(১০৬:১) যেহেতু কুরাইশরা অভ্যস্ত হয়েছে ,
(১০৬:২) ( অর্থাৎ) শীতের ও গ্রীষ্মের সফরে অভ্যস্ত৷
(১০৬:৩) কাজেই তাদের এই ঘরের রবের ইবাদাত করা উচিত ,
(১০৬:৪) যিনি তাদেরকে ক্ষুধা থেকে রেহাই দিয়ে খাবার দিয়েছেন এবং ভীতি থেকে নিরাপত্তা দান করেছেন৷
১. মূল শব্দ হচ্ছে ( আরবী ------------) ৷ এখানে ঈলাফ ( আরবী ---------) শব্দটি এসেছে উলফাত ( আরবী --------) শব্দ থেকে ৷ এর অর্থ হয় অভ্যস্ত হওয়া , পরিচিত হওয়া , বিচ্ছেদের পর মিলিত হওয়া এবং কোন জিনিসের অভ্যাস গড়ে তোলা ৷ ঈলাফ শব্দের পূর্বে যে ' লাম'টি ব্যবহৃত হয়েছে সে সম্পর্কে অনেক আরবী ভাষাবিদ পণ্ডিত এ মত প্রকাশ করেছেন যে , আরবী প্রচলন ও বাকরীতি অনুযায়ী এর মাধ্যমে বিস্ময় প্রকাশ করা বুঝায়৷ যেমন আরবরা বলে , আরবী --------------------)" এই যায়েদের ব্যাপারটা দেখো , আমরা তার সাথে ভালো ব্যবহার করলাম কিন্তু সে আমাদের সাথে কেমন ব্যবহারটা করলো ৷ " কাজেই ( আরবী ------------------) মানে হচ্ছে কুরাইশদের ব্যবহারের বড়ই অবাক হতে হয়৷ কেননা আল্লাহর অনুগ্রহে তারা বিছিন্ন ও বিক্ষিপ্ত হবার পর একত্র হয়েছে এবং এমন ধরনের বাণিজ্য সফরে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে যা তাদের প্রাচুর্য ও সমৃদ্ধির মাধ্যমে পরিণত হয়েছে৷ অথচ তারা সেই আল্লাহর বন্দেগী করতে অস্বীকার করছে ৷ ভাষাতত্ববিদ আখফশ , কিসাঈ ও ফাররা এ মত ব্যক্ত করেছেন৷ ইবনে জরীর এ মতকে প্রাধান্য দিতে গিয়ে লিখেছেন , আরবরা যখন এ ' লাম ' ব্যবহার করে কোন কথা বলে তখন সেই কথাটি এ বিষয়টি প্রকাশ করার জন্য যথেষ্ট বিবেচিত হয় যে , একথার পরও যে ব্যক্তি কোন আচরণ করে তা বিস্ময়কর ৷ বিপরীত পক্ষে খলীল ইবনে আহমদ , সিবওয়াইহে ও যামাখশারী প্রমুখ ভাষাতত্ব ও অলংকার শাস্ত্রবিদগণ বলেন , এখানে লাম অব্যয় সূচক এবং এর সম্পর্ক স্থাপিত হয়েছে আগের বাক্য ( আরবী ---------------) এর সাথে৷ এর অর্থ হচ্ছে , এমনিতেই তো কুরাইশদের প্রতি আল্লাহর নিয়মত সীমা - সংখ্যাহীন , কিন্তু অন্য কোন নিয়ামতের ভিত্তিতে না হলে ও আল্লাহর অনুগ্রহের কারণে তারা এই বাণিজ্য সফরে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে , অন্তত এই একটি নিয়ামতের কারণে তাদের আল্লাহর বন্দেগী করা উচিত ৷ কারণ এটা মূলত তাদের প্রতি একটা বিরাট অনুগ্রহ৷
২. শীত ও গ্রীষ্মের সফরের মানে হচ্ছে গ্রীষ্মকালে কুরাইশরা সিরিয়া ও ফিলিস্তিনের দিকে বাণিজ্য সফর করতো ৷ কারণ এ দু'টি শীত প্রধান দেশ ৷ আর শীতকালে সফর করতো দক্ষিণ আরবের দিকে ৷ কারণ সেটি গ্রীষ্ম প্রধান এলাকা৷
৩. ঘর মানে কা'বা শরীফ৷ এখানে আল্লাহর বক্তব্যের অর্থ হচ্ছে , এ ঘরের বদৌলতেই কুরাইশরা এ নিয়ামতের অধিকারী হয়েছে৷ তারা নিজেরাই একথা মেনে নিয়েছে যে , এই যে ৩৬০ টি মূর্তিকে তারা পূজা করে এরা এ ঘরের রব নয়৷ বরং একমাত্র আল্লাহই এর রব৷ তিনিই আসহাবে ফীলের আক্রমণ থেকে তাদেরকে বাঁচিয়েছেন ৷ আবরাহার সেনাবাহিনীর মোকাবিলায় সাহায্য করার জন্য তাঁর কাছেই তারা আবেদন জানিয়েছিল৷ তাঁর ঘরের আশ্রয় লাভ করার আগে যখন তারা আরবের চারদিকে ছড়িয়ে ছিল তখন তাদের কোন মর্যাদাই ছিল না৷ আরবের অন্যান্য গোত্রের ন্যায় তারাও একটি বংশধারার বিক্ষিপ্ত দল ছিল মাত্র৷ কিন্তু মক্কায় এই ঘরের চারদিকে একত্র হবার এবং এর সেবকের দায়িত্ব পালন করতে থাকার পর সমগ্র আরবে তারা মর্যাদাশালী হয়ে উঠেছে৷ সবদিকে তাদের বাণিজ্য কাফেলা নির্ভয়ে যাওয়া আসা করছে৷ কাজেই তারা যা কিছুই লাভ করেছে এ ঘরের রবের বদৌলতেই লাভ করেছে৷ কাজেই তাদের একমাত্র সেই রবেরই ইবাদাত করা উচিত৷
৪. মক্কায় আসার পূর্বে কুরাইশরা যখন আরবের চারদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল তাখন তারা অনাহারে মরতে বসেছিল ৷ এখানে আসার পর তদের জন্য রিযিকের দরজাগুলো খুলে যেতে থাকে৷ তাদের সপক্ষে হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালাম এই বলে দোয়া করেছিলেন -- "হে আল্লাহ ! আমি তোমার মর্যাদাশালী ঘরের কাছে একটি পানি ও শস্যহীন উপত্যকায় আমার সন্তানদের একটি অংশের বসতি স্থাপন করিয়েছি, যাতে তারা নামায কায়েম করতে পারে৷ কাজেই তুমি লোকদের হৃদয়কে তাদের অনুরাগী করে দিয়ো , তাদের খাবার জন্য ফলমূল দান করো৷ ' ( সূরা ইবরাহীম ৩৭ ) তাঁর এই দোয়া অক্ষরে অক্ষরে পূর্ণ হয়৷
৫. অর্থাৎ যে ভীতি থেকে আরব দেশে কেউ নিরাপদ নয় , তা থেকে তারা নিরাপদ রয়েছে৷ সে যুগে আরবের অবস্থা এমন ছিল যে , সারা দেশে এমন কোন জনপদ ছিল না যেখানে লোকেরা রাতে নিশ্চিন্তে ঘুমাতে পারতো৷ কারণ সবসময় তারা আশংকা করতো , এই বুঝি কোন লুটেরা দল রাতের অন্ধাকরে হঠাৎ তাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লো এবং তাদের সবকিছু লুট করে নিয়ে গেলো ৷ নিজের গোত্রের সীমানার বাইরে পা রাখার সাহস কোন ব্যক্তির ছিল না৷ কারণ একাকী কোন ব্যক্তির জীবিত ফিরে আসা অথবা গ্রেফতার হয়ে গোলাম পরিণত হবার হাত থেকে বেঁচে যাওয়া যেন অসম্ভব ব্যাপার ছিল৷ কোন কাফেলা নিশ্চিন্তে সফর করতে পারতো না৷ কারণ পথে বিভিন্ন স্থানে তাদের ওপর ছিল দস্যূ দলের আক্রমণের ভয়৷ ফলে পথ - পার্শ্বের প্রভাবশালী গোত্র সরদারদেরকে ঘুষ দিয়ে দিয়ে বাণিজ্য কাফেলাগুলো দস্যূ ও লূটেরাদের হাত থেকে নিজেদেরকে নিরাপদ রেখে এগিয়ে যেতে পারতো ৷ কিন্তু কুরাইশরা মক্কায় সম্পূর্ণ নিরাপদ ছিল৷ তাদের নিজেদের ওপর কোন শত্রুর আক্রমণ ভয় ছিল না৷ তাদের ছোট বড় সব রকমের কাফেলা দেশের প্রত্যেক এলাকায় যাওয়া আসা করতো৷ হারাম শরীফের খাদেমদের কাফেলা , একথা জানার পর কেউ তাদের ওপর আক্রমণ করার সাহস করতো না৷ এমন কি একজন কুরাইশী একাই যদি কখনো কোন জায়গায় যেতো এবং সেখানে কেউ তার ক্ষতি করতে যেতো তাহলে তার পক্ষে শুধুমাত্র হারমী ( আরবী ----------) বা ( আরবী ---------) আমি হারম শরীফের লোক বলে দেয়াই যথেষ্ট ছিল৷ একথা শুনার সাথেই আক্রমাণকারীর হাত নিচের দিকে নেমে আসতো৷