নামায পড় এবং তাঁরই জন্য কুরবানী দাও ৷ " এ হুকুমটি এমন এক পরিবেশে দেয়া হয়েছিল যখন কেবল কুরাইশ বংশীয় মুশরিকরাই নয় সমগ্র আরব দেশের মুশরিকবৃন্দ নিজেদের মনগড়া মাবুদদের পূজা করতো এবং তাদের আস্তানায় পশু বলী দিতো ৷ কাজেই এখানে এ হুকুমের উদ্দেশ্য হচ্ছে , মুশরিকদের বিপরীতে তোমরা নিজেদের কর্মনীতির ওপর দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত থাকো৷ অর্থাৎ তোমাদের নামায হবে আল্লাহরই জন্য , কুরবানীও হবে তাঁরই জন্য৷ যেমন অন্যত্র বলা হযেছে :

আরবী ----------------------------------------------------------------------------------

" হে নবী ! বলে দাও , আমার নামায , আমার কুরবানী , আমার জীবন ও আমার মৃত্যু বিশ্ব- জাহানের রব আল্লাহরই জন্য ৷‌ তাঁর কোন শরীক নেই৷ আমাকে এরই হুকুম দেয়া হয়েছে এবং আমি সর্বপ্রথম আনুগত্যের শির নত করি৷ " ( আল আন'আম , ১৬২-১৬৩) ৷

ইবনে আব্বাস আতা , মুজাতিদ, ইকরামা , হাসান বরসী , কাতাদাহ , মুহাম্মাদ ইবনে কাব আল কুয়াযী , যাহহাক , রাবী'ইবনে আনাস , আতাউল খোরাসানী এবং আরো অন্যান্য অনেক নেতৃস্থানীয় মুফাসসির এর এ অর্থই বর্ণনা করেছেন (ইবনে কাসীর )৷ তবে একথা যথাস্থানে পুরোপুরি সত্য যে , রসূলুল্লাহ (সা) যখন মদীনা তাইয়েবায় আল্লাহর হুকুমে ঈদুল আযহার নামায পড়েন ও কুরবানীর প্রচলন করেন তখন যেহেতু ( আরবী ----------------) আয়াতে এবং ( আরবী ---------------) আয়াতে নামাযকে প্রথমে ও কুরবানীকে পরে রাখা হয়েছে তাই তিনি নিজেও এভাবেই করেন এবং মুসলমানদের এভাবে করার হুকুম দেন৷অর্থাৎ এদিন প্রথমে নামায পড়বে এবং তারপর কুরবানী দেবে৷ এটি এ আয়াতের ব্যাখ্যা বা এর শানেনুযুল নয়৷ বরং সংশ্লিষ্ট আয়াতগুলো থেকে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ বিধানটি ইসতেমবাত তথা উদ্ভাবন করেছিলেন ৷ আর রসূলের (সা) ইসতেমবাতও এক ধরনের ওহী ৷
৩. এখানে (আরবী -------------------) (শা- নিআকা ) শব্দ ব্যবাহর করা হয়েছে ৷ এর মূল হচ্ছে (আরবী--------) ( শানউন)৷ এর মানে এমন ধরনের বিদ্বেষ ও শত্রুতা যে কারণে একজন অন্য জনের বিরুদ্ধে অসদ্ব্যবহার করতে থাকে৷ কুরআন মজীদের অন্য জায়গায় বলা হয়েছে :

আবরী ------------------------------------------------------------------------------------

" আর হে মুসলমানরা ! কোন দলের প্রতি শত্রুতা তোমাদের যেন কোন বাড়াবাড়ি করতে উদ্বুদ্ধ না করে যার ফলে তোমরা ইনসাফ করতে সক্ষম না হও৷ "

কাজেই এখানে " শানিয়াকা " বলে এমন প্রত্যেক ব্যক্তিকে বুঝানো হয়েছে যে , রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের শত্রুতায় অন্ধ হওয়া তাঁর প্রতিও দোষারোপ করে , তাঁকে গালিগালাজ করে , তাঁকে অবমাননা করে এবং তাঁর বিরুদ্ধে নানান ধরনের অপবাদ দিয়ে নিজের মনের ঝাল মেটায়৷
৪. আরবী ---------------) "সেই আবতার " বলা হয়েছে৷ অর্থাৎ সে তোমাকে আবতার বলে৷ কিন্তু প্রকৃতপক্ষে সে নিজেই আবতার৷ আমি ইতিপূর্বে এ সূরার ভূমিকায় " আবতার " শব্দের কিছু ব্যাখ্যা দিয়েছি৷ এই শব্দের মূলে রয়েছে বাতারা ( আরবী ---------) এর মানে কাটা৷ কিন্তু এর পরিভাষিক অর্থ অত্যন্ত ব্যাপক৷ হাদীসে নামাযের যে রাকাতের সাথে অন্য কোন রাকাত পড়া হয় না তাকে বুতাইরা ( আরবী ----------) বলা হয়৷ অর্থাৎ একক রাকাত৷ অন্য একটি হাদীসে বলা হয়েছে৷

(আরবী ----------------------------------)

" হে কোন গুরুত্বপূর্ণ কাজ আল্লাহর প্রসংশাবাণী উচ্চারণ না করে শুরু করাটা আবতার৷'

অর্থাৎ তার শিকড় কাটা গেছে ৷ সে কোন প্রতিষ্ঠা ও শক্তিমত্তা লাভ করতে পারে না৷ অথবা তার পরিণাম ভালো নয়৷ ব্যর্থকাম ব্যক্তিকে ও আবতার বলা হয়৷ যে ব্যক্তির কোন উপকার ও কল্যাণের আশা নেই এবং যার সাফল্যের সব আশা নির্মূল হয়ে গেছে তাকেও আবতার বলে৷ যার কোন ছেলে সন্তান নেই অথবা হয়ে মারা গেছে তার ব্যাপারেও আবতার শব্দ ব্যবহার করা হয়ে থাকে৷ কারণ তার অবর্তমানে তার নাম নেবার মতো কেউ থাকে না এবং মারা যাবার পর তার নাম নিশানা মুছে যার৷ প্রায় সমস্ত অর্থেই কুরাইশ কাফেররা মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে আবতার বলতো৷ তার জবাবে আলাহ বলেন ,হে নবী ! তুমি আবতার নও বরং তোমার এ শত্রুই আবতার৷ এটা নিছক কোন জবাবী আক্রমণ ছিল না৷ বরং এটা ছিল আসলে কুরআনের বড় বড় গুরুত্বপূর্ণ ভবিষ্যতবাণীর মধ্য থেকে একটি বড়ই গুরুত্বপূর্ণ ভবিষ্যদ্বাণী৷ এটা অক্ষরে অক্ষরে সত্য প্রমাণিত হয়৷ যখন এ ভবিষ্যদ্বাণী করা হয় তখন লোকেরা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে আবতার মনে করতো৷ তখন কেউ ধরণা করতে পারতো না যে , কুরাইশদের এ বড় বড় সরদাররা আবার কেমন করে আবতার হয়ে যাবে ? তারা কেবল মক্কায়ই নয় সমগ্র দেশে খ্যাতিমান ছিল ৷ তারা সফলকাম ছিল৷ তারা কেবল ধন - সম্পদ ও সন্তান - সন্ততির অধিকারী ছিল না বরং সারা দেশে বিভিন্ন জায়গায় ছিল তাদের সহযোগী ও সাহায্যকারী দল৷ ব্যবসার ইজারাদার ও হজ্জের ব্যবস্থাপক হবার কারণে আরবের সকল গোত্রের সাথে ছিল তাদের সম্পর্ক৷ কিন্তু কয়েক বছর যেতে না যেতেই অবস্থা সম্পূর্ণ বদলে গেলো৷ হিজরী ৫ সনে আহযাব যুদ্ধের সময় কুরাইশরা বহু আরব ও ইহুদি গোত্র নিয়ে মদীনা আক্রমণ করলো এবং রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে অবরুদ্ধ অবস্থায় শহরের চারদিক পরিখা খনন করে প্রতিরক্ষার লড়াইয়ে লিপ্ত হতে হলো৷ কিন্তু এর মাত্র তিন বছর পরে ৮ হিজরীতে রসূলুল্লাহ (সা) যখন মক্কা আক্রমণ করলেন তখন কুরাইশদের কোন সাহায্য - সহযোগিতা দানকারী ছিল না৷ নিতান্ত অসহায়ের মতো তাদেরকে অস্ত্র সংবরণ করতে হলো৷ এরপর এক বছরের মধ্যে সমগ্র আরব দেশ ছিল রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের করতলগত৷ দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে বিভিন্ন গোত্রের প্রতিনিধিদল এসে তাঁর হাতে বাই' আত হচ্ছিল৷ ওদিকে তাঁর শত্রুরা সম্পূর্ণরূপে বন্ধু বান্ধব ও সাহায্য সহায়হীন হয়ে পড়েছিল৷ তারপর তাদের নাম নিশানা দুনিয়ার বুক থেকে এমনভাবে মুছে গেলো যে , তাদের সন্তানদের কেউ আজ বেঁচে থাকলে ও তাদের কেউই আজ জানে না সে আবু জেহেল আর আবু লাহাব , আস ইবনে ওয়ায়েল বা উকবা ইবনে আবী মু'আইত ইত্যাদি ইসলামের শত্রুদের সন্তান ৷ আর কেউ জানলেও সে নিজেকে এদের সন্তান বলে পরিচয় দিতে প্রস্তুত নয়৷ বিপরীত পক্ষে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পরিবারবর্গের ওপর আজ সারা দুনিয়ায় দরূদ পড়া হচ্ছে৷ কোটি কোটি মুসলমান তাঁর সাথে সম্পর্কিত হবার কারণে গর্ব করে৷ লাখো লাখো লোক তাঁর সাথেই নয় বরং তাঁর পরিবার - পরিজন এমন কি তাঁর সাথীদের পরিবার পরিজনের সাথেও সম্পর্কিত হওয়াকে গৌরবজনক মনে করে৷ এখানে কেউ সাইয়েদ , কেউ উলুব্বী , কেউ আব্বাসী , কেউ হাশেমী , কেউ সিদ্দিকী , কেউ ফারুকী , কেউ উসমানী , কেউ যুবাইরী এবং কেউ আনসারী৷ কিন্তু নামমাত্র ও কোন আবু জেহেলী বা আবু লাহাবী পাওয়া যায় না৷ ইতিহাস প্রমাণ করেছে , রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আবতার নন বরং তাঁর শত্রুরাই আবতার৷