(১০৭:১) তুমি কি তাকে দেখেছো৷ যে আখেরাতের পুরস্কার ও শাস্তিকে মিথ্যা বলছে ?
(১০৭:২) সে-ই তো এতিমকে ধাক্কা দেয়
(১০৭:৩) এবং মিসকিনকে খাবার দিতে উদ্বুদ্ধ করে না৷
(১০৭:৪) তারপর সেই নামাযীদের জন্য ধবংস ,
(১০৭:৫) যারা নিজেদের নামাযের ব্যাপারে গাফলতি করে
(১০৭:৬) যারা লোক দেখানো কাজ করে ১০
(১০৭:৭) এবং মামুলি প্রয়োজনের জিনিসপাতি ১১ ( লোকদেরকে ) দিতে বিরত থাকে৷
১. ' তুমি কি দেখেছো ' বাক্যে এখানে বাহ্যত সম্বোধন করা হয়েছে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে ৷ কিন্তু কুরআনের বর্ণনাভংগী অনুযায়ী দেখা যায় , এসব ক্ষেত্রে সাধারণত প্রত্যেক জ্ঞান - বুদ্ধি ও বিচার - বিবেচনা সম্পন্ন লোকদেরকেই এ সম্বোধন করা হয়ে থাকে৷ আর দেকা মানে চোখ দিয়ে দেখাও হয়৷ কারণ সামনের দিকে লোকদের যে অবস্থা বর্ণনা করা হয়েছে তা প্রত্যেক প্রত্যক্ষকারী স্বচক্ষে দেখে নিতে পারে৷ আবার এর মানে জানা , বুঝা ও চিন্তা ভাবনা করাও হতে পারে৷ আরবী ছাড়া অন্যান্য ভাষায়ও এ শব্দটি এ অর্থে ব্যবহৃত হয়৷ যেমন আমরা বলি , " আচ্ছা , ব্যাপারটা আমাকে দেখতে হবে৷ " অর্থাৎ আমাকে জানতে হবে৷ অথবা আমরা বলি , " এ দিকটাও তো একবার দেখো ৷" এর অর্থ হয় , " এ দিকটা সম্পর্কে একটু চিন্তা করো ৷ " কাজেই " আরাআইতা " ( আরবী -----------) শব্দটিকে দ্বিতীয় অর্থে ব্যবহার করলে আয়াতের অর্থ হবে , " তুমি কি জানো সে কেমন লোক যে শাস্তি ও পুরস্কারকে মিথ্যা বলে ? " অথবা " তুমি কি ভেবে দেখেছো সেই ব্যক্তির অবস্থা যে কর্মফলকে মিথ্যা বলে ? "
২. আসলে বলা হয়েছে : ( আরবী ------------) ৷ কুরআনের পরিভাষায় " আদ দীন " শব্দটি থেকে আখেরাতে কর্মফল দান বুঝায়৷ দীন ইসলাম অর্থেও এটি ব্যবহৃত হয়৷ কিন্তু সামনের দিকে যে বিষয়ের আলোচনা হয়েছে তার সাথে প্রথম অর্থটিই বেশী খাপ খায় যদিও বক্তব্যের ধারাবাহিকতার দিক দিয়ে দ্বিতীয় অর্থটিও খাপছাড়া নয়৷ ইবনে আব্বাস ( রা)) দ্বিতীয় অর্থটিকে প্রাধান্য দিয়েছেন৷ তবে অধিকাংশ তাফসীরকার প্রথম অর্থটিকেই অগ্রাধিকার দিয়েছেন৷ প্রথম অর্থটি গ্রহণ করলে সমগ্র সূরায় বক্তব্যের অর্থ হবে , আখেরাত অস্বীকারের আকীদা মানুষের মধ্যে এ ধরনের চরিত্র ও আচরণের জন্ম দেয়৷ আর দ্বিতীয় অর্থটি গ্রহণ করলে দীন ইসলামের নৈতিক গুরুত্ব সুস্পষ্ট করাটাই সমগ্র সূরাটির মূল বক্তব্যে পরিণত হবে৷ অর্থাৎ এ ক্ষেত্রে বক্তব্যের অর্থ হবে , এ দীন অস্বীকারকারীদের মধ্যে যে চরিত্র ও আচরণ বিধি পাওয়া যায় ইসলাম তার বিপরীত চরিত্র সৃষ্টি করতে চায়৷
৩. বক্তব্য যেভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে তাতে মনে হয় , এখানে এ প্রশ্ন দিয়ে কথা শুরু করার উদ্দেশ্য একথা জিজ্ঞেস করা নয় যে , তুমি সেই ব্যক্তিকে দেখেছো কি না৷ বরং আখেরাতের শাস্তি ও পুরস্কার অস্বীকার করার মনোবৃত্তি মানুষের মধ্যে কোন ধরনের চরিত্র সৃষ্টি করে শ্রোতাকে সে সম্পর্কে চিন্তা- ভাবনা করার দাওয়াত দেয়াই এর উদ্দেশ্য৷ এই ধরনের লোকেরা এ আকীদাকে মিথ্যা বলে সে কথা জানার আগ্রহ তার মধ্যে সৃষ্টি করাই এর লক্ষ৷ এভাবে সে আখেরাতের প্রতি ঈমান আনার নৈতিক গুরুত্ব বুঝার চেষ্টা করবে৷
৪. আসলে ( আরবী ----------) বলা হয়েছে৷ এ বাক্যে " ফা " অক্ষরটি একটি সম্পূর্ণ বাক্যের অর্থ পেশ করছে৷ এর মানে হচ্ছে , " যদি তুমি না জেনে থাকো তাহলে তুমি জেনে নাও " " সে - ই তো সেই ব্যক্তি " অথবা এটি এ অর্থে যে , " নিজের এ আখেরাত অস্বীকারের কারণে সে এমন এক ব্যক্তি যে ----------------"
৫. মূলে ( আরবী --------) বলা হয়েছে এর কয়েকটি অর্থ হয়৷ এক , সে এতিমের হক মেরে খায় এবং তার বাপের পরিত্যক্ত সম্পত্তি থেকে বেদখল করে তাকে সেখান থেকে ধাক্কা দিয়ে বের করে দেয়৷ দুই , এতিম যদি তার কাছে সাহায্য চাইতে আসে তাহলে দয়া করার পরিবর্তে সে তাকে ধিক্কার দেয়৷ তারপরও যদি সে নিজের অসহায় ও কষ্টকর অবস্থার জন্য অনুগ্রহ লাভের আশায় দাঁড়িয়ে থাকে তাহলে তাকে ধাক্কা দিয়ে বের করে দেয় ৷ তিন , সে এতিমের ওপর জুলুম করে৷ যেমন তার ঘরেই যদি তার কোন আত্মীয় কথায় গালমন্দ ও লাথি ঝাঁটা খাওয়া ছাড়া তার ভাগ্যে আর কিছুই জোটে না৷ তাছাড়া এ বাক্যের মধ্যে এ অর্থও নিহিত রয়েছে যে, সেই ব্যক্তি মাঝে মাঝে কখনো কখনো এ ধরনের জুলুম করে না বরং এটা তার অভ্যাস ও চিরাচরিত রীতি সে যে এটা একটা খারাপ কাজ করছে , এ অনুভূতিও তার থাকে না৷ বরং বড়ই নিশ্চিন্তে সে এ নীতি অবলম্বন করে যেতে থাকে৷ সে মনে করে , এতিম একটা অক্ষম ও অসহায় জীব৷ কাজেই তার হক মেরে নিলে , তার ওপর জুলুম - নির্যাতন চালালে অথবা সে সাহায্য চাইতে এলে তাকে ধাক্কা মেরে বের করে দিলে কোন ক্ষতি নেই৷ এ প্রসংগে কাজী আবুল হাসান আল মাওয়ারদী তাঁর " আলামূন নুবুওয়াহ " কিতাবে একটি অদ্ভুত ঘটনা বর্ণনা করেছেন ৷ ঘটনাটি হচ্ছে : আবু জেহেল ছিল একটি এতিম ছেলের অভিভাবক৷ ছেলেটি একদিন তার কাছে এলো ৷ তার গায়ে একটুকরা কাপড়ও ছিল না৷ সে কাকুতি মিনতি করে তার বাপের পরিত্যক্ত সম্পদ থেকে তাকে কিছু দিতে বললো৷ কিন্তু জালেম আবু জেহেল তার কথায় কানই দিল না৷ সে অনেক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার পর শেষে নিরাশ হয়ে ফিরে গেলো ৷ কুরাইশ সরদাররা দুষ্টুমি করে বললো , " যা মুহাম্মাদের ( সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ) কাছে চলে যা৷ সেখানে গিয়ে তার কাছে নালিশ কর৷ সে আবু জেহেলের কাছে সুপারিশ করে তোর সম্পদ তোকে দেবার ব্যব্‌স্থা করবে ৷ " ছেলেটি জানতো না আবু জেহেলের সাথে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কি সম্পর্ক এবং এ শয়তানরা তাকে কেন এ পরামর্শ দিচ্ছে৷ সে সোজা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে পৌঁছে গেলো এবং নিজের অবস্থা তাঁর কাছে বর্ণনা করলো৷ তার ঘটনা শুনে নবী ( সা) তখনই দাঁড়িয়ে গেলেন এবং তাকে সংগে নিয়ে নিজের নিকৃষ্টতম শত্রু আবু জেহেলের কাছে চলে গেলেন৷ তাঁকে দেখে আবু জেহেল তাঁকে অভ্যর্থনা জানালো৷ তারপর যখন তিনি বললেন , এ ছেলেটির হক একে ফিরিয়ে দাও তখন সে সংগে সংগেই তাঁর কথা মেনে নিল এবং তার ধন - সম্পদ এনে তার সামনে রেখে দিল ৷ ঘটনার পরিণতি কি হয় এবং পানি কোন দিকে গড়ায় তা দেখার জন্য কুরাইশ সরদাররা ওঁৎ পেতে বসেছিল৷ তারা আশা করছিল দু' জনের মধ্যে বেশ একটা মজার কলহ জমে উঠবে৷ কিন্তু এ অবস্থা দেখে তারা অবাক হয়ে গেলো৷ তারা আবু জেহেলের কাছে এসে তাকে ধিক্কার দিতে লাগলো৷ তাকে বলতে লাগলো , তুমিও নিজের ধর্ম ত্যাগ করেছে৷ আবু জেহেল জবাব দিল , আল্লাহর কসম ! আমি নিজের ধর্ম ত্যাগ করিনি৷ কিন্তু আমি অনুভব করলাম , মুহাম্মাদের ( সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ) ডাইনে ও বাঁয়ে এক একটি অস্ত্র রয়েছে৷ আমি তার ইচ্ছার সামান্যতম বিরুদ্ধাচরণ করলে সেগুলো সোজা আমার শরীরের মধ্যে ঢুকে যাবে৷ এ ঘটনাটি থেকে শুধু এতটুকুই জানা যায় না যে ,সে যুগে আরবের সবচেয়ে বেশী উন্নত ও মর্যাদা গোত্রের বড় বড় সরদাররা পর্যন্ত এতিম ও সহায় - সম্বলহীন লোকদের সাথে কেমন ব্যবহার করতো বরং এই সংগে একথাও জানা যায় যে, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কত উন্নত নৈতিক প্রভাব কতটুকু কার্যকর হয়েছিল৷ ইতিপূর্বে তাফহীমূল কুরআন সূরা আল আম্বিয়া ৫ টীকায় আমি এ ধরনের একটি ঘটনা বর্ণনা করেছি৷নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের যে জবরদস্ত নৈতিক প্রভাব প্রতিপত্তির কারণে কুরাইশরা তাঁকে যাদুকর বলতো এ ঘটনাটি তারই মূর্ত প্রকাশ ৷
৬. আরবী ----------------- নয় বরং আরবী ------------- বলা হয়েছে "ইত্‌'আমূল মিসকিন "বললে অর্থ হতো , সে মিসকিনকে খানা খাওয়াবার ব্যাপারে উৎসাহিত করে না৷কিন্তু "তাআমূল মিসকিন "বলায় এর অর্থ দাঁড়িয়েছে ,"সে মিসকিনকে খানা দিতে উৎ -সাহিত করে না৷ " অন্য কথায় , মিসকিনকে যে খাবার দেয়া হয় তা দাতার খাবার নয় বরং ঐ মিসকিনেরই খাবার ৷ তা ঐ মিসকিনের হক এবং দাতার ওপর এ হক আদায় করার দায়িত্ব র্বতায় ৷ কাজেই দাতা এটা মিসকিনকে দান করছে না বরং তার হক আদায় করছে ৷ সূরা আয যারিয়াতের ১৯ আয়াতে একথাটিই বলা হয়েছে৷ সেখানে বলা হয়েছে :আরবী ------------------ "আর তাদের ধন সম্পদে রয়েছে ভিখারী ও বঞ্চিতদের হক " ৷
৭. আরবী ------ শব্দের মানে হচ্ছে ,সে নিজেকে উদ্বুদ্ধ করে না , নিজের পরিবারের লোকদেরকেও মিসকিনকে খাবার দিতে উদ্বুদ্ধ করে না এবং অন্যদেরকেও এ ব্যাপারে উৎসাহিত করে না যে ,সমাজে যেসব গরীব ও অভাবী লোক অনাহারে মারা যাচ্ছে তাদের হক আদায় করা এবং তাদের ক্ষুধা নিবৃত্তির জন্য কিছু করো৷ এখানে মহান আল্লাহ শুধুমাত্র দু'টি সুম্পট উদাহরণ দিয়ে আসলে আখেরাত অস্বীকার প্রবণতা মানুষের মধ্যে কোন ধরনের নৈতিক অসৎবৃত্তির জন্ম দেয় তা বর্ণনা করেছেন৷আখেরাত না মানলে এতিমকে ধাক্কা দিয়ে বের করে দেয়া এবং মিসকিনকে খাবার দিতে উদ্বুদ্ধ না করার মতো দু'টি দোষ মানুষের মধ্যে সৃষ্টি হয়ে যায় বলে শুধুমাত্র এ দু'টি ব্যাপারে মানুষকে পাকড়াও সমালোচনা করাই এর আসল উদ্দেশ্য নয় ৷ বরং এই গোমরাহীয় ফলে যে অসংখ্য দোষ ও ত্রুটির জন্ম হয় তার মধ্য থেকে নমুনা স্বরূপ এমন দু'টি দোষের কতা উল্লেখ করা হয়েছে প্রত্যেক সুস্থ বিবেক ও সৎবিচার - বুদ্ধি সম্পন্ন ব্যক্তি যেগুলোকে নিকৃষ্টতম দোষ বলে মেনে নেবে৷ এই সংগে একথাও হৃদয়পটে অংকিত করে দেয়াই উদ্দেশ্য যে , এ ব্যক্তিটিই যদি আল্লাহর সামনে নিজের উপস্থিতি ও নিজের কৃতকর্মের জবাবদিহির স্বীকৃতি দিতো , তাহলে এতিমের হক মেরে নেবার , তার ওপর জুলুম -নির্যাতন করার , তাকে ধিক্কার দেবার এবং মিসকিনকে নিজে খাবার না দেবার ও অন্যকে দিতে উদ্বুদ্ধ না করার মতো নিকৃষ্টতম কাজ সে করতো না৷ আখেরাত বিশ্বাসীদের গুণাবলী সূরা আসর ও সুরা বালাদে বয়ান করা হয়েছে৷ সেখানে বলা হয়েছে : আরবী --------------------------------------------------------- আল্লাহর সৃষ্টির প্রতি করুণা করার জন্য তারা পরস্পরকে উপদেশ দেয় এবং ( আবরী ------------) তারা পরস্পরকে সত্যপ্রীতি ও অধিকার আদায়ের উপদেশ দেয়৷
৮. এখানে শব্দ ( আবরী -----------) ব্যবহার করা হয়েছে ৷ এখানে " ফা " ব্যবহার করার তাৎপর্য হচ্ছে এই যে , প্রকাশ্যে যারা আখেরাত অস্বীকার করে তাদের অবস্থা তুমি এখনই শুনলে , এখন যারা নামায পড়ে অর্থাৎ মুসলমানদের সাথে শামিল মুনাফিকদের অবস্থাটা একবার দেখো৷ তারা যেহেতু বাহ্যত মুসলামান হওয়া সত্ত্বেও আখেরাতকে মিথ্যা মনে করে , তাই দেখো তারা নিজেদের জন্য কেমন ধ্বংসের সরঞ্জাম তৈরি করছে৷ " মূসাল্লীন " মানে নামায পাঠকারীগণ৷ কিন্তু যে আলোচনা প্রসংগে শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে এবং সামনের দিকে তাদের যে গুণাবলী বর্ণিত হয়েছে সেগুলোর প্রেক্ষিতে এ শব্দটির মানে আসলে নামাযী নয় বরং নামায আদায়কারী দল অর্থাৎ মুসলমানদের দলের অন্তরভুক্ত হওয়া৷
৯. (আরবী -------------) বলা হয়নি বরং বলা হয়েছে , (আরবী ----------------) যদি বলা হতো " ফী সালাতিহিম " তাহলে এর মানে হতো , নিজের নামাযে ভুলে যায়৷ কিন্তু নামায পড়তে পড়তে ভুলে যাওয়া ইসলামী শরীয়াতে নিফাক তো দূরের কথা গোনাহের পর্যায়েও পড়ে না৷ বরং এটা আদতে কোন দোষ বা পাকড়াও যোগ্য কোন অপরাধও নয়৷নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিজের নামাযের মধ্যে কখনো ভুল হয়েছে৷ তিনি এই ভুল সংশোধনের জন্য পদ্ধতি নির্ধারণ করেছেন৷ এর বিপরীতে (আরবী -----------) মানে হচ্ছে তারা নিজেদের নামায থেকে গাফেল৷ নামায পড়া ও না পড়া উভয়টিরই তাদের দৃষ্টিতে কোন গুরুত্ব নেই৷ কখনো তারা নামায পড়ে আবার কখনো পড়ে না৷ যখন পড়ে , নামাযের আসল সময় থেকে পিছিয়ে যায় এবং সময় যখন একেবারে শেষ হয়ে আসে তখন উঠে গিয়ে চারটি ঠোকর দিয়ে আসে ৷ অথবা নামাযের জন্য ওঠে ঠিকই কিন্তু একবারে যেন উঠতে মন চায়না এমনভাবে ওঠে এবং নামায পড়ে নেয় কিন্তু মনের দিক থেকে কোন সাড়া পায় না৷ যেন কোন আপদ তাদের ওপর চাপিয়ে দেয়া হয়েছে৷ নামায পড়তে পড়তে কাপড় নিয়ে খেলা করতে থাকে৷ হাই তুলতে থাকে৷ আল্লাহর স্মরণ সামান্যতম তাদের মধ্যে থাকে না৷ সারাটা নামাযের মধ্যে তাদের এ অনুভুতি থাকেনা যে , তারা নামায পড়ছে৷ নামাযের মধ্যে কি পড়ছে তাও তাদের খেয়াল থাকে না , নামায পড়তে থাকে এবং মন অনত্র পড়ে থাকে৷ তাড়াহুড়া করে এমনভাবে নামাযটা পড়ে নেয় যাতে কিয়াম , রুকূ ও সিজদা কোনটাই ঠিক হয় না৷ কেননা কোন প্রকারে নামায পড়ার ভান করে দ্রুত শেষ করার চেষ্টা করে৷ আবার এমন অনেক লোক আছে , যারা কোন জায়গায় আটকা পড়ে যাবার কারণে বেকায়দায় পড়ে নামাযটা পড়ে নেয় কিন্তু আসলে তাদের জীবনে এ ইবাদাতটার কোন মর্যাদা নেই৷ নামাযের সময় এসে গেলে এটা যে নামাযের সময় এ অনুভুতিই ও তাদের থাকে না৷ মুয়াযযিনের আওয়াজ কানে এলে তিনি কিসের আহবান জানাচ্ছেন , কাকে এবং কেন জানাচ্ছেন একথাটা একবারও তারা চিন্তা করে না৷ এটাই আখেরাতের প্রতি ঈমান না রাখার আলামত৷ কারণ ইসলামের এ তথাকথিত দাবীদাররা নামায পড়লে কোন পুরস্কার পাবে বলে মনে করে না এবং না পড়লে তাদের কপালে শাস্তি ভোগ আছে একথা বিশ্বাস করে না৷ এ কারণে তারা এ কর্মপদ্ধতি অবলম্বন করে৷ এ জন্য হযরত আনাস ইবনে মালিক (রা) ও হযরত আতা ইবনে দীনার বলেন : আল্লাহর শোকর তিনি " ফী সালাতিহিম সাহুন " বলেননি বরং বলেছেন , " আন সালাতিহিম সাহুন ৷" অর্থাৎ আমরা নামাযে ভুল করি ঠিকই কিন্তু নামায থেকে গাফেল হই না৷ এ জন্য আমরা মুনাফিকদের অন্তরভুক্ত হবো না৷

কুরআন মজীদের অন্যত্র মুনাফিকদের এ অবস্থাটি এভাবে বর্ণনা করা হয়েছে :

আরবী ---------------------------------------------------------------------------

"তারা যখনই নামাযে আসে অবসাদগ্রস্তের মতো আসে এবং যখনই ( আল্লাহর পথে) খরচ করে অনিচ্ছাকৃতভাবে করে৷" ( তাওবা ৫৪ )

রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন :

আরবী -------------------------------------------------------------------------

" এটা মুনাফিকের নামায , এটা মুনাফিকের নামায , এটা মুনাফিকের নামায৷ সে আসরের সময় বসে সূর্য দেখতে থাকে ৷ এমনকি সেটা শয়তানের দু'টো শিংয়ের মাঝখানে পৌঁছে যায়৷ ( অর্থাৎ সূর্যাস্তের সময় নিকটবর্তী হয়) তখন সে উঠে চারটে ঠোকর মেরে নেয়৷ তাতে আল্লাহকে খুব কমই স্মরণ করা হয়৷" (বুখারী , মুসলিম , মুসনাদে আহমাদ )

হযরত সা'দ ইবেন আবী ওয়াক্কাস (রা) থেকে তাঁর পুত্র মুসআব ইবনে সা'দ রেওয়ায়াত করেন, যারা নামাযের ব্যাপারে গাফলতি করে তাদের সম্পর্কে আমি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জিজ্ঞেস করেছিলাম৷ তিনি বলেছিলেন , যারা গড়িমসি করতে করতে নামাযের সময় শেষ হয় এমন অবস্থায় নামায পড়ে তারাই হচ্ছে এসব লোক৷ ( ইবনে জারীর , আবু ইয়ালা , ইবনুল মুনযির , ইবনে আবী হাতেম , তাবারানী ফিল আওসাত , ইবনে মারদুইয়া ও বাইহাকী ফিস সুনান৷ এ রেওয়ায়াতটি হযরত সা'দের নিজের উক্তি হিসেবেও উল্লেখিত হয়েছে৷ সে ক্ষেত্রে এর সনদ বেশী শক্তিশালী ৷ আবার রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বাণী হিসেবে এ রেয়ায়াতটির সনদ বাইহাকী ও হাকেমের দৃষ্টিতে দুর্বল ) হযরত মুস'আবের দ্বিতীয় রেয়ায়াতটি হচ্ছে , তিনি নিজের মহান পিতাকে জিজ্ঞেস করেন , এ আয়াটি নিয়ে কি আপনি চিন্তা - ভাবনা করেছেন ? এর অর্থ কি নামায ত্যাগ করা ? অথবা এর অর্থ নামায পড়তে পড়তে মানুষের চিন্তা অন্য কোনদিকে চলে যাওয়া ? আমাদের মধ্যে কে এমন আছে নামাযের মধ্যে যার চিন্তা অন্য দিকে যায় না ? তিনি জবাব দেন , না এর মানে হচ্ছে মানুষের সময়টা নষ্ট করে দেয়া এবং গড়িমসি করে সময় শেষ হয় হয় এমন অবস্থায় তা পড়া৷ ( ইবনে জারীর , ইবনে আবী শাইবা , আবু ইয়া'লা , ইবনুল মুনযির , ইবনে মারদুইয়া ও বাইহাকী ফিস সুনান )

এ প্রসংগে মনে রাখতে হবে , নামাযের মধ্যে অন্য চিন্তা এসে যাওয়া এক কথা এবং নামাযের প্রতি কখনো দৃষ্টি না দেয়া এবং নামায পড়তে পড়তে সবসময় অন্য বিষয় চিন্তা করতে থাকা সম্পূর্ণ ভিন্ন কথা৷ প্রথম অবস্থাটি মানবিক দুর্বলতার স্বাভাবিক দাবি৷ ইচ্ছা ও সংকল্প ছাড়াই অন্যান্য চিন্তা এসে যায় এবং মু'মিন যখনই অনুভব করে , তার মন নামায থেকে অন্যদিকে চলে গেছে তখনই সে চেষ্টা করে আবার নামারয মনোনিবেশ করে ৷ দ্বিতীয় অবস্থাটি নামাযে গাফলতি করার পর্যায়ভুক্ত৷ কেননা এ অবস্থায় মানুষ শুধুমাত্র নামাযের ব্যায়াম করে৷ আল্লাহকে স্মরণ করার কোন ইচ্ছা তার মনে জাগে না৷ নামায শুরু করা থেকে নিয়ে সালাম ফেরা পর্যন্ত একটা মুহূর্তও তার মন আল্লাহর প্রতি আকৃষ্ট হয় না৷ যেসব চিন্তা মাথায় পুরে সে নামাযে প্রবেশ করে তার মধ্যেই সবসময় ডুবে থাকে৷
১০. এটি একটি স্বতন্ত্র বাক্যও হতে পারে আবার পূর্বের বাক্যের সাথে সম্পর্কিত হতে পারে৷ একে স্বতন্ত্র বাক্য গণ্য করলে এর অর্থ হবে , কেননা সৎকাজও তারা আন্তরিক সংকল্প সহকারে আল্লাহর জন্য করে না৷ বরং যা কিছু করে অন্যদের দেখাবার জন্য করে৷ এভাবে তারা নিজেদের প্রশংসা শুনাতে চায়৷ তারা চায় , লোকেরা তাদের সৎ লোক মনে করে তাদের সৎকাজের ডংকা বাজাবে৷ এর মাধ্যমে তারা কোন না কোনভাবে দুনিয়ার স্বার্থ উদ্ধার করবে৷ আর আগের বাক্যের সাথে একে সম্পর্কিত মনে করলে এর অর্থ হবে তারা লোক দেখানো কাজ করে৷ সাধারণভাবে মুফাস্‌সিরগণ দ্বিতীয় অর্থটিকেই অগ্রাধিকার দিয়েছেন৷ কারণ প্রথম নজরেই টের পাওয়া যায় আগের বাক্যের সাথে এর সম্পর্ক রয়েছে৷ ইবনে আব্বাস (রা) বলেন : " এখানে মোনফিকদের কথা বলা হয়েছে , যারা লোক দেখানো নামায পড়তো৷ অন্য লোক সামনে থাকলে নামায পড়তো এবং অন্য লোক না থাকলে পড়তো না৷ " অন্য একটি রেওয়ায়াতে তাঁর বক্তব্য হচ্ছে , " একাকী থাকলে পড়তো না৷ আর সর্ব সমক্ষে পড়ে নিতো৷ " ( ইবনে জারীর , ইবনুল মুনযির , ইবনে আবী হাতেম , ইবনে মারদুইয়া ও বায়হাকী ফিশ শু'আব ) কুরআন মজীদেও মুনাফিকদের অবস্থা বর্ণনা করে বলা হয়েছে :

আরবী -------------------------------------------------------------------------

" আর যখন তারা নামাযের জন্য ওঠে অবসাতগ্রস্তের ন্যায় ওঠে৷ লোকদের দেখায় এবং আল্লাহকে স্মরণ করে খুব কমই৷ " ( আন নিসা ১৪২ )
১১. মূলে মাউন ( আরবী ------) শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে৷ হযরত আলী (রা) , ইবনে উমর (রা) সাঈদ ইবনে জুবাইর , কাতাদাহ , হাসান বসরী , মুহাম্মাদ ইবন হানাফীয়া , যাহহাক , ইবনে যায়েদ , ইকরামা , মুজাহিদ আতা ও যুহরী রাহেমাহুমুল্লাহ বলেন , এখানে এই শব্দটি থেকে যাকাত বুঝানো হয়েছে৷ ইবনে আব্বাস (রা) ইবনে মাসউদ (র) ইবরাহীম নাখয়ী (র) আবু মালেক (র) এবংঅন্যান্য লোকদের উক্তি হচ্ছে , এখানে নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিস - পত্র যেমন হাড়ী - পাতিল , বালতি , দা,- কুমড়া দাড়িপাল্লা , লবণ , পানি আগুন , চকমাকি ( বর্তমানে এর স্থান দখন করেছে দেয়াশলাই ) ইত্যাদির কথা বলা হয়েছে ৷ কারণ লোকেরা সাধারণত এগুলো দৈনন্দিন কাজের জন্য পরস্পরের কাছ থেকে চেয়ে নেয়৷ সাঈদ ইবনে জুবাইর ও মুজাহিদের একটি উক্তিও এর সমর্থনে পাওয়া যায়৷ হযরত আলীর (রা) এক উক্তিতেও বলা হয়েছে , এর অর্থ যাকাত হয় আবার ছোট ছোট নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিস পত্রও হয়৷ ইবনে আবী হাতেম ইকরামা , থেকে উদ্ধৃত করে বলেন , মাউনের সর্বোচ্চ পর্যায় হচ্ছে যাকাত এবং সর্বনিম্ন পর্যায় হচ্ছে কাউকে চালুনী , বালতী বা দেয়াশলাই ধার দেয়া৷ হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা) বলেন , আমরা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথীরা বলতাম ( কোন কোন হাদীসে আছে , নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মুবারক জামানায় বলতাম ) :মাউন বলতে হাঁড়ি , কুড়াল , বালতি , দাঁড়িপাল্লা এবং এ ধরনের অন্যান্য জিনিস অন্যকে ধার দেয়া বুঝায়৷ ( ইবনে জারীর , ইবনে আবী শাইবা , আবু দাউদ , নাসায়ী , বাযযার , ইবনুল মুনযির , ইবনে আবী হতেম , তাবারানী ফিল আওসাত , ইবনে মারদুইয়া ও বাইহাকী ফিস সুনান ) সাঈদ ইবনে ইয়ায স্পষ্ট নাম উল্লেখ না করেই প্রায় এ একই বক্তব্য রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয় সাল্লামের সাহাবীদের থেকে উদ্ধৃত করেছেন৷ তার অর্থ হচ্ছে , তিনি বিভিন্ন সাহাবী থেকে একথা শুনেছেন ৷ ( ইবনে জারীর ও ইবনে আবী শাইবা ) দাইলামী , ইবনে আসাকির ও আবু নু' আইম হযরত আবু হুরাইরার একটি হাদীস উদ্ধৃত করেছেন ৷ তাতে তিনি বলেছেন : রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজে এ আয়াতের ব্যাখ্যা করে বলেছেন , এ থেকে কুড়াল , বালতি এবং এ ধরনের অন্যান্য জিনিস বুঝানো হয়েছে৷ এ হাদীসটি যদি সহীহ হয়ে থাকে , তাহলে সম্ভবত এটি অন্য লোকেরা জানতেন না৷ জানলে এরপর কখনো তারা এর অন্য কোন ব্যাখ্যা করতেন না৷ মূলত মাউন ছোট ও সামান্য পরিমাণ জিনিসকে বলা হয়৷ এমন ধরনের জিনিস যা লোকদের কোন কাজে লাগে বা এর থেকে তারা ফয়দা অর্জন করতে পারে৷ এ অর্থে যাকাতও মাউন৷ কারণ বিপুল পরিমাণ সম্পদের মধ্য থেকে সামান্য পরিমাণ সম্পদ যাকাত হিসেবে গরীবদের সাহায্য করার জন্য দেয়া হয়৷ আর এই সংগে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা) এবং তাঁর সমমনা লোকেরা অন্যান্য যেসব নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদির কথা উল্লেখ করেছেন সেগুলোও মাউন৷ অধিকাংশ তাফসীরকারের মতে , সাধারণত প্রতিবেশীরা একজন আর একজনের কাছ থেকে দৈনন্দিন যেসব জিনিস চেয়ে নিয়ে থাকে সেগুলোই মাউনের অন্তরভুক্ত ৷ এ জিনিসগুলো অন্যের কাছ থেকে চেয়ে নেয়া কোন অপমানজনক বিষয় নয়৷ কারণ ধনী - গরীব সবার এ জিনিসগুলো কোন না কোন সময় দরকার হয়৷ অবশ্যি এ ধরনের জিনিস অন্যকে দেবার ব্যাপারে কার্পণ্য করা হীন মনোবৃত্তির পরিচায়ক৷ সাধারণত এ পর্যায়ের জিনিসগুলো অপরিবর্তিত থেকে যায় এবং প্রতিবেশীরা নিজেরদের কাজে সেগুলো ব্যবহার করে , কাজ শেষ হয়ে গেলে অবিকৃত অবস্থায়ই তা ফেরত দেয়৷ কারো বাড়িতে মেহমান এলে প্রতিবেশীরা কাছে খাটিয়া বা বিছানা - বালিশ চাওয়াও এ মাউনের অন্তরভুক্ত৷ অথবা নিজের প্রতিবেশীর চুলায় একটু রান্নাবান্না করে নেয়ার অনুমতি চাওয়া কিংবা কেউ কিছুদিনের জন্য বাইরে যাচ্ছে এবং নিজের কোন মূলবান জিনিস অন্যের কাছে হেফাজত সহকারে রাখতে চাওয়াও মাউনের পর্যায়ভুক্ত৷ কাজেই এখানে আয়াতে মূল বক্তব্য হচ্ছে , আখেরাত অস্বীকৃতি মানুষকে এতবেশী সংকীর্ণমনা করে দেয় যে , সে অন্যের জন্যে সামান্যতম ত্যাগ স্বীকার করতেও রাজি হয় না৷